1. mesharulislammonir1122@gmail.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন
  2. info@www.sangjogprotidin.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন :
সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১২:৩২ পূর্বাহ্ন

উপকূলে লবণাক্ততার বিপদ

  • প্রকাশিত: রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬
  • ৩৯ বার পড়া হয়েছে

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পরিবেশে যে বিপর্যয় ঘটে চলেছে তার ধাক্কা বহু আগেই লেগেছে দেশের উপকূলীয় জেলাগুলোতে। উপকূলের নদ-নদীতে দিন দিন লবণাক্ততা বেড়ে চলেছে। এতে হাজার হাজার হেক্টর জমি উর্বরতা হারাচ্ছে। সুপেয় পানির সংকট বাড়ছে। টিকে থাকার যেসব কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না ঠিকমতো। এতে বাস্তুচ্যুতির হার বাড়ছে। উপকূলীয় জেলাগুলো থেকে বস্তুচ্যুত হচ্ছে বহু মানুষ।
উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিতে লবণাক্ততার প্রভাব নিরূপণে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সেবা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান মৃত্তিকা সম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই) সম্প্রতি একটি গবেষণা পরিচালনা করেছে। তাতে দেখা গেছে, শুধু লবণাক্ততার কারণেই প্রতিবছর উপকূলীয় ১৯ জেলায় খাদ্যশস্য উৎপাদন-বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে ৩০ লাখ টনের বেশি। এসআরডিআই-এর তথ্যমতে, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের খাদ্য নিরাপত্তাসহ সার্বিক আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতেই বড় মাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে লবণাক্ততা। এ লবণাক্ততা বাড়তে থাকায় উপকূলীয় অঞ্চলের মাটিতে অণুজীবের সক্রিয়তা কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে মাটিতে কমে যাচ্ছে জৈব পদার্থ, নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের সহজলভ্যতাও। এর বিপরীতে বাড়ছে কপার ও জিংকের মাত্রা।
গত ২২ জানুয়ারি ‘সাতক্ষীরার উপকূলীয় কৃষি জমিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রভাব’ বিষয়ক এক মতবিনিময় সভায় উঠে এসেছে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার সুদূর প্রসারী ফলাফলের চিত্র। সভায় বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সাহানোয়ার সাঈদ শাহীন মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন। যেখানে এসআরডিআই-এর গবেষণার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। প্রবন্ধে বলা হয়েছে, উপকূলীয় অঞ্চলের জমিগুলোতে লবণাক্ততার মাত্রা বেড়েই চলেছে। আর সেটা ছড়াচ্ছেও অত্যন্ত দ্রুতগতিতে। লবণাক্ততার তীব্রতায় আবাদি জমি হয়ে পড়ছে অনাবাদি। ফলন কমছে শস্যের। গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ক্ষত।
প্রবন্ধে আরো বলা হয়, বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাতের কারণে লবণাক্ততা কিছুটা হ্রাস পায়। ওই সময় কিছু লবণাক্ত এলাকায় ধানের, বিশেষ করে আমন ফসলের আবাদ করা সম্ভব হয়। তবে মৌসুমের শেষ দিকে বৃষ্টি কমায় ফসলের দানার সংখ্যাও মারাত্মকহারে কমে যায়। ফলন ঠিকমতো পান না কৃষক। লবণাক্ততার প্রভাবে একদিকে যেমন মাটির উর্বরতা কমছে, অন্যদিকে গাছের উৎপাদনক্ষমতাও কমে আসছে।
প্রবন্ধে উল্লেখ করা তথ্যমতে, স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালেও উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ত জমির পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৩৩ হাজার হেক্টর। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৬০ হাজার হেক্টরে। সে হিসেবে গত চার যুগে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ত জমির পরিমাণ বেড়েছে ২৭ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে হালকা মাত্রায় লবণাক্ত জমির পরিমাণ এক লাখ ৯০ হাজার হেক্টর, মধ্যম মাত্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার, তীব্র মাত্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার ও খুব তীব্র মাত্রায় লবণাক্ত জমির পরিমাণ ২ লাখ হেক্টর।
উপকূলীয় অঞ্চলে এসব এলাকায় মোট আবাদি জমির পরিমাণ ২৮ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে চাষযোগ্য ২১ লাখ ৬২ হাজার হেক্টর। সে হিসেবে উপকূলীয় অঞ্চলের চাষযোগ্য জমির প্রায় অর্ধেকই লবণাক্ত। লবণ পানির ভয়াবহতার কারণে প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে উপকূলীয় এলাকায় পাঁচ লাখ হেক্টরের বেশি জমি অনাবাদি থেকে যায়।
এসআরডিআইয়ের হিসাব অনুযায়ী, উপকূলীয় অঞ্চলে মাঝারি থেকে খুবই তীব্র মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ ৮ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর (স্বল্পমাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত জমিকে বাদ দিয়ে)। এসব জমিতে প্রতি বছর লবণাক্ততার কারণে শস্য উৎপাদন কম হচ্ছে হেক্টর প্রতি গড়ে ৩ দশমিক ৪৮ টন করে। সব মিলিয়ে উপকূলীয় অঞ্চলের জমিগুলো শুধু লবণাক্ততার কারণে ফলন হারাচ্ছে ৩০ লাখ ২৭ হাজার টনেরও বেশি। প্রতি কেজি শস্যের গড় মূল্য ৭৭ সেন্ট হিসেবে বছরে এ ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩৬ কোটি ৭১ লাখ ২০ হাজার ডলারে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩ হাজার ১২০ কোটি টাকা (১ ডলার সমান ৮৫ টাকা)।
অন্যদিকে, ক্ষতিগ্রস্ত জমির পুষ্টি প্রতিস্থাপনে ব্যয় হচ্ছে এক কোটি ৩৫ লাখ ৬০ হাজার ডলার করে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১১৫ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে দেশে প্রতি বছর শুধু উপকূলীয় জমিতে লবণাক্ততার কারণে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে ৩ হাজার ২৩৫ কোটি টাকা করে।
বিশেষজ্ঞদের দেয়া মতামত উল্লেখ করে প্রবন্ধে বলা হয়, বৈশ্বিক উষ্ণতা ও সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার কারণেই উপকূলীয় অঞ্চলের মাটিতে সমুদ্রের লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ ঘটছে। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানিতেও লবণাক্ততা বাড়ছে। এছাড়া জলোচ্ছ্বাসের সময়েও সমুদ্রের নোনাপানি উঁচু ভূমিতে উঠে আসে। পরে তা নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেয়া হয় না। নদীতে সুপেয় পানির অভাব থাকায় নোনাপানি অপসারণ প্রক্রিয়াটিও বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। এছাড়া পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের অভাব, উপকূলীয় নদ-নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় জোয়ারের সময় বাঁধ উপচে পড়ছে। সমুদ্রের লবণাক্ত পানি চলে আসছে কৃষি জমিতে। ব্যাহত হচ্ছে কৃষি জমির স্বাভাবিক উৎপাদন ক্ষমতা।
সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক আফরোজা আক্তার এই প্রতিবেদককে ‌বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের নদীর পানি ক্রমান্বয়ে লবণাক্ত হয়ে পড়ছে। লবণাক্ততার কারণে পরিস্থিতি গুরুতর খারাপের দিকেই যাচ্ছে। লবণাক্ত পানি প্রবেশ ঠেকাতে না পারা ও দুর্যোগের কারণে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসের কারণে বিপর্যয় আরো বাড়বে। জমি আবাদযোগ্য করে তুলতে না পারলে তার প্রভাব পড়বে জনজীবন ও বাস্তুসংস্থানে। লবণাক্ততা সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন ও তা দ্রুত কৃষকের কাছে পৌঁছানো এবং উন্নত প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করতে হবে। এছাড়া এ অঞ্চলে বাঁধ নির্মাণ ও পুননির্মাণ করে লবণ পানি প্রবেশ ঠেকাতে হবে। সার্বিকভাবে এ অঞ্চলের উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি।
লবণাক্ত সহিষ্ণু ধান লাগানো অবস্থায় উপকূলে পরিকল্পিত চিংড়ি চাষ করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে হুমায়ূন কবির বলেন, লবণাক্ততা বন্ধ করা এখন অসম্ভব। তবে লবণাক্ততা সহনীয় কৃষি উদ্ভাবন করে ফলস ফলাতে হবে। ফলে উপকূলীয় জমি আর অনাবাদি থাকবে না। সরকারের পদক্ষেপের বিষয় উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, জেলার দুটি উপজেলা শ্যামনগর ও আশাশুনি অঞ্চলে আবাদি জমি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। কার্যকর ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ না থাকায় এ অঞ্চলের মানুষ প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের কাছে পরাজিত হচ্ছে। লবণাক্ততা বৃদ্ধির জন্য স্বাভাবিক জনজীবন ফিরে পেতে মানুষ সংগ্রাম করছে। তবে সরকার তাদের পাশে সবসময়ই আছে বিধায় এ অঞ্চল জনশূন্য হয়নি।
লবণাক্ততা দূরীকরণে ও সম্ভাব্য বিপর্যয় মোকাবিলার দিক তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, দীর্ঘ মেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বেড়িবাঁধ পুননির্মাণ করা হচ্ছে। এ ধরনের কার্যক্রম আরো কয়েকটি পোল্ডারে করা গেলে স্থায়ীভাবে লবণাক্ত পানি প্রবেশ ঠেকানো সম্ভব হবে। তাহলে জমিতে আবাদ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে লবণাক্ততাসহিষ্ণু শস্য আবাদের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। আমরা চাই এখানকার মানুষ যেন নিজের জমিতে আবাদ করতে সক্ষম হয় এবং ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে না হয়।
খুলনা শহর থেকে ৪৮ কিলোমিটার পথ পেরোলে দাকোপ উপজেলার শেষ সীমানার গ্রাম গুনারি ও কালাবগি। সেখানে যাওয়ার অবশ্য সরাসরি কোনো পথ নেই। নৌকায় তিনটি নদী পেরিয়ে, আঁকাবাঁকা সরু মাটির পথ দিয়ে সেখানে যেতে হয়। এই গ্রাম দুটির পরই সুন্দরবন।
শিল্পোন্নত দেশগুলোর বিপুল কার্বন নিঃসরণের ফলে বিশ্বের তাপমাত্রা বাড়ছে। এতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর বিস্তীর্ণ উপকূলে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করছে। খুলনা-সাতক্ষীরার মতো জেলাগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ আস্তে আস্তে বিপর্যয়ে রূপ নিচ্ছে।
এর ফলে জেলা দুটির পাঁচটি উপজেলার (খুলনার কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছা এবং সাতক্ষীরার আশাশুনি ও শ্যামনগর) ভূমির ধরনের কী বদল হয়েছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন একটি গবেষণা করেছে। তাতে দেখা গেছে, ১৯৯৫ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে এই পাঁচ উপজেলার কৃষিজমি কমেছে ৭৮ হাজার ১৭ একর। লবণ পানিনির্ভর চিংড়ি চাষের জমি বেড়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৬৮৯ একর।
এ বিষয়ে সংস্থাটির এদেশীয় পরিচালক হাসিন জাহান বলেন, ‘আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, ওই পাঁচ উপজেলায় মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ছে। খাওয়ার পানির সংকট থেকে শুরু করে শিক্ষাতেও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সেখানে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছে।’
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ওই পাঁচ উপজেলায় পাল্টে যাচ্ছে জীবন-জীবিকা। বর্তমানে তা কী অবস্থায় দাঁড়িয়েছে, সেটা দেখতে গত শুক্রবার হাজির হই গুনারি গ্রামে। একে গ্রাম বললে অবশ্য ভুল হবে। প্রবল স্রোতের দুই নদ পশুর ও শিবসার মাঝখানে দ্বীপের মতো ওই গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ বছরে তিন মাস কাজ পান। বাকি সময় এগ্রাম-ওগ্রাম এটা-ওটা করে তাঁদের চলে। বছরে একটা ফসল হয়, তা দিয়ে সাত-আট মাসের খোরাকি হয়। বাকি সময় এক-দুই বেলা খেয়ে কোনোমতে চলে।
বাড়ির উঠানে বসে কথা হয় গুনারি গ্রামের পূর্বপাড়ার মিস্ত্রিবাড়ির মুরব্বিদের সঙ্গে। তাঁরা জানালেন, তাঁদের মিস্ত্রি বংশে ৫৩ জন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও ৬০ জন নারী বসবাস করেন। এর মধ্যে তিনজন পুরুষ শহরে স্থায়ী চাকরি করেন। অন্যরা বছরের তিন মাস নিজেদের ও অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করেন। অন্য সময় মাসের ২০ দিন কোনো কাজ থাকে না। ১০ দিনের মতো এলাকায় কোনো সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে মাটি কাটার কাজ পান। তাতে যা পান তা দিয়ে মাস চলে।
মোহন মিস্ত্রি বলেন, তাঁদের পাঁচজনের পরিবারের জন্য দিনে ৫০ টাকার বাজার করেন। ঘরে খোরাকির চাল ও নদী থেকে মাছ ধরে পেট চলে।
পাশে বসে থাকা প্রফুল্ল মিস্ত্রি একটি গোলপাতার কুঁড়েঘর দেখিয়ে বলেন, ‘পেটের জ্বালা সহ্য করতি না পেরে ওই বাড়ির নিতাই মিস্ত্রি ও তপন মিস্ত্রি পিতৃপুরুষের ভিটা ফেলে চলে গেছে।’
কোথায় গেছেন জানতে চাইলে তাঁরা কিছুক্ষণ মুখ চাওয়াচাওয়ি করেন। একপর্যায়ে জবাব দেন, ‘ওই পারে।’
এ বিষয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আইনুন নিশাত এই প্রতিবেদককে।বলেন, ‘আমাদের নিজেদের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সব ধর্মের মানুষ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। এদের মধ্যে অনেকে ভারতে, কেউ কেউ মধ্যপ্রাচ্যে বা ইউরোপেও যাচ্ছে। আর দেশের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামেও খুলনা-সাতক্ষীরার মানুষকে আমরা যেতে দেখেছি। এই সবকিছুর জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অন্যতম দায়ী।’
সরকারি-বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সব সংস্থার নানা গবেষণা, জরিপ, পরিসংখ্যান ও পর্যবেক্ষণ বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল বিশ্বের অন্যতম বিপন্ন এলাকায় পরিণত হয়েছে। সেখানে ২০০৫ সাল থেকে প্রায় দুই বছর পরপর একটি করে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা ও জাতিসংঘের আন্তসরকার জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত প্যানেল (আইপিসিসি) বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে করা গবেষণায় এসব কথার প্রমাণ মিলছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, ১০ বছর ধরে দেশের অর্থনীতিতে গড়ে ৬ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। এতে বছরে দারিদ্র্য কমছে সোয়া ২ শতাংশ হারে। জনসংখ্যা ১ দশমিক ৩ শতাংশ হারে বাড়ছে। কিন্তু খুলনায় উল্টো চিত্র। ২০০১ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে সেখানে জনসংখ্যা কমেছে ৬০ হাজার। লবণাক্ত হয়ে ওঠা জমিতে ফসল হচ্ছে না।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি), বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) ও বিবিএসের সর্বশেষ ২০১৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ। সাতক্ষীরা জেলার ৫৫ শতাংশ মানুষই অতিদরিদ্র, খুলনায় তা ৫০ শতাংশ।
গবেষকেরা বলছেন, একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লোকজন তাঁদের পিতৃপুরুষের পেশা কৃষিকাজ ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নিয়মিত ঝড়ে ষাটের দশকে নির্মিত উপকূলীয় বেড়িবাঁধ ভেঙে কৃষিজমিতে লবণ পানি প্রবেশ করে। এতে লবণাক্ত হয়ে ওঠা মাটিতে কৃষির বদলে চিংড়ি চাষের দিকে তাঁরা ঝুঁকে পড়েন। পরে প্রভাবশালী চিংড়িচাষিরা বাঁধ কেটে ঘেরে নোনাপানি ঢুকিয়ে বাগদা চিংড়ি চাষে ঝুঁকে পড়েন।
তবে চিংড়ি চাষ বেড়ে যাওয়াকে মৎস্য অধিদপ্তর সব সময় ‘উন্নয়ন’ হিসেবে দেখে আসছে। তাদের মতে, এতে দেশে চিংড়ির উৎপাদন বাড়ছে। বৈদেশিক মুদ্রার আয় বাড়ছে।
খুলনা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা ও সাতক্ষীরায় ২০১১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে নোনাপানির বাগদা চিংড়ি চাষের জমি বেড়েছে প্রায় ১ লাখ হেক্টর।
খুলনাভিত্তিক সংস্থা উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোটের (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৯ সালের পর খুলনা ও সাতক্ষীরা থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার মানুষ অন্যত্র চলে যায়। এর দুই বছর পর আবার ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ বাড়িতে ফিরে আসে। বাকি ১৫ হাজার আর ফেরেনি।’ এখনো যারা বেড়িবাঁধে উদ্বাস্তু হিসেবে মানবেতর জীবনযাবন করছে, তাদের এখন উন্নয়নের নামে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে এই এলাকার মানুষ কোথায় যাবে, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।
বাংলাদেশের মোট ভূমির ২০ শতাংশ উপকূলীয় এলাকায়। মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত এ অঞ্চলের পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ থাকে সবচেয়ে বেশি। যুগের পর যুগ ধরে পানিতে লবণাক্ততার সমস্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নারীস্বাস্থ্য। এ অঞ্চলের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী ভুগছে জরায়ুর সমস্যায়। এ কারণে অনেকে বিতাড়িত হচ্ছেন পরিবার থেকে।
অথচ উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে তার বাস্তবায়ন ও সুফল সম্পর্কে ইতিবাচক কোনো সংবাদ এই মুহূর্তে নেই। উপকূলীয় নারীদের স্বাস্থ্য বিষয়ে কাজ করে এমন কিছু সংস্থা জানিয়েছে, উপকূলীয় নারীদের স্বাস্থ্য, বিশেষ করে প্রজননস্বাস্থ্য দিন দিন চরম ঝুঁকির মুখে পড়ছে। জলবায়ুসংকটে বাংলাদেশের উপকূলীয় নারীদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক হারাচ্ছেন তাদের জরায়
উপকূলীয় অঞ্চলের নারীরা যেসব অর্থনৈতিক কাজের সঙ্গে জড়িত, সেগুলোর মধ্যে চিংড়ি পোনা ধরা ও  মাছের ঘেরে কাজ করা অন্যতম। পোনা সংগ্রহের কাজে এ এলাকার কয়েক লাখ নারী ও শিশু নিয়োজিত। লবণাক্ত পানিতে নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি অনেক বেশি। দেশের উপকূলের জলবায়ুসংকটের ফলে সৃষ্ট সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে প্রজননস্বাস্থ্য সমস্যার শিকার হন এখানকার নারীরা। উপকূলীয় লাখ লাখ নারীর জীবনের এক চরম বাস্তবতা এটাই। জরায়ুসংক্রান্ত যেকোনো সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে পুকুরে নেমে গোসল না করার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু সেই সুযোগের অপ্রতুলতা রয়েছে উপকূলীয় নারীদের ক্ষেত্রে। যাদের অসুস্থতার মাত্রা বেড়ে যায়, তাদের নিতে হয় উন্নত চিকিৎসা। এর ব্যয় মেটানোর ভয়ে অনেকে চিকিৎসা না নিয়েই দিন কাটান।
বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, উপকূলে এমনও কিছু অঞ্চল রয়েছে, যেখানে ৫০০ থেকে ৭০০ ফুট গভীর নলকূপ থেকেও লবণাক্ত পানি ওঠে। কিছু বাড়ির আঙিনায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য বসানো হয়েছে পানির ট্যাংক। তবে বর্ষাকাল ছাড়া অন্য সময়ের প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে তা যথেষ্ট নয়। এমনও গ্রাম আছে, যেখানে মাত্র দুটি বড় পুকুর পুরো গ্রামের মানুষের খাওয়ার পানির জোগান দেয়। নারী ও শিশুরা প্রতি সপ্তাহে একবার পাত্র নিয়ে সেই পুকুর থেকে পানি সংগ্রহ করে। এলাকাগুলোর নারীদের স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের সুযোগ সীমিত বলে কাপড়ের ন্যাকড়া ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। যেগুলো আবার পরিষ্কার করতে হয় সেই লবণাক্ত পানি দিয়েই। এখান থেকে জরায়ুর স্থানচ্যুতি, জরায়ু ক্যানসার, পাকস্থলীর দুরারোগ্য নানা সমস্যা এবং ত্বকের বিভিন্ন রোগের সূত্রপাত ঘটছে। তাদের মাসিকের সময়, মাতৃত্বকালে এবং প্রসবোত্তর সময়ে নানা সমস্যায় ভুগতে হয়। ফলে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে গর্ভপাত ও শিশুমৃত্যুর হার।
হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক আশরাফি বিনতে আকরাম। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তাঁর ‘নারীর যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যে লবণাক্ততার প্রভাব: বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ওপর একটি গবেষণা’ শিরোনামে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। তাতে উঠে এসেছে লবণাক্ত পানি ব্যবহারের কারণে মেনোরেজিয়া বা অতি ঋতুস্রাব, লিউকেরিয়া বা সাদা স্রাব এবং যোনি ও জরায়ুতে চুলকানির মতো সমস্যায় ভুগছে উপকূলীয় অঞ্চলের নারীরা। এর ফলে ঘটছে বিবাহবিচ্ছেদ ও বহুবিবাহের ঘটনা। এ অঞ্চলে গর্ভপাত অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে গর্ভপাতের জন্য অনেক কারণ উল্লেখযোগ্য। তবে গবেষকেরা দেশের অন্য সব এলাকার বাসিন্দাদের তুলনায় উপকূলীয় মানুষের মধ্যে এর সংখ্যা বৃদ্ধির হার দেখতে পেয়েছেন। তাঁদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন এর অন্যতম কারণ।
লৈঙ্গিক সমতা অর্জনে নারীর যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য অধিকার সুরক্ষায় বিনিয়োগও অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করা হয়। উপকূলীয় নারীদের নিয়ে কাজ  এমন একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘প্রেরণা’। এর নির্বাহী পরিচালক শম্পা গোস্বামী জানিয়েছেন, বাজেটে উপকূলীয় নারীদের জন্য আলাদাভাবে কোনো বরাদ্দ থাকে না। মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে উপকূলীয় নারীদের মাত্র ৩৮ বছর বয়সে মেনোপজ হওয়ার তথ্য পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। জরায়ু কেটে ফেলা, ক্যানসার, ঋতুচক্রের সমস্যার পাশাপাশি এই সমস্যা নারীদের জন্য ভয়ংকর বলে উল্লেখ করেন। জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত কাজের জন্য যে বরাদ্দ আসে, তার বেশির ভাগ ব্যয় হয় অবকাঠামো উন্নয়নে। অর্থাৎ এই বরাদ্দেও নারীদের স্বাস্থ্য গুরুত্ব পায় না।
নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি খুলনা ও সাতক্ষীরায় একটি প্রকল্প চালু করা হয়। উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর, বিশেষত নারীদের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত লবণাক্ততা মোকাবিলায় অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি শীর্ষক এ প্রকল্পটি খুলনা জেলার ৩টি ও সাতক্ষীরা জেলার ২টি উপজেলায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পটির মেয়াদকাল এ বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু প্রকল্পটির অর্জন সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি।
লবণাক্ততার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের অকাল গর্ভপাত, প্রজননতন্ত্রের সমস্যা, ঋতুচক্রজনিত সমস্যাসহ জরায়ু কেটে ফেলার মতো সমস্যা দিন দিন ভয়াবহ পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এটি কেবল উপকূলের নারীর স্বাস্থ্যহানি ঘটাবে না; জাতীয় অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
মৌসুমের শেষে মার্চ মাসের শুরুতে কর্ণফুলীর পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা বেশি ছিল। এই সময়ের মধ্যে যেসব জমিতে ধান রোপণ করা ও সেচ দেওয়া হয়েছে সেসব জমির চারা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তবে এর আগে রোপণ করা জমির চারা অনেকটা ভালো রয়েছে। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, বোয়ালখালীর কধুরখীল ছাড়াও পশ্চিম গোমদণ্ডী, শাকপুরা, সারোয়াতলী ও কড়লডেঙ্গা ইউনিয়নের বেশির ভাগ জমিতে রোপা চারা মাত্রাতিরিক্ত লবণ পানির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ বোরো আবাদ হচ্ছে পুরোটাই সেচনির্ভর। বোয়ালখালী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেছেন, ‘দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় খালের পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে গেছে। এতে সারোয়াতলী ও কধুরখীল এলাকায় ৭-৮ একর জমির ক্ষেত সম্পূর্ণ ও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’ গত দুই বছর ধরে লবণাক্ততার কারণে বোরো আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এই অঞ্চলে। গত বছর ধান কাটার আগমুহূর্তে লবণাক্ততা ও খরায় পুড়েছিল বোরো আবাদ।
এই সমস্যা শুধু বোয়ালখালীর নয়। চট্টগ্রাম জেলাসহ উপকূলীয় অনেক এলাকার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলের মাটিতে অণুজীব সক্রিয় থাকতে পারছে না। যে কারণে মাটিতে জৈব পদার্থ, নাইট্রোজেন ও ফসফরাস কমে যাচ্ছে। বিপরীতে বাড়ছে কপার ও জিংকের মাত্রা। ফলে ফলন ঠিকমতো হচ্ছে না। লবণাক্ততায় মাটির উর্বরতা কমছে বলে গাছের উৎপাদন ক্ষমতাও কমছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ততার মাত্রা দিন দিন বাড়ছে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের জমিগুলোতে। সেখানকার কৃষিজমি হয়ে পড়ছে অনাবাদি। এর প্রভাবে ফলন কমছে। বাড়ছে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকদের হতাশা। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে এবং সেটা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
জানা গেছে, স্বাধীনতার পর উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ত জমি ছিল ৮ লাখ ৩৩ হাজার হেক্টর। এখন সেটা বেড়ে হয়েছে ১০ লাখ ৬০ হাজার হেক্টরে। অর্থাৎ চার যুগে লবণাক্ত জমি বেড়েছে ২৭ শতাংশ। আবাদি জমি ২৮ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে চাষযোগ্য ২১ লাখ ৬২ হাজার হেক্টর। চাষযোগ্য জমির অর্ধেকই লবণাক্ত। প্রতি বছর পাঁচ লাখ হেক্টরের বেশি জমি অনাবাদি থেকে যায়।
বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়েছে। বেড়েছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। তাই উপকূলীয় অঞ্চলের মাটিতে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি মিশে যাচ্ছে। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানিতেও লবণাক্ততা বাড়ছে। জলোচ্ছ্বাসের সময় সমুদ্রের লোনাপানি এসে জমছে কৃষিজমিতে। এ পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা নেই। যে কারণে কৃষিজমির স্বাভাবিক উৎপাদনক্ষমতা কমে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিতো তাহলে অনেকাংশে লবণাক্ততা কমতো।
এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে তা বাংলাদেশের জন্য ভয়ংকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। কারণ আমাদের জনসংখ্যা অনুপাতে জমি কম। তার ওপর যদি এভাবে প্রতিবছর জমি আবাদের যোগ্যতা হারায় তাহলে দেশে খাদ্যাভাব আবার প্রকট হয়ে উঠবে। পরিস্থিতি সামাল দিতে একদিকে লবণাক্ততা কমানোর ব্যবস্থা নিতে হবে অন্যদিকে লবণাক্ততা সহনশীল ফসল উৎপাদনের দিকে ঝুঁকতে হবে। মোট কথা যা করার তা দ্রুতই করতে হবে।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জলবায়ুর অভিঘাতের নিবিড় পরীক্ষাগার। কিন্তু এখানে আরেকটি নীরব সংকট বহু দিন ধরে ঘনীভূত হচ্ছে। সেটি হলো অল্পবয়সি নারীদের জরায়ুজনিত জটিলতা ও অকাল জরায়ু অপারেশনের ভয়াবহ বিস্তার। লবণাক্ত পানি, মাসিক স্বাস্থ্য সচেতনতার ঘাটতি, দারিদ্র্য, অপচিকিৎসা, ক্লিনিক-দালাল সিন্ডিকেট মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন একটি নীরব স্বাস্থ্য বিপর্যয়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত ২৫-৩৫ বছরের মধ্যে জরায়ু অপারেশনের সংখ্যা ভয়াবহভাবে বেড়েছে। গ্রামে গ্রামে এমন পরিবার পাওয়া যায়, যেখানে একাধিক নারী জরায়ু কেটে ফেলেছেন। স্থানীয় অনেক ক্লিনিক রোগী ধরতে জরায়ু কাটলেই সুস্থ বলে ভুল পরামর্শ দিচ্ছে। লবণাক্ত পানি নারীদের সংক্রমণ ও হরমোনজনিত জটিলতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। নারীরা অপারেশনের পর বাকি জীবন ভুগছেন দুর্বলতা, মানসিক চাপ ও দাম্পত্য ক্ষতিতে।
দাকোপের বানিশান্তা ইউনিয়নের ৩২ বছরের মাহফুজা খাতুন। সকাল হলেই সুন্দরবনের খালে নেমে রেণুপোনা ধরেন। তার শরীরে এখন শক্তি নেই, কোমরে ব্যথা, মাথা ঘোরে। তিনি ফিসফিসিয়ে বলেন, ‘জরায়ু কাটা হয়েছে পাঁচ বছর আগে। বয়স ছিল ২৭। লোনাপানি খাইয়া বড় হইছি, সেই পানিই আমার জরায়ু শেষ কইরা দিছে।’ কারণ জানতে চাইলে বলেন, ‘প্রথমে স্রাব ও পেটব্যথা শুরু। ডাক্তারের কাছে গেলে বলে জরায়ু বড় হয়েছে, কাটতেই হবে।’ কিন্তু তিনি জানতেন না জরায়ু অপারেশন নারীর শরীরে স্থায়ী প্রভাব ফেলে। ‘কাটাইয়া দেওয়ার পর আর আগের মতো কাজ করতে পারি না। দুই বালতি পানি পর্যন্ত তুলতে পারি না।’ এমন গল্প আশাশুনি, শ্যামনগর, কয়রা, পাইকগাছা ও দাকোপের প্রায় সব গ্রামেই শোনা গেছে। এমনকি শ্যামনগরের একটি গ্রামের ২১ জন বিবাহিত নারীর মধ্যে অন্তত সাতজনের জরায়ু অপসারণ হয়েছে। ৫৫ বছরের লতিফা বেগম বলেন, ‘মোর মেয়ারে ২৮ বছর বয়সে কাটাই দিচ্ছে। ডাক্তার কইছে, আর সময় নষ্ট করলে বাঁচব না।’ দুজন নারী জানালেন এলাকার বেসরকারি ক্লিনিকের লোকজনই বেশি চাপ দেয়Ñ ‘কাটলে দ্রুত আরাম পাবি বলে।’ এটা একধরনের ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট, যেখানে দালালরা গ্রামের নারীদের খুঁজে খুঁজে ধরে। সামান্য সংক্রমণকেও জটিল বলে ভয় দেখানো হয়। অপ্রয়োজনীয় অপারেশনের মাধ্যমে ক্লিনিক লাখ লাখ টাকা আয় করে। উপকূলীয় এলাকার প্রতিটি গ্রামে দালালের নেটওয়ার্ক সক্রিয়।
কয়রা বেদাকশি গ্রামের ১৮ বছরের রুবিনা (ছদ্মনাম) বলেন, ‘ন্যাপকিন কিনতে পারি না। লোনাপানিতে পুরনো কাপড় ধুই। দুই দিন পর থেকে চুলকানি আর জ্বালা শুরু হয়।’ গ্রামে কথা বলে জানা যায়, ৭০% নারী এখনও পুরনো কাপড় ব্যবহার করেন। অধিকাংশ কাপড় ধোয়া হয় লবণাক্ত পানিতে। আধুনিক মাসিক-স্বাস্থ্য বিষয়ে ধারণা নেই। সংক্রমণ হলে প্রথমে কবিরাজ, পরে ফার্মেসিতে যান। হামিদা খাতুন নামের একজন স্থানীয় স্কুলশিক্ষিকা বলেন, মেয়েরা মাসিক নিয়ে কথা বলতে ভয় পায়। অসুস্থ হলেও লুকায়। এগুলো মিলিয়েই জরায়ু রোগের প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি হয়।
সাতক্ষীরার শ্যামনগরের ছোট্ট গ্রাম ধুমঘাট। দুপুরের রোদে মাটির ঘরের আঙিনায় বসে আছেন ৩৫ বছর বয়সি খাদিজা বেগম। শরীরের নিচের অংশে শাড়ি জড়িয়ে রেখেছেন প্রায় হাঁটু পর্যন্ত। নিচে শুকনো কাপড়, কিন্তু শব্দেই বোঝা যায় ব্যথায় কুঁকড়ে আছেন। তলপেটটা আগুনের মতো জ্বলে, ধীরে ধীরে বলেন তিনি। তিন বছর হলো জরায়ু কেটে ফেলেছে। তখন বয়স মাত্র ৩২। এখনও শরীর টলে যায়।

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।