1. : lf_ElQ5oe7W3mX7 :
  2. mesharulislammonir1122@gmail.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন
  3. info@www.sangjogprotidin.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন :
মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:১৫ পূর্বাহ্ন

উপকূলীয় বাস্তুচ্যুত শিশুদের হারিয়ে যাওয়া শৈশব

  • প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ০ বার পড়া হয়েছে

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। প্রতিবছর বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনে প্রায় সাত লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। ভিটেমাটি হারানো এসব মানুষের বড় একটি অংশ আশ্রয় নেয় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মতো উপকূলীয় নগরগুলোর প্রান্তিক এলাকায়। কিন্তু এই অভিবাসন শুধু বসত বদলের গল্প নয়, এটি দারিদ্র্য, অনিরাপদ শ্রম এবং শিশুশ্রমের এক নির্মম চক্র তৈরি করছে।
জলবায়ুজনিত দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো তাদের ঘরবাড়ি, জমি ও জীবিকাই শুধু হারায় না, তাতে ভেঙে পড়ে সামাজিক বন্ধন, তৈরি হয় গভীর মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তা। আয় কমে যাওয়ায় অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ নিতে বাধ্য হয়। চট্টগ্রামে জলবায়ু অভিবাসীদের ৬০ শতাংশের বেশি বসবাস করছে নগরের প্রান্তে গড়ে ওঠা দরিদ্র বস্তিতে, যেখানে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অভাব প্রকট। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। উপকূলীয় বস্তিগুলোতে ১০-১৭ বছর বয়সী উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে জলবায়ু-বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর শিশুরা মূলত দুটি খাতে বেশি নিয়োজিত—শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ধাতব কারখানা বা মেটাল ফ্যাক্টরি সেক্টর। এগুলো সরকারিভাবে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হিসেবে চিহ্নিত।
শুঁটকি ও ধাতব কারখানায় শিশুদের ভারী বোঝা বইতে হয়, ধারালো যন্ত্র ব্যবহার করতে হয়, তারা বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসে, দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে আর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঝুঁকিতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের নেওয়া অগ্রিম ঋণের কারণে শিশুরা জড়িয়ে পড়ে বাধ্যতামূলক শ্রমে। ফলে তারা স্কুলছুট হয়, হারায় খেলাধুলা ও স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার সুযোগ। এক অর্থে, দেশ হারাচ্ছে তার ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সম্ভাবনা।
পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে প্রায় ৩৫ লাখ শিশু শ্রমে যুক্ত, যার মধ্যে ১০ লাখের বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। শুঁটকি খাতে শিশুশ্রমিকদের বড় অংশই মেয়েশিশু, আর ধাতব কারখানায় বেশি কাজ করে ছেলেশিশুরা। এসব শিশুর ৭৫ শতাংশ স্কুলের বাইরে, অনেকে কখনো স্কুলেই যায়নি।
শিশুশ্রম–বিরোধী আইন ও নীতির ঘাটতি নেই। বাংলাদেশ শিশুশ্রম নিষিদ্ধকরণে আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুমোদন করেছে, জাতীয় কর্মপরিকল্পনা রয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে শিশুশ্রমমুক্ত দেশের লক্ষ্যও নির্ধারিত। কিন্তু বাস্তবতা হলো—জলবায়ু বাস্তুচ্যুতি ও জীবিকার সংকটকে আলাদাভাবে বিবেচনায় না নিলে এই লক্ষ্য অর্জন খুব কঠিন হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত শুধু পরিবেশগত নয়, এটি সামাজিক ও নৈতিক সংকটও তৈরি করছে। ব্যাপারটি আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠল চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত একটি গোলটেবিল বৈঠকে। ‘জলবায়ু পরিবর্তনে বাস্তুচ্যুত পরিবার ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুশ্রম নিরসন’ শীর্ষক এই বৈঠকে উঠে আসে—কীভাবে জলবায়ুসংকট ধীরে ধীরে শহরের বস্তি, কারখানা ও শুঁটকিমহালের ভেতর দিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গ্রাস করছে। ইয়াং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন (ইপসা) ও একটি ইংরেজি দৈনিকের যৌথ উদ্যোগে, চট্টগ্রাম ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির সহযোগিতায় আয়োজিত এই বৈঠকে নীতিনির্ধারক, গবেষক, শিক্ষক, প্রশাসনের কর্মকর্তা, উন্নয়নকর্মী ও সাংবাদিকেরা একমত হন যে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর শিশুরা আজ সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে।
গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্যে জানা যায়, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনে প্রতিবছর প্রায় সাত লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। এসব পরিবার জীবিকার সন্ধানে শহরমুখী হয়ে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মতো উপকূলীয় নগরে এসে আশ্রয় নিচ্ছে দরিদ্র বস্তিতে। সেখানে মৌলিক সেবার অভাব, অনিরাপদ কর্মসংস্থান এবং দারিদ্র্যসহ নানা কারণে শিশুশ্রমকে প্রায় অনিবার্য করে তুলছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়রও এই সংকটের কথা স্বীকার করলেন। তিনি বললেন, নগরীর ফুটপাতে জলবায়ু বাস্তুচ্যুত পরিবার ও তাদের শিশুদের উপস্থিতি এখন নিত্যদিনের দৃশ্য। এসব শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়ছে, কেউ কেউ কিশোর গ্যাং ও অপরাধের দিকেও ধাবিত হচ্ছে।
বৈঠকে অন্যান্য বক্তা ও বিশেষজ্ঞরাও এ কথা স্বীকার করেছেন যে শিশুশ্রম শুধু দারিদ্র্যের ফল নয়, এটি জলবায়ু পরিবর্তনের এক নীরব কিন্তু ভয়াবহ সামাজিক পরিণতি। জলবায়ু-বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জন্য নিরাপদ বাসস্থান, সম্মানজনক জীবিকা ও শিশুবান্ধব সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করা গেলে শিশুশ্রম নিরসনের লক্ষ্য অধরাই থেকে যাবে।
বৈঠকে জলবায়ু বিশেষজ্ঞ মো. শামসুদ্দোহা কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের জাতীয় জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনাগুলো মানুষকেন্দ্রিক নয়। সেখানে নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিষয়গুলো উপেক্ষিত। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শিশুদের বিকাশ ব্যাহত হলে তা “ইন্টার জেনারেশনাল লস”-এ রূপ নেয়, যার প্রভাব পড়ে পরবর্তী প্রজন্মের ওপরও।’
এই প্রেক্ষাপটে ইপসাসহ কিছু বেসরকারি সংগঠন ভূমিকা রাখছে। তারা সীমিত পরিসরে জলবায়ু-বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর শিশুদের স্কুলে ফিরিয়ে আনা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি এবং নীতিগত সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে তারা ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের চক্র ভাঙার চেষ্টা করছে। শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষাকে একসঙ্গে যুক্ত করার এই উদ্যোগ ভবিষ্যতের জন্য একটি কার্যকর মডেল হতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে বাস্তুচ্যুত শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে ঠেলে দেওয়া মানে তাদের ওপর অবিচার করা। তাই প্রয়োজন খাতভিত্তিক উদ্যোগ, শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, যাতে জলবায়ুসংকটে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো সম্মানজনক ও নিরাপদ জীবিকার পথে ফিরতে পারে, আর শিশুরা ফিরে পায় তাদের হারিয়ে যাওয়া শৈশব।
আমি প্রতিদিন বাবিকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে অফিসে যাই। স্কুলের কম্পাউন্ডে ঢুকি না। ছুটির সময়ও আমি বাইরেই থাকি। কারণ ওখানে ২০ বছরের ছেলেরাও ভাষাহীন চোখে তাকিয়ে থাকে। দোলনায় দোল খায়। ছুটির সময় মা আসতে দেরি করলে চিৎকার করে কাঁদে। এই অভয়ারণ্যে শিশুরা জীবনচর্চা শেখার অনুশীলনে ব্যস্ত।
যদিও সম্ভাবনার গণ্ডি সীমিত; তবুও বাবা, মা, শিক্ষকেরা মিলে চেষ্টা করেন তার জীবনচর্চাটাকে সহজ করার জন্য। আমার যা বোঝার বোঝা হয়ে গেছে। আমি কেবল বাবিকে নামিয়ে দিই আর নিয়ে আসি। শুধু বলেছি, আমার বাবি যেন আদরে থাকে, আমার আর কোনো প্রত্যাশা নেই আপনাদের কাছে।
মাঝে মাঝে দু-একজন বাবা বা মা আমাকে ফোন করেন, ‘আমার বাচ্চাটা তিন বছরের, একটুও বসে না; সারাক্ষণ শুধু দৌড়াচ্ছে, অকারণে কাঁদছে; কোলে থাকতেই চায় না, আমাকে একটুও বসতে দেয় না, কোনো কিছু পেলে সেটা ঘোরাতে থাকে, এখনো কথা বলা শুরু করেনি, চোখের দিকেও তাকায় না; কী করব? আপনি কী করেছেন?’
আর দুই বছর আগে হলেও আমি গল্পের ঝাঁপি নিয়ে বসতাম তার সঙ্গে—কী করেছি, কী করতে হবে। আজ আর তা করি না। বলি, একজন চাইল্ড নিউরোলজিস্টকে দেখান। ঠিকানাও দিয়ে দিই কখনো।
পাশের ফ্ল্যাটের ভাবি হয়তো বলল, ‘আপনার ছেলের তো কোনো শব্দ পাই না। ও তো নিজের মতো থাকে। আমার ভাইয়ের ছেলেটা সারাক্ষণ চিৎকার করে। ওর মাকে একদণ্ড বসতে দেয় না।’ আমি চুপ করে শুনি, মা-বাবারা কখনো আশাহত হন—কেন আমি তাদের ম্যাজিকটা বলে দিলাম না!
আমরাও যখন বুঝতে পেরেছিলাম, ডাক্তার আমাদের বলেছিলেন, ওর অটিজম আছে, তখন ভেবেছিলাম এটা চার-পাঁচ বছরের জার্নি, তাই সবকিছু ছেড়ে দিয়ে ওকে নিয়েই পড়েছিলাম। স্পেশাল স্কুল, বাসায় স্পেশাল টিচার, মূলধারার স্কুলে গাইড টিচারের সহায়তা নিয়ে সেখানে রাখা, ছুটির দিনে পার্কে নিয়ে যাওয়া, বাসায় কথা বলা, গান শোনানো সব করেছি—তারপর একদিন শক্তি কমে এসেছে। মেনে নিতে শিখেছি, বাবিও শান্ত হয়েছে। কিছুটা বুঝেছে হয়তো নিজেকে কী করে চালাতে হবে। অথবা নিজেই নিজেকে মেনে নিয়েছে।
কম্পিউটারে বিভিন্ন রকম বিজ্ঞাপন দেখে হাসে, আবার কাঁদেও। পৃথিবীর আর কোনো সুখ-দুঃখ তাকে স্পর্শ করে না। কেবল দরকারমতো ওয়াশরুমে যায়, খেতে ইচ্ছে করলে খাবার টেবিলে গিয়ে বসে। কখনো নিজেই খাবার নিয়ে নেয়। সে জানে ঘরে কোথায় কী আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অটিজম সোসাইটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ অটিজম সমস্যায় ভুগছে। বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজারে ১৭ জন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা অটিজম আক্রান্ত মানুষ রয়েছে। ঢাকা শহরে এই শিশুদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু বিশেষায়িত সেবা দেওয়া বা সে রকম মানসম্মত স্কুল বাড়েনি। স্কুল প্রতিটি রাস্তার মোড়ে মোড়েই আছে, বিউটি পারলারের মতো।
সন্তানের অটিজম রয়েছে—এমন মা-বাবা অথবা শিক্ষক যাঁরা আগে এমন বিশেষায়িত স্কুলে কাজ করেছেন, তাঁরা কয়েকজন মিলে স্কুল করেছেন। বেশির ভাগ স্কুলেই প্রশিক্ষণহীন শিক্ষক যাঁরা খুব কম বেতনে এসব শিশুর সঙ্গে কাজ করছেন। আমার সন্তান কথা বলতে পারে না। তার স্পিচ থেরাপি দরকার। কটা স্পিচ থেরাপি ক্লাস পায় স্কুলে, জিজ্ঞেস করায় শিক্ষক বললেন—একজন স্পিচ থেরাপিস্ট।এতগুলো বাচ্চা। মাসে তিনি একটা সেশন পান।
বাবির অস্থিরতা বেড়েছে। বয়ঃসন্ধি চলছে। কী করব? বলি, আপনাদের অকুপেশনাল থেরাপিস্ট নেই? কী বলছেন তিনি? কী করলে কমবে এই অস্থিরতা?
‘আমাদের স্কুলে আপাতত অকুপেশনাল থেরাপিস্ট নেই। আমরা খুঁজছি, পেয়ে যাব।’ এ রকম অবস্থা বেশির ভাগ স্কুলের। বিশেষ শিশুদের পরিবেশ, জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া শেখাতে অনেক সাপোর্ট লাগে। মা-বাবা একা এটা পেরে ওঠেন না। স্কুলে দিলেও তাকে আনা-নেওয়া কখনো মায়ের পক্ষে ভীষণ কষ্টকর হয়। কখনো দেখি ছোট বাচ্চাটাকে বুকে বেঁধে নিয়েছেন বেল্ট দিয়ে, তারপর এই বিশেষ শিশুকে ধরে রিকশা খুঁজছেন।
এই শিশুর নিয়মিত চিকিৎসা, স্পেশাল স্কুল, স্পিচ থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপির দরকার হয়; যা একটা সাধারণ পরিবারের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। একজন অকুপেশনাল থেরাপিস্ট বা স্পিচ থেরাপিস্ট প্রতি ৪৫ মিনিটের সেশনে ৮০০ বা তারও বেশি টাকা নেন। যে সময়টার বেশির ভাগ বাচ্চার স্থির হয়ে বসতে বসতে শেষ হয়ে যায়। থেরাপিস্টের এত সময় নেই।
পরবর্তী ৪৫ মিনিট বুক করা আছে আরেক বাচ্চার জন্য। কোনো কোনো থেরাপিস্টের সিরিয়াল পেতে রাত থেকে অপেক্ষা করতে হয়।আগেই বলেছি, প্রতিটি বড় রাস্তায় এই স্কুল আছে। স্কুলগুলো কতটুকু বিশেষায়িত সেবা দিতে পারে, সেটা নিয়ে সন্দেহ আছে। যদিও এগুলোর মাসিক টিউশন ফি ৭ থেকে ১৫ হাজার টাকা। যদিও জানি, বেশির ভাগ স্কুলে তিন-চারটি শিশুর জন্য একজন শিক্ষক থাকেন।
কখনো কখনো ‘ওয়ান টু ওয়ান’ সাপোর্টও থাকে। এই শিশুদের টয়লেট ও অন্যান্য সাপোর্টের জন্য আয়া দরকার হয়। গেটে দুজনকে রাখতে হয় এদের দেখেশুনে রাখার জন্য। ঢাকা শহরে বাড়িভাড়া নিয়ে এমন একটি স্কুল চালানোও ব্যয়বহুল। ফলে মা-বাবার খরচ বেড়ে যায়। সরকারি স্কুলে একীভূত শিক্ষার কথা বলা হলেও এ ধরনের শিশু মূলধারার স্কুলে টিকে থাকতে পারে না। অন্যান্য বেসরকারি স্কুলে বিশেষ শিশু ভর্তি করতে মা-বাবাকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। এ অবস্থায় সরকার পরিচালিত বিশেষ স্কুল বাড়ানো দরকার।
যেখানে সরকারের সব ধরনের সহায়তায় দরিদ্র বা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের বিশেষ শিশুরা স্কুলের সেবা পাবে, মা-বাবা একটু শ্বাস নিতে পারবেন। কেবল বিশেষ স্কুলের ব্যয়ভার বহন করতে পারবেন না বলে অনেকেই সন্তানদের বাড়িতে রেখে দিয়েছেন।
বিশেষ শিশুর জীবনযাপন, তার স্কুলে যাওয়া সবই ব্যয়বহুল। সাধারণ একটা পরিবারের পক্ষে এটা বহন করা দুঃসাধ্য। তবু এ আশায় তাঁরা চেষ্টা করে যান, একদিন তার ছেলেটা বা মেয়েটা ভালো হবে, কথা বলবে। তাই কেউ জমি বিক্রি করে মফস্বল থেকে এসে ঢাকার স্কুলে ভর্তি করান। কখনো ঢাকার বাইরে থেকে এসে থেরাপি করান। কিন্তু আমরা যারা অভিজ্ঞ বাবা-মা, তারা জানি এই জার্নি চার-পাঁচ বছরের নয়। এই যাত্রা দীর্ঘদিনের, কখনো সারা জীবনেরও হতে পারে। তাই রাষ্ট্রীয় সহায়তায় এ ধরনের বিশেষায়িত স্কুল ও সেবা বাড়ানো দরকার।তাদের পুনর্বাসন দরকার, নইলে কী হবে যখন তাদের মা-বাবা, আপনজন থাকবে না?
কোনো দুঃখ-বেদনাই অনন্তকাল থাকে না। হয় দুঃখ-বেদনা চলে যায় অথবা মানুষটাই চলে যায়। বিশেষ শিশুদের মা-বাবারা অনন্তকালের দিকে তাকিয়ে আছেন। যদিও তাঁরা জানেন, তাঁরা থাকবেন না; কিন্তু তাঁদের এই সন্তান, এই দুঃখ থাকবে। অন্তকালে তার একটা ভালো পরিণতি হবে, নিরাপদে থাকবে, সেটা অন্তত তাঁরা ভাবতে চান। এর শেষ কোথায়, আমরা কেউই জানি না।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভুগতে থাকা বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলোর একটি। উপকূলীয় জেলাগুলোতে জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় এলাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগের থেকে অনেক বেশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপকূলীয় জেলাগুলোতে আঘাত হানছে। একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে না উঠতেই অন্য একটি দুর্যোগ আঘাত হানছে। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে উপকূলীয় জেলাগুলো এককথায় ধুঁকছে। উপকূলীয় জীবনব্যবস্থা এলোমেলো করে দিচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব। উপকূলের শিশুদের জীবন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাবের কারণে সেই ভবিষ্যৎ শিশুদের জীবন এখন এলোমেলো। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, তাপদাহ, নদীভাঙনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে উপকূলীয় জীবনব্যবস্থার ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে অনেক আগে থেকেই। উপর্যুপরি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে উপকূলের লাখ লাখ পরিবার তাদের ঘরবাড়ি হারিয়েছে, কাজ হারিয়েছে। সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় সুপেয় পানির সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। অর্থ দিয়েও বিশুদ্ধ পানি মিলছে না। উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় লোনা পানিতে তলিয়ে গেছে ফসলের ক্ষেত। প্রাকৃতিক দুর্যোগে উপকূলের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীভাঙনের কবলে পড়ে হারিয়ে গেছে। উপকূলে জীবনযাত্রার খরচ এখন আগের থেকে বেড়েছে। বিপরীতে তাদের আয়ের উৎস দিন দিন সংকুচিত হয়েছে এবং হচ্ছে।
জাতিসংঘের শিশু তহবিল ‘ইউনিসেফে’র ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদন বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ২ কোটি শিশুর জীবন ও ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে। ইউনিসেফের ২০২১ সালের অন্য আরেক প্রতিবেদন মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের শিকার হওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিতে থাকা ৬৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫তম। উপকূলের শিশুদের জীবন দিন দিন খারাপ থেকে খারাপতর হচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে জলবায়ু উদ্বাস্তু হয়ে হাজার হাজার পরিবার শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। অর্থকষ্টে ভুগতে থাকা উপকূলের বহু পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে জীবনের তাগিদে বাধ্য হচ্ছে শহরে আসতে। উপকূলে মানুষের কাজ কমে যাচ্ছে, জীবনযাত্রার খরচ বাড়ছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় বাড়ছে। পরিসংখ্যান বলছে, অন্যসব জেলায় জনসংখ্যা বাড়লেও উপকূলের জেলাগুলোতে বিশেষ করে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও বরগুনায় জনসংখ্যা বৃদ্ধি না পেয়ে উল্টো কমে যাচ্ছে। মাত্রাতিরিক্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপকূলের জীবনব্যবস্থায় চরম বৈষম্য তৈরি করছে। দারিদ্র্য বেড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের শিশুরা যে সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বড় হচ্ছে উপকূলের শিশুরা সেসব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জলবায়ু সমস্যাগ্রস্ত পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের পেছনে বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে উপকূলের শিশুরা অপুষ্টি নিয়ে বড় হচ্ছে। বিশুদ্ধ পানি সংকটসহ নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত হয়ে উপকূলের হাজার হাজার শিশু রোগগ্রস্ত হয়ে জীবন কাটাচ্ছে। অর্থকষ্টে ভুগতে থাকা উপকূলের বহু পরিবার তাদের শিশু সন্তানদের লেখাপড়া বাদ দিয়ে কাজে লাগিয়ে দিচ্ছে। অনেক পরিবার তাদের মেয়েদের কম বয়সে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ খারাপ জেনেও শুধু বেঁচে থাকার জন্য পরিবারগুলো এসব সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে! জলবায়ু উদ্বাস্তু হয়ে শহরে পাড়ি জমানো পরিবারগুলোর অবস্থা আরও খারাপ। শহরের বস্তিতে কিংবা রেললাইনে ঠাঁই নেওয়া এসব পরিবারের শিশুরা তাদের শৈশব হারিয়ে ফেলছে। পড়ালেখা বাদ দিয়ে শিশুরা দোকান, কারখানাসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যোগ দিচ্ছে। শহরে এসে অনেকে স্থানীয় বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও জলবায়ু উদ্বাস্তু বেশিরভাগ শিশু শেষ পর্যন্ত বাস্তবতার কাছে হার মেনে বিপথে চলে যাচ্ছে। পিতামাতার হাতে টাকা না থাকলে আর শিশুর পেটে ক্ষুধা থাকলে যা হবার তাই হচ্ছে। উপকূলের প্রতিবন্ধী শিশুদের অবস্থা তো আরও খারাপ। যেখানে জলবায়ু দুর্যোগের শিকার হওয়া পরিবারগুলোর সাধারণ শিশুদের জীবন অগোছালো সেখানে প্রতিবন্ধী শিশুদের জীবনধারণের অবস্থা সহজে অনুমেয়।
বছরের পর বছর মাত্রাতিরিক্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া উপকূলীয় অঞ্চল নিয়ে আলাদাভাবে ভাবার সময় এসেছে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের থেকে সাম্প্রতিককালের প্লাবন সমভূমির এ উপকূলীয় অঞ্চলে ভবিষ্যতের শিশুদের কথা ভেবে হলেও আলাদাভাবে নজর দিতে হবে। জলবায়ু সমস্যায় জর্জরিত হয়ে উপকূলের মানুষ এখন উপকূলে থাকতে চাচ্ছে না। আবার শহরে পাড়ি জমানো উপকূলের মানুষ শহরে আসলেই যে সমস্যার সমাধান হচ্ছে তাও নয়। শহরে মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ তৈরি হচ্ছে। দুর্যোগে বিপর্যস্ত উপকূলে সমস্যা ও বৈষম্য এভাবে বাড়তে থাকলে উপকূলীয় জনপদ একসময় জনশূন্য হয়ে পড়বে। দেশের একটি অংশ অর্থাৎ উপকূলীয় শিশুদের টেকসই ও উন্নত জীবন ব্যতিরেকে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দিন দিন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়বে এটা ধরে নিয়েই উপকূলীয় জনপদে জীবনব্যবস্থা সাজাতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো তথা অভিযোজন কর্মসূচির আওতায় বিশেষ বরাদ্দ বাড়াতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। করোনাকালে এমনিতেই গরিব মানুষের জীবনব্যবস্থায় নৈতিবাচক প্রভাব তার উপর আবার মাত্রাতিরিক্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগে উপকূলীয় জনপদের জীবনধারা বিপর্যস্ত। উপকূলীয় জনপদে জীবনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ও শিশুবান্ধব সহায়ক পরিবেশ বজায় রাখার জন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো ও টেকসই পরিকল্পনা করতে হবে। কেননা, উপকূলের শিশুদের টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে না পারলে আগামীর উন্নত বাংলাদেশ সম্ভব নয়।
সুন্দরবনসংলগ্ন সাতক্ষীরার শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের বুড়িগোয়ালিনী গ্রামে স্বপ্নার বাড়ি। এলাকার মানুষের প্রধান পেশা মাছ ধরা। মালঞ্চ নদে জোয়ার এলেই যেন জেগে ওঠে শিশু-কিশোর বয়সের ছেলেপুলে! জোয়ারে সুন্দরবন তলিয়ে যায়। এ সময় ছোট ছোট ডিঙি, জাল, নেট আর আটল (কাঁকড়া ধরার যন্ত্র) নিয়ে ছোটবড় সবাই বেরিয়ে পড়ে সাদা মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ির রেণু সংগ্রহে। সংসারে অভাব-অনটন এ এলাকার মানুষের নিত্যসঙ্গী। মাছ ধরা বাদে উল্লেখযোগ্য কোনো কর্মসংস্থান নেই। তাই লেখাপড়ার চেয়ে ছোটবেলায় বাপদাদার পুরাতন পেশা মাছ ধরার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয় বেশি!
মালঞ্চের পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে দেখা হয় মিয়ারাজের সঙ্গে। মাকে নিয়ে দোকানে খাবার কিনতে এসেছে আট বছরের মিয়ারাজ। তুমি স্কুলে যাও?Ñ এ প্রশ্নের উত্তরে মায়ের আঁচলের নিচে হাসিমাখা মুখ লুকায় ও। মিয়ারাজের মা রহিমা (৩২) জানান, স্কুলে ভর্তি হলেও মিয়ারাজ স্কুলে যায় না। ছেলের লেখাপড়া নিয়ে অতটা চিন্তিত নন মা। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘লেখাপড়া শিখে কী হবে? চাকরি নাই। বাদাবনে (সুন্দরবনে) কাজে দিয়ে দেব।’ একই দোকানে বসে ছিলেন দুই সন্তানের জননী খাইরুন (৩৫)। ছোট ছেলের নাম রণি। বয়স ১১। চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়িয়ে আর পড়াননি। অল্প বয়সের ছেলেকে অভাবের কারণে কাজে দিয়ে দিয়েছেন।
মালঞ্চের তীর ঘেঁষে বুড়িগোয়ালিনী গ্রামের বাঁধের রাস্তা দিয়ে নীলডুমুর যাওয়ার পথে দেখা হয় ইয়াসিনুর রহমানের (৩০) সঙ্গে। এলাকায় একটি প্রজেক্টে দীর্ঘদিন কাজ করছেন। এলাকায় শিশুদের কোনো সমস্যা আছে কি না?Ñ এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এলাকায় জলবায়ুগত সমস্যার প্রভাব রয়েছে। এ গ্রামের বাসিন্দাদের প্রধান সমস্যা নদীভাঙন। এলাকার মানুষ বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভরশীল। পুকুরের পানি বিশুদ্ধকরণের পর পাইপের মাধ্যমে গ্রামে সরবরাহ করলেও শুষ্ক মৌসুমে পানি লবণাক্ত হয়ে যায়। তখন পানির জন্য হাহাকার লেগে যায়। অনেক পরিবারের শিশুরা লবণাক্ত পানি পান করতে বাধ্য হয়। ফলে শিশুরা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়। শিশুদের পাঁচড়া, শ্বাসকষ্ট, চুলকানি, সর্দিকাশি লেগেই থাকে। অভাব ও অসচেতনতার কারণে বেশিরভাগ পরিবারের শিশুরা অপুষ্টিতে ভুগছে। এলাকায় চিকিৎসাসেবাও ভঙ্গুর।’
শ্যামনগরের আরেক ইউনিয়ন গাবুরা। এটি একটি দ্বীপ ইউনিয়ন। কপোতাক্ষ নদ ও খোলপেটুয়া নদী গাবুরার চারদিক ঘিরে রেখেছে। এলাকায় ৯৫ ভাগ রাস্তা কাঁচা। গাবুরা ইউনিয়নে বাঁধের ওপর যখন পৌঁছাই তখন দুপুর সাড়ে ১২টা। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। বাঁধের পাশে আলী হায়দারের (২৯) ছোট দোকানে তখন শিশুদের জটলা। বাঁধের এক পাশে কংক্রিটের ব্লক দিয়ে ঢালাই চলছে। তার পাশেই আবার নদীভাঙনের চিহ্ন স্পষ্ট। এলাকায় প্রধান সমস্যা কী?Ñ প্রশ্ন করতেই শুরুতে আলী হায়দার লবণাক্ততার কথা জানান। এ সমস্যার কারণে শিশুদের সর্দিকাশি, নিউমোনিয়া লেগেই থাকে। এলাকার হাওয়া খারাপ। যোগাযোগব্যবস্থা খুবই নাজুক। অপুষ্টি, রক্তশূন্যতা ও বাল্যবিবাহের মতো সমস্যা রয়েছে শিশুদের। আগে তিনি সন্তানদের জন্য রক্তের বড়ি কিনে খাওয়াতেন। একই দোকানে বসে কথা হয় কিশোর আরিফুল ইসলামের (১৪) সঙ্গে। ৫০ নম্বর গাবুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বয়সের সঙ্গে শ্রেণি না মেলায় খানিকটা অবাক হই! তোমার তো এখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার কথা?Ñ এ প্রশ্নের উত্তরে ঠোঁট দুটো চওড়া করে মিষ্টি হাসি দিয়ে আরিফুল বলে, ‘আমায় দেরিতে স্কুলে দেছে। বাপ-মায় জানে।’ আরিফুল আরও জানায়, প্রতি বছর মে মাসের দিকে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাকেও ছোটবেলায় বাঁধে থাকতে হয়েছে। আরিফুলের সঙ্গে কথা বলতে বলতে দোকানে হাজির হয় ১২ বছরের শিশু আজমীর। স্থানীয় নিজামিয়া দাখিল মাদ্রাসায় পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। আজমীর জানায়, একটু বৃষ্টি হলেই কাঁচা রাস্তা দিয়ে মাদ্রাসায় যেতে মন চায় না। বাড়িতে লোনা পানি দিয়ে থালাবাসন ধোয়া ও অন্যান্য কাজ করা হয়। আর খাওয়ার জন্য টিউবওয়েলের পানি সংগ্রহ করতে হয়। আজমীর আরও জানায়, এলাকায় নদীভাঙনের ভয় আছে। নদীভাঙন শুরু হলে তখন বাঁধের ওপর থাকা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। তাই ছোট্ট ভাইকে নিয়ে খুব
চিন্তা হয় ওর।
গাবুরা ইউনিয়নের খোলপেটুয়া গ্রামের বাসিন্দা মাজেদা বেগমের (৪৫) ছোট মেয়ে সাবিনা। বয়স ৭। স্কুলের বারান্দায় যাওয়ার সুযোগ হয়নি এখনও। কারণ ঘরে থাকা বয়স্ক অন্ধ দাদিকে দেখাশোনা করতে হয়। গাঙের চরে ওদের বাস। ঘরের তিন পাশে পানি। বহুবার নদীভাঙনের শিক্ষার হয়েছে মাজেদার পরিবার। শিশু সাবিনা আদৌ লেখাপড়া করতে পারবে কি না নিশ্চয়তা নেই পরিবারের কাছে!
গাবুরায় সবচেয়ে সমস্যা হলো বিয়ে দেওয়ার সময় বেশিরভাগ পরিবার মেয়ের উপযুক্ত বয়স বিবেচনায় নেয় না। এলাকায় কম বয়সে বিয়ে হওয়ার প্রবণতা বা প্রথা অনেক আগে থেকেই। নয়টি ওয়ার্ডের মধ্যে ছয়টিতেই বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট। গাবুরা দ্বীপটিকে বাঁচানোর জন্য চারপাশে কংক্রিটের ঢালাই গাবুরাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি। কাজও শুরু হয়েছিল। গত জুনের মধ্যে কংক্রিটের বাঁধের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও অর্ধেকের কম কাজ হয়েছে। তাই লেবুবুনিয়া বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশের ভয়ে এলাকার শিশুসহ সবাই শঙ্কিত।
গাবুরা সুন্দরবন কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক হাফিজুল ইসলাম জানান, তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণিতে কয়েক মাস আগেও ৭৭ জন শিক্ষার্থী ছিল। এখন রয়েছে ৫৫ জন। ঝরে পড়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, শুষ্ক মৌসুমে অনেক শিক্ষার্থী বাবা-মায়ের সঙ্গে এলাকার বাইরে ছয় মাসের জন্য ইটভাটায় কাজ করতে যায়। দারিদ্র্য ও অভিভাবকদের অসচেতনতা শিশুদের ঝরে পড়ার প্রধান কারণ। এলাকার শিশুদের এগিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি ‘গাবুরা শিশু অধিকার ফাউন্ডেশন’ করেছেন বলে জানান।
শ্যামনগরের আরেক প্রসিদ্ধ ইউনিয়ন মুন্সিগঞ্জ। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে যখন সুন্দরবনসংলগ্ন মুন্সিগঞ্জ সেন্টার কালীনগর গ্রামের রাস্তা দিয়ে হাঁটছি তখন দেখা হয়ে গেল স্কুল থেকে ফেরা নিশাত তাসনিম, ইসরাত তাসনিম ও মারিয়ার সঙ্গে। তাদের প্রত্যেকের বয়স ১২ বছরের কাছাকাছি। তারা সাড়ে ৩ কিলোমিটার হেঁটে মুন্সিগঞ্জ বাজারের পাশে কলবাড়ি নেকজানিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়তে আসে। বৃষ্টি হলে বিদ্যালয়ে আসা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়! ইসরাত জানায়, তাদের এক বান্ধবীর ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াকালে বিয়ে হয়ে গেছে। গ্রামে বিশুদ্ধ পানির সংকট আছে বলে তারা জানায়।
বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে শিশুসহ সব নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসাকে মৌলিক মানবিক চাহিদা বা মৌলিক উপকরণ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু জলবায়ুগত সমস্যার কারণে উপকূলের অনেক শিশু এসব মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত।

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।