1. mesharulislammonir1122@gmail.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন
  2. info@www.sangjogprotidin.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন :
বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫০ পূর্বাহ্ন

উপকূলে জীবনের লড়াই ক্রমেই কঠিন হচ্ছে

  • প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬
  • ২৫ বার পড়া হয়েছে

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতের পর থেকে চার বছর ধরে কপোতাক্ষ নদের বেড়িবাঁধের ওপর ঝুপড়িতে বাস করছেন খুলনার কয়রার কাটমারচর গ্রামের সাইফুল্লাহ ঢালীর পরিবার
২০২০ সালে ঘূর্ণিঝড় আম্পানে কপোতাক্ষ নদের বেড়িবাঁধ ধসে লবণ পানি প্রবেশ করেছিল গ্রামে। লবণ পানির নিচে ডুবে গিয়েছিল গ্রামের পর গ্রাম। সেই থেকে গ্রামের সবুজ হারিয়ে গেছে। লবণাক্ততায় গ্রামে ধান চাষ করা সম্ভব ছিল না। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে ধানের জমিতে চিংড়ি চাষ শুরু করে। আম্পান এলাকার দৃশ্যপট বদলে দিয়েছে।
কথাগুলো বলছিলেন খুলনার সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় উপজেলা কয়রার কাটমারচর গ্রামের বাসিন্দা আবুল কাশেম। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তাণ্ডবের চার বছর আজ সোমবার। ২০২০ সালের এই দিনে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে আঘাত হানে আম্পান। এতে কয়রার চারটি ইউনিয়ন বিধ্বস্ত হয়। ঘূর্ণিঝড়ে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে মানুষের ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, চিংড়ির খামার, পুকুর, ডোবা—সবকিছু তলিয়ে যায়। চার বছর পরও এই অঞ্চলের মানুষ আম্পানের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। সে কথাই বলছিলেন আবুল কাশেম।
রোববার কয়রার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কৃষক আবুল কাশেমের কথাগুলোর সঙ্গে মাঠের দৃশ্যপটের হুবহু মিল দেখা যায়। লবণাক্ততার কারণে অনেক মাঠে এখন আর সবুজ নেই। অনেক এলাকার জমি ও চিংড়ির ঘের এখনো চাষের উপযোগী হয়নি। আম্পানে বাড়িঘর হারানো অনেকে বেড়িবাঁধের ওপর ঝুপড়ি তুলে বসবাস করছেন। কৃষক বা চিংড়ির ঘেরের মালিকদের অনেকে এখন দিনমজুর। কেউ কেউ সুন্দরবনে মাছ-কাঁকড়া ধরে সংসার চালাচ্ছেন। অনেকে এলাকা ছেড়ে শহরে পাড়ি দিয়েছেন।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, আম্পানে কয়রার উত্তর ও দক্ষিণ বেদকাশী এবং কয়রা সদর ইউনিয়নে ব্যাপক ক্ষতি হয়। আংশিক ক্ষতি হয় মহারাজপুর ইউনিয়নে। এতে উপজেলার দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছিলেন। আংশিক ও সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ঘরবাড়ির সংখ্যা ছিল ৩৮ হাজার। এ ছাড়া ৩ হাজার হেক্টর ফসলি ও ৪ হাজার হেক্টর জমির মাছের ঘের লোনাপানিতে তলিয়ে গিয়েছিল।
গতকাল দিনভর কয়রার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কাটমারচর, হাজতখালী, গাতিরঘেরী, হরিণখোলাসহ বিভিন্ন এলাকায় আম্পানের সময় কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদীর বাঁধ ভেঙে স্রোতের তোড়ে তৈরি হওয়া খালগুলোতে এখনো পানি থই থই করছে। বহু মানুষ এখনো আছেন বেড়িবাঁধের ওপর ঝুপড়িতে।
কপোতাক্ষপাড়ের কাটমারচর গ্রামের বেড়িবাঁধে দাঁড়িয়ে কথা হয় সাইফুল্লাহ ঢালীর সঙ্গে। বড় ঝড় আসছে, জোয়ারের পানি বাড়ছে দ্রুতগতিতে। এসব জেনেও সেদিন স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে বাড়িতেই ছিলেন তিনি। মধ্যরাতে হঠাৎ পানির শব্দে ঘরের বাইরে এসে টর্চলাইটের আলোয় দেখেন বিকট শব্দে নদের বাঁধ ভেঙে পানির স্রোত আসছে বাড়ির দিকে। পড়িমরি করে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে বাড়ির কাছে একটি একতলা স্কুল ভবনে গিয়ে আশ্রয় নেন। অল্প সময়ে সেই ভবনের নিচতলা পানিতে ডুবে যায়। অবশেষে সাইফুল্লাহ ঢালী এবং তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যরা কপোতাক্ষ নদীর তীরে বেড়িবাঁধের ওপর আশ্রয় নেন। সেই রাত থেকে এখন পর্যন্ত তাঁরা সেখানেই বাস করছে।
সাইফুল্লাহ ঢালী বলেন, ‘আম্পানের আগে দিনমজুরি করতাম, যা উপার্জন হতো, তাতে ভালোই চলত সংসার। কিন্তু আম্পান আমার সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এখন কিছুই নাই। ঝড়ের রাতে ঘাড়ে আঘাত পেয়েছিলাম। সেই থেকে শক্ত কাজ করতে পারি না। এখন নদীতে মাছ ধরে কোনোমতে সংসার চালাই।’
হাজতখালী গ্রামে গিয়ে কথা হয় পরিমল মণ্ডলের সঙ্গে। তিনি বলেন, একসময় তাঁদের সবই ছিল। আম্পানের রাতে কপোতাক্ষ নদের বাঁধ ভেঙে সব শেষ হয়ে যায়। চার বিঘা জমির ভিটাবাড়ির মাত্র ৩ শতাংশ আছে। বাকিটা আম্পানের প্রবল স্রোতে ভেসে গেছে। বেড়িবাঁধ ভেঙে গোটা গ্রাম পানিতে ভেসে যায় সেদিন। হাজতখালী, কাটমারচর, উত্তর বেদকাশী এবং অন্যান্য গ্রামের বহু পরিবারের ঠাঁই হয় বেড়িবাঁধে। টানা ছয় মাস ধরে ঠিকমতো কেউ রান্না, খাওয়াদাওয়া করতে পারেনি। পরে নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী অনেক পরিবার নতুন করে ঘরবাড়ি তৈরি করে বাড়ি ফিরেছে, অনেকে অন্যত্র চলে গেছে, তবে উপায় না থাকায় এখনো অনেকেই রয়ে গেছে বাঁধের ওপর।
উপজেলার কাশির হাটখোলা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, হাটের সারি সারি খুপরি দোকানগুলোতে পরিবার নিয়ে বাস করছে চার বছর আগে আম্পানে গৃহহারা কয়েকটি পরিবার। সেখানে কথা হয়, ‘ফুলবাসি সরদারের সঙ্গে। তিনি বলেন, আগে জমি, বসতভিটা সবই ছিল আমাদের। এখন আমরা হাটখোলার খুপরি ঘরের বাসিন্দা।’
খাশিরহাটখোলা এলাকার নিলকান্ত সরদার জানান, আম্পানে ভেঙে যাওয়া কয়রা-কাশিরহাট সড়কটি চার বছরেও সংস্কার হয়নি। এখানে নেই চিকিৎসার সুব্যবস্থা। অনেক জায়গায় সুপেয় পানির সংকট তীব্র। এলাকার বেড়িবাঁধগুলোর অবস্থাও নাজুক। সরকারের কাছে পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ ও টেকসই বেঁড়িবাধ নির্মাণের দাবি এলাকাবাসীর।
বিজ্ঞাপন
কয়রা সদর ইউনিয়নের গোবরা গ্রামের বয়োবৃদ্ধ আত্তাপ আলী শেখ বলছিলেন, কেবল আম্পানই যে তাঁদের নিঃস্ব করেছে তা নয়। আম্পানের পর কয়েকটি বড় দুর্যোগ মোকাবিলা করে টিকে থাকতে হয়েছে তাঁদের। বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের ছোবলে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে এলাকা। এসব দুর্যোগ নতুন দুর্ভোগের মুখোমুখি করেছে মানুষকে।
কয়রা সদর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এস এম বাহারুল ইসলাম বলেন, আম্পানের ক্ষত এখনো শুকায়নি। একের পর এক দুর্যোগের হানায় অসহায় মানুষেরা যে যেভাবে পারছে বেড়িবাঁধে আশ্রয় নিয়েছে। এলাকায় লবণাক্ততা ও কাজের অভাবে মানুষ বাইরে চলে যাচ্ছে। আম্পানের পর ভেঙে যাওয়া নদীর বেড়িবাঁধ সংস্কার করা হলেও কয়েকটি স্থানের বেঁড়িবাধ এখনো রয়েছে জরাজীর্ণ অবস্থায়। স্থায়ী টেকসই বেড়িবাঁধের দাবি এলাকাবাসীর।
কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এই প্রতিবেদক ‌জামান বলেন, উপজেলাটি তিন দিক থেকে নদীবেষ্টিত। যে কারণে ছোটখাটো দুর্যোগেও প্লাবিত হয়ে পড়ে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ে। দুর্যোগে এসব ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে পুনর্বাসনে সরকারের পাশপাশি বেসরকারি কয়েকটি সংগঠন তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। বেড়িবাঁধে বসবাসকারী লোকজনকেও পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে।
খুলনার উপকূলঘেরা জনপদে বাস্তবতা যেন একই সঙ্গে দুটি ভিন্ন পৃথিবীর ছবি। একদিকে নির্বাচনের মৌসুমে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি, ঝলমলে পোস্টার আর ব্যানারে ভরা সড়ক; অন্যদিকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরেই উপকূলবাসীর উঠোনে নোনাজল, ভাঙা বেড়িবাঁধের ফাঁক গলে ঢুকে পড়ছে নদীর গর্জন। রাতভর মানুষ ছুটছে বালুভর্তি বস্তা কাঁধে নিজেদের ঘর, জমি আর ভবিষ্যৎ বাঁচানোর জন্য। উন্নয়ন যেন কাগজে আটকে আছে আর দুর্ভোগের বাস্তবতা রয়ে গেছে মাটিতেই।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই উপকূলীয় অঞ্চল শুধু প্রকৃতির প্রতিকূলতার নয়, বরং দীর্ঘদিনের নীতিগত অবহেলারও শিকার। নদীভাঙন, লবণাক্ততা, সুপেয় পানির সংকট, ভঙ্গুর বেড়িবাঁধ ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এই সংকটগুলো হঠাৎ তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর ধরে পরিকল্পনার ঘাটতি, দুর্বল বাস্তবায়ন ও দায় এড়ানোর সংস্কৃতি এগুলোকে আরও গভীর করেছে।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল রক্ষায় নির্মিত ১,০১৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলের মানুষের জন্য জীবনরক্ষাকারী অবকাঠামো হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে এই বাঁধগুলোর অন্তত তিন-চতুর্থাংশই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। স্থানীয়দের কাছে বাঁধ শব্দটি এখন নিরাপত্তার প্রতীক নয়, বরং আশঙ্কার করেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নদীর স্রোত বেড়েছে, জোয়ারের উচ্চতা অস্বাভাবিক হয়েছে, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতাও বাড়ছে। এসব বাস্তবতায় বাঁধ নির্মাণে প্রয়োজন ছিল আধুনিক নকশা, জিওটেক্সটাইল ব্যবহার, প্রশস্ত স্লোপ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, অধিকাংশ মেরামত কাজই হয় স্বল্পমেয়াদি চিন্তা থেকে সঙ্কুচিত বাজেট, দুর্বল তদারকি ও রাজনৈতিক প্রভাবের সমন্বয়ে।
ফলে বর্ষা বা জোয়ার এলেই বাঁধ ভেঙে পড়ে। কয়রা, দাকোপ, পাইকগাছা কিংবা বটিয়াঘাটার বহু গ্রামে একই দৃশ্য নদীর পানি ঢুকে ফসলি জমি নষ্ট হয়, ঘরবাড়ি ভেঙে যায়, মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।
কয়রা মহেশ্বরীপুরের বাসিন্দা হালিমা খাতুন বললেন, আমাদের ঘর ছিল ওইখানে, এখন সব গাঙ হয়ে গেছে। বছর বছর পানি আসে, জমি যায়। সরকার বদলায় কিন্তু আমাদের ভাগ্য বদলায় না।
খুলনা-৬ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মনিরুল হাসান বাপ্পি বলেন, নির্বাচিত হলে তার প্রথম কাজ হবে ভৈরব নদে একটি সেতু নির্মাণ এবং নিরাপদ সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, কয়রা ও পাইকগাছার মানুষকে চিকিৎসার জন্য ১০৪ কিলোমিটার ভাঙাচোরা রাস্তা পাড়ি দিয়ে খুলনা শহরে আসতে হয়। এই দুর্ভোগ লাঘবে ওই এলাকায় ২৫০ শয্যার একটি আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে স্থানীয় মানুষ নিজ এলাকাতেই চিকিৎসাসেবা পেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার চিন্তাও রয়েছে। এতে সারা দেশের মানুষ কয়রা-পাইকগাছায় আসবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে যারা এলাকা ছেড়ে শহরে চলে গেছে, তারা আবার নিজ এলাকায় ফিরে আসবে, বলেন তিনি।
মনিরুল হাসান বাপ্পি বলেন, আমরা একটি আধুনিক, পরিকল্পিত ও মডেল কয়রা-পাইকগাছা গড়ে তুলতে চাই।
উপকূলীয় খুলনার সবচেয়ে নীরব কিন্তু ভয়ংকর সংকট হলো লবণাক্ততা। মাটি ও পানিতে লবণের মাত্রা বাড়তে থাকায় সুপেয় পানির সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বর্ষা ছাড়া বছরের অধিকাংশ সময় টিউবওয়েলের পানি নোনা, পুকুর ও জলাশয়ের পানি পানযোগ্য নয়।
সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কিছু এলাকায় রিভার্স ওসমোসিস (আরও) প্লান্ট বসানো হলেও সংখ্যায় তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। অনেক প্লান্ট আবার রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অচল হয়ে পড়ে আছে। ফলে নারীদের কিলোমিটার পর কিলোমিটার হাঁটে পানি সংগ্রহ করতে হয়, যা তাদের সময়, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন লবণাক্ত পানি পান করার ফলে উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভকালীন জটিলতা, কিডনি ও ত্বকজনিত রোগ বাড়ছে। অথচ নিরাপদ পানির স্থায়ী সমাধানে বড় মাপের সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প এখনও আলোর মুখ দেখেনি।
গ্রামীণ উপকূলের বাইরে শহর খুলনাও ভিন্ন কোনো স্বস্তির জায়গা নয়। মহানগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, জলাবদ্ধতা ও যোগাযোগ অব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক এলাকায় পরিকল্পিত ড্রেন নেই, যেখানে আছে সেগুলোও ভরাট ও অকার্যকর।
বর্ষাকালে সামান্য বৃষ্টিতেই সড়ক ডুবে যায়, ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ে। এক স্থানীয় ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ড্রেনেজের সমস্যাটা কোনো সরকারের সময়ই সমাধান হয়নি। আমরা পানি সহ্য করি, যানজট সহ্য করি নেতারা শুধু নির্বাচনের সময় এসবের কথা বলেন।
একসময়ের শিল্পনগরী খুলনা আজ বন্ধ হয়ে যাওয়া সরকারি জুটমিলের ভার বইছে। খালিশপুর ও দৌলতপুর এলাকার হাজারো শ্রমিক পরিবার কর্মসংস্থান হারিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়েছে। নতুন শিল্প স্থাপনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি সীমিত।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে খুলনার উপকূলীয় ছয়টি আসন ও মহানগরে প্রায় ২০ লাখ ভোটার আবারও আশার আলো দেখছেন। তবে সেই আশার সঙ্গে রয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা ও অনাস্থা।
এক সাবেক জুটমিল শ্রমিকের ভাষায়, ভোটে উৎসাহ নাই। উৎসাহ আছে কবে আমাদের মিল চালু হবে। যে নেতৃত্ব মিল চালু করবে, তাকেই ভোট দেব। এই বক্তব্য শুধু একজনের নয়, এটি হাজারো মানুষের দীর্ঘদিনের হতাশার প্রতিফলন।
প্রার্থীরা অবশ্য প্রতিশ্রুতির ঝুলি খুলে বসেছেন টেকসই বেড়িবাঁধ, লবণাক্ততা মোকাবিলায় পানি ব্যবস্থাপনা, আধুনিক হাসপাতাল, কর্মসংস্থান। খুলনা-৩ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী রকিবুল ইসলাম বকুল বলেন, এই অঞ্চলে আধুনিক হাসপাতাল নেই। নির্বাচিত হলে এটি হবে আমার প্রথম কাজ। কিন্তু স্থানীয়দের প্রশ্ন এই প্রতিশ্রুতিগুলো কি আগের মতোই কাগজে থেকে যাবে, নাকি বাস্তবায়নের মুখ দেখবে? খুলনার মানুষের জীবন মানেই প্রতিদিনের লড়াই নদীভাঙন, লবণাক্ততা, নিরাপদ পানির সংকট, ভঙ্গুর বেড়িবাঁধ আর কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে। তবু নির্বাচন এলেই তারা আবারও আশা করেন হয়তো এবার কেউ তাদের কথা শুনবে। ২০ লাখ ভোটারের এই জেলা এখন অপেক্ষায় কে আসবে শুধু আশ্বাস দিতে নয়, বরং সমাধান, প্রকল্প, বাজেট ও বাস্তবায়নের স্পষ্ট রূপরেখা নিয়ে? উত্তর মিলবে ভোটকেন্দ্রে। আর মানুষের প্রত্যাশা একটাই নিরাপদ বেড়িবাঁধ, সুপেয় পানি এবং সম্মানজনক জীবনের টেকসই ভবিষ্যৎ।জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা ও ঘনত্ব ক্রমেই বাড়ছে। প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা ও খরায় দেশের উপকূল ও নদীবিধৌত (উপকূলীয়) অঞ্চলের মানুষ হারাচ্ছে বসতভিটা ও জীবিকা। এর ফলে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। একাধিক গবেষণা সংস্থার আশঙ্কা, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশে দেড় কোটির বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে। বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে বছরের পর বছর জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা হলেও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য কার্যকর সমাধান এখনো অধর।
সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, গত ৩০ বছরে দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। একের পর এক ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, অস্বাভাবিক বন্যা ও খরার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ ভিটেমাটি ও সহায়-সম্বল হারাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে উপকূলীয় নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। উপকূলজুড়ে ‘জীবনের লড়াই’ দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে জাতীয় অর্থনীতিতেও।
লবণাক্ততার আগ্রাসন, নদী-খাল ও জলাশয় দখল ও দূষণের কারণে বহু মানুষ পেশা হারাচ্ছে। নিরুপায় হয়ে তারা এক জেলা থেকে অন্য জেলা কিংবা রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরে আশ্রয় নিচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রায় ৬০ শতাংশ ঢাকায়, ২০ শতাংশ চট্টগ্রাম নগরে এবং বাকি ২০ শতাংশ অন্যান্য জেলায় অভিবাসী হয়েছে।
‘ক্লাইমেট ভালনারেবিলিটি অ্যান্ড রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট ইন লো-লাইং কোস্টাল সিটিজ অব বাংলাদেশ ইউজিং অ্যানালিটিক হায়ারার্কিক প্রসেস’ শীর্ষক একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেশের ২২টি শহরের ঝুঁকির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর জার্নাল অব ওয়াটার অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ-এ প্রকাশিত এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর একদল গবেষক। গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু ঝুঁকির প্রকৃত প্রভাব মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কতটা ভয়াবহ, তা শুধু সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
ইন্টারন্যাশনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টার-এর তথ্যানুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে ২০৫০ সালের মধ্যে নতুন করে এক কোটি ৩৩ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে উন্নয়ন সংস্থা কারিতাস বাংলাদেশ জানিয়েছে, একই সময়ের মধ্যে দেশের প্রায় দুই কোটি ৬০ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হতে পারে। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার বস্তিবাসীদের প্রায় ৭০ শতাংশই পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে নিজ এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
জলবায়ু সচেতনতা ও সুন্দরবন-উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক সাংবাদিক শুভ্র শচীন বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশ। উপকূলীয় অঞ্চলে ঘন ঘন দুর্যোগ, লবণাক্ততা, নদীভাঙন ও পানির সংকট মানুষের জীবনযাত্রাকে চরমভাবে প্রভাবিত করছে।” তিনি আরও বলেন, কৃষিনির্ভর এলাকার মানুষ কাজ হারিয়ে শহরমুখী হচ্ছে—কেউ একা, কেউ পরিবারসহ। এতে জলবায়ু উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, যা একটি গভীর সামাজিক সংকটের দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ হিসেবে মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। ক্লাইমেট সেন্ট্রালের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশসহ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৩৪ শতাংশ ৩০ দিনেরও বেশি সময় ধরে মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ তীব্র তাপমাত্রার মধ্যে বসবাস করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাধার ভরাট, বন উজাড় ও অতিমাত্রায় কার্বন নিঃসরণ দেশের পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করছে। একটি আদর্শ শহরে যেখানে কমপক্ষে ২৫ শতাংশ সবুজ এলাকা থাকার কথা, সেখানে দেশের কোনো শহরেই সেই মানদণ্ড পূরণ হচ্ছে না। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় এখনই পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যৎ সংকট আরও গভীর হবে—এমন সতর্কবার্তাই দিচ্ছেন পরিবেশবিদরা।
কেউ কেউ শহরের দিকে পা বাড়াচ্ছে। কৃষক আর চাষাবাদের দিকে এগোয় না। চাষাবাদের মাধ্যমে দেনাপাওনা পরিশোধ করা কষ্টকর হয়ে ওঠে। তারা পিতৃভূমি হারিয়ে ফেলছে। ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। প্রাকৃতিক সম্পদ হ্রাস পাচ্ছে। বিশুদ্ধ খাবার পানিরও সংকট দেখা দিচ্ছে। দেশের উপকূলের ১৯ জেলায় ৪ কোটির বেশি মানুষের বসবাস; যা দেশের আয়তনের শতকরা ৩২ ভাগ। উপকূল অঞ্চলের একটি সম্প্রদায় মুন্ডা। ধারণা করা হয়, জঙ্গল পরিষ্কারের জন্য ভারত থেকে ৩০০ বছর আগে এ ভূখণ্ডে আসে তারা। বর্তমানে এদের অবস্থান খুলনা বিভাগের বেশ কয়েকটি জায়গায়। তার মধ্যে খুলনার কয়রা ও ডুমুরিয়া এবং সাতক্ষীরার দেবহাটা ও তালা উপজেলা উল্লেখযোগ্য। পেশা হিসেবে এরা বেশিরভাগই দিনমজুরি করে। অনেকে আবার সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। সুন্দরবনের ওপর নির্ভর বলতে মূলত মধু সংগ্রহ, মাছ শিকার এসব। তবে বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য তাদের স্বাভাবিক জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে।
প্রতিকূল পরিবেশে কঠোর পরিশ্রম করতে পারায় তৎকালীন শাসকরা সুন্দরবনের গাছ কেটে বসতি গড়তে মুন্ডাদের এ দেশে এনেছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে। তারপর আর ফিরে যাওয়া হয়নি তাদের। আজও সুন্দরবন ঘিরেই তাদের জীবনমরণ। তবে ভালো নেই তারা। সুন্দরবনসংলগ্ন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কালিঞ্চি, ভেটখালী, তারানিপুর, সাপখালী, ধুমঘাট, মুন্সিগঞ্জ, কাশিপুর, কচুখালী এলাকায় বসবাস করে মুন্ডারা। জেলার দেবহাটা ও তালা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে মুন্ডাদের বসতি। সাতক্ষীরা উপকূলে মুন্ডা জনগোষ্ঠী রয়েছে আড়াই সহস্রাধিক। এ ছাড়া খুলনার কয়রা ও ডুমুরিয়া উপজেলায় তাদের বসতি রয়েছে। বাংলাদেশের বৃহত্তর ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনেও এদের বসতির চিহ্ন মেলে। কম্পাট মুন্ডা, খাঙ্গার মুন্ডা, খাড়িয়া মুন্ডা, পাথর মুন্ডা, দেরগে মুন্ডা, সাঙ্কা মুন্ডা ও মাঙ্কী মুন্ডা- বাংলাদেশে এ সাত মুন্ডা গোষ্ঠীর উল্লেখ পাওয়া যায়। সুন্দরবন এলাকার মুন্ডাদের জীবনজীবিকা বনের ওপরই নির্ভরশীল।
মুন্ডা পরিবারের ৯৫ শতাংশ ভূমিহীন। অশিক্ষা, অজ্ঞতা ও অভাব পুঁজি করে সৃষ্টি হয়েছে এ সম্প্রদায়ের কষ্টের জীবন। জমিজমা যা ছিল তা-ও হারিয়েছে নানা কারণে। বর্তমানে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাতে হয় অধিকাংশকে। আগে মুন্ডাদের প্রধান জীবিকা ছিল সুন্দরবনের গাছ কাটা। বিশেষ করে গোলপাতা ও গরান কাঠ কাটা ছিল তাদের অন্যতম কাজ। বর্তমানে অনেকে আদি পেশা ছেড়ে ভিন্ন পেশায় যুক্ত। বাঙালির মতো মুন্ডারা কৃষিকাজে নিয়োজিত হলেও অধিকাংশই ভূমিহীন। তাই এ অঞ্চলের মুন্ডারা দিনমজুরির ভিত্তিতে মাছ ধরে। অন্যের জমিতে বেতনভুক কাজ, নৌকা নির্মাণ, কাঠমিস্ত্রির কাজ করে। পরিবেশের বিপর্যয়ে প্রভাব পড়েছে মুন্ডা নারীদের জীবনেও। মুন্ডা নারীরাও আজ ঘরের বাইরে নানা কাজ করে। জাল বোনা, সুন্দরবনের নদী-খালে মাছ- কাঁকড়া ধরা, মৌ সংগ্রহসহ সব ধরনের কাজে দেখা যায় মুন্ডা নারীদের। এ ছাড়া গৃহপালিত পশুর দেখভাল, কৃষি থেকে শুরু করে নানা কাজে অংশ নেয় তারা।
‘ইটভাটার কাজ কী আমরা জানতাম না, আইলার পর আমাদের চারপাশের অনেকেই এখন ইটভাটায় কাজ করি। কার ইচ্ছা করে বলুন নিজের বাড়ি ছেড়ে দূরে কাজ করতে যেতে। তাও আমাদের যেতে হয়, পেটের ক্ষুধা তো কারও কথা শোনে না। আগে কত ভালো সময় ছিল, আমরা চাষাবাদ করতাম। যদিও অন্যের জমিতে ফসল ফলাতাম তাও পরিবারের সঙ্গে থাকতে তো পারতাম। আমাদের সম্প্রদায়ের যারা এ অঞ্চলে থাকি, তাদের বেশিরভাগেরই সেই অর্থে চাষের জমি নেই। যতটুকু আছে, আমরা চেষ্টা করতাম ফসল ফলাতে। আমরা প্রতিদিন মজুরির ভিত্তিতে কাজ করি, সেটা হতে পারে কৃষিকাজ, মাছ চাষ কিংবা অন্য কোনো টুকিটাকি কাজ। আর সেজন্যই আমরা এ এলাকায় দিনমজুর হিসেবে পরিচিত।
এখনও কিন্তু আমরা দিনমজুরি করি, তবে আমাদের এখানে ফসল উৎপাদন কম কারণ কয়েক দিন পরপর ঘূর্ণিঝড়, বন্যার প্রকোপ ঘটে। আর এসব কিছু মানেই আপনারা জানেন আমাদের লোকালয়ে লবণপানির প্রবেশ। পুরো এলাকায় আপনি যেখানে যাবেন সেখানে অতিরিক্ত লবণাক্ততার জন্য জমির ফসল হয় না, এ গল্প শুনবেন। আমাদের এ অঞ্চলের চারদিকে নদীতে যখন বন্যা হয়, পাড় ভেঙে গিয়ে লবণপানি লোকালয়ে প্রবেশ করে। তবে অনেকে আবার চিংড়ি চাষের জন্য নিজেরাও নালা কেটে লবণপানি প্রবেশ করায়। এ সমস্যা না হয় আমরা কিছু একটা করে বন্ধ করতে পারি, কিন্তু দিনে দিনে নদীর পানির সঙ্গেও তো লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে, এ সমস্যা কী করে সমাধান করব, তা জানা নেই। আর সমস্যা তো একটা না, ওই আইলার পর থেকে নানান ধরনের রোগ আমাদের দেখা দিচ্ছে। চুলকানি থেকে শুরু করে পেটের রোগ, জ্বর কী নেই তার মধ্যে। আমাদের মেয়েরা আরও বেশি ধুঁকছে বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যায়। এ অঞ্চলে শুধু আমরা মুন্ডারা না, সব মেয়ের বাচ্চা জন্মানোর সময় সিজার করতে হয়। যাতে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মও বিপদের মুখে। আর এসবের ফলস্বরূপ আমাদের ছেলেমেয়েরাও ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারছে না, হয়তো তারাও ভবিষ্যতে আমাদের মতো দিনমজুর হবে।’ কথাগুলো বলছিলেন শরৎ মুন্ডা, যার বাস খুলনার কয়রা উপজেলার টোপখালী। পেশায় দিনমজুর।
পোড়াকাটলা এলাকার বাসিন্দা মিতা রানী (৪৫) বলেন, ‘আমার তলপেট খুব ব্যথা করে, কোমরের অংশ অবশ হয়ে যায়, মনে হয় পেটের ভেতর থেকে কিছু একটা ছিঁড়ে নিচে নেমে আসছে। তা ছাড়া প্রচণ্ড সাদা স্রাব হয় আর চুলকায়। ঘন ঘন প্রস্রাব হয়। আর প্রসাব করতেও খুব কষ্ট হয়। গ্রামের ডাক্তাররা জরায়ু কেটে ফেলার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু এ বয়সে অপারেশন করাতে স্বামী রাজি হননি। আপাতত চিকিৎসা নিচ্ছি। কিন্তু খুব বেশি হলে ১০-১৫ দিন ভালো থাকি।’
শেফালী বেগম (৩৮) বলেন, ‘আমার আমার বাড়ি সাতক্ষীরার দাতিনাখালী। ফলে জন্ম থেকেই নোনা পানির সঙ্গে বসবাস। তবে আগের তুলনায় যেন নোনাভাব বেড়েছে। আস্তে আস্তে নোনাভাব এত বাড়ে যে পুকুরের পানি মুখেই নিতে পারি না। অথচ তাতেই গোসলসহ সব কাজ করতে হয়। আমাদের চর্মরোগ ও জরায়ুতে সমস্যা হচ্ছে।’
ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কসংকেত পেলেই ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে হয় উপকূলের মানুষকে
পরিবেশকর্মীদের একাধিক গবেষণায় দেখা যায়, উপকূলীয় এলাকায় নোনা পানিতে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে নারীরা। এতে তাদের জরায়ুতে নানা রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়মিত ঋতুস্রাব, গর্ভকালীন খিঁচুনি, গর্ভপাত এমনকি অপরিণত শিশু জন্মের হার বেড়েছে। এ ছাড়া দৈনন্দিন গৃহস্থালি কাজ, গোসল, কৃষি, গবাদি পশু পালন, চিংড়ির পোনা ধরাসহ অন্যান্য অর্থনৈতিক কাজে লবণাক্ত পানি ব্যবহারের কারণে নারীরা লিউকোরিয়াসহ সাধারণ পানিবাহিত বিভিন্ন রোগ ও চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা, স্বাস্থ্যকর্মী এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় অঞ্চলের অনেক নারীকে অল্প বয়সে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জরায়ু অপসারণ করতে হচ্ছে।
তারা বলছেন, বাংলাদেশের এ অংশে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়া এবং সে লবণাক্ত পানির অত্যধিক সংস্পর্শের ফলে এ সমস্যা বেড়েই চলেছে। শারীরিক নানা অসুস্থতার কারণে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদ। আবার কম বয়সে মুখে কালো ছোপ পড়া এবং শরীরের রঙ কালো হয়ে যাওয়ায় বাল্যবিবাহ বেড়েছে। মেয়েকে বিয়ে দিয়ে বোঝামুক্ত হতে চান অভিভাবকরা, সাতক্ষীরার অনেক গ্রামেই অবিবাহিত কোনো কিশোরী নেই বললে চলে।
করোনাকালে স্কুল বন্ধ থাকার সময় বাড়ির কাজ আর খেলাধুলা করেই কাটছিল হাওয়ালভাঙ্গি আটুলিয়ার মনিরা খাতুনের (১৩)। হঠাৎ এক সন্ধ্যায় আত্মীয়ের বাড়িতে নেওয়া হয়। সে জানতে পারে একটু পরই তার বিয়ে। এ উপকূলে তার মতো বাল্যবিবাহের শিকার আছিয়া খাতুন (১৭), কারিশমা (১৬), সোনিয়া খাতুন (১৫), লাকি আক্তার (১৭) ও তানিয়া (১৬)।
বাল্যবিবাহের এ চিত্র বাংলাদেশের দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় অঞ্চলে বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিম খুলনায় খুবই সাধারণ। দারিদ্র্য এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে বাল্যবিবাহের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। করোনা মহামারির পর তা বহুগুণে বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের অন্যতম সাতক্ষীরায় বাল্যবিয়ে প্রায় ঘরে ঘরে। তা ছাড়া লবণাক্ততার কারণে কৃষিজমি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পুরুষের বড় একটা অংশকে পরিবার ছেড়ে শহরে কাজ করে।

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।