1. mesharulislammonir1122@gmail.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন
  2. info@www.sangjogprotidin.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন :
বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ০৪:২৮ অপরাহ্ন

লবণাক্তা উপকূলে বিপদের মুখে মানুষ সহ জীববৈচিত্র্য

  • প্রকাশিত: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬
  • ৩৭ বার পড়া হয়েছে

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলাগুলোর মধ্যে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা নিয়ে বৃহত্তর খুলনাঞ্চল গঠিত। পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেষ্ট সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ একদিকে যেমন জেলাগুলোকে করেছে সমৃদ্ধ তেমনি নানা প্রাকৃতিক দূর্যোগ থেকে রক্ষা করে চলেছে যুগের পর যুগ। সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগর সন্নিহিত জেলা হওয়ায় মৎস্য, মধু, মাছ ও কাঠ আহরণ এ অঞ্চলের মানুষের বড় একটি অংশের রোজকার জীবিকা।
প্রকৃতি যেমন এ অঞ্চলকে উদারভাবে তার সম্পদ দান করেছে, তেমনি লবণাক্ততা এ অঞ্চলের মানুষ ও পরিবেশকে চরম হুমকির মুখেও ফেলে দিয়েছে। দিনে দিনে লবণাক্ততার এই সমস্যা বেড়ে চলেছে। আশানুরূপ ফসল ফলছে না জমিতে। লোকসংখ্যা বেড়ে চলেছে, কিন্তু বিঘার পর বিঘা অনাবাদি রয়ে যাচ্ছে। এক সময় লবণাক্ত পানিতে ব্যাপকভাবে চিংড়ি চাষ হলেও সময়ের বিবর্তনে তাতেও ধস নেমেছে। সুপেয় পানির অভাবে রোগ ব্যাধি বাড়ছে। নারীরা বিভিন্ন সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন। হাহাকার বিরাজ করছে সমগ্র উপকূলীয় এলাকায়। অনেকেই নিজ বাস্তভিটা ছেড়ে চলে গেছেন। লবণাক্ততার কারণে পুরো বাস্তুসংস্থান বদলে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, লবণাক্ততা সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হলে আগামী দুই যুগে কয়েক লক্ষ মানুষ এ অঞ্চল ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হবে।
উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা সমস্যা দীর্ঘদিনের। এখন থেকে প্রায় ৬শ’ বছর আগে লবণাক্ততা সমস্যা উপলব্ধি করে হজরত খানজাহান আলী (রহ.) বৃহত্তর খুলনাঞ্চলে ৩৬০ টি মিষ্টি পানির দীঘি খনন করেছিলেন। সে সময় জনসংখ্যা খুবই কম থাকায় মিষ্টি পানির দীঘিগুলো সুপেয় পানির চাহিদা পূরণে সক্ষম ছিল। এখন জনসংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে। সময়ের প্রয়োজনে মানুষ খালবিল সব ভরাট করে ফেলেছে। নদনদী ভরাট করেছে। ছোট ডোবা-পুকুর কিছুই দখল থেকে বাদ পড়েনি। মানুষই নিরাপদ পানযোগ্য পানির উৎস সংকুচিত করেছে ফেলেছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গেছে। বর্ষা মৌসুমে কাঙ্খিত পরিমাণ বৃষ্টিপাত হচ্ছে না।
স্থানীয় নদনদীর গভীরতা বা নাব্যতা কমে যাওয়ায় জোয়ারে সাগরের লবণ পানি প্রবেশ করছে কিন্তু ভাটায় সে পরিমানে নামছে না। বছরের পর বছর এ অবস্থা বিরাজমান থাকায় পানি ও মাটি লবণ আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সাগরপৃষ্টের উচ্চতা বেড়ে চলায়ও লবণ পানি উপকূলে ঢুকছে। উপকূল এলাকায় বাঁধ দিয়ে পুরো প্লাবনভূমিকে আটকে দেওয়া হয়েছে। যার ফলে প্লাবনভূমিতে পানিবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে লবণাক্ততা বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে, ষাটের দশকে নির্মিত দূর্বল বেড়িবাঁধ সামান্য জলোচ্ছাসে, ঝড়ে ভেঙ্গে যাচ্ছে। প্রবেশ করছে লবণপানি। এ পানি নামতে সময় নিচ্ছে ৩ থেকে ৩ মাস।
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ততা বৃদ্ধির নেপথ্যে প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতও অনেকটা দায়ী। পাহাড় থেকে নেমে আসা পানি বাংলাদেশে প্রবেশ করলে লবণাক্ততার পরিমাণ তুলনামূলক কম হতো। ফারাক্কা ও অন্যান্য বাঁধ দেয়ার পর থেকেই এ অঞ্চলের সকল নদনদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়েছে। স্রোত কমে আসায় নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। পানি চুক্তির ন্যায্যতা ভারত রক্ষা করলে লবণাক্ত পানির সমস্যা বহুলাংশে হ্রাস পেতো।
এ বিষয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের (বিভাগ) অধ্যাপক দিলীপ কুমার দত্ত বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের জনঘনত্ব আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। উপকূলীয় এলাকায় পানির অভাব নেই, অভাব রয়েছে সুপেয় পানির। জীবনধারণের জন্য যে পরিমাণ পানি দরকার, তা মাথাপিছু অনুযায়ী কমে গেছে। খাবার পানির সমস্যা সমাধানের জন্য প্রায় ৬০০-৭০০ বছর আগে থেকেই এসব অঞ্চলে বড় বড় দীঘি খনন করা হয়েছিল। খানজাহান আলীসহ অন্যরা হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন, এটাই একমাত্র উপায়। এটা হলো প্রকৃতিগত পদ্ধতি। এই পদ্ধতির কথাই এখন অনেকে বলছেন, কিন্তু সেটা নিয়ে কেউ কাজ করছেন না। ইতিমধ্যে যেসব জলাশয় ছিল, তা আমরা ভরাট করে ফেলেছি। আসলে আমাদের যেটা প্রয়োজন, আমরা ঠিক তার উল্টো পথে চলছি। আমরা সব সময় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। ভূগর্ভস্থ পানি হলো যেকোনো উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। ভূগর্ভস্থ পানির বয়স কমপক্ষে ৬০০ বছর, ওপরে ২ হাজার ৫০০ বছর। অর্থাৎ আমরা বর্তমানে যে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করছি, তার বয়স এমনই। এই ভূগর্ভস্থ পানি পূরণ হতে কমপক্ষে ৬০০ বছর লাগবে। বর্তমানে আমাদের উপকূলীয় এলাকায় কমপক্ষে ৯৮ শতাংশ মানুষ ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে যে পরিমাণ পানি তোলা হচ্ছে তা পূরণ হচ্ছে না। যেসব জলাশয় ছিল তা ভরাট হয়ে গেছে।
খুলনার কয়রা, পাইকগাছা, সাতক্ষীরার আশাশুনি, শ্যামনগর, তালা, বাগেরহাটের শরণখোলা প্রভৃতি উপজেলায় দেখা গেছে, পানযোগ্য পানি আনতে গৃহবধূদের কয়েক মাইল পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। মিষ্টি পানির পুকুর থেকে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে তারা পানি সংগ্রহ করছে। ওই সকল উপজেলায় একসময় প্রায় ৮০ হাজার মৎস্য ঘেরে লোনা পানির চিংড়ি চাষ করা হতো। লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় এখন ঘেরের সংখ্যা ২০ হাজার কমে গেছে। লাভজনক চিংড়ি চাষ এখন লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লবণাক্ততার কারণে চিংড়ি ঘেরে মড়ক দেখা দিচ্ছে। চিংড়ি রেণু পোণা বাড়ছে না। অন্যদিকে, ফসলের আবাদ কমছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের একটি গবেষণাপত্রে জানা গেছে, খুলনার কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছা এবং সাতক্ষীরার আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলায় ১৯৯৫ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে কৃষিজমি কমেছে ৭৮ হাজার ১৭ একর।
খুলনাভিত্তিক সংস্থা উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোটের (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদি বলেন, আমাদের নিজস্ব গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৯ সালে ঘুর্ণিঝড় আইলার পর খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলা থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার মানুষ অন্যত্র চলে যায়। এর দুই বছর পর আবার ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ বাড়িতে ফিরে আসে। বাকি ১৫ হাজার আর ফেরেনি।
এ বিষয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আইনুন নিশাত বলেন, আমাদের নিজেদের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সব ধর্মের মানুষ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। এদের মধ্যে অনেকে ভারতে, কেউ কেউ মধ্যপ্রাচ্যে বা ইউরোপেও যাচ্ছে। আর দেশের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামেও খুলনা-সাতক্ষীরার মানুষকে আমরা যেতে দেখেছি। এই সবকিছুর জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অন্যতম দায়ী।
খুলনা মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ও চর্ম যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আক্তারুজ্জামান বলেন, লবণাক্ততা সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি হলে শরীরে নানা রোগ ব্যধির সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে চর্ম রোগের আশংকা থাকে। খুলনার উপকূলীয় এলাকাগুলোতে চর্মরোগীর সংখ্যা বেশি। দেহে লবনের মাত্রা বেড়ে গেলে বেশ কিছু জীবানুর সংক্রমণ দেখা দেয়। অন্যদিকে লবণ বাড়লে শরীরে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হয়। খুলনা বাগেরহাট সাতক্ষীরার উপকূলীয় মানুষের উপরে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো জরিপ এ পর্যন্ত করা না হলেও তাদের এ সমস্যাগুলোর তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে।
উপকূলীয় এলাকার লবণ সমস্যা দূর করার বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেইন ওয়াটার হার্ভেস্ট বা বৃষ্টির পানি ধরে রেখে ব্যবহার একটি জনপ্রিয় মাধ্যম। তবে, এটা শুধু স্বল্প সময়ের জন্য খাবার পানির চাহিদা পূরণ করে। তবে মনে রাখতে হবে, মিঠা পানির চাহিদা শুধু মানুষের নয়, পরিবেশের প্রতিটি গাছপালা ও জীবজন্তুর জন্যও প্রয়োজন। বৃষ্টির পানি ধরে রেখে শুধু মানুষের খাবার পানির চাহিদা মিটতে পারে, কিন্তু পরিবেশের নয়। এর জন্য প্রয়োজন প্রকৃতি নির্ভর সমাধান। তবে এ ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কারণ, উৎসের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার সীমিত করতে হবে। এলাকাভিত্তিক বড় বড় পুকুর, খাল, জলাশয় খনন করে তাতে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। নদ নদী খনন করতে হবে। পানি ব্যবহারে সবাইকে মিতব্যয়ী হতে হবে।
আবহাওয়া ও জলবাযুর বিরূপ প্রভাবে উপকূলীয় এলাকার মাটি ও পানিতে দিন দিন বাড়ছে লবণাক্ততার পরিমাণ। এর ফলে মানুষের সুপেয় পানির যেমন অভাব দেখা দিচ্ছে, তেমনি কৃষি ও মৎস্য চাষ চরম হুমকির মুখে পড়ছে। লবণাক্ততার ছোবলে কৃষি-অর্থনীতি, জীবন-জীবিকাসহ অনেক ক্ষেত্রে ঘটছে নানামুখী সর্বনাশ। সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বৈশ্বিক জলবায়ুর পরিবর্তনকে ‘রেড এলার্ট’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষের কর্মকান্ডের ফলে জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে অপ্রত্যাশিত এবং অপরিবর্তনীয় উপায়ে। এর ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে ঝুঁকিতে পড়বে কোটি কোটি মানুষ। ২১০০ সালের মধ্যে ভেসে যাবে উপকূল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যা প্রতিরোধে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার যেমন কমাতে হবে, তেমনি প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণও বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশ মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের উপকূলবর্তী প্রায় ৫৩ শতাংশ অঞ্চল লবণাক্ততা দ্বারা সরাসরি আক্রান্ত। বর্তমানে দেশের উপক‚লবর্তী এলাকা ছাড়িয়ে এই লবণাক্ততা আক্রান্ত অঞ্চল ক্রমেই বেড়ে চলেছে। দক্ষিণ-পূর্বে টেকনাফ থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে খুলনা-সাতক্ষীরা পর্যন্ত ৭১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দক্ষিণভাগে উপক‚লীয় তটরেখা ঘেঁষে বঙ্গোপসাগরের কোলে বিস্তীর্ণ চর-উপক‚ল-দ্বীপাঞ্চল। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী, ল²ীপুর, চাঁদপুর, ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরাসহ ১৯টি উপক‚লীয় জেলার নদনদী খাল-বিল-খাঁড়ি, পুকুর-নলক‚পসহ পানির উৎসগুলোতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ২৮.৬ লাখ হেক্টর উপক‚লীয় এলাকার মধ্যে ১০.৫৬ লাখ হেক্টর এলাকা বিভিন্ন মাত্রায় লবণাক্ত কবলিত। এই লবণাক্ততার কারণে শুকনো মৌসুমে বিশেষ করে রবি ও খরিফ-১ মৌসুমে ফসল চাষ অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ সময়ে মাটির লবণাতক্ততা ৮.০ ডিএ/মি এর উপরে চলে যায়। এছাড়া এই সময়ে নদীর পানির লবণাক্ততা ২৫.০-৩০.০ ডিএস/মি পর্যন্ত হয়ে থাকে।
লবণাক্ততা দিন দিন কৃষিজমি গিলে খাচ্ছে। জমি হারাচ্ছে উর্বরাশক্তি। ফল-ফসলের বর্ধন, ঘনত্ব বা নিবিড়তা এবং ফলন কমছে। খাদ্যনিরাপত্তা হচ্ছে বিঘিœত। দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততার সমস্যা দীর্ঘদিনের। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে কৃষি-খামার এমনকি জনস্বাস্থ্য। বিষিয়ে উঠেছে পরিবেশ-প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য। একবার জমি লোনাক্রান্ত হলে তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা কঠিন। প্রায় ৪ কোটি উপক‚লবাসী কোনো না কোনোভাবে লোনার শিকার। উৎপাদনশীলতা কমছে সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময় উপক‚লে। বেকার, স্থানান্তর ও পেশা বদল করছে মানুষ। প্রকট হচ্ছে দারিদ্র্য, আর্থ-সামাজিক সঙ্কট।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন পরিবেশ বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. মোহাম্মদ শফিউল আলম এ প্রসঙ্গে ইনকিলাবকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাও বেড়ে যাচ্ছে। এরফলে অস্বাভাবিক সামুদ্রিক জোয়ারে নদ-নদী-খালের মিঠাপানি লবণাক্ত হয়ে পড়ছে। মিঠাপানির মাছের বৃহত্তম প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র হালদা নদীও লবণাক্ত হয়ে পড়েছে। কৃষিজমি লোনাকবলিত হচ্ছে। লবণ ও চিংড়ি চাষে রূপান্তরিত হচ্ছে ব্যাপক কৃষিজমি। তাছাড়া পরিবেশ-প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্যের উপর পড়েছে বিরূপ প্রভাব। পরস্পর নির্ভরশীল জীবনচক্র ও খাদ্যশৃঙ্খল বিঘিœত হচ্ছে। অনেক প্রজাতির মাছসহ প্রাণিকূল, উদ্ভিদ বিলুপ্তির মুখে। লবণাক্ততার সমস্যা ক্রমাগত বাড়ছে।

জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের গুরুতর প্রভাবে পৃথিবী এবং সমুদ্র উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, কক্সবাজার উপক‚লে বছরে ৭ দশমিক ৮ মিলিমিটার হারে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। গত চার দশকে দ্বীপজেলা ভোলার প্রায় তিন হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা সমুদ্রের পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। বাংলাদেশের উপক‚লভাগে ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে অস্বাভাবিক উঁচু জোয়ার এবং ছোট ছোট জলোচ্ছ্বাস হচ্ছে ঘন ঘন। ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস সিডর, আইলা, আম্ফান, ইয়াসের আঘাতে অধিকাংশ উপক‚লীয় জেলা-উপজেলায় বেড়িবাঁধ কমবেশি বিধ্বস্ত। ভাঙাচোরা বেড়িবাঁধ দিয়ে অবাধে জোয়ারের পানি ঢুকে ডুবছে অনেক এলাকা। উপরের দিকে স্থলভাগে ছড়িয়ে পড়ছে সামুদ্রিক নোনা পানি এবং কৃষি-অকৃষি জমি ও লোকালয়ে আটকে যাচ্ছে। গ্রাস করছে মিঠা পানি বা স্বাদু পানির নদ-নদী-খালসহ পানির যাবতীয় উৎস। উপকূলে নদ-নদী-খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে নোনা পানির প্রসার ঘটছে দ্রæত। লবণাক্ত পানিবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। আবার ভূগর্ভস্থ পানিও লবণাক্ত হয়ে পড়ছে। ফল-ফসলের চাষযোগ্য জমিতে লবণাক্ততার হার বেড়েই চলেছে। আবাদী জমির পরিমাণ কমছে, বাড়ছে পতিত জমি। ফলনও হ্রাস পাচ্ছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে সমগ্র কৃষি খাতে।

দেশের আবাদী জমির ৩০ ভাগ উপক‚লীয় এলাকায়। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই) এবং লবণাক্ততা ব্যবস্থাপনা ও গবেষণা কেন্দ্রের জরিপে জানা গেছে, ১৯৭৩ সালে দেশের উপক‚লীয় অঞ্চলে ২৮ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর জমির মধ্যে ৮ লাখ ৩৩ হাজার হেক্টর লবণাক্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়। ২০০০ সালে লবণাক্ত জমির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১০ লাখ ২০ হাজার ৭০০ হেক্টর। ২০০৯ সালের জরিপে লবণাক্ত জমি আরও বেড়ে দাঁড়ায় ১০ লাখ ৫৬ হাজার ২৬০ হেক্টর। গত ৩৬ বছরে লবণাক্ত জমি বৃদ্ধি পেয়েছে ২৬ দশমিক ৭ ভাগ। এরমধ্যে গত ১০ বছরে বেড়েছে সাড়ে ৩ শতাংশ।
গ্রীষ্মকালে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাতের কারণে দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদী-খালগুলো প্রায় শুকিয়ে তলানিতে ঠেকে যায়। তখন উজানের দিক থেকে পানির স্বাভাবিক চাপ ও প্রবাহ থাকে না। অন্যদিকে নিয়মিত প্রবল সামুদ্রিক জোয়ারের পানিতে ভরে যায় উপক‚লের নদ-নদী, শাখানদী ও খাল-খাঁড়িগুলো। সমুদ্রের নোনাপানি স্থলভাগের দিকে এগিয়ে আসে। অনেক নিম্নাঞ্চলে নোনাপানি আটকে থাকে। এরফলে লবণাক্ততা বেড়ে যায়।
তাছাড়া পদ্মা নদীর উজানে গঙ্গায় ভারত ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ ও পানির প্রবাহ আটকে রাখার কারণে দক্ষিণ-পশ্চিম, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলসহ গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় ভাটিতে অবস্থিত অনেকগুলো নদ-নদীতে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ অত্যন্ত ক্ষীণ হয়ে পড়ে। এরফলে বিস্তীর্ণ এই অঞ্চলে লবণাক্ততা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। দক্ষিণাঞ্চল থেকে লবণাক্ততা বিস্তার লাভ করেছে ক্রমশ উজানভাগে যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, বৃহত্তর কুমিল্লা-চাঁদপুরসহ উত্তর দিকে প্রায় দেড়শ’ কিলোমিটার পর্যন্ত। নোনার আগ্রাসন আরও উত্তর দিকে বিস্তারের আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
চট্টগ্রাম শহরতলীতে অবস্থিত ‘মৎস্য ব্যাংক’ খ্যাত এশিয়ায় জোয়ার-ভাটানির্ভর মিঠাপানির রুই-কাতলাসহ বড় জাতের (কার্প) মাছের সর্ববৃহৎ প্রাকৃতিক প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র ‘বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ’ ঘোষিত হালদা নদীর পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৮ পিপিটি (লবণাক্ততা পরিমাপক)। হালদা বিশেষজ্ঞ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ড. মো. মনজুরুল কিবরীয়া জানান, ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’র প্রভাবে প্রবল জোয়ারের সাথে হালদা নদীতে সমুদ্রের লবণাক্ত পানির অতিমাত্রায় অনুপ্রবেশ ঘটে। এর বিরূপ প্রভাবে মিঠাপানির রুই-কাতলা মা-মাছরা এবার (২৬-২৭ মে) ডিম ছেড়েছে সাড়ে ৬ হাজার কেজি। অথচ আগের বছর ২০২০ সালে একযুগের রেকর্ড ভঙ্গ করে ২৫ হাজার ৫৩৬ কেজি ডিম মিলেছে।
লোনার আগ্রাসনে সমগ্র উপক‚লে কৃষিসহ সবক্ষেত্রে ক্ষতিকর প্রভাব দৃশ্যমান। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, খাদ্যশস্যের নিবিড়তার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছে দক্ষিণাঞ্চল। দেশে ফসলের নিবিড়তা গড়ে ২শ’ ভাগ। কিন্তু দক্ষিণাঞ্চলে তা প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, লবণাক্ততার কবলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে কৃষি-খামার, প্রাণ-প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য। তাছাড়া খাবারের জন্য মিঠাপানি এবং কৃষিজমিতে সেচের পানির সঙ্কট হবে আরও তীব্র। অনেক প্রজাতির মিঠাপানির মাছ বিলুপ্তির পথে, আরও প্রজাতি হারিয়ে যাবে। তবে ২০৫০ সালের কথা ওই প্রতিবেদনে বলা হলেও সঙ্কট আরো দ্রত হচ্ছে। মৃত্তিকা সম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) তথ্য মতে, দেশের উপক‚লীয় অঞ্চলে কৃষি-খামার ভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতিতে বর্তমানে বড় সমস্যার কারণগুলো হচ্ছে পানির উৎসগুলোতে এবং কৃষিজমিতে ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা, লোনায় দীর্ঘ সময়ে পানিবদ্ধতা, সেচের পানিতে লবণাক্ততা। এতে করে অনাবাদী ও পতিত জমি বাড়ছে।
লবণাক্ততা কবলিত উপক‚লে রোগব্যাধির প্রকোপ বৃদ্ধি ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির সমস্যা প্রকট হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় বাংলাদেশের উপক‚লীয় এলাকায় ২০ শতাংশ প্রসূতি লবণাক্ততার কারণে অকাল গর্ভপাতের শিকার হচ্ছেন। গর্ভাবস্থায় অধিক মাত্রায় লবণাক্ত পানি পান করলে খিঁচুনি ও উচ্চ রক্তচাপ হয়। এ কারণে গর্ভাবস্থায় সন্তান মারা যাওয়ার হার বেশি। আইসিডিডিআরবি’র এক গবেষণায় বলা হয়েছে, লবণাক্ততার কারণে উপক‚লের মহিলারা অকাল গর্ভপাতের শিকার হচ্ছেন শুধু তাই নয়। একই কারণে তিন শতাংশ শিশু মারা যায়। তাছাড়া ডায়রিয়া, আমাশয়, হৃদরোগ, চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগব্যাধি বেশিমাত্রায় লক্ষ্য করা যায় উপকূলীয় অঞ্চলে।
বাংলাদেশের উপকূল, যা একসময় সবুজ ধানের দিগন্তজোড়া মাঠ আর স্বাদু পানির প্রাচুর্যের জন্য পরিচিত ছিল, আজ ক্রমশ প্রভাব বিস্তার করা লবনাক্ততার শিকার। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে কৃষিজমি ও স্বাদু পানির উৎসে লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ছে, যা গত প্রায় দুই দশকে (২০০০-২০২৫) এই অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকায় এক আমূল পরিবর্তন এনেছে। এই পরিবর্তন আমাদের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য এক অশনি সংকেতত।ছ
লবণাক্ততা উপকূলীয় কৃষিব্যবস্থার জন্য বড়ো হুমকি। এর প্রধান শিকার হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্যশস্য ধান। উচ্চ লবণাক্ততার কারণে ধানের উৎপাদন মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয় যে, কিছু এলাকায় ৪-৫ বছর ধান চাষ করা সম্ভবই হয়নি। আবার ২০২৪ এর ঘূর্ণিঝড় রেমাল তেমনই প্রভাব রেখে গিয়েছে অনেক অঞ্চলে।
লবণাক্ততা মাটির উর্বরতাকেও নষ্ট করে দিচ্ছে। এটি মাটি থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সরিয়ে ফেলে এবং উপকারী অণুজীব মেরে ফেলে। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের বেশিরভাগ চাষযোগ্য জমি বিভিন্ন মাত্রার লবণাক্ততায় আক্রান্ত। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে এখানকার মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কম এবং নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির তীব্র ঘাটতি রয়েছে।
সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে স্বাদু পানি নিয়ে। লবণাক্ত পানি ভূ-পৃষ্ঠের নদী-খাল এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে দূষিত করছে, যা সেচ ও পানীয় জলের তীব্র অভাব তৈরি করেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০৫০ সাল নাগাদ উপকূলীয় অঞ্চলে পানীয় ও সেচের পানির তীব্র সংকট দেখা দেবে। এই সম্মিলিত প্রভাব বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে
২০০০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রায় দুই দশকে উপকূলের মানুষের জীবন-জীবিকায় একটি সুস্পষ্ট পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। ঐতিহ্যবাহী কৃষি কাজ ছেড়ে মানুষ বাধ্য হয়ে অন্য পেশা বেছে নিচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ধান চাষ ছেড়ে চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষের দিকে ঝুঁকে পড়া। মাটি ও পানিতে অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণেই তারা ধান চাষের বদলে চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষে যেতে বাধ্য হয়েছেন। ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততার কারণে উপকূলের অনেক পরিবার তাদের জীবিকার ধরণ পরিবর্তন করে নিয়েছে।
চিংড়ি চাষের পাশাপাশি অনেকে দিনমজুরি, ভ্যান চালানো, দোকানদারি এবং অন্যান্য অ-কৃষি কাজে যুক্ত হচ্ছেন। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র হলো বাধ্য হয়ে অভিবাসন। কৃষিজমি হারিয়ে, মাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঘরবাড়ি হারিয়ে হাজার হাজার মানুষ ঢাকা, খুলনা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছে। এই বাধ্যতামূলক অভিবাসন কেবল তাদের অর্থনৈতিক সংকট বাড়াচ্ছে না, বরং সামাজিক বন্ধনকেও নড়বড়ে করে দিচ্ছে।
পরিবেশগত কারণ: সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তন লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশকে ত্বরান্বিত করছে। গত ২০ বছরে বাংলাদেশে ৮টি বড় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস আঘাত হেনেছে, যা কয়েক মিলিয়ন মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং উপকূলের কৃষিজমিকে লবণাক্ত পানিতে ডুবিয়ে দিয়েছে।
মানবিক ও আর্থ-সামাজিক কারণ: ফসলের ক্ষতি হওয়ায় কৃষকদের আয় কমে যাচ্ছে এবং বেকারত্ব বাড়ছে। এর চেয়েও মারাত্মক হলো স্বাস্থ্যগত ক্ষতি। লবণাক্ত পানি পান ও ব্যবহারের ফলে মানুষের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভবতী নারীদের প্রি-এক্লাম্পশিয়া ও গর্ভপাত, চর্মরোগ এবং শ্বাসকষ্টের মতো ভয়াবহ রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। এই স্বাস্থ্য ঝুঁকি এবং অর্থনৈতিক চাপ মানুষকে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য করছে।
চাহিদা ও বাজার: আন্তর্জাতিক বাজারে চিংড়ির ব্যাপক চাহিদা চিংড়ি চাষকে উৎসাহিত করেছে। অন্যদিকে, নগরায়ন গ্রামীণ মানুষকে শহরে কাজের সন্ধানে আকর্ষণ করছে, যা গ্রামের কৃষিব্যবস্থাকে দিনদিন পঙ্গু করে দিচ্ছে। এছাড়া, সরকারি সহায়তা অপর্যাপ্ত হওয়ায় কৃষকরা প্রায়ই এনজিওগুলোর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও উপকূলের মানুষ টিকে থাকার জন্য লড়াই করে যাচ্ছে। তারা লবণ-সহনশীল ধানের জাত (যেমন, ব্রি ধান-৪৭, বিনা ধান-৮) চাষ করছে, উঁচু জমিতে বা ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি আবাদ করছে এবং বৃষ্টির পানি ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
তবে অনেক অভিযোজন কৌশলই টেকসই নয়, বরং কিছু ক্ষেত্রে তা হিতে বিপরীত হচ্ছে। যেমন, চিংড়ি চাষ বিকল্প আয়ের পথ খুলে দিলেও তা জমির লবণাক্ততা আরও বাড়িয়ে তুলছে এবং পরিবেশের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করছে। এটিকে ‘ত্রুটিপূর্ণ অভিযোজন’ বা Maladaptation বলা হয়। এছাড়া, দুর্বল অবকাঠামো (নাজুক বেড়িবাঁধ যা সামান্য দুর্যোগেই ভেঙে যায়), আর্থিক ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব এবং সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয়হীনতা অভিযোজন প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে। থর
উপকূলীয় বাংলাদেশে লবণাক্ততা এখন আর কেবল একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর মানবিক ও আর্থ-সামাজিক সংকট। এই সংকট আমাদের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলেছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বিচ্ছিন্ন বা স্বল্পমেয়াদী প্রকল্প যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত, এবং দূরদর্শী কর্মপরিকল্পনা।
সমন্বিত উপকূলীয় অঞ্চল ব্যবস্থাপনা (ICZM): কৃষি, মৎস্য, স্বাস্থ্য এবং অবকাঠামো পরিকল্পনাকে এক ছাতার নিচে এনে লবণাক্ততা মোকাবিলার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো: দুর্বল বেড়িবাঁধের পরিবর্তে শক্তিশালী ও টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে।
টেকসই বিকল্প জীবিকা: চিংড়ি-কাঁকড়া চাষের মতো পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর জীবিকার পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ‘নীল অর্থনীতি’ (Blue Economy) নির্ভর জীবিকার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
পরিকল্পিত পুনর্বাসন: যারা অভিবাসনে বাধ্য হচ্ছেন, তাদের জন্য পরিকল্পিত পুনর্বাসনের আইনি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পরিবেশে যে বিপর্যয় ঘটে চলেছে তার ধাক্কা বহু আগেই লেগেছে দেশের উপকূলীয় জেলাগুলোতে। উপকূলের নদ-নদীতে দিন দিন লবণাক্ততা বেড়ে চলেছে। এতে হাজার হাজার হেক্টর জমি উর্বরতা হারাচ্ছে। সুপেয় পানির সংকট বাড়ছে। টিকে থাকার যেসব কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না ঠিকমতো। এতে বাস্তুচ্যুতির হার বাড়ছে। উপকূলীয় জেলাগুলো থেকে বস্তুচ্যুত হচ্ছে বহু মানুষ।
উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিতে লবণাক্ততার প্রভাব নিরূপণে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সেবা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান মৃত্তিকা সম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই) সম্প্রতি একটি গবেষণা পরিচালনা করেছে। তাতে দেখা গেছে, শুধু লবণাক্ততার কারণেই প্রতিবছর উপকূলীয় ১৯ জেলায় খাদ্যশস্য উৎপাদন-বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে ৩০ লাখ টনের বেশি। এসআরডিআই-এর তথ্যমতে, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের খাদ্য নিরাপত্তাসহ সার্বিক আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতেই বড় মাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে লবণাক্ততা। এ লবণাক্ততা বাড়তে থাকায় উপকূলীয় অঞ্চলের মাটিতে অণুজীবের সক্রিয়তা কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে মাটিতে কমে যাচ্ছে জৈব পদার্থ, নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের সহজলভ্যতাও। এর বিপরীতে বাড়ছে কপার ও জিংকের মাত্র।
গত ২২ জানুয়ারি ‘সাতক্ষীরার উপকূলীয় কৃষি জমিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রভাব’ বিষয়ক এক মতবিনিময় সভায় উঠে এসেছে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার সুদূর প্রসারী ফলাফলের চিত্র। সভায় বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সাহানোয়ার সাঈদ শাহীন মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন।

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।