1. mesharulislammonir1122@gmail.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন
  2. info@www.sangjogprotidin.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন :
শনিবার, ০১ অগাস্ট ২০২৬, ১০:৪৮ পূর্বাহ্ন

আদি পিতা আদম আঃ সালামের জীবন বৃত্তান্ত পর্ব ৮

  • প্রকাশিত: শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩০ বার পড়া হয়েছে

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : শব্দটি আরবী ধাতু হইতে নির্গত, যাহার অর্থ সংবাদ। নবীগণ যেহেতু আল্লাহর পক্ষ হইতে সংবাদ বাহকের দায়িত্ব পালন করেন, এইজন্য তাহাদিগকে নবী (বহুবচনে আম্বিয়া) বলা হইয়া থাকে।
আল্লামা রাগিব ইসফাহানী বলেন : “নবুওয়াত হইতেছে আল্লাহ ও তদীয় বোধসম্পন্ন বান্দাদের মধ্যকার দৌতৗকর্ম, যাহাতে তাহাদের পরকাল ও ইহকালের জীবনের ব্যাধিসমূহ দূরীভূত হয়।”
কিন্তু নবী শব্দটি তিনি ১৯ বিহীনভাবে -রূপে লিখিয়াছেন এবং ইহার আলোচনায় লিখিয়াছেন : নবী শব্দটি  বিহীন, তবে ব্যাকরণবিদগণ বলিয়াছেন মূলে ছিল, পরে তাহা পরিত্যক্ত হয়। কতক আলিম বলিয়াছেন, শব্দটি আরবী শব্দমূল হইতে উদ্ভূত, যাহার অর্থ সমগ্র মানব সমাজে উচ্চ মর্যাদার আসন। দলীল হইতেছে আল্লাহর বাণী :
“আমি তাহাকে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী করিয়াছি” (১৯ : ৫৭)।
সুতরাং  বিহীন শব্দটি যুক্ত হইতে বলিষ্ঠতর। কেননা : যাহার সংবাদ দেওয়া হয় তাহার সবটাই মর্যাদাপূর্ণ বা গুরুত্বপূর্ণ হয় না। এইজন্যই নবী করমী (স) যখন লক্ষ্য করিলেন যে, এক ব্যক্তি তাঁহাদের প্রতি বিদ্বেষবশত তাঁহাকে । যোগ UI বলিয়া সম্বোধন করিল তখন সাথে সাথে তিনি বলিয়া উঠিলেন? ওহে, আমি  নহি, আমি হইতেছি  (আল-মুফরাদাত ফী গারীবিল কুরআন, পৃ. ৪৮২, বৈরূত সং)।
রাসূল শব্দটি আরবী শব্দমূল হইতে নির্গত, যাহার অর্থ দৌত্যকর্ম বা সংবাদ বহন করা। রাসূলগণ যেহেতু সৃষ্টিজগতের নিকট আল্লাহ তাআলার পয়গাম বহন করিয়া আনেন, তাই তাঁহাদিগকে রাসূল বলা হইয়া থাকে। মূলত নবী ও রাসূল শব্দ দুইটি প্রায় অভিন্ন অর্থ বহন কারিলেও উভয়ের মধ্যে পরিভাষাগত কিছুটা পার্থক্য বিদ্যমান। আল্লামা তাফতানী (র) বলেন :
“রাসূল হইতেছেন সেই সত্তা যাঁহাকে আল্লাহ তাআলা তাঁহার সৃষ্ট জগতের প্রতি তাঁহার বিধিবিধানের প্রচারের জন্য প্রেরণ করিয়াছেন। তাঁহার প্রতি কিতাব নাযিলের শর্ত আরোপ করা হইয়া থাকে অর্থাৎ তাঁহার প্রতি কোন কিতাব অবতীর্ণ হইলেই কেবল তাঁহাকে রাসূল বলা যায় । পক্ষান্তরে নবীর কিতাব লাভ শর্ত নহে। কেননা নবী শব্দটি ব্যাপকতর অর্থবোধক (শরহু আকাইদিন নাসাফী, পৃ. ২৪, চট্টগ্রাম মুদ্রণ)।
কিন্তু উক্ত সংজ্ঞা সম্পূর্ণ যথার্থ বলিয়া মনে হয় না। কেননা কুরআন শরীফে হযরত ইসমাঈল (আ) সম্পর্কেও উক্ত হইয়াছে :
“স্মরণ কর এই কিতাবে ইসমাঈলের কথা, সে তো ছিল প্রতিশ্রুতি পালনে সত্যাশ্রয়ী এবং সে ছিল রাসূল নবী”(১৯ : ৫৪)।
লক্ষণীয়, নাযিলকৃত আসমানী কিতাবের সংখ্যা সর্বসাকুল্যে ১০৪। প্রধান চারিখানা তাওরাত, যাবূর, ইনজীল ও আল-কুরআন যথাক্রমে হযরত মূসা (আ), হযরত দাউদ (আ), হযরত ঈসা (আ) ও নবীকুল শিরোমনি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি নাযিল হয় এবং বাকি এক শতখানা, যেগুলিকে সহীফা নামে অভিহিত করা হইয়াছে, যথাক্রমে নাযিল হয় :
আদম (আ)-এর প্রতি ১০খানা;
শীছ (আ)-এর প্রতি ৫০খানা;
ইদরীস (আ)-এর প্রতি ৩০খানা এবং
ইবরাহীম (আ)-এর প্রতি ১০খানা।
অথচ রাসূলের সংখ্যা হাদীছমতে ৩১৩। অন্য কথায় কিতাব ও সহীফাপ্রাপ্ত, রাসূলের সংখ্যা মাত্র ৮, অবশিষ্ট ৩০৫ জন রাসূলের প্রতি কোন কিতাবই অবতীর্ণ হয় নাই। এতদসত্ত্বেও আল্লাহর রাসূল (স) তাহাদিগকে রাসূল বলিয়া অতিহিত করিয়াছেন। উল্লিখিত ৩১৩ জনের মধ্যে ২৫ জন রাসূলের নাম কুরআনুল কারীমে উল্লেখ হইয়াছে।
মুফতী মুহাম্মাদ শফী (র) বলেন, নবী ও রাসূল-এর সংজ্ঞা সম্পর্কে বিভিন্ন অভিমত রহিয়াছে। বিভিন্ন আয়াত সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করিয়া আমি যাহা উপলব্ধি করিয়াছি তাহা এই যে, উক্ত দুইটি শব্দের মধ্যে ‘মানতিক’ শাস্ত্রের পরিভাষায় [ ] নামক সম্পর্ক বিদ্যমান। অর্থাৎ কোন কোন দিক হইতে নবী শব্দটিই অধিকতর ব্যাপক–আবার কোন কোন দিক হইতে রাসূল শব্দই অধিকতর ব্যাপক।
“রাসূল হইতেছেন সেই প্রেরিত পুরুষ যিনি তাঁহার সম্প্রদায়কে লূতন শরীআতের বার্তা পৌঁছাইয়া থাকেন। এই শরীআত তাহার নিজের জন্যও লূতন হইতে পারে, যেমন তাওরাত প্রভৃতি, আবার তাহার নিজের বেলায় লূতন না হইলেও কেবল তাহার উম্মতের বেলায়ও লূতন হইতে পারে। যেমন ইসমাঈল (আ)-এর শরীআত; উহা মূলত ইবরাহীম (আ)-এর পুরাতন শরীআতই ছিল, কিন্তু তিনি যে জ্বরহুম সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হইয়াছিলেন তাহাদের জন্য উহা লূতন শরীআত ছিল। কেননা পূর্বে তাহাদের কাছে এই শরীআতের বার্তা পৌঁছে নাই। হযরত ইসমাঈল (আ)-এর মাধ্যমেই উহা তাহাদের কাছে সর্বপ্রথম পৌঁছে। এই অর্থের দিক হইতে বিবেচনা করিলে রাসূলকে যে নবী হইতে হইবে এমন কোন কথা নাই। যেমন ফেরেশতাগণ, তাহাদের ক্ষেত্রে রাসূল শব্দটি প্রযোজ্য হইলেও তাঁহারা নবী নহেন। ঈসা (আ)-এর প্রেরিত বার্তাবাহকগণের ক্ষেত্রেও ঐ একই কথা প্রযোজ্য।
আয়াতে তাহাদিগকে রাসূল অভিধায় অভিহিত করা হইয়াছে, কিন্তু তাহারা নবী ছিলেন না। পক্ষান্তরে নবী হইতেছেন সেই প্রেরিত পুরুষ যিনি ওহী লাভ করিয়া থাকেন–তিনি লূতন শরীআতের তাবলীগ করুন অথবা পুরাতন শরীআতের। যেমন বনী ইসরাঈলের অধিকাংশ নবীই মূসা (আ)-এর শরীআতের তাবলীগ করিতেন। এই হিসাবে রাসূল শব্দের মধ্যে নবীর তুলনায় ব্যাপ্তি বেশি। আর অন্য হিসাবে নবী শব্দটিই রাসূল-এর তুলনায় ব্যাপকতর।;, শব্দ দুইটি যেখানে আয়াতে পাশাপাশি একত্রে ব্যবহৃত হইয়াছে সেখানে তো কোন সমস্যা নাই। কিন্তু যেখানে শব্দ দুইটি একটি আরেকটির মুকাবিলায় ভিন্ন ভিন্ন অর্থবোধকরূপে আসিয়াছে, যেমন, ১১ ও ১,, (২২ : ৫২) আয়াতে :
এখানে পূর্বাপর বিবেচনায় নবী শব্দটি বলিতে ঐ সত্তাই বুঝিতে হইবে যিনি তাঁহার পূর্ববর্তী শরীআতের তাবলীগ করেন (মাআরিফুল কুরআন, ৬খ, পৃ. ৪২; দারুল মাআরিফ, করাচী–১৪১৬ হি.)
নবীগণ যে নিষ্পাপ হইয়া থাকেন, ইহাও একটি সর্বসম্মত আকীদা। তারপরও আদম (আ) কী করিয়া আল্লাহ তাআলার নির্দেশ অমান্য করিতে পারিলেন, এই প্রশ্নটি কাহারও মনে উদিত হওয়া স্বাভাবিক।
এই প্রসঙ্গে আলোচনা করিতে যাইয়া আল্লামা ইদরীস কান্দলবী (র) ইসমত ও মাসিয়াত তথা নিষ্পপত্ব ও অবাধ্যতা শব্দদ্বয়ের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করিয়াছেন। চমৎকারভাবে তিনি লিখেন ।
“হকপন্থীগণের সর্ববাদীসম্মত আকীদা এই যে, নবী-রাসূলগণ (আ) আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা হইতে সর্বতোভাবে পবিত্র ও নিষ্পাপ । তাহারা সর্বপ্রকার গুনাহ হইতে মুক্ত । ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁহাদের দ্বারা আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা সংঘটিত হওয়া অসম্ভব। ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহর অবাধ্যতা যদি তাঁহাদের পক্ষে সম্ভবই হইত তাহা হইলে আল্লাহ তাআলা তদীয় মাখলুককে নিঃশর্তভাবে তাহাদের আনুগত্য করার নির্দেশ দিতেন না, তাহাদের আনুগত্যকে তাঁহার নিজের আনুগত্য বলিয়া অভিহিত করিতেন না এবং আম্বিয়া কিরামের হাতে আনুগত্যের শপথকে তাঁহার নিজের হাতে আনুগত্যের শপথ বলিয়া অভিহিত করিতেন না। আল্লাহ তাআলা বলিয়াছেন :
“যে রাসূলের আনুগত্য করিল সে আল্লাহরই আনুগত্য করিল” (৪৮ : ১০)।
“যাহারা তোমার হাতে আনুগত্যের শপথ করিল তাহারা আল্লাহরই হাতে আনুগত্যের শপথ করিল । আল্লাহর হাত তাহাদের হাতের উপর থাকে” (৪৮ : ১০)।
বলা বাহুল্য, কুরআন দ্বারাও প্রমাণিত যে, এই নিঃশর্ত আনুগত্যের আদেশ কোন বিশেষ ব্যাপারের মধ্যে সীমাদ্ধ নহে, বরং আকাইদ হইতে আমলসমূহ পর্যন্ত প্রতিটি আকীদা-আমলে ও আচরণে নবীর আনুগত্য অপরিহার্য। ইহার হেতু এই যে, আম্বিয়া কিরামের সত্তা ও তাঁহাদের স্বভাবচরিত্র অত্যন্ত পবিত্র হইয়া থাকে। আম্বিয়া কিরামের স্বভাব-চরিত্র ফেরেশতাকূলের অনুরূপ। ইসমত বা নিষ্পাপ হইতেছে ফেরেশতাগণের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য, আর আম্বিয়া কিরাম ফেরেশতাকুলের তুলনায় উত্তম ও অধিকতর বরণীয়। হযরত আদম (আ)-এর ঘটনাবলী ইহার জাজ্বল্যমান প্রমাণ। এই ঘটনা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, হযরত আদম (আ) মাসূম (নিষ্পপ), ফেরেশতাগণের তুলনায় উত্তম ও অধিকতর মর্যাদাশীল।
ইসমত হইতেছে বাহিরে ও অভ্যন্তরে নফস তথা রিপু ও শয়তানের হস্তক্ষেপ হইতে পবিত্র ও মুক্ত থাকা। নফস এবং শয়তানই হইতেছে মাসিয়াত বা পাপাচারের উৎস বা মূল হেতু। আর মাসিয়াত বা পাপাচার হইতে মুক্ত থাকার নামই হইতেছে ইস্মত। মাসূম ঐ সত্তা যাহার মন ও মনন, বিশ্বাস ও ইতিকাদ, ইচ্ছা-আকাঙ্খ, আচার-আচরণ, অভ্যাস-ইবাদত লেনদেন, কথাবার্তা, ক্রিয়াকর্ম সবকিছু নফস ও শয়তানের হস্তক্ষেপ হইতে সর্বতোভাবে মুক্ত। গায়বী হিফাযত দ্বারা তিনি সংরক্ষিত থাকেন। তাঁহার দ্বারা এমন কিছু সংঘটিত হইতে পারে না যদ্দ্বারা তাহার ইসমত কোনভাবে বিঘ্নিত ও ক্লেদাক্ত হইতে পারে। আল্লাহ তাআলা সদয় দৃষ্টি এবং ফেরেশতাগণের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান তাঁহাকে ঘিরিয়া থাকে যাহা তাহাকে পদে পদে সঠিক পথে পরিচালিত করে এবং হকের সামান্যতম পরিপন্থী প্রবণতা হইতেও তাঁহাকে ফিরাইয়া রাখে । আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারীমে আম্বিয়ায়ে কিরামকে “মুসতাফায়নাল আখয়ার” (মনোনীত উত্তম বান্দা; দ্র. ৩৮ : ৪৭) ও “ইবাদুল মুখলাসীন” (একনিষ্ঠ বান্দা; দ্র, ৩৮ ও ৮৩) বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন, যাহা তাঁহাদের প্রতি আল্লাহর সার্বিক সন্তুষ্টি এবং তাহাদের ঐকান্তিক নিষ্ঠার প্রমাণবহ। মুখলাস বা মুখলিস শব্দ কেবল তাহার জন্যই প্রযোজ্য যাহার মধ্যে গায়রুল্লাহর বিন্দুমাত্র প্রভাব নাই, পূর্ণ মাত্রায় আল্লাহর জন্য নিবেদিত। অর্থাৎ তাহারা শয়তানী উপাদান হইতে সর্বোতোভাবে মুক্ত, পবিত্র । সুতরাং নবী অবশ্যই সর্বপ্রকার সগীরা ও কবীরা গুনাহ হইতে মুক্ত ও সর্বপ্রকার ক্লেদ হইতে পবিত্র বা মাসূম হইবেন ইহাই স্বাভাবিক। আল্লাহ তাআলার বাণী :  (৭২ ২৭)-এর মধ্যে বর্ণনামূলক [ ] এবং [ ] শব্দটি অনির্দিষ্ট বাচক [ ]–রূপে আসিয়াছে। এই বর্ণনাভঙ্গি দ্বারা ইহা সুস্পষ্ট যে, নবী মাত্রই আল্লাহ তাআলার পসন্দনীয় এবং মনোনীত বান্দা। তাহার প্রত্যেকটি আমল-আখলাক, স্বভাব-চরিত্র, আচার-আচরণ, হাল-অবস্থা সর্বদিক হইতে আল্লাহ তাআলার নিকট পসন্দনীয় এবং তিনি সর্বতোভাবে একমাত্র আল্লাহরই বান্দা। উক্ত আয়াতে বর্ণিত সন্তুষ্টি কোনক্রমেই আংশিক সন্তুষ্টি নহে। কেননা কোন না কোন দিক দিয়া প্রত্যেক মুসলমানই আল্লাহর সার্বিক ও পূর্ণ মাত্রার সঙ্কুষ্টিপ্রাপ্ত হয়, আর পূর্ণ মাত্রায় এই সন্তুষ্টি কেবল ঐ বান্দাগণই লাভ করিতে পারেন যাহাদের যাহির-বাতিন নফস তথা রিপু এবং শয়তানের বন্দেগী ও আনুগত্য হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র। মাসিয়াত তথা পাপ-পঙ্কিলতা হইতে এই সার্বিক মুক্ত থাকার নামই হইতেছে ইসমত, পাপ হইতে মুক্ত থাকা। আম্বিয়া কিরামের বিশেষণরূপে ইতিফা ও ইরতিদা শব্দ দুইটির প্রয়োগও প্রণিধান যোগ্য। শব্দ দুইটি [ ]–এর ১৯a বা ক্রিয়ামূল। নিজের জন্য নির্দিষ্ট কোন ব্যাপার বুঝাইতে ইহা ব্যবহৃত হইয়া থাকে। যেমন [ ] শব্দ দুইটি নিজের জন্য ওজন করিয়া লওয়া ও মাপিয়া লওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হইয়া থাকে। পক্ষান্তরে [ ] ও [ ] শব্দ দুইটি নিজের-পরের সকলের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে ব্যবহৃত হইয়া থাকে। যেমন আল্লাহ তাআলার বাণী :
ইহাতে নিজেদের জন্য মাপিয়া নেওয়াকে [ ] এবং অন্যদের জন্য মাপিয়া লওয়াকে [ ] অন্যদের জন্য ওজন করিয়া লওয়াকে [ ] বলা হইয়াছে (অর্থাৎ যাহারা নিজেদের জন্য মাপিয়া বা ওজন করিয়া লইতে পরিপূর্ণভাবে কড়ায়- গণ্ডায় আদায় করিয়া লয়, আর অন্যদের জন্য মাপিতে বা ওজন ঝরিতে কম করিয়া দেয়, উক্ত আয়াতে তাহাদের নিন্দা করা হইয়াছে)। ব্যকরণের এই নিয়ম অনুসারেই [ ] শব্দদ্বয়ের দ্বারা নিজের জন্য বাছিয়া লওয়া ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করা বুঝান হইয়াছে। অন্যত্র ঐ একই অর্থে বলা হইয়াছে।
“আমি তোমাকে নিজের জন্য পছন্দ করিয়া লইয়াছি (হে রাসূল)”
মোটকথা, আম্বিয়ায়ে কিরাম (আ) তাঁহাদের সকল আখলাক, আদাত, ইবাদাত, মুআমালাত, আচার-আচরণ ও কথায়-বার্তায় আপদমস্তক আল্লাহ তাআলার পসন্দনীয় এবং যাহিরে-বাতিনে শয়তানী হস্তক্ষেপ ও রিপুর তাড়না হইতে মুক্ত ও পবিত্র থাকেন। একটি মুহূর্তের জন্যও তাহারা আল্লাহর করুণা, সাহায্য ও তত্ত্বাবধান হইতে বিচ্ছিন্ন হন না। এইজন্যই বিনা প্রশ্নে শর্তহীনভাবে আম্বিয়ায়ে কিরামের আনুগত্য করা ফরয, তাহাদের প্রতিটি কথা ও কাজ গ্রহণীয় এবং তাহাদের আনুগত্য বর্জন চিরস্থায়ী দুর্ভাগ্যের এবং ইহলোকে-পরলোকে সমূহ ক্ষতির কারণ। মানবিক কারণে যদি নবী-রাসূলগণের দ্বারা কখনো কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটিয়াও যায়, তবে তাহা বাহির হইতে আসে, তাহাদের নিজেদের অভ্যন্তর হইতে নহে। যেমন পানির মধ্যে উষ্ণতা বাহির হইতে আসিয়া থাকে, স্বভাবগতভাবে উহাতে কেবল শীতলতাই থাকে, উষ্ণতার নামমাত্র থাকে না। এইজন্য পানি যতই গরম হউক না কেন, আগুনে উহা ঢালিয়া দেওয়া মাত্র তাহা নির্বাপিত হইয়া যায়। অনুরূপ আম্বিয়ায়ে কিরামের অন্তর্লোক পাপাচারের উৎস-উপাদান (নফস ও শয়তান) হইতে সর্বতোভাবে মুক্ত ও পবিত্র। বাহিরের আছরের ফলে কখনও তাঁহাদের দ্বারা কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি হইয়া গেলেও কুদরতের অদৃশ্য হাত তাঁহাদের ইসমতের চেহারা হইতে সেই বহিরাগত ধুলাবালি ঝাড়িয়া পরিষ্কার করিয়া দেয়। ফলে নবুওয়াতের চেহারা পূর্বের তুলনায় পরিচ্ছন্নতর ও উজ্জ্বলতর হইয়া ঝলমলাইয়া উঠে। ইউসুফ (আ)-এর ঘটনা বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন :
“এইভাবে আমি তাহাকে মন্দ কর্ম ও অশ্লীলতা হইতে বিরত রাখিবার জন্য নিদর্শন দেখাইয়াছিলাম। সে তো ছিল আমার বিশুদ্ধচিত্ত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত” (১২ : ২৪)। উক্ত আয়াতে আমাদের পূর্ববর্তী বক্তব্যের যথার্থতাই প্রতীয়মান হয়। কেননা উক্ত আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলিয়াছেন যে, তিনি গর্হিত কর্ম ও অশ্লীলতাকে ইউসুফ (আ) হইতে দূরে রাখিয়াছেন। তিনি বলেন নাই যে, তিনি ইউসুফকে গর্হিত কর্ম ও অশ্লীলতা হইতে দূরে রাখিয়াছেন। ফিরাইয়া রাখা, দূরে রাখা বা হটাইয়া দেওয়ার ব্যাপারটা তাহার জন্যই প্রযোজ্য হইতে পারে, যে নিজে সেদিকে অগ্রসর হইতে উদ্যত হয়। উক্ত আয়াতের বক্তব্য দ্বারা বুঝা গেল যে, গর্হিত কর্ম ও অশ্লীলতা ইউসুফ (আ)-এর দিকে ধাবিত হইতে চাহিতেছিল। আল্লাহ তাআলা তাহা ফিরাইয়া রাখিলেন। ইউসুফ (আ) সেদিকে অগ্রসর হইতে প্রয়াস পান নাই।
মোটকথা, বাহিরের প্রভাবে ভুলরশত আম্বিয়ায়ে কিরামের দ্বারা যেসব ত্রুটি-বিচ্যুক্তি হইয়া যায়, বাহ্যত আত্মাকে ইইয়ান বা মাসিয়াত (পাপ বা অপরাধ) বলিয়া অভিহিত করা যায় অথবা বলা যায়, তাহাদের উচ্চ মর্যাদার দিকে লক্ষ্য রাখিয়া ঐগুলিকেও পাপ বা অপরাধ বলিয়া অভিহিত করা হইয়া থাকে, যদিও বাস্তবিকপক্ষে উহা অপরাধ নহে।
আল্লাহর হুকুম পালন না করা মাত্রই মাসিয়ত বা গুনাহ নহে, বরং জ্ঞাতসারে ও ইচ্ছাকৃতভাবে যে বিরুদ্ধাচরণ করা হইয়া থাকে, ভুলক্রমে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে নহে, তাহাই পাপ বা গুনাহ। এইজন্যই ওরখাহী করিতে গিয়া বলা হইয়া থাকে, আমি ভুলিয়া গিয়াছিলাম অথবা আমি বুঝিয়া উঠিতে পারি নাই। যদি ভুলক্রমে বা ভুল বুঝাবুঝির কারণে সংঘটিত ত্রুটি-বিচ্যুতিও পাপ বলিয়া অভিহিত হয়, তাহা হইলে ওযরশাহির ক্ষেত্রে আমি ভুলিয়া গিয়াছিলাম বা বুঝিয়া উঠিতে পারি নাই বলার কোন অর্থই হয় না। যে ভুলত্রুটি ভুলক্রমে সংঘটিত হইয়া যায় তাহাকে মাসিয়াত বা গুনাহ বলিয়া উহাকে বলা হয় পদস্খলন। হযরত আদম (আ)-এর নিষিদ্ধ ফল খাওয়াও ছিল ভুলবশত । কুরআনুল কারীমে বলা হইয়াছে ।
“তারপর সে (আদম) ভুলিয়া গেল, আর আমি তাহার মধ্যে দৃঢ়তা পাইলাম না” (২ : ১১৫)।
হযরত আদম (আ) তখন আল্লাহ তাআলা “এ গাছের কাছেও তোমরা দুইজন ঘেষিও না” বলিয়া যে নিষেধাজ্ঞা জারী করিয়াছিলেন উহাও সেই সময় ভুলিয়া গিয়াছিলেন। শয়তান যে চিরশত্রু তাহাও তখন তাহার স্মরণ ছিল না। আল্লাহ তাআলা যে পূর্বাহ্নেই বলিয়া রাখিয়াছিলেন :
“তোমাদেরকে সে যেন বেহেশত হইতে বাহির করিয়া না দেয়, দিলে তোমরা দুর্ভোগে নিপতিত হইবে” (২: ১১৭), তাহাও তখন তাঁহার স্মরণ ছিল না। সুতরাং যাহা ঘটিয়াছে ভুলক্রমেই ঘটিয়াছে। উহাকে পাপ বা অপরাধ বলিয়া অভিহিত করাই ভুল । হযরত আদম ও হাওয়া (আ) উভয়ে জান্নাতের জন্যই আত্মহারা ছিলেন। এইজন্য ইবলীসের শপথ শুনিয়া তাঁহারা তাহার প্রতারণার শিকার হইয়া গেলেন এবং ভাবিলেন, স্বয়ং আল্লাহর নাম লইয়া কেহ মিথ্যা বলিতে পারে না। উপরন্তু আদম (আ)-এর নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ ছিল আল্লাহর প্রতি অনুরাগ-মহব্বতেই কারণে, জান্নাতে আল্লাহর নৈকট্য চিরস্থায়ী হইবার আকাঙ্খায়। কুরআন মজীদের আয়াতাংশ যেমন শয়তানের উক্তি হিসাবে বর্ণিত হইয়াছে :
“তোমরা দুইজনে ফেরেশতা হইয়া যাও অথবা স্থায়ী হইয়া যাও এইজন্যই তোমাদের প্রভু তোমাদেরকে এই বৃক্ষ হইতে নিষেধ করিয়াছেন” (৭ : ২০)।
আল্লাহর নামে শপথ করার কারণে আদম (আ) এই ভুলে নিপতিত হইয়াছিলেন?
“এবং সে (শয়তান) তাহাদের দুইজনের নিকট শপথ করিয়া বলিল, নিশ্চয় আমি তোমাদের দুইজনের হিতাকাঙ্খীদের একজন” (৭ : ২১)।
তখন হযরত আদম (আ)-এর মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ হইল না যে, মহান আল্লাহর পবিত্র নাম লইয়াও কেহ মিথ্যা শপথ করিতে পারে, মিথ্যা কথা বলিতে পারে। তিনি মনে করিলেন, আল্লাহর কোন বান্দাই তাহার পবিত্র ও মহান নাম লইয়া মিথ্যা শপথ করিতে পারে না। সুতরাং বুঝা গেল যে, হযরত আদম (আ)-এর উক্ত কাজ বিরুদ্ধাচরণের উদ্দেশ্যে বা রিপুর তাড়নায় ছিল না। তাই উহাকে গুনাহ বা অপরাধ বলা যাইবে না বরং উহাকে তাঁহার পদস্খলনই বলিতে হইবে। আল্লাহ তাআলার বাণী l এবং ১৬;i–এর উভয় ক্ষেত্রেই উহা যে তাঁহার পদত্থলন ও ভুলবশত ছিল, তাহার আল্লাহর নাফরমানীর ইচ্ছা ছিল না সেদিকেই ইঙ্গিত করা হইয়াছে।
সুতরাং কুরআনুল কারীমের যে সমস্ত আয়াতে উহাকে তাহার বিরুদ্ধাচরণ বা অপরাধ বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে উহা কেবল যাহেরী সুরত হিসাবেই বলা হইয়াছে, প্রকৃত অর্থে নহে অথবা তাহার উচ্চ মর্যাদার অনুপাতে উহাকে ইসয়ান বা অপরাধ বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে।
নবী-রাসূলগণের ক্ষেত্রে উত্তম কাজ ছাড়িয়া অনুত্তম বা তাহার চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের কাজ করাই এমন যেমনটি অন্যদের জন্য অপরাধমূলক কর্ম (দ্র. খিয়ালী–এর মোল্লা আবদুল হাকীমের লিখিত পাদটীকা)।
নবী-রাসূলগণের ক্রটির অর্থ হইতেছে উত্তম ও শ্রেষ্ঠতরটির স্থলে ভুলবশত তাহাদের অপেক্ষাকৃত অনুত্তমটি করিয়া বসা। আর অন্যদের ত্রুটির অর্থ হক ও হিদায়াতের স্থলে বাতিল বা গোমরাহীর মধ্যে লিপ্ত হইয়া পড়া। উম্মতের আলিমগণের সর্ববাদীসম্মত মতে আম্বিয়ায়ে কিরাম এই জাতীয় ত্রুটি বা অপরাধ হইতে মুক্ত, মাসূম। তাহাদের ইজতিহাদগত ত্রুটির অর্থ হইতেছে ভুলবশত উত্তম ও শ্রেষ্ঠতরটির স্থলে অপেক্ষাকৃত অনুত্তম তাঁহাদের দ্বারা সংঘটিত হইয়া যাওয়া।
হযরত আদম (আ)-এর পদস্খলন (;) ততটুকুই। তাহা না হইয়া (আল্লাহর আশ্রয় চাই) তাঁহারা যদি লোভের বশবর্তী ও রিপুর অনুবর্তী হইতেন, তাহা হইলে আল্লাহ তাআলা আমাদের উপর তাহাদের নিঃশর্ত ও অকুণ্ঠ আনুগত্য কখনও ফরয বা অপরিহার্য করিয়া দিতেন না আর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে তাঁহাদের অনুকরণের নির্দেশ দিয়া বলিতেন না?
“ইহারাই হইতেছে সেই সব ব্যক্তি যাহাদেরকে স্বয়ং আল্লাহ হিদায়াত দান করিয়াছেন, সুতরাং (তুমি ওহে রাসূল) তাহাদেরই অনুকরণ কর” (৬ : ৯০) (দ্র. আল-মুতামাদ ফিল-মুতাকাদ তাওরীশী প্রণীত)।
ইমাম আবু মানসূর মাতুরীদী (র) বলেন : চিন্তা-গবেষণায় ইহাই যৌক্তিক গ্রহণযোগ্য হইতে বাধ্য যে, আম্বিয়ায়ে কিরামের মাসূম হওয়ার বিশ্বাস ফেরেশতাদের মাসূম হওয়ার বিশ্বাসের চাইতে অধিকতর তাকিদপূর্ণ ও গুরুত্ববহ। এইজন্য যে, লোকজন আম্বিয়ায়ে কিরামের অনুসরণ করার জন্য আদিষ্ট, ফিরিশতাগণের অনুসরণের জন্য আদিষ্ট নহে (দ্র, আল-মুতামাদ ফিল-মুতাকাদ, পৃ. ৭৩)।
ইমাম রাযী (র) বলেন, ইসমতের সম্পর্ক চারটি ব্যাপারের সহিতঃ
(১) আকাইদ (বিশ্বাস)
(২) আহকাম (আদেশ-নিষেধের তাবলীগ)
(৩) ফাতওয়া ও ইজতিহাদ;
(৪) কার্যকলাপ, আচার-আচরণ, অভ্যাস ও স্বভাব-চরিত্র।
(১) আকাইদ সম্পর্কে গোটা মুসলিম উম্মাহর সর্ববাদীসম্মত মত এই যে, নবী-রাসূলগণ একেবারে গোড়া হইতেই সহজাতভাবে তাওহীদ ও ঈমানের অধিকারী হইয়া থাকেন। ভূমিষ্ঠ কাল হইতেই তাঁহাদের অন্তর কুফর ও শিরকের ক্লেদমুক্ত এবং ইয়াকীন ও বিশ্বাসে পরিপূর্ণ থাকে। তাঁহাদের মুবারক চেহারাসমূহ সর্বদা মারিফাত ও আল্লাহর নৈকট্যের জ্যোতিতে উদ্ভাসিত থাকে। আজ পর্যন্ত ইতিহাসে ইহার কোন প্রামণ পাওয়া যায় নাই যে, আল্লাহ তাআলা যে পবিত্র আত্মা মনীষিগণকে নবুওয়াত ও রিসালাত দানে ধন্য করিয়াছিলেন, তাহাদের মধ্যকার কোন একজনও জীবনের কোন পর্যায়ে শিরক ও কুফরের কলুষতায় নিপতিত হইয়াছেন। আল্লাহ তাআলার বাণী :
“ইবরাহীমকে আমি পূর্ব হইতেই হিদায়াত দান করিয়াছিলাম এবং আমি তাহার সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত ছিলাম” (২১ : ৫১)। ইহা দ্বারা সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, নবুওয়াত লাভের পূর্বে যদিও নবীগণ নবী পদবাচ্য হন না, তবুও তাহারা তখনও আল্লাহ কামিল ওলী এবং নৈকট্যধন্য অবশ্যই থাকেন। তাঁহাদের সেই বিলায়াত এত উচ্চ মানের হয় যে, অন্য ওলীগণ তাহাদের তুলনায় সমুদ্রের সম্মুখে বারি বিন্দুসমও গণ্য হন না। এইজন্য উম্মতে মুহাম্মাদীর আলিমগণ এই ব্যাপারে সম্পূর্ণ একমত যে, আম্বিয়ায়ে কিরামের অন্তরে কুফর ও গুমরাহির উপস্থিতি অসম্ভব।
(২) তাবলীগে আহকাম বা আদেশ-নিষেধের প্রচারে নবী-রাসূলগণ যে মাসূম এ ব্যাপারে গোটা উম্মত একমত। এই ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁহাদের কোন ভুলভ্রান্তির শিকার হওয়া বা মনের অজান্তে ভুলক্রমে তাবলীগের ক্ষেত্রে তাহাদের মিথ্যা বা বিকৃতির আশ্রয় লওয়া অসম্ভব। এই ব্যাপারে তাঁহারা সর্বতোভাবে মাসূম ও পবিত্র। তাঁহাদের সুস্থ বা অসুস্থ অবস্থায় অনুরাগ বা বিরাগের ক্ষেত্রে কোন অবস্থায়ই ওহী প্রচারের ব্যাপারে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তাহাদের কোনরূপ মিথ্যা বা ছলচাতুরীর আশ্রয় লওয়া একটি অসম্ভব ব্যাপার। নচেৎ অকুণ্ঠচিত্তে ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় ফেরেশতাগণের কঠোর প্রহরার ব্যবস্থা থাকিত, যাহাতে শয়তানের কোনরূপ হস্তক্ষেপ, ভেজাল বা মিথ্যার সংমিশ্রণ ওহীর সহিত না ঘটিতে পারে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলিয়াছেন :
“তিনি অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা; তিনি তাঁহার অদৃশ্যের জ্ঞান কাহারও নিকট প্রকাশ করেন না তাঁহার মনোনীত রাসূল ব্যতীত। সেই ক্ষেত্রে আল্লাহ রাসূলের অগ্র ও পশ্চাতে প্রহরী নিয়োজিত করেন, রাসূলগণ তাহাদের প্রতিপালকের বাণী পৌঁছাইয়া দিয়াছেন কিনা জানিবার জন্য। রাসূলগণের নিকট যাহা আছে তাহা তাঁহার জ্ঞানগোচর এবং তিনি সমস্ত কিছুর বিস্তারিত হিসাব রাখেন” (৭২ : ২৬-২৮)।
(৩) ফাতওয়া ও ইজতিহাদের ব্যাপারে উলামায়ে ইসলামের মত হইতেছে, আম্বিয়ায়ে কিরাম যে সমস্ত ব্যাপারে ওহী অবতীর্ণ হয় নাই এমন ব্যাপারসমূহে কখনও কখনও ইজতিহাদও করিতেন। কখনও সেই সব ইজতিহাদে ভুলত্রুটি হইয়া গেলে সাথে সাথে ওহীর মাধ্যমে তাঁহাদিগকে সতর্ক করিয়া দেওয়া হইত। নবী-রাসূলের পক্ষ হইতে ইজতিহাদগত কোন ত্রুটি হইয়া যাইবে অথচ আল্লাহর পক্ষ হইতে তাঁহাকে এ ব্যাপারে সতর্ক করা হইবে না এমনটি হইতেই পারে না।
(৪) কার্যকলাপ ও আচার-আচরণের ক্ষেত্রে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআত-এর অভিমত এই যে, নবী-রাসূলগণ কবীরা গুনাহ হইতে সর্বতোভাবে মুক্ত ও পবিত্র, অবশ্য সগীরা বা অনুত্তম পর্যায়ের কাজ কখনো ভুলবশত বা অজ্ঞাতসারে হইয়া যাইতে পারে। বাহ্যিকভাবে তাহা অপরাধ বলিয়া মনে হইলেও ঐগুলির দ্বারাও শরীআতের কোন কোন হুকুম ব্যক্ত করাই উদ্দেশ্য। উদাহরণস্বরূপ বলা যাইতে পারে, যুহর বা আসরের নামাযে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ভুল (সাহু) হইয়া যাওয়া। বাহ্যত উহা ভুল বলিয়া দেখা গেলেও ইহার দ্বারা প্রকৃতপক্ষে সিজদায়ে সহো শিক্ষা দেওয়াই উদ্দেশ্য ছিল । নবী করীম (স)-এর নামাযে সাহু না হইলে উম্মত সিজদায়ে সাহুর মাস্আলা কীভাবে শিক্ষা লাভ করিত। অনুরূপভাবে ‘লায়লাতুত তারীছ নামে মশহুর রাত্রিতে তাহার নামায কাযা
হইলে উম্মত কাযা নামায আদায়ের মাস্আলা কোথা হইতে লাভ করিত? এই হিসাবে ঐ সাহু বা ভুলিয়া যাওয়াটাও ছিল আল্লাহর দয়া ও সাক্ষাত রহমত। এইজন্য হযরত আবু বকর (রা) বলিতেনঃ “হায়, যদি আমি মুহাম্মাদের ভুলত্রুটিই হইতাম”! অর্থাৎ মহানবী (স)-এর ভুল ও আমার হাজার নির্ভুল হইতে উত্তম। আল্লাহ তাআলার বাণী :
“নিশ্চয় আমি তোমাকে পাঠ করাইব, ফলে তুমি বিস্মৃত হইবে না, আল্লাহ যাহা ইচ্ছা করেন তাহা ব্যতীত” (৮৭ ও ৬–৭)।
এই আয়াত দ্বারাও সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, নবীর তুলিয়া যাওয়ার মধ্যেও কোন না কোন তাৎপর্য নিহিত থাকে। মানুষ হিসাবে নবী-রাসূলগণেরও ভুলত্রুটি হইয়া থাকে। তাহা এইজন্য যে, তিনি যতক্ষণ পর্যন্ত মানবরূপে থাকিবেন, মানবীয় বৈশিষ্ট্যাবলী হইতে ততক্ষণ পর্যন্ত মুক্ত থাকা সম্ভব নহে ও ক্ষুধা-তৃষ্ণা আছে, আনন্দ-উফুল্লতাও আছে, হাসি-কান্না আছে, অনুরাগ-বিরাগও আছে। আল্লাহ তাআলা বাণী :
“বল আমি তোমাদেরই মত মানুষ” (১৮ : ১১০)। ইহার মধ্যে তাহার ইঙ্গিত রহিয়াছে অর্থাৎ নবী হওয়া সত্ত্বেও আমি মানুষই, ফেরেশতা নই। তোমাদেরই মত পানাহার করিয়া থাকি এবং মানবীয় প্রয়োজনাদি মিটাইবার উদ্দেশে হাট-বাজারেও গিয়া থাকি। এইসব কিছুই মানবীয় বৈশিষ্ট্য। এইগুলিও নবুওয়াত ও রিসালতের পরিপন্থী নহে। অবশ্য নবী-রাসূলগণ।

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।