
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : কেউই নিজের মেয়ের খারাপ চায় না। আমাদের এলাকায় থাকতি কষ্ট, পানিতে কষ্ট। খাওনের পানি কিনি খাওয়া যায়, ব্যবহারের পানি তো কেনা সম্ভব না। শারীরিক নানা সমস্যাও হয়। তাই মেয়েগুলোর তাড়াতাড়ি বিয়ে দিই। পরে যেন সমস্যায় পড়তি না হয়।’ কথাগুলো বলছিলেন সাতক্ষীরা জেলার সুন্দরবন উপকূলবর্তী বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের নীলডুমুরিয়া গ্রামের আঞ্জুমান আরা নামের এক অভিভাবক। শুধু আঞ্জুমান আরাই নন, এ অঞ্চলের বেশির ভাগ অভিভাবকের মুখে একই সুর। তারা মনে করেন, এখানকার পানিতে লবণ অনেক বেশি। লবণপানি ব্যবহার করার জন্য গায়ের রং কালো হয়ে যায়। অল্প বয়সেই চেহারায় বয়সের ছাপ পড়ে।
সাতক্ষীরার আলীপুর আজিজিয়া দাখিল মাদ্রাসায় চলতি বছর দশম শ্রেণিতে একজন মেয়েও নেই। অথচ এ ব্যাচটি যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে ছিল, তখন শ্রেণিকক্ষে ২৪ জন মেয়ে ছিল। একই এলাকার আরেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মাহমুদপুর গার্লস কলেজিয়েট স্কুলের দশম শ্রেণিতে বর্তমানে ১০ জন ছাত্রী রয়েছে। অথচ এ ব্যাচটি যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে ছিল, তখন ছাত্রীসংখ্যা ছিল ৪২ জন। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে এ অঞ্চলে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই কন্যাশিশুরা লেখাপড়া থেকে ছিটকে পড়ে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো হয়ে পড়ে মেয়ে শিক্ষার্থীশূন্য।
স্থানীয় বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ কমিটির সদস্য শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘স্কুলগুলোয় ছাত্রী ঝরে পড়ার এ হার দেখেই বোঝা যায়, এখানে বাল্যবিয়ে কতটা প্রকট। লবণাক্ততার কারণে বেশির ভাগ অভিভাবক বয়স হওয়ার আগেই মেয়েকে বিয়ে দেন। এ ছাড়া শারীরিক জটিলতাও তৈরি হয়। যেমন দীর্ঘ সময় ধরে মাসিক চলার কারণে অপুষ্টিহীনতায় ভোগে অনেকেই। গাইনি সমস্যাও দেখা দেয়।’
বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ কমিটির তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরা জেলায় মেয়েদের বাল্যবিয়ের হার ৭০ শতাংশের বেশি। জেলার ১২টি উপজেলায় নারী ও শিশুদের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করে বেসরকারি সংস্থা ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স। সংস্থাটির পরিকল্পনা কর্মসূচি পরিচালক জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘২০১৯-২০ সালে আমরা এ এলাকায় একটি সার্ভে করি। এতে দেখা যায়, বর্ষা থেকে শীতের আগ পর্যন্ত পাঁচ-ছয় মাস এলাকার মানুষের কর্মের সুযোগ কমে যায়। লবণাক্ততাসহ নানা অজুহাত দেখিয়ে অভিভাবকরা তখন তাদের সন্তানদের কম বয়সে বিয়ে দেন।’
বাল্যবিয়েপ্রবণ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নকল ভলিউম বইয়ের মাধ্যমে বিয়ে দেওয়া হয়। প্রাপ্তবয়স্ক না হলে সেই খাতায় ছেলে ও মেয়ের তথ্য লিপিবদ্ধ করা হয়। উচ্চহারে নিবন্ধন ফিও নেওয়া হয়। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে ছেলেমেয়ের বিয়ে দিলেও সেটি আইনসম্মতভাবে রেজিস্ট্রি হয় না।
মাত্র ১২ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল সায়মার (ছদ্মনাম)। বর্তমানে তাঁর বয়স ১৯ বছর। তিনি জানান, বিয়ের পরপরই যৌতুকের জন্য স্বামী চাপ দিতে থাকেন। দু’দফায় তাঁকে ৬০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আরও টাকা চান। যৌতুক দিতে না পারায় চলে শারীরিক নির্যাতন। তাই তাঁকে তালাক দেন তিনি। প্রমাণ না থাকায় দেনমোহর ও ভরণপোষণের কিছুই পাননি সায়েমা।
আগরদাঁড়ী ইউনিয়নের আবাদেরহাট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী স্বপ্না (ছদ্মনাম), পৌরসভার বাটকেখালী গ্রামের ১৩ বছর বয়সী জুই (ছদ্মনাম), বৈচনা গ্রামের পল্লীশ্রী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী লামিয়া বাল্যবিয়ের শিকার হতে যাচ্ছিল। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের কর্মীরা জেলা প্রশাসন, উপজেলা জেলা প্রশাসন, জেলা বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ কমিটির লোকজন তাদের বিয়ে ঠেকাতে সক্ষম হন। ওই সময় তাদের পরিবারকে বোঝাতে সক্ষম হয় যে, এই বয়সে বিয়ে না করে তাদের একটা কিছু হতে হবে। এখন তারা পড়াশোনাও করছে ভালোভাবে।
তবে মাসিকের সময় স্বপ্না ও জুঁইয়ের পেটে ব্যথা হয়, জরায়ুর মুখে জ্বালাপোড়া করে। সাতক্ষীরার সদর উপজেলার ফিংড়ী, আগরদাঁড়ী ও আলিপুর ইউনিয়ন; শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনীর নীলডুমুর গ্রাম, পইকখালীর সাহেবখালীর অনেক কিশোরীই জানায় এমন কথা। উপকূলীয় এ অঞ্চলে সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কার্যক্রমের কারণে কোথাও কোথাও বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা সম্ভব হলেও, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে সৃষ্ট শারীরিক সমস্যা থেকে মুক্তি নেই তাদের। এসব এলাকার মধ্য বয়সী নারীরাও জানান প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যার কথা। উপকূলীয় এলাকায় অল্প বয়সেই প্রজনন ক্ষমতা হারানো, গর্ভপাত, উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভকালীন খিঁচুনি আর অপরিণত শিশু জন্ম আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ার তথ্য উঠে আসে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের গবেষণায়।
জানা যায়, শুষ্ক মৌসুমে নারী ও কিশোরীদের একটা বড় অংশ চিংড়ি ঘেরে কাজ করে। সকাল সাড়ে ৬টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত লবণাক্ত পানিতে থাকে। ফলে তাদের জরায়ুর সমস্যা দেখা দেয়। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে তারা পানির অভাবে দূর থেকে মিষ্টি পানি সংগ্রহ করে। এ সময় পানি কম খায়, পরিচ্ছন্নতার জন্য লবণাক্ত পানি ব্যবহার করে। বাল্যবিয়ের প্রবণতা ও কারণ জানতে গত বছর অক্টোবর মাসে ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা কর্মসূচি ২৭টি জেলার প্রায় ৫০ হাজার খানায় জরিপ চালিয়েছে। যেখানে দেশের ৬০ শতাংশের বেশি পরিবারে বাল্যবিয়ে হওয়ার চর্চা রয়েছে বলে উঠে এসেছে। এর অর্থ হচ্ছে, গত পাঁচ বছরে এসব পরিবারের যেসব মেয়ের বিয়ে দেওয়া হয়েছে অথবা পুত্রবধূ হিসেবে যারা এসেছে তাদের ৬০ শতাংশেরও বেশি মেয়ের বিয়ের বয়স ১৮ বছরের কম ছিল।
জরিপের তথ্য বলছে, এসব জেলায় ৪৪ দশমিক ৭ শতাংশ মেয়ে ১৮ বছরের আগেই বাল্যবিয়ের শিকার হয়। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে পিরোজপুর, সেখানে বাল্যবিয়ের হার ৭২ দশমিক ৬ শতাংশ। গবেষণায় বলা হয়েছে, বাল্যবিয়ের শিকার মেয়েদের ৬ দশমিক ৯ শতাংশের বয়স ১৫ বছরের নিচে।
নারী ও শিশুর মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের প্রোগ্রাম ম্যানেজার শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘উপকূলীয় অঞ্চলে বাল্যবিয়ের হার বাড়ার অন্যতম কারণ দারিদ্র্য। অর্থনৈতিক দুর্দশা অনেক পরিবারকে মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দিতে বাধ্য করে, যাতে পরিবারের খরচ কমানো যায়। এ ছাড়া এখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বেশি থাকে; কাজের সন্ধানে পরিবারের অভিভাবক বছরের দীর্ঘ একটি সময় অন্যত্র গমন করেন, যা পরিবারের মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণ। তাই মেয়েদের দ্রুত বিয়ে দিয়ে নিরাপদ করার চেষ্টা করা হয়। ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স শিশু সুরক্ষা নীতিমালা তৈরিসহ সরকারি দপ্তরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কমিটিতে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্তি, ক্যাম্পেইন, পথনাটক, খেলা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা ও অনুষ্ঠান আয়োজন করছে নিয়মিত। শিশুদের উন্নয়নকল্পে শিশু সুরক্ষা নেটওয়ার্ক গঠন করা হয়েছে।’
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘বাল্যবিয়ে মেয়েদের জীবন বিকশিত হতে বাধাগ্রস্ত করে। অভিভাবকদের দায়িত্ব সন্তানদের বিকশিত হতে সাহায্য করা।’
সাতক্ষীরা জেলার পানিতে লবণের মাত্রা বেশি হওয়ায় সেখানে বাল্যবিবাহ বেড়েছে! পাঠকের কাছে তথ্যটা অদ্ভুত ঠেকতে পারে। মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, লবণাক্ত পানির সঙ্গে বাল্যবিবাহের সম্পর্ক কী? এর উত্তর ও ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে সোমবার আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে। ৩০ সেপ্টেম্বর জাতীয় কন্যাশিশু দিবস উপলক্ষে ছাপা হয় ‘নকল ভলিউমে বাল্যবিয়ে’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনটি, যেখানে সাতক্ষীরার বাল্যবিবাহ পরিস্থিতির চিত্র ফুটে উঠেছে।
প্রতিবেদনে প্রথমে উল্লেখ করা হয় একটি অভিযোগ। সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় কাজির সহকারীরা নকল ভলিউম বই রাখেন। সরকারের নির্ধারণ করে দেওয়া ফির চেয়ে বেশি টাকা নিয়ে সেই বইতে তাঁরা বাল্যবিবাহ লিপিবদ্ধ করেন। বর বা কনে বিয়ের আইনসম্মত বয়সে পৌঁছালে প্রকৃত নিকাহ রেজিস্ট্রি খাতায় বিয়ের তথ্য টুকে রাখা হয়। এদিকে বিয়ের সময় দুই পরিবারের কেউই জানতে পারে না যে বিয়েটি আইনসম্মতভাবে রেজিস্ট্রি করা হয়নি। অবশ্য এ নিয়ে তাদের মাথাব্যথা থাকলে বাল্যবিবাহের আয়োজনই করত না।
ইউনিসেফ গত বছর বলেছে, দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি বাল্যবিবাহ হয় বাংলাদেশে। আর এ দেশে যেসব জেলায় বাল্যবিবাহ বেশি হয়, তার মধ্যে সাতক্ষীরা অন্যতম। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, এই জেলায় মেয়েদের বাল্যবিবাহের হার ৭০ শতাংশের বেশি। এখানে বাল্যবিবাহের হার বেশি হওয়ার কারণটাও খুব অদ্ভুত। এখানকার অতিমাত্রায় লবণাক্ত পানি ব্যবহার করার কারণে মেয়েদের চেহারার রং ‘নষ্ট’ হয়ে যায়, গায়ের রং ‘কালো’ হয়ে যায়। তাই ১২-১৩ বছর বয়স হলেই পাত্র দেখা শুরু হয়ে যায় মেয়েদের জন্য। এসব কিশোরীর বিয়ে হয়ে যায় ১৮ বছরে পা দেওয়ার আগেই। ষষ্ঠ শ্রেণিতে কক্ষভর্তি মেয়ে শিক্ষার্থী থাকলেও দশম শ্রেণিতে উঠতে উঠতে বাকি শ্রেণিকক্ষগুলোতে মেয়েদের সংখ্যা প্রায় শূন্য হয়ে পড়ে। কেননা, স্কুল-মাদ্রাসার গণ্ডি পার হওয়ার আগেই তাদের বাবার বাড়ির গণ্ডি পার হতে হয়।
বাল্যবিবাহ একটি জাতীয় সমস্যা তো বটেই। সেই সঙ্গে যুক্ত হয় মেয়েদের গায়ের রং! বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া মানুষদের কাছে তাই লবণাক্ত পানির কারণে কন্যাশিশুদের বিয়ে হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা অদ্ভুতই লাগবে। তবে আমাদের দেশে সৌন্দর্যের যে প্রচলিত ধারণা—গায়ের রং ‘ফরসা’ মানেই ‘সুন্দর’ আর ‘কালো’ মানে ‘কুৎসিত’—তা থেকে বের হয়ে আসাটা খুব জরুরি। গায়ের রং দিয়ে কখনো মানুষের সৌন্দর্য মাপা যায় না, মাপতে হয় মনের রং দিয়ে। খুব ‘ফরসা’ রংধারী মানুষও যে অন্যায়, অপরাধ, দুর্নীতি করতে পারে, তা তো প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় চোখ রাখলেই বোঝা যায়।
শুধু সাতক্ষীরা নয়, পুরো দেশেই বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের কী কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা সংশ্লিষ্টরা নিশ্চয়ই ভালো জানেন। তবে তা করে দেখাতে হবে। নইলে বিয়ে হয়ে যাওয়া কিশোরীরা বলতেই থাকবে—স্বামী কিছু হইলেই শুধু মারত। এখনো আমার সারা গায়ে মাইরের দাগ।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব ও লবণাক্ততার আগ্রাসনে উপকূলে বাল্যবিয়ে বাড়ছে বলে মনে করেন নাগরিক সমাজের নেতারা। তারা বলেন, সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর নানামুখী পদক্ষেপ সত্ত্বেও উপকূলে বাল্যবিয়ে কাঙ্ক্ষিত হারে কমছে না। কারণ সেখানে লবণাক্ততা ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে মানুষ কর্মসংস্থান হারাচ্ছে। সুপেয় পানির সংকট বাড়ছে। সচেতনতার অভাব রয়েছে। ফলে অভিভাবকরা মেয়েদের স্কুলে না পাঠিয়ে শ্বশুর বাড়িতে পাঠাতে বেশি আগ্রহী হচ্ছে। গতকাল ‘বাল্যবিয়ের শিকার উপকূলের শিশু ও করণীয়’ শীর্ষক এক অনলাইন সংলাপে এ সব কথা বলেন তারা। বাল্যবিয়ে বন্ধে সামাজিক আন্দোলন জোরদার করার লক্ষ্যে উন্নয়ন সংস্থা ‘ফেইথ ইন অ্যাকশন’, নাগরিক সংগঠন ‘সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলন’ এবং পার্লামেন্ট নিউজ আয়োজিত সংলাপটি সঞ্চালনা করেন সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র। আলোচনায় অংশ নেন- শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প কর্মকর্তা হালিমা খানম, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম আজাদ, টিম অ্যাসোসিয়েটসের টিম লিডার পুলক রাহা, সমাজ কল্যাণ ও উন্নয়ন সংস্থা (স্কাস) চেয়ারম্যান জেসমিন প্রেমা, নারী প্রগতি সংঘের পরিচালক শাহনাজ সুমী, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক সাকিলা পারভীন, স্ক্যান সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মুকুল, ফেইথ ইন অ্যাকশনের নির্বাহী পরিচালক নৃপেন বৈদ্য, ইনসিডিন বাংলাদেশের কো-অর্ডিনেটর মো. রফিকুল আলম, অনির্বাণ লাইব্রেরির সভাপতি প্রধান শিক্ষক রহিমা আক্তার শম্পা, ফ্যামিলি টাইস ফর উইমেন ডেভেলপন্টের নির্বাহী পরিচালক খুজিস্থা বেগম জোনাকি, মহিলা পরিষদের জোৎস্না দত্ত, নাগরিক উদ্যোগের সাকিল আহমেদ, ফেইথ ইন অ্যাকশনের জ্যাকব টিটো, খুলনার সাংবাদিক মো. আব্দুল আজিজ, কিশোর-কিশোরী ক্লাবের রিংকু রানী মণ্ডল, সচেতন সংস্থার রিয়াদ হোসেন প্রমুখ। সংলাপে জানানো হয়, ‘ফেইথ ইন অ্যাকশন’ নারীর ক্ষমতায়ন, শিশু অধিকার ও সুরক্ষায় ২০১৯ সালে খুলনা জেলার কয়রা উপজেলায় কাজ শুরু করে। যা পরে পরিবর্তন হয়ে মুক্তির আহ্বান প্রকল্প নামে কয়রা উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের ২৩টি গ্রামে পরিচালিত হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় বাল্যবিয়ে কমানো, নারীর ক্ষমতায়ন ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রম কমানোসহ সচেতনমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এ কার্যক্রম পরিচালনাকালে দেখা গেছে, ওই সব গ্রামের গত জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আত্মণ্ডসহায়ক নারী দল, গুচ্ছ পর্যায়ে সংগঠন, শিশু সুরক্ষা কমিটি এবং শিশু ও কিশোর-কিশোরী ক্লাবের সদস্যদের মাধ্যমে ২২ জন শিশুর বাল্যবিয়ে বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এরপরও ওই এলাকায় ৬৭টি বাল্যবিয়ে হয়েছে। এরমধ্যেই ৬৪ জন মেয়ে ও তিনজন ছেলে শিশু রয়েছে। বাল্যবিয়ের জন্য অর্থাভাব ও সচেতনতার অভাবকে দায়ী করে সংলাপে বলা হয়, পরিবারের লোকজন শিশুদের লুকিয়ে, এমনকি আত্মীয়বাড়ি নিয়ে গিয়ে বিয়ের আয়োজন করে। এক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী ও জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবও বাল্যবিয়ে বন্ধের পথে বাধা হিসেবে কাজ করছে। বাল্যবিয়ে বন্ধে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, লবণাক্ততার আগ্রাসন রোধ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত এবং সচেতনতা বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করা হয় সংলাপে। আলোচনায় অংশ নিয়ে অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, পরিবারের বোঝা কমাতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেয়েদের বাল্যবিয়ে দিয়ে অভিভাবকরা সন্তানের জীবনকে বিপদের মধ্যে ফেলছে। তাই অভিভাবকদের আরো দায়িত্বশীল হতে হবে। একইসঙ্গে মেয়েদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের প্রকল্প কর্মকর্তা হালিমা খানম বলেন, প্রতিটি জেলার জেলা প্রশাসকেরা বাল্যবিয়ে নজরদারি করছেন। একেবারে ইউনিয়ন থেকে উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে এ নজরদারি চলছে। সরকারের হেল্পলাইন নম্বরে (১০৯) আসা ফোন কলের সংখ্যা বাড়লেও বাল্যবিয়ে বেড়েছে এমন তথ্য নেই। তিনি বাল্যবিয়ে বন্ধে সরকারের কার্যক্রমে সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও সাতক্ষীরার শ্যামনগরে বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম রোধ করা যাচ্ছে না। শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহের কারণে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ছে সুন্দরবন উপকূলীয় জনপদের শিশুরা।
শ্যামনগর উপজেলা শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে উপজেলার ৪৬টি বিদ্যালয়, ৩৬টি মাদ্রাসা ও ৩টি কারিগরি (ভোকেশনাল) বিদ্যালয়ে মোট ৫ হাজার ৬৫৭ জন শিক্ষার্থী অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছিল। ওই বছরের পরীক্ষার্থীরাই ২০২৩ সালে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। আর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নেয় মাত্র ৩ হাজার ২৯৩ জন শিক্ষার্থী। অর্থাৎ ওইব্যাচেরকমপক্ষে২হাজার৩৬৪জনশিক্ষার্থীঝরেপড়েছে।
শিক্ষকরা জানান, ছেলে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার প্রধান কারণ দারিদ্র্যতা এবং মেয়ে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার পেছনে মূলত দায়ী বাল্যবিবাহ। বিয়ে হওয়ার পরে ছাত্রীদের পক্ষে পড়াশোনা অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সচেতনতার অভাবে মেয়ে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ বাল্যবিবাহ ও পারিবারিক আর্থিক দুরবস্থার কারণে দ্রুতই শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ছে। যদিও গত কয়েক বছর সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগে এ চিত্রে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। সরকার উপবৃত্তি ও বিনামূল্যে বই দেওয়াসহ নানা উদ্যোগের মাধ্যমে দেশে শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে মেয়েদের অংশগ্রহণ ও টিকে থাকার হার বৃদ্ধির চেষ্টা করছে। তবে ব্যতিক্রম চিত্র লক্ষ্য করা যায় ছেলে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে। মূলত দারিদ্র্যের কারণেই ঝরে পড়া এসব ছেলে শিক্ষার্থী মাধ্যমিকের আগেই পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা। পরিবারের ভরণ-পোষণের তাগিদে জীবিকা উপার্জন করতে গিয়ে ঝরে পড়া এসব শিক্ষার্থী শিশুশ্রমের শিকার বলে দাবি তাদের। এ ছাড়া বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে তারা। এ থেকে গড়ে উঠছে ছোট ছোট কিশোর গ্যাং।
উপজেলায় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কাজ করছে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক। সংস্থাটি এ বছর উপজেলায় ৩টি বাল্যবিবাহ বন্ধ করেছে প্রশাসনের সহায়তায়।
ব্র্যাকের মানবাধিকার ও আইন সহায়তা কর্মসূচির (বিএলসি) উপজেলা কর্মকর্তা আরাফাত হোসেন বলেন, অনেক সময় অভিভাবকরা দূরে কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে মেয়ের বিয়ে দেন। ফলে সব বিয়ে রোধ করা সম্ভব হয় না।
উপজেলার প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত উপজেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৩৪টি বাল্যবিবাহ বন্ধ করা হয়।
তবে উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেন, বহু বিয়ে প্রশাসনের অগোচরে হয়ে গেছে।
উপজেলার কৈখালী ইউনিয়নের সাপখালী গ্রামের এক দরিদ্র অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তিনি এক আত্মীয়ের কথা শুনে সপ্তম শ্রেণিতে পড়া মেয়েকে বিয়ে দেন ২০২১ সালে। মাত্র চার মাসের মাথায় মেয়ের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। এখন মেয়েটি বাবার বাড়িতেই থাকে। তার পড়াশোনাও আর হয়নি।
কৈখালী ইউনিয়নের সাপখালী গ্রামের মোস্তফা গাজী বলেন, তার ছেলেকে পারিবারিক অসচ্ছলতা ও দরিদ্র্যতার কারণে বেশি পড়াশোনা করাননি তিনি। সপ্তম শ্রেণির পর তাকে ইট ভাটায় পাঠিয়ে দেন কাজে। এ বছরও ইটভাটা মালিকপক্ষের নিকট থেকে অগ্রিম টাকা নিয়েছেন তাকে কাজে পাঠানোর জন্য।
শিশুশ্রমের কথা বলায় তিনি বলেন, ওসব আমরা বুঝি না। কাজ করতে হবে, কাজ না করলে পেটে ভাত জুটবে না। অভাব অনটনের সংসারে একার পক্ষে সংসার চালানো সম্ভব না। তাই ছেলেকে কাজে লাগিয়েছি।
শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আক্তার হোসেন বলেন, সপ্তম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহের সংখ্যা বেশি। বাল্যবিবাহ রোধে প্রশাসন থেকে সচেতনতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে জরিমানা করাও হচ্ছে।
তবে উদ্বেগজনক হারে শিশু শ্রমের হার বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দরিদ্র্যতার কারণে পারিবারিকভাবে শিশুরা শিশুশ্রমে জড়িয়ে পড়ছে।
জোবেদা সোহরাব মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুস সাত্তার বলেন, তার বিদ্যালয়ের ৯৭ জন শিক্ষার্থী ২০২০ সালে অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যায়নরত ছিল। নবম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়ে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার আগেই ৯ জনের মেয়ের বিয়ে হয়েছে। পাঁচজন ছেলে পড়ালেখা বাদ দিয়েছেন। জানতে পেরেছি দরিদ্র্যতার কারণে অভিভাবকরা তাদের দেশের বিভিন্ন এলাকার ইটভাটায় শ্রমিক হিসাবে ও স্থানীয় বিভিন্ন দোকানের কর্মচারী হিসেবে কাজে যোগদান করিয়েছেন। ২০২৩ সালে ৭২ জন শিক্ষার্থী মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে।
কৈখালী শামছুর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শেখ সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, তার বিদ্যালয়ে ২০২০ সালে ৮৭ জন শিক্ষার্থী অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছিল। এবার ৫৪ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। বাকি ৩৩ জন ঝরে পড়েছে। এদের অধিকাংশেরই বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমে জড়িয়ে গেছে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও নকিপুর পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কৃষ্ণানন্দ মুখার্জী বলেন, তার বিদ্যালয়েও বাল্যবিবাহের কারণে কয়েকজন শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। তবে বাল্যবিবাহের শিকার হয়েও বেশ কয়েকজন ছাত্রী এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন।
তবে তিনি বাল্যবিবাহ আগের তুলনায় কমেছে দাবি করে জানান, বাল্যবিবাহের হার আগের তুলনায় কমলেও শিশুশ্রমের হার বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে প্রতিবছর আমাদের এ উপকূলীয় এলাকা থেকে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন ইটভাটাসহ অন্যান্য পেশায় কাজে চলে যাচ্ছে পড়াশোনা বাদ দিয়ে। ৬ মাস ইটভাটায় কাজ শেষ করে তারা আর পড়াশোনায় যোগ দিচ্ছে না। এতে ঝরে পড়ছে অনেক শিক্ষার্থী।
বিবাহ সম্পাদন বা নিবন্ধনকালে নারী বা পুরুষ কারো বয়স আইনে নির্ধারিত বয়সের চেয়ে কম হলে সে বিয়ে বাল্যবিবাহ হিসেবে গণ্য। নারী বা পুরুষ যার ক্ষেত্রেই ঘটুক না কেন, বাল্যবিবাহ মানবাধিকারের সুষ্পষ্ট লঙ্ঘন। এটি শিশুদেরকে কখন এবং কাকে বিয়ে করবে সে অধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত করে। সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ ১৯৪৮ তে বিবাহের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছায়, পূর্ণ সম্মতি দানের অধিকারকে স্বীকার করে বলা হয়েছে, ‘একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ব্যক্তিকে অবশ্যই মানসিকভাবে পরিপক্ক হতে হবে।’ এ
২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ৫, ৩, ১ ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০২০, ২০২৫ এবং ২০৩০ সালে ১৮ বছরের কমবয়সী নারীদের বিবাহের হার যথাক্রমে ৩০, ২০ ও ১০ শতাংশ সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস (বিবিএস) কর্তৃক প্রকাশিত এসবিআরএস ২০২৩ (স্যাম্পল ভাইটাল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম) অনুসারে ১৮ বছরের কমবয়সী নারীদের বাল্যবিবাহের হার ২০১৯, ২০২০, ২০২১, ২০২২ ও ২০২৩ সালে যথাক্রমে ৪১ দশমিক এক, ৩১ দশমিক তিন, ৩২ দশমিক চার, ৪০ দশমিক নয় এবং ৪১ দশমিক ছয় শতাংশ ছিল। বিবিএস পরিসংখ্যান অনুসারে ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালে আমাদের দেশে বাল্যবিবাহের হার হ্রাস পায়নি। বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ সম্পর্কিত ইউনিসেফের ২০২০ সালের প্রতিবেদন অনুসারে বাল্যবিবাহের হার (প্রিভেলেন্স) ৫১ শতাংশ এবং বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বাধিক বাল্যবিবাহ সম্পন্ন হয় এমন ১০টি দেশের একটি।
ব্রিটিশ আমলে প্রবর্তিত বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ১৯২৯ বালাদেশে বাল্যবিয়ে রুখতে অকার্যকর হয়ে পরে ছিল। সরকার এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য অংশীজনদের সাথে দীর্ঘ আলাপ, আলোচনার পর ১৯২৯ সালের আইনটিকে রদ করে বাল্যবিবাহ নিরসনের জন্য বর্তমান সময়ের চাহিদার নিরিখে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ প্রবর্তন করে। এই আইন অনুসারে বিবাহের ক্ষেত্রে ২১ বৎসর পূর্ণ করেননি এমন কোনো পুরুষ এবং ১৮ বৎসর পূর্ণ করেননি এমন কোনো নারী অপ্রাপ্তবয়স্ক। যে বিবাহের ক্ষেত্রে কোনো একপক্ষ বা উভয়পক্ষ অপ্রাপ্তবয়স্ক সে বিবাহটি বাল্যবিবাহ। আইনটি প্রণয়নের এক বৎসরের মধ্যে তা বাস্তবায়নের জন্য বাল্যবিবাহ নিরোধ বিধিমালা, ২০১৮ প্রণয়ন ও প্রকাশ করা হয়। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের জন্য জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত কমিটি গঠন করা হয়। বাল্যবিয়ে নিরসনের জন্য ছাত্রছাত্রী, কিশোর-কিশোরী, অভিভাবকদের সচেতন করার জন্য সরকারি-বেসরকারিভাবে ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। পত্রপত্রিকায় প্রতিদিনই বাল্যবিয়ে বন্ধের জন্য মাঠ পর্যায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, জেল-জরিমানা, মুচলেকা গ্রহণের সংবাদ দেখা যায়। কিন্তু বিবিএস ২০১৯ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৮ বছরের কম বয়স্ক নারীদের বিবাহের যে চিত্র তুলে এনেছে তাতে বাল্যবিবাহ নিরোধে গৃহীত কার্যক্রম ইপ্সিত ফল বয়ে নিয়ে এসেছে, একথা বলা যায় না। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অনুযায়ী বাংলাদেশকে ২০২৫ ও ২০৩০ সালের জন্য নির্ধারিত বাল্যবিয়ের হারে পৌঁছানোর জন্য এ পর্যায়ে গৃহীত কার্যক্রমগুলো পর্যালোচনা করে বিকল্প পন্থা নিয়ে অগ্রসর হওয়া প্রয়জন।
বাল্যবিবাহের কারণসমূহ: আমাদের দেশে নারীদের বাল্যবিবাহের উচ্চ হারের জন্য গতানুগতিকভাবে বহুবিধ কারণকে দায়ী করা হয়। মোটাদাগে এই কারণগুলো হলো নিরক্ষরতা, দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা। এ ছাড়া বিবাহ প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে পরিবারে পুরুষদের প্রাধান্য, স্থানীয় প্রথা, কুসংস্কার, সুন্দরী নারী, টিজিং, লেখাপড়ায় অমনোযোগ, লেখাপড়া করে না, নদীভাঙ্গা পরিবার, এতিম, পাত্র বিদেশে থাকে, পাত্র ভালো চাকরি করে, প্রেমিকের সাথে বিবাহের জেদ ধরা, পুরুষ নারীকে অশোভন অবস্থায় পাওয়া, প্রেমিকের সাথে পালানো এগুলোকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সাম্প্রতিককালে এর সাথে করোনা (কোভিড) ও স্মার্ট ফোনে আসক্তি যোগ হয়।
গভর্নেন্স ইনোভেশন ইউনিট কর্তৃক ২০১৬ সালে প্রকাশিত ‘উদ্ভাবনী উপায়ে বাল্যবিবাহ নিরোধ’ শীর্ষক বইতে বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের কারণ হিসেবে, বিবাহের সহজ পদ্ধতি, বিবাহ সম্পাদিত হলে বয়সের কারণে তা বাতিল না হওয়া, বিবাহের সময় কাগজ-পত্রাদি যাচাই ও সংরক্ষণ না করা, বিবাহের একটি বড় অংশ নিবন্ধিত না হওয়া, সরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ ব্যতীত বিবাহ পড়ানোয় সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গকে সচেতন বা মনিটর না করা, এফিডেভিট ও কোর্ট ম্যারেজের বিষয়ে ভুল ধারণা এবং বিবাহকে সকল সমস্যার একমাত্র সমাধান মনে করাকে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ তে বাল্যবিবাহ নিরোধের জন্য বর্ণিত ব্যবস্থাদি বিশ্লেষণ করে বাল্যবিবাহের যে সকল কারণ দেখা যায়, সেগুলো হচ্ছে-বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ও বন্ধের ব্যবস্থা না থাকা, পিতামাতাসহ অন্যান্য ব্যক্তির বাল্যবিবাহ সম্পন্নে ভূমিকা রাখা, বিবাহ সম্পদানকারী কর্তৃক বাল্যবিবাহ সম্পাদন, বিবাহ সম্পাদন ও নিবন্ধনের সময় পাত্রপাত্রীর বয়স প্রমাণের জন্য নির্ধারিত দলিলাদি পরীক্ষা না করা।