1. mesharulislammonir1122@gmail.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন
  2. info@www.sangjogprotidin.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন :
শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ১০:৩৪ পূর্বাহ্ন

জলের জন্য জীবনের লড়াই, শহরের চেয়ে ৪০ গুণ বেশি দাম গ্রামে

  • প্রকাশিত: শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬
  • ১১ বার পড়া হয়েছে

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি ‌: আয়ের নির্দিষ্ট অংশ ব্যয় হচ্ছে পানি কিনতে• পৌরসভার পানি দুর্গন্ধযুক্ত, ব্যবহারে নষ্ট হয় রান্নায় স্বাদ• টিউবওয়েলের পানিতেও আয়রন ও আর্সেনিক• বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শিশু ও বৃদ্ধরা• পৌরসভার সীমাবদ্ধতা • স্বল্প খরচের সমাধান হতে পারে রেইনওয়াটার হারভেস্টিং
সাতক্ষীরা শহরের মুনজিতপুর এলাকার গৃহবধূ রহিমা খাতুন সকালে পৌরসভার পানির কল খুলে বিশুদ্ধ পানির বদলে পান দুর্গন্ধযুক্ত পানি। সেই পানি দিয়ে রান্না করা যায় না, গোসল করলেও চুল আর ত্বক নষ্ট হয়। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে প্রতিদিন টাকা দিয়ে জারের পানি কিনে পান করেন তারা।
রহিমার মতো এই শহরের অসংখ্য মানুষ এখন সুপেয় পানির জন্য টাকা গুনছেন। শহরের অনেক পরিবারই এখন বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হওয়া জারের পানি বা দোকানের বোতলজাত পানির ওপর নির্ভরশীল। অথচ পানি তাদের মৌলিক অধিকার।
‘পৌরসভার পানি তো আসেই না ঠিকমতো। আর যেটুকু আসে সেটা খাওয়া তো দূরের কথা, মুখে দিতেই ভয় লাগে। পানি কিনে খেতে হচ্ছে, যা গরিব মানুষের জন্য কষ্টকর।’
তবে এই সংকটের মধ্যেও কেউ কেউ খুঁজে নিচ্ছেন বাঁচার নতুন উপায়। অনেকেই ঘরের ছাদে জমানো বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে তা ফুটিয়ে বা ছেঁকে রান্না, গোসল এমনকি পান করার ব্যবস্থাও করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শহরে ব্যক্তিগত বা পাড়াভিত্তিক ‘রেইনওয়াটার হারভেস্টিং’ বা বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখাই হতে পারে সুপেয় পানির একটি টেকসই সমাধান। এজন্য দরকার শুধু একটু সচেতনতা, আগ্রহ আর ছোট পরিসরের একটি ব্যবস্থা।
পানি এখন বাজারের পণ্য
সাতক্ষীরা শহরের সুলতানপুর, কামালনগর, কাটিয়া, মুন্সিপাড়া, রসুলপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় প্রতিটি বাসায় দিনে একাধিক জার পানি কিনে খেতে হয়। একেকটি পানির জার বিক্রি হয় ২০ থেকে ৩০ টাকায়। পাঁচ সদস্যের একটি পরিবারে মাসে খরচ পড়ে প্রায় ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা!
‘অনেকেই আর্সেনিকের এই বিষাক্ততার লক্ষণগুলোকে সাধারণ রোগ মনে করে গুরুত্ব দেন না। অথচ এটি একটি জনস্বাস্থ্য সংকট। সুপেয় পানি নিশ্চিত না করা গেলে ভবিষ্যতে সাতক্ষীরায় পানিবাহিত দীর্ঘমেয়াদি রোগের হার আরও বেড়ে যেতে পারে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।’
শহরের কামালনগরের বাসিন্দা আমিরুজ্জামান বাবু বলেন, পৌরসভার পানি তো আসেই না ঠিকমতো। আর যেটুকু আসে সেটা খাওয়া তো দূরের কথা, মুখে দিতেই ভয় লাগে। পানি কিনে খেতে হচ্ছে, যা গরিব মানুষের জন্য কষ্টকর।
সাতক্ষীরা পৌরসভার পানি সরবরাহ ব্যবস্থা বছরের পর বছর ধরে অব্যবস্থাপনার শিকার। পুরোনো ও জীর্ণ পাইপলাইনের কারণে অনেক এলাকায় পানি পৌঁছায়ই না, আর যেখানে পৌঁছায়, সেখানেও পানির রং ঘোলা, দুর্গন্ধযুক্ত ও লবণাক্ত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পানিতে আয়রনের মাত্রা এত বেশি থাকে যে তা রান্নার স্বাদ নষ্ট করে দেয়। পৌরসভার পানি পরিশোধন ব্যবস্থাও প্রায় অনুন্নত। নেই আধুনিক যন্ত্রপাতি, আয়রন বা লবণ দূর করার ব্যবস্থা। পানি সরবরাহও সীমিত। কোথাও দিনে একঘণ্টা, কোথাও একেবারেই আসে না। বিদ্যুৎ না থাকলে বা পাম্পে সমস্যা হলে দিন পেরোলেও পানি আসে না। ফলে বহু পরিবার বাধ্য হয়ে জার কিনে পানি খায়। এ অবস্থায় নাগরিকদের স্বাস্থ্য, আর্থিক সক্ষমতা ও দৈনন্দিন জীবন গভীর সংকটে পড়েছে।
‘সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে, যা ভূগর্ভস্থ পানির উৎসেও প্রভাব ফেলছে। অপরিকল্পিত পানি উত্তোলন ও অনিয়মিত বর্ষণের ফলে পানির স্তর ক্রমেই নিচে নামছে। এতে সাধারণ নলকূপ বা পৌরসভার পুরোনো সরবরাহ ব্যবস্থা দিয়ে বিশুদ্ধ পানি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।’
পৌরসভার সুলতানপুর এলাকার বাসিন্দা ওমর আলী বলেন, আমাদের এলাকায় সকালে পানির কল খুললে গড়গড় শব্দ হয়, পানি আসে না। আবার কখনো কখনো অল্প পানি এলেও সেটা ঘোলা থাকে। মাঝে মাঝে পানিতে একটা দুর্গন্ধ বের হয়।
তিনি বলেন, গ্লাসে এক ঘণ্টা পানি রাখলে নিচে সাদা পাউডারের মতো কিছু জমে থাকে। এই পানি খেয়ে কি বেঁচে থাকা যায়?”
‘সুপেয় পানির সংকটে স্বল্প খরচে সমাধান হতে পারে ছাদ থেকে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ (রেইনওয়াটার হারভেস্টিং) ও ঘরোয়া পানিশোধন পদ্ধতি। বাড়ির ছাদে পড়া বৃষ্টির পানি প্রথম ১০-১৫ মিনিট ফেলে দিয়ে পরের অংশ একটি পাইপের মাধ্যমে ঢাকনাযুক্ত ড্রামে বা ট্যাংকে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। সংরক্ষণের আগে কাপড় বা মশারির মতো ছাঁকনির মাধ্যমে পানি ছেঁকে নিতে হবে।’
টিউবওয়েলের পানিতেও নেই স্বস্তি
কেউ কেউ এখনো টিউবওয়েলের ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু শহরের অনেক টিউবওয়েলের পানিতে পাওয়া যাচ্ছে আয়রন ও আর্সেনিক, যা দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সাতক্ষীরা শহরের বিভিন্ন এলাকায় গভীর নলকূপ বসানো হলেও সেগুলোও পানির সংকটের সমাধান দিতে পারেনি। অনেক জায়গায় গভীর নলকূপের পানি খেতে লবণাক্ত লাগে, কখনো বালিমিশ্রিত থাকে, যা স্বাদ ও গুণমানে একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। ফলে বিশুদ্ধ পানির আশায় নলকূপ বসালেও সেগুলোও এখন ভরসার জায়গা হতে পারছে না, বরং মানুষ আরও বেশি হতাশ ও নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে বাজারের জারজাত পানির ওপর।
জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরা শহরের কিছু এলাকার টিউবওয়েলের পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি রয়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। দীর্ঘমেয়াদে এই পানি পান করলে মানুষের শরীরে নানা ধরনের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আসাদুজ্জামান বলেন, আর্সেনিকযুক্ত পানি শরীরের জন্য নীরব বিষের মতো কাজ করে। সাতক্ষীরার কিছু এলাকায় আমরা দেখতে পাচ্ছি, দীর্ঘদিন আর্সেনিক মিশ্রিত পানি পান করার কারণে অনেক রোগী চর্মরোগ, জ্বরজ্বর ভাব, পাকস্থলীর সমস্যা, ওজন হ্রাস, এমনকি স্নায়ু দুর্বলতা নিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আর্সেনিক শরীরে জমে থেকে ধীরে ধীরে কিডনি, লিভার এবং স্নায়ুতন্ত্রে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হচ্ছে, এটি ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়ায়। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রভাব আরও মারাত্মক হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, অনেকেই আর্সেনিকের এই বিষাক্ততার লক্ষণগুলোকে সাধারণ রোগ মনে করে গুরুত্ব দেন না। অথচ এটি একটি জনস্বাস্থ্য সংকট। সুপেয় পানি নিশ্চিত না করা গেলে ভবিষ্যতে সাতক্ষীরায় পানিবাহিত দীর্ঘমেয়াদি রোগের হার আরও বেড়ে যেতে পারে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
সাতক্ষীরা শহরের পানি সংকটের সবচেয়ে বড় বোঝাটা যেন পড়েছে নারীদের কাঁধে। ঘরে পানি না থাকলে রান্না, কাপড় ধোয়া, বাসন মাজা, বাচ্চাদের দেখভাল সব কাজের মধ্যেই নতুন করে যুক্ত হয় পানি সংগ্রহের অতিরিক্ত শ্রম। একদিকে গৃহস্থালি কাজের চাপ, অন্যদিকে প্রতিদিন পানির জন্য লাইন ধরা বা হাঁটাপথে পানি বয়ে আনা এটি তাদের দৈনন্দিন জীবনে বাড়তি ক্লান্তি ও সময় নষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মুন্সিপাড়া এলাকার গৃহবধূ হামিদা বেগম বলেন, সাপ্লাই কল থেকে ঠিকমতো পানি আসে না। ভোরবেলা উঠেই কলের সামনে লাইনে দাঁড়াতে হয়, দুই-তিন বালতি পানি তুলতে কখনও আধা ঘণ্টা, কখনও তারও বেশি সময় লাগে। অনেকে আগে এসে দাঁড়িয়ে থাকে, তাই কখনও পানি না পেয়ে খালি হাতে ফিরতে হয়। তখন বাধ্য হয়ে হেঁটে দূরের একটা টিউবওয়েল থেকে পানি আনতে হয়। ওই পানি আবার খাওয়ার মতো হয় না, শুধু কাপড় ধোয়ার কাজে লাগে।
এই বাড়তি কষ্ট শুধু শারীরিকই নয়, মানসিক চাপও তৈরি করছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর নারীরা যারা বাইরের কাজও করেন, তাদের জন্য প্রতিদিন পানি সংগ্রহ এক কঠিন যুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হুমকিতে শিশু ও বৃদ্ধদের স্বাস্থ্য
পানির এই দুরাবস্থায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধরা। দূষিত পানি খেয়ে ডায়রিয়া, টাইফয়েড, চর্মরোগ ও পেটের সমস্যা বেড়েই চলেছে। সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, গত কয়েক বছরে পানিজনিত রোগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা আগের চেয়ে কয়েক গুণ বেড়েছে। এদের অধিকাংশ বৃদ্ধ ও শিশু, যারা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। এছাড়া আর্সেনিকজনিত কারণে চর্ম রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাতক্ষীরা শহরের সুপেয় পানির সংকট আরও গভীর হয়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিবছর নিচে নেমে যাচ্ছে, যা অনিয়মিত বর্ষণ, দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুম এবং অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে ঘটছে। পাশাপাশি উপকূলবর্তী জেলা হওয়ায় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে মিঠা পানির উৎসগুলো দূষিত হচ্ছে। অনেক গভীর নলকূপের পানিও লবণাক্ত বা আয়রনযুক্ত হয়ে পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টির পরিমাণ ও ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, যার ফলে রেইনওয়াটার হারভেস্টিংও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সব মিলিয়ে এই সংকট শুধু অবকাঠামোগত নয়, এটি একটি জলবায়ু জনিত জনস্বাস্থ্য সংকট, যা নারী ও শিশুদের ওপর আরও বেশি চাপ তৈরি করছে।
সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আ.ন.ম গাউছার রেজা বলেন, সাতক্ষীরা শহরের সুপেয় পানির সংকট এখন আর শুধু অবকাঠামো বা পৌর পরিষেবার সীমাবদ্ধতার কারণে নয়, এটি স্পষ্টতই জলবায়ু পরিবর্তনের একটি বাস্তব প্রতিক্রিয়া। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে, যা ভূগর্ভস্থ পানির উৎসেও প্রভাব ফেলছে। অপরিকল্পিত পানি উত্তোলন ও অনিয়মিত বর্ষণের ফলে পানির স্তর ক্রমেই নিচে নামছে। এতে সাধারণ নলকূপ বা পৌরসভার পুরোনো সরবরাহ ব্যবস্থা দিয়ে বিশুদ্ধ পানি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। সাতক্ষীরার মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ শহরগুলোতে পানি ব্যবস্থাপনায় এখনই জলবায়ু সহনশীল ও বিকল্প পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
সমস্যা সমাধানে করণীয় কী?
নাগরিক নেতৃবৃন্দ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জীবন বাঁচাতে নিরাপদ পানি চাই, পানি আমাদের জীবনের মৌলিক চাহিদা। অথচ সাতক্ষীরা শহরের হাজার হাজার মানুষ সেই মৌলিক চাহিদা থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছেন। নিরাপদ পানি না থাকলে, সুস্থ জীবন ও উন্নয়ন দুটোই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
জেলা নাগরিক কমিটির নেতা আলী নূর খান বাবুল বলেন, পানি শুধু জীবনধারণের উপকরণ নয়, এটি নাগরিক অধিকার। কিন্তু সাতক্ষীরার মানুষকে প্রতিদিন সেই অধিকার ছিনিয়ে আনতে হয় কষ্ট, টাকা আর অপেক্ষার বিনিময়ে। পৌরসভার পানি সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, পর্যাপ্ত পরিশোধনের অভাব ও ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা আজ নাগরিক দুর্ভোগের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকট সমাধানে স্থানীয় সরকারকে দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে।
সাতক্ষীরা পৌর এলাকায় পানি সংকট বিষয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা বারসিক সাতক্ষীরা অফিসের প্রোগ্রাম অফিসার গাজী মাহিদা মিজান মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, আমরা সাতক্ষীরা পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডের ১৭টি নিম্নবিত্ত এলাকায় নিয়মিত কাজ করছি। প্রায় প্রতিটি কর্ম এলাকায় গিয়ে আমরা একই চিত্র দেখতে পাই, মানুষ বিশুদ্ধ পানির সংকটে আছে। প্রায় প্রতিটি পরিবারই খাবার পানি কিনে খায়। তারা যা আয় করে, তার একটা বড় অংশই পানি কিনতে খরচ হয়ে যাচ্ছে। এটি দীর্ঘমেয়াদে একটি আর্থ-সামাজিক চাপ তৈরি করছে।
তিনি বলেন, সাতক্ষীরা শহরের পানি সংকটের সম্ভাব্য সমাধানের পথ হিসেবে রেইনওয়াটার হারভেস্টিং বা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ধারণাটি বিশেষজ্ঞ ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কাছে এখন গুরুত্ব পাচ্ছে। এটি বাস্তবায়ন করতে খুব বেশি খরচ বা প্রযুক্তির প্রয়োজন পড়ে না। শুধু একটি ঢালু ছাদ, পাইপের মাধ্যমে পানি প্রবাহের ব্যবস্থা, একটি বালতি/ড্রাম/ট্যাংক এবং একটি সাধারণ ফিলটার সিস্টেম থাকলেই বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব। প্রাথমিকভাবে এই পানি রান্না, গোসল বা ধোয়া-মোছায় ব্যবহার করা গেলেও, ফিলটার ব্যবস্থায় উন্নয়ন এনে তা পানযোগ্য করাও সম্ভব।
পৌরসভার ব্যর্থতা স্বীকার
সাতক্ষীরা পৌরসভার পানি সরবরাহ বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানা বলেন, শহরের পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় পৌরসভার অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পৌরসভার পানির পাম্প, মোটর ও লাইনগুলো অনেক পুরোনো। কোথাও কোথাও ৪০ বছর আগে স্থাপিত। তাছাড়া শহরের ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও আগের তুলনায় অনেক নিচে নেমে গেছে, যা আমাদের পানি উত্তোলনে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
তিনি আরও বলেন, সাতক্ষীরায় আগে দুটি পানির প্ল্যান্ট ছিল। পানির চাহিদা বাড়ায় ২০১৭ সালে শহরের কুখরালি এলাকায় একটি আধুনিক ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বসানো হয়েছে। নতুন করে আরও একটি প্ল্যান্ট বসানোর চেষ্টা চলছে। তবে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ এখনো পাইনি। বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে। এছাড়া পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে, এবং আরও কিছু এলাকাভিত্তিক গভীর নলকূপ বসানোর পরিকল্পনাও হাতে আছে। তবে প্রতিনিয়ত শহরের আয়তন বৃদ্ধির কারণে পানির চাহিদা বাড়ছে। ফলে পৌরসভার পক্ষে চাহিদা অনুযায়ী পানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
স্বল্প খরচে সুপেয় পানি কীভাবে পাবেন?
সাতক্ষীরা পৌরসভার সাবেক সহকারী প্রকৌশলী সেলিম সরোয়ার বলেন, সাতক্ষীরা শহরের পানি সংকট নিরসনে আধুনিক ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন, পৌরসভার পানি লাইনগুলো আধুনিকায়ন, টিউবওয়েলের পানি পরীক্ষার জন্য নিয়মিত উদ্যোগ, ছাদে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের সরকারি ও সামাজিক উদ্যোগ, কমিউনিটি ট্যাংক বা বিকল্প পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু এবং স্কুল ও ওয়ার্ড পর্যায়ে পানি সচেতনতা কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
স্বল্প খরচে সুপেয় পানির বিষয়ে তিনি বলেন, সুপেয় পানির সংকটে স্বল্প খরচে সমাধান হতে পারে ছাদ থেকে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ (রেইনওয়াটার হারভেস্টিং) ও ঘরোয়া পরিশোধন পদ্ধতি। বাড়ির ছাদে পড়া বৃষ্টির পানি প্রথম ১০-১৫ মিনিট ফেলে দিয়ে পরের অংশ একটি পাইপের মাধ্যমে ঢাকনাযুক্ত ড্রামে বা ট্যাংকে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। সংরক্ষণের আগে কাপড় বা মশারির মতো ছাঁকনির মাধ্যমে পানি ছেঁকে নিতে হবে। পানি ফুটিয়ে ১০-১৫ মিনিট রেখে ঠান্ডা করে খাওয়া সবচেয়ে নিরাপদ উপায়। রোদের তাপে রেখে (সোলার ডিসইনফেকশন), অথবা প্রাকৃতিক উপায়ে সহজেই এই পানি শোধন করা যায়। কয়েক হাজার টাকায় একটি পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় রেইনওয়াটার হারভেস্টিং ইউনিট তৈরি করা সম্ভব, যা পুরো মৌসুম বিশুদ্ধ পানির জোগান দিতে পারে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও স্থানীয় কিছু এনজিও কারিগরি সহায়তা দিয়ে থাকে।
পঞ্চাশোর্ধ ব্রজসুন্দরী বাড়ি কাঁচরাহাটি গ্রামে। খাবার পানি যোগাড় করতে তাকে সপ্তাহে কমপক্ষে দুই বার প্যাডেলযুক্ত বাহনে চড়ে তিন কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পানি কিনে আনতে হয় নিজের পরিবারের জন্য। দক্ষিন এশিয়ার বহু শুষ্ক ও স্বল্প শুষ্ক অঞ্চলে বাস করা লক্ষ লক্ষ নারীকে পায়ে হেটে দিনে কমপক্ষে দুই বার খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয়। তারা হয়ত ব্রজোসুন্দরীর সপ্তাহে দু’বার পানি সংগ্রহ করাকে সৌবাগ্য হিসেবেই দেখতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ব্রজসুন্দরী বাস করেন বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলের একটি জেলায়। এখানে যেদিকে দৃষ্টি যায় – পুকুর, ছোট ছোট খাল, নদী বা বিল, সবখানেই কেবল পানিই চোখে পড়ে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই পানি একেবারেই পানের অযোগ্য।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারনে বেড়ে গেছে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা। এর ফলে ক্রমাগত লবনাক্ত পানি প্রবেশ করে দক্ষিন এশিয়ার সমগ্র সমুদ্র উপকূলের অঞ্চলগুলোর মিষ্টি পানির উৎসগুলোকে বিষাক্ত করে তুলেছে। আর বাংলাদেশে লবন পানি ক্রমেই মূল ভূখন্ডের আরো ভিতরে প্রবেশ করছে।
তাই ব্রজসুন্দরীকে এখন নিত্যই দোকানে গিয়ে পানি কিনতে হয় যেখানে পাম্পের মাধ্যমে ভূ-গর্ভের গভীর থেকে পানি উত্তোলন করার পর বিশুদ্ধ করে তা বিক্রি করা হয় সাধারণ মানুষের কাছে। বাংলাদেশের দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলের জেলার সাতক্ষীরার উপজেলা শ্যামনগরে বসবাসকারী এই বৃদ্ধ বাসিন্দা প্রতিবার ৬০ লিটার পানি ক্রয় করেন ৩০ টাকার বিনিময়ে (০.৩৫ মার্কিন ডলার) এবং এই পানি বহন করে আনতে তাকে পায়েটানা রিকশার জন্য আরো ব্যয় করতে হয় ২০ টাকা (০.২৪ মার্কিন ডলার)। সব মিলিয়ে মাসে ব্রজসুন্দরীকে পানির জন্য ব্যয় করতে হয় ৪০০ টাকা (৪.৭২ মার্কিন ডলার), যা কিনা সরকারের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ি, একজন ভূমিহীন কৃষি শ্রমিকের গড় আয়ের ১০ শতাংশেরও বেশি।
ব্রজসুন্দরী দ্যথার্ডপোল.নেটকে বলেন, কখনও ভাবিনি যে আমাকে একসময় টাকা দিয়ে পানি কিনে খেতে হবে। আগে আমাদেও বাড়ির কাছেই ছিল বড় বড় পুকুর। কিন্তু লবন পানি ঢুকে এখন সব বিনষ্ট হয়ে গেছে। দিন দিন পানির এই সমস্যা যেন মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
২০১১ সালে ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন এবং লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন এক গবেষনার মধ্য দিয়ে জানিয়েছিল যে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় বসবাসকারী মানুষের শরীরে পানির মাধ্যমে প্রবেশ করা লবনের মাত্রা স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে অনেকগুন ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে এই মুহুর্তে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।সমস্যার ব্যাপকতা বহুমাত্রিক
বাংলাদেশের ১৯টি উপকূলীয় জেলার মধ্যে সাতক্ষীরা একটি। এর মধ্যে যে সাতটি জেলা সমুদ্রমুখী তার মধ্যেও সাতক্ষীরা রয়েছে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৩২ শতাংশ উপকূলীয় জেলাগুলোতে বসবাস করে। বাংলাদেশ সরকারের সাম্প্রতিক আদমশুমারী অনুযায়ি এই অঞ্চলে বসবাসকারী মোট জনসংখ্যা ৩৫ মিলিয়ন।
প্রচুর সংখ্যক গবেষণার মধ্য দিয়ে এটি এখন প্রতিষ্ঠিত যে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসকারী জনগণ পানির লবনাক্ততা বৃদ্ধিতে নানাবিধ সমস্যার মুখে পড়ছে এবং এই সমস্যা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে।
রিভার স্যালাইনিটি অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ: এভিডেন্স ফ্রম কোস্টাল বাংলাদেশ শীর্ষক ২০১৪ সালে প্রকাশিত বিশ^ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ অক্টোবর থেকে মে মাস পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে দেশের দক্ষিন-পশ্চিম অঞ্চলের নদনদীগুলোর লবনাক্ততার কারনে ব্যাপক পরিবর্তন স্বাধিত হবে। এর ফলে খাবার পানির সংকটসহ সেচ ব্যবস্থা এবং জলজ বাস্তুসংস্থানে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যাবে।
আসলে পানির সংকট কিন্তু এরই মধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছে। আর এর মধ্য দিয়ে সমগ্র উপকূলীয় এলাকায় ক্রমবর্ধমান হারে নতুন এক ব্যবসা প্রসারিত হচ্ছে, আর তা হচ্ছে পাত্রে করে খাবার পানি বিক্রির ব্যবসা।
এখন পানির দোকানগুলোর সামনে চোখে পড়ার মতো জনসমাগম একটি নৈমিত্তিক দৃশ্য। এই দোকানগুলো এমন স্থানে স্থাপন করা হয় যেখানে তুলনামূলকভাবে গভীর এবং বিশুদ্ধ ভূগর্ভস্থ্য পানির স্তর পাওয়া যায়। প্রথমে মাটির নিচ থেকে পানি সংগ্রহ করে তা রিভার্স অসমোসিস (আরও) পদ্ধতিতে বিশুদ্ধ করা করা। এই পাম্পটি দোকনের পিছনে স্থাপন করা হয়। সংগ্রহীত পানি লবনমুক্ত করে তা পানের যোগ্য করে তা স্থানীয়দের কাছে বিক্রি করা হয়।
শ্যামনগর শহরের নাকিপুর এলাকায় বসবাসকারী শাহীনুর রহমান এমন একটি দোকানের মালিক। তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম মৌসুমী ড্রিকিং ওয়াটার প্ল্যান্ট। ২০১৮ সালে ৬০০,০০০ টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে তিনি এই ব্যবসা শুরু করেন। তার প্ল্যান্টে প্রতি ঘন্টায় এক হাজার লিটার পানি বিশুদ্ধ করা যায়। তিনি প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ পরিবারের কাছে ৫০ পয়সা প্রতি লিটার পানি বিক্রি করেন।
দ্য থার্ডপোল.নেটকে তিনি বলেন, আমি প্রতি মাসে এখান থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় করি। এখানে পানির ব্যবসা একটি বড় ব্যবসা। মানুষের আসলে পানির অত্যন্ত চাহিদা আর আমরা তাদের চাহিদা পূরণ করে যাচ্ছি।
প্রায় চার লাখ বাসিন্দার জন্য শ্যামনগরে এ মুহুর্তে ২৫টি পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট রয়েছে। এখানকার বাসিন্দারা রাজধানী ঢাকার বাসিন্দাদের চেয়েও বেশি মূল্যে পানি ক্রয় করলেও আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এখানকার সবগুলো প্ল্যান্টই মুনাফা করে যাচ্ছে। ঢাকা ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড স্যুয়েরেজ অথরিটি (ওয়াশা) ঢাকায় মাত্র ১২ টাকায় এক হাজার লিটার পানি সরাবরাহ করে। অন্যদিকে শ্যামনগরের বাসিন্দারা মাত্র ২৪ লিটার পানির জন্য ব্যয় করে ১২ টাকা।
রাজধানীতে বসবাসকারী সকল নাগরিকের নিজেদের বাড়িতে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পানি বিশুদ্ধকরণ ব্যবস্থা স্থাপন করার কথা। অথচ শ্যামনগরের মতো এলাকার বাসিন্দাদের চেয়ে রাজধানী ঢাকায় বসবাসকারী জনগণ অনেক কম মূল্যে পানি ক্রয় করছে । আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে আরো শ্যামনগরের বাসিন্দাদের গড় আয় ঢাকার বাসিন্দাদের গড় আয়ের অর্ধেক।
২০১৩ সালে বেসরকারী সংস্থা ওয়াটারএইড বাংলাদেশ প্রকাশিত এক গবেষনায় বলা হয়, ঢাকার চেয়ে উপকূলীয় এলাকাগুলোতে পাত্রে সরাবরাহ করা পানির মূল্য অনেক বেশি। গবেষণাটি সাতক্ষীরা এবং খূলনায় পরিচালনা করা হয়।
গবেষণাটি সেসময় নেতৃত্ব দেন আফতাব ওপেল। বর্তমানে তিনি ভিশন স্প্রীং নামে অন্য একটি সংস্থায় কর্মরত। তিনি বলেন, বর্তমানে উপকূলীয় এলাকায় পানির ব্যবসা বেশ রমরমা। প্রতিদিনই এই ব্যবসার প্রসার বাড়ছে। ২০১৩ সালের তুলনায় এখন পানির মূল্য ঢাকায় লিটার প্রতি অনেক কমে গেছে, অথচ উপকূলীয় এসব এলাকায় এই পানির মূল্য কয়েকশত গুন বেশি।
উপকূলে খাবার পানির উৎসগুলোতে লবনাক্ত বেড়ে যাওয়ার পিছনে অন্যতম একটি কারন হচ্ছে চিংড়ি চাষ যা কিনা ১৯৮০ সালের দিকে বাংলাদেশে শুরু হয়। চিংড়ি চাষিরা তাদের প্লটগুলোতে অবাধে লবন পানি প্রবেশ করায় কারন লবনাক্ত পানিতে চিংড়ি সবচেয়ে ভালো বৃদ্ধি পায়। আর এই লবন পানিই ধীরে ধীরে ভূগর্ভস্থ্য পানির উৎসগুলোতে গিয়ে ধীরে ধীরে জমতে থাকে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক দিলীপ দত্ত বলেন, লবনাক্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় বড় বড় পুকুরের পানি এখন পানের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। চিংড়ি চাষের সাথে যারা যুক্ত তারা এই সমস্যা সমাধানে নতুন কোনো জলাধার নির্মান করেনি। তারা কেবল মুনাফর চিন্তাই করে।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সেবাক কুমার সাহা ২০১৭ সালে বাংলাদেশের দক্ষিন-পশ্চিম উপকূলে চিংড়ি চাষের ফলে আর্থ সামজিক ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে একটি গবেষনা পরিচালনা করেন। তিনি বলেন, পানিতে লবনাক্ততা বৃদ্ধির কারনে সেখানে বসবাসকারী মানুষের শরীরে মারাত্বক প্রভাব পড়ছে। এর ফলে খাবার পানির সংকট হচ্ছে, এবং একই সাথে প্রাত্যহিক কর্মকান্ড যেমন ¯œান করা, রান্নার কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
খাবার পানি আর অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় কাজে শ্যামনগরের মতো অন্যান্য উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দারা পানি কিনতে বাধ্য হলেও তারা আর এই ব্যয় নির্বাহ করতে পারছে না। এর ফলে লবন পানি ব্যবহার বেড়ে গেছে স্নান ও পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে। স্বাস্থ্যের উপরে এর প্রভাব পড়ছে মারাত্বক ভাবে। এই এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে, বিশেষ করে নারীদের যেসব স্বাস্থ্যগত সমস্যা হচ্ছে তা হলো চর্মরোগ, মূত্রনালীতে সংক্রমন এবং শ্রোনী প্রদাহজনিত রোগ। এছাড়া নারীদের আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে মাসিক ঋতুকালীন সমস্যা। এটি একটি বড় ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।
আসলে এখানকার মানুষদের যে পরিমান পানি পান করা উচিত সে পরিমান পানি তারা পান করেনা। শ্যামনগর উপজেলার ২৩ বছর বয়সী এক নারী বলেন, এখানে পানির খুব অভাব। তাই পানি পান করার আগে আমাকে চিন্তা করতে হয় কতটুকু পান করবো আর কতটুকু সংরক্ষণ করবো। এই নারী একটি চিংড়ির ঘেড়ে কাজ করেন। সেখানে কাজ করতে গিয়ে তাকে সারাদিন কোমর সমান লবন পানিতে ডুবে কাজ করতে হয়।  তার কর্মস্থলে পানি পানের কোনো ব্যবস্থাই নেই। ২০১৯ সালে মূত্রনালীতে সংক্রমনের সমস্যা হওয়ায় তাকে একবার স্থানীয় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়েছিল। তখন চিকিৎসক তাকে বলেছিলেন তিনি প্রয়োজনের তুলনায় কম পানি পান করেন বলেই এই সমস্যা বোধ করছেন।
ক্যামনগর হেলথ কেয়ার সেন্টাওে কর্মরত রত্না রানী পাল বলেন, আমাদের কাছে বেশিরভাগ নারী রোগীরা প্রজননতন্ত্রের সমস্যা নিয়ে আসেন। এর অন্যতম প্রধান কারন হচ্ছে মাসিক সংক্রান্ত প্রয়েঅজনীয় যত্ন আর ব্যবস্থাপনার অভাব।
সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার তৃণমূল নারী সংগঠন প্রেরণা নারী উন্নয়ন সংস্থানের পরিচালক শম্পা গোস্বামী বলেন, এখানকার নারীদের জীবন অত্যন্ত হুমকির মুখে। পানিতে লবনাক্ততা, জলবায়ু পরিবর্তন আর একের পর এক ঘূর্ণিঝড় এখানকার নারীদের জীবনকে দিনকে দিন দূর্বিষহ করে তুলছে।
অনুবাদ: আরিক গিফার
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলবর্তী খুলনা জেলা। এই জেলার কয়রা উপজেলার একটি গ্রাম দক্ষিণ কালিকাপুরে থাকেন ২৭ বছর বয়সী হোসনেয়ারা। প্রতিদিন সকালে তিনি একটা কলসি হাতে নিয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার হাঁটেন খাবার পানির খোঁজে।
হোসনেয়ারার গন্তব্য একটি ছোট পুকুর, সেখানে গেলে এখনো কিছুটা ঘোলা পানি মেলে। পানির ওপর ভাসে পাতলা হলদেটে স্তর। কলসি দিয়ে সেই স্তর সরিয়ে হালকা সবুজাভ সেই পানি ভরতে থাকেন হোসনেয়ারা।

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।