
ডেস্ক রিপোর্ট : ভেজাল বীজের কারণে চলতি বোরো মৌসুমে ফলন কমে যাওয়ার আশংকা করছেন কৃষকরা। খুলনাঞ্চলের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পথে আসছে ভারতীয় ভেজাল বীজ। বীজের মান যাচাইয়ের সুযোগ না থাকায় এ সবের সাথে আসছে বিভিন্ন ধরণের ক্ষতিকর আগাছা। ছত্রাকজনীত রোগবালাই এবং মিলিবাগ, প্লান্ট হপারসহ নানা পোকামাকড়। অধিকাংশ বীজ অত্যন্ত নিম্নমানের হওয়ায় ফলনেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা। এতে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিতে পড়ছে উন্নয়নশীল খুলনাঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা। স্থানীয় কৃষি দপ্তর বলছে, খুলনাঞ্চলের কৃষকরা আধুনিক উচ্চফলনশীল ফসল আবাদে ঝুঁকছে। এক দশকে বাণিজ্যিক চাষাবাদ বেড়েছে ব্যাপক। কিন্ত সে তুলনায় পর্যাপ্ত উচ্চফলনশীল বীজের জোগান নেই। চাহিদার মাত্র ১০ শতাংশ উচ্চফলনশীল বীজ সরবরাহ করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। আর এ সুযোগটিই কাজে লাগিয়েছে অসাধু সিন্ডিকেট। সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পথে আসছে পাট, ভুট্রা, গম, ধান ও বিভিন্ন হাইব্রিড সবজি বীজ। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ বছর টমোটো চাষে চাষীরা ভেজাল বীজে ক্ষতির শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া নিম্নমানের বোরো ধান বীজে প্রতারিত হয়েছে এ অঞ্চলের কৃষকরা। অধিকাংশ বীজের অঙ্কুরোদ্গমনই হয়নি। আর এসব বীজের পুরোটাই চোরাই পথে এসেছে এমনটি দাবী করেন কৃষি কর্মকর্তাগণ। খুলনার বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা জানান, এবার প্রায় ৯টি হাইব্রিড জাতের টমেটো চাষ করেন তারা। এর মধ্যে ইউএস নাসির বীজ কিনে প্রতারিত হয়েছেন কয়েকজন চাষী। ফলন বিপর্যয় হয়ে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির মধ্যে পড়েছেন তারা। মাঠ পরিদর্শনে কৃষকদের অভিযোগের সত্যতা মিলেছে বলে জানিয়েছেন বটিয়াঘাটা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু বক্কর সিদ্দিক। তিনি বলেন, এক সময়ে চোরাই পথে আসা বীজের মূল্য কম হওয়ায় কৃষকরা সেদিকেই বেশী ঝুঁকে পড়তেন। তারা বাজার থেকে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের এসব বীজ ক্রয় করে ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তবে এখন আর সীমান্ত পথে বীজ প্রবেশ করেনা। এবার ৯ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। যা গত দুবছরের চেয়ে দ্বিগুন।
বটিয়াঘাটার কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, বাজার থেকে বীজ ক্রয় করার পর তিনি অতি আগ্রহে বীজতলা তৈরী করেন। কিন্ত বীজ খুবই কম অঙ্কুরিত হয়েছে। যে কারণে ধারণার চেয়ে কম জমিতে রোপন করা সম্ভব হয়েছে। তার পরও ফলন নিয়ে শংকা রয়েছে। রূপসা উপজেলার যুগিহাটী গ্রামের সবজি চাষী শেখ জিয়া উদ্দিন বলেন, তিনি পনেরো কাঠা জমিতে শাক-সবজির আবাদের জন্য জমি তৈরী করেছেন। কিন্তু বীজের চড়া দামের কারণে অর্ধেকের বেশী জমি এখনও পড়ে রযেছে। বীজ ক্রয় করে ঠকেছেন এমন অনেক কৃষক কয়েকটি বীজ কোম্পানীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। এদিকে শুধু ফলন বিপর্যই নয়, বীজের সাথে আসছে ক্ষতিকর আগাছা ও রোগবালাই। সীমান্ত দিয়ে এ পর্যন্ত আমদানী হয়েছে দানা, ফল, মসলা পশুখাদ্য ও সবজিসহ আরো কয়েকটি পণ্য। এর মধ্যে কোন ধরণেরই বীজ নেই। সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধ পথে এ সব বীজ অনুপ্রবেশ করলেও পরীক্ষার কোন ব্যবস্থা নেই। যশোরের বেনাপোল ও সাতক্ষিরার ভোমরা সীমান্ত দিয়ে সাধরণত বৈধপথে বীজ প্রবেশ না করায় এ সব বীজ পরীক্ষার আওতায় আসে না। ফলে ক্ষতিকর উদ্ভিদ বীজ এ সব বীজের সাথে থেকে যায়। পরবর্তীতে এ সবের বিস্তার ছড়িয়ে পড়ে কৃষির ব্যাপক ক্ষতি করে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে প্রতি মৌসুমে কয়েক কোটি টাকার ভেজাল বীজ আসছে সীমান্ত পেরিয়ে। খুলনার অন্তত ৮ জন ব্যবসায়ী নিয়ন্ত্রণ করছেন এ সিন্ডিকেট। তারা ভারতের খোলা বজার থেকে ভেজাল বীজ ক্রয় করে বিভিন্ন আকর্ষনীয় মোড়কে রেখে বিক্রি করেন। শুধু তাই নয়, খুলনার কালিবাড়ী এলাকায় বিভিন্ন বীজ বিক্রেতা দেশী জাতের নিম্ন মানের বীজ আকর্ষণীয় মোড়কে রেখে বিভিন্ন কোম্পানীর নাম ব্যবহার করে উচ্চ মূল্যে বিক্রি করছেন। এ ব্যাপারে প্রশাসনিক ভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় দিনে দিনে ভেজাল বীজের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েই চলেছে।
খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নজরুল ইসলাম বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, অসাধু বীজ বিক্রেতাদের সঠিক ভাবে সনাক্ত করতে পারলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কঠোর নজরদারীও করা চলছে। তিনি বলেন, চোরাচালানের মাধ্যমে প্রবেশ করা বীজ যেমন কৃষির ক্ষতি করে, তেমনি এসব বীজের সাথে প্রবেশ ক্ষতিকর উদ্ভিদ ভাইরাস ছড়াতে সহায়তা দেয়। ব্লাস্ট রোগর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ায় গম চাষ প্রায় বন্ধ রয়েছে। তবে কড়াকড়ি তদারকির কারণে ঘুরে দাঁড়িয়েছে খুলনার কৃষি।