
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : এই প্রথমবারের মত পৃথিবীতে মানুষের মৃত্যু, তাহাও আবার নিজের প্রাণপ্রিয় সন্তানের মৃত্যু। তাই পুত্র বিরহে আদম (আ) ও মা হাওয়া (আ) অত্যধিক বিমর্ষ হইয়া পড়িলেন। পূর্বেই উক্ত হইয়াছে যে, হাবীল হত্যার সময় আদম (আ) হজ্জ উপলক্ষে মক্কা শরীফে ছিলেন। মক্কা হইতে প্রত্যাবর্তনের পর অনেক খোঁজ করিয়াও তিনি হাবীলের কোন সন্ধান পাইলেন না। লোকজনকে জিজ্ঞাসা করিলে তাহারাও ইহার কোন উত্তর দিতে পারিল না। কাবীলের অন্যায় জিদ এবং খুনের হুমকির কথা তাহার জানা ছিল। তাই হাবীলের ব্যাপারে তাহার দুশ্চিন্তার অন্ত ছিল না। তাবারী ও ইবন কাছীর (র) প্রমুখ ঐতিহাসিকগণের গ্রন্থাবলীতে হাবীলের মৃত্যুতে আদম (আ)-এর শোকগাথা উদ্ধৃত হইয়াছে :
“বদলে গেছে জনপদ সব বদলেছে তার বাসিন্দারা
পৃথ্বী আনন ধুসরিত বীভৎস আজ বসুন্ধরা
রঙিনেরা রঙ হারালো সুস্বাদুরা স্বাদের খ্যাতি
লাবণীদের লাবণ্য নেই নেই চেহারায় রূপের ভাতি”।
জবাবে আদম (আ)-এর উদ্দেশ্যে ধ্বনিত হলোঃ
“হাবীলের পিতা! দুইজনই আজ নিহতের পর্যায়ে
জীবিত হন্তা নিহতেরই মত মরিতেছে তড়পায়ে।
জিঘাংসা বশে হলো যেন কাজ তাহার হস্ত দিয়া
আর্ত কণ্ঠে ফুকারি ফিরিছে সাদা শঙ্কিত হিয়া”।
(তাবারী, তারীখুল উমাম ওয়ার রুসুল-ওয়াল-মুলুক, ১০, পৃ. ২২০; ইবন কাছীর, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৫৫, কায়রো ১৯৯৭ খৃ.)।
ইবন কাছীর (র) তদীয় গ্রন্থে পংক্তিগুলি উদ্ধৃত করিয়া মন্তব্য করেন : “উক্ত পংক্তিগুলি সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ রহিয়াছে। যতদূর মনে হয়, শোকার্ত আদম (আ) বিলাপ ছলে তাহার নিজের ভাষায় কিছু বলিয়াছিলেন। পরবর্তীতে কোন কবি তাহা এইভাবে কবিতায় রূপ দান করিয়াছেন। আল্লাহই সম্যক জ্ঞাত (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ. পৃ. ৮৮)। উর্দু দায়িরাতুল মাআরিফ গ্রন্থে ও ইসলামী বিশ্বকোষে উক্ত ঘটনার বিবরণ প্রদান ও উক্ত শোকগাথা উদ্ধৃত করার পর মন্তব্য করা হইয়াছে : উক্ত ঘটনার এই সকল বিবরণ হাদীছ ও যুক্তির মৌল নীতিমালা অনুযায়ী সত্য নহে (ইসলামী বিশ্বকোষ, ২৫খ, পৃ. ২৩৭)। মা হাওয়া (আ) সংক্রান্ত কিছু কথা
কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে :
“হে মানব! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি হইতে সৃষ্টি করিয়াছেন এবং যিনি তাহা হইতে তাহার স্ত্রীকে সৃষ্টি করেন, যিনি তাহাদের দুইজন হইতে বহু নর-নারী ছড়াইয়া দেন” (৪:১)।
উক্ত আয়াত হইতে আমরা জানিতে পারিলামঃ (১) একটিমাত্র মানুষ অর্থাৎ হযরত আদম (আ) হইতে গোটা মানবজাতির সৃষ্টি; (২) হাওয়া (আ) তাহারই দেহপিঞ্জর হইতে নিৰ্গত; (৩) হাওয়া বিশ্বের গোটা মানবজাতির মহীয়সী জননী। মহানবী (স) বলেন, “স্ত্রীলোকদের সহিত উত্তম আচরণ করিবে, কেননা নারীকে পাঁজর হইতে সৃষ্টি করা হইয়াছে” (বুখারী ও মুসলিম)।
ইবন ইসহাকের মতে ইহার অর্থ হইল, হাওয়াকে আদমের বাম পাঁজর হইতে সৃষ্টি করা হইয়াছে। কুরতুবী ইহার অর্থ করিয়াছেন, স্ত্রীলোককে মূলত পাঁজরের সাথে তুলনা করা হইয়াছে এবং বলা হইয়াছে, স্ত্রীলোকের সৃষ্টির সূচনা পাঁজর থেকেই হইয়াছে এবং ইহাদের অবস্থা পাজরের। মত যদি ইহাদের বক্রতাকে সোজা করিতে চাও তবে তাহা ভাঙ্গিয়া যাইবে। অতএব পাঁজরের বক্ৰতা সত্ত্বেও যেমন তাহা থেকে কাজ নেওয়া হয় এবং ত্রুটি (বক্রতা) দূর করার চেষ্টা করা হয় না, তেমনি স্ত্রীলোকদের সাথেও নম্র ও সহানুভূতিশীল আচরণ করিতে হইবে। যদি তাহাদের সাথে রূঢ় আচরণ করা হয় তবে তাহাদের সাথে সম্বন্ধ মধুর হওয়ার চাইতে বরং আরো তিক্ত হইবে (ফতুহুল বারী, ৬খ, পৃ. ২৮৩-এর বরাতে হিফযুর রহমান, কাসাসুল কুরআন, বাংলা অনু, ১খ, পৃ. ৩৩; ইফা প্রকাশিত, ১ম সং, ১৯৯০ খৃ.)। কুরতুবীর এই বর্ণনায় পাঁজর হইতে স্ত্রীলোক সৃষ্টিকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ না করিয়া যে রূপক অর্থ গ্রহণ করা হইয়াছে তাহা সুস্পষ্ট।
বাইবেলের বর্ণনায় রহিয়াছে : “পরে সদাপ্রভু বললেন, ‘মানুষটির পক্ষে একা থাকা ভাল নয়। আমি তার জন্যে একজন উপযুক্ত সঙ্গী তৈরী করব। সদাপ্রভু মাটি থেকে যেসব ডাঙ্গার জীবজন্তু ও আকাশের পাখি তৈরী করেছিলেন সেগুলো সেই মানুষটির কাছে আসলো। সদাপ্রভু দেখতে চাইলেন তিনি সেগুলোকে কি বলে ডাকেন। তিনি সেইসব জীবন্ত প্রাণীগুলোকে যেটির যে নামে ডাকলেন সেটির সেই নামই হল। তিনি প্রত্যেকটি পোষ মানা ও পোষ না মানা এবং আকাশের পাখির নাম দিলেন। কিন্তু সেগুলোর মধ্যে সেই পুরুষ মানুষটির অর্থাৎ আদমের কোন উপযুক্ত সঙ্গী দেখা গেল na। সেইজন্য সদাপ্রভু আদমের উপর একটা গভীর ঘুমের ভাব আনলেন। আর তাতে তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। তখন তিনি তার একটা পাঁজর তুলে নিয়ে সেই ফাঁকা জায়গাটা বন্ধ করে দিলেন। আদম থেকে তুলে নেওয়া সেই পাঁজরটা দিয়ে সদাপ্রভু একজন স্ত্রীলোক তৈরী করে তাকে আদমের কাছে নিয়ে গেলেন। তাকে দেখে আদম বললেন, এবার হয়েছে। এর হাড়-মাংস আমার হাড়-মাংস থেকেই তৈরী। পুরুষ লোকের দেহের মধ্য থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে বলে একে স্ত্রীলোক বলা হয়। এজন্যেই মানুষ মা-বাবাকে ছেড়ে তার স্ত্রীর সঙ্গে এক হয়ে থাকবে আর তারা দুজন একদেহ হবে” (আদি পুস্তক ২ : ১৮-২৫)।
কুরআন, হাদীছ ও বাইবেলের উক্ত বর্ণনা হইতে আক্ষরিক অর্থেই হাওয়া যে আদম (আ)-এর পাঁজর হইতে সৃষ্ট এবং মানবজাতির পরম সম্মানিত আদিমাতা তাহার প্রমাণ পাওয়া যায়। বাইবেলের বর্ণনায় প্রতীয়মান হয় যে, মা হাওয়াই প্রথমে শয়তানের দ্বারা প্ররোচিত হইয়া নিষিদ্ধ গাছের ফল ভক্ষণ করেন এবং তিনিই আদম (আ)-কে নিষিদ্ধ ফল খাইতে প্রলুব্ধ করেন। পক্ষান্তরে আল-কুরআনের বর্ণনায় নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার ব্যাপারে শয়তানের প্ররোচনাকেই দায়ী করা হইয়াছে এবং এই ব্যাপারে আদম ও হাওয়া (আ) দুইজনকে সমপর্যায়ে রাখিয়া এমনভাবে ঘটনাটি বিবৃত করা হইয়াছে, যাহাতে এই অপরাধের জন্য কেহ কাহারও উপর নির্ভরশীল বা কেহ কাহারও অগ্রণী বা কেহ কাহারও চাইতে বেশী অপরাধী ছিলেন এমনটি বুঝা যায় না। যেমন আল্লাহ পাক বলিয়াছেন :
“কিন্তু শয়তান উহা হইতে তাহাদের পদস্খলন ঘটাইল এবং তাহারা যেখানে ছিল সেখান হইতে তাহাদেরকে বহিস্কৃত করিল” (২৪ ৩৬)।
“শয়তান তাহাদের উভয়কে কুমন্ত্রণা দিল” (৭-২০)। বরং শয়তানের কুমন্ত্রণা ছিল শিকাররূপে। অন্যত্র আদম (আ)-এর প্রতিই ইঙ্গিত করা হইয়াছেঃ
“অতঃপর শয়তান তাহাকে কুমন্ত্রণা দিল” (২০ : ১২০)। “ বরং আরও সুস্পষ্টভাবে আদম (আ)-এর প্রতিই বিস্মৃতি, দৃঢ়তার অভাব এবং বিচ্যুতি আরোপ করা হইয়াছে। যেমনঃ
“আমি তো ইতোপূর্বে আদমের প্রতি নির্দেশ দান করিয়াছিলাম, কিন্তু সে ভুলিয়া গিয়াছিল! আমি তাহাকে সংকল্পে দৃঢ় পাই নাই” (২০ ও ১১৫)।
“আদম তাহার প্রতিপালকের হুকুম অমান্য করিল, ফলে সে ভ্রমে পতিত হইল” (২০ : ১২১)। এমতাবস্থায় নিষিদ্ধ গাছের ফল খাইয়া জান্নাত হারানোর জন্য কেবল মা হাওয়াকে দায়ী করা বাস্তবসম্মত নহে।
আদম (আ)-এর বর্ণনা প্রসঙ্গে ময়ুর, সাপ প্রভৃতি বাইবেলীয় কাহিনী বহুল প্রচলিত। বলা হইয়া থাকে যে, সাপের মুখ গহবরে প্রবেশ করিয়া শয়তান বেহেশতে প্রবেশ করিয়া মা হাওয়াকে নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার জন্য প্ররোচিত করিয়াছিল। ওসওয়াসা বা প্ররোচনা দেওয়ার জন্য শয়তানের বেহেশতে প্রবেশের আদৌ কোন প্রয়োজন ছিল না। কেননা তাহার কিয়ামত পর্যন্ত দীর্ঘায়ু এবং প্ররোচনা দানের শক্তি তাহার প্রার্থনা অনুযায়ী স্বয়ং আল্লাহ তাআলা তাহার জন্য মঞ্জুর করিয়াছিলেন, যাহা কুরআন শরীফের উদ্ধৃতিসহ পূর্বেই উক্ত হইয়াছে। সুতরাং সে বেহেশতের বাহির হইতেও প্ররোচিত করিতে সক্ষম ছিল। উপরন্ত সাপের মুখে প্রবিষ্ট শয়তানকে দেখিতে মানব চক্ষু ব্যর্থ হইলেও আল্লাহর পক্ষ হইতে বেহেশতের জন্য নিযুক্ত ফেরেশতা প্রহরীগণের দৃষ্টি এভাবে এড়াইয়া যাওয়া সম্ভবপর ছিল না। মানবীয় দৃষ্টি সীমাবদ্ধতা ও অক্ষমতার দিকে লক্ষ্য রাখিয়াই যে এরূপ কল্প-কাহিনী গ্রীক ও ভারতীয় উপকথার মত করিয়া রচিত তাহা সহজেই বোধগম্য। তাই আল্লামা হিফযুর রহমান সিউহারভী (র) যথার্থই লিখিয়াছেন :
“তাওরাত ও ইঞ্জীলে সাপ-ময়ূরের কাহিনী বা এই জাতীয় অন্য যে সব উপাখ্যান বর্ণনা করা হয়েছে তার উল্লেখ পবিত্র কুরআন বা হাদীছের কোথাও নেই। এই সব ইসরাঈলী কাহিনী সম্পূর্ণ বানোয়াট ও মনগড়া। এগুলোর ভিত্তি না ইলমে সহীহ-এর উপর প্রতিষ্ঠিত আর না এগুলো বিবেক-বুদ্ধি ও ইতিহাস দ্বারা সমর্থিত। কোন কোন মুফাসসির অবাধে এ সব কাহিনী বর্ণনা করে থাকেন, যার মারাত্মক কুফল এই যে, শুধু সাধারণ মানুষই না, বরং বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও এ ধারণা, পোষণ করে বসে থাকেন যে, অন্যান্য ইসলামী রিওয়ায়াতের মত এগুলোরও বুঝি কোন সঠিক ভিত্তি রয়েছে” (কাসাসুল কুরআন, বাংলা অনু., ১খ, পৃ. ৪৫, ইফা প্রকাশিত ১ম সংস্করণ, ১৯৯০ ইং)।
আদম (আ)-এর মৃত্যুর সময় ঘনাইয়া আসিলে তিনি তাঁহার পুত্রদের কাছে জান্নাতী ফলমূল খাওয়ার আগ্রহ ব্যক্ত করেন। পিতার অন্তিম বাসনা পূরণের মানসে তাহার পুত্রগণ ফলমূলের সন্ধানে বাহির হইয়া পড়েন। পথে তাহাদের এমন কতিপয় ফেরেশতার সহিত সাক্ষাত হয় যাহাদের সহিত আদম (আ)-এর কাফন, সুগন্ধি দ্রব্যাদি, কয়েকটি কুড়াল-কোদাল এবং মাটি বহনের ঝুড়ি ছিল। ফেরেশতাগণ আদম-সন্তানদের গন্তব্যস্থল ও যাত্রার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাহাদেরকে জিজ্ঞাসা করিল তাঁহারা জানান যে, তাঁহাদের অসুস্থ পিতা জান্নাতী ফল খাওয়ার আগ্রহ ব্যক্ত করিয়াছেন। তাই তাহারা সেই ফলমূলের সন্ধানে বাহির হইয়াছেন। ফেরেশতাগণ জানাইলেন যে, এখন আর সেই সময় নাই। আদম (আ)-এর মৃত্যু আসন্ন। সুতরাং তাঁহারা তাহাদেরকে ঘরে ফিরিয়া যাইতে বলিলেন। তারপর সত্যসত্যই ফেরেশতাগণ ঐ সমস্ত বস্ত্রসম্ভারসহ আদম (আ)-এর নিকট গিয়া উপস্থিত হন। ফেরেশতাদের এরূপ আগমনে মা হাওয়া (আ) তাহাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আঁচ করিতে পারিলেন। তিনি তাঁহার প্রিয় স্বামীকে জড়াইয়া ধরিলেন। আদম (আ) বলিলেন, তুমি সরিয়া যাও । কেননা, তোমার পূর্বেই আমার ডাক পড়িয়া গিয়াছে। সুতরাং আমাকে ও আমার পরোয়ারদিগার ফেরেশতাগণকে একান্তে মিলিত হইতে দাও।
এই সময় ফেরেশতাগণ তাহার রূহ কবয করেন। তারপর তাঁহাকে গোসল দেওয়াইয়া কাফন পরাইয়া, সুগন্ধি মাখাইয়া, কবর খনন করিয়া যথারীতি জানাযা পড়িয়া দাফন করা হয়। কবরের উপর মাটিচাপা দেওয়ার পর তাহারা আদম-সন্তানদেরকে লক্ষ্য করিয়া বলেন : “হে আদম-সন্তানগণ! ইহাই হইতেছে তোমাদের দাফনের রীতি” (আহমদ, ৫খ, পৃ. ১৩৬)। ইবন কাছীর (র) তদীয় ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে উবাই ইবন কাব (রা)-এর মুখে শ্রুত বিবরণ রূপে ঘটনাটি উদ্ধৃত করিয়া মন্তব্য করেন :এই বর্ণনাকে তাঁহার সহিত সম্পর্কিত করার ব্যাপারটি সহীহ ১খ, পৃ. ৯১)। ইবন আসাকির (র) বর্ণনা করেন ও ফেরেশতাগণ আদম (আ)-এর জানাযায় চারবার তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করিয়াছিলেন (হাকেম, ১খ, ৩৮৫)।
আবু হুরায়রা (রা) বর্ণিত মারফু হাদীছ হইতে জানা যায় যে, লওহে মাহফুযে আদম (আ)-এর বয়স এক হাজার বৎসর লিপিবদ্ধ ছিল। অপরদিকে তাওরাতে আছে, আদম (আ) নয় শত ত্রিশ বৎসরকাল আয়ু লাভ করেন। ইবন কাছীর (র) বলেন : তওরাতের বর্ণনাকে যদি সংরক্ষিত ও বিশুদ্ধ বলিয়া মানিয়া লওয়া হয়, তাহা হইলে বুঝিতে হইবে যে, ইহা হইতেছে আদম (আ)-এর পৃথিবীতে অবতরণের পরবর্তী আয়ুর সৌর বৎসর। চান্দ্র হিসাবে উহার মেয়াদ হয় নয় শত সাতান্ন বৎসর। ইহার সহিত তৎপূর্বকার বেহেশতে অবস্থানকালীন তেতাল্লিশ বৎসর যোগ করিলে সর্ব সাকুল্যে এক হাজার বৎসরই হয়। ইবন জারীর (র) প্রমুখ এইরূপই বর্ণনা করিয়াছেন। আদম (আ)-এর মৃত্যুর ঐ দিনটি ছিল শুক্রবার (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, পৃ. ৯১-৯২)।
আদম (আ)-এর শবদেহ কোথায় দাফন করা হইয়াছিল সে সম্পর্কে মতভেদ রহিয়াছে। মশহুর হইল, ভারতবর্ষ তথা সরশীপের যে পাহাড়ে সর্বপ্রথম তাঁহাকে অবতরণ করান হইয়াছিল, সেখানেই তাঁহাকে দাফন করা হয়। কেহ কেহ মক্কা শরীফের জাবালে আবু কুবায়সকে তাঁহার দাফনস্থল বলিয়াছেন। আবার এরূপও কথিত আছে যে, নূহ (আ) মহাপ্লাবনকালে আদম (আ) ও মা হাওয়ার কফিন জাহাজে তাঁহার সহিত রাখিয়াছিলেন এবং মহাপ্লাবন শেষে তিনি বায়তুল মুকাদ্দাস তাঁহাদেরকে দাফন করেন (তারীখ তাবারী, ১খ, পৃ. ১৬১)।
আতা খুরাসানী বলেন, আদম (আ)-এর মৃত্যুতে গোটা বিশ্ব জগৎ তাঁহার শোকে সপ্তাহ ব্যাপী ক্রন্দন ও শোক পালন করে। ইবন ইসহাক বলেন, আদম (আ)-এর মৃত্যুতে এক সপ্তাহ পর্যন্ত চন্দ্র ও সূর্যের গ্রহণ লাগিয়াছিল (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১খ, পৃ. ৯১)।
তাঁহার মৃত্যুর এক বৎসর পরে মা-হাওয়াও (আ) ইনতিকাল করেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া,
আদম (আ)-এর অন্তিম শয্যায় তদীয় প্রিয়তম পুত্র শীছ (আ) তাঁহার সেবা-যত্নের জন্য সব সময় পিতার নিকটে অবস্থান করিতেন। তাঁহার অপর ভাইগণ যখন পিতার অন্তিম অভিলাষ পূরণের জন্য ফলমূল সংগ্রহের উদ্দেশে বাহির হইয়া পড়েন, তখনও তিনি পিতার নিকটই ছিলেন। পুত্রদের ফলমূল লইয়া আসিতে বিলম্ব হইলে তিনি শীছ (আ)-কে বলিলেন : সম্ভবত তাহারা আমার জন্য ফলমূল সংগ্রহ করিতে পারিতেছে না। এজন্য বিলম্ব ঘটিতেছে। তুমি বরং অমুক পাহাড়ে গিয়া আল্লাহর দরবারে দুআ কর, হয়তো বা তাহাতে মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হইবে।
শীছ (আ) বলিলেন, পিতা! আপনি মানবকূলের আদিপুরুষ। আমারও পিতা। আপনি আল্লাহর প্রিয়পাত্র ও মককূল বান্দা। আপনি নিজে যদি আল্লাহর দরবারে হাত তুলেন তাহা হইলে নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আপনাকে ব্যর্থ মনোরথ করিবেন না। প্রত্যুত্তরে আদম (আ) বলিলেন : নিষিদ্ধ গাছের ফল খাইয়া আমি যে অপরাধ করিয়াছি, সেইজন্য আমি আল্লাহর দরবারে লজ্জিত, তুমিই বরং দুআ কর, আল্লাহ নিশ্চয়ই তাহা কবুল করিবেন।
সেমতে শীছ (আ) দুআ করিলেন। সত্য সত্যই সেই দুআ কবুল হইল। জিবরাঈল (আ) খাঞ্চা ভর্তি বেহেশতী ফলমূল এক অপূর্ব সুন্দরী বেহেশতী হুরের মাথায় চাপাইয়া লইয়া হাযির হইলেন। হুরটি যখন মুখের ঘোমটা খুলিয়া আদম (আ)-এর সম্মুখে আসিল তখন আদম (আ)-এর জিজ্ঞাসার জবাবে জিবরাঈল জানাইলেন ও একমাত্র শীছ ছাড়া আপনার অপর সকল পুত্র কন্যা যেহেতু জোড়ায় জোড়ায় জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, তাই শীছের সহিত বিবাহের উদ্দেশে আল্লাহ তাআলা ইহাকে প্রেরণ করিয়াছেন। সেমতে শীছের সহিত ঐ বেহেশতী হুরের বিবাহ হয় এবং হরটি যেহেতু আরবীভাষী ছিলেন তাই তাঁহার বংশধরগণ বংশানুক্রমিকভাবে আরবীভাষী হন এবং শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তাফা (স)-ও তাঁহার অধস্তন পুরুষ। এ হৃরের আনীত ফলমূল আদম (আ) তাহার উপস্থিত সন্তানদেরকেও খাইতে দেন। ঐ ফলমূল যাহারা খাইয়াছিলেন তাহাদের জ্ঞান-বুদ্ধি বৃদ্ধি পায়। অপর বর্ণনামতে, ঐ হুর তারপর বেহেশতে ফিরিয়া যায়।
ঐ সময় আদম (আ) পুত্রদের উদ্দেশ্য বলেন যে, তাঁহার অন্তিম সময় উপস্থিত। তাঁহার পরে শীহই হইবেন তাহার স্থলাভিষিক্ত। সুতরাং সকলে যেন তাঁহাকে অভিভাবকরূপে মান্য করেন এবং তাঁহার নির্দেশনা অনুসারে জীবন-যাপন করেন। অন্য কথায়, ইনতিকালের পূর্বেই আদম (আ) তদীয় পুত্র শীছ (আ)-এর অভিষেক সম্পন্ন করিলেন (দ্র. তর্জমা উর্দু কাসাসুল আম্বিয়া (বৃহৎ কলেবর), গোলাম নবী কুমিল্লায়ী, পৃ. ২০-২১)।
হাবীল ও কাবীলের পর শীছই ছিলেন আদম (আ)-এর সন্তানদের মধ্যে বয়োজ্যষ্ঠ। শীছ (আ)-এর জন্মগ্রহণের পর আদম ও হাওয়া (আ)-এর পুত্র বিরহ বেদনা অনেকটা লাঘব হইয়াছিল। এইজন্য জন্মের পর হইতেই তিনি পিতা-মাতার অতি আদরের সন্তান। শীছ শব্দের অর্থই হইতেছে ‘আল্লাহর দান। মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক বলেন, “আদম (আ)- এর মৃত্যুর সময় ঘনাইয়া আসিলে তিনি শীছকে তাঁহার স্থলাভিষিক্ত করেন এবং তাহাকে দিরারাত্রির প্রহরসমূহ সম্পর্কে জ্ঞানদান করেন এবং পরবর্তী কালে ঘটিতব্য মহাপ্লাবনের ব্যাপারে অবহিত করেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, পৃ. ৯১)।
নবুওয়তী ধারার একটি চিরাচরিত নিয়ম হইল, পূর্ববর্তী নবী ইনতিকালের পূর্বেই তাঁহার পরবর্তী নবী সম্পর্কে আপন উম্মতদেরকে অবহিত করিবেন। আদি মানব ও আদি নবী হযরত আদম (আ) তাহার মৃত্যুর পূর্বেই যোগ্যতম পুত্র শীছ (আ)-কে স্থলাভিষিক্ত করিয়া সেই ধারারই সূত্রপাত করিয়া যান।
আদম (আ)–এর নবুওয়াত ও রিসালাত
নবী হিসাবে প্রত্যক্ষভাবে কুরআনুল করীমে আদম (আ)-এর উল্লেখ না থাকিলেও পরোক্ষভাবে তাঁহার উল্লেখ আছে।
“নিশ্চয়ই আল্লাহ্ আদমকে, নূহকে ও ইবরাহীমের বংশধর এবং ইমরানের বংশধরকে বিশ্বজগতে মনোনীত করিয়াছেন” (৩ : ৩৩)।
উক্ত আয়াতে নবী ও রাসূলরূপে নূহ ও ইরাহীম (আ)-এর সহিত সমপর্যায়ে আদম (আ)-এর উল্লেখ করা হইয়াছে। আল্লামা শাব্বীর আহমাদ উছমানী বলেন, “আল্লাহ তাআলার এই মনোনীতকরণ ও নির্বাচিতকরণ জনিত সম্মানদান, যাহাকে আমরা নবুওয়াত অভিধায় অভিহিত করিয়া থাকি” (তাফসীরে উছমানী, পৃ. ৬৯, পাদটীকা ৮)।
হযরত আবু যর গিফারী (রা) বর্ণিত হাদীছে আছে :
“আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! নবীগণের মধ্যে সর্বপ্রথম নবী কে? তিনি বলিলেন, আদম (আ)। আমি আবার জিজ্ঞাসা করিলাম, তিনি কি নবী ছিলেন? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন : হাঁ, নবী ছিলেন। তাঁহার সাথে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা কথা বলিয়াছেন” (আহমাদ, ৫, ১৬৬, ১৭৮, ১৭৯)।
উক্ত হাদীছখানা উদ্ধৃত করিয়া আবু বকর জাবির আল-জাযাইরী লিখেন, উক্ত মরফু হাদীছে আদম (আ)-কে আল্লাহ তাআলার কালাম-ধন্য ও ওহীপ্রাপ্ত নবীরূপে বর্ণনা করা হইয়াছে (আবু বা আল-জাযাইয়ী, আকীদাতুল-মুমিন, পৃ. ২৬৬; মাকতাবাতুল কুল্লিয়াতিল আযহারিয়া, ১ম সং, কায়রো, ১৩৯৭ হি.)।
মুহাম্মাদ আলী আস-সাৰ্বনী এতসম্পর্কে আরও স্পষ্টভাবে লিখিয়াছেন ইহা নিশ্চিত যে, আদম (আ) নবীগণের অন্তর্ভুক্ত। ইহা জমহুর উলামার সর্বাণীসম্মত অভিমত। কোন আলেমই এই মতের বিরোধিতা করেন নাই। তবে তিনি রাসূল ছিলেন কিনা সে সম্পর্কে মতভেদ আছে। তাহার নবুওয়াত সম্পর্কে আল-কিতাব ও সুন্নাহতে বর্ণনা আসিয়াছে। তবে আল-কুরআনে উহার সুস্পষ্ট উল্লেখ নাই। তাই আদম (আ) সম্পর্কে ঠিক ঐভাবে নবুওয়াতের উল্লেখ করা হয় নাই যেমনটি অন্যদের ব্যাপারে, যেমন ইবরাহীম, ইসমাঈল, মূসা ও ঈসা (আ) প্রমুখ নবীগণের ব্যাপারে করা হইয়াছে। কিন্তু ইহা উল্লিখিত হইয়াছে যে, আল্লাহ তাআলা প্রত্যক্ষভাবে তাঁহাকে সম্বোধন করিয়াছেন এবং ঐ সম্বোধনের মাধ্যমে তাঁহাকে শরীআত দান করিয়াছেন। তাহাতে তিনি তাঁহার প্রতি আদেশ করিয়াছেন, নিষেধ করিয়াছেন। তাঁহার জন্য অনেক কিছুকে হালাল এবং অনেক কিছুকে হারাম করিয়াছেন। তাঁহার প্রতি কোন রাসূল বা বাইক না পাঠাইয়া তিনি এই সমস্ত করিয়াছেন। উহাই তাহার নবুওয়াত বা তিনি নবী হওয়ার অর্থ, যেমনটি আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করিয়াছি (আন-নবুওয়াতু ওয়াল আম্বিয়া, পৃ. ১২৪-১২৫, ২য় সংস্করণ, মক্কা ১৪০০/১৯৮০)।
আলিমগণের অনেকেই তাঁহাকে রাসূল বলিয়াছেন । তাহাদের মতে তিনি তদীয় সন্তান-সন্তুতি বংশধরগণের প্রতি প্রেরিত হইয়াছিলেন। অন্য আলিমগণ তাহাকে নবী বলিয়া থাকেন। তাহাদের দলীল হইতেছে সহীহ মুসলিমের বর্ণিত শাফাআত সংক্রান্ত হাদীছ যাহাতে উল্লিখিত হইছে, কিয়ামতে মহা পেরেশানীর দিনে ওষ্ঠাগতপ্রাণ হইয়া লোকজন নূহ (আ)-এর কাছে ছুটিয়া যাইবে এবং তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া বলিবে : “আপানিই পৃথিবী বক্ষে প্রেরিত প্রথম রাসূল”। আদম (আ) যদি রাসূলই হইতেন তাহা হইলে এরূপ বলা হইত না।
যাঁহারা তাহাকে রাসূল বলিয়া থাকেন তাঁহারা ইহার জবাব দেন এইভাবে, যে মহাপ্লাবনের পর মানবজাতির পৃথিবীতে লূতনভাবে পুনর্বাসনের পর তিনিই প্রথম রাসূল, উক্ত কথা দ্বারা সেদিকেই ইঙ্গিত করা হইয়াছে। এবম্বিধ যুক্তি প্রদর্শনের পর আল-জাযাইরী তাহার অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন এইভাবে : “তবে তিনি যে রাসূল ছিলেন এই অভিমতই অগ্রগণ্য” (আকীদাতুল মুমিন, পৃ. ১২৫)। এ ব্যাপারে আরও দলীল নিম্নে উক্ত হইল :
(১) আল্লাহ তাআলা আদম-হাওয়াকে পৃথিবীতে প্রেরণকালে বলিয়া দেন?
“পরে যখন আমার পক্ষ হইতে তোমাদের নিকট সৎপথের কোন নির্দেশ আসিবে, তখন যাহারা আমার সৎপথের নির্দেশ অনুসরণ করিবে তাহাদের কোন ভয় নাই এবং তাহারা দুঃখিতও হইবে না” (২ : ৩৮)।
উক্ত আয়াতে ১ বা নির্দেশনা প্রেরণের কথা বলিয়া আসলে তিনি যে নবুওয়াত বা রিসালাতের দায়িত্ব লাভ করিবেন সেই আশ্বাসই দেওয়া হইয়াছিল।
(২) অন্য আয়াতে সুস্পষ্টভাবে সেই কথাটিই বলা হইয়াছে এইভাবে :
“আদম তাহার প্রতিপালকের হুকুম অমান্য করিল, ফলে সে ভ্রমে পতিত হইল। ইহার পর তাহার প্রতিপালক তাহাকে মনোনীত করিলেন, তাহার তওবা কবুল করিলেন ও তাহাকে পথনির্দেশ করিলেন” (২০ : ১২১-১২২)।
মুহাম্মাদ আলী সাবুনীর ভাষায় : “এই মনোনীতকরণই ছিল তাঁহাকে নবুওয়াত ও রিসালাত দান করা (আন্-নুবুওয়াতু ওয়াল আম্বিয়া, পৃ. ১২৫)।
(৩) আবু সাঈদ খুদরী (রা) বর্ণিত হাদীছে আছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন : “কিয়ামতের দিন আমিই হইব আদম-সন্তানদের তথা সমস্ত মানবজাতির সর্দার। ইহা আমার অহংকার নহে। আমার হাতেই থাকিবে আল্লাহর প্রশস্তির পতাকা। ইহা আমার অহংকার নহে। সেদিন আদমসহ সকল নবীই আমার পতাকাতলে থাকিবেন” (মুসনাদে আহমাদ, ৩, পৃ. ২)।
ইব্ন মাজা এবং তিরমিযীও হাদীছটি রিওয়ায়াত করিয়াছেন এবং তিরমিযী ইহাকে রীতিমত হাসান-সহীহ পর্যায়ের হাদীছ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন (মাহমূদ মুহাম্মদ খাত্তাব সুবকী কৃত আদ-দীন আল-খালিস, ১খ, পৃ. ৭৪, ৪র্থ সং, কায়রো)।
তাবারীর বর্ণনায় সুস্পষ্টভাবে উল্লিখিত হইয়াছে : “আল্লাহ তাআলা যখন আদমকে পৃথিবীর রাজত্ব দান করিলেন তখন তিনি তাঁহাকে নবুওয়াতও দান করেন এবং তাঁহাকে তাঁহার সন্তানদের প্রতি রাসূল হিসাবে প্রেরণ করেন। তিনি তাহার প্রতি একুশখানা সহীফা (পুস্তিকা) অবতীর্ণ করেন। তিনি স্বহস্তে তাহা লিপিবদ্ধ করেন এবং জিব্রাঈল (আ) তাঁহাকে এগুলি শিক্ষা দান করেন” (দ্র. তাবারীর-তারীখ, ১খ, পৃ. ১৫০; আল-মুনতাসার, ১খ, পৃ. ২২১)।
কুরআন শরীফে যেমন নবী-রাসূলগণের সকলের নাম উল্লিখিত হয় নাই, তেমনি কোন্ কোন্ রাসূল বা নবীর প্রতি কোন্ কোন্ কিতাব অবতীর্ণ করা হইয়াছে তাহারও বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয় নাই এবং ইজমালীভাবে বলা হইয়াছে :
“নিশ্চয় আমি আমার রাসূলগণকে প্রেরণ করিয়াছি স্পষ্ট প্রমাণসহ এবং তাহাদের সঙ্গে দিয়াছি কিতাব ও ন্যায়নীতি, যাহাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে” (৫৭ :২৫)।
শরহ উমদা-এর বরাতে মওলানা আবদুল হক হক্কানী দেহলবী (র) লিখেন : মোট আসমানী কিতাবের সংখ্যা ১০৪। তন্মধ্যে ছোট ছোট ৫০টি হযরত শীছ (আ), ৩০টি হযরত ইদরীস (আ), ১০টি হযরত ইবরাহীম (আ) এবং ১০টি হযরত আদম (আ)-এর প্রতি অবতীর্ণ হইয়াছে। আর প্রধান প্রধান চারিখানা চারিজন নবীর প্রতি নাযিল হইয়াছে” (ইসলামী আকীদা, পৃ. ৯৭, অনুবাদ : মওলানা আবদুস সুবহান, ইফা প্রকাশিত, ১ম সং, ১৯৮১)।
সভ্যতার আদি যুগে আদম (আ)-এর সহীফাগুলি তো বটেই, পূর্ববর্তী যুগের তাবৎ নবী-রাসূলগণের প্রতি নাযিলকৃত আসমানী কিতাব ও সহীফাগুলি বিকৃতি, বিস্মৃতি ও বিলুপ্তির শিকার হইয়াছে। সায়্যিদ সুলায়মান নদভীর ভাষায় : “এ কথা আমরাও মানি, যুগে যুগে পয়গাম্বরগণের মাধ্যমে আল্লাহর পয়গাম দুনিয়ায় এসেছে, কিন্তু আমরা বারবার বলেছি এবং ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর আলোকে প্রমাণ করেও দেখিয়েছি যে, বিশেষ বিশেষ যুগ বা বিশেষ বিশেষ দেশের জন্যই তাঁদের আবির্ভাব ঘটেছিল। তারা ছিলেন সাময়িক প্রয়োজন মেটানোর তাগিদে সাময়িক পয়গাম্বর। আর এজন্যই তাঁদের পয়গামসমূহ চিরদিনের জন্য সুসংরক্ষণের ইন্তেজাম হয়ে উঠেনি, ছিন্ন হয়ে গেছে এগুলোর মূল সূত্র” (নবী চিরন্তন, অনুবাদ আবদুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী, ২য় সং, বুক সোসাইটি, ঢাকা ১৯৭৯ খৃ.)।
বলা বাহুল্য, উপরিউক্ত বক্তব্যটি আদি মানব এবং সর্বপ্রথম নবী আদম (আ) এবং তাঁহার শরীআত ও সহীফাগুলির ব্যাপারে সর্বাধিক প্রযোজ্য। তাই তাহার শরীআতের কাঠামো কী ছিল বা তাঁহার ইবাদাত ও আমলের নমুনা কী ছিল তাহা সুনির্দিষ্টভাবে বলা এক সুকঠিন ব্যাপার। তবে এতদসংক্রান্ত রিওয়ায়াতসমূহ হইতে ইহার কিছু কিছু আঁচ করা যায়।
আল্লামা ইব্ন কাছীর সহীহ ইব্ন হিব্বান হইতে হযরত আবু হুরায়রা (রা) বর্ণিত একখানা হাদীছ উদ্ধৃত করিয়াছেন : “রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আল্লাহ যখন আদমকে সৃষ্টি করেন এবং তাঁহার মধ্যে রূহ যুঁকিলেন তখন তিনি হাঁচি দিয়া উঠিলেন এবং বলিলেন : আলহামদু লিল্লাহ্ (সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর)। তিনি তাহার আদেশক্রমেই হাহমদ বা আল্লাহর প্রশংসা করিলেন। তখন তাঁহার প্রতিপালক তাহার উদ্দেশে বলিলেন, তোমার প্রতিপালক তোমার প্রতি সদয় হউন হে আদম! ঐ পাশে উপবিষ্ট ফেরেশতামণ্ডলীর দিকে যাও এবং তাহাদেরকে সালাম দাও। তখন তিনি গিয়া তাহাদেরকে সালাম দিলেন। তিনি বলিলেন : আসোলামু আলায়কুম । তাহারা বলিলেন : ওয়া ‘আলায়কুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি। তারপর তিনি তাঁহার প্রতিপালকের নিকট ফিরিয়া গেলেন। তখন তিনি বলিলেন; ইহাই তোমার ও তোমার সন্তানদের মধ্যকার সম্ভাষণ” (কাসাসুল আম্বিয়া, ইবন কাছীর, পৃ. ৪৪ ও আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া)। বুখারীর রিওয়ায়াতেও অনুরূপ বক্তব্য রহিয়াছে।
উক্ত বর্ণনার দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হইল যে, সৃষ্টির প্রথম প্রভাতে আদম (আ)-এর সর্বপ্রথম ইবাদতটি ছিল ‘আলহামদু লিল্লাহ বলিয়া সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ ।