
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : উপকূল মানেই নোনাপানির সঙ্গে বসবাস। সেইসঙ্গে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভাঙন, বন্যা, ভূমিকম্পতো লেগেই আছে। সবকিছু মিলিয়েই প্রতিনিয়ত সংগ্রামে বাঁচে উপকূলের মানুষগুলো। এদের মধ্যে কারও বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি, কারও স্বপ্নের চিংড়ি ঘের ও ফসলি জমি। প্রাকৃতিক দুর্যোগে কারও যাচ্ছে প্রাণ, কেউ হারাচ্ছেন স্বপ্ন। কেউ কেউ আবার শহুরে কাজের সন্ধানে বাসস্থান ছাড়ছে। জীবন বাস্তবতায় স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে শিশুগুলো। এই বয়সেই ঢুকে যাচ্ছে কাজে, বাড়ছে শিশুশ্রম। এতে হারিয়ে যাচ্ছে তাদের শৈশব, দিক হারাচ্ছে কৈশোর। আবার নোনজলের কারণে নারীদের জরায়ু সমস্যা নতুন করে সামনে এসেছে
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার নারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে তাদের চুল ও ত্বকের ক্ষতি হচ্ছে। এছাড়া গর্ভপাত এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। সেখানকার নারী ও শিশুরা চিংড়িপোনা ধরার জন্য নদীর লবণাক্ত পানিতে প্রায় ৪-৫ ঘণ্টা সময় কাটায়। ফলে প্রজনন স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েন এসব নারী ও শিশুরা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গর্ভবতী নারীরা উচ্চ রক্তচাপ, ডেলিভারি সম্পর্কিত জটিলতা, অকাল প্রসব ও জন্মগত সমস্যা মোকাবিলা করছেন।
লবণাক্ত পানির কারণে নারীদের জরায়ু ক্যানসারের মতো জটিল রোগ বাড়ছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশে প্রতিবছর যে কয়েক লাখ নারী জরায়ু ক্যানসারের ঝুঁকিতে থাকে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ উপকূলীয় অঞ্চলের। তাদের জরায়ুসংক্রান্ত অসুখের তীব্রতা লবণাক্ততা প্রবণ গ্রামগুলোতে বেশি দেখা যায়।
লবণাক্ততার প্রভাবে শীর্ষক একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, উপকূলীয় অঞ্চলে নারী ও কিশোরীরা মাসিকের সময় ব্যবহৃত কাপড় ধুয়ে ফের সেটি ব্যবহার করে। এছাড়া, তারা লবণাক্ত পানিতে গোসলসহ দৈনন্দিন কাজ করে। এ কারণে জরায়ুসংক্রান্ত রোগের উপস্থিতি অনেক বেশি। উপকূলের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই জরায়ুসংক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
ক্যানসারবিষয়ক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গ্লোবোকনের ২০২০ সালের পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে বলা হয়, ক্যানসার আক্রান্ত ৬৮ হাজার ৭০০ নারীর মধ্যে ১৯ শতাংশ স্তন ক্যানসারে, ১২ শতাংশ জরায়ুমুখ ক্যানসারে, ১১ দশমিক ১ শতাংশ খাদ্যনালীর ক্যানসারে, ৭ দশমিক ৮ শতাংশ পিত্তাশয়ের ক্যানসারে, ৬ দশমিক ৭ শতাংশ মুখ ও ঠোঁটের ক্যানসারে এবং ৪৩ দশমিক ৪ শতাংশ নারী কয়েক ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত।
খোলপেটুয়া নদীর পাশে বসবাসকারী স্বামী পরিত্যক্তা বনজীবী নারী রেহানা খাতুন জানান, উপকূলে জীবিকা নির্বাহের জন্য ৫০ শতাংশ নারীকে নদীতে মাছ ধরাসহ মৎস ঘেরে কাজ করতে হয়। তার স্বামী তাকে ছেড়ে যাওয়ার পর থেকে নদীতে জাল টেনে ও মৎস্য ঘেরে কাজ করে দুই মেয়েকে নিয়ে কোনোরকম সংসার চালাচ্ছেন। লবণ পানিতে নামলে শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলার্জি এবং ঘা-পাঁচড়া, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়াসহ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হতে হয়। এছাড়াও ঘটে অকাল গর্ভপাতের মতো ঘটনা, সেইসঙ্গে শারীরিক নানা সমস্যা তো হয়-ই।
সাতক্ষীরা শ্যামনগরের গাবুরা এলাকায় গেলে দেখা মেলে রহিমা বেগমের সঙ্গে। লবণ পানিতে নেমে তিনি চিংড়ির পোনা শিকারে জাল ঠেলছেন, আর তার সাত বছর বয়সী ছেলে সেই মাছের পোনা গামলায় রাখছেন। রহিমা বেগমের কাছে জানতে চাইলে এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘আমাদের অভাবের সংসার। আমি জাল না ঠেললে খাওয়া চলে না। তাই এই লবণ জলে জাল ঠেলে জীবিকা নির্বাহ করছি।’
সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘নদীর লবণাক্তার কারণে নারীদের জরায়ুতে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবে চর্মরোগ হতে পারে।’
বিশেষজ্ঞরা জানান, ঋতুস্রাবের সময় উপকূলীয় অঞ্চলের নারীরা পুরনো কাপড় ব্যবহার করে। যা লবণাক্ত পানিতে ধোয়ার ফলে প্রজনন অঙ্গের সংক্রমণ হয়। ওখানকার মেয়েরা স্কুলে গিয়ে বাথরুম ব্যবহার করতে ভয় পায়। উপকূলীয় অঞ্চলে ঋতুস্রাবের সময় নোনাজলে পুরনো কাপড় ধুয়ে ব্যবহার করতে গিয়ে সংক্রমণ ও জরায়ুর রোগে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে থাকে কিশোরীরা। ফলে অনেকেই মাসিক বন্ধ রাখার জন্য জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল খাওয়া শুরু করে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া মাসের পর মাস পিল খেয়ে মাসিক বন্ধ রাখছে। যা তাদের প্রজনন স্বাস্থ্য ও মানসিক বিকাশের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে।
৫৭ বছরের মনোয়ারা বেগম, গলাচিপার আগুনমুখা নদীর ঘাটে নৌকা নিয়ে নামেন সূর্য উঠার আগেই। ৩০ বছর ধরে নদীতে মাছ ধরছেন, কিন্তু আজও মেলেনি জেলে কার্ড। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘এতদিন মাছ মারছি, জাল বাইছি, কিন্তু এখনও কাগজে আমি জেলে না। মহিলা হইয়া কি জেলে হওয়া যায় না?’ পুরুষ সহকর্মীরা সরকারি সহায়তা পেলেও নারী হওয়ায় মনোয়ারা বঞ্চিত। ভিজিএফের চাল, প্রণোদনা বা দুর্যোগকালীন ত্রাণÑ কোনো কিছুরই ভাগীদার নন তিনি।
মানতা সম্প্রদায়ের নারীরাও মুখ খুলছেন এ নিয়ে। গোলাভানু বেগম, পেশায় নারী জেলে। নদীতে জন্ম, নদীতেই জীবিকা। কিন্তু রাষ্ট্র তাকে জেলে হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। তার প্রশ্ন, ‘এই দুঃখ কই রাখি?’
সরকারি হিসাব বলছে, দেশে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১৭ লাখ ৬৪ হাজার। কিন্তু এর মধ্যে নারী জেলের সংখ্যা নেই। পটুয়াখালীতেই নারী মৎস্যজীবী রয়েছেন প্রায় ১০ হাজার, অথচ মাত্র ৫০০ জন পেয়েছেন নিবন্ধন।
ওয়ার্ল্ড ফিশ-এর গবেষক সাগরিকা স্মৃতি জানান, ‘নারী জেলেরা পুরুষদের তুলনায় বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন। ৯৩ শতাংশ নারী জেলে কোনো না কোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগেন। কিন্তু তারা সব থেকে কম কথা বলার সুযোগ পান।’
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘নারী জেলেরা মৎস্য খাতের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হলেও তাদের স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। মে দিবসে তাদের কথা না বললে এই দিবসের দাবি শুধু স্লোগানেই রয়ে যাবে।’
গলাচিপা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. জহিরুন্নবী বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের নিবন্ধনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নারীরাও সরকারি সহায়তার আওতায় আসবেন।
পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম জানিয়েছেন, সম্প্রতি মন্ত্রণালয় থেকে নারী মৎস্যজীবীদের নিবন্ধনের বিষয়ে নির্দেশনা এসেছে, কাজ শুরু হয়েছে।
তবে বাস্তবতায় এখনও তেমন অগ্রগতি নেই। যদি বাস্তব কার্যক্রম দ্রুত শুরু হয়, তবে হয়তো নারী বলে নয়Ñ জেলে বলেই পরিচিতি পাবেন উপকূলের এই অক্লান্ত নারীরা।
শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে এক হাতে বৈঠা আর এক হাতে জাল নিয়ে খালি পায়ে নদীর দিকে হাঁটতে শুরু করলেন শ্যামনগর দাতিনাখালি গ্রামের ৪৫ বছর বয়সী গীতা মুন্ডা। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মাছ ধরবেন। উঠে পড়লেন নৌকায়। তার সঙ্গী হয়েছেন তার ভাবী রানী মুন্ডা।
গ্রামটির অধিকাংশ নারীই মাছ ধরা পেশার সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে নদীতে পোনা মাছ ধরে তারা পরিবারের জীবিকা নির্বাহে সহায়তা করেন।
খুব ভোরে, সূর্য ওঠার আগেই জাল কাঁধে নদীতে নামেন তারা। কোমরসমান লবণাক্ত পানিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে মাছ ধরেন। ঘন বনে কাঁকড়াও ধরতে যান এই নারীরা। কোনো কোনো দিন জালভর্তি করে তাদের আঁচলে উঠে আসে অনেক রকমের মাছ। আবার কোনো দিন ৪০টা পোনা পেতেও নদীতে শরীর ভিজিয়ে থাকতে হয় ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা।
‘আগে একবার জাল ফেললেই কত রকম মাছ যে উঠতো, আর এখন পুরো দিনে আধা কেজি জোটে কি না সন্দেহ,’ বলেন ৪৫ বছর বয়সী গীতা মুন্ডা। তিনি প্রায় ৩০ বছর ধরে নদীতে মাছ ধরছেন।
‘নদী আর আগের মতো নাই। আর মাছও নাই,’ বলেন তিনি।
তার হাতে ঘা দেখিয়ে বলেন, ‘ছোটবেলা আমাদের বিয়ে করে নিয়ে আসছে। তখন থেকে স্বামীর সাথে মাছ ধরার কাজ করছি। আগে মিঠা পানি ছিল আর এখন লবণ পানিতে আমাদের শরীরে ঘা হয়ে যাচ্ছে। আর মিঠা পানিতে যেই মাছ টিকে, সেই মাছতো লবণ পানিতে থাকে না। তাই মাছও কমে যাচ্ছে। আগের মতো নানা রকম মাছ এখন আর দেখি না। খালি চিংড়ি, ফাইসসা, টেংরা এসব মাছ।’
গীতার মতো আরও অনেক নারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লবণাক্ত পানিতে দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে কাজ করতে গিয়ে নারীরা আক্রান্ত হচ্ছেন পায়ের পচন, চর্মরোগ ও জরায়ু সংক্রান্ত জটিলতায়।
‘আমার জরায়ু কেটে ফেলতে হইছে,’ বলেন গীতা মুন্ডা। ‘ডাক্তার কইছে, এই পানিতে আর কাজ করলে শরীর নষ্ট হইয়া যাবে।”
গত ৪ মাস আগে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে নিজের জরায়ু অপসারণ করান গীতা। ‘হঠাৎ করে পেটের মধ্য ব্যথা আর মাসিক হচ্ছিল না। পরে ডাক্তার দেখালে বলে টিউমার। পরে সেইটা অপরাশেন করে ফেলতে হইছে, টিউমারের ওজন ছিল আড়াই কেজি।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা বাংলাদেশের সবচেয়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের একটি। ঘূর্ণিঝড় আইলা (২০০৯), ফণী (২০১৯), আম্পান (২০২০), সিত্রাং (২০২২) একের পর এক দুর্যোগে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে এখানকার নদীবাঁধ, চিংড়ি ঘের, কৃষিজমি, আর মানুষের জীবন। জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়েছে পানির লবণাক্ততায়। সারা বছর নদীর পানি এখন লবণাক্ত হয়ে আছে, এমনকি খাওয়ার পানিও আজ দুর্লভ।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় প্রতি দুইজন নারীর একজন জরায়ু, ডিম্বাশয় বা প্রজনন অঙ্গ-সম্পর্কিত জটিলতায় ভুগছেন। সিপিআরডির ২০২৩ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, লবণাক্ত পানি, ঘূর্ণিঝড় ও খাদ্য সংকটের কারণে নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৫৪ শতাংশ নারী এসব সমস্যায় ভুগছেন, যা জলবায়ু ন্যায়ের চরম লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
২০২৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও একটি গবেষণায় দেখা গেছে, উপকূলীয় নারীরা যারা নিয়মিত লবণাক্ত পানিতে কাজ করেন, তাদের ৬৭ শতাংশ বিভিন্ন ত্বক ও গাইনোকোলজিক্যাল সমস্যায় আক্রান্ত হন।
তবে এসব গবেষণা মূলত শহরে প্রকাশ হয়, স্থানীয় প্রশাসন বা জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে না। ফলে এই নারীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা হয়ে থাকে নিছক পরিসংখ্যান, বলছেন পরিবেশবিদরা।
সাধারণত ধরা বা জেলে পেশাটি পুরুষদের কাজ হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু শ্যামনগরের বাস্তবতা আলাদা। এখানে নারীরাও মাছ ধরেন, জাল তৈরি করেন, ঘের দেখাশোনা করেন, এমনকি বাজারজাত করতেও যান। অনেক পরিবারেই পুরুষেরা কাজের সন্ধানে বাইরে থাকেন, আর নারীরাই পরিবারের অর্থনীতির দায়িত্ব কাঁধে নেন।
৪০ বছর বয়সী আমেনা খাতুন বলেন, ‘স্বামী ঢাকায় কাজ করে, আমি মাছ ধরেই বাচ্চাদের পড়াশোনা চালাই।’ আর এই মাছ ধরতে তাকে মহাজনের কাছ থেকে দাদন নিতে হয়েছিল। তাই মহাজনের কাছেই বাজারের চেয়ে কম দামে বাধ্য হয়ে মাছ বিক্রি করতে হয় আমেনাকে।
শত শত নারী জেলে দাদন নিয়ে মাছ ধরেন। কিন্তু এ দাদনই তাদের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে। কারণ তারা যে মহাজনের কাছ থেকে দাদন নেন, বাধ্যতামূলকভাবে তার কাছেই মাছ বেচতে হয়। এতে একদিকে ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হন, অন্যদিকে দেনার বোঝা আরও চেপে বসে।
তবে স্থানীয়ভাবে তাদের এই শ্রম বা নেতৃত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এখনো সরকারি প্রকল্প, প্রশিক্ষণ কিংবা জলবায়ু তহবিলের আওতায় নারীদের অংশগ্রহণ খুব সীমিত। তারা উন্নয়নের ডাটাবেসে নেই।
সরকারি হিসেবে সাতক্ষীরা শ্যামনগর উপজেলায় ১৬ হাজার ৮শ ৫৮ জন কার্ডধারী জেলের মধ্য নারী কার্ডধারী জেলের সংখ্যা ৭ হাজার ৭৩ জন। তবে এই সংখ্যা যে আরও বেশি সেটি এলাকা ঘুরেই প্রত্যক্ষ করা গেছে।
এখানে ৫৮ দিন সমুদ্রে মাছ ধরা নিষেধ। আর এই ৫৮ দিন শুধু সমুদ্রগামী নিবন্ধিত জেলেদের প্রতিমাসে ৪০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়, যা এই ৫৮ দিনে ৭০ থেকে ৭৫ কেজির মতো হয় বলে জানান শ্যামনগর সিনিয়র উপজেলা মৎস্য অফিসার মোহাম্মদ তৌহিদ হাসান। এখানে নারী জেলেদের জন্য আলাদা করে কোনো প্রণোদনা নেই, বলেন তিনি।
উপকূলে কিছু এনজিও ও নারী সংগঠন নারীদের বিকল্প জীবিকা প্রশিক্ষণ দিচ্ছে যেমন- শুকনো মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ, চাষাবাদে নার্সারি তৈরি, বেতশিল্প, হাঁস-মুরগি পালন ইত্যাদি। তবে এসব উদ্যোগও স্বল্প পরিসরে সীমাবদ্ধ।
সিসিডিবি (Christian Commission for Development in Bangladesh) তার এনগেজ (ENGAGE) প্রকল্পের মাধ্যমে শ্যামনগরে নারী মৎস্যজীবীদের ক্ষমতায়নে কাজ করছে। এই প্রকল্পের অধীনে নারীদের নেতৃত্ব উন্নয়ন, বিকল্প জীবিকা যেমন- কোয়েল পালন, জলবায়ু সহনশীল কৃষি এবং স্থানীয় পর্যায়ে অ্যাডভোকেসি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, ইকোফিশ (ECOFISH) প্রকল্প উপকূলীয় এলাকায় নারীদের সমন্বিত মৎস্য ব্যবস্থাপনায় অন্তর্ভুক্ত করছে। নারীরা এখন কমিউনিটিভিত্তিক কো-ম্যানেজমেন্ট কমিটিতে অংশ নিচ্ছে এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জ্ঞান ও আয় বৃদ্ধি করছে।
সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত এসডিএফ (Social Development Foundation) এর বিএসসিএমএফপি (BSCMFP) প্রকল্পের আওতায় নারীরা কারিগরি ও ভোকেশনাল প্রশিক্ষণের সুযোগ পাচ্ছেন। এতে তারা মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিকল্প পেশায় দক্ষতা অর্জন করছেন।
কোস্টাল এডুকেশন অ্যান্ড ডাইভারসিটি ইম্প্রুভমেন্ট অরগানাইজেশন- (সিআইডিআইও) শ্যামনগর কলবাড়ি এলাকায় নারী জেলেদের নৌকা দিচ্ছে যাতে মহাজনদের কাছে ঋণগ্রস্ত হয়ে দাদন চক্রে না পড়তে হয়। এছাড়া সুপেয় পানির জন্য নারীদের ক্লিন ওয়াটার হার্ভেস্টিংয়ের জন্য ৪৯ জন নারীকে পানির টাংকি বিতরণ করছে। এছাড়া ১৪টি পরিবারকে ১৭ হাজার লিটারের ড্রাম দেওয়া হয়েছে বলেও জানান সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক গাজী আল ইমরান।
‘এখানে নারীরা লোনা পানির সাথে প্রতিনিয়ত জীবন অতিবাহিত করছে, জলবায়ুর সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হচ্ছে তাদের। আর এসব নারীদের স্বস্থ্যের বিষয়টি মাথায় রেখে আমরা একটি প্রোগ্রাম চালু করেছি। যেখানে আমাদের নারী ভলেনটিয়াররা উঠান বৈঠকে বসে এলাকার নারীদের ঋতুচক্র ও প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করেন,’ বলেন গাজী আল ইমরান।
সব প্রতিকূলতা, ঋণ, লবণাক্ত পানি, শরীরের যন্ত্রণা পেছনে ফেলে শ্যামনগরের নারী জেলেরা প্রতিদিন ভোরে আবার নদীর পথে হাঁটেন। তাদের হাতে জাল, পিঠে সংসারের বোঝা, আর মনে অদৃশ্য সাহস। নদীর মতোই তারা এগিয়ে চলেন। ভাঙেন, জোড়া বাঁধেন, আবার চলেন। এই নারীরা শুধু মৎস্যজীবীই নন, তারা জলবায়ুর বিরুদ্ধে একেকজন নিঃশব্দ যোদ্ধা।