
বিজ্ঞপ্তি : পহেলা বৈশাখ-এ ইলিশ খাওয়া কোনো সৃষ্টিশীল কৃষ্টি নয়; এটি যখন অতিরঞ্জিত হয়, তখন তা হয়ে ওঠে খাদ্য আর অর্থের অযথা অপচয়।
পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসব। নতুন বছরের সূচনা, পুরনোকে বিদায় আর নতুন স্বপ্নকে বরণ এই দিনটি মূলত আনন্দ, সাম্য ও সংস্কৃতির প্রতীক। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই উৎসবের কিছু চর্চা এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা আসল কৃষ্টির চেয়ে বাহ্যিক প্রদর্শনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এর অন্যতম উদাহরণ হলো পহেলা বৈশাখে ইলিশ খাওয়ার প্রবণতা।
ইলিশ নিঃসন্দেহে বাঙালির প্রিয় মাছ, এর স্বাদ ও ঐতিহ্য নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু এটিকে বৈশাখ উদযাপনের অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখা আসলে একটি আধুনিক সামাজিক প্রবণতা, প্রাচীন কৃষ্টি নয়। ধীরে ধীরে এটি এমন এক সামাজিক চাপ তৈরি করেছে, যেখানে অনেকেই মনে করেন ইলিশ ছাড়া বৈশাখ অসম্পূর্ণ। অথচ উৎসবের সৌন্দর্য কখনোই একটি নির্দিষ্ট খাবারের ওপর নির্ভর করে না।
এছাড়া এই সময় ইলিশ মাছের জীববৈজ্ঞানিক দিকটিও বিবেচনা করা জরুরি। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে ইলিশ প্রজননের জন্য প্রস্তুত হয়-এই সময় তারা ডিম দেয় বা গর্ভধারণ করে। অতিরিক্ত আহরণ বা চাহিদা বৃদ্ধির কারণে এই প্রজনন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। অর্থাৎ, শুধু তাৎক্ষণিক আনন্দের জন্য আমরা দীর্ঘমেয়াদে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদকে ঝুঁকির মুখে ফেলছি।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বৈশাখ এলেই ইলিশের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। এতে সমাজে এক ধরনের বৈষম্য তৈরি হয়-যেখানে কেউ ইলিশ দিয়ে উৎসব পালন করে, আর কেউ তা পারে না। ফলে উৎসবের মূল চেতনা, অর্থাৎ সবার অংশগ্রহণ ও সমান আনন্দ, তা ক্ষুণ্ণ হয়।
খাদ্য অপচয়ের বিষয়টিও এখানে উপেক্ষা করা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক মর্যাদা বা দেখানোর জন্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত ইলিশ কেনা ও রান্না করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত অপচয়ে পরিণত হয়। এটি যেমন অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর, তেমনি নৈতিক দিক থেকেও প্রশ্নবিদ্ধ।
সংস্কৃতি কখনো জোর করে তৈরি হয় না; এটি মানুষের জীবন, পরিবেশ ও মূল্যবোধ থেকে স্বাভাবিকভাবে গড়ে ওঠে। পহেলা বৈশাখের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে সরলতায়-পান্তা-ভাত, শাকসবজি, গ্রামীণ খাবার, মেলা, গান আর মানুষের মিলনমেলায়। এখানে ইলিশ থাকতে পারে, কিন্তু সেটি যেন বাধ্যতামূলক না হয়ে পছন্দের একটি অংশ হয়।
অতএব, আমাদের উচিত এই প্রবণতাকে নতুনভাবে ভাবা। ইলিশকে কেন্দ্র করে নয়, বরং উৎসবের মূল চেতনা-সহজতা, সাম্য ও পরিবেশের প্রতি দায়িত্ববোধ-এই বিষয়গুলোকে সামনে আনা। তবেই পহেলা বৈশাখ সত্যিকার অর্থে একটি সৃষ্টিশীল ও টেকসই কৃষ্টিতে পরিণত
হয়েছে বলে এ-সব কথা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ জাতীয় মৎস্যজিবী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাবেক সভাপতি ও ফোয়াব এর সভাপতি মোল্লা সামছুর রহমান শাহীন।