
ডেস্ক রিপোর্ট : দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী না হতে শুরু থেকেই কঠোর অবস্থান নেয় বিএনপি। এ নির্দেশনা অমান্য করায় প্রাথমিক পর্যায়ে একযোগে কয়েকজন নেতাকে বহিষ্কারও করা হয়। পরে বাকি বিদ্রোহী প্রার্থীদের অনেককে ঢাকায় ডেকে কথা বলেন বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান।
দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারাও বিভিন্ন আসনের বিদ্রোহী প্রার্থীদের সঙ্গে একাধিক দফা বৈঠক করে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। এতে কেউ কেউ সাড়া দিলেও শেষ পর্যন্ত বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের ৯২ জন নেতা নির্বাচনের মাঠ ছাড়েননি।
মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) পর্যন্ত ৭৯টি আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর বাইরে বিদ্রোহী প্রার্থীরা সরে দাঁড়াননি। এতে নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন দলটির নেতাকর্মীরা।
জানা গেছে, হাইকমান্ডের প্রত্যাশা ছিল দলের সিদ্ধান্ত মেনে স্বতন্ত্র ব্যানারে দাঁড়ানো সব বিদ্রোহী প্রার্থী শেষ পর্যন্ত সরে দাঁড়াবেন। কিন্তু ৯২ নেতা মাঠে থাকায় নির্বাচনের আগে দলটির ভেতরে অস্বস্তি রয়ে গেছে।
বিশেষ করে যেসব আসনে একাধিক বিএনপি নেতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, সেখানে মূল প্রার্থীর ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে সুবিধা পেতে পারেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। একই সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে ছেড়ে দেওয়া আসনগুলোতেও বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে প্রায় দেড় যুগ ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি।
রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কার্যালয় থেকে প্রতিনিধিদের পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৯৮ আসনের মধ্যে ২৯৫ আসনের হিসাব বিশ্লেষণ করে এই চিত্র পাওয়া গেছে। শুরুতে বিএনপির দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ১১৭টি আসনে প্রায় ১৯০ জন নেতা প্রার্থী হয়েছিলেন। পরবর্তীতে মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ে কয়েকজনের মনোনয়ন বাতিল হয়। শেষ দিনে অনেকে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করলেও ৯২ জন নির্বাচন থেকে সরে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
এদিকে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হওয়া নেতাদের মধ্যে অন্তত ১৩ জনকে বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পর্যায়ের পদ-পদবি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। আজ বুধবার (২১ জানুয়ারি) প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণায় নামবেন প্রার্থীরা।
বহিষ্কারেও মাঠ ছাড়লেন না তারা
দল থেকে বহিষ্কারের পরও যুগপৎ আন্দোলনের শরিক ও সমমনাদের জন্য ছেড়ে দেওয়া আসনগুলোতে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি বিএনপির বহিষ্কৃত নেতারা। বরং তারা ভোটে থাকার সিদ্ধান্তের কথা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন। কেউ কেউ বলেছেন, বহিষ্কৃত হওয়ায় দলের নির্দেশনা মানতে তারা বাধ্য নন।
ঢাকা-১২ আসনে বিএনপি গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক দল বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হককে প্রার্থী করেছে। এ আসনে বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন পাওয়া ঢাকা মহানগর উত্তর কমিটির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলমের (নীরব) স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন। গত ৩০ ডিসেম্বর তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনে বিএনপির সাবেক আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহসম্পাদক রুমিন ফারহানাও মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি। এ আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব জুনায়েদ আল হাবীবকে সমর্থন দিয়েছে বিএনপি। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হওয়ায় তাকেও বহিষ্কার করা হয়েছে।
পটুয়াখালী-৩ আসনে বিএনপি যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দল গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে সমর্থন দিলেও মাঠে আছেন বহিষ্কৃত নেতা হাসান মামুন। তিনি কোনোভাবেই মাঠ ছাড়বেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন।
ঝিনাইদহ-৪ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাইফুল ইসলাম ফিরোজ। তিনি ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সদস্য এবং জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
এ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট করার জন্য গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. রাশেদ খাঁন বিএনপিতে যোগ দেন। সাইফুল ইসলাম ফিরোজ দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হওয়ায় তাকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি।
সিলেট-৫ আসনে জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মামুনুর রশিদও প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি। এ আসন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সভাপতি মাওলানা মোহাম্মদ উবায়দুল্লাহ ফারুককে ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। মামুনুর রশিদকে ইতোমধ্যে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মনির হোসেন কাসেমীকে ছাড়লেও এখানে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আছেন দুজন।
তারা হলেন- বিএনপির সাবেক কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ শাহ আলম ও মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন। তাদের দুজনকে ইতোমধ্যে বিএনপি বহিষ্কার করেছে।
যশোর-৫ আসনে উপজেলা বিএনপির সভাপতি শহীদ মো. ইকবাল হোসেন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি। এ আসনও বাংলাদেশ জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের (অনিবন্ধিত দল) নেতা মুফতি রশীদ বিন ওয়াক্কাছকে ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জাতীয় দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন সৈয়দ এহসানুল হুদা। তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে। এই আসনে কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য ও বাজিতপুর উপজেলার সভাপতি শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল প্রার্থী হয়েছেন। তিনি মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি।
গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম শরিক দল নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাকে একটি আসন ছাড়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে বিএনপির। তিনি ঢাকা-১৮ আর বগুড়া-২ আসনে প্রার্থী হয়েছেন। মনোনয়নপত্র বৈধও হয়েছে। দুই আসনেই নির্বাচন করতে চান মান্না।
ঢাকা-১৮ আসনে বিএনপি এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনকে ও বগুড়া-২ আসনে বিএনপির নেতা মীর শাহে আলমকে মনোনয়ন দিয়েছে। তাদের দুজনের প্রার্থিতাও বৈধ হয়েছে।
ঢাকা-১২ ছাড়াও রাজধানীতে আরো দুটি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়ে গেছেন। আসনগুলো হলো ঢাকা-৭ ও ঢাকা-১৪।
ঢাকা-৭ আসনে বিএনপির প্রার্থী হামিদুর রহমানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন বিএনপির নেতা ইসহাক সরকার। তিনি জাতীয়তাবাদী যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক।
অন্যদিকে ঢাকা-১৪ আসনে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলামকে (তুলি) প্রার্থী করে বিএনপি। এই আসনে দারুস সালাম থানা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক (সাজু) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন স্বতন্ত্র হিসেবে। ইতোমধ্যে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
প্রভাবশালী নেতাদের আসনেও বিদ্রোহীদের হানা
মিত্র দলের নেতারা যখন বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ে বেকায়দায় পড়েছেন তখন খোদ নিজ দলের প্রভাবশালী অনেক নেতা সমস্যায় পড়েছেন। কারণ তাদের আসনেও বিদ্রোহী প্রার্থী আছেন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন (টুকু) টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনে বিএনপি প্রার্থী। এই আসনে টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ইকবাল মনোনয়ন প্রত্যাহার করেনি। নোয়াখালী-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক। এই আসনে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য কাজী মফিজুর রহমান বিদ্রোহী হিসেবে মাঠে আছেন।
মুন্সিগঞ্জ-১ আসনে শেখ আবদুল্লাহর বিপরীতে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মমিন আলী রয়ে গেছেন।
কুমিল্লার তিনটি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন। কুমিল্লা-২ আসনে রয়েছেন খালেদা জিয়ার এক সময়কার এপিএস আবদুল মতিন, কুমিল্লা-৭ আসনে চান্দিনা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আতিকুল আলম, কুমিল্লা-৯ আসনে সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিমের মেয়ে সামিরা আজিম।
সুনামগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী কয়সর আহমেদের বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন। সুনামগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী নুরুল ইসলামের বিপরীতে জেলা বিএনপির জেলা সাবেক সহ-সভাপতি দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনে জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি এ কে এম কামরুজ্জামান ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ইকবাল চৌধুরী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে রুমিন ফারহানা ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি ও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্টের মহাসচিব তরুণ দে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন। তরুণ দেও বহিষ্কার হয়েছেন বিএনপি থেকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা বিএনপির অর্থবিষয়ক সম্পাদক কাজী নাজমুল হোসেন।
নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনের মধ্যে চারটি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহসম্পাদক মোহাম্মদ দুলাল হোসেন, নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে সাবেক সংসদ সদস্য আতাউর রহমান খান আঙ্গুর, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে সাবেক প্রতিমন্ত্রী রেজাউল করিম ও বহিষ্কৃত জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির নির্বাহী কমিটির বহিষ্কৃত দুই সদস্য মোহাম্মদ শাহ আলম ও মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন।
সবচেয়ে বেশি বিদ্রোহী প্রার্থী আছে ময়মনসিংহে। এই জেলার ১১টি আসনে বিএনপির সাত জন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। এদের মধ্যে ময়মনসিংহ-১ আসনে উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য সালমান ওমর, ময়মনসিংহ-২ আসনে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য (দল থেকে বহিষ্কৃত) শাহ্ শহীদ সারোয়ার, ময়মনসিংহ-৩ আসনে উপজেলা বিএনপির বহিষ্কৃত আহ্বায়ক আহাম্মদ তায়েবুর রহমান, ময়মনসিংহ-৬ আসনে উপজেলা মহিলা দলের সাবেক সভাপতি আখতার সুলতানা, ময়মনসিংহ-৭ আসনে আনোয়ার সাদাত, ময়মনসিংহ-৯ আসনে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম খুররম খান চৌধুরীর স্ত্রী হাসিনা খান চৌধুরী, ময়মনসিংহ-১০ আসনে দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবু বকর সিদ্দিকুর রহমান, ময়মনসিংহ-১১ আসনে উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ মোর্শেদ আলম বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন।
অনেক চেষ্টার পরও বিদ্রোহী প্রার্থীদের সরাতে না পারার বিষয়ে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একজন শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ করার শর্তে ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘নানাভাবে দলের পক্ষ থেকে চেষ্টা করা হয়েছে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যারা নির্বাচন করছেন তাদের নিবৃত করতে। অনেককে বহিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এখনো অনেকে রয়ে গেছেন। দলের সিদ্ধান্ত যারা মানছেন না তাদের জন্য নিশ্চয়ই আরো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।’