1. mesharulislammonir1122@gmail.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন
  2. info@www.sangjogprotidin.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন :
বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:২১ পূর্বাহ্ন

আদি পিতা আদম আঃ সালামের জীবন বৃত্তান্ত পর্ব ৫

  • প্রকাশিত: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ০ বার পড়া হয়েছে

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : (আ)-এর সন্তান-সন্তুতির আলোচনা প্রসঙ্গে ইমাম আহমদ প্রমুখ বিশিষ্ট মুহাদ্দিছ বর্ণিত এক হাদীছে আছে, হুযূর (স) বলেন : হাওয়ার সন্তানগণ বাঁচিত না। একবার হাওয়ার গর্ভে সন্তান আগমন করিলে শয়তান তাঁহার নিকট আসিয়া বলিল, তুমি উহার নাম আবদুল হারিছ রাখিয়া দাও। তাহা হইলে সে বাঁচিবে। সে মতে তিনি তাহার আবদুল হারিছ বলিয়া নামকরণ করিলেন এবং সত্য সত্যই এই সন্তানটি বাঁচিয়া যায়। উহা ছিল শয়তানের প্ররোচনা ও নির্দেশ (কাসাসুল আম্বিয়া (উর্দু খুলাসাতুল আম্বিয়ার অনুবাদ), গদ্যানুবাদ মোহাম্মদ হাসান এফ.এম.এম.এ, বি-এড, ইসলামিয়া, লাইব্রেরী, আন্দরকিল্লা চট্টগ্রাম, ১ম প্রকাশ ১৯৪, পৃ. ৪৫; আহমদ ৫খ, ১১)।
তিরমিযী, ইবন জারীর, ইবন আবী হাতিম, ইবন মারদুয়ায় প্রমুখ বিশিষ্ট মুহাদ্দিছ ও মুফাসসিরও তাঁহাদের তাফসীরে এই হাদীছ রিওয়ায়াত করিয়াছেন। হাকেম ও তদীয় মুস্তাদরাক কিতাবে উহা উদ্ধৃত করিয়াছেন। হাকেম তো রীতিমত উহার “সনদ সহীহ, যদিও বুখারী মুসলিম (র) উহা রিওয়ায়াত করেন নাই” বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন। তিরমিযী বলিয়াছেন ও হাদীছটি হাসান-গরীব পর্যায়ের, উমার ইবন ইবরাহীমের সূত্র ছাড়া অন্য কোন সুত্রে উহা আমরা প্রাপ্ত হই নাই। কেহ কেহ আবদুস সামাদ সূত্রে বর্ণনা করিলেও উহাকে মারফু পর্যায়ে উত্তীর্ণ করেন নাই অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাণীরূপে নহে, সাহাবীর উক্তিরূপেই বর্ণনা করিয়াছেন (তিরমিযী, হাদীস নং ৩০৭৭)। আল্লামা ইবন কাছীর (র) হাদীছটির সূত্র সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনার পর সিদ্ধান্ত টানিয়াছেন এইভাবে ও স্পষ্টতই উহা কাব আহবার সূত্রে প্রাপ্ত, স্পষ্টতই রাবী উহা ইসরাঈলী উপাখ্যান হইতে প্রাপ্ত হইয়াছেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৮৯)। উক্ত হাদীছ সম্পর্কে আমাদের এই দীর্ঘ আলোচনার কারণ হইতেছে হারিছ শয়তানের একটি নাম। তাই আবদুল হারিছ অর্থ শয়তানের দাস। আল্লাহর খিলাফতের মর্যাদা লাভকারী এবং শয়তানের তার্যিমী সিজদাপ্রাপ্ত সম্মানিত আদম (আ)-এর সন্তানের এরূপ নামকরণ সহজে মানিয়া লওয়া যায় না।
এজন্য হাসান বসরী (র), যে সমস্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় উক্ত হাদীছ বলিয়া কথিত রিওয়ায়াত বর্ণনা করা হইয়াছে, সেগুলির ভিন্ন ব্যাখ্যা করিয়াছেন। তিনি যদি উক্ত বর্ণনাটিকে মরফু হাদীছ বলিয়া মানিয়া লইতেন তাহা হইলে ভিন্নতর ব্যাখ্যার আশ্রয় লইতেন না।
আল্লামা ইবন কাছীর (র) একটি যুক্তির দ্বারাও উক্ত বর্ণনাটির মারফু হাদীছ হওয়ার বিষয়টি নাকচ করিয়া দিয়াছেন। তাহার যুক্তি হইল : আল্লাহ তাআলা অদম (আ) ও হাওয়া (আ)-কে মানব জাতির উৎসমূলরূপে এবং তাঁহাদের দ্বারা অগণিত মানব-মানবী সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিয়াছেন। এমতাবস্থায় হাওয়ার সন্তান বাঁচিত না তাহা কেমন করিয়া হইতে পারে! নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, উহাকে নবী করীম (স)-এর হাদীছ বলাটা ভ্রম প্রমাদ, ইহাকে মওকুফ বা সাহাবীর উক্তি আখ্যা দেওয়াই বিশুদ্ধতর। আমি আমার তাফসীর গ্রন্থে উহাই লিখিয়াছি (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, ৯০)।
কুরআন শরীফে হাবীল-কাবীলের ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবৃত হইয়াছে। কেননা ইহাই ছিল পৃথিবীতে হানাহানি ও ভ্রাতৃ-হননের সর্বপ্রথম ঘটনা।
পূর্বেই উক্ত হইয়াছে যে, আদি মাতা হাওয়া (আ) প্রতিবারে দুইজন করিয়া সন্তান প্রসব করিতেন। উহাদের একজন পুত্র সন্তান এবং অন্য জন কন্যা সন্তান।
ফার্সী ‘খুলাসাতুল আম্বিয়া অবলম্বনে রচিত উর্দু কাসাসুল আম্বিয়া কিতাবের (মূল ফার্সী ভাষ্য হাজী মুহাম্মদ সাঈদ, উর্দু গ্রন্থাবলীর বিখ্যাত প্রকাশক, খালাসীটোলা, কোলকাতা, উর্দু ভাষ্য তদীয় পুত্র হাজী মুহাম্মদ শফীর এবং অপর উর্দু ভাষ্যটি গোলাম নবী কুমিল্লায়ী, প্রকাশক অধুনালুপ্ত কুরআন মঞ্জিল, বাবু বাজার, ঢাকা, বাংলা কাসাসুল আম্বিয়া পুঁথি উহা অবলম্বনেই রচিত। –জালালাবাদী)। বর্ণনা অনুযায়ী হযরত আদম (আ) ও হাওয়া দম্পতি ভারতবর্ষে আসিয়া বসবাস শুরু করিলে হাওয়া গর্ভবতী হন এবং প্রথমবারের মত একটি পুত্র সন্তান ও একটি কন্যা সন্তান প্রসব করেন। পুত্রটির নাম রাখা হয় কাবীল এবং কন্যাটির নাম রাখা হয় একলিমা । কন্যাটি অত্যন্ত রূপবতী ছিল। দ্বিতীয় দফায় তাহার গর্ভে যে যমজ পুত্র-কন্যার জন্ম হয় তাহাদের নাম রাখা হয় যথাক্রমে হাবীল ও গাযা। গাযা ততটা রূপবতী ছিল না। তাহাদের যখন বিবাহের বয়স হইল তখন একদা হযরত জিবরাঈল (আ) আদম (আ)-এর নিকট আগমন করিয়া বলেন, আল্লাহ তাআলা আপনার প্রতি সালাম জানাইয়া নির্দেশ দিয়াছেন যে, আপনি যেন হাবীলের সাথে কাবীলের যমজ ভগ্নির এবং কাবীলের সাথে হাবীলের যমজ ভগ্নির বিবাহের ব্যবস্থা করেন। সেমতে আদম (আ) তাঁহার উভয় সন্তানকে ডাকিয়া আল্লাহর নির্দেশের কথা তাহাদিগকে জানাইয়া দেন। কিন্তু কাবীল বাকিয়া বসিল এবং সে তাহার রূপবতী যমজ ভগ্নি একলিমাকে কোনমতেই হাতছাড়া করিতে রাজি হইল না। সে বলিল, আপনি যেহেতু হাবীলকে অধিক ভালবাসেন এইজন্য এরূপ বলিতেছেন। এইভাবে সর্বপ্রথম কাবীলই পৃথিবী বক্ষে পিতৃ-আদেশ অমান্য করিল। কিন্তু আদম (আ) তাহার আপত্তি অগ্রাহ্য করিয়া শেষ পর্যন্ত হাবীলের সহিত একলিমার বিবাহ দেন। কাবীল তাহাতে অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হইয়া উঠে এবং হাবীলকে চাপ দিতে থাকে যেন তিনি একলিমাকে তালাক দেন, যাহাতে সে একলিমাকে গ্রহণ করিতে পারে। কিন্তু হাবীল কোনক্রমেই তাহাতে সম্মত হইলেন না। তিনি বলিলেন, একলিমা আমার বৈধ স্ত্রী। আমার পিতা আল্লাহর হুকুমে আমার সহিত তাহার বিবাহ দিয়াছেন। এমতাবস্থায় কোনক্রমেই আমি পিতৃ আদেশ ও আল্লাহর আদেশ লজ্জন করিতে পারি না। যখন তাহাদের এই বাদানুবাদের কথা আদম (আ)-এর কর্ণগোচর হইল তখন তিনি তাহাদের সান্ত্বনার জন্য উভয়কে আল্লাহর দরবারে কুরবানী পেশ করিতে নির্দেশ দিলেন। সাথে সাথে বলিয়া দিলেন, যাহার কুরবানী আল্লাহর দরবারে কবুল হইবে, একলিমা তাহারই অধিকারে থাকিবে। সে মতে হাবীল একটি উৎকৃষ্ট দুম্বা এবং কাবীল কিছু নিকৃষ্ট শস্য কুরবানীরূপে উৎসর্গ করিয়া মিনার পাহাড় শীর্ষে রাখিয়া দিলেন, যাহার বর্ণনা রহিয়াছে কুরআনের এই আয়াতে?
“আদমের দুই পুত্রের বৃত্তান্ত তুমি তাহাদেরকে যথাযথভাবে শোনাও। যখন তাহারা উভয়ে কুরবানী করিয়াছিল, তখন একজনের কুরবানী কবুল হইল এবং অন্য জনের কবুল হইল না” (৫ : ২৭)।
মোটকথা, উভয় ভ্রাতাই কুরবানী করিলেন এবং মিনার পাহাড় চূড়ায় নিজ নিজ কুরবানী রাখিয়া তাহা কবুল হওয়ার জন্য আল্লাহর দরবারে দুআ করিলেন। এমন সময় ধুম্রবিহীন একটি আগুনের হষ্কা আসিয়া উট পাখির মত হাবীলের কুরবানীকে গ্রাস করিল। কাবীলের কুরবানী সেখানে পড়িয়াই রহিল। তখন কাবীল হাবীলের প্রতি আরও ক্ষিপ্ত হইয়া বলিল : adiu J6 “আমি অবশ্যই তোকে হত্যা করিব”। এবারে হাবীল বলিলেন, iiiii.! অবশ্যই আল্লাহ মুত্তাকীদের কুরবানী কবুল করেন”। উহাতে ক্ষিপ্ত হইয়া কাবীল হাবীলকে হত্যা করে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, পৃ. ৯৩)।
কাহিনী আকারে উপরে উদ্ধৃত হাবীল-কাবীলের সংঘাতের উক্ত ঘটনা এইরূপই বাংলা, উর্দু ও ফার্সী ভাষায় কাসাসুল আম্বিয়ার বদৌলতে লোকায়ত সাহিত্যের পর্যায়ে উন্নীত হইয়াছে। পুঁথি সাহিত্য ছাড়াও অধুনা প্রকাশিত পুঁথিভিত্তিক গদ্য পুস্তকাদিতেও উক্ত কাহিনীর এই বিবরণ দেশব্যাপী প্রচারিত হইতেছে (দ্র. আদি ও আসল কাছাছুল আম্বিয়া, কৃত এম, এন, ইমদাদুল্লাহ, এম. এ., বি.এ. অনার্স, রয়েল সাইজে ২ খণ্ডে প্রকাশিত, ৬৪০ পৃষ্ঠা কলেবর, প্রকাশক বাংলাদেশ তাজ কোম্পানী লিমিটেড, ৬. প্যারীদাস রোড, ঢাকা)। কিন্তু মৌলিক তাফসীর, হাদীছ ও ইতিহাস গ্রন্থসমূহের বর্ণনার আলোকে পর্যালোচনা না করিলে মূল বক্তব্য যথার্থ হইলেও উহাকে কাহিনীসুলভ অতিরঞ্জনের ছাপ রহিয়াছে বলিয়া প্রতীয়মান হয়। কেননা, তাফসীর তাবারী, ইবন কাছীর (র) কৃত বিশ্বকোষ পর্যায়ের ইতিহাস গ্রন্থ “আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া প্রভৃতি গ্রন্থে হাবীলের সহিত একলিমার বিবাহ হইয়াছিল বলিয়া কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না।
সুদ্দী, আবু মালিক, ইবন আব্বাস ও ইবন মাসউদ (রা) সূত্রে বর্ণিত আছে যে, কাবীল বয়সে হাবীলের চাইতে বড় ছিল। যমজ ভগ্নির রূপে বিমোহিত হইয়া সে বিবাহের ব্যাপারে পিতৃ-আদেশ অমান্য করে এবং তাহাকে বিবাহের ব্যাপারে নিজের অগ্রাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালায়। আদম (আ) তাহাদের উভয়কে কুরবানী করার পরামর্শ বা আদেশ দেন। তারপর তিনি হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কায় চলিয়া যান।
আদম (আ) মক্কায় চলিয়া যাওয়ার পর হাবীল-কাবীল দুই ভাই কুরবানী দেন। হাবীলের অনেক মেষ ছাগল ছিল। তিনি একটি হৃষ্টপুষ্ট পশু কুরবানী দিলেন। পক্ষান্তরে কাবীল তাহার ক্ষেতের নিম্ন মানের এক আঁটি ফসল উৎসর্গ করিল। আকাশ হইতে আগুন আসিয়া হাবীলের কুরবানীকে গ্রাস করিল, কিন্তু কাবীলের উৎসর্গীকৃত ফসল পড়িয়া রহিল। আগুন তাহা স্পর্শ করিল না। তখন কাবীল ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিল এবং বলিল, আমি তোমাকে হত্যা করিব যাহাতে তুমি আমার ভগ্নিকে বিবাহ করিতে না পার (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১ম জিলদ, পৃ. ৮৬; তাফসীর তাবারী, ৬খ, পৃ. ১৯১)।
এই উক্তি হইতে প্রতীয়মান হয় যে, একলিমার সাথে হাবীলের বিবাহ হয় নাই। রাবী আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা) বলেন, “আল্লাহর কসম! নিহত ব্যক্তি (অর্থাৎ হাবীল) তাহাদের উভয়ের মধ্যে অধিকতর বলিষ্ঠ ছিল। কিন্তু তাহার সংযম তাহাকে ভ্রাতার উপর হাত ভোলা হইতে বিরত রাখে (প্রাগুক্ত)।
আবু জাফর বাকির (র)-এর এক বর্ণনামতে, আদম (আ)-এর উপস্থিতিতেই তাহার উক্ত পুত্রদ্বয়ের কুরবানী প্রদান এবং হাবীলের কুরবানী কবুল হওয়ার ও কাবীলের কুরবানী কবুল না হওয়ার ঘটনা ঘটে এবং তিনি তাহা অবলোকনও করিয়াছিলেন। এই সময় কাবীল তাহাকে অভিযুক্ত করিয়া বলে, আপনি তাহার পক্ষে দুআ করিয়াছেন বলিয়াই তাহার কুরবানী কবুল হইয়াছে, আমার পক্ষে দুআ করেন নাই বলিয়া আমার কুরবানী কবুল হয় নাই। ঐ সময়ই সে হাবীলকে হত্যার হুমকি দেয়।
হাবীল নিজেকে নির্দোষ বলিয়া ঘোষণা করিয়া বলেন, তোমার কুরবানী কবুল না হওয়ার জন্য আমি দায়ী নই । আল্লাহ তাআলার চিরন্তন রীতি এই যে, তিনি কেবল মুত্তাকী লোকদের কুরবানী কবুল করেন। আল্লাহ ভীতির পথ অবলম্বন করিলে তোমার কুরবানীও কবুল হইত । তুমি তাহা কর নাই। তাই তোমার কুরবানী কবুল হয় নাই। ইহাতে আমার কী অপরাধ (তাফসীর মাআরিফুল কুরআন, ১ম জিলদ, মুফতী মুহাম্মদ শফী, সূরা মায়িদার ২৭ নং আয়াতের ব্যাখ্যায়)।
আল্লাহর আদেশ শরীয়তের বিধান সকলের শিরোধার্য হওয়া উচিত–স্বয়ং পিতার মুখে তাহা শুনিয়াও কাবীল তাহা গ্রাহ্য করে নাই। আদম (আ) কেবল পিতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন আল্লাহর প্রথম নবীও। তাই শুধু পিতারূপে আদেশ দিয়াই তিনি ক্ষান্ত হন নাই, নবীসুলভ প্রজ্ঞাও তিনি এই ক্ষেত্রে ব্যবহার করেন এবং কুরবানী প্রদানের মাধ্যমে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণের সমান সুযোগ উভয় পুত্রকেই প্রদান করেন। সে পরীক্ষায়ও যখন কাবীল উত্তীর্ণ হইতে পারিল না, বরং তাহার চক্ষের সম্মুখেই হাবীলের কুরবানী কবুল হইল এবং নিজের অগ্রহণযোগ্যতা দিবালোকের মত স্পষ্ট হইয়া উঠিল, তখন তাহার সংযত ও নিবৃত্ত হইয়া যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সে নিবৃত্ত হইল না, বরং রাগে, ক্ষোভে ও অপমানে তাহার হিতাহিত জ্ঞান লোপ পাইল। তাহার মধ্যে জিঘাংসা ও পশুপ্রবৃত্তি মাথাচাড়া দিয়া উঠিল। সে পিতার সম্মুখেই আপন সহোদর ভাইকে হত্যার প্রকাশ্য হুমকি দিয়া বসিল : আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করিব।
এই ক্ষেত্রে হাবীলের যেহেতু কোন অপরাধ ছিল না, তাই তিনি পাল্টা রাগ করিয়া তাহার চাইতে দুর্বলতর প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করিতে পারিতেন। কিন্তু তিনি ছিলেন মুত্তাকী, পিতৃভক্ত, সচ্চরিত্রের অধিকারী। তিনি অত্যন্ত সংযতভাবে বুদ্ধিগ্রাহ্য ভাষায় কুরবানী কবুল হওয়া না হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করিয়া ভাইকে শান্ত করিবার চেষ্টা করিলেন। পরোক্ষে অগ্রজকে আল্লাহভীতি অবলম্বনের আহ্বান জানাইলেন। কিন্তু কাবীলের জিদ আরও বৃদ্ধি পাইল। অগত্যা হাবীল তদীয় অগ্রজের এই সীমালঙ্ঘন ও তাহার প্রাণসংহারী প্রচেষ্টার মুখেও চরম ধৈর্য ও সংযমের পরিচয় দিবেন বলিয়া নিজের সংকল্পও ঘোষণা করিলেন এইভাবে : “আমাকে হত্যা করার জন্য তুমি হাত তুলিলেও তোমাকে হত্যা করার জন্য আমি হাত তুলিব না; আমি তো জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি” (৫ : ২৮)।
কিন্তু এতসব উপদেশ সত্ত্বেও কাবীলের পাপাচারী মন টলিল না। সে তাহার সংকল্পে অটল থাকিল। সর্বশেষে তিনি তাহাকে জাহান্নামের শাস্তির কথাটাও স্মরণ করাইয়া দিলেন : “তুমি আমার ও তোমার পাপের ভার বহন কর এবং অগ্রবর্তী হও, ইহাই আমি চাহি এবং ইহা যালিমদের কর্মফল” (৫ : ২৯)।
কিন্তু তারপরেও কাবীল নিবৃত্ত হইল না। “অতঃপর তাহার চিত্ত ভ্রাতৃ হত্যায় তাহাকে প্ররোচিত করিল। ফলে সে তাহাকে হত্যা করিল। তাই সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হইল” (৫ :৩০)।
সেই ক্ষতির পরিমাণ যে কী বিপুল হযরত ইবন মাসউদ (রা) বর্ণিত হাদীছে তাহার বিবরণ দেওয়া হইয়াছে এইভাবে:
“রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, অন্যায়ভাবে নিহত প্রত্যেকটি ব্যক্তির একটি দায়ভাগ আদমের প্রথম সন্তানটির উপর বর্তায়। কেননা হত্যার রীতি সেই সর্বপ্রথম প্রবর্তন করিয়াছিল” (আহমাদ, জিলদ ১, পৃ. ৩৮৩, ৪৩০ ও ৪৩৩)। এই ব্যাপারে কুরআন শরীফেও সতর্কবাণী রহিয়াছে। আল্লাহ তাআলা বলেন :
“নরহত্যা অথবা দুনিয়া ধ্বংসাত্মক কার্য করা হেতু ব্যতীত কেহ কাহাকেও হত্যা করিলে সে যেন দুনিয়ার সকল মানুষকেই হত্যা করিল” (৫ : ৩২)। হাবীল-কাবীলের মনোমলিন্যের কারণ
কুরআন মাজীদে আদমের দুই পুত্রের বিবরণ বর্ণনা প্রসঙ্গে তাহাদের এক ভাই অপর ভাইকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে বলিয়া বিবৃত হইয়াছে। কিন্তু ঐ পুত্রদ্বয়ের নাম উল্লেখ করা হয় নাই। এমনিভাবে কোন কোন হাদীছে ও (উদাহরণস্বরূপ দ্র. আহমাদ ইবন হাম্বাল, মুসনাদ, আত-তাবারী, তাফসীর, কায়রো সং, ১০খ, ২৩০; রিওয়ায়াত ১১৭৬৭-১১৭৬৯) ইবনায় আদাম বা আদমের পুত্রদ্বয় শব্দই ব্যবহৃত হইয়াছে। এতদসত্ত্বেও মুফাসসিরগণ ইহা দ্বারা হযরত আদম আলায়হিস সালামের দুই পুত্র হাবীল (নিহত) এবং কাবীল (হস্তা)-কেই বুঝান হইয়াছে বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। খুব সম্ভব এই ব্যাপারে মুফাসসিরগণের তথ্যসূত্র হইল ইসরাঈলী রিওয়ায়াত, বিশেষত তাওরাত (দ্র. বাইবেলের আদিপুস্তক, ৪ ও ১০-১৬ প্রভৃতি)। সেখানে তাহাদের নাম হাবীল ও কাবীল বলিয়া উল্লেখিত হইয়াছে (দ্র. আদিপুস্তক, ৪ : ১-১৬)। উহাকেই আরবীকরণের সময়ে হাবীল ও কাবীলরূপে উল্লেখ করা হইয়াছে। এই তথ্যের উপর ভিত্তি করিয়াই আত-তাবারী তাহার ইতিহাস গ্রন্থে প্রত্যেক জায়গায়ই কাবীলকে কাইনরূপেই উল্লেখ করিয়াছেন (আত-তাবারী, তারীখ, নির্ঘন্ট)। কোন কোন মুফাসসির (যথা হাসান ও দাহহাক প্রমুখ)। [ ] কথাটি ব্যাপক অর্থে গ্রহণ করিয়া উহা দ্বারা বানূ ইসরাঈল-এর ঘটনা বুঝানো হইয়াছে বলিয়া অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন (দ্র. আত-তাবারী, তাফসীর, গবেষণা সম্পা, মাহমূদ শাকির, কায়রো, ১০খ, ২২০, রিওয়ায়াত ১১৭২১; আর-রাযী, তাফসীর কাবীর, কায়রো ১৩১৮ হি, ৩খ, ৪০২; আল-আসী, রূহুল মাআনী, ৬খ, ১১১)। কিন্তু সাহাবী, তাবিঈ ও মাফাসসিরগণের অধিকাংশের মত হইল, উক্ত কথাটি দ্বারা হযরত আদম (আ)-এর ঔরসজাত দুই পুত্রকেই বুঝানো হইয়াছে (দ্র. আত-তাবারী, ১০খ, ২২০)। স্বয়ং কুরআন-হাদীছের কিছু বর্ণনা (কাক প্রেরণ করা প্রভৃতি) দ্বারা ইহার সমর্থন পাওয়া যায় (প্রাগুক্ত বরাত)।
কুরবানীর কারণ সম্পর্কেও মতভেদ রহিয়াছে। স্বয়ং কুরআন মাজীদে এই প্রসঙ্গ উত্থাপন করা হয় নাই, বরং “উভয়ে যখন নিজ নিজ কুরবানী পেশ করিয়াছিল” (৫ : ৮২)-এর দ্বারা বাক্য শুরু করা হইয়াছে। ইহাতে বুঝা যায় যে, উভয়ের মধ্যে কুরবানী কবুল হওয়া ও না হওয়ার ব্যাপারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। আত-তাবারী বিভিন্ন সাহাবী (রা) ও তাবিঈ (র) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, এই কুরবানী তাহারা স্বেচ্ছায় অথবা আল্লাহ তাআলার নির্দেশের আওতাধীনে করিয়াছিলেন (আত-তাবারী, ১০, পৃ. ২০৩-এর বরাতে ইসলামী বিশ্বকোষ, ২৫খ, পৃ. ২৩৬)। মওলানা হিফযুর রহমানও কুরআনে তাহাদের বিবাহ কাহিনীর কোন উল্লেখ না থাকার কথাটা উল্লেখ করিয়া উক্ত ভ্রাতৃদ্বয়ের মনোমালিন্যের কারণ যে বিবাহ না হইয়া কেবল কুরবানী কবুল হওয়া না হওয়া জনিত মনোমালিন্যও হইতে পারে সে দিকেই প্রকারান্তরে ইঙ্গিত করিয়াছেন (দ্র. কাসাসুল কুরআন, বঙ্গানুবাদ, ১খ, ৫৬)।
কাবীলের মনে ভ্রাতৃ-হত্যার জন্য জিঘাংসাভাব জাগিয়াছিল সত্য, কিন্তু ইতোপূর্বে হত্যাকৰ্ম তো পৃথিবীতে আর কোন দিন ঘটে নাই। তাই হত্যার প্রক্রিয়াও তাহার জানা ছিল না। কীভাবে তাহার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করিবে এইজন্য তাহার চিন্তার অবধি ছিল না। এমতাবস্থায় ইবলীস উপস্থিত হইল। মুহূর্তে সে একটি মানুষের রূপ ধারণ করিয়া কাবীলের সম্মুখ দিয়া ধীরে ধীরে হাঁটিতে লাগিল এবং কাবীলের দৃষ্টির অগোচরে একটি কৃত্রিম সাপ বানাইয়া পথের উপর ছাড়িয়া দিল। সাপটি ধীরে ধীরে মানবরূপী ইবলীসের দিকে অগ্রসর হইতেছিল। অমনি সে যমিন হইতে বৃহৎ একখণ্ড পাথর উঠাইয়া সর্পের মস্তক লক্ষ্য করিয়া সজোরে নিক্ষেপ করিল। পাথরের আঘাতে তৎক্ষণাৎ সর্পটি মারা গেল। ইহা কাবীলের চোখের সম্মুখেই ঘটিল। ইব্‌ন জুরায়জের বর্ণনায় সাপের স্থলে পাখির কথা উল্লেখ রহিয়াছে (তাফসীর মাযহারী, ৩খ, পৃ. ৮১)।
কাবীলের সমস্যা দূরীভূত হইয়া গেল। হত্যা করিবার উপায় সে শিখিয়া ফেলিল। সুতরাং আর কাল বিলম্ব না করিয়া সে নিজেও বৃহদাকার পাথর হাতে লইয়া ঘুমন্ত হাবীলের মস্তক লক্ষ্য করিয়া সজোরে নিক্ষেপ করিল। সঙ্গে সঙ্গে হাবীলের মৃত্যু ঘটিল। কাসাসুল আম্বিয়ার বর্ণনামতে, এই ঘটনাটি ঘটে হযরত আদম (আ)-এর মক্কা শরীফে হজ্জ করিতে যাওয়াকালীন অনুপস্থিতির সুযোগে। কিন্তু ইবন কাছীর (র)-এর বর্ণনায় উহা ঘটে হযরত আদম (আ)-এর আপন বাড়িতে উপস্থিত থাকাকালে। তাঁহার বর্ণনায় সুস্পষ্টভাবে উল্লিখিত আছেঃ “একদা রাত্রিবেলা যখন হাবীলের চারণভূমি হইতে ফিরিতে বিলম্ব হইতেছিল, তখন চিন্তিত পিতা আদম (আ) কি কারণে বিলম্ব হইতেছে তাহা দেখিবার জন্য কাবীলকে চারণভূমিতে পাঠাইলেন” (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, পৃ. ৮৬; কাসাসুল আম্বিয়া, আরবী, ইবন কাছীর, পৃ. ৫৩)।
সেমতে কাবীল চারণভূমিতে গিয়া উপস্থিত হইল। তখন সত্য সত্যই হাবীল সেখানেই ছিলেন। কাবীল তাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, তোমার কুরবানী কবুল হইল, আমারটা হইল না।
জবাবে হাবীল বলিলেন, “আল্লাহ কেবল মুত্তাকীদের পক্ষ হইতেই কবুল করিয়া থাকেন।”
তিনি এই বাক্যের দ্বারা বুঝাইতে চাহিয়াছেন যে, তাকওয়া হইতেছে কবুলিয়তের পূর্বশর্ত। তুমি যদি তাকওয়া অবলম্বন করিয়া কবুলিয়তের সেই পূর্বশর্ত পূরণ করিতে ব্যর্থ হও, তবে তাহাতে আমার অপরাধ কি? কাবীলের কাছে উহার কোন সদুত্তর ছিল না। এইজন্য লজ্জিত হওয়ার পরিবর্তে তাহার ক্রোধ ও জিঘাংসাই বৃদ্ধি পায় এবং হস্তস্থিত একটি লৌহদণ্ড দ্বারা আঘাত করিয়া তাহার প্রাণ সংহার করে।
ইব্‌ন কাছীর (র)-এর বাকভঙ্গি হইতে প্রতীয়মান হয় যে, উহা সৰ্ববাদীসম্মত মত নহে। তাই তিনি আরও লিখেন, কাহারও কাহারও মতে সে তাহার দিকে একটি প্রস্তরখণ্ড নিক্ষেপ করে যাহা তাহার মস্তিষ্কে পতিত হইয়া তাহা চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া ফেলে। তখন হাবীল নিদ্রিত অবস্থায় ছিলেন। আবার কেহ কেহ বলিয়াছেন, বরং সে তাহাকে সজোরে গলা চাপিয়া ধরিয়া শাসরুদ্ধ করে এবং তারপর হিংস্র প্রাণীদের মত কামড়াইয়া তাহার দেহকে ক্ষতবিক্ষত করিয়া ফেলে। এইভাবে হাবীলের মৃত্যু হয়। আল্লাহই সম্যক অবগত (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, পৃ. ৮৬)।
দামিশকের উত্তরে অবস্থিত কাসিউন পাহাড়ের চূড়ায় একটি গুহাকে রক্ত গুহা বলিয়া অভিহিত করা হইত। বর্তমানে ইহা “আরবাঈন” নামে পরিচিত। কাবীল হাবীলকে উক্ত স্থানে হত্যা করিয়াছিল বলিয়া জনশ্রুতি রহিয়াছে। এই জনশ্রুতির কথা আহলে কিতাব সূত্রে প্রাপ্ত। উহা কতটুকু সত্য তাহা একমাত্র আল্লাহই জানেন।
হাফিয ইব্‌ন আসাকির (র) তদীয় গ্রন্থে ‘আহমাদ ইব্‌ন কাছীর (র)-এর জীবনী আলোচনা প্রসঙ্গে একটি আশ্চর্যজনক কথা লিপিবদ্ধ করিয়াছেন।
‘তিনি (আহমদ ইবন কাছীর) একজন পুণ্যবান ব্যক্তি ছিলেন। তিনি একদা নবী করীম (স) আবু বাকর (রা) ও হাবীলকে স্বপ্নে দেখেন। তিনি ঐ সময় হাবীলকে আল্লাহর নামে কসম দিয়া জিজ্ঞাসা করেন যে, সত্য সত্যই ঐ স্থানটি তাহার হত্যাস্থল কিনা? তিনি শপথ পূর্বক তাহা স্বীকার করেন এবং বলেন যে, তিনি আল্লাহর নিকট দুআ করিয়াছিলেন যে, ঐ স্থানটিকে যেন তিনি দুআ কবুলের স্থানরূপে গ্রহণ করিয়া লন। আল্লাহ তাআলা তাহার সেই দুআটি কবুলও করেন। হাফিয ইবন কাছীর (র) মন্তব্য করেন যে, ইহা একটি স্বপ্নমাত্ৰ (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, পৃ. ৮৭)।
হাবীলকে হত্যার পরিণতিতে কাবীলের কি সর্বনাশ সাধিত হইল তাহার বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ পাকের বাণী :
“ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হইল”। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় সায়্যিদ কুতব শহীদ বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত হইয়া ধ্বংসের গহ্বরে নিপতিত হইল। নিজের সাহায্যকারী ও সাথী ভাইকে হারাইল। কেননা খুনীর জীবন কখনও সুখের হয় না। সে আখিরাতেও ক্ষতিগ্রস্ত হইল। ফলে সে হত্যা সংক্রান্ত তাহার প্রথম পাপ ও পরবর্তীতে পাপে ক্ষতিগ্রস্ত হইল। অতঃপর তাহার অপরাধের ফলশ্রুতিতে মৃত ভাইয়ের শবদেহ পচিয়া দুর্গন্ধ ছড়াইয়া অসহনীয় পরিবেশ সৃষ্টি করিল। আল্লাহ তাআলার সুগভীর প্রজ্ঞা সেই দুর্ধর্ষ খুনীর সম্মুখে তাহার একটি অক্ষমতা প্রকাশ করিয়া দিল। সে ভাইয়ের মৃতদেহ দাফন-কাফনে অক্ষম হইয়া পড়িল, এমনকি ক্ষুদ্র কাক যাহা পারে তাহাও সে পারে না এমন লজ্জাকর অবস্থায় সে নিপতিত হইল (ফী যিলালিল কুরআন, ২খ, পৃ. ৮৭৭; সূরা মায়িদার ৩০ নং আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে)।
আল্লামা শাব্বীর আহমদ উছমানী (র) তাহার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ব্যাখ্যায় বলেন : “পার্থিব ক্ষতি তো এই যে, এমন একজন পুণ্যবান ভাই যিনি তাহার বাহুবল হইতে পারিতেন, তাহাকেই সে হারাইল আর নিজে উম্মাদ হইয়া মৃত্যুবরণ করিল। হাদীছে আছে, যুলুম এবং ঘনিষ্ঠজনদের সহিত সম্পর্কচ্ছেদ করা এমন দুইটি পাপ যাহার শাস্তি আখিরাতের পূর্বে এই দুনিয়াতেও ভোগ করিতে হয়। আর পারলৌকিক ক্ষতি এই যে, যুলুম, ঘনিষ্ঠ জনদের সহিত সম্পর্কচ্ছেদ, ইচ্ছাকৃতভাবে নরহত্যা এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির দ্বার উন্মোচন করায় পৃথিবীতে এই জাতীয় যাবতীয় পাপের উদ্বোধনকারীরূপে সেই সকল পাপে তাহার একটি অংশ থাকিয়া যাইবে, যাহা স্পষ্টভাবে হাদীছে উক্ত হইয়াছে (সূরা মাইদার ৩০ নং আয়াতের তর্জমার পাদটীকায়, তাফসীরে উছমানী, ১খ, পৃ. ৫২২, পাদটীকা ১০৮)।
পৃথিবীতে যেহেতু ইতোপূর্বে কোন মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে নাই, তাই হাবীলের লাশ কাবীলের জন্য এক মহা সমস্যা হইয়া দেখা দিল। লাশ এইভাবে পড়িয়া থাকিলে তাহা পিতা-মাতা ও অন্যান্য ভাই-বোনের গোচরে আসিবে। হাবীলকে যেহেতু সে প্রকাশ্যেই হত্যার হুমকি দিয়াছিল এবং তাহার প্রতি তাহার বিদ্বেষ ও কোপানলের কথা অজ্ঞাত ছিল না, তাই এই লাশ দেখামাত্র যে কেহ চক্ষু খুঁজিয়া বলিয়া দিবে যে, ইহা একমাত্র কাবীলেরই কাজ হইতে পারে। তাই দুশ্চিন্তায় কাবীল দিক-বিদিক জ্ঞান হারাইয়া ফেলিল এবং লাশ কাঁধে তুলিয়া এদিক-সেদিক ছুটিতে লাগিল। ভাইয়ের লাশ লইয়া কাবীলের উদ্ৰান্তভাবে বেড়াইবার এই মেয়াদ কেহ চল্লিশ দিন, আবার কেহ এক বৎসর কাল দীর্ঘ ছিল বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন (তাফসীর মাযহারী, ৩খ, পৃ. ৮১; বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, পৃ. ৮৮)।
“অতঃপর আল্লাহ একটি কাক পাঠাইলেন, যে তাহার ভ্রাতার মৃতদেহ কিভাবে গোপন করা যায় তাহা দেখাইবার জন্য মাটি খনন করিতে লাগিল। সে বলিল, হায়! আমি কি এই কাকের মতও হইতে পারিলাম না, যাহাতে আমার ভ্রাতার মৃতদেহ গোপন করিতে পারি। অতঃপর সে অনুতপ্ত হইল” (৫ : ৩১)।
আস-সুদ্দী কতক সাহাবীর বরাতে বর্ণনা করেন যে, ঐ সময় আল্লাহ তাআলা দুইটি সহোদর কাক প্রেরণ করিয়াছিলেন। উভয় কাক সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং তাহাদের একটি অপরটিকে হত্যা করে। হত্যাকৰ্ম সম্পন্ন করার পর হন্তা কাকটি মাটি খনন করিয়া তাহার মৃত ভাইয়ের দেহটি গর্তে নিক্ষেপ করিল এবং তারপর তাহা মাটি চাপা দিল। তাহা প্রত্যক্ষ করিয়া কাবীল বলিয়া উঠিল, হায়! আমি কি ঐ কাকটির মতও হইতে পারিলাম না যে, আমার ভাইয়ের লাশটি লোকচক্ষুর অন্তরালে গোপন করিয়া ফেলি! তখন সে কাকের অনুসরণে ঐরূপই করিল এবং হাবীলের মৃতদেহ দাফন করিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, পৃ. ৮৮; তাফসীর তাবারী, ৬খ, পৃ. ১৯৭; তাফসীর রূহুল মাআনী, ৬খ, পৃ. ১১৫-১১৬)।
এই ঘটনার পর্যালোচনা প্রসঙ্গে আল্লামা হিফযুর রহমান লিখেন, হাবীল ছিলেন আল্লাহর প্রিয়পাত্র আর কাবীল ছিল অভিশপ্ত। তাই হাবীলের পবিত্র মৃতদেহের যাহাতে অবমাননা না হয়, আদম সন্তানগণের মৃত্যুর পর যাহাতে সম্মানজনকভাবে তাহাদের মৃতদেহ দাফনের সুন্নাত বা রীতি প্রবর্তিত হয় এবং কাবীলকে যেন তাহার লজ্জাজনক অপরাধের দরুন এই দুনিয়ায়ও লাঞ্ছিত অপমানিত হইতে হয়, সে তাহার নির্বুদ্ধিতা ও অদূরদর্শিতার কথা যাহাতে হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি ‌হয়।

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।