
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : আমরা বোধহয় ভুলেই গেছি, শৈশব মানেই দুরন্তপনা। শৈশব মানেই স্মৃতি ও স্বপ্ন-জাগানিয়া সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কাটানো সময়। সেই শৈশবের দুরন্তপনা আর প্রকৃতির আলিঙ্গন থেকে সরে যাচ্ছে আমাদের প্রজন্ম। তাই নতুন প্রজন্মের জীবনস্মৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব। সস্তা প্রতিযোগিতাশীল বিবেক-বোধহীন পরিবেশে বড় হচ্ছে আমাদের শিশুরা। ইট, কংক্রিটের ফ্ল্যাট কালচারের আড়ালে শিশুরা ঠিকই বড় হচ্ছে—তবে তারা পাচ্ছে না সোনালি রোদের আলো, বর্ণিল মেঘের ছায়া, রংধনুর আলোর ঝলকানি অথবা নির্মল দামাল বাতাসের দমকা! চার দেয়ালের ভেতর তার জন্য সব বন্দিত্বের আয়োজন! টেলিভিশন, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, ফেসবুক, ভিডিও গেম আর মোবাইল গেম রীতিমতো ভূতের বোঝা হয়ে চেপেছে শিশুদের মনে। ডরিমন, পকিমন আর শিশুদের বেকুব বানানোর জন্য স্টার জলসার কিছু আয়োজন গিলে খাচ্ছে শিশুদের স্বপ্নবিলাস।
এখন অনেক বাবা-মায়ের অভিযোগ ডরিমন, পকিমন নিয়ে। অভিযোগ ইন্ডিয়ান চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠান নিয়ে। শিশুরা এখন অকপটে যেসব হিন্দি ভাষায় কথা বলতে শিখছে, যা শুনে বাবা-মায়েরা শুনে বোকা বনে যাচ্ছেন। তারা নিজেরাও জানে না এসব ভাষার মানে কী। যে শিশুটি ঠিকমতো বাংলা বলতে শিখেনি—সে স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করছে ভিনদেশি ভাষা হিন্দি! এখনো আমাদের টনক নড়ছে না!! অথচ টিভি অনুষ্ঠান নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিরুদ্ধে দাবি তুলেছে ভারতীয় বাবা-মায়েরা।
অ্যাসোসিয়েটেড চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি অব ইন্ডিয়ার এক জরিপে জানা যায়, টিভি অনুষ্ঠানে লাগামহীন যৌনতা ও সহিংসতা প্রদর্শনে রাশ টানতে একটি নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ চায় ৬৩ শতাংশ ভারতীয় বাবা-মা। জরিপের ফলাফলে দেখানো হয়—শিশুদের ১০ শতাংশ সহিংস আচরণের জন্য টিভি অনুষ্ঠানের চমৎকার প্রদর্শন দায়ী। জরিপে ৭৬ শতাংশ বাবা-মা বিশ্বাস করে টেলিভিশনের অনুষ্ঠানের কারণেই চার থেকে আট বছর বয়সী শিশুরা অভিভাবকদের শ্রদ্ধা করে না। এই হলো ভারতে অবস্থা। ভারতের আগ্রাসী প্রভাব এখন আমাদের দেশেও পড়তে শুরু করেছে।
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানা গেছে, দাদা-দাদি, নানা-নানির সাহচর্য শিশুদের দীর্ঘজীবী করে। এখন দাদাবাড়ি, নানাবাড়ি বা মামার বাড়ি বেড়ানো উচ্ছ্বাস শিশুদের জীবনে নেই। শহুরে শিশুরা নদী দেখে না, সাঁতার জানে না। ঝড়ের দিনে আম কুড়ানো অসাধারণ রোমাঞ্চকর সাহসিকা তাদের জীবনে ঘটে না! কারণ, পারিবারিক সংস্কৃতি বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে। শিশুরা পাচ্ছে না যৌথ পারিবারিক বন্ধনের আনন্দমুখরতা। বিচ্ছিন্ন, ছন্নছাড়া পরিবারগুলোর মধ্যে নিরানন্দ বিষণ্নতায় শৈশব কাটছে। স্কুলের হোমওয়ার্ক, গৃহশিক্ষকের পড়া, তারপর বাবা-মায়ের স্বপ্নপূরণে সন্তানদের ওপর চাপিয়ে নাচ, গান প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার চাপে শিশুদের মধ্যে অস্বস্তি আর অস্থিরতা বাড়ছে। নিরানন্দ জীবনের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ শিশুরা। অভিভাবকরাও বুঝতে চায় না যে শিশুর জন্য কখন কী প্রয়োজন। শিশুমন কখন কী চায়, তার কী প্রয়োজন তা না বুঝেই তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় বাবা-মায়ের ইচ্ছা।
দাদা-দাদি, নানা-নানির সাহচর্য শিশুদের দীর্ঘজীবী করে। এখন দাদাবাড়ি, নানাবাড়ি বা মামার বাড়ি বেড়ানো উচ্ছ্বাস শিশুদের জীবনে নেই। শহুরে শিশুরা নদী দেখে না, সাঁতার জানে না। ঝড়ের দিনে আম কুড়ানো অসাধারণ রোমাঞ্চকর সাহসিকা তাদের জীবনে ঘটে না! কারণ, পারিবারিক সংস্কৃতি বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে…
ব্রিটেনভিত্তিক দাতব্য সংস্থা রয়েল সোসাইটির এক জরিপে জানা যায়, ব্রিটেনে ১৫ থেকে ৩৪ বছর বয়স্ক মানুষের কোনো সোনালি শৈশব নেই! প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়ার মতো অকৃত্রিম অভিজ্ঞতা তাদের জীবনে ঘটেনি! জরিপে সবাই একবাক্যে স্বীকার করেছেন—সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার জন্য শিশুজীবনে প্রকৃতিবান্ধব অভিজ্ঞতার কোনো বিকল্প নেই। প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের শিশুরা প্রকৃতির আলিঙ্গন কী পাচ্ছে? নগরসভ্যতা যেন সমৃদ্ধ শৈশবের সব আয়োজনকে গো-গ্রাসে গিলে ফেলছে। আর ব্যবস্থার নামে অভিভাবকরাও শিশুদের বায়না মেটাচ্ছেন কৃত্রিম আয়োজনে! এভাবে কী শিখবে আমাদের শিশুরা? মনোবিজ্ঞানী ডা. মেহতাব খানম বলেছেন, শিশুদের জন্য উপযোগী এবং সঠিক জীবন চর্চাই হচ্ছে না। এখন আমাদের পরিবারগুলোয় শ্রদ্ধা, স্নেহ-মমতা, সহিষ্ণুতা ও শর্তহীন ভালোবাসার চর্চা নেই। সবাই স্বার্থপরের মতো নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছি। আগে পরিবারে একে অপরের সঙ্গে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নিত। পরিবারগুলো ছিল বাবা-মা, দাদা-দাদিকেন্দ্রিক। গ্রামের সঙ্গে ছিল নিবিড় সম্পর্ক। বছরে দুই ঈদ ছাড়াও ধান কাটার মৌসুম, শীতের পিঠা-পায়েস উৎসব, বর্ষা ও আম-কাঁঠালের উৎসবকে কেন্দ্র করে গ্রামে যাওয়া হতো। ফলে শিশুরা পারিবারিক সম্প্রীতির পাশাপাশি গ্রামীণ ঐতিহ্য ও প্রকৃতির আলিঙ্গন পেত। এখন আধুনিকতার নামে কৃত্তিমতা এসে গ্রাস করেছে আমাদের চিন্তা, চেতনা ও রুচিবোধে। কথা হলো এই সমাজে কী করে বোধসম্পন্ন নাগরিকের জন্ম হবে?
বাবা-মায়েরা এখন অতি সচেতনার নামে তুলোতে করে সন্তানকে মানুষ করতে গিয়ে বোধহীন বেকুব হিসেবে গড়ে তুলছে! এটা করো-না, ওটা করো-না কত রকম বাধা-বিপত্তি শিশুর জন্য! শিশুদের প্রাকৃতিকভাবে বড় হওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। প্লে-ইংল্যান্ড নামের একটি সংগঠন বলেছে, শিশুদের গাছে ওঠা বা সাইকেল চালানোর মতো ঝুঁকিপূর্ণ খেলাগুলোয় উৎসাহিত করা উচিত। তাতে একটু-আধটু ব্যথা পেলে বা কেটে-চিড়ে গেলেও ক্ষতি নেই। সে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে শিখবে। বাধা-বিপত্তি সম্পর্কে বুঝবে। আরো বুঝবে, যেকোনো কিছু অর্জন করা অত সহজ নয়। সবকিছুই কষ্ট করে অর্জন করতে হয়। আমরা করছি তার উল্টোটা। অভিভাবকেরা সন্তানদের অনেক চাহিদা নগদ টাকা এবং জিনিসপত্র দেওয়ার মাধ্যমে পূরণ করে থাকি। এ কারণে এসব বিষয় তাদের কাছে খুব সহজলভ্য মনে হয়। চাহিবামাত্র অনেক দামি একটা জিনিস সহজে পেয়ে যাওয়াার কারণে এটা তার কাছে যেমন খুব মূল্যবান কিছু মনে হয় না, তেমনি পরবর্তী বায়না পূরণে তার কোনো বিলম্বও সয়না! বরং তার অস্থিরতা বাড়ে। এসব কারণে সবার আগে আমাদের বুঝতে হবে শিশুর মানসিক চাহিদা কী। সে কী চায়, কেন চায়।
উন্নত দেশগুলোয় শিশুদের স্কুল এবং শিক্ষা পদ্ধতি আনন্দদায়ক। শিক্ষকরা বন্ধুসুলভ। ওখানকার স্কুলে তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ‘প্রবলেম সলভিং স্কিল বা সমস্যা সমাধানের পারঙ্গমতা’ শেখানো হয়। সেখানে শিক্ষকরা এমনভাবে শেখায় যার ফলে শিক্ষার্থীকে আর প্রাইভেট বা কোচিং করতে হয় না। সেখানে অনেক স্কুলের আঙ্গিনায় বাচ্চাদের দিয়ে ফুলের ও সবজির বাগান করানো হয়। সে বাগানের সবজি দিয়ে স্কুলে টিফিন খাওয়ানো হয়। এবার ভাবুন আমাদের দেশে শিশুরা এতসব জাঁতাকলের চাপে কী করে সুস্থ আছে সেটাই আশ্চর্যের বিষয় নয় কী? শিশুদের জন্য প্রয়োজন সমৃদ্ধ সোনালি শৈশব। আর এজন্য আমরা আর কী কী করতে পারি—
শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। বাবা-মা সন্তানের সঙ্গে একান্ত কিছু সময় কাটানো। পারিবারিক আলোচনা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও তাদের স্বপ্নের কথা জানানো। সন্তানের খোঁজখবর নেওয়া। সন্তানের স্বপ্ন বা ইচ্ছের কথা জানা। পারিবারিক আত্মীয়স্বজনের কাছে নিয়ে যাওয়া। স্বজনদের উপলক্ষে আয়োজনে একত্র করা। স্বজনদের খোশগল্প সন্তানদের সঙ্গে আলোচনা করা। সপ্তাহে অন্তত একদিন সপরিবারে কোথাও বেড়াতে যাওয়া। হতে পারে কোনো বিনোদন পার্ক, কোনো প্রাকৃতিক পরিবেশ। নিদেনপক্ষে আত্মীয়ের বাড়ি। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একসঙ্গে খাওয়া, আড্ডা দেওয়া, নাটক, সিনেমা ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান দেখা। সন্তানদের দাদা-দাদি, নানা-নানির গল্প শুনানো। নিজেদের ছেলেবেলার গল্প শুনানো। গ্রামের বাড়ির গল্প শুনানো। বছরে অন্তত দু-একবার সাধ্যমতো ভ্রমণে যাওয়া। হতে পারে পাহাড়ি অঞ্চল সিলেট, বান্দরবন, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, টেকনাফ, কুয়াকাটা, হাওড়াঞ্চল—সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা। অথবা কোনো পর্যটন এলাকায়। আম-কাঁঠালের মৌসুমে, শীতের পিঠা-পায়েসের উৎসবে, ফসল তোলার মৌসুমে সন্তানদের নিয়ে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া।
সন্তানদের সাঁতার শেখানো, গাছে চড়তে শেখানো, সাইকেল চালাতে শেখানো, পাঠাগারে পাঠানো, গল্পের বই কিনে দেওয়া, বিশেষ দিবসে বই উপহার দেওয়া। শহরে অনুষ্ঠিত বইমেলা, পিঠামেলা, বৃক্ষমেলা, বর্ষা উৎসব, থিয়েটার নাটক ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া। হাটে-বাজারে নিয়ে যাওয়া, বাজার করতে শেখানো এসবই আমাদের জীবনের অনুষঙ্গ বিষয়। সন্তানদের অন্যান্য সহপাঠী-প্রতিবেশী ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে মিশতে দেওয়া। তবে তারা কার সঙ্গে মিশে কী শিখছে সে বিষয়ে খেয়াল রাখা। সন্তানদের জীবনযাপন সম্পর্কে ধারণা দেওয়া। মূলত পারিবারিক আলোচনায় সন্তানদের সম্পৃক্ত করলেই এসব বিষয়ে ধারণা পাবে তারা। মনে রাখা দরকার, আমরা অনেকেই পিতা-মাতা হিসেবে সন্তানদের কাছে আদর্শের মডেল হতে পারছি না। সবার আগে এ কাজটি করা জরুরি।সেই দিনের কথা আর কি বলব ভাই। এখনকার ছেলেপুলে তো খেলাধুলা কি জিনিস- জানেই না। তারা খেলাধুলা বলতে বুঝে শুধু মোবাইল গেম। আমরা কত খেলাধুলা করেছি। বৃষ্টি হলে তো কোনো কথাই নাই! ভিজে ভিজে ফুটবল খেলা, ছুটোছুটি করা। এই পাড়া থেকে ওই পাড়া ছুটে বেড়ানো। বৃষ্টিতে ভিজে সাইকেলের টায়ার চালিয়েছি। আবার পুকুরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গোসল করেছি। চোর-পুলিশ খেলেছি। আমাদের শৈশবটাই ছিল অন্যরকম। কি দিন ছিল আর কি দিন আসলো! এসব কথা মনে হলে চোখে পানি চলে আসে।’
জল টলমল চোখ এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন দিনাজপুর জেলার প্রত্যন্ত একটি গ্রামে বড় হওয়া রুবেল। বর্তমানে চাকরি করছেন রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। নব্বই দশকের শৈশবকালের কথা জানাতে গিয়ে এভাবেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।
শৈশবে কাটানো সময়ের কথা বলতে গিয়ে একই কথা জানালেন টাঙ্গাইলের সোহাইবও। তিনি বলেন, ‘সেই দিনগুলো ছিল অন্যরকম। যা বলে বোঝানো যাবে না। সবথেকে আনন্দের বিষয় ছিল- হাফ প্যান্ট পরে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে ফুটবল খেলা। তখন আমাদের বই বহনে জন্য ব্যাগ ছিল না। বৃষ্টির দিনে সবাই একটা পলিথিন ব্যাগ সাথে রাখতাম। স্কুল ছুটির পর বৃষ্টি হলে বইগুলো পলিথিন ব্যাগে ভরে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে বাড়িতে চলে আসতাম। আবার বইগুলো রেখে অনেকক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজে খেলাধুলা করতাম। দীর্ঘসময় বৃষ্টিতে ভিজলেও জ্বর-সর্দি কিছুই আসত না। আমরা যে পরিমাণ খেলাধুলা করেছি, এখনকার ছেলে-মেয়ে সেই খেলার নামই জানে না।’
শুধু রুবেল বা সোহাইব-ই নয়, ১৫ থেকে ২০ বছর আগের শিশুদের শৈশবগুলা ঠিক এমনই ছিল। তখন বৃষ্টি হলেই আনন্দে নেচে উঠত শিশুরা। বাবা-মা নিষেধ করার স্বত্বেও লুকিয়ে মাঠে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজত ছোট-বড় সব শিশু। মাত্র ২০ বছরে শিশুদের শৈশবে এসেছে আমূল পরিবর্তন। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে মাঠে খেলাধুলা করা, পুকুরে গোসল করা, ঝরের দিনে আম কুড়ানো- এসব যেন এখনকার শিশুদের জন্য ‘ঠাকুমার ঝুলির’ গল্পের মতো।
তখনকার শিশুদের ছিল অসাধারণ এক শৈশব। তবে সেই বৃষ্টিভেজা শৈশব হারিয়ে ফেলেছে এখনকার শিশুরা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিতে ভেজার আনন্দ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে তারা। তার ওপর এখন কোনো কারণে সামান্য একটু বৃষ্টিতে ভিজলেই জ্বর-সর্দিতে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। শুধু বৃষ্টিভেজা শৈশবই নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আরও অনেক কিছু থেকই বঞ্চিত হচ্ছে শিশুরা। সেই সঙ্গে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতেও পড়ছে। এতে কমছে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ। সবমিলিয়ে জন্ম থেকে শুরু করে জীবনভর জলবায়ু পরিবর্তনের ভুক্তভোগী হচ্ছে বর্তমানে বেড়ে ওঠা শিশুরা।
গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরত, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত এই ছয় ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। বছর ঘুরে এখন ঋতুর নামের পরিবর্তন হচ্ছে ঠিকই কিন্তু আবহাওয়ার সঠিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। বর্ষাকালে যখন মাসের অধিকাংশ দিন রিমঝিম বৃষ্টি হওয়ার কথা, তখন বৃষ্টির অভাবে মাঠ ফেটে চৌচির! আবার যেই সময়ে আকাশে থাকার কথা মেঘের ঘনঘটা, সেই সময়ে থাকছে প্রচণ্ড তাপদাহ। সেই সঙ্গে যখন-তখন দেখা দিচ্ছে অস্বাভাবিক বন্যা।
এদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এখন যে বৃষ্টিপাত হয় তা স্বাস্থ্যের জন্য মোটেও উপযোগী নয়। যে বৃষ্টিতে ভিজলে নানা ধরনের অসুখ-বিসুখ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে বজ্রপাতও। যার করণে হালকা বৃষ্টি হলেও ভয়ে ভিজতে চায় না শিশুরা। আর বাবা-মাও কঠোরভাবে শিশুদের বৃষ্টিতে ভিজতে বারণ করেন।
গবেষকরা বলছেন- জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। আর এই ঝুঁকির অধিকাংশ ভুক্তভোগী শিশুরা। আগামী প্রজন্মের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠছে জলবায়ু পরিবর্তন। এর ফলে মাতৃগর্ভে থাকা শিশুরাও ঝুঁকিতে আছে। ইউনিসেফের শিশুদের জন্য জলবায়ু ঝুঁকি সূচক বা চিলড্রেনস ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৩ দেশের মধ্যে ১৫তম।
জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক তহবিলটির (ইউনিসেফ) তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় দুই কোটি শিশু বিরূপ আবহাওয়া, বন্যা, নদী ভাঙন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পরিবেশগত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের অনেকেরই ঠাঁই হয় শহরের বস্তিতে। তাদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সম্ভাবনা নস্যাৎ হয়ে যায়। সেই সঙ্গে শোষণমূলক শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে ও পাচারের ফাঁদে আটকা পড়ে লাখ লাখ শিশূ।
সংস্থাটি আরও বলছে, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তিন জেলা- খুলনা, সাতক্ষীরা ও ভোলায় জলবায়ু পরিবর্তন ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলছে। ঘনঘন দুর্যোগের সম্মুখীন হচ্ছে এই জেলাগুলো। বঙ্গোপসাগরের উপকূল ঘেঁষে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। সেই সঙ্গে পানির লবণাক্ততাও অন্যতম প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপকূলের অনেক এলাকা এখন এই সমস্যায়। এছাড়া অতিরিক্ত গরমও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ফসলের ক্ষেত নষ্ট হয়ে মানুষের জীবিকা সংকটের মুখে পড়ে।
প্রতি পাঁচ বছরে একবার খরার কারণে বিপদে পড়ে বাংলাদেশের মানুষ, আর এ ক্ষেত্রে দেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের বাসিন্দারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব অঞ্চলের শিশুদের ঝুঁকি বড়দের চেয়ে বেশি। গরম ও অন্যান্য জলবায়ু সংক্রান্ত সমস্যার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা বড়দের তুলনায় তাদের কম। সেই সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় তাদের ডায়রিয়া ও অন্যান্য প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বেশি থাকে। পাশাপাশি পুষ্টিহীনতায় ভোগারও ঝুঁকি থাকে এসব শিশুদের। আর দুর্যোগে স্কুল, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও জীবিকার ক্ষতি তো থাকেই।
বর্তমান এই আবহাওয়া বিপর্যয়ের একমাত্র কারণ হচ্ছে ক্লাইমেট চেঞ্জ, গ্লোবাল ওয়ার্মিং। এখন বিভিন্ন কারণে গ্লোবাল ওয়ার্মিং হচ্ছে। কিছুটা হচ্ছে প্রাকৃতিক কারণ। আর কিছুটা হচ্ছে মানবসৃষ্ট কারণে। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে আমাদের গ্রিন হাউজে গ্যাস নিঃসরণের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম
তিনি বলেন, বিভিন্ন শিল্পায়ন বা ইন্ডাস্ট্রিয়ালের ফলে গ্রিন হাউজের গ্যাস নিঃসরণ বাড়ছে। গ্রিন হাউজের কাজ হচ্ছে তাপ আটকে রাখা। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ফলে আইস গলে যাচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমুদ্রের পানি প্রসারিত হয়ে তার আয়তন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাপমাত্রা যদি বাড়ে, তবে পানির ভলিয়ম বাড়ে। এটাকে বলে থার্মাল এক্সপানশন।
সমুদ্রের বিশাল জলরাশির ওপর পানি বাষ্পায়নের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ফলে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বাড়ছে। এতে বিভিন্ন এলাকায় আবহাওয়া ও জলবায়ু রিলেটেড বিপর্যয়গুলোর পরিমাণও বাড়ছে। আর সবথেকে বড় বিষয় হচ্ছে এই আবহাওয়া বিপর্যয়ের সবথেকে বড় ভুক্তভোগী চরাঞ্চলের মানুষ। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা। কোথাও বন্যা হলে নারী শিশুদের ভোগান্তি বেশি হয়। আবার অনাবৃষ্টির ফলে সৃষ্ট তাপদাহেও বেশি কষ্ট হয় তাদের।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন বৃষ্টিপাত হচ্ছে অনিয়মিত, অপরিমিত। যখন বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম থাকে, বৃষ্টির আদ্রতা পরিবর্তন হয় এবং গরম বেশি হয় তখন অনেকের ডয়রিয়াজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। আর এইসব রোগে সাধারণত শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হয়।স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার
প্রফেসর ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, আরেকটি বিষয় হলো- শিশুরা স্কুলে বা বিভিন্ন জায়গায় যখন যায় তখন অত্যধিক গরমের কারণে তারা অস্বস্তিতে থাকে এবং তাদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। এছাড়াও মশাবাহিত রোগগুলো বেড়ে যায়। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নানা রোগ-শোক দেখা দেয়, যেখানে শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হয়।
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক আরও বলেন, গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায় এবং নদী ভাঙন বৃদ্ধি পায়, সাইক্লোন জলোচ্ছ্বাসসহ বিভিন্ন রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি পায়। লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং নদী ভাঙন বৃদ্ধির কারণে যে পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ওই পরিবারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমে যায়। তখন পরিবারের কনিষ্ঠতম সদস্য হিসেবে শিশুরাই এই সমস্যা বেশি সাফার করে। শিশুদের বেসিক যে চাহিদাগুলা আছে সেগুলা ফুলফিল করা পরিবারের পক্ষে কঠিন হয়ে যায়। ফলে শিশুরা আবার বঞ্চিত হয়।
সবথেকে বড় বিষয় হলো- জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শিশুরা মানসিকভাবে যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাতে আগামী দিনের সক্ষমতা নিয়ে তারা বেড়ে উঠতে পারছে না। ফলে তাদের সুনাগরিক বা সুস্বাস্থ্যবান হওয়াটা আগামী দিনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সারা বিশ্বই ব্যাপক উদ্বিগ্ন। এবং এটা নিয়ে বারবার সচেতন করা হচ্ছে। আমাদেরকেও সচেতন হতে হবে। কাউন্সিলিং করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণগুলো কমাতে হবে। দূষণ কমাতে হবে। সব থেকে বড় বিষয় হচ্ছে গাছ লাগাতে হবে।’
ঘুড়ি একসময় গ্রামীণ জনপদে শিশুর হাতে রঙিন স্বপ্ন হয়ে আকাশে উড়তো। বাতাসে ভেসে বেড়াতো দূরন্ত শৈশবের হাসি, বাঁধাহীন আনন্দ। কিন্তু প্রযুক্তির হাওয়ায় বদলে যাওয়া সময় এখন সেই ঘুড়ির দিকেই আর তেমন চোখ ফেরায় না। একদিন যাদের শৈশব ছিল আকাশজোড়া ঘুড়ির সঙ্গী, আজ তারা বিস্ময়ের চোখে দেখেনÑনতুন প্রজন্ম জানেই না ঘুড়ি কী!
সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, বরগুনা, পিরোজপুর, ভোলা, নোয়াখালীসহ বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলাগুলোয় এক সময় গ্রীষ্মকাল এলেই শুরু হতো ঘুড়ি উড়ানোর প্রতিযোগিতা। ছোটবেলা মানেই ছিল ছেলেমেয়েদের হাতে নাটাই, আকাশে চিল ঘুড়ি, সাপ ঘুড়ি কিংবা তেলেঙ্গা ঘুড়ির লড়াই। ধান কাটা শেষে মাঠ হয়ে উঠতো ঘুড়ির রাজ্য। দুপুর গড়ালেই দক্ষিণা বাতাসে ভর করে শুরু হতো উড়ন্ত প্রতিযোগিতা। এখন সে দৃশ্য যেন শুধুই স্মৃতি।
সাতক্ষীরার শ্যামনগরের কৈখালী, বংশীপুর, রমজাননগর, কাশিমাড়ি কিংবা গাবুরার মতো প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতেও এমন দৃশ্য ছিল খুবই সাধারণ। প্রবীণদের কণ্ঠে এখনও শোনা যায় ঘুড়ির সেই দিনগুলোর কথা। রমজাননগরের সোরা গ্রামের শুকুর আলী সরদার স্মৃতিচারণ করে বলেন, “আমরা সাপ ঘুড়ি, তেলেঙ্গা ঘুড়ি, পেটকাটা ঘুড়ি বানিয়ে আকাশে উড়াতাম। ধানের মাঠে দিনভর চলতো প্রতিযোগিতা, কখনো ঘুড়ি কাটা নিয়ে দারুণ উত্তেজনা হতো। এখন তো এসব আর দেখা যায় না।”
শ্যামনগর উপজেলা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আলহাজ্ব আবু কওছার বলেন, “গরমের দিনে আমরা মাঠে ঘুড়ি উড়াতে ছুটতাম। ঘুড়ির সঙ্গে বাঁধা ধনুক-আকৃতির সুতা বাতাসে এক মিষ্টি সুর তুলত। সন্ধ্যার আকাশেও যেন ঘুড়ি লুকিয়ে খেলত।” স্মৃতির পাতায় ঘুড়ির আভা এখনও উজ্জ্বল থাকলেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা।
আজকের শিশুদের শৈশব বন্দি স্মার্টফোন, ট্যাব আর ভার্চুয়াল গেমে। মাঠে খেলাধুলা কিংবা ঘুড়ি ওড়ানোর মতো সময়-ই নেই। শহরের মতোই গ্রামেও এখন আর আগের সেই আকাশভরা রঙিন দৃশ্য চোখে পড়ে না। এমনকি অনেকে ঘুড়ির নামটাই জানে না।
ঘুড়ির আরেক প্রেমিক আবুল কালাম বলেন, “আমরা শৈশবে ঘুড়ির পেছনে ছুটতাম বৃষ্টির ফোঁটা এড়িয়ে, বাতাসের সাথে পাল্লা দিয়ে। এখনকার শিশুদের আগ্রহ নেই, পরিবেশ নেই। অথচ ঘুড়ি শুধু খেলা নয়, এটা ছিল আবেগ, ছিল শিকড় ছোঁয়ার এক আনন্দময় মাধ্যম।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল বিনোদন নয়Ñঘুড়ি ওড়ানো শিশুদের কল্পনাশক্তি, মনোসংযোগ এবং সৃজনশীলতা বাড়াতো। ঘুড়ি তৈরি থেকে শুরু করে উড়ানোর কৌশল শেখা ছিল এক ধরনের জীবন-শিক্ষা।
তবে এখনও সব আশা শেষ হয়ে যায়নি। দেশের কিছু অঞ্চলে, বিশেষ করে পৌষ সংক্রান্তি বা পহেলা বৈশাখে কিছু এলাকায় ঘুড়ি উৎসবের আয়োজন হয়। চাইলে এই আয়োজনগুলো আরও বিস্তৃত করা যায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজন হতে পারে বার্ষিক ঘুড়ি উৎসব, যেখান থেকে নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে বাংলার হারিয়ে যাওয়া রঙিন ঐতিহ্য।
এখন সময় এসেছে ‘ঘুড়ি’ শব্দটিকে শুধুই বইয়ের পাতায় বন্দি না রেখে ফিরিয়ে আনা বাস্তবের আকাশে।
আবারও রঙে রঙিন হোক সাতক্ষীরার বিকেলের আকাশ, আবারও প্রতিধ্বনিত হোক নাটাইয়ের টান আর দূরন্ত শৈশবের হাসি।শৈশব! ছিল না কোনো বালাই। ছিল না কোনো গণ্ডি। দুরন্তপনার ক্ষেত্র ছিল অবারিত। মধ্যে চলে গেছে অনেকগুলো বছর। সেই সময়ের শিশুদের শৈশব আর এ সময়ের শিশুদের শৈশবের ঢের পার্থক্য। আধুনিক যুগে শহুরে শিশুদের শৈশব যেন খাঁচায় থাকা ছটফটে চড়ুই পাখির মতো। প্রাণ আছে কিন্তু সেই প্রাণে আনন্দের লেশ নেই।
সেই অতীতে আমাদের শৈশবে সবার কাছে নিজের স্কুলটি ছিল সবচাইতে প্রিয় জায়গা। তখন এখনকার মতো এত স্কুল ছিল না। গ্রামে কিংবা শহরে সরকারি স্কুলগুলোতেই সবাই পড়ত। সকালে চোখে ঘুম নিয়ে রেডি হতে হতো। ব্যাগে থাকত পড়ার বইয়ের সঙ্গে কমিক বই। আরো থাকত পাঁচ-ছয়টি করে কলম। এখনকার ছেলেমেয়েদের কাছে সর্বোচ্চ দুইয়ের বেশি কলম থাকে না। হিসাবেও তাই ঠিক। তাহলে ওই পাঁচটি কলম নেওয়ার অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল।
সরকারি স্কুলের বিশাল মাঠ। বিদ্যালয়ের সবচেয়ে রাগী শিক্ষক পিটি স্যার। হাতে তার জালি বেত। মারলে লাগত বেজায়। তাই সকালের শুরুতেই পিটিতে কেউ মার খেতে চাইত না। পিটি শেষে যে যার ক্লাসে চলে যেত। নিয়মিত প্রতি ক্লাসে স্যাররা আসতেন। পড়া না পারলেই মার। সেই বেতের বাড়িতে যেন একটা মায়া থাকত। ঠিকই স্যার পড়াটা আবার বুঝিয়ে দিতেন সবাইকে।
অনেকের কাছে ক্লাস দীর্ঘ লাগত। মনে হতো কখন যে টিফিন হবে! ভাবতে ভাবতে টিফিনের বেল। অনেকেই টিফিন খেতো বাটারবন, ক্রিমরোল। এখন বাটারবন দেখা গেলেও দু-একটি দোকান ছাড়া ক্রিমরোলের দেখা পাওয়া যায় না। অনেকে গেটে থাকা দারোয়ান মামাকে পাঠাতো। দারোয়ান মামা ঝালমুড়ি এনে দিত। গেটের বাইরে ফুসকা বিক্রি হতো। ছোটদের বাইরে যাওয়া নিষেধ হলেও বড়রা ঠিকই দারোয়ান মামাকে পটিয়ে বাইরে থেকে ফুসকা খেয়ে আসত। গরমের সময় মালাই আইসক্রিম বিক্রি হতো। ১ টাকা, ২ টাকা করে।
অনেকে আবার খাওয়া বাদ দিয়ে টিফিন সময়ে মাঠে খেলায় ব্যস্ত। ছেলেরা বল দিয়ে ফুটবল খেলায় ব্যস্ত। অন্যদিকে ক্লাসরুমেও কলম ফাইট, কাটাকাটি, বাক্স খেলা। শুধু কলম দিয়ে কাটাকাটি খেলার জন্যই একেকজন এতগুলো কলম নিয়ে আসত। অনেকেই ব্যস্ত কমিক বই পরিবর্তনে। সে সময় কাগজের কমিক বই ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। চাচা চৌধুরী আর সাবু, দ্যা অ্যাডভেঞ্চার অব টিনটিন, বিল্লু কমিকস পড়ে অনেকেই টিনটিন, বিল্লু ভাবত নিজেকে।
মেয়েরা পছন্দ করত পিংকি কমিকস। বড় ক্লাসের ছেলেমেয়েরা তিন গোয়েন্দা, মাসুদ রানা, কুয়াশা পড়ত। সে সময় সেবা প্রকাশনীর এ বইগুলোতে যেন প্রাণের অস্তিত্ব ছিল। ক্লাসে বন্ধুরা একজন আরেকজনকে তিন গোয়েন্দার নাম অনুসারে কিশোর, মুসা, রবিন বলে ডাকত। এভাবে এক ক্লাসে অনেকগুলো কিশোর, মুসা, রবিন হয়ে যেত। ক্লাসের বিশিষ্ট ভালো ছাত্রছাত্রীরা আবার এসব পড়ত না। তারা পড়ত জাফর ইকবালের সায়েন্সফিকশন বই। সরকারি স্কুলগুলোতে মাঝে মাঝে মিটিং হতো। এ সুযোগে স্কুল আগে ছুটি হলে সবাই আনন্দ করত। ছুটি শেষে সবাই বাসায়। কেউ কেউ বিকেলে প্রাইভেট পড়ত। হাতে গোনা কোচিং সেন্টার ছিল। তবে বেশিরভাগই বাসায় পড়ত। বিকেলে বাইরে গিয়ে আবার খেলা। এর মধ্যে বাড়ির কাজ শেষ করে ফেলত অনেকে। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বসা।
পড়া শেষে রাত ৯টার অপেক্ষা। কখন শুরু হবে! ম্যাকগাইভার, ডিএটিম, সিন্দবাদ। ম্যাকগাইভারের মতো অনেকে হতে চেষ্টা করত। মীনা কার্টুনের গানটি মুখস্থ ছিল না এমন কিশোর-কিশোরী খুঁজে পাওয়া কষ্ট ছিল। আমি বাবা-মায়ের শত আদরের… দারুণ একটা গান। রাত ১০টা বাজলেই ঘুম। কাউকে বলতে হতো না। অনেকে আবার রাতের পড়া শেষে গল্পের বই পড়ত। ছেলেমেয়েরা ক্যাসেট প্লেয়ারে গান শুনত আবার ক্যাসেট প্লেয়ারের ফিতা দিয়ে মজার খেলাও খেলত।
সে সময়টায় এখনকার মতো এত চকোলেট, ক্যান্ডি ছিল না। ছিল নাবিস্কো লজেন্স। সবচেয়ে ভালোর মধ্যে ছিল ডেইরি মিল্ক মিমি। চিপসের মধ্যে ছিল পটেটো, মি. টুইস্ট।
শীতকালে বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলে সবাই নানাবাড়িতে যেত, পিঠা-পায়েশ খেতো, খুব মজা করত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পার হয়েছে অনেকগুলো বছর। আমূল পরিবর্তন হয়েছে সবকিছুই।
এখনকার সময়ের শৈশব পুরোটাই আগের সময়ের থেকে আলাদা। শহরে সকালে যে ছেলে বা মেয়ে ঘুম থেকে ওঠে, তার ওপর থাকে বিশাল দায়িত্ব।