1. mesharulislammonir1122@gmail.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন
  2. info@www.sangjogprotidin.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন :
মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ০৩:০৭ পূর্বাহ্ন

২০২৪- ২৫ অর্থবছরে ইউরোপ আমেরিকায় কাঁকড়া রপ্তানি ৭০০ কোটি টাকা

  • প্রকাশিত: শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬
  • ১৩ বার পড়া হয়েছে

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি :  ২০২৪- ২৫ অর্থবছর বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ আমেরিকা সহ ২৪ টি রাষ্ট্রে ৭০০কোটি টাকা কাকড়া রপ্তানি হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ কাকড়া ‌রপ্তানি সমিতি।: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্ব ঐতিহ্য বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের মৎস্যভান্ডার নামে খ্যাত বঙ্গোপসাগরেবিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের উপকূলীয় এলাকায় কাঁকড়া রপ্তানি খাতে এসেছে অভাবনীয় সাফল্য। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৭০০ কোটি টাকার কাঁকড়া রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছে, যা তিন বছর আগের তুলনায় দ্বিগুণ।
সফটশেল ও হার্ডশেল কাঁকড়ার চাষ ও রপ্তানির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানও বেড়েছে। বর্তমানে দেশের ২.৫ থেকে ৩ লাখ মানুষ এই খাতে সরাসরি নিয়োজিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চিংড়ির তুলনায় কাঁকড়ার চাষে ঝুঁকি কম, রোগবালাইও তুলনামূলকভাবে কম, এবং সফটশেল কাঁকড়ার আন্তর্জাতিক চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে।
খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটসহ উপকূলীয় জেলাগুলোতে এই সম্ভাবনাময় খাতকে ঘিরে বৈদেশিক আয় আরও বাড়াতে সরকার ও বিনিয়োগকারীদের কার্যকর ভূমিকা রাখা জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। উপকূলের তিন বছরের ব্যবধানে দেশে কাঁকড়া রপ্তানি আয় বেড়েছে দ্বিগুণ। গত অর্থবছরে বিদেশে কাঁকড়া রপ্তানি করে ৭০০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে। তিন বছর আগে আয় হয়েছিল ৩৯৪ কোটি টাকা। সফটশেল ও শক্ত খোলসের কাঁকড়া রপ্তানিতে দেশে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আসছে। একই সঙ্গে কাঁকড়ার চাষ দিন দিন জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা চিংড়ির বিকল্প হিসেবে কাঁকড়া রপ্তানির মাধ্যমে ডলারসংকট মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। ফ্রোজেন ও জীবিত কাঁকড়া বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সিঙ্গাপুরে রপ্তানি করা হয়। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সারা দেশে ৯ হাজার ৭৮৮ দশমিক ৭২ টন কাঁকড়া রপ্তানি করে ৬ কোটি ২৮ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯১ ডলার আয় হয়েছে। আগের বছর ৭ হাজার ৪৫২ দশমিক ১৫ টন কাঁকড়া রপ্তানি করে ৪৪৫ দশমিক ১৯ কোটি টাকা আয় হয়েছিল। ঢাকা থেকে ৯ হাজার ১৪৩ টন কাঁকড়া রপ্তানি হয়েছে, যেখানে খুলনা অঞ্চল থেকে সফটশেল কাঁকড়া রপ্তানির মাধ্যমে ৮০ লাখ ২১ হাজার ৯২৪ মার্কিন ডলার আয় হয়েছে। তবে গত তিন বছরে সফটশেল কাঁকড়ার রপ্তানি ২৫৭ দশমিক ৯৪৫ টন কমেছে।
এ কারণে রাজস্ব আয়ও হ্রাস পেয়েছে। পল্লি কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, সারা দেশে ২ দশমিক ৫ থেকে ৩ লাখ মানুষ কাঁকড়া চাষে নিয়োজিত। সাতক্ষীরায় ৩০ হাজার মানুষ এ কাজে জড়িত। কক্সবাজার, পটুয়াখালী, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে কাঁকড়া চাষ বাড়ালে সরকারের রাজস্ব আয় কয়েকগুণ বৃদ্ধি হতে পারে। বাংলাদেশে ১৫ প্রজাতির কাঁকড়া রয়েছে। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে ম্যাডক্র্যাব বা শিলা কাঁকড়ার চাষ হয়। এ কাঁকড়া জীবদ্দশায় ১৪-১৬ বার খোলস বদল করে। নরম অবস্থায় অর্থাৎ সফটশেল কাঁকড়া হিসেবে রপ্তানি করা হয়। বর্তমানে কক্সবাজার ও সাতক্ষীরায় কাঁকড়ার হ্যাচারি রয়েছে। পল্লি কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘চিংড়ির তুলনায় কাঁকড়ার চাষে ঝুঁকি কম ও পুষ্টিগুণ বেশি।’ তিনি আরও জানান, কাঁকড়ার ব্যবসা ঝুঁকিমুক্ত ও রোগবালাই কম। তাই কাঁকড়ার চাষ ও রপ্তানি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে। কীভাবে হয় কাঁকড়ার চাষ: বাগদা চিংড়ির মতো কাঁকড়া উপকূলীয় লবণাক্ত পানিতে চাষ করা হয়। তাই দেশের উপকূলীয় অঞ্চল কাঁকড়া চাষের জন্য উপযোগী। নরম দো-আঁশ বা এঁটেল মাটিতে কাঁকড়া চাষ হয়ে থাকে। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল, বিশেষ করে খুলনা, বাগেরহাট এবং সাতক্ষীরা এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে এই কাঁকড়া চাষ হয়। উপকূলীয় কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, পটুয়াখালী, বরিশাল, নোয়াখালী, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, সন্দ্বীপ ও সুন্দরবনের দুবলার চর এলাকায় শিলা কাঁকড়ার দেখা মেলে। তবে খুলনা ও চকরিয়া সুন্দরবন এলাকায় এদের সংখ্যা বেশি।
সুন্দরবন সংলগ্ন শ্যামনগর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে, বিশেষ করে হরিনগর, মুন্সীগঞ্জ ও নয়াদিঘির এলাকায় বেশি পরিমাণ কাঁকড়া চাষ করা হয়। সাতক্ষীরার মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলার ৩২১ হেক্টর এলাকায় কাঁকড়া চাষ হয়। বছরে দুই হাজার টনের বেশি কাঁকড়া উৎপাদিত হয়। নদীর মোহনা বা সাগরের জোয়ারের পানির সঙ্গে বিভিন্ন আকারের কাঁকড়া আসে; এর মধ্যে ছোট বা কিশোর কাঁকড়া সংগ্রহ করে ঘেরে রেখে বড় করা হয়। বড় কাঁকড়া হলে ওইগুলো ধরে বিক্রি করা হয়। বাণিজ্যিকভাবে পালনের ক্ষেত্রে কাঁকড়ার খাবার হিসেবে তেলাপিয়া বা অন্য ছোট মাছ ব্যবহার করা হয়। চিংড়ির তুলনায় কাঁকড়া চাষে সময় কম লাগে এবং কাঁকড়ার রোগ-বালাইও চিংড়ির তুলনায় কম। খুলনা মৎস্য পরিদর্শন ও মাননিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মিল্টন সর্দার জানান, কাঁকড়ার পোনাকে ক্র্যাবলেট বলা হয়। একসময় এগুলো উপকূলীয় এলাকা থেকে সংগ্রহ করা হতো, এখন হ্যাচারিতে পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে দুইভাবে কাঁকড়ার চাষ হচ্ছে।
একটি হচ্ছে ফ্যাটেনিং বা মোটাতাজাকরণ ও অন্যটি হচ্ছে সফটশেল কাঁকড়া উৎপাদন। মোটাতাজাকরণে একটি জলাশয় জাল বা প্লাস্টিক দিয়ে ঘিরে কিশোর কাঁকড়া পালন করা হয়। এভাবে কাঁকড়া একটি নির্দিষ্ট ওজন পর্যন্ত বড় হলে তা বিদেশে রপ্তানি করা হয়। ঘেরে চাষের পাশাপাশি হার্ডশেল কাঁকড়া বিভিন্ন নদ-নদীতেও পাওয়া যায়, ওইগুলো সংগ্রহ করে বিক্রি করা হয়। অন্যদিকে সফটশেল কাঁকড়া চাষে প্লাস্টিকের বাক্সে ৮০ বা ১০০ গ্রাম ওজনের কাঁকড়া রাখা হয়। নিয়মিত খাবার দেওয়ার মাধ্যমে কাঁকড়া বড় করা হয়। যেহেতু কাঁকড়া খোলস পাল্টায়। তাই কাঙ্ক্ষিত ওজনের হলে খোলস পাল্টানোর সময় কাঁকড়া ধরা হয়। এ সময় কাঁকড়ার খোলস না থাকার কারণে এটি নরম হয়, তাই একে সফটশেল ক্র্যাব বলা হয়। বিদেশে সফটশেল কাঁকড়ার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। ঢাকা মৎস্য পরিদর্শন ও মাননিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে সফটশেল ও শক্ত খোলসযুক্ত কাঁকড়া রপ্তানি প্রতি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। কাঁকড়া রপ্তানিতে বড় একটি সম্ভাবনা রয়েছে। ব্যবসায়ীরা এ খাতে বিনিয়োগ করলে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব হবে।
কাঁক্ড়া আর্থোপোড শ্রেণির শক্ত খোলসবিশিষ্ট জলজ প্রাণী। প্রজাতি ভিত্তিক মিঠা ও লোনা পানি, উভয় পরিবেশে কাঁক্ড়া পাওয়া যায়। মিঠা পানিতে চার প্রজাতির এবং লোনা পানিতে এগারো প্রজাতির কাঁক্ড়া রয়েছে। মিঠা পানির কাঁক্ড়া আকারে ছোট এবং লোনা পানির কাঁক্ড়া আকারে বেশ বড় হয়। লোনা পানির কাঁক্ড়া সমুদ্রে বসবাস করে। মিঠা পানির কাঁকড়া বিদেশে রপ্তানি হয় না। সামুদ্রিক বড় আকারের কাঁক্ড়া বিদেশে রপ্তানি হয়। তাছাড়া সামুদ্রিক এগারো প্রজাতির কাঁক্ড়ার মধ্যে একমাত্র শিলা কাঁক্ড়া রপ্তানি হয়। এর বৈজ্ঞানিক নাম সাইলা সিরেটা। অনেক স্থানে এ কাঁকড়া ম্যাডক্রাব নামে পরিচিত।
বিদেশে শিলা কাঁক্ড়ার মাংসই প্রিয় খাদ্য। বাংলাদেশে সর্বত্র সব শ্রেণির লোকের কাছে কাঁক্ড়া অতি পরিচিত প্রাণী। কাঁক্ড়া মৎস্য সম্পদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্থানীয়ভাবে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী খাদ্য হিসেবে কাঁকড়া গ্রহণ না করলেও বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশসহ ইউরোপ মহাদেশেও কাঁক্ড়ার চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১৪ কোটি টাকার কাঁক্ড়া বিদেশে রপ্তানি করে থাকে। বিশ্ব বাজারে কাঁক্ড়ার চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এর সংগ্রহ প্রক্রিয়াও যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি কাঁক্ড়ার চাষপদ্ধতির কলাকৌশল সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশে কাঁক্ড়া চাষ প্রক্রিয়া এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। বর্তমান রপ্তানিকৃত কাঁক্ড়ার প্রায় সবটাই উপকূলীয় চিংড়ি খামার ও সমুদ্রের মোহনা নদী এবং ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল থেকে আহরণ করা হয়ে থাকে।
পরিচিতি ও বিস্তৃতি কাঁক্ড়া বা ম্যাডক্রাব আফ্রিকার পূর্ব উপকূলীয় ভারত উপকূল এবং ইন্দোপেসিফিক অঞ্চলের ম্যানগ্রোভ এলাকায় দেখা যায়। এসব কাঁক্ড়ার চক্ষুপুঞ্জের দুই পাশে Carapace-এর ওপরে নয়টি দাঁত রয়েছে, যাকে Serrations বলা হয়। সিরাসনের সংখ্যা দিয়ে কিশোর কাঁক্ড়া চেনা যায়। বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় সর্বত্র কাঁক্ড়া পাওয়া যায়। কাঁক্ড়ার বয়স সধারণত ১৬-১৮ মাসের হলেই পূর্ণবয়স্ক বা প্রজননক্ষম হয়। এসময় একটি কাঁক্ড়ার ওজন হয় ৩০০-৫০০ গ্রাম। একটি কাঁকড়া সর্বোচ্চ ৫ কেজি পর্যন্ত ওজনের পাওয়া গেছে। সাধারণত এক বছর বয়সের কাঁকড়ার ওজন ৪০০-৫০০ গ্রাম হয়ে থাকে। বাগদা চিংড়ির মতো স্ত্রী কাঁক্ড়া গভীর সমুদ্রে ‘নউপ্লি’ ছেড়ে থাকে। যা পরে পাঁচটি লার্ভা স্তরে পার হয়ে ম্যাগালোপা ও পোস্ট লার্ভা স্তরে উপনীত হয়। এরা জোয়ার, ঢেউ ও বাতাসে উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ এলাকায় ভেসে আসে এবং কিশোর স্তরে উপনীত হয়। একটি স্ত্রী কাঁক্ড়া ১-৮ মিলিয়ন ডিম দিতে পারে। বাগদা চিংড়ির মতো কাঁক্ড়ার খোলস রয়েছে, যা চিংড়ির চেয়ে অপেক্ষাকৃত শক্ত। দৈহিক বৃদ্ধির জন্য কাঁক্ড়া খোলস পরিবর্তন করে থাকে। কাঁক্ড়ার নিজ প্রজাতি ভক্ষণ প্রবণতা রয়েছে। কাঁকড়ার শক্ত সারসী বা চিমটা দ্বারা সহজে অন্য প্রাণীকে মেরে ফেলতে পারে। কাঁক্ড়া মাটিতে এবং বাঁধে গর্ত করতে পছন্দ করে। ডুবন্ত গাছের শেঁকড়ে ও ডালপালায় এরা আশ্রয় নেয়। তাই ম্যানগ্রোভ এলাকায় এদের পাওয়া যায়। পানি ছাড়া কাঁক্ড়া দীর্ঘসময় বাঁচতে পারে এবং হেঁটে হেঁটে এক স্থান থেকে সহজে অন্য স্থানে চলে যেতে পারে।
কাঁক্ড়া চাষের সুবিধাসমূহ বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলে চাষের পরিবেশ বিদ্যমান। আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা থাকায় এর উৎপাদন লাভজনক। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক পোনা (কিশোর) পাওয়া যায়। কাঁক্ড়ার খাবার স্বল্পমূল্যে গ্রহণ সম্ভব। ওজন হিসেবে কাঁক্ড়ার বৃদ্ধির হার বেশি। পঁচা আবর্জনা খেয়ে পরিবেশ রক্ষা করে।
কাঁক্ড়া চাষের উপযুক্ত পরিবেশ বাগদা চিংড়ির ন্যায় কাঁকড়া উপকূলের লবণাক্ত পানিতে চাষ করা যায। কাঁকড়া চাষের মাটি ও পানির গুণাবলি নিম্নরূপ হওয়া বাঞ্ছনীয়।
মাটির গুণাবলিক. নরম দোঁআশ বা এঁটেল মাটিখ. হাইড্রোজেন সালফাইট ও অ্যামুনিয়া গ্যাসযুক্ত মাটিগ. জৈব পদার্থ ৭%-১২%ঘ. অ্যাসিড সালফেটমুক্ত মাটিঙ. হালকা শ্যাওলা ও জলজ আগাছাযুক্ত পরিবেশ।
পানির গুণাবলিক. লবণাক্ততা ১০-২৫ পিপিটিখ. তাপমাত্রা ২৫-৩০ সে.গ. পিএইচ ৭.৫-৮.৫ ঘ. অ্যালকালিনিটি ৮০ মি.গ্রা/লি. ঙ. হার্ডনেস ৪০-১০০ পিপিএম চ. দ্রবীভূত অক্সিজেন ৪ পিপিএমের ঊর্ধ্বে।
কাঁক্ড়া চাষের স্থান নির্বাচন সাধারণভাবে বাগদা চিংড়ি চাষের উপযুক্ত স্থানে সহজেই কাঁক্ড়া চাষ করা যায়। কাঁক্ড়ার খাবার বা পুকুরে প্রতিনিয়ত লবণাক্ত পানি পরিবর্তনের যথেষ্ট সুযোগ থাকতে হবে। বছরে ৮-১০ মাস ৫ পিপিটির ঊর্ধ্ব লবণাক্ততা থাকে, এরূপ স্থান কাঁক্ড়া চাষের উপযোগী। কাঁক্ড়া চাষ এলাকা বন্যপ্রাণী ও পাখিমুক্ত থাকতে হবে।
কাঁক্ড়া চাষের পুকুর নির্মাণ বাগদা চিংড়ি চাষের পুকুরের ন্যায় কাঁক্ড়ার পুকুরের পানি ধারণের জন্য শক্ত বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। কাঁক্ড়া হেঁটে বেড়াতে অভ্যস্ত। তাছাড়া মাটিতে গর্ত করে লুকিয়ে থাকতে পছন্দ করে। তাই বাঁধের অভ্যন্তরে বেড়া স্থাপন করা আবশ্যক। বেড়ার উচ্চতা পানির ওপরে ০.৫ মিটার রাখতে হবে। পুকুরের অভ্যন্তরে এই বেড়া বাঁশের ঘন পাটা, ঘন কঞ্চির বুনন, সিমেন্টের দেওয়াল বা অ্যাসবেস্টাস দ্বারা দেওয়াল তৈরি করা যায়। এই বেড়া কমপক্ষে ০.৫ মিটার মাটির নিচে বসিয়ে দিতে হবে। যেন কাঁক্ড়া বেড়ার নিচে দিয়ে গর্ত করে পালিয়ে যেতে না পারে। এ ছাড়া বেড়ার বুনন এমন হতে হবে যেন কিশোর কাঁক্ড়া ফাঁক দিয়ে পালিয়ে যেতে না পারে। এ ছাড়া অন্য ক্ষতিকর প্রাণীও যেন কাঁক্ড়ার পুকুরে প্রবেশ করতে না পারে। পুকুর শুকানো এবং পানি সরবরাহের ব্যবস্থা থাকতে হবে। বাগদা চিংড়ির ন্যায় গেট বা বাক্স নির্মাণ করে পানি সঞ্চালনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। পুকুরের আয়তন ০.২-১.০ হেক্টর হলে ব্যবস্থাপনায় সুবিধা হয়। পুকুরের গভীরতা ১.০-১.৫ মিটার রাখা ভালো।
পুকুর প্রস্তুতিশুকানো ও ধৌত করণ বাগদা চিংড়ির পুকুরের ন্যায় চাষ এলাকার মাটি শুকাতে হবে। শুকানোর পর মাটির ওপরের অম্ল, লবণ ও বিষাক্ত পদার্থ অপসারণের জন্য পুকুরের তলদেশ ধৌত করতে হবে। পানি তুলে পুনরায় একদিন পর পানি ছেড়ে ধৌত প্রক্রিয়া সমাধা করা যায়। পুকুরের তলদেশ চাষ দেওয়ার প্রয়োজন হলে চাষ দেওয়ার পর একই নিয়মে তা পুনরায় ধৌত করতে হবে।
চুন প্রয়োগ হেক্টরপ্রতি সাধারণত ৩০০-৮০০ কেজি Ca চাষ পূর্ব মাটিতে এবং বাঁধে দিতে হবে। মাটির পিএইচ নির্ধারণপূর্বক চুন প্রয়োগ করা উচিত। মাটির পিএইচের ভিত্তিতে সমহারে চুন দেওয়া যায়।
আশ্রয়স্থল সৃষ্টিকাঁক্ড়া খোলস ছাড়ার সময় জলজ প্রাণীর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য লুকিয়ে থাকতে পছন্দ করে। প্রকৃতিতে ম্যানগ্রোভ গাছের শিকড়ের আড়ালে এরা আশ্রয় নেয়। তাছাড়া সিমেন্টের পাইপ বা পিভিসি পাইপের টুকরাও ব্যবহার করা যায়। সাধারণত ৪-৬ ব্যাসের পাইপ ব্যবহার করা যায়। পাইপের ব্যাস বিভিন্ন সাইজের হলে ছোট-বড় কাঁক্ড়া তাদের পছন্দ মতো স্থানে আশ্রয় নিতে পারে। পুকুরের তলদেশে এবং অভ্যন্তরে বেড়ার পার্শ্বে এ আশ্রয়স্থল স্থাপন করা যায়। পচনশীল দ্রব্য আশ্রয়ের জন্য ব্যবহার করা যাবে না।
পুকুরে পানি উত্তোলন ও সার প্রয়োগ চিংড়ি চাষের ন্যায় কাঁক্ড়ার চাষ এলাকায় অন্য পানির অনুপ্রবেশ রোধ করার জন্য সব সময় ০.২৫ মি.মি. ছিদ্রযুক্ত নাইলন জাল দিয়ে পানি ছেকে তুলতে হবে। প্রথমবার ৩০ সে.মি পানি পুকুরে উঠিয়ে পানিতে জৈব সার ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করা যায়। পানিতে সার একত্রে সব না দিয়ে কয়েক ভাগে ভাগ করে প্রয়োগ করা হলে ভালো ফল পাওয়া যায়। যা আর্থিভাবেও লাভজনক। হেক্টরপ্রতি ৫০০ কেজি জৈব সার, ১৫ কেজি টিএসপি এবং ১০ কেজি ইউরিয়া সার পানিতে গুলে সর্বত্র ছিটিয়ে দিতে হবে। পানির রং এবং ফাইটোপ্লাংকটনের উৎপাদনের পরিমাণ অনুযায়ী মাত্রা অনুসারে সার প্রয়োগ করতে হবে। সার প্রয়োগের পাশাপাশি ক্রমান্বয়ে পানির গভীরতা বৃদ্ধি করতে হবে। যা পানির গভীরতা ১ মিটারের মধ্যে থাকা বাঞ্ছনীয়। পানিতে উৎপাদিত ফাইটোপ্লাকটন কাঁক্ড়ার খাদ্য উপাদান বৃদ্ধিতে সহায়তার পাশাপাশি পুকুরের তলায় ছায়া দেয়। কাঁকড়া সূর্যের আলো সহ্য করতে পারে না এবং ছায়া পছন্দ করে। এ ছাড়া প্লাংকটন পানির গুণগত সঠিক মাত্রায় থাকার সাহায্য করে ও বিষাক্ত পদার্থ অপসারণে সহায়তা করে।
কাঁকড়া মজুতকরণ বর্তমানে কাঁক্ড়া চাষ বলতে কাঁকড়া মোটাতাজা করাকেই বোঝায়। কিশোর কাঁকড়া বাঁশের চাই বা ফাঁদ, পাতা জালে, থলে জাল দিয়ে ধরা হয়। ২০-৪০ গ্রাম ওজনের ৮-১০ হাজার কাঁক্ড়া প্রতি হেক্টরে মজুত করা যায়। স্ত্রী কাঁকড়ার চাষ বেশি লাভজনক। তাই স্ত্রী ও পুরুষের অনুপাত ৯.১ বা ৯০% স্ত্রী ১০% পুরুষ মজুত কাঁকড়ার চিমটা পা ও বুকের ফ্ল্যাপ দেখে শনাক্ত করা যায়। পুরুষ কাঁক্ড়ার চিমটা পা বড়, স্ত্রী কাঁকড়ার চিমটা পা একই বয়সের পুরুষ কাঁক্ড়ার চেয়ে ছোট। স্ত্রী কাঁক্ড়ার বুকের ফ্লাপটি অর্ধ গোলাকার, অন্যদিকে পুরুষ কাঁকড়ার ফ্লাপটি অপেক্ষাকৃত সরু ও ইংরেজি ভি আকৃতির। একই বয়সের কাঁকড়া একত্রে সংগ্রহ করা অত্যন্ত কঠিন। তাই ওজন ভিত্তিতে কাছাকাছি ওজনের কাঁকড়া মজুত করা হলে চাষকালীন পরিচর্যার সুবিধা হয়। কিশোর কাঁকড়া একস্থান থেকে অন্যস্থানে বাঁশের ঝুড়িতে পরিবহণ করা যায়। রপ্তানির জন্য গুনাড বিশিষ্ট স্ত্রী কাঁক্ড়াগুলো শনাক্ত করা হয়। আহরণের পর যে সমস্ত স্ত্রী কাঁক্ড়া গুনাড/ডিম্বাশয়বিহীন অবস্থায় পাওয়া যায়, সেগুলোকে স্থানীয় ভাষায় খোসা কাঁকড়া বলা হয়। এই খোসা কাঁকড়া বা নরম খোলসা বিশিষ্ট কাঁকড়া নির্ধারিত পুকুরে ১৫-২০ দিন রেখে উপযুক্ত খাবার দেওয়া হয়। এটিকে কাঁক্ড়া ফেটেনিং বলা হয়। কাঁক্ড়া ফেটেনিং পদ্ধতি অনেক স্থানেই প্রচলিত আছে।
খাবার সরবরাহ কাঁকড়া সর্বভূক। এরা সাধারণত জীবন্ত খাদ্য পেতে পছন্দ করে। ছোট ছোট মাছ, সামুদ্রিক ক্রিমি, শামুক, ঝিনুক, কীটপতঙ্গ খেয়ে থাকে। তবে ময়লা ও পচা জৈব পদার্থ জাতীয় খাবারও এরা খায়। খাদ্য হিসাবে ছোট গুড়া মাছ, শামুক, ঝিনুকের মাংস, চিংড়ি ও চিংড়ির মাথা, বিভিন্ন প্রকার দেহাবশেষ ইত্যাদি ব্যবহার করা যায়। কাঁক্ড়ার খোলস তৈরির জন্য ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাদ্য প্রয়োজন। তাই মাংসের হাড় বা কাঁটাও কাঁকড়া খেয়ে থাকে। এ ছাড়া চালের কুড়া, গমের ভুষি, আটা, ফিস মিল ইত্যাদি মিশ্রণপূর্বক কাঁকড়ার খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করা যায়। কাঁকড়ার দেহের বৃদ্ধির সাথে সাথে খাদ্য চাহিদা বৃদ্ধি পায়। ট্রেতে খাবার দিয়ে খাদ্য গ্রহণের প্রবণতা পর্যবেক্ষণ পূর্বক খাবার সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে। কাঁক্ড়া বাগদা চিংড়ির ন্যায় নিশাচর প্রাণী। তাই বিকেলে বা সন্ধ্যায় ও রাতে প্রত্যহ ২-৩ বার খাবার দিতে হয়।
পানি ব্যবস্থাপনা অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় জোয়ার-ভাটার প্রভাবে কাঁকড়ার পকুরের পানি পরিবর্তন করা যয়। পানির গুণাগুণ রক্ষার জন্য নিয়মিত চুন ও সার প্রয়োগ করতে হবে। কোনো কারণে প্লাংকটন মারা গেলে কিংবা পানি দূষিত হলে সাথে সাথে পানি পরিবর্তনের ব্যবস্থা নিতে হবে। কাঁকড়া উপযুক্ত পরিবেশ না পেলে অন্যত্র বের হয়ে যায়। কাঁকড়া শক্ত প্রাণী বটে কিন্তু পরিবেশের তারতম্য বা পানি দূষিত হওয়ার কারণে এরা মারা যায় এবং উৎপাদন ব্যাহত হয়।
কাঁক্ড়া আহরণ ও বাজারজাতকরণ মজুতের ৩-৪ মাস পর কাঁক্ড়া আহরণ করা যায়। বাংলাদেশে সবচেয়ে চাষের উপযুক্ত সময় মার্চ থেকে জুলাই মাস। এ সময় পানির গুণাগুণ ও তাপমাত্রা উপযুক্ত পর্যায়ে থাকে। কাঁকড়া ধরার জন্য বাঁশের চাই অথবা জালের তৈরি ফাঁদ সবচেয়ে উপযুক্ত। ধরার সময় কাঁকড়ার পা ভেঙে গেলে বাজারজাত করা যায় না। লিফ্ট নেট বা চাই ফাঁদে খাবার দিয়ে কাঁক্ড়া পর্যায়ক্রমে ধরা যায়। কাঁকড়া ধরার আগেই পুকুরে খাবার সরবরাহ বন্ধ রাখতে হবে। কাঁকড়া একপাত্র থেকে অন্য পাত্রে নেওয়া বা রাখার জন্য বাঁশের চিমটা এমন ভাবে ব্যবহার করতে হবে যেন পা ভেঙে না যায়। কাঁকড়াকে পেছন দিয়ে চিমটা বা হাত দিয়ে ধরা যায়। বর্তমানে জীবন্ত কাঁকড়া বিদেশে রপ্তানি হয়ে থাকে। তাই কাঁকড়া চিমটা বা প্লাস্টিকের ফিতা দিয়ে ভালোভাবে বেঁধে ঝুঁড়িতে ভরে বাজারজাত করা যায়। পরিবহনের সময় ঝুড়িতে স্যাঁতসেঁতে ভাব বজায় রাখার জন্য লবণ পানি ছিটিয়ে দিতে হয়। কাঁকড়ার ঝুড়ি অন্ধকারে/ছায়াযুক্ত ঠান্ডা স্থানে রাখতে হয়। বাংলাদেশ থেকে এখনো সিদ্ধ করা অথবা হিমায়িত কাঁকড়া বিদেশের বাজারে বাজারজাত করা হয় না। যদি ওই অবস্থায় রপ্তানি করা যেত, তবে পরিবহন খরচ অনেক কম হতো।
উপসংহার কাঁকড়া চাষের উপযুক্ত পরিবেশ আমাদের দেশের উপকূল অঞ্চলে রয়েছে। যদিও এর চাষ এখনো তেমন প্রসার লাভ করেনি। কাঁকড়ার রপ্তানি বাজারদর হিসাবে এর চাষ বেশ লাভজনক। সঠিকভাবে চাষ করা গেলে বর্তমান হিসাবে প্রতি কেজিতে ৬০ টাকারও বেশি নীট লাভ করা যায়। কাঁকড়াও একটি চাষযোগ্য প্রাণী এবং এর উৎপাদন একটি লাভজনক বিনিয়োগ। বিষয়টি প্রদর্শনের জন্য দেশে কাঁকড়া খামার স্থাপিত হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি এ বিষয় সম্পর্কে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা সরকারি পর্যায়ে করতে হবে। বর্তমানে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব মোচনেও সহায়ক হবে। জীবন্ত কাঁকড়া রপ্তানির জন্য পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র প্রয়োজন হয়। কাঁকড়া চাষ এবং উৎপাদনকে উৎসাহিত করার জন্য এ দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের ওপর ন্যাস্ত করতে হবে। উপকূলীয় এলাকার পানি উন্নয়ন বোর্ডের বরোপিট এলাকায় পরিকল্পিত কাঁকড়া চাষ করে জমির সুষ্ঠু ব্যবহার করা যায়। কাঁকড়ার বাচ্চা সরবরাহ নিশ্চিত করণের জন্য সুন্দরবনের অভ্যন্তরীণ খালসমূহে বেহুন্দী জাল ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও আইন প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের কাঁকড়া সম্পদ বৃদ্ধি পাবে বলে সংশ্লিষ্ট সবার প্রত্যাশা।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে কাঁকড়া চাষ বেকারত্ব নিরসন এবং প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এক বিশাল সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। আর্থোপোড শ্রেণির শক্ত খোলসবিশিষ্ট এই জলজ প্রাণীটি যদিও স্থানীয়ভাবে খাদ্য হিসেবে তেমন জনপ্রিয় নয়, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
কাঁকড়া বা ম্যাডক্রাব, যার বৈজ্ঞানিক নাম সাইলা সিরেটা, মূলত আফ্রিকার পূর্ব উপকূলীয় ভারত উপকূল এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ম্যানগ্রোভ এলাকায় দেখা যায়। বাংলাদেশে মিঠা পানিতে চার প্রজাতির এবং লোনা পানিতে এগারো প্রজাতির কাঁকড়া পাওয়া যায়। তবে, রপ্তানি হয় কেবলমাত্র সামুদ্রিক বড় আকারের শিলা কাঁকড়া। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশসহ ইউরোপ মহাদেশেও এই শিলা কাঁকড়ার মাংসের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১৪ কোটি টাকার কাঁকড়া বিদেশে রপ্তানি হয়ে থাকে। বিশ্ব বাজারে কাঁকড়ার চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এর সংগ্রহ প্রক্রিয়া যেমন বেড়েছে, তেমনি কাঁকড়া চাষপদ্ধতির কলাকৌশল সম্পর্কেও চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশে কাঁকড়া চাষ প্রক্রিয়া এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমান রপ্তানিকৃত কাঁকড়ার প্রায় সবটাই উপকূলীয় চিংড়ি খামার, সমুদ্রের মোহনা, নদী এবং ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল থেকে আহরণ করা হয়। একটি পূর্ণবয়স্ক বা প্রজননক্ষম কাঁকড়ার ওজন সাধারণত ৩০০-৫০০ গ্রাম হয়, যদিও সর্বোচ্চ ৫ কেজি ওজনের কাঁকড়াও পাওয়া গেছে। একটি স্ত্রী কাঁকড়া ১-৮ মিলিয়ন ডিম দিতে পারে। কাঁকড়া দৈহিক বৃদ্ধির জন্য খোলস পরিবর্তন করে এবং এটি মাটিতে ও বাঁধে গর্ত করতে পছন্দ করে, যা ম্যানগ্রোভ এলাকায় এদের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করে।
বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলে কাঁকড়া চাষের উপযুক্ত পরিবেশ বিদ্যমান। আন্তর্জাতিক বাজারে এর চাহিদা থাকায় এই উৎপাদন লাভজনক। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক পোনা (কিশোর) পাওয়া যায় এবং কাঁকড়ার খাবার স্বল্পমূল্যে সংগ্রহ করা সম্ভব। ওজন হিসেবে কাঁকড়ার বৃদ্ধির হার বেশি এবং এটি পঁচা আবর্জনা খেয়ে পরিবেশ রক্ষা করে।
কাঁকড়া চাষের জন্য বাগদা চিংড়ি চাষের ন্যায় উপকূলের লবণাক্ত পানি উপযুক্ত। মাটির গুণাবলির মধ্যে নরম দোঁআশ বা এঁটেল মাটি, হাইড্রোজেন সালফাইট ও অ্যামুনিয়া গ্যাসযুক্ত মাটি, ৭-১২% জৈব পদার্থ এবং অ্যাসিড সালফেটমুক্ত পরিবেশ বাঞ্ছনীয়। পানির ক্ষেত্রে ১০-২৫ পিপিটি লবণাক্ততা, ২৫-৩০ সে. তাপমাত্রা, ৭.৫-৮.৫ পিএইচ, ৮০ মি.গ্রা/লি. অ্যালকালিনিটি, ৪০-১০০ পিপিএম হার্ডনেস এবং ৪ পিপিএমের ঊর্ধ্বে দ্রবীভূত অক্সিজেন থাকা উচিত।
কাঁকড়া চাষের স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে বাগদা চিংড়ি চাষের উপযুক্ত স্থানই অগ্রাধিকার পায়। কাঁকড়ার পুকুরে প্রতিনিয়ত লবণাক্ত পানি পরিবর্তনের সুযোগ থাকতে হবে এবং এটি বন্যপ্রাণী ও পাখিমুক্ত হতে হবে। পুকুরের আয়তন ০.২-১.০ হেক্টর হলে ব্যবস্থাপনায় সুবিধা হয় এবং গভীরতা ১.০-১.৫ মিটার রাখা ভালো। পুকুর নিধনর্মাণের সময় মজবুত বাঁধ এবং কাঁকড়া পালিয়ে যাওয়া রোধ করতে ০.৫ মিটার উঁচু বেড়া স্থাপন করা আবশ্যক।
পুকুর প্রস্তুতির জন্য মাটি শুকানো ও ধৌতকরণ, চুন প্রয়োগ, এবং কাঁকড়ার আশ্রয়স্থল সৃষ্টির উপর জোর দেওয়া হয়। ডিম্বাশয়বিহীন স্ত্রী কাঁকড়া (খোসা কাঁকড়া) ১৫-২০ দিন পুকুরে রেখে উপযুক্ত খাবার দিয়ে মোটাতাজা করা হয়, যাকে ‘কাঁকড়া ফেটেনিং’ বলে। কাঁকড়া সর্বভূক প্রাণী। এরা ছোট মাছ, সামুদ্রিক ক্রিমি, শামুক, ঝিনুক, পোকাযমাকড় এবং পচনশীল জৈব পদার্থ খায়। চালেমাকড় , গমের ভুষি, আটা, ফিস মিল ইত্যাদি মিশ্রণপূর্বক কাঁকড়ার খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করা যায়। সাধারণত, বিকেলে বা সন্ধ্যায় ও রাতে প্রতিদিন ২-৩ বার খাবার সরবরাহ করা উচিত।
পানি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় জোয়ার-ভাটার প্রভাবে পুকুরের পানি পরিবর্তন করা যায়। নিয়মিত চুন ও সার প্রয়োগ এবং পানির গুণাগুণ রক্ষার দিকে নজর দিতে হবে। উপযুক্ত পরিবেশ না পেলে কাঁকড়া অন্যত্র বের হয়ে যায় বা মারা যায়।
কাঁকড়া মজুতের ৩-৪ মাস পর আহরণ করা যায়। বাংলাদেশে সবচেয়ে উপযুক্ত সতময় মার্চ থেকে জুলাই মাস। কাঁকড়া ধরার জন্য বাঁশের চাই অথবা জালের তৈরি ফাঁদ সবচেয়ে উপযুক্ত। জীবন্ত কাঁকড়া চিমটা বা প্লাস্টিকের ফিতা দিযযয়ে ভালোভাবে বেঁধে ঝুড়িতে ভরে বাজারজাত করা হয়। পরিবহনের সময় ঝুড়িতে স্যাঁতসেঁতে ভাব বজায় রাখার জন্য লবণ পানি ছিটিয়ে দিতে হয় এবং ঝুড়ি অন্ধকারে/ছায়াযুক্ত ঠান্ডা স্থানে রাখতে হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে সিদ্ধ করা অথবা হিমায়িত কাঁকড়া বিদেশের বাজারে বাজারজাত করা হয় না, যা পরিবহন খরচ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
কাঁকড়া চাষের উপযুক্ত পরিবেশ আমাদের দেশের উপকূল অঞ্চলে থাকলেও এর চাষ এখনো তেমন প্রসার লাভ করেনি। কাঁকড়ার রপ্তানি বাজারদর বিবেচনায় এর চাষ বেশ লাভজনক, কারণ সঠিকভাবে চাষ করা গেলে প্রতি কেজিতে ৬০ টাকারও বেশি নীট লাভ করা যায়। এটি একটি লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
বিষয়টি প্রদর্শনের জন্য দেশে কাঁকড়া খামার স্থাপন এবং সরকারি পর্যায়ে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এটি দারিদ্র্য ও বেকারত্ব মোচনে সহায়ক হবে।

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।