
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : বাংলাদেশে সমুদ্র উপকূলের মোট দৈর্ঘ্য ৭১১ কিলোমিটার। ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস, জোয়ার-ভাটাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপকূলীয় অঞ্চলে স্বাভাবিক ঘটনা। আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাবের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ক্রমাগত বেড়ে চলছে। এসব দুর্যোগের কবল থেকে উপকূলবাসীকে রক্ষা করতে বেড়িবাঁধ এবং বনায়নের মাধ্যমে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার কথা অনেকবার শোনা গেছে। তবে ৩-৪ দশক আগের বেড়িবাঁধ নানা দুর্যোগে ভেঙে গেছে। আবার অসাধু ব্যক্তিরা বনায়নের গাছ কেটে চিংড়িঘের তৈরি করেছে। সব মিলিয়ে উপকূল বরাবর অরক্ষিত। ১৯৬৬ সাল থেকে আমাদের ম্যানগ্রোভ বনায়ন শুরু। দক্ষিণ এবং পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলকে জলোচ্ছ্বাস এবং উপকূলীয় ভাঙন থেকে রক্ষা করার জন্য ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল সংঘটিত প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর মূলত উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। কারণ হচ্ছে, বেড়িবাঁধের সম্মুখে অবস্থিত ঢাল বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে জলোচ্ছ্বাসের প্রকোপ থেকে রক্ষা এবং উপকূলবর্তী এলাকাসমূহের
কৃষিজমি ও জানমাল রক্ষা করে। উপকূলবতী এলাকাসমূহে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, প্রচলিত নিয়মে সারিবদ্ধভাবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বৃক্ষরোপণ করেও যেখানে জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। বরং উপকূলরেখার সম্মুখ অংশে ব্যাপক বনায়নের মাধ্যমে তা প্রতিরোধ সম্ভব হতো, কিন্তু হয়নি।
বিভিন্ন সময় প্রকাশিত সংবাদে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের উপকূলীয় বেষ্টনীর ৫০ শতাংশের বেশি সুশোভিত ঝাউবন উজাড় হওয়ার কথা গণমাধ্যমে এসেছে অনেকবার। কিন্তু অসৎ কাঠ ব্যবসায়ী, চোরাকারবারি, বনদস্যুদের নির্বিচারে গাছ কাটা, যথেচ্ছ ও অপরিকল্পিত চিংড়িঘের, লবণ চাষ এবং শিপব্রেকিং ইয়ার্ড তৈরি রোধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়নি। এমনকি বনদস্যুদের সঙ্গে নির্বিচারে বনজঙ্গল ধ্বংস তা-বে কিছু অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্ট থাকার কথা অনেকবার বলা হয়েছে। কিন্তু তেমন কিছু হয়নি। যে কারণে বরগুনার প্রমত্ত বিষখালী নদী বারবার ছিনিয়ে নিয়েছে মানুষের আশ্রয়, স্বপ্ন, হাসি। সিডর ও সিডর-পরবর্তী সময়ে বিষখালীর ভাঙনে অনেকবার এলাকার মানুষ হারিয়েছেন ঘর, গাছের ছায়া, উঠানের মাটি। এমনকি স্মৃতির ঠিকানা। তবু তারা হার মানেননি, হার মানেন না। শুধু বরগুনা নয়, এমনই উপকূলবাসীর চিত্র। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর বরগুনাসহ উপকূলে আঘাত হেনেছিল প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডর। গতকাল ছিল সেই ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের ১৮ বছর পূর্তি। ১৮ বছর পর এসেও সেই দুঃসহ দিনের স্মৃতি মনে পড়লে আঁতকে ওঠেন উপকূলবর্তী মানুষ। কিন্তু তারা হার মানেন না। আবার জোটবদ্ধ হয়ে স্বপ্ন দেখেন, গভীর প্রত্যয়ে নতুন করে বাঁচার। দেশের জন্য এ এক নির্দয় উপহাস।
আমরা রাজনীতি করি মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা এবং চিকিৎসা নিশ্চিতের জন্য। সেখানে নিজস্ব বিত্তবৈভব নিয়ে মগ্ন থাকি। এ যেন সেই মঙ্গোলীয় শোষণ। আর ব্রিটিশের শোষণ-শাসন, পাকিস্তানিদের শোষণ-শাসন ভেঙে আমরা স্বাধীন হলাম প্রশ্ন আসে, কী পেল জনগণ? দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৬ শতাংশ বাস করে উপকূলীয় অঞ্চলে। তাদের জীবন-জীবিকা প্রাথমিকভাবে নির্ভর করে মাছ, কৃষি, বন, স্থানীয় পরিবহন, লবণ ইত্যাদির ওপর। কিন্তু জলোচ্ছ্বাস এবং ঘূর্ণিঝড় সবকিছু ল-ভ- করে দেয়। উপকূলের সংকট, সমস্যা, সম্ভাবনা এবং জলবায়ুর ঝুঁকিতে থাকা মানুষের অধিকার ও ন্যায্যতার দাবি আদায়ে তেমন কোনো দায়িত্ববোধ কোনো সরকার দেখায়নি। কেন এমনটি হয়েছে, তা অজানা। রাজনীতি মূলত কোন ধরনের মানুষের কথা বলে? চিন্তা থমকে যায় এই ভেবে আমাদের রাজনীতি শোষক না শোষিতের পক্ষে? আর উপকূলবাসী কোন পক্ষে যাবে! সরকার নিশ্চয়ই তাদের কথা ভাবে। প্রত্যাশা থাকল, অচিরেই তারা নিশ্চিত জীবনযাপন পাবেন। কান্না, দুর্ভাবনা, হতাশা আর ভাঙনের ধ্বনি কাড়বে না স্বপ্ন ও সুন্দর জীবনের পথচলা।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, সুন্দরবনের লাগোয়া উপকূলীয় জনপদ কয়রার দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়ন। কপোতাক্ষ, শাকবাড়িয়া আর আড়পাঙ্গাসিয়া নদী তিনদিক থেকে ঘিরে রেখেছে এই ভূখন্ডকে। আকাশ থেকে দেখলে মনে হয়, পানির বুকে ভাসমান এক দ্বীপ। প্রকৃতির আশীর্বাদ নয়, বরং শাস্তির মতো প্রতিদিনের জীবনসংগ্রামই এখানের নিয়তি।
দক্ষিণ বেদকাশীতে গেলে প্রথমেই চোখে পড়ে ভাঙাচোরা বেড়িবাঁধ। নদীর জোয়ার-ভাটা আর ঘূর্ণিঝড়ের হানা এখানে জীবনের অংশ হয়ে গেছে। ২০০৯ সালের আইলার মতো দুর্যোগ মানুষকে নিঃস্ব করেছে, আবার সিডর, আমফান, ইয়াস- প্রতিটি দুর্যোগ নতুন ক্ষত তৈরি করেছে। প্রতিবারই ঘরবাড়ি ভেসে যায়, আবার নতুন করে উঠে দাঁড়াতে হয়।
মোছাঃ রফিউন নেসা নামের এক গৃহবধূর গল্প যেন গোটা উপকূলের প্রতিচ্ছবি। থাকেন দক্ষিণ বেদকাশির চরামুখার কপোতাক্ষ পাড়ের বেড়িবাঁধের ওপর। স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনি চার সন্তান নিয়ে বেড়িবাঁধের পাশে ঝুঁকিপূর্ণ কুঁড়েঘরে বাস শুরু করেন। সিডর, আইলা, আমফান-প্রতিটি দুর্যোগ তার সংসার ভাসিয়ে নিয়ে গেলেও বারবার নতুন করে উঠে দাঁড়িয়েছেন। নদীর মাছই তার পরিবারের একমাত্র ভরসা। মাছ না পেলে সন্তানদের নিয়ে কাটাতে হয় অর্ধাহারে কিংবা অনাহারে। কুড়েঘরের পুরো বারান্দাজুড়ে দেখা মেলে পানিতে ভেসে আসা সুন্দরবনের বিভিন্ন ফল ও ডালপালা। জানতে চাইলে বলেন, এগুলো কুড়িয়ে শুকিয়ে রাখি সারাবছরের রান্নার জন্য। ওইগুলোই তাদের জ্বালানি।
পরিদর্শনকালে দেখা যায়, এলাকার মানুষের জীবিকার ভরসা নদী আর সুন্দরবন। মাছ, কাঁকড়া, মধু সংগ্রহ করেই চলে সংসার। কিন্তু সেখানে আবার আছে বাঘ-কুমিরের ভয়, বনবিভাগের নিয়ম, আর বনদস্যুদের দাপট। এক জেলে জানালেন, “সাত দিনের জন্য বনবিভাগকে ২৭০০ টাকা দিয়ে পাস নিতে হয়। কিন্তু বনে গেলে আবার ‘দুলাভাই বাহিনী’ কিংবা ‘ছোট জাহাঙ্গীর’, ‘বড় জাহাঙ্গীর’ বাহিনীকে ট্রিপপ্রতি চার হাজার টাকা দিতে হয়। তাদের টোকেন ছাড়া কাজ করা যায় না।” রয়েছে বাঘের আক্রমণের পর জীবন নিয়ে ফিরে আসা অনেকের গল্পও।
মোহাম্মদ শাহজাহান গাজী নামে দক্ষিণ বেদকাশীর এক বাসিন্দা জানান, “সুন্দরবনে মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে মাথায় গুরুতর আঘাত পাই। মাথায় ৪৮টি সেলাই লেগেছিল। এখন দিনমজুরি করেই সংসার চলে, তবে কাজও তেমন পাওয়া যায় না।”
একই এলাকার রেজাউল মোল্লা, শামসুর আলি ও কাশেম মোল্লাসহ আরও অনেকে বাঘের আক্রমণের শিকার হয়েছেন। কারও জীবন গেছে, কেউ অঙ্গহানি হয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন।
স্থানীয় স্কুলশিক্ষক মাওলানা মাহফুজুর রহমান বলেন, “এখানে বেড়িবাঁধ মানেই জীবন। বাঁধ ভাঙলে সব ভেসে যায়, আশ্রয়কেন্দ্রও পর্যাপ্ত নেই। মানুষকে প্রতিনিয়ত আতঙ্কে থাকতে হয়।”
ওই স্কুলসহ এলাকার আরও অনেকের ভাষায় সেখানে সুপেয় পানির সংকটও মারাত্মক। সাধারণ টিউবওয়েল বছরের কয়েক মাস পানি দেয় না। যাদের সাবমারসিবল আছে তারাই কিছুটা স্বস্তিতে আছেন। সম্প্রতি বেসরকারি সংস্থা জাগ্রত যুব সংঘ-জেজেএস কিছু বাড়িতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য প্লাস্টিকের ট্যাংক সরবরাহ করেছে। এতে কিছুটা সংকট দূর হলেও তা যথেষ্ট নয়। প্রতিটি ট্যাংকের ধারণ ক্ষমতা সাড়ে সাত হাজার লিটার। একেকটি সেটে দু’টি করে ট্যাংকি বসিয়ে মোট ১৫ হাজার লিটার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জেজেএস’র সহকারী প্রকল্প সমন্বয়কারী নাজমুল হুদা। তিনি বলেন, কয়রা সদরে ১৮টি ও দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নে ১৮টি বাড়িতে ১৮টি সেট স্থাপন করা হয়েছে। বৃষ্টির মৌসুমে পানি ধরে রেখে যাতে পুরো বছর চালানো যায়।
দক্ষিণ বেদকাশী থেকে উপজেলা সদর ২০ কিলোমিটার দূরে। সেখান থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দূরত্ব আরও ১৩ কিলোমিটার। অর্থাৎ প্রায় ৩৩ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে চিকিৎসা নিতে হয় ওই ঐ এলাকার মানুষদের। ফলে গুরুতর অসুস্থরা অনেক সময় কোয়াক ডাক্তার বা গ্রাম্য চিকিৎসকের ওপর নির্ভর করেন। বাঘের আক্রমণ থেকে বেঁচে যাওয়া অনেকেই স্থানীয় চিকিৎসকের সেবা নিয়েই সুস্থ হয়েছেন এমন নজিরও মিলেছে সেখানে গিয়ে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বলছে, দক্ষিণ কয়রার বেদকাশী ইউনিয়নের তিনদিক ঘেঁষা ১৪/১ নম্বর পোল্ডার পুনর্বাসনের কাজ চলছে। প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ সংস্কারের পাশাপাশি ব্লক বসিয়ে শক্তিশালী করা হচ্ছে। পাউবো’র নির্বাহী প্রকৌশলী এই প্রতিবেদককে জানান, “প্রকল্পটি এ বছরের জানুয়ারিতে শুরু হয়েছে। শেষ হতে আরও বছরখানেক লাগবে। এটি সম্পন্ন হলে মানুষের জীবন কিছুটা হলেও নিরাপদ হয়।উপজেলা সংবাদদাতা : সাতক্ষীরা শ্যামনগর উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা অস্বাভাবিকভাবে দিন দিন বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে দেশের দক্ষিণ পশ্চিমের জেলা সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের আবহাওয়া জীববৈচিত্র্যের উপর প্রভাব পড়ছে ব্যাপকভাবে।
জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে ১৯৮৮ সালে প্রথম এ উপকূলীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটে। ঘুর্ণীঝড়ের দাপটে নোনা পানির প্রচন্ড শ্রোতে উপকূলীয় এলাকার ফসলি জমি ও মানুষের জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এরপর উপকূলীয় অঞ্চলে পর্যায় ক্রমে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটতে থাকে।
দেশের দক্ষিণ পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের উপর দিয়ে ২০০৮ সালের ১৫ নবেম্বর ‘সিডর’ এবং ২০০৯ সালের ২৫ মে ‘আইলা’ নামক দুটি প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট ঝড় বয়ে যায়। সিডর’ ও ‘আইলা’ ঝড়ের ফলে তাৎক্ষতিক ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াও এর ফলে একটা দীর্ঘ মেয়াদি পরিবেশগত ক্ষতি ও পরিবর্তন দেখা দিয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিহয় আইলায় ৭১১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে সমুদ্রের লোনাপানি প্রায় দুই লাখ একর ফসলি জমির ভেতর ঢুকে পড়ে আর বের হতে পারেনি। এর ফলে তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদি অনেক ক্ষতি হয়েছে। মিষ্টি পানির ফসল উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক বৃক্ষ ও গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ মারা গেছে। এবং লোনাপানির বদ্ধতার কারণে অনেক প্রজাতির উদ্ভিদ প্রায় বিলুপ্ত হয়েছে। অনেক বন্যপ্রাণী ও স্থানীয়ভাবে পালন করা হাস, গরু, ছাগল,প্রভৃতির খাদ্য সংকট সৃষ্টি হওয়ায় এ অঞ্চলে সকল গৃহপালিত পশুপালন ব্যাহত হয়েছে।
আর এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার নানা দিকের একটি হলো এ অঞ্চলের মানুষের খাদ্য পুষ্টি ঘাটতি।
আইলায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাতক্ষীরা জেলার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে সরকার এবং বিভিন্ন এনজিও ও সংস্থা সাহায্য কারলেও, আইলার আট বছর পরেও এ এলাকা মানুষের বসবাসের উপযোগী করে গড়েতুলতে পারিনি। পারিনি এই উপকূলীয় মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা, পুষ্টি ও খাদ্য নিশ্চিত করতে।
ছবিতে, আইলায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত সাতক্ষীরা শ্যামনগর উপজেলার পদ্মাপুকুর ইউনিয়নের শিক্ষা ও চিকিৎসাহীন গুচ্ছগ্রামের অপুষ্টো শিশুরা। এই গুচ্ছগ্রামে ৮১ পরিবারে দু’শোরও বেশি অপুষ্ট শিশু রয়েছে। শিক্ষা চিকিৎসাহীন অপুষ্ট শিশুরা ব্যাবহার হচ্ছে এনজিও ও সংস্থাগুলোর কাছে।
জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশের এই উপকূলীয় অঞ্চল। এইমর্মে, বিশ্বের বড় বড় দাতাসংস্থার কাছে অপুষ্ট মা শিশু ও অসহায় মানুষের করুণচিত্র তুলেধরে বিশাল অঙ্কের অর্থ সহযোগিতা নিয়ে নিজেরাই পকেট ভর্তি করছে এনজিও ও সংস্থাগুলো। শুধুই খাতা কলমে কর্মকান্ড সীমাবদ্ধ রেখেছেন। মুখে বলেন উপকূলের মানুষের সুপেয়পানি, পুষ্টি, চিকিৎসা, শিক্ষা, নিশ্চিত করা হয়েছে। সৃষ্টি করা হয়েছে বনায়ন ও কর্মসংস্থানের। সরজমিনে গিয়ে দেখা যায় এ সবের উল্টো, উপকূলীয় মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছে।
আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত এউপকূলীয় অঞ্চলে বনায়ন সৃষ্টিকরা হয়নি, চাষাবাদের অযোগ্য রয়ে গেছে সমতল ভূমি। নেই সুপেয় পানির ব্যবস্থা।
মানুষে মানুষে প্রাণে প্রাণে, মনে মনে ভিন্ন প্রতিবেশে আন্তঃসম্পকের্র আরো বৃদ্ধি পাক এই স্লোগানে সম্প্রতি দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের সাথে তাদের শত দুর্যোগে যুদ্ধ করে টিকে থাকার গল্প ও জীবন থেকে শিক্ষার এক ভিন্ন অবিজ্ঞতা বিনিময় সফর করলাম। কর্মসূচির আলোকে তাদের সংক্ষিপ্ত বয়ানে অভিজ্ঞতা বলার চেষ্টা করব।
গত ১৮ মার্চ ২০২৩ বারসিক মানিকগঞ্জ রিসোর্স সেন্টার থেকে আমি মো. নজরুল ইসলাম, সহকর্মী রুমা আক্তার. হরিরামপুর চর জলবায়ু সেচ্ছাসেবক টিমের সদস্য ফয়সাল হোসেন ও ঘিওর নালীর আলোর পথ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাইকেল আকাশ নিয়ে শ্যামনগর, মুন্সিগঞ্জ,কলবাড়িয়া বারসিক অফিসের পথে রওনা দিলাম এবং কলবাড়ি বরসা রিসোর্টে এসেই মিজারিও জার্মান প্রতিনিধি ড্যানিয়েল বোস্টন ও বারসিক নির্বাহী পরিচালক সুকান্ত সেনসহ অংশগ্রহণকারিদের সাথে মতবিনিময় সভায় যোগদান করলাম। সপ্তাহব্যাপি কর্মসূচির নির্দেশনায় আছেন বারসিক পরিচালক পাভেল পার্থ, সিলভানুস লামিন ও সমন্বয়কারী জাহাঙ্গীর আলম, উপকূলীয় সমন্বয়কারি রামকৃষ্ণ জোয়ারদার ও বাবলু জোয়ারদার, মফিজুর রহমানসহ সাতক্ষীরা, রাজশাহী, নেত্রকোণা ও মানিকগঞ্জের অংশগ্রহণকারীগণ।
পরদিন সকালে বারসিক কলবাড়ি অফিসে সবাই সকালের নাস্তা করে বরসা রির্সোটের লঞ্চ ঘাটে শ্যামনগর এসএসটি ও সিডিও স্বেচ্ছাসেবীদের সাথে লঞ্চ ঘাটে আসলাম। তারপর সবাই মিলে সুন্দরবন রক্ষায় ট্রলারে ব্যানার ধরে উই ওয়ান্ট জাস্টিস, উই ওয়ান্ট ক্লাইমেট স্লোগানে নিয়ে চুনা নদী দিয়ে কলাগাছিয়ার দিকে রওনা দিলাম। জলাবন দেখতে মনোরম দুপাশে ধুগুধুগু বন আর বন এবং চারিদিকে অথই পানি। রাজশাহীর জামিল, মীম, স্মৃতি, তাসনিম, নেত্রকোনার অর্জুন, আইরিন, রনি, রুমি, নেত্রকোনার জাহাঙ্গীর, রাইসুল, মিলন ও সহকর্মী বাবলু, মফিজ, মানিকগঞ্জ থেকে নজরুল, রুমা,ফয়সাল ও আকাশ এবং ঢাকা থেকে পাভেল পার্থ,সিলভানুস লামিন, জাহাঙ্গীর আলম ভাইসহ সবাই নাচে গানে আনন্দে মেতে উঠলাম। তারপর কলাগাছিয়া ঘাটে এসেই বৈশি^ক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সুন্দবন সুরক্ষায় বিভিন্ন স্লোগান ধরে ব্যানার ফেস্টুন ধরে মানববন্ধন করলাম। তারপর কলাগাছিয়া ইকোপার্কে প্রবেশ করেই বানর ও হরিণ দেখতে দেখতে ক্রোকোডাইল তিন তলা টাওয়ার, কুমিরের বেস্টনী, পুকুর কালভার্ট ও চারপাশে সবুজ নিলাভিরাম সুন্দর, বাইন, কেউরা ও পশুর গাছের মনোরম দৃশ্য দেখে আমরা সবাই মুগ্ধ। বিভিন্ন পয়েন্টে ফটোসেশন তো চলছেই। তারপর দ্রুত ঘাটে এসে ট্রলারে উঠে ভারাক্রান্ত মনে এত কাছের সুন্দরবনকে বিদায় জানাতে হলো। পুনরায় কলবাড়িয়া ঘাটে এসে আবার মানবন্ধন করে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের প্রতি অসীম ভালোবাসা ও বনদস্যু দানবদের প্রতি ঘৃনা জানিয়ে বিদায় নিলাম। সবাই বেশ ক্লান্ত হলেও গবেষক পাভেল পার্থ দার নির্দেশনায় বরসা রিসোর্ট হলরুমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিরা দ্বন্দ্ব রুপান্তর ও সক্ষমতা বিষয়ক কর্মশালায় বিষয়ভিত্তিক সেশন ও লেখালিখি সাংবাদিকতা বিষয়ক সেশন ও কালচারাল অনুষ্ঠানের জন্য মিলিত হলাম। প্রথমেই প্রশিক্ষক প্রশিক্ষণের পুনআলোচনা করেন বারসিক প্রকল্প সমন্বয়করি জাহাঙ্গীর আলম এবং ফিচার লিখনের ওপর সেশন পরিচালনা করেন বারসিক নিউজ সম্পাদক সিলভানুস লামিন। তারপর রাতের খাবর প্রস্তুতের আগ পর্যন্ত মানিকগঞ্জ থেকে আমাদের লিজা আক্তার, ফয়সাল হোসেন, সাতক্ষিরা থেকে বিধান মান্ডু, বিশ^জিত দা, নেত্রকোনা থেকে আইরিন হেমব্রম, অর্জুন হাজং ও রনি খান, রাজশাহী থেকে জামাল, মিম ও স্মৃতি ঢাকা থেকে পাভেল পার্থ দা নাচ গান কবিতাসহ সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশগ্রহণ করেন।
পদ্মপুকুর ইউনিয়নের দীর্ঘদিনের সাবেক ইউপি সদস্য ও প্যানেল চেয়ারমেন মো. আশরাফ হোসে একজন সাদা মনের মানুষ। তিনি সারাদিন আমাদের সময় দিয়েছেন এবং তার জীবন ্ও এলাকার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিনিয়তই আমাদের শত দুর্যোগের সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয়। আমরা আইলা, হারিকেন, নার্গিসের মতোন দুর্যোগ মোকাবিলা করেছি। সরকারি সংকেত শুনে আমরা বারসিক ও স্থানীয় সংগঠন যৌথভাবে মানুষদের সচেতন করতে আশ্রয়ন প্রকল্পে আহবান করেছি। প্রতিদিন জোয়ার ভাটায় বাঁধ ও রাস্তা ভেঙে যাচ্ছে। মাটিতে লবণের পরিমাণ বেশি হওয়াতে বাঁধ থাকছে না। নদীতে দেশী মাছ না থাকার অন্যতম কারণ হলো কারেন্ট জাল ব্যবহার, রাসায়নিক প্রয়োগ ইত্যাদি। জমিতে লবণ পনি বৃদ্ধি পাওয়াতে অন্য কোন ফসল হয়না বিধায় আমরা চিংড়ী চাষ করি। কিন্তু চিংড়ী ঘেরে বর্তমানে সার বিষ কিটনাশকসহ প্রচুর মূলধন লাগছে। বাজার সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে কৃষক মুনাফা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমরা এই সকল সমস্যসহ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় করনীয় বিষয়ে কৃষি অফিসসহ সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছি এবং আপনাদের মাধ্যমে জোর দাবি জানাচ্ছি।
বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরে কূল ঘেঁষে দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা। এই জেলার সবচেয়ে বড় উপজেলা উপকূলীয় ১২টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত শ্যামনগর উপজেলা। শ্যামনগর মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের কলবাড়িয়া বরসা রিসোর্টের পাশেই স্কুল শিক্ষার্থী শিশু জয় বাইনদের বাড়ী। জয় বাইন তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। সে বলে, ‘আমরা প্রতিদিন লবণ পানির সাথে খেলা করি। আমার বাবা ও মা নদীতে মাছ ধরে ও বনে মৌয়ালদের সাথে কাজ করেন। আমরা গরিব মানুষ। বাবা মায়ের কষ্ট বুঝি। নদীতে প্রতিদিন জোয়ার ও ভাটা হয়। আমরা জোয়ার ভাটায় খেলা করি। মাছ ধরা আমার নেশা। বিশেষ করে চিংড়ি, কাকরা, ফেসা মাছ ধরে খবই আনন্দ পাই। বেশি ধরতে পারলে বিক্রি করি। এগুলো দেশি মাছ বলে দাম ও চাহিদা বেশি। সবদিন মাছ হয়না কেন জানিনা। তবে আমার মনে হয় কারেন্ট জালসহ রাসায়নিকের কারণে আমরা মাছ পাইনা। আমি সরকারের কাছে এই জাল নিষিদ্ধসহ নদীকে বিষ মুক্ত রাখার দাবি জানাই।
অভিজ্ঞতার আলোকে আরো বলতে গেলে- নেত্রকোণার কলমাকান্দার লেঙ্গুরা গ্রামের মেয়ে সুস্মিতা হাজংদের এলাকা প্রতিবছর পাহাড়ি ঢলে আক্রান্ত হয়। পাহাড়ের বালিতে নষ্ট হয় ফসলের জমি, বাড়ছে পানি সংকট। রাজশাহীর তানোরের মুন্ডুমালার মেয়ে আইরিন হেমব্রমের গ্রামে পানির খুব অভাব। অনাবৃষ্টি আর খরার প্রতিবছর নষ্ট হয় ফসলের জমি। মানিকগঞ্জের হরিরামপুরের ‘চর জলবায়ু স্বেচ্ছাসেবক টিমের’ সদস্য ফয়সাল হোসেনদের চরে নদীভাঙন বাড়ছে। মানিকগঞ্জ, রাজশাহী, নেত্রকোণা ও ঢাকার জলবায়ু সংকটাপন্ন এলাকা থেকে এমন যুব তরুণ শিক্ষার্থীরা অংশ নিলেন ৪ দিন ব্যাপি এক প্রায়োগিক যুব জলবায়ু কর্মশালায়। যুবদের প্রত্যেকেই নিজ এলাকায় যুব সংগঠনের মাধ্যমে জলবায়ু ও পরিবেশ সচেতনতা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। শ্যামনগরের ‘সুন্দরবন স্টুডেন্ট সলিডারিটি টিমের (এসএসএসটি)’ সদস্য রাইসুল ইসলাম নানা এলাকা থেকে আগত যুবদের নিয়ে গেলেন গাবুরার চকবারা গ্রামে। শ্যামনগরের ৬টি ইউনিয়নের ৬টি গ্রাম ও সাতক্ষীরা বনরেঞ্জে আয়োজিত এই কর্মশালায় শ্যামনগরের এসএসএসটি এবং সিডিওর যুব সংগঠকেরা ভিন্ন ভিন্ন এলাকার তরুণদের নিয়ে দলগতভাবে উপকূল ঘুরিয়ে দেখালেন। অংশগ্রহণকারীরা উপকূলের কৃষক, বনজীবী, জেলে, মুন্ডা-বাগদী, উন্নয়নকর্মী, শিক্ষক, স্থানীয় সরকার, জনসংগঠন ও যুব প্রতিনিধিদের কাছ থেকে জানলেন জলবায়ু সংকট, দ্বন্দ্ব এবং টিকে থাকার কৌশলগুলো।
নিজের চোখে দেখলেন জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব এবং উপকূল মানুষের জীবনসংগ্রাম। ভিন্ন ভিন্ন এলাকা থেকে আগত তরুণেরা জানালেন, সব এলাকাতেই জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব পড়েছে এবং এ কারণে সবার জীবনে বাড়ছে সংকট। দেশের ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের যুবরা উপকূল অঞ্চলের জলবায়ু সংকট এবং বেঁচে থাকার সংগ্রামকে খুব কঠিন দুঃসহ বাস্তবতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কর্মশালার অংশ হিসেবে যুবরা ‘সুন্দরবনকে প্লাস্টিক ও বিষমুক্ত রাখার দাবিতে’ মুন্সীগঞ্জ থেকে কলাগাছিয়া পর্যন্ত এক জলবায়ু প্রচারাভিযান আয়োজন করেন যুবরা। কাগজ ও কাপড়ে হাতে লেখা বিভিন্ন ব্যানার ও ফেস্টুনের মাধ্যমে যুবরা জানান, বিশ^ ঐতিহ্য কেবল দুর্যোগ থেকে দেশকে বাঁচায় না বরং বিশে^ও এই বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন পৃথিবীর এক বৃহত কার্বণ শোষণাগার। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লবণাক্ততা, জোয়ারের উচ্চতা এবং দুর্যোগ বৃব্ধির প্রভাব থেকে এই বনকে বাঁচাতে হবে পৃথিবীর টিকে থাকার স্বার্থে।
দেশের সব তরুণ যুবদেরকেই সচেতনভাবে এই দায়িত্ব নিতে হবে। আটুলিয়ার বিড়ালাক্ষী, সদরের কালমেঘা, মুন্সিগঞ্জের ।