
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : লালশাক একটি জনপ্রিয় পুষ্টিকর শাক। এর রং লাল। একটুখানি শাক মিশিয়ে ভাত মাখালে কী সুন্দর টকটকে লাল হয়ে যায় ভাতগুলো। এশাক দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি খেতেও সুস্বাদু। এর ইংরেজি নাম Red Amaranth এবং বৈজ্ঞানিক নাম Amaranthus gangeticus . লালশাক পুষ্টিগুণে ভরপুর। এশাকে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন ‘এ’ (ক্যারোটিন), বি. সি. এবং ক্যালসিয়াম ও আয়রণ রয়েছে। তাছাড়া এতে অ্যামাইনো এ্যাসিড, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, পটাশিয়াম ও ফাইবার বা আঁশ থাকে।
লালশাকের উৎপত্তি দক্ষিণ আমেরিকা, বিশেষ করে মেক্সিকো। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলংকা, ভিয়েতনাম, চীন, তাইওয়ান, আফ্রিকা, নাইজেরিয়া, গিনি, গিনি-বিসাউ, সেনেগাল, ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশে লালশাক চাষ হয়। লালশাকের গাছ ছোট বর্ষজীবী গুল্ম প্রকৃতির। কান্ড ফাঁপা। লালশাকের পাতা ডাঁটা শাকের পাতার চেয়ে ছোট ও নরম।
পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, খাদ্য উপযোগী প্রতি ১০০ গ্রাম লালশাকে রয়েছে প্রোটিন ৫.৩ গ্রাম, শ্বেতসার ৫.০ গ্রাম, চর্বি ০.১ গ্রাম, ১০ গ্রাম আঁশ, ১.৬ গ্রাম খনিজ লবণ, ০.১০ মিলিগ্রাম ভিটামিন-১ ও ০.১৩ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-২। তাছাড়া প্রতি ১০০ গ্রাম লালশাকে ৪৩ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’, ৩৭৪ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ৮৩ মিলিগ্রাম ফসফরাস, ২৫.৫ মিলিগ্রাম আয়রন, ১১৯৪০ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিন ও ৪৩ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি থাকে। ভিটামিন ও বিভিন্ন পুষ্টির ভালো উৎস হওয়ায় লালশাক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
পালংশাক, মুলাশাক, বাঁধাকপি, লেটুস, ধনেপাতা ও সরিষা শাকের তুলনায় লালশাকে অধিক পরিমাণে ক্যারোটিন ( carotene ) থাকে। এ ক্যারোটিন হতে আমাদের দেহে ভিটামিন ‘এ’ সৃষ্টি হয়। চোখের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখা ভিটামিন ‘এ’ র প্রধান কাজ। এছাড়া ত্বক, হাড় ও দাঁতের গঠন এবং সুস্থতা রক্ষার জন্য ভিটামিন ‘এ’ বিশেষ প্রয়োজন। দেহে ভিটামিন ‘এ’র অভাব হলে চোখের দৃষ্টিশক্তি কমে যায়। রাতের বেলায় অল্প আলোতে দেখতে অসুবিধা হয়। এ অবস্থাকে বলা হয় রাতকানা রোগ। ভিটামিন ‘এ’ র অভাব ক্রমাগত চলতে থাকলে চোখে অন্যান্য কঠিন রোগ দেখা দেয় এবং আস্তে আস্তে চোখ অন্ধ হয়ে যায়। অল্প বয়স্ক শিশুরাই (দশ বছর বয়স পর্যন্ত) এ রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। শিশু ও ছোট ছেলে-মেয়েদের অন্ধত্ব ও রাতকানা রোগ প্রতিরোধে লালশাক খুবই উপকারী। এ শাকে বিদ্যমান ভিটামিন ‘এ’ রেটিনার ক্ষমতা বাড়িয়ে দিয়ে সার্বিকভাবে দৃষ্টি শক্তির উন্নতিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। গর্ভবতী মহিলাদের দেহে ভিটামিন ‘এ’র অভাব হলে গর্ভের শিশু দুর্বল ও ক্ষীণ স্বাস্থ্যের অধিকারী হতে পারে। বুকের দুধে ভিটামিন ‘এ’ তৈরির জন্য স্তন্যদানকালে প্রসূতি মায়ের বেশি করে গাঢ় ও সবুজ রঙের শাক-সবজি খাওয়া উচিত। তাই শিশু ও কিশোর-কিশোরীসহ গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়ের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্যারোটিন (ভিটামিন ‘এ’) সমৃদ্ধ লালশাক এবং গাঢ় সবুজ ও হলুদ রঙের অন্যান্য শাক-সবজি থাকা আবশ্যক।
সরিসা শাক, বাঁধাকপি ও লেটুস পাতার চেয়ে লালশাক থেকে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘সি’ পাওয়া যায়। ভিটিামিন ‘সি’ আমাদের দাঁত, মাড়ি ও পেশি মজবুত করে। তাছাড়া সর্দি-কাশি ও ঠান্ডার কবল থেকে রক্ষা করে এবং দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। ভিটামিন ‘সি’ ক্যালসিয়াম ও আয়রণের বিপাকেও সহায়তা করে। তাই দেহের ভিটামিন ‘সি’ এর চাহিদা পূরণে লালশাক এবং অন্যান্য ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ শাক-সবজি আমাদের বেশি করে খাওয়া উচিত। ভিটামিন ‘সি’ তাপে সংবেদনশীল বলে রান্নার সময় শাক-সবজির শতকরা ৫০ ভাগ ভিটামিন ‘সি’ নষ্ট হয়ে যায়। এজন্য লালশাক এবং অন্যান্য শাক-সবজিতে বিদ্যমান ভিটামিন ‘সি’ রক্ষার জন্য উচ্চতাপে অল্প সময়ে রান্না করে যত দ্রুত সম্ভব তা খেয়ে ফেলা উচিত।
পালংশাক, মুলাশাক, সরিষাশাক, লাউশাক ও ধনেপাতার চেয়ে লালশাকে বেশি পরিমাণে ক্যালসিয়াম রয়েছে। মানবদেহের হাড় ও দাঁত গঠনে ক্যালসিয়াম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। গর্ভবতী মহিলারা যদি ক্যালসিয়ামের অভাবে ভোগেন তাহলে এর প্রভাব শিশুদের ওপর দেখা যায়। যেমন – ক্যালসিয়ামের অভাবে শিশুদের হাড়ের কাঠামো দুর্বল, ছোট ও বাঁকা হয়, দাঁত দেরীতে ওঠে এবং দাঁ হয় অপুষ্ট। তাছাড়া শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় প্রসূতি মায়ের খাবারেও যথেষ্ট পরিমাণে ক্যালসিয়াম থাকা আবশ্যক। তাই শিশু, কিশোর-কিশারী এবং গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়ের সুস্বাস্থ্যের জন্য লালশাক অত্যন্ত উপকারী।
আবার লালশাকে পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়রন থাকে। দেহে আয়রণের অভাব হলে শরীরে অপুষ্টিজনিত রক্তশূন্যতা ( anaemia ) রোগ দেখা দেয়। ছোট ছেলে-মেয়েরা এবং গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েরা অতি সহজেই এ রোগের শিকার হয়। লালশাক দেহের রক্তপ্রবাহে উন্নতি ঘটায়। নিয়মিত লালশাক খেলে রক্ত পরিশোধিত হয়। লালশাক শরীরে লোহিত রক্ত কণিকার মাত্রা বাড়াতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই রক্তশূন্যতা রোধ করতে লালশাক খুবই উপকারী।
লালশাকে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার বা আঁশ থাকার কারণে এটি দেহের হজম, পরিপাক ও বিপাক প্রক্রিয়ার কাজে সহায়তা করে, কোলন পরিস্কারেও ভূমিকা রাখে। এটি কোষ্ঠকাঠিন্য ও কোলন ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। লালশাক রক্তে কোলেস্টরলের মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে। ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে। মস্তিষ্ক ও হৃদপিণ্ডকে শক্তিশালী করতেও লালশাকের ভূমিকা রয়েছে। চুলের স্বাস্থ্যের জন্য লালশাক অনেক উপকারী। এটি চুলের গোড়া মজবুত করে এবং চুলে মিনারেল ও পুষ্টি জোগায়। তাছাড়া নিয়মিত লালশাক খেলে কিডনির কার্যকারিতা ভালো থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত লালশাক খেলে একদিকে যেমন কিডনির কর্মক্ষমতা বাড়ে, তেমনি অন্যদিকে রক্তে উপস্থিত একাধিক ক্ষতিকর উপাদান শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। লালশাকের এন্টি অক্সিডেন্ট ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। এছাড়া লালশাকে উপস্থিত অ্যামাইনো এসিড, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, ভিটামিন-ই, পটাশিয়াম এবং ভিটামিন ‘সি’ শরীরে উপস্থিত একাধিক টক্সিক উপাদান দূর করে। সেই সঙ্গে ক্যান্সার কোষ যাতে জন্ম নিতে না পারে, সেদিকেও খেয়াল রাখে। সর্বোপরি, আমাদের দেেহর সুস্থতা বজায় রাখার জন্য লালশাকের গুরুত্ব অনেক বেশি।
লালশাক ভাজি ও মাছের সঙ্গে ব্যঞ্জন হিসেবে রান্না করে খাওয়া হয়। এশাকের তরকারী খেতে সুস্বাদু ও পুষ্টিকর। পরিমাণমতো তেল দিয়ে রান্না না করার কারণে লালশাক এবং অন্যান্য শাকে বিদ্যমান ক্যারোটিন দেহে শোষিত হতে পারে না। এজন্য লালশাক অবশ্যই পর্যাপ্ত পরিমাণ তেল দিয়ে রান্না করে খেতে হবে। লালশাক দামে সস্তা ও সহজলভ্য অথচ পুষ্টিমাণে সমৃদ্ধ। তাই দেহের পুষ্টি সাধন এবং দেহকে সুস্থ-সবল ও নিরোগ রাখার জন্য শিশু ও পূর্ণবয়স্ক লোকের প্রতিদিন লালশাক ও অন্যান্য পুষ্টিকর শাক সবজি খাওয়া একান্ত প্রয়োজন।
উৎপাদন প্রযুক্তি:
উপযোগী জমি ও মাটিঃ দো-আঁশ ও বেলে দো-আঁশ মাটি লালশাক চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী।
জাত নির্বাচনঃ বাংলাদেশে প্রচলিত জাতগুলো হচ্ছে আলতাপেটি, রেড ব্লাড, ললিতা, রক্ত রাঙা, রক্ত জবা, পিংকি কুইন, অরুণা, বারি লালশাক-১ এবং স্থানীয় উন্নত জাত।
বীজ বপণের সময়ঃ সারা বছরই লালশাকের চাষ করা যায়। তবে ভাদ্র থেকে পৌষ মাস পর্যন্ত লাল শাকের চাষ বেশি হয়।
জমি তৈরিঃ ৩/৪টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরা করে জমি তৈরী করতে হবে।
সারের পরিমাণ ও প্রয়োগ পদ্ধতিঃ লালশাকের জীবনকাল কম। তাই সঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণে সার দেয়া প্রয়োজন। লালশাক চাষের জন্য প্রতি এক শতক জমিতে ২৫ কেজি গোবর, ৫০০ গ্রাম ইউরিয়া, ৪০০ গ্রাম টি.এস.পি. ও ৩০০ গ্রাম এম,ও,পি ও ২০০ গ্রাম জিপসাম সার দরকার হয়। শেষ চাষের সময় সমুদয় গোবর, টি.এস.পি ও জিপসাম এবং অর্ধেক ইউরিয়া ও এম,ও,পি সার জমিতে প্রয়োগ করতে হবে। অবশিষ্ট ইউরিয়া ও এম,ও,পি সার বীজ বপণের ২০-২৫ দিন পর উপরি প্রয়োগ করে মাটির সাথে ভাল করে মিশিয়ে দিতে হবে।
বীজ বপণঃ ছিটিয়ে অথবা সারিতে বীজ বপণ করা যায়। লালশাকের বীজ খুব ছোট বলে ১ ভাগ বীজের সাথে ৯ ভাগ শুকনো ছাই অথবা বালি মিশিয়ে জমিতে ছিটিয়ে দিতে হবে। এতে জমির সব জায়গায় সমানভাবে বীজ পড়ে। বীজ বপণের পর একটা হালকা চাষ ও মই দিয়ে বীজ মাটির মধ্যে ঢেকে দিতে হয়। বীজ সারিতে বা লাইনে বপণ করা হলে সারি থেকে সারির দূরত্ব রাখতে হবে ২০-২৫ সেঃ মিঃ। প্রতি সারিতে ১৫ সে. মি. দূরে দূরে কাঠি দিয়ে ১.৫-২.০ সেঃমিঃ গভীর করে লালশাকের বীজ বপণ করতে হয়। ছিটিয়ে বপণ করলে প্রতি শতকে ১০ গ্রাম এবং সারিতে বুনলে ৫ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়।
পরবর্তী পরিচর্যাঃ চারা গজানোর এক সপ্তাহ পর ঘন জায়গা থেকে চারা তুলে পাতলা করে দিতে হবে। এগুলো শাক হিসেবে খাওয়া যায়। মাটিতে রসের অভাব হলে জমিতে পানি সেচ দিতে হয়। জমি খুব শুকিয়ে গেলে লালশাকের পাতা ও কাণ্ড শক্ত হয়ে যায়, বাজারে বিক্রি করে ভাল দাম পাওয়া যায় না। তাই লালশাকের জমিতে ৪-৫ দিন পর পর সেচ দিতে পারলে ভালো হয়।
এছাড়া খেতের আগাছা নিড়ানি দিয়ে নিয়মিত পরিস্কার করতে হবে। বৃষ্টিপাত বা সেচের পর জমির ওপরের মাটি চটা ধরে শক্ত হয়ে এলে নিড়ানি বা ছোট কোদাল দিয়ে তা ভেঙ্গে মাটি আলগা ও ঝুরঝুরে করে দিতে হবে।
পোকা-মাকড় ও রোগ-বালাই দমনঃ লালশাকে লেদা পোকা ও পাতার বিটল পোকার আক্রমন হয় এছাড়া লালশাকে সাদা মরিচা ( White rust ) রোগের আক্রমণ দেখা যায়। সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার (আই,পি,এম) মাধ্যমে এসব পোকা-মাকড় ও রোগ-বালাই দমন করতে হবে।
ফসল সংগ্রহঃ বীজ বপণের এক মাস পর থেকে লালশাক সংগ্রহের উপযোগী হয়।
ফলনঃ প্রতি শতকে ৩০-৪০ কেজি লাল শাক পাওয়া যায়।