1. mesharulislammonir1122@gmail.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন
  2. info@www.sangjogprotidin.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন :
সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৫:২৫ পূর্বাহ্ন

উপকূলের মানুষের জীবন চলে বাঘ কুমিরের সাথে যুদ্ধ করে

  • প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪৫ বার পড়া হয়েছে

বিশেষ প্রতিনিধি : উপকূলের মানুষের জীবন চলে বাঘ কুমিরের সাথে যুদ্ধ করে ‌। এছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনে উপকূলের মানুষের প্রতিটা ক্ষেত্রে প্রভাব পড়েছে। সে কারণে উপকূলের মানুষ বহুমুখী সমস্যায় জর্জরিত। অনেকেই এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে অন্যত্রে ‌।জলবায়ু পরিবর্তনের কষাঘাত সুন্দরবন উপকূলে। ৩০ বছরে কমেছে ২২ শতাংশ ফসলি জমি। লবণাক্ততা বাড়ায় অনাবাদি জমির পরিমাণ বেড়েছে ৭ শতাংশ। নেই বিকল্প কর্মসংস্থানের বড় কোনো উদ্যোগও। এ অবস্থায় জীবিকার খোঁজে অন্যত্র পাড়ি জমালেও প্রতারিত হয়ে ফিরেছেন অনেকে।
শ্যামনগর, সাতক্ষীরা জেলার একটা উপজেলা। মুন্সিগঞ্জ, শ্যামনগর উপজেলার একটি ইউনিয়ন। বিভিন্ন কারণে ইউনিয়নটির নাম বারবার আলোচনায় আসলেও সবচেয়ে বড় পরিচয় বিশ্বের একমাত্র ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে এর অবস্থান। এখানে বসবাস করা লোকদের আবাসন নিয়ে আমরা চিন্তিত, ভাবছি তাদের সুরক্ষা নিয়ে। বনের ওপর নির্ভর করা এই মানুষগুলো ছয় থেকে সাত মাস বন সংশ্লিষ্ট কোনো কাজ করতে পারে না। আমরা তাদের আশি থেকে নব্বই কেজি চাল দিয়ে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতার গল্প শুনিয়ে দিচ্ছি। রাতে কোনো মা ও শিশু অসুস্থ হয়ে পড়লে জরুরি কোনো যানবাহন যেখানে পৌঁছায় না, সেখানে আমরা তাদের স্বাস্থ্য সচেতনতার বার্তা দিচ্ছি।
সুন্দরবনের মোট আয়তন দুই হাজার দুইশত আঠাশ বর্গমাইল বা তিন হাজার পাঁচশত পঁয়ষট্টি বর্গ কিলোমিটার বা চৌদ্দ লক্ষ পঁচিশ হাজার আটশত পঁচানব্বই একর। যার মধ্যে সাতক্ষীরা তথা শ্যামনগর অংশে বনভূমির পরিমাণ চার লাখ একান্ন হাজার একশত আশি একর। শ্যামনগর ইউনিয়ন প্রায় পঁয়ত্রিশ বর্গ কিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট। যার মূল ভূখণ্ড চারশত পঞ্চান্ন বর্গ কিলোমিটার এবং সুন্দরবন এক হাজার চারশত আটচল্লিশ বর্গ কিলোমিটার।
জলবায়ু পরিবর্তনের কষাঘাত সুন্দরবন উপকূলে। ৩০ বছরে কমেছে ২২ শতাংশ ফসলি জমি। লবণাক্ততা বাড়ায় অনাবাদি জমির পরিমাণ বেড়েছে ৭ শতাংশ। নেই বিকল্প কর্মসংস্থানের বড় কোনো উদ্যোগও। এ অবস্থায় জীবিকার খোঁজে অন্যত্র পাড়ি জমালেও প্রতারিত হয়ে ফিরেছেন অনেকে।
প্রকৃতির কোলে জীবনের গল্প। যেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকির সাথে নিত্য বসবাস। প্রতি বছর বাড়তে থাকা ঘূর্ণিঝড়, বন্যা আর নদী ভাঙনে জর্জরিত এক জনপদ আজ নিজেদের অস্তিত্ব ও ভবিষ্যত প্রজম্মকে একটি সুস্থ ও টেকসই জীবন কামনা করছে। কিন্তু সত্যি কি তারা পারবে তা করতে!
একথা আজ আমাদের কাছে নতুন কোনো বিষয় নয় যে, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ জলবায়ুর প্রতিনিয়ত পরিবর্তন। আর এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর বারংবার চরম আঘাত হানছে যা ইতোমধ্যে আমরা উপলব্ধি করেছি। জলবায়ু পরিবর্তন শুধুমাত্র পরিবেশে পরিবর্তন আনছে না, মানবজীবন, খাদ্য উৎপাদন, পানীয় জল সরবরাহ, স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে।
জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃসরকারি প্যানেলের ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২১ শতকের শেষ নাগাদ বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা গড়ে ১ মিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ২ থেকে ৩ মিলিমিটার হারে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। উপকূলীয় ১৯ জেলার মধ্যে প্রায় ১০ জেলা আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা। বিশ্বব্যাংক, ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের প্রতিবেদন বলছে, খুলনা, সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরগুনা তারমধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। সমুদ্রপৃষ্ঠ ১ মিটার বাড়লে প্রায় ১৭ শতাংশ জমি ও ৩০ মিলিয়ন মানুষ ঝুঁকিতে পড়বে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট অনুসারে, গত ৩৫ বছরে আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ত জমির পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য মতে ২০৫০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে ১ দশমিক ৫–২ কোটিরও বেশি মানুষ তাদের বসতি হারাতে পারে উপকূলীয় অঞ্চলে। এদেরকে বলা হচ্ছে ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’, যাদের অনেকেই শহরমুখী হয়ে চরম দারিদ্র্য ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
ম্যানগ্রোভ বন জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাবের শিকার। উপকূলীয় জেলেরা জীবিকা হারাচ্ছেন। সুন্দরবনের ক্ষয়ে ঘূর্ণিঝড় থেকে রক্ষার প্রাকৃতিক ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল যা জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বিপন্ন হতে পারে। বন বিভাগের তথ্য মতে, সুন্দরবনের ৪০ শতাংশ অঞ্চল আগামী কয়েক দশকের মধ্যে বিলীন হতে পারে, যা বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশ্ব প্রকৃতি তহবিলের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, সুন্দরবন যেমন রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল, তেমনি এটি উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ, যা ক্ষতিগ্রস্ত হলে মানবিক ও পরিবেশগত সংকট সৃষ্টি করবে। পানিবাহিত রোগ (ডায়রিয়া, টাইফয়েড, চর্মরোগ) বাড়ছে। বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের পরে বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি দেখা দেয়। অভ্যন্তরীণ স্থানচ্যুতি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র অনুযায়ী, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ জলবায়ুজনিত কারণে শুধুমাত্র বাংলাদেশে ৭ লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। শহরমুখী অভিবাসন বৃদ্ধি পাবে, ঢাকা, চট্টগ্রামের মতো বিভাগীয় শহরে জনসংখ্যার চাপ বৃদ্ধি।
বস্তি ও সামাজিক অস্থিরতা তথা অপরাধ, দারিদ্র্য, স্বাস্থ্য ঝুঁকি বেড়েই যাবে, মানসিক স্বাস্থ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, বিশেষ করে যারা বাস্তুচ্যুত হবে। ডাবলিন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বৃষ্টিপাতের প্রবণতা পরিবর্তন হলে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া এবং কলেরা রোগের বিস্তার বাড়বে। স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলছে, ২০৫০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্য সমস্যা আরও প্রকট হয়ে উঠবে ও দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গুসহ অন্যান্য রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাবে। জলে লবণাক্ততা বেড়ে গিয়ে কৃষিকাজে ব্যবহৃত জমি অনাবাদি হয়ে পড়বে। ধান, গম, সবজি, পাটসহ বহু খাদ্যশস্যের উৎপাদন ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। গবাদি পশু ও খামারব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পানির সংকট তীব্র হবে, লবণাক্ততা ভূগর্ভস্থ ও পৃষ্ঠজল উভয়েই আক্রান্ত করবে, বিশুদ্ধ পানির অভাবে জলবাহিত রোগ ও অপুষ্টি ব্যাপকভাবে ছড়াতে পারে। মৎস্য ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হবে সুন্দরবনসহ উপকূলীয় নদী ও মোহনার জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে। চিংড়ি, ইলিশ ও অন্যান্য মাছের প্রজনন হ্রাস পেতে পারে, যার ফলে জীবিকা হারাবে লাখো মানুষ।
যতীন্দ্রনগর জেলে পাড়ার সুরমা (ছদ্মনাম) আজ কাঁদছে। স্বামী স্ত্রী দুজনে বনে মাছ, কাঁকড়া ধরে জীবনচালায়। সুন্দরবনের কোলে তাদের বসবাস। একদিকে বন অন্যদিকে জীবন। জানুয়ারি থেকে মার্চ ইলিশের প্রজনন মৌসুম। জুন থেকে আগস্ট কাঁকড়া ও চিংড়ির প্রজনন মৌসুম। এ সময়ে বনে যাওয়া ও নদীতে মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষেধ। নিষেধাজ্ঞাকালীন সরকারিভাবে পরিবার প্রতি চাল দেয়া হয়। কিন্তু আর জীবন চলবে কিভাবে! খুব অল্প বয়সে বাবার হাত ধরে বনে যাওয়া শুরু, এখন যাচ্ছে স্বামীর হাত ধরে। এই পথ চলা তার শেষ হয়নি! নিজের সঞ্চয় বলে কিছু নেই। তাই আজ সে খুঁজছে বিকল্প জীবনের পথ। ভরা জোয়ারে, ঢেউয়ের তালে যাদের জীবন দোলে, প্রতিনিয়ত নদী, বন, প্রকৃতির সাথে সংগ্রাম করে, আজ সে ক্লান্ত। সবাই আসে যায় কিন্তু সুরমাদের ভাগ্যের কোন দিশা এখনো হয়নি! অজানা ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে তাদের চোখে অশ্রু ছাড়া আর কিছু নেই!
তাই আজ আমাদের সবার জন্য, দেশ প্রকৃতি জীব ও বৈচিত্র্য রক্ষায় কঠিন পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। উপকূলীয় এলাকায় সবুজ বেষ্টনী তৈরি, বিশেষ করে সুন্দরবনের মত ম্যানগ্রোভ বন সম্প্রসারণ, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সাহায্য করে। নদী ভাঙনরোধে কার্যকর ভেড়িবাঁধ নির্মাণ করা। বাড়ির চারপাশে লবণাক্ত সহিষ্ণু গাছ রোপণ করা। চাষাবাদের জন্য লবণাক্ততা অভিযোজক ধান, গম বা সবজির জাত নির্বাচন করা। লবণ সহনশীল কৃষি গবেষণা ও বীজ সরবরাহে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহার দক্ষ করার জন্য বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ পদ্ধতি গ্রহণ। শুধুমাত্র কৃষির ওপর নির্ভর না করে হাঁস-মুরগি পালন, মৎস্য চাষ, হস্তশিল্প বা ক্ষুদ্র ব্যবসায় উৎসাহ দেওয়া। নারীদের স্বনির্ভরতা বাড়াতে সেলাই, কুটির শিল্প ও ছোট উদ্যোক্তার প্রশিক্ষণ দেওয়া। উঁচু মাচা বা প্ল্যাটফর্মের ওপর ঘর নির্মাণ। বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় প্রতিরোধে উপযোগী আবাস গঠন করা। স্থানীয় সাইক্লোন শেল্টারগুলোতে সঠিকভাবে যাতায়াত নিশ্চিত করা।
পরিবারভিত্তিক জরুরি পরিকল্পনা তৈরি (প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ওষুধ, শুকনো খাবার সংরক্ষণ)। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে স্থানীয় জনগণকে সচেতন করা। স্কুল ও কমিউনিটিতে সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা আয়োজন করা। শিশু ও যুবকদের জলবায়ুর নেতা হিসেবে তৈরি করা। উপকূলীয় জেলায় মিষ্টি পানির রিজার্ভার নির্মাণ। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য ঘরে ঘরে হারভেস্টিং সিস্টেম চালু করা। জলাধার পুনঃখনন করে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমানো। আগাম ঘূর্ণিঝড় সতর্কতা ও এসএমএস সতর্কবার্তা প্রযুক্তি আরও উন্নত ও সম্প্রসারিত করা। জলবায়ুর কারণে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর জন্য গৃহনির্মাণ ও পুনর্বাসন প্রকল্প (যেমন আশ্রয়ন প্রকল্প) আরও সম্প্রসারণ। উন্নত দেশগুলো থেকে জলবায়ু ক্ষতিপূরণ সংগ্রহে সক্রিয় কূটনৈতিক সক্ষমতা তৈরি করা। ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য ‘ক্ষতি এবং ক্ষতি’ অর্থায়ন নিশ্চিত করা। জাতীয় জলবায়ু ফান্ড গঠন করে উপকূলীয় উন্নয়নে ব্যবহার। জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ও জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বহু-খাতভিত্তিক সমন্বিত নীতি গ্রহণ। আগামী প্রজন্মের জন্য আজ থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। শুধু প্রকৃতি নয়, মানুষের মানসিকতা, অভ্যাস ও নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে না হলে ২০৫০ খ্রিষ্টাব্দ উপকূল নয়, পুরো দেশই বিপদের মুখে পড়তে পারে। আসুন আমরা সকলে মিলে আমাদের গর্বের সুন্দর বনকে ও তাকে নির্ভর করে যাদের জীবন চলে তাদের জন্য কিছু করি। আগামী প্রজন্মকে একটি টেকসই ভবিষ্যৎ উপহার দেই।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রতিবছর নতুন করে ধরা দিচ্ছে। ঋতুভিত্তিক তাপমাত্রার ওলট-পালট শুধু জনগণের দুর্ভোগেরই কারণ হচ্ছে না, একই সঙ্গে মানুষের জীবন-জীবিকাও হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। আর এর অন্যতম ভুক্তভোগী উপকূলীয় অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
যদিও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রায় প্রত্যেকটি অঞ্চলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। খরাপ্রবণ অঞ্চলে এক ধরনের সমস্যা, হাওড় অঞ্চলে আরেক ধরনের সমস্যা এবং পাহাড়ি অঞ্চলে অন্য ধরনের সমস্যা। এ বছর কালবৈশাখী হয়েছে শীতকালে আর যখন কালবৈশাখী হওয়ার কথা তখন এর দেখা নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ বছর এপ্রিলের গরম গত অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে রেকর্ড।
গত মাসেই (২০ মার্চ) জাতিসংঘের আইপিসিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে এই শতাব্দীর মধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্রতিশ্রুত ১.৫ ডিগ্রি থেকে অনেক বেশি অতিক্রম করতে পারে। এ জন্য আইপিসিসি জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত সমস্যা সমাধানে বিশ্বব্যাপী কার্বন গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে আনা ও অভিযোজনে অধিকতর রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে।
এর আগে ২০২১ সালের আইপিসিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষের কর্মকাণ্ডই নজিরবিহীনভাবে জলবায়ুর পরিবর্তন করছে। নতুন প্রতিবেদন বলছে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত সমস্যা সহসা সমাধানের জন্য দ্রুত সময় ফুরিয়ে আসছে। ফলে কার্বন নিঃসরণ মুক্ত অর্থনীতি গড়ার জন্য দ্রুত ধারাবাহিক সংস্কার ও নতুন ব্যবস্থায় রূপান্তর করা দরকার।
জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার ২০২৩ সালে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা প্রণয়ন করে। এই পরিকল্পনায় বাংলাদেশকে এগারোটি ভিন্ন ভিন্ন জলবায়ু বিপদাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে তা মোকাবিলায় ১১৩টি উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০২৩-৫০ সালের মধ্যে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ২৩০ বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন হবে।
উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগ যেমন মোকাবিলা করা যাবে এবং পাশাপাশি প্রায় ১.১ মিলিয়ন হেক্টর জমি জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততা থেকে রক্ষা পাবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যেমন সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে যাচ্ছে, লবণাক্ত পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে, লবণাক্ততার হার কোথাও কোথাও কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে এবং পরিবেশ আরও বেশি লবণাক্ত হয়ে উঠছে।
পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠী নদীভাঙন ও সমুদ্রভাঙন ইত্যাদির শিকার হচ্ছে। এমনকি পুকুরের পানিও লবণাক্ত হয়ে পানির উৎসের সর্বশেষ সহায়টুকুও দূষণের শিকার হচ্ছে। একদিকে লবণাক্ততার প্রভাবে কৃষকরা কৃষিকাজ ও ধান চাষের মতো জীবিকা নির্বাহের মূল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হতে পারছে না, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের অভাবে এলাকা ছেড়ে শহরে জীবিকার সন্ধান করতে হচ্ছে। আমরা জানি, এই দুর্যোগপূর্ণ অবস্থায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য অভিযোজন কতটা কঠিন হয়ে উঠছে।
২০২১ সালের খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা অনুযায়ী দেশের চাষযোগ্য জমির ২৫-৩০ শতাংশ বাংলাদেশের ২১টি উপকূলীয় জেলার অন্তর্ভুক্ত, যার ৫৩ শতাংশই লবণাক্ত আক্রান্ত। তবে উপকূলীয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ইদানীং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণসহিষ্ণু ধান চাষের প্রচেষ্টা চলছে।
এর মধ্যে কোনো কোনো জাত চারা অবস্থায় ১২-১৪ ডিএস/মিটার এবং সব ধাপে ৮ ডিএস/মিটার মাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করে ফলন দিতে সক্ষম। যদিও বর্তমানে উপকূলীয় জেলাগুলোয় বিশেষ করে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটসহ বিভিন্ন জেলায় লবণাক্ততার পরিমাণ ৮.১ ডিএস/মিটার থেকে ১৬ ডিএস/মিটার এবং কোথাও কোথাও তার থেকেও বেশি। এই অবস্থা ধানচাষের জন্য কোনোভাবেই সহায়ক নয়।
আর এর পাশাপাশি আছে স্থানীয় প্রভাবশালী চিড়িং ও মাছের খামারিদের দাপট। এদের প্রভাবে অনেক ক্ষুদ্র কৃষক তার চাষের একখণ্ড জমিও প্রভাবশালীদের কাছে বন্ধক দিতে বাধ্য হয় ন্যূনতম মূল্যে। সম্প্রতি বাগেরহাট ও রামপাল এলাকা পরিদর্শনের সুযোগ হয়েছে। স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে আলোচনায় জানা যায়, বর্তমানে এক বিঘা জমিতে ধানচাষের মাধ্যমে যেভাবে কৃষক লাভবান হন তার তুলনায় মাছের খামারে জমি বন্ধক প্রদানে প্রাপ্তি খুবই কম।
অভিযোগ আছে, বড় মাছের খামারিরা চান না ক্ষুদ্র কৃষক কৃষিতে ফিরে আসুক। কারণ একবার যদি তারা কৃষিকাজের সুফল বুঝতে পারেন তাহলে হয়তো আর মাছ চাষের জন্য নিজের সামান্য সহায় সম্বলটুকু অন্যের হাতে তুলে দেবে না। আবার অভিজ্ঞরা বললেন, মাছের খামারও আর আগের মতো লাভজনক নেই। এখন প্রায়ই রোগবালাই লেগে থাকে এবং ফলন কম। এবারের এপ্রিলের গরমে অনেক খামারের চিড়িং মরে যাওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে উপকূলীয় অঞ্চলে ভুক্তভোগী কৃষকরা লবণসহিষ্ণু জাতের মাধ্যমে কৃষিকাজের উদ্যোগ গ্রহণ করছেন। কিন্তু ক্ষুদ্র কৃষকরা বলছেন খামারিদের কারণে তাদের কৃষিকাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, মাঠের ধান পুড়ে যাচ্ছে।
কারণ কৃষকদের ধানের মৌসুম শেষ না হওয়ার আগেই প্রভাবশালীরা মাঠে লবণ পানি ঢুকিয়ে থাকে। ফলে ধান ঘরে তোলার আগেই লবণ পানির প্রভাবে মাঠেই ফসল পুড়ে শেষ। কৃষকদের কাছ থেকে দাবি উঠেছে, যে মাঠে কৃষিকাজ করা সম্ভব সেখানে লবণ পানির মাছ চাষ নিষিদ্ধ করা হোক।
অন্যদিকে মাছ চাষের জন্য প্রভাবশালীরা খালে বাঁধ দিয়ে প্রাকৃতিক পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে, যাও এই অঞ্চলের মাটির লবণাক্ততা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। কৃষকরা এসব খাল প্রভাবশালীদের কাছ থেকে অবমুক্ত করার জন্য জোর দাবি জানিয়েছে।
অন্যদিকে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষদের অন্যতম বড় সমস্যা সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা। সুপেয় পানির অভাবে এই অঞ্চলে একটি হতদরিদ্র পরিবারকে খাবার পানির জন্য যে পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হয় তা একটি শহুরে অবস্থাপন্ন পরিবারের তুলনায় বেশি।
অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে লবণ পানি ব্যবহার করতে বাধ্য হওয়ায় স্থানীয় জনগোষ্ঠী বিশেষ করে নারীরা বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগসহ নানা ধরনের প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত জটিলতার সম্মুখীন হচ্ছে। আবার অনেক পরিবারের নারীকে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার হেঁটে পরিবারের জন্য খাবার পানিটুকু সংগ্রহ করতে হয়।
উপকূলীয় জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে কৃষিকাজের ব্যাপারে কৃষকদের মধ্যে উদ্যম লক্ষ করা গেছে। অনেক কৃষকই নিজেদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ধানচাষসহ বিভিন্ন ধরনের কৃষিকাজে উদ্যোগী হচ্ছেন।
এখন এই কৃষকদের সহযোগিতা করার জন্য সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে এবং একই সঙ্গে তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের খাদ্যের চাহিদা মেটাতে পারেন। কৃষিকাজের জমিতে এখন লবণ পানির মৎস্য চাষ নিষিদ্ধ করতে হবে।
কীভাবে কৃষিকাজে জৈবসার ও বালাইনাশক ব্যবহার করা যায় তার সহযোগিতা প্রদান করতে হবে। পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকার সঙ্গে প্রান্তিক কৃষকদের সরাসরি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর সুফল নিশ্চিত করতে হলে এই অঞ্চলের কৃষকদের সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই।
অন্যদিকে এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর পানীয় জলের কষ্ট দূর করার জন্য প্রত্যেক গ্রামে সরকারি জমিতে পুকুর খনন করে সুপেয় পানির রিজার্ভার তৈরি করতে হবে। প্রয়োজনীয় সরকারি জমি না থাকলে সরকারি উদ্যোগে জমির ব্যবস্থা করে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে হবে।
বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে এলাকার দুস্থ পরিবারের মধ্যে পানির ট্যাংক সরবরাহ করা হয়। এ ধরনের সহযোগিতার ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আছে। এর সুফল যাতে প্রকৃত ভুক্তভোগীর কাছে পৌঁছায় তা নিশ্চিতে স্থানীয় প্রশাসন ও স্থানীয় সরকারের জবাবদিহিতার কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি সমস্যা সমাধানে নদী ও খালের পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা, তীর সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ ইত্যাদি বিষয়ে বিশেষভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার।
বাংলাদেশে প্রকৃতিক দুর্যোগ নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রতি বছরই কোনো না কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে দেশ। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন এদেশের অতি পরিচিত সব প্রাকৃতিক দুর্যোগ। দেশব্যাপী এসব দুর্যোগের আতঙ্ক বিরাজ করলেও প্রতিবারের প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ। একটির আঘাত কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন অন্য একটি দুর্যোগের আবির্ভাবে উপকূলবাসীর সমস্ত স্বপ্ন তছনছ হয়ে যায়। বিগত দিনের ঘটে যাওয়া সিডর, আইলা, মহাসেন, বুলবুল, আম্পান, ইয়াস তারই স্বাক্ষর বহন করে চলেছে। এসব দুর্যোগের ক্ষত কাটিয়ে ওঠার পূর্বেই সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় ‘রিমাল’ আঘাত হেনেছে উপকূলে। রিমালের ক্ষয়ক্ষতির পুরোপুরি পরিসংখ্যান এখনো নিরূপণ করা হয়নি। তবে যে শক্তি নিয়ে ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হেনেছে এবং উপকূল অতিক্রম করতে দীর্ঘ সময় নিয়েছে। তাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি হওয়াই স্বাভাবিক। প্রলয়ঙ্ককরী এসব দুর্যোগের প্রতিটিতে প্রাণহানির পাশাপাশি বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, যা পুষিয়ে নিতে সময় লাগে বছরের পর বছর। ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা’র ক্ষয়ক্ষতি এবং ক্ষত এখনো দৃশ্যমান। তার উপর নতুন করে রিমাল সেই ক্ষতকে অনেক বেশি উস্কে দিল। মে-জুন মাস এলেই উপকূলবাসীর সামনে নেমে আসে অতি ভয়ঙ্কর সব দুর্যোগ। স্বভাবত উপকূলীয় জনপদ বারংবার অবহেলিত। অবহেলিত হওয়ায় তাদের জানমালের রক্ষায় সুদূরপ্রসারী ও সুচিন্তিত তেমন পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। ফলে প্রতিবছর উপকূলীয় জনপদে আতঙ্ক বিরাজ করে।
সিডর থেকে ইয়াস পর্যন্ত সব ঘূর্ণিঝড়েই সুন্দর বনের প্রাণী ও উদ্ভিদের বিস্তর ক্ষতি হলেও রিমালের তা-ব ছিল সব থেকে দীর্ঘস্থায়ী। এর অবস্থান এবং আক্রমণের প্রভাব ছিল ৩৮ ঘণ্টারও অধিক সময় ধরে। এই সময়ের মধ্যে ছিল তিনবার ছিল পূর্ণ জোয়ার। প্রতিবার এই পূর্ণ জোয়ারের সাথে ঝড়ের তীব্রতা মিলিয়ে এটি স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে অধিক মাত্রার জোয়ার এবং জলোচ্ছ্বাসে পরিণত হয়। সে জলোচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে উপকূলবাসীর সহায় সম্বল, বসত ভিটা, চিংড়ি ঘের, ফসলের ক্ষেতসহ গবাদি পশু, হাঁস-মুরগিসহ সর্বস্ব। ভৌগোলিক অবস্থান এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের জন্য অধিকতর হুমকি। তবে আশার বিষয় হল, বাংলাদেশের অবহেলিত উপকূলীয় জনপদকে সকল প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে আসছে সুন্দরবন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আঘাত হানা ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাস থেকে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলকে রক্ষা করতে সুন্দরবনের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
প্রকৃতির আশীর্বাদ এই সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন বা লবণাক্ত বনাঞ্চল। সুন্দরবনের মোট আয়তন প্রায় ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটার, যা যৌথভাবে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অবস্থিত। সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের আয়তন ৬,৫১৭ বর্গ কিলোমিটার, যা সমগ্র আয়তনের ৬৬ শতাংশ। এই বৃহৎ অংশ আমাদের দেশের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। কেননা, প্রতিবার ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে এই বন উপকূলবাসীর জন্য ঢাল হয়ে ওঠে। দুর্যোগের সবটুকু ক্ষতি নিজে সয়ে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। সুন্দরবন যদি আগলে না রাখত তাহলে দেশের উপকূল ধ্বংস হয়ে যেত। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে কিছুটা প্রশমিত করে সুন্দরবনের সবুজ প্রকৃতি। এক কথায় সুন্দরবন উপকূল তথা পুরো দেশের রক্ষাকবচ। অন্যদিকে সুন্দরবনসহ উপকূলীয় জনপদ আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা ও প্রাকৃতিক সম্পদের আধার। দেশের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাস করে। জাতীয় অর্থনীতিতে যাদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। এসব জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা সুন্দরবন কেন্দ্রিক। সুন্দরবন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ঢাল হয়ে উপকূলীয় জনপদকে রক্ষা করার পাশাপাশি তাদের জীবন-জীবিকা নির্বাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ধারায় সাম্প্রতিক দশকগুলোতে সুন্দরবনসহ উপকূলীয় জনপদের মানুষ ও প্রাণপ্রকৃতি বার বার মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। ২০০৭ ও ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলার তান্ডবে শত শত কিলোমিটার উপকূলীয় বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কৃষিজমি, মৎস্যখামার ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় সামুদ্রিক লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়েছিল। কিন্তু সুন্দরবনের কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকাংশে কমে আসে। অতীতের মতো এবারো উপকূলীয় জনপদের প্রাকৃতিক সুরক্ষাব্যুহ সুন্দরবন রিমালের তান্ডব নিজের বুক পেতে প্রতিহত করার চেষ্টা করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সাক্ষী হয়ে থাকা আইলা, সিডর, আম্পান, ইয়াস, রিমালের ক্ষতবিক্ষত জায়গাগুলোয় দাঁড়িয়ে কিছুটা অনুধাবন করা যায় সুন্দরবন ছাড়া আমাদের ভবিষ্যৎ কতটা ভয়ানক হতে পারে। ঘূর্ণিঝড় আইলা ও সিডর পরবর্তী সময়ে সুন্দরবনের যে ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছিল সেটি কাটিয়ে উঠতে বহু বছর লাগবে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছিলেন। সেই ক্ষতি পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠার আগেই সুন্দরবনের উপর বার বার দুর্যোগ হানা দিচ্ছে। ল-ভ- হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। একদিকে প্রকৃতিক দুর্যোগ অন্যদিকে মানুষ্য সৃষ্ট কারণে সুন্দরবন তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। প্রকৃতি আপন খেয়ালে সুন্দরবনের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সচেষ্ট হলেও আমরা নাগরিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ায় উপকূলীয় জনপদের মানুষ বার বার ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, যে সুন্দরবন আমাদের বেঁচে থাকতে সাহায্য করছে কিন্তু তার প্রতি আমরা সামান্যতম হলেও দায়িত্ববান নই। একেকটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর প্রথমেই উপকূলীয় বেড়িবাঁধ মেরামত, উন্নতকরণ, উপকূলীয় সবুজবেষ্টনী এবং সংরক্ষিত বনভূমি রক্ষা ও উন্নয়নে যে ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন ছিল, সরকারিভাবে তা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ফলে এর দায়ভার বহন করতে হচ্ছে উপকূলীয় জনপদের প্রাণপ্রকৃতি ও লাখ লাখ মানুষকে। জলবায়ু পরিবর্তন, ক্ষতিকর কর্মকা-, বন উজাড়, আমাদের অসচেতনতা, লোভী মানসিকতা ও বনবিভাগের দুর্নীতির কারণে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উপকূলীয় বনাঞ্চল আমাদের সুন্দরবন আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল এর জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত বৈশ্বিক দুর্নীতি শীর্ষক প্রতিবেদনের বলা হয়েছে, ‘সুন্দরবন থেকে বছরে ১৩৫ কোটি টাকার কাঠ পাচার হয়। কিছু ব্যবসায়ী, অসাধু বন কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রশাসনের যোগসাজশে নির্দ্বিধায় সুন্দরবন থেকে অবৈধভাবে গাছ কাটা হচ্ছে। ফলে প্রতিবছরই একটু একটু করে কমে যাচ্ছে সুন্দরবনের গাছের পরিমাণ। হুমকির মুখে পড়ছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিরূপ প্রভাব-সংক্রান্ত আন্তঃসরকারি প্যানেলে এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের গোটা দক্ষিণাঞ্চল মানুষের বসবাসের অনুপযোগী।

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট