1. mesharulislammonir1122@gmail.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন
  2. info@www.sangjogprotidin.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন :
বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৯:২৮ অপরাহ্ন

রমজানের গুরুত্ব

  • প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
  • ৩৪ বার পড়া হয়েছে

সিরাজুল ইসলাম, (ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক : রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের মাস রমজানুল মোবারক ফিরে এসেছে। এ মাস সিয়াম সাধনার। আত্মসংযমের। ধৈর্য, ত্যাগ, সহানুভূতি, সহমর্মিতা অর্জনের। মানবিক গুণাবলী অনুশীলনের। এ জন্য এ মাস অতি পবিত্র। মুসলিম জাতির জন্য তো বটেই অন্যান্য জাতির নিকটও এ মাসটি অতি পবিত্র, বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এ মাসে মানব জাতিকে সঠিক পথপ্রদর্শনের জন্য যেমন মহাগ্রন্থ আল-কুরআন নাজিল হয়েছে, তেমনি অন্যান্য আসমানী কিতাবও নাজিল হয়েছে এ পবিত্র মাসেই। এ মাসের মধ্যে অবস্থিত হাজার মাসের চেয়ে উত্তম কুরআনের নুজুল, তেমনি হযরত ইব্রাহীমের ছহিফা এ মাসের প্রথম কিংবা তৃতীয় তারিখে অবতীর্ণ হয়। অষ্টাদশ কিংবা দ্বাদশ তারিখে জবুর প্রাপ্ত হন হযরত দাউদ (আ.) ৬ষ্ঠ দিবসে তৌরাত পান হযরত মুসা (আ.)। দ্বাদশ কিংবা ত্রয়োদশ তারিখে ইঞ্জিল প্রাপ্ত হন হযরত ঈসা (আ.)। এরূপ সব আসমানী কিতাব এ মাসে নাজিল হওয়ায় সব জাতির নিকট এ মাস যেমন পবিত্র, তেমনি এর পবিত্রতা রক্ষার জন্য যতœবান হওয়া উচিত প্রত্যেককেই। পবিত্রতা বা সম্মান রক্ষার অর্থ যার ওপর রোজা রাখা ফরজ তার রোজা রাখা, অধীনস্ত অন্যান্যের রোজা রাখানো। সব রকমের অন্যায়, অশ্লীলতা, বেলেল্লাপনা, নোংরামী, চরিত্রবিধ্বংসী ও নৈতিকতাবিরোধী কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকা ও অন্যান্যেরও বিরত রাখার চেষ্টা করা, রাস্তা-ঘাটে প্রকাশ্য দিবালোকে ধূমপানসহ সর্বপ্রকার পানাহার বন্ধ রাখা। ঝগড়া-ঝাটি, ফ্যাসাদ, কলহ-কোন্দল এড়িয়ে থাকা এবং তা যাতে সৃষ্টি হতে না পারে সেজন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো। সব ব্যাপারে সংযমশীলতার পরিচয় দেয়া।
কুরআন তিলাওয়াত, চরিত্র গঠনমূলক আলোচনা অনুষ্ঠান, ইবাদত-বন্দেগি ইত্যাদির মাধ্যমে মুত্তাকী হওয়ার জন্য ব্রতী হওয়াই এ মাসের দাবি। যতেœর সাথে দীর্ঘ একটি মাস যদি গোটা জাতি এই সাধনায় আত্মনিয়োগ করে তবে তার মনমানসিকতার পরিবর্তন সম্ভব। রমজানের উদ্দেশ্য যাতে সফল হয়, এ জন্য সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা চালানো উচিত প্রতিটি লোকের। বিশেষ করে, সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের এ ব্যাপারে পালন করা উচিত বিশেষ ভূমিকা। কারণ, আমাদের আর্থিক অভাব, অনটন আছে একথা সত্য, কিন্তু আজকে সবচেয়ে বড় অভাব হচ্ছে সততার, ন্যায়নিষ্ঠার, দায়িত্ববোধের, সৎ চরিত্রের, যার অভাবে কোনো জাতি কখনও নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে না, আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে না। আমাদের জনগণ, জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে প্রায় সকলেই রমজানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে থাকে। তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এজন্য চেষ্টাও চালায়। কিন্তু একশ্রেণির অসৎ অতিলোভী ব্যবসায়ী, কিছু দায়িত্বহীন উচ্ছৃংখল, বখাটে যুবক এর পবিত্রতা বিনষ্টের জন্য যেন ইচ্ছাকৃতভাবেই তৎপর হয়। এ ধরনের হীন মানসিকতাসম্পন্ন ব্যবসায়ীদের কথা অবশ্য আলাদা। লোভ তাদের পশুরও অধম করেছে। শকুন যেমন মড়া দেখলে খুশি হয়, তেমনি এরা মানুষের দুর্দশা দেখলে আনন্দিত হয়। একে মনে করে মুনাফা লোটার, স্ফীত হয়ে ওঠার একটা মোক্ষম মওকা। বানে, বন্যায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগে অগণিত মানুষ যখন হাহাকার করে, তখন তারা মাল আটকে রেখে মওজুদারির মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি করার ধান্ধায় থাকে। জিনিসপত্রের দাম দ্বিগুণ, ত্রিগুণ বাড়িয়ে রাতারাতি বড়লোক হওয়ার প্রতিযোগিতায় উঠে-পড়ে লেগে যায়। রমজানকেও এরা মোক্ষম সুযোগ মনে করে মানুষের রক্ত চোষার ঘৃণ্য তৎপরতায় লিপ্ত হয়। এদেরই কারসাজিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দাম হু হু করে চড়ে যায়। চলে যায় সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে। উপর দিয়ে ধার্মিকতার যতই ভড়ং দেখাক না কেন, এদের কাছে রমজানের আবেদন ব্যর্থ হয়ে যায়। আত্মশুদ্ধি বা কৃচ্ছ্রতা নয়, লোভ-লালসাই বর্ধিত হয় এদের।
রমজান মাস সহানুভূতি ও সহমর্মিতার মাস। রাসূলেপাক (সা.) একে আখ্যায়িত করেছেন শাহরুল মাওয়াছাত বা সমবেদনা ও সহমর্মিতার মাস বলে। গরিব-দুঃখী, দুস্থ, অনাথ, কাঙ্গালদের ব্যথা-কষ্ট দূর করার জন্য এ মাসে আরও অধিক যতœবান হওয়া উচিত। কেবল ধনীরাই দান করবে, তা নয়। তারা তাদের মতো করবে, আমরাও পারি আমাদের মতো করতে। আমার ইফতারির জন্য ৫টা আইটেমের জায়গায় ৩টা আইটেম করে বাকি দুটো বা দুটোর পয়সা দিতে পারি আমাদের অভাবগ্রস্ত নিকট-প্রতিবেশীকে। আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, রাসূলে করিম (সা.)-এর সেই সাবধান বাণী: খোদার কসম, সে ব্যক্তি মোমেন নয়, যে পেট পুরে আহার করে আর তার প্রতিবেশী অনাহারী ক্ষুধার্ত অবস্থায় রাত কাটায়। রাসূলে করিম (সা.) আরও বলেছেন, আর যদি না পারো তবে তোমাদের তরকারিতে একটু বেশি করে সুরওয়া বা ঝোল দিও এবং তা প্রতিবেশীকে পৌঁছিও। কত বাস্তব ও যুক্তিপূর্ণ একথা। আসলে লাখ টাকা দান করাই বড় কথা নয়, আমার যা আছে তা থেকে যতটা সম্ভব দেয়াই বড় কথা। এটা একটা মানসিকতা। আমরা প্রত্যেকেই যদি নিজ নিজ প্রতিবেশীর দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হতাম, তবে সমাজে এ হাহাকার থাকতে পারতো না। নিজ বাড়ির আশপাশের ৪০ ঘর হচ্ছে প্রতিবেশী। প্রত্যেকেই যদি এ ৪০ ঘরের খোঁজ-খবর রাখে, সাধ্যানুযায়ী তাদের অভাব-অভিযোগ, দুঃখ-কষ্ট লাঘবের জন্য সচেষ্ট হয়, তবে সমাজের অবস্থা পাল্টে যেতে পারে। ধর্মপরায়ণতা প্রদর্শনীর ব্যাপার নয়, অন্তরের। তেমনি সওয়াব আড়ম্বরতার মধ্যে নেই, তা নিয়ত বা মননের মধ্যে। যিনি দোকানদার তিনি রোজাদারদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে এই পবিত্র মাসের ফজিলতের প্রতি লক্ষ্য রেখে যদি যা ন্যায্যমূল্য তাই রাখে বা অন্য সময়ের তুলনায় একটু কম রাখে তবে অবশ্যই সে এর জন্য সওয়াব পাবে। এভাবে প্রত্যেকে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে নিজ নিজ সাধ্যসীমার মধ্যে কিছু না কিছু অবশ্যই করতে পারে।
রমজান মাসে ভালো ভালো খাবার আর ভূরিভোজনের প্রবণতা লক্ষ করা যায়। সারাদিন অনাহারে থাকার মাসুল সুদে-আসলে পুরিয়ে নেয়ার জন্য সেহরি ও ইফতারিতে অধিক আয়োজন ও খাওয়ার প্রতিযোগিতা চলে। আসলে এতে রোজার মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যায়। এ মাস তো কৃচ্ছ্রতা সাধনের। সংযম সাধনার। রোজার মূল উদ্দেশ্য কামভাব ও প্রবৃত্তি দমন। কিন্তু অতিরিক্ত আহারের দ্বারা তা সফল হলো কোথায়? শেখ সাদী বলেছেন, পেট ও শরীর পূজারীদের অন্তর জ্ঞান ও সূক্ষ্মতন্ত্রের আলোক থেকে বঞ্চিত থাকে। তাই অপচয় না করে বরং দৈনন্দিন রুটিন খাবার থেকে কিছু বাঁচিয়ে পাশের অনাহারী লোকদের মুখে যদি তা তুলে দেয়া যায় এর দ্বারাই রোজার মূল লক্ষ্য হাসিল করা সম্ভব।রমযান সিয়ামের মাস।
কোরআন নাযিলের মাস। খায়ের ও বরকতের মাস। তাকওয়া অর্জনের মাস। আমলে অগ্রগামী হওয়ার মাস। নেকী হাছিলের মাস। তারাবী, তাহাজ্জুদ ও কুরআন তিলাওয়াতের মাস। ইতিকাফের মাস। শবে কদরের মাস। গুনাহ তরক করার মাস। ক্ষমা লাভের মাস। প্রবৃত্তির লাগাম টেনে ধরার মাস। সংযম সাধনার মাস। ভ্রাতৃত্ব চর্চার মাস। ক্ষমা, উদারতা ও সহানুভূতির মাস। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বনী আদমের প্রতিটি আমলের প্রতিদান বহু গুণে বৃদ্ধি হতে থাকে, ১০ গুণ থেকে ৭০০ গুণ, এমনকি আল্লাহ চাইলে তার চেয়েও বেশি দেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, তবে রোযার বিষয়টি ভিন্ন। কেননা রোযা একমাত্র আমার জন্য এবং আমি স্বয়ং এর প্রতিদান দিব। বান্দা একমাত্র আমার জন্য পানাহার ও প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণ থেকে বিরত থাকে। রোযাদারের জন্য দুটি আনন্দ। এক. ইফতারের মুহূর্তে, দুই. রবের সঙ্গে সাক্ষাতের মুহূর্তে। আর রোযাদারের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকের চেয়েও উত্তম। (সহীহ মুসলিম : ১১৫১)।
হযরত সাহল ইবনে সা’দ (রা.) থেকে বর্ণিত, জান্নাতে রাইয়ান নামে একটি দরজা আছে। এই দরজা দিয়ে শুধু রোযাদাররা প্রবেশ করবে। ঘোষণা করা হবে, রোযাদাররা কোথায়? তখন তারা উঠে দাঁড়াবে। যখন তাঁরা প্রবেশ করবে তখন ওই দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে এবং সেই দরজা দিয়ে আর কেউ প্রবেশ করবে না। (সহীহ বুখারী : ১৮৯৬)।
রোযাদারের দুআ ফিরিয়ে দেয়া হয় না। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তিন ব্যক্তির দুআ ফিরিয়ে দেয়া হয় না : ১. রোযাদারের দুআ ইফতার করা পর্যন্ত। ২. ন্যায়পরায়ণ বাদশাহর দুআ। ৩. মাজলুমের দুআ। আল্লাহ তাআলা তাদের দুআ মেঘমালার উপরে উঠিয়ে নেন। এর জন্য আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়। আর আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার ইজ্জতের কসম! বিলম্বে হলেও আমি অবশ্যই তোমাকে সাহায্য করব। (জামে তিরমিযী : ৩৫৯৮)।
রোযা রোযাদারের জন্য সুপারিশ করবে। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রোযা এবং কুরআন কিয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোযা বলবে, আমি তাকে দিনের বেলায় পানাহার ও প্রবৃত্তির চাহিদা মেটানো থেকে বিরত রেখেছি; সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। কুরআন বলবে, আমি তাকে রাতের ঘুম থেকে বিরত রেখেছি; সুতরাং আমার সুপারিশ কবুল করুন। তখন দু’জনের সুপারিশই গ্রহণ করা হবে। (মুসনাদে আহমাদ : ৬৬২৬)।
জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, প্রতিদিন ইফতারের সময় অনেক জাহান্নামীকে মুক্তি দেয়া হয় এবং এটা প্রতি রাতে। (সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৬৪৩)। রমযানুল মুবারকের শুরুতে শয়তান ও দুষ্ট জিনদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করা হয়, জান্নাতের দরজা খুলে দেয়া হয়
রমযানুল মুবারকের আরেকটি ফযীলতের কথা এসেছে একটি হাদীসে। আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রমযান মাসের প্রথম রাতে শয়তান ও দুষ্ট জিনদেরকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করা হয় এবং (পুরো রমযান) এর একটি দরজাও আর খোলা হয় না, জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয় এবং (রমযানে) এর একটি দরজাও আর বন্ধ করা হয় না। (এ মাসে) একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দিতে থাকেন, হে কল্যাণ অন্বেষী! অগ্রসর হও। হে অকল্যাণ অন্বেষী! নিবৃত্ত হও, নিয়ন্ত্রিত হও। আর বহু লোককে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে এ মাসে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে দেয়া হয়। প্রত্যেক রাতেই এরূপ হতে থাকে। (জামে তিরমিযী : ৬৮২)।পবিত্র মাহে রমজান এবার আমাদের দ্বারপ্রান্তে সমাগত। আত্মশুদ্ধি, সাম্য, সহমর্মিতা ও মানবীয় গুণাবলী সৃষ্টির উদাত্ত আহ্বান নিয়ে এলো পবিত্র রমজান। মুসলিম জাতীয় ঐতিহ্য চেতনায় এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনে রমজান অতি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা রমজান মাস পবিত্র কুরআন নাজিলের মাস, ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও বিজয়ের মাস। মুসলমানদের দ্বীন ও দুনিয়ার সমৃদ্ধি, পার্থিব ও আধ্যাত্মিক উন্নতি, দৈহিক ও মানবিক শ্রেষ্ঠত্ব আর গৌরব ও মর্যাদার অবিস্মরণীয় স্মৃতি বয়ে নিয়ে আসে মাহে রমজান। উন্নত চরিত্র অর্জনের পক্ষে অন্তরায় পাশবিক বাসনার প্রাবল্যকে পরাভ’ত করত: পাশবিক শক্তিকে আয়ত্বাধীন করা হচ্ছে সিয়ামের তাৎপর্য। ব্যক্তিগত এবং সামাজিকভাবে সর্বত্র আল্লাহর দ্বীনের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠায় যাবতীয় প্রতিকূলতার মূখে টিকে থাকার জন্যে যে মনমানসিকতার প্রয়োজন সিয়াম সাধনার দ্বারাই তা অর্জিত হয়। মানবতার মহান নেতা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর বিপ্লবী সাহাবারা এ মহান মাসে বদর যুদ্ধসহ লড়াই করেছিলেন বাতিলের বিরুদ্ধে, অন্যায়-অবিচার, জুলুম ও শোষণের বিরুদ্ধে এবং মানুষের ওপর মানুষের প্রভ’ত্ব খতম করার লক্ষ্যে। তাই আজ শুধু রমজানের মাহাত্ম আউড়িয়ে আত্মতৃপ্তি পাবার সুযোগ নেই। বরং মানবতা রক্ষার জন্যে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নেতৃত্বে সাহাবায়ে কেরাম আত্মত্যাগের যে নজির স্থাপন করে গেছেন, সেই ত্যাগের আদর্শ গ্রহণের মধ্যেই পবিত্র রমজানের চেতনা নিহিত। আজ প্রয়োজন রমজানের ত্যাগ-তিতিক্ষার সেই চেতনায় উজ্জীবিত হওয়া। ইসলামের বিজয় পতাকাকে সমুন্নত রাখার জন্যে পবিত্র রমজান মাসে সেই আত্মত্যাগের ইতিহাস আমাদের কাছে এক শিক্ষার বাণী বহন করে ফেরে। রমজানে সংযম ও আত্মত্যাগের অনুশীলন এবং সেই সাথে ইসলাম ভিত্তিক ন্যায়, সত্য ও সততা প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রত্যয় গ্রহণ প্রয়োজন। এসব ত্যাগ-তিতিক্ষা ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় প্রমাণিত, শাশ্বত ও জীবন্ত। তাই মহান আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস রেখে অসত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার অনুশীলন করার সুযোগ আসে রমজান মাসে। নৈতিকতা, শালীনতা ও ইফতার গ্রহণের মাধ্যমে সহমর্মিতার সদভ্যাস গড়ে তুলে ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক কল্যাণ সাধনের পথ প্রশস্ত করার অনুশীলন করার মাস হচ্ছে রমজান। চিরায়ত ইসলামী মূল্যবোধ, ধ্যান-ধারণা, চরিত্র, ধর্ম ও আদর্শ রক্ষায় ইসলামী নিয়ম-কানুন অনুশীলনের চেতনা জোরদার করতে হবে । তাছাড়া সিয়াম সাধনার মধ্য দিয়ে মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে মাফফিরাতের কামনা করতে হবে।
মুসলমানদের জন্য আল্লাহ তাআলার এক বিশাল নেয়ামত হচ্ছে রমযান মাস। আমরা কি রমযানের হাকীকত এবং এর মর্তবা মর্যাদা সম্পর্কে অবগত হওয়ার সামান্যতম কোনো গরযবোধ করছি? আমরা তো দিবানিশি দুনিয়ার ঝামেলার মধ্যে ডুবে রয়েছি। সকাল সন্ধ্যা নিজের ধান্ধা ফিকিরের চক্করেই সময় বিনষ্ট করছি। পার্থিব স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া আমাদের অস্থিমজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রমযান কি জিনিস তা নিয়ে চিন্তা ভাবনার সময় আমাদের কোথায়? রমযানের মাহাত্ম্য, এর গুরুত্ব, ফযীলত ও মর্তবা একমাত্র তাদের কাছেই রয়েছে, যারা এ মাসের বরকত সম্পর্কে অবগত। যারা জানে এ মাসটি খোদায়ী নূরে পরিপূর্ণ। এ মাসে আল্লাহর রহমতের প্লাবন বয়ে যায়, এ ধারণা যাদের আছে তারাই এ মাসের সম্মান করে থাকে। কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাদীসে ইরশাদ করেন, ‘হে আল্লাহ! রজব এবং শাবান মাসে আমাদের উপর বরকত অবতীর্ণ কর। আর আমাদেরকে রমযানে পৌঁছিয়ে দাও।’ ( মাজমাউয যাওয়ায়িদ: খন্ড-২, পৃষ্ঠা-১৬৫)। এই হাদীসের মর্ম হল, আমাদের বয়স এতটুকু দীর্ঘ করে দাও, যেন রমযান মাসের সৌভাগ্য আমাদের অর্জিত হয়। এ থেকেই অনুমান করা যায় যে, দু’মাস পূর্ব থেকেই রমযানের জন্য অধীর অপেক্ষার পর্বটি শুরু হয়ে যায়। আর এই অপেক্ষার পর্বটি একমাত্র তাদের দ্বারাই হতে পারে, যারা এ মাসের মর্যাদা, এ মাসের গুরুত্ব ও ফযীলত উপলব্ধি করতে সক্ষম।
আল্লাহ তাআলা মানবজাতির সৃষ্টিকর্তা। তাই তিনি জ্ঞাত ছিলেন মানুষ দুনিয়ার ধান্ধায় জড়িয়ে তাঁকে ভুলে যাবে। দুনিয়ার কর্মকান্ডে সে যত নিবিড়ভাবে জড়িয়ে পড়বে আল্লাহ তাআলার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার একাগ্রতায় ততই দুর্বলতা আসবে। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে একটি সূবর্ণ সুযোগ করে দিলেন। তিনি তাদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা দিলেন: প্রতি বছর আমি তোমাদেরকে একটি মাস প্রদান করছি। এগার মাস দুনিয়াদারী এবং অর্থকড়ির ধান্ধার পেছনে ছুটাছুটি করার কারণে যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে। আন্তরিকতার সঙ্গে এই একটি মাস যদি তোমরা আমার কাছে প্রত্যাবর্তন কর, তাহলে এগার মাসে যে আধ্যাত্মিক ঘাটতি তোমাদের হয়েছে, আমার নৈকট্য অর্জনের ক্ষেত্রে যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে, এই মহান ও পবিত্র মাসে তোমরা তা পূরণ করে নাও। নিজের অন্তরের জং পাকসাফ করে পূত: পবিত্র হয়ে যাও। আমার সঙ্গে দূরত্ব হ্রাস করে নৈকট্য অর্জন করে নাও। অন্তরে আমার স্মরণ ও যিকির বাড়িয়ে দাও। মহান রাব্বুল আলামীন এই উদ্দেশ্যের নিরিখেই মুসলিম উম্মাহর জন্য রমযানের বরকতময় মাস দান করেছেন। এই উদ্দেশ্যাবলী অর্জনে,আল্লাহর নৈকট্য হাসিল ও সান্নিধ্য অর্জনে রোযার প্রথম ও প্রধান ভূমিকা রয়েছে। রোযা ছাড়া আর যেসব ইবাদত এই পবিত্র মাসে মুসলমানদের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে সেগুলোও আল্লাহ তাআলার নৈকট্য ও সান্নিধ্য অর্জনে বিরাট ভূমিকা রয়েছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্য একটিই, আর তা হল, এই পুণ্যময় মাসের মাধ্যমে মানবজাতিকে নিজের কাছে টেনে নেয়া। শুধু উপবাস থাকাই রমজানের সাফল্যের শর্ত নয়, বরং উপবাসের সাথে যাবতীয় পাপ কাজ যেমন মিথ্যা কথা বলা, গীবত করা, চোগলখোরী, মুনাফাখোরী, কালোবাজারী, প্রতারণা ও প্রবঞ্চনার মতো ইসলাম বিরোধী কাজ থেকে বিরত থাকার কঠোর অনুশীলন না করলে রমজানের সুফল পাওয়া যাবেনা। পবিত্র রমজানের পবিত্রতা বজায় রেখে রমজানের মাহাত্ব ও গুরুত্ব উপলব্ধি করার জন্যে বিশ্ব মুসলিমকে আল্লাহ পাক তাওফিক দান করুন, আমীন।ইন্ডিয়ার অভিনেতা ইরফান খান মন্তব্য করেছিলেন যে, জনগণের কুরবানি ও রোজা না করে আত্ম-পরীক্ষা, অন্তর্দশন করা উচিত। তিনি বলেন যে, ভেড়া-ছাগল কুরবানি না করে নিজের নিকটবর্তী কিছুকে কুরবানি করা উচিত। এ ধরনের মন্তব্যের পর অলইন্ডিয়া মুসলিম পারসনাল ল’ বোর্ডের সদস্য জাফর গিলাবী একে সমালোচনা করলেন। জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ সংগঠনের সচিব মাওলানা খাত্রি বললেন, অভিনেতার উচিত নিজের ‘ক্যারিয়ার’- কাজের দিকে নজর দেয়া এবং উল্টাপাল্টা বক্তব্য না রাখা।
মুসলিম হয়ে ইরফান খান কুরবানি ও রোজাকে নিরুৎসাহিত করেছেন। কুরআন-হাদিস, ইসলামী জীবন দর্শন না জানার ফলে এটা হয়েছে। রোজা তো কুরআন-হাদিসের নির্দেশে রাখা হয়। কুরআন বলে, ‘তোমরা যদি সঠিক বিষয় অনুধাবন করতে তাহলে তোমরা বুঝতে তোমাদের জন্য রোজা রাখাই অধিকতর মঙ্গলজনক। রমযানের মাস এ মাসেই কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, যা মানব জাতির জন্য পুরোপুরি হিদায়াত এবং এমন দ্ব্যর্থহীন শিক্ষা সঙ্কলিত, যা সত্য-সঠিক পথ দেখায় এবং হক ও বাতিলের পার্থক্য সুস্পষ্ট করে দেয়। কাজেই এখন থেকে যে ব্যক্তি এ মাসেই সাক্ষাৎ পাবে তার জন্য এই সম্পূর্ণ মাসটিতে রোজা রাখা অপরিহার্য।’ (সূরা বাকারা : ১৮৪-১৮৫ আয়াত)।
এই যে নির্দেশ বিশ্বনবীর মাধ্যমে এসেছে তাকে অমান্য করবে একজন অভিনেতার কথা মান্য করে? তবে নবী (সা:)-এর সময় বদরযুদ্ধ ও মক্কা অভিযানের সময় রমজান মাস এলে, রোজা রাখতে হয়নি। কুরআন বলে, ‘আল্লাহ তোমাদের সাথে নরম নীতি অবলম্বন করতে চান, কঠোর নীতি অবলম্বন করতে চান না। (সূরা বাকারা : ১৮৫ আয়াত)
কিছু মুসলিম নেতা উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে বলে রোজা করতে নিষেধ করেন। তিউনিসিয়ার মরহুম প্রেসিডেন্ট হাবিব বারগুইবা অন্যতম। তার ফরাসি স্ত্রী তাকে এ ব্যাপারে উৎপাহিত করে থাকবেন। তাই বিবাহ শাদীর ব্যাপারে সাবধান হওয়া উচিত।
এদিকে চীন ও আরো কিছু দেম মুসলমানদের রোজা রাখতে দিচ্ছে না। অজানা ধর্মকর্মেও বাধা দিচ্ছে। চীনের সঙ্গে বিশ্বের মুসলমানরা সম্পর্ক বৃদ্ধিতে আগ্রহী। তবে এই আধা-কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ইসলামবিরোধী অবস্থান মুসলমানদের হতাশ করেছে। চীনের দেখাদেখি মিয়ানমারও মুসলিম নির্যাতন শুরু করেছে।
রোজার ধর্মীয়-আধ্যাত্মিক মঙ্গল ছাড়াও অন্যান্য মঙ্গল রয়েছে, বিশেষ করে দৈহিক। মার্ক ম্যাটিসন নামক এক ¯œায়ুতন্ত্র বিশেষজ্ঞ গবেষণা করে দেখেছেন যে, রোজা রাখলে রক্তের সুগার (চিনি) লেভেল (স্তর)-–এর উন্নতি হয়, হৃদরোগের আশঙ্কা কমে যায়, মস্তিষ্কের ¯œায়ু রোগগুলো অপসারিত হয়, যেমন আলজেইমার ও পারকিনসনস রোগ আর ব্যক্তির মন-মানসিকতা ও স্মৃতি বাড়ে।
বলা হয় যে, পেটের ভূড়ি কমাতে রোজা কার্যকরী উপায়। রোজা বয়স-বৃদ্ধি রোধ করে সুস্বাস্থ্য প্রদান করে।
যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘টি এইচ চান স্কুল অব পাবলিক হেলথ’ একটা গবেষণা করে রোজার ওপর যা ২০১৭ সালে ২৬ অক্টোবর ‘সেল মেটাবলিজম’ নামে প্রকাশিত হয়। মানবদেহের সেলে খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করে কিভাবে পরিবর্তন হয় তা এই গবেষণায় পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে দেখা যায় যে, এই উপবাসে জীবন-প্রবাহ বৃদ্ধি পায়, স্বাস্থ্য উন্নত হয়। হার্ভার্ডের চান স্কুলের জেনেটিকস অ্যান্ড কমপ্লেক্স ডিজিজেজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক উইলিয়াম নেয়ার বলেন, ‘যদিও পূর্ববর্তী গবেষণা প্রতিপন্ন করেছে কিভাবে সবিরাম রোজা (ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং) বৃদ্ধত্বকে ¯øথ করে, আমরণ এখন সবেমাত্র বুঝতে পারছি এবং আন্তর্নিহিত জীববিজ্ঞানের বিষয়টি।…. যখন আপনি আপনার খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করেন কিছু সময়ের জন্য, এতে শরীরের বিশাল মঙ্গল হয়। যেমনÑ ওজন হ্রাস, ক্রনিক ব্যাধি থেকে রক্ষা, দেহের সেলের মেরামত সংস্কার স্মৃতিশক্তির উন্নতি এবং মস্তিষ্কের ক্ষমতা বৃদ্ধি।’ মোট কথা রোজাতে শরীরের সেলসমূহের মেরামত হয় এবং শরীর ত্রæটিপূর্ণ টিসুকে শোষিত করে।
সবিরাম উপবাস পাশ্চাত্যে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে। এর নাম ‘ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং’ যেমন সারাদিনে একবার আহার, অথবা একদিন পরপর খাদ্য গ্রহণ। ওয়েব পেজ, বøগ ও বইপুস্তকে ব্যায়াম ও খাদ্য বিশারদগণ এই ব্যবস্থা প্রচার করে চলেছেন অন্যান্য ধর্মের রোজার বিকল্প উপবাস দেখা যায়। হিন্দু ধর্মের রয়েছে উপবাস যেমন একাদশীর উপবাস। বিধবারা আবার বেশি উপবাস করে। সর্বজনীন উপবাস নেই। আর তাদের উপবাসে পানি ও অন্য কিছু আহার কই অনুমোদিত রোজার কথা আছে হযরত মুসা (আ:), হযরত ঈসা (আ:) অর্থাৎ যিশুখ্রিষ্ট যে চল্লিশ দিন ধরে রোজা করেছিলেন, তার উল্লেখ রয়েছে বাইবেলে। গাইবেল লেখে তিনি (নবী এলিজা বা এলিয়) উঠে ভোজন পান করলেন এবং সেই খাদ্যের প্রভাবে চল্লিশ দিবা-রাত্র গমন করে
ঈশ্বরের পর্বত হোরেরে উপস্থিত হলেন (১ রাজাবলি ১৯:৮)। নবীন এলিজা চল্লিশ দিন না খেয়ে রোজা রাখেন।
সেই সময়ে মুসা চল্লিশ দিবা-রাত্র সেখানে ঈশ্বরের সহিত অবস্থিতি করলেন, অন্নভোজন ও পানি পান করলেন না। আর তিনি সেই দুই পাথরে নিয়মের বাক্যগুলো অর্থাৎ দশ আজ্ঞা (টেন কমান্ড সেন্টস) লিখলেন। (এক সোডাস, ৩৪:২৮)।
আর ঐ মাসের চতুর্বিংশ দিনে ইসরায়েল-সন্তানরা উপবাস, চটপরিধান ও মস্তকে মাটি লাগিয়ে একত্র হলো। (নহিমিয় ৯:১)।
ইহুদিদের জন্য রোজার বিধান ছিল। তাই হযরত ঈসা (আ:) চল্লিশ দিন রোজা পালন করেছিলেন। এ যুগে খ্রিষ্টানরা বড় লম্বা ধরনের রোজা না করলে ‘লেন্ট’ নামক পর্বে রোজা রাখে, তবে প্রধানত খ্রিষ্টান পুরোহিতরা। ‘লেন্ট’ রোজা মূলত ক্যাথলিক খ্রিষ্টানরা পালন করে। ১৮ থেকে ৫৯ বছরের ক্যাথলিকরা এটা পালন করে এস ওয়েনেসডে ও গুড ফ্রাইডের দিনে। এটা করা হয় যিশুখ্রিষ্টের অত্মবিসর্জনের স্মরণে। এই উপবাসে কোনো কোনো স্থানে পশু থেকে প্রাপ্ত খাদ্যাবলি গ্রহণ নিষিদ্ধ, কেউ কেউ উপবাসে মাছ অথবা মাছ ও মুরগি আহার মান্যতা দেয় কেউ আবার ফল ও ডিম নিষিদ্ধ করে, আবার কেউ উপবাসে শুধু রুটি খাওয়ার অনুমোদন দেয়। তবে একজনকে উপবাস সময়ে একটা পূর্ণ আহার গ্রহণ অনুমোদন করা হয়। সামান্য কিছু প্রটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টান লেন্ট উপবাস পালন করে।
যিশুখ্রিষ্ট জন দি ব্যাপ্টিস্টের নিকট জর্ডান নদীতে দীক্ষা নিয়ে মরুভূমিতে চলে যান। সেখানে তিনি চল্লিশ দিন-রাত রোজা পালন করেছিলেন।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু মুসলিম দেশে রোজাকে রোজা না বলে অন্য শব্দ ব্যবহার করা হয়, যেমন মালয়েশিয়া, ব্রæনেই ও সিঙ্গাপুরে রোজাকে বলা হয় ‘পউসা’ যা সম্ভবত সংস্কৃত ‘উপবাস’ শব্দ থেকে এসেছে। ‘পউসা’ শব্দ ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডেও ব্যবহৃত হয়।
মউরুন ফিডলার নামক এক পর্যটক কাশ্মিরে মুসলমানদের সূর্যোদায় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা দেখে বিস্মিত হন। তিনি চমৎকার হন এই জেনে যে, রোজাদার পানি পর্যন্ত পান করেন না। রোজার ত্রিশ দিনে। তিনি মন্তব্য করেন ‘মুসলিম রোজা লেন্ট উপবাসকে ঈষদুষ্ণ (টেপিড) করেছে। তিনি আশ্চর্য হন জেনে যে, রোজাদার রোজার সময় যৌনকর্ম থেকে বিরত থাকে, পাপের কাজ করে না যেমন পরনিন্দা করা, গালি দেয়া, মিথ্যা বলা, মারামারি করা ইত্যাদি করে না রোজা থেকে। তিনি বলেন, ক্যাথলিকরা দিন দুপুরের সময় প্রথমবার আহার করে উপবাস থেকে, আর সপ্তাহে এক দিন উপবাস। কখনও কখন উপবাস থেকে দিনে দু’বার হালকা খাবার খায় তারা। আর পানি পান কোনো সমস্যাই নয়। আজকাল লেন্ট উপবাস সপ্তাহব্যাপী করা হয় না। ফিডলার মন্তব্য করেন, ‘আমাদের মুসলিম ভাই-বোন স্বর্গ-সুখে সুখী হোক রমজান মাসে এই কামনা আমি করি।’
আজকের কলামটি একান্তভাবেই রমজানুল মোবারক নিয়ে নিজে কোনো ধর্মীয় জ্ঞানে বিশেষজ্ঞ নই; আমি অভ্যাসে চেষ্টারত সাধারণ মুসলমান। তাই সাধারণ ভাবনাগুলোই প্রকাশ করছি। কলামটির প্রথম অংশ হচ্ছে রমজান মাসের গুরুত্ব কী এবং আমাদের আচরণ কী রকম হওয়া উচিত। দ্বিতীয় অংশ হচ্ছে রমজান মাসে বাংলাদেশে যা হয় তার একটি চিত্র। পাঠক মেহেরবানি করে কষ্ট করুন এবং মিলিয়ে নিন কোনটি সঠিক এবং কোনটি বেঠিক। তৃতীয় অংশটি হচ্ছে ক্ষুদ্রতম অংশ: ঐতিহাসিক বদরের যুদ্ধের আলোচনা। সর্বশেষ অংশ হচ্ছে তরুণদের প্রতি আবেদন। রমজান মাস যদি একটি ফলদায়ক বৃক্ষ হয়, আমরা যেন সেই বৃক্ষ থেকে সর্বাধিক ফল আহরণ করতে পারি, সে চেষ্টাই হওয়া উচিত।
রমজান গুরুত্বপূর্ণ মাস হওয়ার প্রথম কারণ হচ্ছে, পবিত্র মাসে কুরআনুল কারিম নাজিল হয়েছে। কুরআনুল কারিমের ভাষা হলো (দুনিয়ার দৃষ্টিতে) আরবি; কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করলে স্বীকৃত হবে যে, এই ভাষাতেই মহান আল্লাহ তায়ালা মানবজাতির সাথে কথা বলেছেন। কুরআনুল কারিম হলো মানবজাতির জন্য জীবনবিধান। কুরআনুল কারিম হলো, মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে নাজিল হওয়া গ্রন্থগুলো তথা ঐশী কিতাবগুলোর মধ্যে সর্বশেষ। এই কিতাব প্রথম নাজিল হয়েছে রমজান মাসে। এতে রমজানের সম্মান-মর্যাদা এমনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে যে, এটি সর্বশ্রেষ্ঠ মাস হিসেবে গণ্য।
রমজান মাস গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার দ্বিতীয় কারণ, রমজানুল মোবারকের ২০ তারিখের পর বেজোড় রজনীগুলোতে, লাইলাতুল কদর তথা ‘সম্মানিত রজনী’ আছে। এই রাতের মর্যাদা বা মান বা মূল্য এক হাজার মাসের চেয়েও বেশি।

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট