
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা ,খুলনা ও বাগেরহাট সহ দেশের সকল জেলার নারী ভোটারদের ভয় বিএনপিতে আর তরুণ ভোটারদের ভয় জামায়াতে ইসলামের মধ্যে। সারাদেশে নারী ভোটাররা ভোট দিতে ইচ্ছা পোষণ করেন জামায়াতে ইসলাম তথা দাঁড়িপাল্লায়। আর সারাদেশের বেশি তরুণদের ইচ্ছা বিএনপি তথা ধানের শীষে ভোট দিতে ইচ্ছুক এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন দেশে-বিদেশি একাধিক জরিপ সংস্থা । জরিপ সংস্থাগুলোর তথ্য ও বিশ্লেষণে উঠে এসেছে বাংলাদেশের ঢাকা শহর বাদে অন্যান্য জেলাগুলোতে নারী ভোটাররা দাড়িপাল্লায় ভোট দিতে ইচ্ছুক বেশি । তাদের তথ্য মতে বাংলাদেশের গ্রাম গঞ্জের নারী ভোটাররা পরহেজগার ও ধর্মভিত্তিক বেশি। তাদের তথ্য মতে আরো বলা হয়েছে বাংলাদেশের বিভাগীয় শহরগুলোর তরুণ তরুণী, ভোটাররা বিএনপি তথা ধানের শীষে ভোট দিতে পারে বলে এসব তথ্য পোষণ করেছেন তাদের জরিপে। বিশেষ করে বাংলাদেশের গ্রাম গঞ্জের নারী ভোটাররা জামায়াতে ইসলামের ইসলামী সংক্রান্ত কথায় বিশ্বাস করে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেয় এবং এবারও তৃণমূলের নারী ভোটাররা দাড়িপাল্লায় ভোট দিতে পারে এমন অভিমত সংস্থাগুলোর জরিপে উঠে এসেছে। নারী ভোটারদের এই ভয়টা বিরাজ করছে বিএনপি তথা ধানের শীষের প্রার্থীদের মধ্যে। অন্যদিকে দেশের বড় একাংশ তরুণ তরুণী ভোটাররা ভোট দিতে পারে বিএনপি তথা ধানের শীষের প্রার্থীদের এমন তথ্য সংস্থাগুলোর জরিপের প্রকাশ করা হয়েছে। এই তথ্য প্রকাশের পরে জামায়াতে ইসলাম রয়েছে তরুণ ভোটারের চিন্তায় আর বিএনপি রয়েছে নারী ভোটারের চিন্তায়। তবে জরিপ করা ওই সংস্থাগুলোর কয়েকটি সংস্থার জরিপে উঠে এসেছে নারী ভোটাররা বেশিরভাগ যেদিকে ভোট দিবে সেদিকে প্রার্থীরা তথা দল বিজয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই সমস্ত জরিপের ফলাফল কিছুটা আমলে নিয়ে মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন জামায়াত-বিএনপি উভয় পক্ষের প্রার্থী থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় নীতি নির্ধারকরা। তবে বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দাবি নারী পুরুষ তরুণ তরণী সকল ভোটাররাই বিএনপি তথা ধানের শীষ কে ভোট দিয়ে বিজয় করবে। আর জামায়াতে ইসলামের আমির শফিকুর রহমান বিভিন্ন জনসভায় বক্তব্য রাখছেন নারী পুরুষ ও তরুণ তরুণী ভোটাররা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামকে তথা দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়ে ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে এদেশে এবার দাঁড়িপাল্লার সরকারকে ক্ষমতায় বসাবে । কাতার ভিত্তিক বিশ্ব গণমাধ্যম সংস্থা আল জাজিরার সম্প্রীতি জরিপে বলা হয়েছে বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনে বর্তমান অবস্থায় জামাত-বিএনপি হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতা চলছে । তবে ওই গণমাধ্যম আরেকটি প্রতিবেদনে বলেছেন বাংলাদেশে যেহেতু আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে পিছিয়ে রাখা হয়েছে সে কারণে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটারদের ভোটদান থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। তবুও উভয় দলের চাপে কলে কৌশলে আওয়ামী লীগের যে সমর্থন রয়েছে তার থেকে ৩০-৪০ শতাংশ কোন কোন আসনে তার অধিক ভোটাররা ভোট দিতে যাবে ।এই ভোট জামায়াত-বিএনপি যে জোট বাগিয়ে নিতে পারবে তারাই আগামীর সরকার গঠন করতে পারে বাংলাদেশে ।আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারা দেশের মোট ভোটারের অর্ধেকই নারী। এবারের নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারণে নারী ভোটার বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দল বিভিন্ন আশ্বাস, অঙ্গীকার করে নারী ভোটারদের নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা করছে। এক কথায় বলা যায়, টার্গেট এখন নারী ভোটার।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সরকার আসে সরকার যায়, কিন্তু নারীদের ভাগ্যের খুব একটা পরিবর্তন হয় না। আশা করি, আসন্ন নির্বাচনে যে দলই দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আসবে তারা আন্তরিকতার সঙ্গে নারীদের ভাগ্যের উন্নয়নে কাজ করবে।
দেশের নারী উদ্যোক্তাদের প্রতিষ্ঠান উইমেন এন্টারপ্রেনারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ওয়েব) প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী নাসরিন ফাতেমা আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘আগামীতে নির্বাচিত সরকারের কাছে আশা করছি, নারীদের জন্য আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করবে। নারীদের কাজের সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করবে। অনেক নারী আছে ব্যবসা করতে চান, কিন্তু পর্যাপ্ত পুঁজির অভাবে তা পারেন না। শুধু নারীদের জন্যে ব্যাংক করার দাবি করছি। শুধু তাই না কর্মক্ষেত্রে নারীদের কাজের মূল্যায়ন করতে হবে। একটি রাজনৈতিক দল, নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড দিতে চেয়েছে, আমি এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।’
এরই মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সেই তথ্যানুসারে, এবারের ভোটার তালিকায় ৩০০টি আসনের মধ্যে ৭৮টি আসনে পুরুষের তুলনায় নারী ভোটার বেশি রয়েছেন। বিশেষভাবে দেশের উত্তর ও দক্ষিণ এলাকার আসনগুলোয় ভোটারদের মধ্যে নারীর সংখ্যা বেশি।
ইসির তথ্যানুসারে, এবারের নির্বাচনে ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৫ জন নাগরিক তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ পাবেন। পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫১ জন এবং নারী ভোটার রয়েছেন ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৪ জন।
এরই মধ্যে বিভিন্ন জনসভায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান জানিয়েছেন, বিএনপি সরকারে গেলে নারীর যথাযথ ক্ষমতায়ন নিশ্চিতে কাজ করবে। দেশে নারীরা নানাভাবে বঞ্চিত। এ ছাড়া সামাজিকভাবেও তাদের নানা ধরনের বাধ্যবাধকতা আছে। তাই নারীর যথাযথ ক্ষমতায়ন নিশ্চিতে বিএনপির পরিকল্পনা আছে।
বিএনপি পরিবারের প্রধান নারীকে; যিনি সংসার চালান তাকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার কথা বলছে। বিএনপি চেয়ারম্যান দাবি করেছেন, এতে মানসিকভাবে ওই নারী শক্তিশালী হবেন, পরিবারে তার সম্মান আরও বৃদ্ধি পাবে। ফ্যামিলি কার্ড থাকলে প্রতি মাসে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকার আর্থিক সহায়তা অথবা খাদ্য সুবিধা, যথা- চাল, ডাল, তেল, লবণসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দেওয়া হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এক সভায় বলেছেন, ‘আমাদের আগামী দিনের অর্থনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ ও অংশীদারত্ব কীভাবে বাড়ানো যায়, সেটাই হবে আমাদের কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দু। নারীদের জীবনমান উন্নয়নে যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, তার বাজেট কোথা থেকে আসবে, তা নিয়েও বাস্তববাদী চিন্তা করেছে বিএনপি। কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে দক্ষতা বাড়াতে হবে। প্রত্যন্ত এলাকায় নারীদের আর্থিক সহায়তা বাড়াতে হবে। নারীদের কাজকে মার্কেটিং, ব্র্যান্ডিং ও ডিজাইন সাপোর্ট দিলে তাদের জীবন যাপনের চিত্র পাল্টে যাবে। এসব নিয়ে কাজ করবে বিএনপি।’
তিনি নারী উন্নয়নের জন্য বেশ কয়েকটি ক্ষেত্র উল্লেখ করে বলেন, ‘নারীদের শিক্ষার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়নে জোর দেওয়া হবে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের নারীদের জন্য প্রাথমিকভাবে যেসব কাজ তারা করেন, সেখানে আর্থিক সহায়তা ও ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়ানো হবে।’
খেলাধুলা ও সৃজনশীল খাতেও নারীদের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে আমীর খসরু বলেন, ‘সুযোগ দিন। আমরা গ্রামে-গঞ্জে খেলাধুলার কেন্দ্র তৈরি করব। এই নীতিতে কত টাকা লাগবে, কীভাবে বাস্তবায়ন করব, বাজেট কত হবে এবং উৎস কোথা থেকে আসবে, তার সব হিসাব আমরা করে রেখেছি।’
অন্যদিকে আরেক অন্যতম রাজনৈতিক দল জামায়াতের ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বিভিন্ন জনসভায় বলেন, ‘আমরা এমন একটি দেশ চাই, যেখানে আমাদের মা-বোনরা ঘরে সুরক্ষিত থাকবেন, কর্মস্থলে সুরক্ষা পাবেন, রাস্তাঘাটেও সুরক্ষিত থাকবেন। তাদের দিকে কোনো খারাপ লোক চোখ তুলে তাকানোর ফুরসত পাবে না। তারা ইজ্জতের সঙ্গে, মর্যাদার সঙ্গে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবেন।’
জামায়াতের আমির আরও বলেন, ‘আমাদের ব্যাপারে ইসলামের প্রতিপক্ষ শক্তিরা অপপ্রচার চালায়। বলে, জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে নারীদের ঘর থেকে বের হতে দেবে না। যদিও দেয়ও, জোর করে বোরকা পরাবে।’ তিনি বলেন, ‘জোর করা লাগবে না। যে দেশে ইসলাম কায়েম হবে, সে দেশে মায়েরা আনন্দের সঙ্গে তাদের সম্মানের ও মর্যাদার পোশাক পরবেন। তারপরও কোনো মা, কোনোও বোন যদি এই পোশাকের বাইরে থাকেন, আমরা কথা দিচ্ছি, নিশ্চয়তা দিচ্ছি, কারও ওপর জোর খাটানো হবে না। কারণ, এই দেশে শুধু মুসলমানেরা বসবাস করেন না।’
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘আগামীতে সরকার নারীদের জন্যে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবে। এতে নারীদের দক্ষতা বাড়বে। তারা তাদের আর্থিক সংকট কাটাতে ব্যবস্থা নেবে। নারীদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখবে।’
ইসির তথ্যানুসারে, উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর মধ্যে যেসব আসনে নারী ভোটারের সংখ্যা বেশি সেগুলো হলো ঠাকুরগাঁও-১, দিনাজপুর-৫ ও ৬, রংপুর-৩, ৪, ৫ ও ৬, কুড়িগ্রামের চারটি আসনের সব, গাইবান্ধার পাঁচটি আসনের সব, জয়পুরহাটের দুটি আসনের সব, বগুড়ার সাতটি আসনের মধ্যে ৩, ৪, ৫ ও ৬ নম্বর আসন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসন, নওগাঁর ছয়টি আসনের মধ্যে ১, ২, ৩, ৪ ও ৫ নম্বর আসন, রাজশাহীর ছয়টি আসনের মধ্যে ১, ২, ৩ ও ৬, নাটোরের চারটি আসনের সব, সিরাজগঞ্জ-১ ও ৪ নম্বর আসন, পাবনা-৪ আসন, মেহেরপুর-২ আসন, কুষ্টিয়া-৩ আসন, চুয়াডাঙ্গা-১ আসন, ঝিনাইদহ-২ আসন, যশোর-১ ও ৪ আসন, মাগুরা-১, নড়াইল-২, বাগেরহাট-১ ও ২, খুলনা-১, ২, ৪ ও ৫, সাতক্ষীরা-১ ২, ৩, ও ৪,বরগুনা-১ ও ২, পিরোজপুর-১, টাঙ্গাইল-৮, জামালপুর-৪ ও ৫, শেরপুরের তিনটি আসনের সব, ময়মনসিংহ-১, ৪ ও ১১, ঢাকা-২০, গাজীপুর-১, ২, ৩ ও ৪, নরসিংদী-৪ এবং ফরিদপুর-৩ আসন। এসব আসনে ব্যবধান খুব বেশি না হলেও পুরুষ ভোটারের তুলনায় নারী ভোটার বেশি। যেমন–বগুড়া-৬ আসনে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২২ হাজার ৭৯৬ জন, আর নারী ভোটার ২ লাখ ৩২ হাজার ২৩৭ জন। আবার ঠাকুরগাঁও-১ আসনে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫৫ হাজার ৫৩ জন, আর নারী ভোটার ২ লাখ ৫৬ হাজার ৫৭২ জন। এছাড়া ঢাকা, খুলনা ,বরিশাল, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের তৃণমূলের আসনগুলোতে একই অবস্থা বিরাজ করছে।