
সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা : চলছে রমজান মাস। রহমত, মাগফিরাত ও নাজাত নিয়ে আমাদের মাঝে আগমন করেছে পবিত্র মাহে রমজান। বছরের বারো মাসের মধ্যে রমজান মাস হলো সবচাইতে ফজিলত এবং বরকত পূর্ণ মাস। এ মাসের রোজা আল্লাহ তাআলা ফরজ করেছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রমজানের রোজা ফরয করা হয়েছে, যেভাবে তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতের উপর ফরজ করা হয়েছিল। যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পারো। (সূরা বাকারা : ১৮৩)। এ মাসে দিনের বেলা রোজা আর রাতের বেলা তারাবির নামাজ মুসলমানদের উপর পালনীয়। এ মাসে আল্লাহ তাআলা রহমতের দরজা সমূহ খুলে দেন এবং অভিশপ্ত শয়তানকে শিকলে আবদ্ধ করে রাখেন। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন রমজান মাস আসে তখন রহমতের দরজা সমূহ খুলে দেওয়া হয়। (সহি বুখারী, হাদিস: ১৮৯৮) অন্য এক হাদীসে হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রমজান মাস আসলে জান্নাতের দরজা সমূহ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজা সমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (সহিহ মুসলিম : ২৩৮৫)।
রমজান মাসে একটি আমল করলে অন্য মাসের তুলনায় তা বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেওয়া হয় সওয়াবের দিক থেকে। রমজানে যদি কেউ একটি নফল আমল করে তাহলে অন্য মাসের ফরজ আমল সমতুল্য তাকে সওয়াব দেয়া হয়। হযরত সালমান ফারসী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রমজান মাসে যে ব্যক্তি একটি নফল আদায় করল সে যেন অন্য মাসে একটি ফরজ আদায় করল। আর যে এ মাসে একটি ফরজ আদায় করল সে যেন অন্য মাসে সত্তরটি ফরজ আদায় করল। (শুআবুল ঈমান, বায়হাকী: ৩/৩০৫-৩০৬)। অর্থাৎ এ মাসের নফল আদায় করলে অন্য মাসের ফরজের ন্যায় সওয়াব হয়। আর এ মাসের এক ফরজে অন্য মাসে ৭০ ফরজের সমান সওয়াব হয়।
কেউ যদি বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ করতে চায়, তাহলে তার জন্য প্রস্তুতি এবং প্রশিক্ষণ নেওয়া আবশ্যক। কারণ সে যদি ভালোভাবে প্রস্তুতি না নেয় তাহলে সে তার উদ্দেশ্যে সফলকাম হতে পারবে না। উদ্দেশ্যে সফলকাম হওয়ার জন্য আগে থেকে প্রস্তুতি থাকা আবশ্যক। আমরা যদি সাধারণ দুনিয়ার কোন কাজের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো, প্রত্যেক কাজের জন্য আগে প্রশিক্ষণ দিতে হয়। কর্মের তুলনায় প্রশিক্ষণ অনেক কষ্টের হয়ে থাকে। কর্মক্ষেত্রে যেন সে পরবর্তী কাজগুলি ভালো করে করতে পারে, এজন্য এভাবে তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে অনেক বৈধ কাজকে তার জন্য অবৈধ করে দেওয়া হয় যাতে প্রশিক্ষণ ভালো হয়।
এবং কর্মক্ষেত্রে গিয়ে ভালো ফলাফল করতে পারে। এজন্য মহান আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে রমজান মাস দিয়েছেন একটা প্রশিক্ষণ হিসেবে আর সেটা হল তাকওয়া ও আল্লাহ ভীতি অর্জন করার প্রশিক্ষণ। এজন্য দেখা যায় রমজানের বাহিরে যে কাজগুলি আমাদের জন্য বৈধ যেমন পানাহার ও স্ত্রীসহবাস, এগুলোকে রমজান মাসে অবৈধ করে দেওয়া হয়েছে যাতে করে বান্দা তাকওয়া ও আল্লাহ ভীতির ব্যাপারে পরিপূর্ণ প্রশিক্ষণ নিতে পারে। আমরা যদি পবিত্র রমজানের পূর্ণ বরকত ও ফজিলত লাভ করতে চাই, তাহলে তার জন্য আমাদের নিজেদেরকে প্রস্তুত করতে হবে। শারীরিক ও মানসিক উভয় প্রস্তুতিই কাম্য। পূর্ণ প্রস্তুতি না থাকলে মাঝ পথে আমরা ছিটকে পড়তে পারি ।
রমজানকে সামনে রেখে আমরা যে সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারি তার কয়েকটি হল – এক. গুনাহ ছেড়ে দেওয়া। আমার দ্বারা যদি কোন গুনাহ হতে থাকে তাহলে তা ছেড়ে দিতে হবে এবং একনিষ্ঠ ভাবে আল্লাহ তাআলার কাছে তাওবা করতে হবে। তাওবা অর্থ আল্লাহ তাআলার দিকে ফিরে যাওয়া। তাওবা তিন জিনিসের নাম। ১. পূর্বের গুনাহ ছেড়ে দেওয়া। ২. পূর্বের গুনাহের উপর লজ্জিত হওয়া। ৩. ভবিষ্যতে তার উপর দঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া। দুই. বেশী বেশী তওবা-ইস্তেগফার করা। তিন. জান্নাত – জাহান্নাম এবং মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ করা।
চার. রোজা, ইফতার ও সাহরীর মাসআলা-মাসায়েল সমূহ ভালোভাবে জেনে নেয়া, যাতে করে অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে আমার রোজা নষ্ট হয়ে না যায়। পাঁচ. নিত্যপয়োজনীয় পণ্য – সামগ্রী ও অর্থকরি আগে থেকে যথাসম্ভব মজুদ করে রাখার চেষ্টা করা। যাতে করে রমজানে শরীরের উপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে। ছয়. রমজানের আগের মাস গুলিতে, বিশেষ করে রজব ও শাবান মাসে কিছু কিছু রোজা রেখে রমজানের জন্য শরীর এবং মনকে অভ্যস্ত করা। সাত. যে সকল আসবাব – সামগ্রী দ্বারা গুনাহ ও পাপ কাজ সংঘটিত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে সেগুলি নিজের কাছ থেকে সরিয়ে ফেলা। আট. যে সকল কাজ করলে আমলের প্রতি আগ্রহ বাড়ে সেগুলি করা। নয়. নিজের পরিবার ও সন্তানাদিকে রোজা রাখার জন্য প্রস্তুত করা। দশ. রমজান ও রোজার ফাজায়েল সমূহ পরস্পরের মাঝে বেশি বেশি আলোচনা এবং পর্যালোচনা করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে রমজানের পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করে রোজাগুলো আদায় করার তাওফিক দান করুন ।সিয়াম সাধনা ও আত্মশুদ্ধির বার্তা নিয়ে বছর ঘুরে এলো পবিত্র রমজান মাস। হিজরি বর্ষের বারো মাসের মধ্যে নবম মাস হলো রমজান। ফযিলত, রহমত, বরকতের দিক দিয়ে এ মাস অন্য ১১ মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। ধর্মপ্রাণ মুসলানদের কাছে এ মাসের গুরুত্ব অপরিসীম।
ফযিলতের দিক থেকে রমজান মাসকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রমজান মাসের প্রথমাংশে রহমত, দ্বিতীয়াংশে মাগফিরাত আর তৃতীয়াংশে নাজাত তথা দোজখ থেকে মুক্তি।’ তৃতীয়াংশে- অর্থাৎ শেষ দশকে রয়েছে হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ‘লাইলাতুল কদর’। আল্লাহ তা’লা উম্মতে মুহাম্মাদির লাইলাতুল কদরের একরাত্রির ইবাদতকে পূর্ববর্তী উম্মতগণের এক হাজার মাসের ইবাদাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। এ রাত সম্পর্কে কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে, ‘শবে কদর হল এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ’।
‘সাওম’ বা রোজা ইসলামের মূল ভিত্তিসমুহের মধ্যে অন্যতম। ‘সাওম’ আরবি শব্দ। এর অর্থ বিরত থাকা। ‘সাওম’ শব্দের বহুবচন হচ্ছে ‘সিয়াম’। শরিয়তের পরিভাষায় সুবহে সাদিক উদয় হওয়ার পূর্ব থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজার নিয়তে পানাহার ও যৌনাচার থেকে বিরত থাকার নাম ‘সাওম’। আল্লাহ তা’লা কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেন, ‘হে ইমানদারগণ! তোমাদের উপর ‘সিয়াম’- তথা রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা পরহেজগারি অর্জন করতে পারো’। (সূরা বাকারা- ১৮৩)।
অন্য আয়াতে আল্লাহ তা’লা বলেন, ‘রমজান মাসই হল সে মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে আল-কুরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়ত এবং সৎ পথের ¯পষ্ঠ নিদর্শন ও সত্য-মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এই মাসটি পাবে, সে এতে রোজা রাখবে।’ (সূরা বাকারা ১৮৫)।
রমজান মাসের আগমন হলে রাসূলুল্লাহ (সা.) খুবই আনন্দিত হতেন। সাহাবায়ে কেরামদের বলতেন, বরকতময় মাস রমজান এসেছে। এ মাসের কিছু ফযীলত বর্ণনা করে তিনি বলতেন, ‘আল্লাহ তা’লা তোমাদের জন্য সিয়াম পালন ফরজ করেছেন। এ মাসে আকাশের দ্বারসমূহ খুলে দেয়া হয়। বন্ধ করে দেয়া হয় জাহান্নামের দরজাগুলো। অভিশপ্ত শয়তানকে বন্দি করা হয়। এ মাসে রয়েছে একটি রাত যা হাজার রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। যে ব্যক্তি এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো সে মূলত সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল। (নাসায়ি)।
রাসুল (সা.) বলেছেন, রমজান মাসে আমার উম্মতকে পাঁচটি বিশেষ নিয়ামত দান করা হয়েছে, যা আগেকার উম্মতগণকে দেওয়া হয়নি। এই নিয়ামতগুলো হচ্ছে- ১. রোজাদারের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকের চেয়ে বেশী ঘ্রানযুক্ত। ২. ইফতার পর্যন্ত রোজাদারের জন্য ফেরেশতারা দোয়া করেন। ৩. রোজাদারের জন্য প্রতিদিন জান্নাতকে সজ্জিত করা হয়। ৪. শয়তানকে বন্দি করা হয়। ৫. রমজানের শেষ রাতে সকল উম্মতকে ক্ষমা করা হয়।
আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দাদের জন্য অধিক পূণ্য অর্জনের বিশেষ অফার নিয়ে আসে পবিত্র রমজান মাস। আল্লাহপাক রাব্বুল আলামীন বলেন, ‘নিশ্চয়ই রোজা আমার জন্য, এর প্রতিদান আমিই দান করি’। রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ‘রমজান মাসে যে ব্যক্তি একটি নফল আদায় করল, সে যেন অন্য মাসের একটি ফরজ আদায় করল। আর যে ব্যক্তি এ মাসে একটি ফরজ আদায় করল, সে যেন অন্য মাসের সত্তরটি ফরজ আদায় করল’। (বায়হাকি)।
এ মাসে সিয়াম পালনকারী একজন মুসলমান সত্যিকারের খাঁটি ইবাদতকারী হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। আল্লাহ তায়ালা সন্তুষ্ঠ হয়ে পাপি-তাপি বান্দাদেরকে উদারচিত্তে ক্ষমা করেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত- মহানবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সহিত সওয়াবের নিয়তে রমজান মাসে সওম পালন করবে, তার অতীতের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (বুখারি)।
রমজান মাসের প্রত্যেকটি রোজা এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে, হযরত আবু হুরায়রাহ (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোন কারণ ছাড়া ইচ্ছাপূর্বক রমজানের একটি রোজা ভঙ্গ করে সে যদি অন্য সময় সারা জীবন রোজা রাখে তবুও রমজানের একটি রোজার সমতুল্য হবে না।’ একশ্রেণীর মানুষ আছে যারা পাপিষ্ঠ শয়তানের ধোকায় পড়ে শরিয়তসম্মত কারণ ছাড়া গোপনে সিযাম ভঙ্গ করে ফেলে। সবার মনে রাখা উচিৎ- নিজের প্রতিটি কাজের জন্য মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে জবাবদিহি করতে হবে। ঘরের দরজা বন্ধ করে বা নির্জন স্থানে অবস্থান করলে হয়তো দুনিয়ার মানুষকে আড়াল করা যাবে; কিন্তু মহান আল্লাহ তায়ালাকে আড়াল করা সম্ভব নয়। তিনি সবকিছু দেখেন, সবকিছু শুনেন। পৃথিবীর সব কিছুই তাঁর দৃষ্টিসীমার মধ্যে। কোন কারণ ছাড়া মাহে রমজানের একটি রোজা ভঙ্গ করলে আল্লাহর দরবারে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।
আবার অনেকে রোজা রেখে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হন। নানাবিধ গোনাহের কাজে লিপ্ত হন। এরকম সিয়াম পালনের দ্বারা আত্মশুদ্ধি ও তাক্বওয়া অর্জিত হবে না। খানাপিনা, যৌনাচার থেকে মুক্ত থাকার পাশাপাশি সকল প্রকার অনৈতিক কাজ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার নামই হচ্ছে ‘সিয়াম’। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত নবী করীম (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা ও মিথ্যা আমল বর্জন করেনি, তার এ পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। (বুখারি)।
এ মাসে প্রত্যেক মুসলমানের করণীয় হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সিয়াম পালন করা। অন্যান্য ফরজ ইবাদাতসমুহ গুরুত্বসহকারে আদায় করা। সুন্নাত ও যাবতীয় নফল ইবাদাত পালনে যত্নবান হওযা। বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা। তাওবা-ইস্তেগফার, জিকির-আজকার ও মোনাজাত করা। হালাল গ্রহন করা হারাম থেকে থেকে বেঁচে থাকা। কাউকে গালি না দেওয়া। গীবত না করা। চুরি-ডাকাতি, দুর্নীতি না করা। সন্ত্রাস, খুন, গুম, ধর্ষণ, যেনা-ব্যবিচার না করা।
রমজান মাসের পবিত্রতা রক্ষা করা প্রত্যেকের জন্য জরুরী। এ মাসে যাবতীয় অশ্লিলতা ও ব্যহায়াপনা থেকে বেঁচে থাকা, দিনের বেলা হোটেল রেস্তেরা বন্ধ রাখা উচিত। সেহরী, ইফতার ও তারাবিহের সময় যাতে বিদ্যুৎবিভ্রাট বা লোডশেডিং না হয় সে দিকে বিশেষ লক্ষ রাখতে হবে। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বোগতি রোধ করে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখতে প্রয়োজনীয় প্রদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আমরা দেখতে পাই, বিভিন্ন আরব দেশে রমজান মাস আসার আগেই পণ্যের দাম অনেকটা কমিয়ে দেয়া হয়। বিভিন্ন দেশে মূল্য ছাড়ের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের দেশে এর ঠিক উল্টো। এখানে রমজান মাস আসার আগেই দাম বাড়ানোর প্রতিযোগিতা শুরু হযে যায়। এছাড়াও পণ্যে ভেজাল দিয়ে আমাদের খাবারকে দুষিত করা হচ্ছে। ভেজাল খাবার গ্রহণের ফলে মানবদেহে বিভিন্ন ধরণের রোগ সৃষ্টি হচ্ছে। পবিত্র রমজান মাসে অসৎ মুনাফাখোর ব্যবসায়ীদের অপকৌশলের বিরুদ্ধে সরকারকে আরো কঠোর হতে হবে।
বছরের সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ পবিত্র রমজান মাস এলে ধর্মপ্রান মুসলমানরা আনন্দিত হন। প্রত্যেকেই দুনিয়াবি কাজকর্ম সংক্ষিপ্ত পর্যায়ে নিয়ে আসেন। ব্যবসা-বাণিজ্য, আফিস-আদালত ইত্যাদির সময়ও সংক্ষিপ্ত করা হয়। সকলেই তাক্বওয়া অর্জন ও আত্মশুদ্ধির জন্য আল্লাহর ইবাদাত-বন্দেগীতে মশগুল হন। বাংলাদেশের মানুষ অধিক ধর্মপরায়ন। এ দেশের মানুষ ইবাদাতের বিশেষ উপলক্ষ্যগুলো যথাযথভাবে কাজে লাগানোর প্রয়াস চালায়। বিশেষকরে রমজান মাস এলে এদেশের মুসলমানরা আল্লাহর বন্দেগীতে আত্মনিয়োগ করে। ‘রমযান বছরের বাকি এগার মাস অপেক্ষা অধিক মর্যাদাশীল ও বরকতপূর্ণ মাস। এ মাসের বিশেষত্ব অনেক।
১. এ মাসেই মানুষ ও জিন জাতির মুক্তির সনদ কুরআন মজীদ একত্রে লাওহে মাহফূয থেকে প্রথম আসমানে বাইতুল ইযযতে অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট সর্বপ্রথম এ মাসেই ওহী অবতীর্ণ হয়। কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে- (তরজমা) ‘রমযান মাসই হল সে মাস যাতে নাযিল করা হয়েছে কুরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়াত এবং সত্যপথযাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথনির্দেশ। -সূরা বাকারা ১৮৫
২. এ মাসে রহমতের দরজা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। হাদীস শরীফে এসেছে- ‘রমযান মাস শুরু হলেই রহমতের দরজা খুলে দেওয়া হয়।’ -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১০৭৯/২
৩. অন্য এক হাদীসে এ মাসের ফযীলত বর্ণিত হয়েছে যে, ‘রমযান মাসের শুভাগমন উপলক্ষে জান্নাতের দরজাসমুহ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর শয়তানকে শৃংখলাবদ্ধ করা হয়।’ -সহীহ বুখারী, হাদীস ১৮৯৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১০৭৯/১
৪. এ মাস জাহান্নাম থেকে নাজাত লাভের মাস। সুতরাং বেশি বেশি ইবাদত ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে মুক্তির পরওয়ানা লাভ করার এটিই সুবর্ণ সুযোগ। হাদীস শরীফে এসেছে- ‘আল্লাহ তাআলা প্রত্যহ ইফতারের সময় অসংখ্য ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন।’ -মুসনাদে আহমদ হাদীস ২১৬৯৮
৫. ব্যবসায়ী মহলের একটি বিশেষ মৌসুম থাকে যখন তাদের ব্যবসা হয় খুব জমজমাট ও লাভজনক। সে মৌসুমে বৎসরের অন্য সময়ের চেয়ে অনেক বেশি আয় হয়। আখেরাতের ব্যবসায়ীদের জন্য আখেরাতের সওদা করার উত্তম মৌসুম হল এই রমযান মাস। কেননা এ মাসে প্রতিটি আমলের অনেক গুণ বেশি ছওয়াব পাওয়া যায়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- ‘রমযানের ওমরা হজ্জ সমতুল্য।’ -জামে তিরমিযী, হাদীস ৯৩৯; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৯৮৬
অন্য এক বর্ণনায় (যা সনদের দিক থেকে দুর্বল) বিষয়টি এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, ‘রমযান মাসে যে ব্যক্তি একটি নফল আদায় করল সে যেন অন্য মাসে একটি ফযর আদায় করল। আর যে এ মাসে একটি ফরয আদায় করল সে যেন অন্য মাসে সত্তরটি ফরয আদায় করল। -শুআবুল ঈমান ৩/৩০৫-৩০৬
অর্থাৎ এ মাসে নফল আদায় করলে অন্য মাসের ফরযের ন্যায় ছওয়াব হয়। আর এ মাসের এক ফরযে অন্য মাসের ৭০ ফরযের সমান ছওয়াব পাওয়া যায়।
এ তো হল রোযা ছাড়া এ মাসের অন্যান্য আমলের ছওয়াব। আর রোযার ছওয়াব সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা নিজেই ইরশাদ করেন- (তরজমা) ‘নিশ্চয় রোযা আমার জন্য, আর এর প্রতিদান স্বয়ং আমিই দিব।’ সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৫১/১৬৫
এ ছওয়াবের পরিমাণ যে কত তা একমাত্র তিনিই জানেন। এ প্রসঙ্গে ‘রোযার ফযীলত’ শিরোনামে আলোকপাত করা হয়েছে।
রমযান মাস রহমত, বরকত, মাগফিরাত, জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাত লাভের মাস। তাই এমন মাস পেয়েও যে ব্যক্তি স্বীয় গুনাহ মাফ করাতে পারল না তার জন্য স্বয়ং জিবরাঈল আ. বদদুআ করেছেন এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাহমাতুল্লিল আলামিন হয়েও আমীন বলে সমর্থন জানিয়েছেন। হাদীস শরীফে এসেছে- ‘নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বরে উঠে আমীন, আমীন, আমীন বললেন। তাঁকে বলা হল, হে রাসূল! আপনি তো এরূপ করতেন না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, জিবরাঈল আমাকে বললেন, ঐ ব্যক্তি ধ্বংস হোক যে পিতা-মাতা উভয়কে অথবা একজনকে পেয়েও (তাদের খেদমত করে) জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না। তখন আমি বললাম, আমীন। অতঃপর তিনি বললেন, ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক যে রমযান পেয়েও নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারল না। আমি বললাম, আমীন। জিবরাঈল আবার বললেন, ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক যার নিকট আমার নাম আলোচিত হল অথচ সে আমার উপর দুরূদ পড়ল না। আমি বললাম, আমীন। -আল আদাবুল মুফরাদ : ২২৫, হাদীস ৬৪৬; সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস ৯০৮
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে রমযানের হক আদায় করার তওফীক দান করুন এবং নবীজীর অভিসম্পাৎ থেকে রক্ষা করুন। আমীন!
* রোযা : রমযান মাসে রোযা রাখা ফরয। এটা এ মাসের বিশেষ আমল। সকল আদব রক্ষা করে পুরো মাস রোযা রাখা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য।
* তারাবীহ : রমযানের রাতের বিশেষ আমল হল কিয়ামে রমযান তথা বিশ রাকাত তারাবীহ। এ মাসের অফুরন্ত রহমত ও মাগফিরাত লাভ করার জন্য এবং প্রতিশ্রুত ছওয়াব ও পুরস্কার পাওয়ার জন্য তারাবী নামাযের প্রভাব অপরিসীম।
* দান করা : দান-সদকা সর্বাবস্থাতেই উৎকৃষ্ট আমল, কিন্তু রমযানে তার গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়। হাদীস শরীফে এসেছে- ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়ার সকল মানুষ অপেক্ষা অধিক দানশীল ছিলেন। রমযান মাসে তাঁর দানের হস্ত আরো প্রসারিত হত।’ -সহীহ বুখারী, হাদীস ১৯০২
* কুরআন মজীদ তেলাওয়াত : এ মাস কুরআন অবতরণের মাস। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরীল আ.-এর সাথে রমযানের প্রত্যেক রাতে কুরআন মজীদ দাওর করতেন। হাদীস শরীফে এসেছে- ‘হযরত জিবরীল আ. রমযানের শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক রাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সাক্ষাত করতেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে কুরআন মজীদ শোনাতেন।’-সহীহ বুখারী, হাদীস ১৯০২
অতএব আমাদের প্রত্যেকের উচিত রমযানে অধিক পরিমাণে কুরআন তেলাওয়াত করা। অন্তত একবার হলেও কুরআন মজীদ খতম করা। সালাফে সালেহীনের জীবনী আলোচনা করলে দেখা যায় যে, তাঁরা এবং পরিবারের সদস্যগণ প্রত্যেকে রমযানে বহুবার কুরআন মজীদ খতম করতেন।
* নফল ইবাদত : এ মাসে শয়তান শৃংখলাবদ্ধ থাকে। এই সুযোগে অধিক পরিমাণে নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জন করা যায়। এ মাসে যে কোনো ইবাদত নিয়মিত করতে তেমন কোনো বেগ পেতে হয় না এবং পরবর্তীতে তা সহজেই অভ্যাসে পরিণত হয়। সুতরাং যিকির-আযকারের সঙ্গে অধিক পরিমাণে নফল নামায আদায় করা উচিত। অন্তত বিভিন্ন সময়ের নফল নামাযগুলো আদায় করা যেমন-ইশরাক, চাশত ও তাহাজ্জুদ ইত্যাদি।
আফসোসের বিষয় এই যে, রমযানে সাহরীতে উঠলেই দু’চার রাকাত তাহাজ্জুদ নামায সহজেই পড়া যায়। বছরের অন্য দিনের মতো কষ্ট করার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু অমনোযোগী হওয়ার ফলে কিংবা সাহরীতে অতি ভোজনের কারণে তাহাজ্জুদ আদায়ের সুযোগ হয়ে ওঠে না।
* দুআ করা : এ মাস রহমত, বরকত, মাগফিরাত ও জান্নাত লাভের মাস। তাই বেশি বেশি আল্লাহ তাআলার শরণাপন্ন হয়ে কান্না-কাটি করে দুআ করা একান্ত কাম্য।
* মাগফিরাত কামনা করা : যে ব্যক্তি রমযান পেয়েও স্বীয় গুনাহসমূহ ক্ষমা করাতে পারল না তার উপর জিবরীল আ. ও দয়ার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভিসম্পাত করেছেন। তাই জীবনের কৃত গুনাহের কথা স্মরণ করে বেশি বেশি তওবা ইস্তেগফার করা এবং আল্লাহ তাআলার দরবারে ক্ষমা মঞ্জুর করিয়ে নেওয়ার এটিই উত্তম সময়। বিশেষ করে ইফতার ও তাহাজ্জুদের সময় আল্লাহ তাআলার দরবারে ক্ষমা চাওয়া এবং দুআ করা উচিত।
* ই’তিকাফ : শেষ দশকের মাসনূন ই’তিকাফ অত্যন্ত ফযীলতের আমল। হাদীস শরীফে এসেছে- ‘নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের শেষ দশদিন ইতিকাফ করতেন।’ -সহীহ বুখারী, হাদীস ২০২১; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৭১ ঁ
* শবে কদর অন্বেষণ : ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমে রাত্রি জাগরণ করে সহস্র রজনী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ও উত্তম রাত-লাইলাতুল কদর তালাশ করা কর্তব্য। কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে-
‘নিঃসন্দেহে কদরের রাতে আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি। আর আপনি কি জানেন শবে কদর কী? শবে কদর হল এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। এ রাতে ফেরেশতা ও রুহুল কুদ্স (জিবরাঈল আ.) তাদের পালনকর্তার আদেশক্রমে প্রত্যেক মঙ্গলময় বস্ত্ত নিয়ে (পৃথিবীতে) অবতরণ করে। (এ রাতের) আগাগোড়া শান্তি যা ফজর হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।’ -সূরা কদর
ইসলামের মূল স্তম্ভসমূহের মধ্যে ঈমান, নামায ও যাকাতের পরই রোযার স্থান। হাদীস শরীফে এসেছে-
‘পাঁচটি স্তম্ভের উপর ইসলামের ভিত্তি স্থাপিত : আল্লাহ তাআলা এক বলে স্বীকার করা, নামায কায়েম করা, যাকাত প্রদান করা, রমযানের রোযা রাখা ও হজ্জ পালন করা।’ সহীহ মুসলিম ১/৩২
সুতরাং রমযানের পূর্ণ মাস রোযা রাখা ফরয। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- (তরজমা) ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর (রমযানের) রোযা ফরয করা হয়েছে, যেভাবে তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতের উপর ফরয করা হয়েছিল। যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।’- সূরা বাকারা ১৮৩
শরয়ী ওযর ছাড়া যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত একটি রোযাও পরিত্যাগ করে সে নিকৃষ্ট পাপী। দ্বীনের মৌলিক ফরয লংঘনকারী এবং ঈমান ও ইসলামের ভিত্তি বিনষ্টকারীরূপে সে পরিগণিত হবে। আর এ কাজ সে রোযার যে মঙ্গল ও বরকত থেকে বঞ্চিত হবে তা কস্মিণকালেও পাবে না। এমনকি এ রোযার কাযা করে নিলেও তা ফিরে পাবে না। হাদীস শরীফে এসেছে ‘যে ব্যক্তি কোনো ওযর বা অসুস্থতা ব্যতিরেকে রমযানের একটি রোযা পরিত্যাগ করবে সে যদি ঐ রোযার পরিবর্তে আজীবন রোযা রাখে তবুও ঐ এক রোযার ক্ষতি পূরণ হবে না।’ -জামে তিরমিযী, হাদীস ৭২৩
অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় এই যে, আমাদের সমাজে অনেক সবল-সুঠাম দেহের অধিকারী ব্যক্তিও অকারণে, সামান্য ছুতায় অসুস্থ হওয়ার অমূলক আশংকায় রোযা পরিত্যাগ করে। এতে তারা আখেরাতের কত বড় ক্ষতি নিজের উপর টেনে নিচ্ছে তা একটু ভেবেও দেখে না।
রোযার অর্থ : রোযা একটি ফারসী শব্দ। এর আরবী হল ‘ছওম’। ছওম এর আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা। শরীয়তের পরিভাষায় ‘জ্ঞানবুদ্ধি সম্পন্ন মুসলমানের উপর সুবহে সাদিক তথা দিনের একেবারে শুরু ভাগ থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোযার নিয়তে পানাহার, স্ত্রী সহবাস ও রোযাভঙ্গকারী অন্যান্য কার্যাদি থেকে বিরত থাকার নামই হল ‘সওম’ বা ‘রোযা’।’
রোযা এমন একটি ইবাদত যা বাহ্যত কষ্টকর হলেও তার প্রচলন ছিল সর্বকালে। হযরত আদম আ.-এর যুগ থেকে শেষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত সকল নবীর উম্মতের উপরই তা ফরয ছিল। -রূহুল মাআনী ২/৫৬
অবশ্য পূর্ব যুগে রোযার ধরন ছিল বিভিন্ন প্রকৃতির। রোযা রাখার পদ্ধতির ভিন্নতা ছাড়াও ফরয রোযার সংখ্যাও বিভিন্ন রকম ছিল। প্রাথমিক অবস্থায় উম্মতে মুহাম্মদীর উপরও কেবলমাত্র আশুরার রোযা ফরয ছিল। রমযানের রোযার ফরয বিধান আসার পর আশুরার রোযা ফরয হওয়ার হুকুম রহিত হয়ে যায়। -মাআরিফুস সুনান ৫/৩২৩
উল্লেখ্য, রোযা ফরয হয় হিজরতের দেড় বৎসর পর, ১০ শাবানে। রোযা ফরয হওয়ার পর নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মোট ৯টি রমযান পেয়েছিলেন।
রোযার হেকমত তথা অন্তনির্হিত তাৎপর্য সম্পর্কে আলোচনার পূর্বে একটি কথা ভালোভাবে জানা থাকা দরকার। তা এই যে, মহিয়ান গরিয়ান আল্লাহ তাআলা ও মানুষের মাঝে সম্পর্ক হল মহান স্রষ্টা ও ক্ষুদ্র সৃষ্টি এবং মহা মুনিব ও সাধারণ দাসের সম্পর্ক। এ সম্পর্কের সুস্পষ্ট দাবি হল, সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী বিশ্ব প্রতিপালক স্রষ্টার যে কোনো নির্দেশ পালন করতে মানুষ সর্বদা প্রস্ত্তত থাকবে। ঐ নির্দেশের হেকমত (তাৎপর্য) তার বুঝে আসুক আর নাই আসুক। সুতরাং মহান আল্লাহ তাআলা যত প্রকার ইবাদতের নির্দেশ দিবেন সেগুলোর কোনো কারণ বা তাৎপর্যের পিছনে না পড়ে তৎক্ষণাৎ নতশিরে তা মেনে নেওয়াই হচ্ছে বান্দার দায়িত্ব। বলাবাহুল্য, শরীয়ত নির্দেশিত কোনো ইবাদতই তাৎপর্যহীন বা যুক্তিবিরোধী নয়। তবে সব কিছুর যুক্তি বা হেকমতই যে বান্দার জানা থাকবে বা বান্দার জ্ঞান-বুদ্ধি তাকে স্পর্শ করতে পারবে এমনটি ভাবা ঠিক নয়। কারণ আল্লাহ তাআলা বান্দাকে অতি সামান্য জ্ঞানই দান করেছেন। ইরশাদ হয়েছে- ‘তোমাদেরকে অতি সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে।’-সূরা আলইমরান ৮৫
আল্লাহ রাববুল আলামীনের নির্দেশনসমূহে কত হেকমত, কত কারণ এবং কত উদ্দেশ্যই থাকতে পারে, বান্দার কত কল্যাণই তাতে নিহিত থাকতে পারে। অসীম জ্ঞানের অধিকারী সে স্বত্তার নির্দেশনসমূহ তাৎপর্য সসীম জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ কতই বা বুঝতে পারবে! তবুও ইসলামী পন্ডিতগণ বিভিন্ন ইবাদতের বিভিন্ন ধরনের হেকমত বর্ণনা করেছেন। রোযার ব্যাপারেও বিভিন্ন হেকমতের কথা তাঁরা বলেছেন। যদিও শরীয়তের নির্দেশ মান্য করা এ সকল হেকমত বুঝে আসার সাথে সম্পর্কিত নয় তথাপি সম্মানিত পাঠকমন্ডলীর কৌতুহল নিবারণের উদ্দেশ্যে নিম্নে রোযার দু’একটি হেকমত সম্পর্কেও আলোকপাত করা হল।
‘আল্লাহ তাআলা মানুষের স্বভাবে যে ফেরেশতা সুলভ বৈশিষ্ট্য চরিত্র গচ্ছিত রেখেছেন, তার উন্নতি ও উৎকর্ষসাধন এবং নফস ও প্রবৃত্তির দমন ও নিবৃত্তির অন্যতম মাধ্যম হল রোযা। কানা’আত, আত্মশুদ্ধি, সবর ও শোকর, তাকওয়ার মতো বৈশিষ্ট্যগুলোর উন্নতি ও বিকাশে রোযার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। উপরন্তু রোযার মাধ্যমে মানুষ উদার ও প্রবৃত্তিরথ জৈবিক তাড়না হতে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে ঊর্ধ্ব জগৎ তথা আপন স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক ও যোগসূত্র স্থাপন।