
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি: সাতক্ষীরায় এ বছর ৭উপজেলায় ১লাখ ৭৭৬হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ চাষ হচ্ছে ।ফলন বাড়াতে সমলয় পদ্ধতিতে যন্ত্রের মাধ্যমে জমিতে বোরো ধান রোপন কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়েছে। রবিবার সকাল ৯টায় সাতক্ষীরা সদরের ঝাউডাঙা ইউনিয়নের মাধবকাটি ব্লকের বলাডাঙা বিলে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন সাতক্ষীরা খামার বাড়ির উপপরিচালক মো. সাইফুল আলম।এর আগে ভালো মানের চারাউৎপাদনের জন্য উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্রে-তে বীজ বপন করছিলেন কৃষকরা।
সাতক্ষীরা খামার বাড়ি সূত্রে জানা গেছে, এবার ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে জেলায় বোরো ধানের চাষ হচ্ছে। এরমধ্যে জেলার সদর উপজেলার ধুলিহর ও ঝাউডাঙা, কলারোয়া পৌর ব্লক ও কেরালকাতা ব্লক, দেবহাটা উপজেলার সদর ব্লক ও তালা উপজেলা সদর ব্লকে ৩০০ একর জমিতে সমলয় পদ্ধতিতে ট্রেতে বীজ বপন ও মেশিনে পাতা রোপনের মাধ্যমে হাইব্রীড তেঁজগোল্ড জাতের বোরো ধানের চাষ হচ্ছে। আউশ, আমন ও বোরো এই তিন মৌসুমে এ চাষ হয়ে থাকে।
মাধবকাটি ব্লকের উপসহকারি কৃষি কর্মকর্তা কিরন্ময় সরকার জানান,জনসংখা বৃদ্ধির সাথে সাথে কমছে কৃষি জমি। তাই স্বল্প জমিতে অধিক ধান উৎপাদন করে মানুষের খাদ্য চাহিদা পুরণের লক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় সাতক্ষীরায় উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে সমলয় পদ্ধতিতে বোরো ধান চাষাবাদ শুরু হয়েছে। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে সমালয় পদ্ধতিতে সদর উপজেলার মাধবকটি ব্লকের বলাডাঙায় ৫০ একর জমিতে হাইব্রীড তেঁজগোল্ড বোরো ধানের আবাদ হচ্ছে। রোপন পদ্ধতি কৃষকরা উদ্বুদ্ধ হয়েছে।
তিনি আরো জানান,সরকারি কৃষি প্রণোদনা কার্যক্রমের আওতায় সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঝাউডাঙা ইউনিয়নের মাধবকাটি ব্লকের বলাডাঙা গ্রামে স্থানীয় ৫৫ জন কৃষক মাটিভর্তি ট্রে-তে বপন করছে তেঁজগোল্ড হাইব্রিড জাতের ধানবীজ। সমলয় চাষাবাদের নতুন মাত্রায় মেশিন দিয়ে ৫০ একর জমিতে রোবো ধানের চারা রোপন করা হয়। এবার জেলার চারটি উপজেলায় ৩০০ একর জমিতে এ জাতের ধান রোপন করা হচ্ছে। ট্রে-তে বীজ বপনের ১৪০ থেকে ১৪৫ দিনের মধ্যে ধান কেটে ঘরে তোলা যায়। বিঘা প্রতি ২০ বস্তা বা ৩০ মণ ধান উৎপাদন হবে। একইভাবে এ চাষে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কিনতে শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার কৃষকদের ৭০ শতাংশ ও অন্যান্য উপজেলাগুলিতে ৫০ শতাংশ সরকারি অনুদান দেওয়া হবে। কৃষির সর্বাধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারে উচ্চ ফলনশীল একই জাত ব্যবহার, ট্রে-তে বীজ বপন, কম বয়সের চারা রোপন, চারা রোপনে রাইচ ট্রন্সপ্লান্টার ব্যবহার, সুষম সার ব্যবহার, আইল ফসল, ধান কর্তনে কম্বাইন হারভেস্টার ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়ানো, উৎপাদন খরচ সাশ্রয় করা, কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ভরা মৌসুমে কৃষি শ্রমিকের সংকটের সমাধান সম্ভব হবে এই সমলয় চাষাবাদে। যান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাইচ ট্রন্সপ্লান্টারের মাধ্যমে ৪৫ থেকে ৬০ মিনিটে এক বিঘা জমিতে চারা রোপন করা যাবে। এ বিষয়ে কৃষকদের কারিগরি সুবিধা ও সার্বক্ষনিক পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন তারা।
বলাডাঙা গ্রামের ওমর ফারুক ওরফে লাল্টু জানান, গত বছর তালা উপজেলার কুমিরা ইউনিয়নের মাহমুদকাটিতে তেঁজগোল্ড হাইব্রীড জাতের ধান চাষ করা হয়। কৃষি বিভাগের মাধ্যমে এ খবর পেয়ে ওই এলাকার কৃষকদের সাথে তিনি কথা বলেছেন। তেঁজগোল্ড হাইব্রীড বোরো ধান ট্রেতে বীজতলা তৈরি করা হয়। এ ছাড়া মেশিনের মাধ্যমে রোপন করা হয় ধান গাছ। শ্রমিক, মজুরি ও সময় কম লাগায় এ চাষে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি দেড় বিঘা জমিতে এ বার এ জাতের ধান লাগিয়েছেন।
বলাডাঙা গ্রামের হাফিজা খাতুন জানান, এক বিঘা জমি মেশিন দিয়ে রোপন করতে এক লিটার প্রেট্রোল লাগে। সময় লাগে ৪০ থেকে ৪৫ মিনিট। খরচ কম। তাই তিনি এবার ১২ কাঠা জমিতে এ জাতের ধান চাষ করেছেন। একইভাবে কৃষি বিভাগের সহায়তায় ও পরামর্শে দেড় বিঘা জমিতে তেঁজগোল্ড জাতের বোরো ধানের চাষ করার কথা উলেখ করে তিনি বলেন, প্রথম চাষ করছেন। ট্রেতে ধান ফেলে মেশিনে রোপন করা হয়। বিঘা প্রতি ২০ বস্তা ধান হবে। এক বিঘা জমি রোপন করতে ৪/৫ জন শ্রমিক লাগে। ধানের বীজতলা তৈরি থেকে কাটা পর্যন্ত ১৪০ থেকে ১৪৫ দিন সময় লাগে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনা কর্মসুচির আওতায় এবার ৫০ একর হাইব্রীড জাতের বোরো ধান রোপন করা হচ্ছে। ৪ হাজার ৫০০ ট্রে-তে হাইব্রীড ধানের বীজতলা লাগানো হযেছে। সার ও কীটনাশকসহ কর্তণ সরকারি উদ্যোগে করা হবে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, মৌসুমী প্রণোদনার রাইস ট্রান্সপ্লান্টের আওতায় ১৫০ বিঘা জমিতে সমালয় পদ্ধতিতে হাইব্রীড বোরো ধানের চাষ হচ্ছে। খরচ কম হওয়ায় কৃষকরা লাভবান হবে।
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, এবার সাতক্ষীরা জেলায় ১ লাখ ৭ হাজার ৭৭৭ হেক্টর জমিতে বোরা ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। চারটি উপজেলার ৬টি স্থানে ৬০০ একর জমিতে সমলয় পদ্ধতিতে হাইব্রীড ধান চাষ করা হচ্ছে। চাষীদের অর্থের অপচয় কম ও সময় সাশ্রয়। রাইস প্লান্টার এর মাধ্যমে বপন, রোপন, কর্তন ও কর্ষণ সবগুলো হচ্ছে যান্ত্রিকভাবে। যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ১০০ ভাগ কর্ষণ ও ১২ ভাগ কর্তন হলেও রোপন ২ শতাংশ হচ্ছে। কম্বাইন হারভেস্টারের জন্য যন্ত্রপাতি কিনতে সরকার অনুদান দিচ্ছে।
উত্তরের হিমেল বাতাস আর ঘন কুয়াশা ও বরফের মত ঠাণ্ডার পানি উপেক্ষা করে ধানের জেলা সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলায় পুরোদমে ইরি-বোরো চাষে ঝুঁকে পড়েছেন কৃষককেরা। ভোর হতেই শীতল বরফের মত ঠাণ্ডা পানিতে নেমে বোরো ধানের বীজ তোলা আর সেই বীজ তোলে জমিতে সারি সারি ভাবে রোপণ করছেন কৃষককেরা। পাশাপাশি চলছে বোরো চাষের জন্যে প্রস্তুত করা হচ্ছে জমি। ভোর রাত থেকে শুরু করে দুপুর পর্যন্ত বোরো জমি প্রস্তুত করতে হাল চাষ করছেন কৃষক।
আগাম জাতের ইরি বোরো ধানের বীজ রোপণের হিড়িক পড়েছে। তাই ইরি-বোরো রোপণ নিয়ে যেন চলছে গ্রামে গ্রামে উৎসবের আমেজ। ব্যস্ত সময় কাটছে কৃষক-কৃষাণিদের। এবার অন্য বছরের তুলনায় সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলায় তিনগুণ বেশি জমিতে ইরি বোরো ধান চাষ হবে। কারণ হিসাবে উল্লেখ করেছেন, এ বছর আমন ধানের দাম কম পাওয়ায় ইরি বোরো ধানের আবাদ বেশি হবে।
কলারোয়া উপজেলাতে ইরি বোরো ধানের মধ্যে হাইব্রিড ও উফসী জাতের ধান বেশি আবাদ হয়। এছাড়াও ব্রিধান-৮৮,ব্রিধান -৬৩, ব্রিধান -১০০(বঙ্গবন্ধু), শুভলতা,তেজগোল্ড,এস,এল,৮ এইচ,ব্রি: ২৮ সহ স্থানীয় জাতের কিছু ধান চাষ হচ্ছে।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে ঘনকুয়াশা ঢাকা ভোর। বাড়ি সংলগ্ন জমিতে ধানের চারা তুলছেন অনেক কৃষক। পুরুষেরা বস্তার মধ্যে কেউবা ভার-বাকুয়ায় করে ধানের চারা নিয়ে মাঠে যাচ্ছেন। কেউ চাষ দেয়া জমির ঘাস পরিষ্কার করছেন। পরিষ্কার শেষে সারিতে লাগানো হচ্ছে ধানের চারা। হালকা হিমেল বাতাসে দুলছে সদ্য লাগানো ধানের চারা। দোল খাওয়া ধানের চারায় কৃষক দেখছেন আগামীর রঙিন স্বপ্ন। চারা বড় হবে, ফসলে ভরে উঠবে তার ধানের গোলা।
কৃষকরা বলছেন, আগাম চারারোপণ করায় ক্ষেতে ফসল ভালো উৎপাদন হয়। আর সারি সারি করে রোপণ করার ফলে পরিচর্যায় স্বস্থি মিলে। এছাড়াও ক্ষেতে রোগ বালাই কম হওয়ায় অন্যান্য ফসল থেকে শতকরা ২০ ভাগ উৎপাদন বেশি হয়।
চন্দনপুর গ্রামের কৃষক কুদ্দুস সরদার জানান, এই ফসল দিয়ে পরিবারের খাবারের যোগান দিতে হয়। তাই বোরো মৌসুম এলে সময় মতো রান্না, খাবারের কথা ভুলে যেতে হয়। শুকনো খাবার চিড়া-মুড়ি খেয়ে ভোরে কাজে নামতে হয়। পরিবারের নারীরা শ্রমিকদের সাহায্য করতে মাঠে যান।
এই উপজেলার চন্দনপুর ইউনিয়নের কাঁদপুর গ্রামের বাবু মোড়ল জানান, বীজ, সার সবকিছুর দাম বেশি। শ্রমিকের মজুরিও বেশি। সার ও বীজের দাম সহনীয় হলে ধান চাষ করে আরো লাভ পাওয়া যেত। তবে এখন শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে কারণ আর কয়েকদিন পর সকলেই এক সাথে ইরি বোরো ধানের বীজতলা রোপণ করতে শুরু করলে শ্রমিক সঙ্কটে পড়তে হবে।
সোনাবাড়িয়া গ্রামের কৃষক আমজাদ আলী জানান, ঘন কুয়াশা ও কনকনে ঠাণ্ডার মধ্যে সময় মতো চারা রোপণ করতে না পারলে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যাবে না। তাই চারা রোপণ শুরু করেছি।
কৃষিবিভাগ বলছে, চলতি মৌসুমে শীতে বীজ তলার তেমন ক্ষতি না হওয়ায় কৃষকেরা বেশ স্বস্থিতে রয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে চলতি ইরি বোরো মৌসুমে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কলারোয়া উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষিবিদ কৃষি কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেন, এখন বোরো লাগানোতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে কৃষক-কৃষাণিরা। কোনো সমস্যা না হলে প্রতি হেক্টরে হাইব্রিড ৫.৮১ মে. টন এবং উচ্চ ফলনশীল ৫,২৪ মে. টন ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
কলারোয়া উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষিবিদ কৃষি কর্মকর্তা বলেন,
কলারোয়া উপজেলাতে এবছর ১৭হাজার ৭শ ৫০ হেক্টর জমিতে ইরি বোরো ধানের আবাদের লক্ষ্য মাত্রা নির্ধারিত করা হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে এ বছর লক্ষ মাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে ইরি-বোরো ধানের আবাদ বেশি হবে।সাতক্ষীরায় ক্রমশঃ বাড়ছে মিঠাপানির মাছের ঘেরে বোরো ধানের চাষ। শীত মৌসুমের শুরুতে জেলার অভ্যন্তরের মিঠা পানির মাছের ঘেরে বোরো ধানের চাষ করছেন কৃষকরা। মাছের ঘেরে বোরো ধানের চাষ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন গ্রামীণ কৃষকরা। মাছের ঘেরে বোরো ধানের চাষ করে অধিক ফলন পাচ্ছেন তারা। ফলে খাদ্য ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি আর্থিক স্বচ্ছলতায় ফিরছে কৃষক পরিবারে।
দৈনন্দিন আমিষের চাহিদা পূরণের পর মিঠা পানির মাছের ঘেরে বোরো চাষে গ্রামীণ দরিদ্র কৃষক জনগোষ্ঠীর ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। একই সাথে খাদ্য ঘাটতি মোকাবেলায় দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক ভূমিকার আসছেন তারা। নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে ঘেরের মাছ ধরার পর পানি শুকিয়ে সেখানে পুনরায় মাছ চাষের পরিবর্তে কৃষকরা চাষ করছেন বোরা ধান। গত কয়েক বছর ধরে এই ধরনের চাষ পদ্ধতিতে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন। ফলে ক্রমশঃ বাড়ছে এই চাষ পদ্ধতি।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, মাছের ঘেরে ধানের ফলন হয় অন্য জমির চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। এখানে বোরো ধান লাগাতে বাড়তি কোন চাষের প্রয়োজন হয় না। খরচও অনেক কম। যে কারণে বোরো মৌসুমে মাছের চেয়ে ধান চাষের লাভের সম্ভাবনা থাকে অনেক বেশি। ফলে বর্ষা মৌসুমের পর মিঠা পানি শুকিয়ে গেলে মাছের ঘেরে ধান চাষ করছেন কৃষকরা। আবার অনেক কৃষক বর্ষা মৌসুমে চাষ করা মাছ ধরে নিয়ে নিজেরা ঘেরের পানি সরিয়ে জমি শুকিয়ে বোরো ধান চাষ করছেন। কয়েক বছর যাবত মাছের ঘেরে বোরো ধান চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন সাতক্ষীরার গ্রামীণ কৃষকরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভোমরা এলাকার দাঁতভাঙ্গা ও শালতিয়া বিল, দক্ষিণ হাড়দ্দহার বিল চৌবাড়িয়া ও গয়েশপুর বিল পদ্মশাখরা বিল ঝাউডাঙ্গা এলাকার উত্তর বিল, দেবনগরের কচুর বিল এবং তালা উপজেলার জেঠুয়া মাঠ ও নগরঘাটা বিলের বিভিন্ন মাছের ঘেরে বোরো চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। শীত ও কুয়াশা উপেক্ষা করে চাষের জমির পাশাপাশি মাছের ঘেরে বোরো ধানের চারা রোপন করছেন কৃষকরা। তারা বলছিলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় চারা উৎপাদনও ভালো হয়েছে এবার। সব কিছু ঠিক থাকলে ভালো ফলনের আশা করছেন কৃষকরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র বলছেন, জেলার সাত উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায় নিচু জমিতে গড়ে উঠেছে মিঠা পানিতে সাদা মাছের ঘের। বর্ষাকালীন সময়ে এসব ঘেরে চাষ হয় সাদা মাছের। নভেম্বর-ডিসেম্বরে ঘেরের মাছ উঠিয়ে সেখানে বোরো ধানের আবাদ করা হচ্ছে।
সূত্র আরও জানায়, জেলায় এবার ১ লাখ ৭ হাজার ৭৭হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে তালা উপজেলা সদরের ৪০০ একর জমিতে সমলয় পদ্ধতিতে ট্রেতে বীজ বপন ও মেশিনে পাতার রোপণের মাধ্যমে হাইব্রিড, তেজ গোল্ড জাতের বোরো ধানের চাষাবাদ হচ্ছে। ফলে ধানের উৎপাদন শতভাগ অর্জিত হবে বলে আশা করছেন কৃষকসহ কৃষি কর্মকর্তারা।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা সহকারি কৃষি কর্মকর্তা মনির হোসেন জানান, অল্প জমিতে বেশি ধান উৎপাদন করে মানুষের খাদ্য চাহিদা পূরণে কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় সাতক্ষীরায় উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে সমলয় পদ্ধতিতে বোরোর চাষাবাদ শুরু হয়েছে। ফলন বাড়াতে সমলয় পদ্ধতিতে যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। সাতক্ষীরার মাধবকাটি বলাডাঙ্গা বিলে সম্প্রতি এ আবাদ কার্যক্রম শুরু করা হয়। নতুন এই পদ্ধতিতে চাষাবাদের কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
সাতক্ষীরার বিনেরপোতা এলাকার ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা তাহমিনা খাতুন জানান, ধান গাছের অবশিষ্ট অংশ ও সবজির উচ্ছিষ্ট পচনের ফলে জৈব পদার্থ এবং নাইট্রোজেন ও ফসফরাস জাতীয় জৈব উৎপন্ন হয়, যা ঘেরে প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদনে ভূমিকা রাখে। মাছের খাবারের উচ্ছিষ্ট ও মলমূত্র তলদেশে জমা হয়। তলদেশের জৈব উপাদান সমৃদ্ধ মাটি ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব ধান ও সবজি চাষ করে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। কৃষি নির্ভর উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার অর্থনৈতিক উন্নয়নে মৎস্য খাতের পাশাপাশি বোরো চাষ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় হয়ে উঠেছে।
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (খামারবাড়ি) উপ-পরিচালক মোঃ সাইফুল ইসলাম জানান, জেলায় আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ১,৬৯,৩৩৯ হেক্টর। অনাবাদি জমি রয়েছে ৫৮৬৭১ হেক্টর। এই জমিতে কোন ফসল হচ্ছে না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্তৃক গৃহীত সাতক্ষীরা জেলায় জমির সদ্ব্যবহারের নিমিত্তে করণীয় বিষয়ক প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন হলে আরো ১৯, ৯৪২ হেক্টর জমি আবাদের আওতায় আসবে।
তিনি আরও বলেন, চলতি মৌসুমে জেলায় লক্ষ্যমাত্রা চেয়ে বেশি জমিতে বোরো আবাদ হতে চলেছে। এছাড়া প্রতিটি উপজেলায় জলবায়ুর ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি করে কৃষি, খাদ্য ও অবকাঠামোসহ সব বিষয় নিয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে মৎস্য ঘেরে বোরোর আবাদ উৎপাদনে কৃষি খামারবাড়ি কাজ করে যাচ্ছে।সাতক্ষীরায় চলতি বোরো মৌসুমে বিস্তীর্ণ চিংড়ি ঘেরে ১ লাখ ৭৭৬ হেক্টর জমিতে বোরো লবণসহিষ্ণু ধান আবাদ হয়েছে। জেলার উপকূলীয় অঞ্চলে বেশির ভাগ জমি লবণাক্ত। এই জমিতে নদীর লোনা পানি তুলে বিগত প্রায় চার দশক ধরে চিংড়ি চাষ করছে স্থানীয় কৃষক। বিগত বছরগুলোতে শুষ্ক মৌসুমে চিংড়ির উৎপাদন ভালো না হওয়ায় লবণসহিষ্ণু বোরো ধান চাষে ঝুঁকেছে কৃষক।
চলতি মৌসুমে জেলার সাতটি উপজেলায় ১ লাখ হাজার ৭৭৬ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে, যা থেকে ৪ লাখ ৩৬ হাজার ৭৭১ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। গত মৌসুমে চাষ হয়েছিল ৭৯ হাজার ৫২৬ হেক্টর জমিতে। এক বছরে ২৫০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ বেশি হয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন কৃষক জানান, এখানকার লবণাক্ত জমিতে বোরো ধান উৎপাদন করে লাভবান হচ্ছেন তারা। লোনা পানির মাছের ঘেরে চিংড়ি ছাড়া অন্য কোনো ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হয় না। সেখানে বর্তমানে লবণসহিষ্ণু ধান চাষ করছেন তারা। চিংড়ির পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে ধান উৎপাদন করে বাড়তি আয় হচ্ছে।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (খামারবাড়ি) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ মৌসুমে জেলার সাতটি উপজেলায় ১ লাখ হাজার ৭৭৬ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। এ থেকে ৫ লাখ ৩৬ হাজার ৭৭১ টন চাল উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরা সদরে ২৮ হাজার ২৫০ হেক্টর, কলারোয়ায় ১৭ হাজার ৬৫৫, তালায় ১৭ হাজার ১৫৫, দেবহাটায় ১০ হাজার ১২৫, কালিগঞ্জে ১৬ হাজার ৯৪৬, আশাশুনিতে১৪হাজার এবং শ্যামনগরে ৭ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। গত মৌসুমে জেলায় ৭৯ হাজার ৫২৬ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছিল। সে হিসাব অনুযায়ী চলতি মৌসুমে ২৫০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ বেড়েছে। এছাড়া গেল মৌসুমে বোরো চাল উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ১২ হাজার ৮২৫ টন।
আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের চিংড়ি চাষি আজমত আলী জানান, চলতি মৌসুমে তিনি ২৫ বিঘা জমিতে মাছের ঘেরে লবণসহিষ্ণু ২৬ জাতের বোরো ধান চাষ করেছেন। ফলন ভালো হয়েছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয় না ঘটলে ভালো ফলন পাওয়া যাবে।? বিঘাপ্রতি তার ৭ হাজার টাকা হারে ২৫ বিঘায় এক লাখ ৭৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে তার। ২৫ বিঘায় ৬২৫-৬৩০ মণ ধান উৎপাদন হবে। যার বাজার মূল্য কমপক্ষে ৭ লাখ টাকা। খরচ বাদে পাঁচ লাখ টাকার বেশি লাভ হবে তার।
দেবহাটা উপজেলার কুলিয়া ইউনিয়নের রাঙাশিসা গ্রামের মাছচাষি? আমিনুর রহমান জানান, তিনি ১২ বিঘা জমির চিংড়ি ঘেরে ব্রি-৬৭ জাতের বোরো ধান চাষ করেছেন তিনি। অন্যান্য জাতের ধানের চেয়ে বি-৬৭ লবণ সহ্য করতে পারে বেশি। রোগবালাই কম। বিঘায় সর্বনিম্ন ১৫ বস্তা করে ধান উৎপাদন হবে।
কৃষকরা বলছেন, চলতি মৌসুমে চিংড়ি ঘেরে বোরো ধান উৎপাদন করে আড়াই লাখ টাকার বেশি লাভ হবে তার। এটি বাড়তি লাভ। কারণ শুষ্ক মৌসুমে ঘেরে চিংড়ি উৎপাদন ভালো হয় না। চার মাসের ফসল হিসেবে ধান উৎপাদন বাড়তি লাভ। তাছাড়া লবণাক্ত জমিতে চিংড়ি ছাড়া আর কিছু চাষ করা সম্ভব ছিল না। কয়েক বছর ধরে লবণ পানির চিংড়ি ঘেরে বোরো ধান চাষ করছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (খামারবাড়ি) উপপরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় লবণসহিষ্ণু বিভিন্ন জাতের ধান উৎপাদন হচ্ছে। যেসব লোনা পানির মাছের ঘেরে চিংড়ি ছাড়া অন্য কিছু হতো না, সেখানে এখন ধান চাষ হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, চলতি মৌসুমে জেলায় বিনা-১০, ব্রি-৬৭, ৯৭, ৯৯ এবং বিএডিসির উদ্ভাবিত এসএল-৮ এইচ জাতের লবণসহিষ্ণু ধান চাষ হয়েছে। এসব জাত ১০-১৩ ডিএস পর্যন্ত লবণ সহ্য করতে পারে। জেলায় মোট বোরো ধানের ২০ শতাংশই লবণাক্ত জমিতে চাষ হয়েছে।
সাতক্ষীরায় ফলন বাড়াতে সমলয় পদ্ধতিতে যন্ত্রের মাধ্যমে জমিতে বোরো ধান রোপন কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়েছে। রোববার (৩ জানুয়ারি) সকাল ৯টায় সাতক্ষীরা সদরের ঝাউডাঙা ইউনিয়নের মাধবকাটি ব্লকের বলাডাঙা বিলে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন সাতক্ষীরা খামার বাড়ির উপপরিচালক মোঃ নুরুল ইসলাম।। এর আগে ভালো মানের চারা উৎপাদনের জন্য উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্রে-তে বীজ বপন করছিলেন কৃষকরা।
সাতক্ষীরা খামার বাড়ি সূত্রে জানা গেছে, এবার ১ রাত ৭৭৬ হেক্টর জমিতে জেলায় বোরো ধানের চাষ হচ্ছে। এরমধ্যে জেলার সদর উপজেলার ধুলিহর ও ঝাউডাঙা, কলারোয়া পৌর ব্লক ও কেরালকাতা ব্লক, দেবহাটা উপজেলার সদর ব্লক ও তালা উপজেলা সদর ব্লকে ৪০০ একর জমিতে সমলয় পদ্ধতিতে ট্রেতে বীজ বপন ও মেশিনে পাতা রোপনের মাধ্যমে হাইব্রীড তেঁজগোল্ড জাতের বোরো ধানের চাষ হচ্ছে। আউশ, আমন ও বোরো এই তিন মৌসুমে এ চাষ হয়ে থাকে।
মাধবকাটি ব্লকের উপসহকারি কৃষি কর্মকর্তা কিরন্ময় সরকার জানান,জনসংখা বৃদ্ধির সাথে সাথে কমছে কৃষি জমি। তাই স্বল্প জমিতে অধিক ধান উৎপাদন করে মানুষের খাদ্য চাহিদা পুরণের লক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় সাতক্ষীরায় উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে সমলয় পদ্ধতিতে বোরো ধান চাষাবাদ শুরু হয়েছে।
২০২৫-২০২৬অর্থবছরে সমালয় পদ্ধতিতে সদর উপজেলার মাধবকটি ব্লকের বলাডাঙায় ৫০ একর জমিতে হাইব্রীড তেঁজগোল্ড বোরো ধানের আবাদ হচ্ছে। রোপন পদ্ধতি দেখে কৃষকরা উদ্বুদ্ধ হয়েছে।
সাতক্ষীরা মাছের ঘেরে বোরো ধান চাষে সাফল্য পাচ্ছে চাষিরা। প্রতি বছর মাছের ঘেরে বোরো ধানের আবাদ বাড়ছে। মৌসুমের শুরুতেই শীত ও কুয়াশাকে উপেক্ষা করে চাষের জমির পাশপাশি মাছের ঘেরে বোরো ধানের চারা রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। প্রাকৃতিক পরিবেশ অনুকূলে থাকায় চারা উৎপাদনও ভাল হয়েছে এবার। শেষ পর্যন্ত সব কিছু ঠিক থাকলে ধান উৎপাদনেও ভাল ফল পাবেন বলে আশা করছেন কৃষকরা।
সাতক্ষীরা জেলা শহরের আশপাশ এলাকার পাশাপাশি সাতটি উপজেলার প্রত্যান্ত এলাকায় নিচু জমিতে গড়ে উঠেছে সাদা মাছের ঘের। বর্ষায় সেই ঘেরে সাদা মাছের চাষ হয়। নভেম্বর-ডিসেম্বরে ঘেরে মাছ উঠিয়ে সেখানে করা হচ্ছে বোরো ধানের আবাদ।
মাছের ঘেরে ধানের ফলন হয় অন্য জমির চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। কৃষকরা বলছেন, মাছের ঘেরে বোরো ধান লাগাতে বাড়তি কোন চাষের প্রয়োজন হয় না। ফলে খরচ অনেকটাই কম। অন্যদিকে মাছের তুলনায় ধানের দাম বেশি। চলতি মৌসুমে তারা মাছ চাষ কমিয়ে বোরো ধান চাষে বেশি ঝুঁকে পড়ছে মাছ চাষিরা। গত কয়েক বছর ধরে বোরো মৌসুমে মাছের ঘেরে ধান চাষে অভাবনীয় সাফল্য এসেছে সাতক্ষীরায়। ফলে মাছের ঘেরে বোরো ধান ও সবজির সমন্বিত চাষের মাধ্যমে প্রান্তিক চাষিরা পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে।
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (খামার বাড়ি) সূত্র জানায়, জেলায় এবার ১ লাখ ৭৭৬ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ করা হচ্ছে। এর মধ্যে তালা উপজেলা সদরের ৪০০ একর জমিতে সমলয় পদ্ধতিতে ট্রেতে বীজ বপন ও মেশিনে পাতা রোপণের মাধ্যমে হাইব্রিড তেজগোল্ড জাতের বোরো ধানের চাষাবাদ হচ্ছে। ফলে ধানের উৎপাদন এবার শতভাগ অর্জিত হবে বলে আশা করছেন কৃষকসহ কৃষি কর্মকর্তারা।
জেলার কৃষি কর্মকর্তারা জানান, স্বল্প জমিতে অধিক ধান উৎপাদন করে মানুষের খাদ্য চাহিদা পুরণের লক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় সাতক্ষীরায় উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে সমলয় পদ্ধতিতে বোরোর চাষাবাদ শুরু হয়েছে। একইসাথে ফলন বাড়াতে সমলয় পদ্ধতিতে যন্ত্রের মাধ্যমে বোরো ধানের আবাদ শুরু হয়েছে জেলাতে। সদর উপজেলার ঝাউডাঙা ইউনিয়নের মাধবকাটি বলাডাঙা বিলে সম্প্রতি এ আবাদ কার্যক্রম শুরু করা হয়। নতুন এই পদ্ধতিতে চাষাবাদে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে বলে জানালেন জেলা কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক।
সাতক্ষীরার বিনেরপোতা এলাকার ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্ত্ অলিউর রহমান জানান, ধান গাছের অবশিষ্টাংশ এবং সবজির উচ্ছিষ্টাংশ পচনের ফলে জৈব পদার্থ এবং নাইট্রোজেন ও ফসফরাস জাতীয় যৌগ উৎপন্ন হয় যা ঘেরে প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদনে ভূমিকা রাখে। মাছের খাবারের উচ্ছিষ্ঠাংশ ও মলমূত্র তলদেশে জমা হয়। তলদেশের জৈব উপাদান সমৃদ্ধ মাটি ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব ধান ও সবজি চাষ করে উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব। কৃষিনির্ভর উপকূলী জেলা সাতক্ষীরার অর্থনৈতিক উন্নয়নে মৎস্য উপখাতের পাশা পাশি বোরোর আবাদ অত্যন্তগুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভবনাময় হয়ে উঠেছে।
তিনি আরও বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে বোরো ধান চাষ করা ঝুঁকিপূর্ণ। এর পরিপ্রেক্ষিতে লবণাক্ততা পরিস্থিতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে বিবেচনা করে উপকূলীয় অঞ্চলে বোরো ধান চাষ সম্প্রসারণের জন্য কিছু বিশেষ কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে, যেমন-(১) লবণাক্ততা সহনশীল জাতের চাষ, (২) বীজ বোনার সময় পরিবর্তন, (৩) স্বাদু বা স্বল্প লবণাক্ত পানি দ্বারা সেচের ব্যবস্থা করা। উপকূলীয় জমিতে এই তিনটি কৌশল অবলম্বন করে বোরো ধানের চাষ ও উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
অধ্যক্ষ আশেক ই এলাহী বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে বোরো ধান চাষে একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো এ মৌসুমে সেচের উৎস নদ-নদী ও খালের পানি লবণাক্ত হয়ে পড়া। এমনকি মাটি ও নলকূপের পানিও লবণাক্ত হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত শুষ্কতা, তাপমাত্রা, কড়া রোদ ও বৃষ্টিবিহীন অবস্থার কারণে মাটিতে থাকা পানি অধিক হারে বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়ায় লবণাক্ততা বেড়ে যায়, অনেক সময় এতে মাটির উপরেও লবণের দানা বা স্তর দেখা যায়। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সাগরের লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশের ফলে দিন দিন লবণাক্ত জমির পরিমাণ বাড়ছে। এ অবস্থায় জমিতে পানি ধরে রেখে বা সেচের মাধ্যমে বোরো ধানের চাষ করলে লবণাক্ততা কমে। সেক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে খাল সংস্কার করে সেসব খালে বৃষ্টির পানি মজুদ করে তা দিয়ে বোরো ধানে সেচের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে লবণাক্ততা সহনশীল জাতের চাষ করলে এসব এলাকার খাল বা নদীর পানিতে অথবা নলকূপের পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা সহনীয় থাকে সেসব এলাকায় লবণাক্ততা সহনশীল জাতের চাষ করে সেচ দিয়ে বোরো ধানের চাষ করা যায়।
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (খামার বাড়ি) এর উপপরিচালক সাইফুল ইসলাম জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় লক্ষ্যমাত্রা চেয়ে বেশি জমিতে বোরোর আবাদ হতে চলেছে। এছাড়া প্রতিটি উপজেলায় জলবায়ুর ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি করে কৃষি, খাদ্য ও অবকাঠামোসহ সবগুলো বিষয় নিয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে মৎস্য ঘেরে বোরোর আবাদে উৎপাদনে কৃষি খামার বাড়ি কাজ করে যাচ্ছে।
উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় লবণাক্ততার কারণে অনেক জমিতে ভালো ফসল হতো না। তবে এসব জমিতে এখন উচ্চফলনশীল জাতের বোরো ধান আবাদ হচ্ছে। আবাদের বিস্তারও বাড়ছে প্রতি বছর। চলতি মৌসুমে জেলায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে লবণসহিষ্ণু বিভিন্ন জাতের বোরো ধান আবাদ হয়েছে, যা গত মৌসুমের তুলনায় চার হাজার হেক্টর বেশি।
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬মৌসুমে জেলার সাত উপজেলায় ১ লাখ লাখ ৭৭৬হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ২০ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে লবণসহিষ্ণু জাতের ধান। গত মৌসুমে এর পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার হেক্টর।
আশাশুনি উপজেলার মাদারবাড়িয়া গ্রামের বোরো চাষী খোকন গাইন জানান, তার এলাকার অধিকাংশ জমিতে উচ্চমাত্রার লবণ থাকায় সব জাতের ধান চাষ করা যায় না। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে কয়েক বছর ধরে লবণসহিষ্ণু জাতের বোরো ধান চাষ করছেন তিনি। চলতি মৌসুমে ১৫ বিঘা জমিতে লবণসহিষ্ণু ব্রি-৬৭ জাতের ধান চাষ করেছেন তিনি।