
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : খুলনার সুন্দরবন সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের তীরে জেগে ওঠা দুবলারচরে এখন চলছে শুঁটকির ভরা মৌসুম। টানা ৬ মাসের জন্য কয়েক হাজার মৎস্যজীবীর পচারণায় মুখর দুলারচরের বিস্তীর্ণ জনপদ। পুরোদমে শুরু হয়েছে সাগর থেকে মাছ ধরে শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে ১০ হাজার জেলে মাছ ধরা ও শুকানোর কাজে নেমে পড়েছে।
টানা ৫ মাস এই চরে কাজ করেন তারা। প্রতি মৌসুমে এই পল্লীতে শত কোটি টাকার বিনিয়োগ হলেও শুঁটকি শিল্পে নেই সরকারি কোনো বড় উদ্যোগ। অস্থায়ী ঘর ও মাচা করতে হয় মহাজন ও জেলেরে উদ্যোগে।
ছয় মাসের বাণিজ্যে মহাজনদের কেউ হচ্ছেন কোটিপতি, আবার কেউ টানাপড়েনে নিঃস্ব হচ্ছেন। বিভিন্ন এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে মহাজনরা দুবলারচরে ব্যবসা করলেও ‘সাহেবরে’ তারা আশীর্বাদ মনে করেন। সাহেবরা বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করে মাথাবিহীন কাঁচা চিংড়িমাছ সংগ্রহ করেন। তারাই মূলত বন বিভাগ থেকে সাগরে জেলেদের মাছ ধরার অনুমতির ব্যবস্থা করে আসছেন যুগ যুগ ধরে। এবারও এই চরে শুটকি প্রক্রিয়াজাতকরনে ১৫ জনের নামে লাইসেন্সের অনুমতি দিয়েছে বন বিভাগ। সেই ঘুরে ফিরে এখনও ফ্যাসিবাদের খলেই রয়ে গেছে দেশের অন্যতম শুটকিপল্লী হিসেবে খ্যাত ‘দুবলার চর’।
এখানে নেই স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, কেউ অসুস্থ হলে ঝড়-জলোচ্ছাস উপেক্ষা করেই মংলা বন্দরে যেতে পাড়ি দিতে হয় ১২০ কিলোমিটার পথ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় এই পল্লীতে স্যুতা কমে গেলেও যুগ যুগ ধরে বড় সাহেব হিসেবে পরিচিত কামাল উদ্দিনের রয়েছে একচ্ছত্র আধিপত্য। তার নিয়ন্ত্রণে অন্তত ১৫ জন সেকেন্ড ইন কমান্ডের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে দুবলারচরের জীবন-জীবিকা। এজন্য মহাজন ও জেলেরা তাদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। অনেকেই তাদের জুলুম-নীপিড়ন সহ্য করলেও নানা শঙ্কায় মুখ খুলতেও সাহস পান না।
জানা গেছে, বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশ অংশের মংলা সমুদ্র বন্দর থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে সুন্দরবনের দক্ষিণে, কটকার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং হিরণ পয়েন্টের ক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত একটি দ্বীপ। এই দ্বীপটির আয়তন ৬৬.৫ কিমি ২। এটি খুলনা বিভাগের বাগেরহাট জেলায় অবস্থিত। দুবলার চর সুন্দরবনের ৪৫ এবং ৮ নম্বর কম্পার্টমেন্টে অবস্থিত। খুলনা শহর বা বাগেরহাট জেলার মোংলা বন্দর থেকে ট্রলার কিংবা লঞ্চযোগে যেতে হয় দুবলার চরে। এটি সুন্দরবনের মধ্যে একটি পর্যটন কেন্দ্রও বটে। তবে মাছ ধরার মৌসুমে এখানে পাঁচ থেকে ছয় মাস বসবাস করেন জেলেরা। আলোরকোল, কোকিলমনি, হলদিখালি, কবরখালি, মাঝেরকিল্লা, অফিসকিল্লা, নারকেলবাড়িয়া, ছোট আমবাড়িয়া, মেহেরআলির চর এবং শ্যালারচর নিয়ে গঠিত দুবলার চর। কুঙ্গা ও মরা পশুর নরে মাঝে এটি একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। দুবলার চর মূলত জেলে গ্রাম হিসেবেই পরিচিত। জোয়ার-ভাটার সঙ্গে জেগে ওঠে আবার সাগরের লোনা জলে তলিয়ে যায় দুবলার চর। মাছ ধরার সঙ্গে চলে শুঁটকি শুকানোর কাজ।
বর্ষা মৌসুমের পর বহু জেলে পাঁচ মাসের জন্য সুদূর কক্সবাজার, চট্টগ্রামসহ, বাগেরহাট, পিরোজপুর, খুলনা, সাতক্ষীরা থেকে ডেরা বেঁধে সাময়িক বসতি গড়েন এখানে। এই দ্বীপটিতে প্রতি বছরের কার্ত্তিক মাসে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের রাসমেলা এবং পুণ্যস্নানের আয়োজন হয়। ধুঁ ধুঁ বালু চরে টেলিটক ছাড়া আর কোনো মোবাইল অপারেটর কোম্পানির নেটওয়ার্কের সংযোগ নেই এখানে। এখান থেকে আহরিত শুঁটকি চট্টগ্রামসহ দেশের পাইকারী বাজারে মজুত ও বিক্রয় করা হয়। সুন্দরবনের পূর্ব বিভাগের সদর প্তর বাগেরহাট থেকে মাছ সংগ্রহের পূর্বানুমতিসাপেক্ষে বহরার ও জেলেরা দুবলার চরে প্রবেশ করেন।
আরও জানা গেছে, শুষ্ক মৌসুমে জেলেরা বঙ্গোপসাগর ও সুন্দরবনের সংলগ্ন নদী থেকে ধরে এনে এই চরে প্রচুর পরিমাণে মাছ শুটকি বানায়। রূপচাঁদা, লইট্যা, ছুরিসহ প্রায় ৮৫ প্রজাতির মাছ এবং বিভিন্ন ধরনের চিংড়ি সুন্দরবনে শুকিয়ে শুটকি প্রক্রিয়াজাত করা হয়। চরে জেলেদের থাকার জন্য বনবিভাগের অনুমতি নিয়ে আলোরকোলে ৮২৫টি, মাঝেরকেল্লায় ৪০টি, নারিকেলবাড়ীয়ায় ৯৫টি এবং শ্যালারচরে ৭৫টি অস্থায়ী জেলেঘর নির্মাণ করেছে। ছন দিয়ে এসব ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া আলোরকোলে ৯০টি দোকান, ৫১টি মাছের ডিপো, মাঝেরকেল্লায় সুইটি দোকান, পাঁচটি মাছের ডিপো, নারিকেলবাড়ীয়ায় সুইটি দোকান, চারটি ডিপো এবং শ্যালারচরে সুইটি দোকান ও চারটি মাছের ডিপো বসানো হয়েছে। সাগরতীরে জেলেদের অস্থায়ী থাকার ঘর, মাছ শুকানোর চাতাল এবং মাচা বানাতে সুন্দরবনের কোনো গাছপালা ব্যবহার না করার জন্য বনবিভাগের নির্দেশনা আছে।
এসব বানাতে জেলেরা গ্রামের গাছপালা সঙ্গে নিয়ে যান সেখানে। সাতক্ষীরা, ফরিদপুর, খুলনা, যশোরসহ বিভিন্ন জেলার মানুষ সেখানে বছরে টানা পাঁচমাস কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এই পাঁচমাসের আয়-রোজগারের টাকায় চলে তাদের সারা বছরের হিসেব। নভেম্বর থেকে শুরু হয়ে মার্চ মাস পর্যন্ত এই পাঁচ মাসের সময়কালে তারা এই-একমাস পর ৪-৭ দিনের জন্য ছুটিতে বাড়িতে পরিবারের কাছে যাওয়ার সুযোগ পান। প্রায় ২ হাজার ট্রলার ও নৌকা নিয়ে এখানে আগত জেলেরা নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত এই পাঁচমাস সাগরে মাছ ধরেন। ধরে আনা মাছ জেলেরা মাচায় শুকিয়ে শুঁটকি করেন। এর ১০-১২ জনের একটি গ্রপ ১০ দিন পর্যন্ত নদীতে থেকে জাল ফেলে কেবল মাছ ধরেন।
অপর একটি গ্রপ ট্রলারযোগে বিভিন্ন জেলের জাল থেকে ধরা মাছ সংগ্রহ করে দুবলার চরে পৌঁছে দেনে। আরেকটি গ্রুপ সেই মাছ ট্রলার থেকে বিভিন্ন ড্রামে তুলে চাতালে আনেন। এরপর চাতালে থাকা আরেকটি গ্রুপ শুটকির জন্য প্রক্রিয়াজাত শুরু করেন। পরে অন্য একটি দল তা শুকানোর জন্য মাটিতে বেছানো নেট বা বাঁশের মাচায় ঝুলিয়ে রাখেন।
বাগেরহাট রামপালের শুঁটকি ব্যবসায়ী ইমরান ফরাজী জানান, তার বাবা কুদ্দুস ফরাজী ৫০ বছর আগে এই চরে শুঁটকি ব্যবসা করেছেন। তার অপর ভাই মুতাচ্ছিন ফরাজীও এই ব্যবসায় জড়িত।
তিনি জানান, এই খাত থেকে সরকার বিপুল অঙ্কের রাজস্ব পেলেও নেই সরকারি কোনো উদ্যোগ বা পৃষ্ঠপোষকতা। তারা এনজিওর থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে এই ব্যবসা করে আসছেন। মূলত সাহেবরা বনবিভাগ থেকে তাদের মাছ ধরার অনুমতির ব্যবস্থা করে থাকেন। তারা কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন জেলে-মহাজনদের কাছে। সাহেবরা-কোনো সুদ না নিলেও বিনিয়োগের বিপরীতে কাঁচা চিংড়ি মাছ নিয়ে থাকেন। চিংড়ি মাছ ধরার পর মাথা কেটে রাখা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুবলার চরের একাধিক জেলে ও মহাজনরা জানান, কামাল উদ্দিন, খুলনার পিন্টু কমিশনার, খোকন, হক, হাকিম বিশ্বাস, জাহিুল সাহেব তাদের এখানে বিনিয়োগ করেন। সাহেবরা বিনিয়োগ করলেও সেই টাকা পর্যাপ্ত না হওয়ায় মহাজনেরা এনজিও থেকে প্রতি লাখে শতকরা ১৪ টাকা হারে সুদে টাকা নেয়। এছাড়া পাঁচমাসের জন্য এক লাখ টাকা নিয়ে বাড়তি ২০ হাজার টাকা সুদ গুনতে হয়। তবে অর্থ বিনিয়োগ ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তার কারণে তারা সাহেবদের আশীর্বাদ মনে করেন। তারা জানান, র্যাব ও কোষ্টগার্ডের তদারকি এবং নজরদারির কারণে দুবলারচরে স্যুতা অনেকটাই কমে গেছে। তবে পুরো দুবলার চর নিয়ন্ত্রণ করেন কামাল উদ্দিন।
তিনি যুগ যুগ ধরে দুবলার চরে একক আধিপত্য বিস্তার করে চলছেন। শেখ হাসিনার আশীর্বাদপুষ্ট আওয়ামী লীগের অনুসারী হয়েও সাধারণ জেলে ও মহাজনদের ওপর ফ্যাসিবাদী ভুমিকায় অবতীর্ণ হন কামাল উদ্দিনসহ তার সেকেন্ড ইন কমান্ড খ্যাত আরও ১৫ জন নেতা। ‘সাহেবদের’ শোষণে তাদের জীবন অতিষ্ট।
দুবলার চরে বসবাসরত ৩০ থেকে ৫০ হাজার জেলের সব কর্মযজ্ঞ ১৫ জন ‘সাহেব’ নিয়ন্ত্রণ করেন। আর এসব সাহেবরে ‘সাহেব’ দুবলার চর ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি কামাল উদ্দিন আহমেদ। জেলেরে অনেকে তাকে ‘বড় সাহেব’ বা ‘কামাল মামা’ বলে ডাকেন। জেলেদের অভিযোগ, মূলত জেলেরা বন বিভাগ থেকে মাছ ধার জন্য লাইসেন্স বা অনুমোতি পত্র পান না। এই লাইসেন্স নিয়ন্ত্রণ করেন এই কামাল উদ্দিনসহ সাহেবরা। কোন জেলে কোথায় মাছ ধরবেন, কার কাছে বিক্রি করবেন, সব কিছুই কামাল সাহেব নিয়ন্ত্রণ করেন। এখানের সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করেন এই কামাল উদ্দিন।
দুবলার চরে চারটি সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে। এর মধ্যে মেহেরআলী সাইক্লোন শেল্টার খল করে কামাল উদ্দিন গড়ে তুলেছেন নিজের সুরম্য প্রাসাদ। মৌসুমের ৫ মাস কামাল উদ্দিন রাজার হালে এখানেই থাকেন এবং চরের সবকিছু নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিজের আখের গোছান। দুবলার চরের আলোরকোলে গড়ে ওঠা নিউ মার্কেট পুরোটাই এককভাবে কামাল উদ্দিনের নিয়ন্ত্রণে থাকে। ৯৬টি দোকানের কেউই ভয়ে কামালের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলতে চান না।
জেলেরা আরও অভিযোগ করেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্র থেকে মাছ ধরি, কিন্তু সাহেবদের যন্ত্রণায় মাছের সঠিক মূল্য পাই না। কামাল উদ্দিন এই চরের মাছ ও শুঁটকির র নিয়ন্ত্রণ করেন। এছাড়া চিংড়ি মাছের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তার হাতেই। অনেক সময় জেলেরা নী বা সমুদ্র থেকে চাকা চিংড়ি ধরেন, কিন্তু সেগুলো কামালের লোকজন নিয়ে যায়। আবার জেলেরা কম মূল্যে কামালের কাছেই চিংড়ি বিক্রি করতে বাধ্য হন। বড় কোনো মাছ জেলেদের জালে ধরা পড়লে সেই মাছও চরে আনা হয় না। জেলেদের নৌকা থেকে কামাল উদ্দিনের লোকজন সেগুলো নিয়ে যায়।
জেলেরা জানান, কামাল উদ্দিন খুবই চতুর ও ভয়ঙ্কর লোক। তার সঙ্গে যারা ব্যবসা করতে গেছেন তারাই নিঃস্ব হয়েছেন। তার আক্রোশের কারণে অনেক জেলে সর্বশান্ত হয়েছেন, অনেক জেলেই দুবলার চরে ঢুকতে পারেন না। কামালের অনুসারীরাই ছয় মাসের বাণিজ্যে কোটিপতি হচ্ছেন। আবার তার বিপরীতে থাকা জেলে বা মহাজনেরা বড় বিনিয়োগ করেও নিঃস্ব হয়ে মৌসুম শেষ করছেন।
জানা গেছে, পিরোজপুরের প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) জিয়া উদ্দিন আহমেদ ১৯৮৪ সালের অক্টোবরে তার ছোট ভাই কামাল উদ্দিন আহমেদ, ভাগ্নে শাহানুর রহমান শামীম ও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে সুন্দরবনের দুবলার চরে আসেন। বনস্যু বাহিনীগুলোর হাতে প্রতিনিয়ত নির্যাতিত সুন্দরবনের জেলেদের সংগঠিত করে শুঁটকি মাছের ব্যবসা শুরু করেন।
২০১৩ সালে পূর্ব সুন্দরবনের চরপুঁটিয়ায় বন্দুকযুদ্ধে জলদস্যু মোর্তজা বাহিনীর চার সদস্য নিহত ও মেজর জিয়া গুলিবিদ্ধ হন। ২০১৭ সালের ২৭ জুলাই অসুস্থ হয়ে মারা যান জিয়া। এরপর কয়েকজন সাহেবকে নিয়ে ভিন্নভাবে দুবলার চরের নিয়ন্ত্রণ নেন কামাল উদ্দিন।
অভিযোগের বিষয় জানতে চাইলে কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি জেলে, বাওয়ালি, মৌয়ালী ও শুঁটকি ব্যবসায়ীদের সার্বিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আসছি। এখানে জেলেরা নিরাপদে এখন মাছ আহরণ করতে পারে। কোনো চাঁদা দিতে হয় না।
বন বিভাগের সূত্র ও মৎস্যজীবীরা জানান, মৌসুমে মাছ ধরার জন্য ১০ হাজার টাকা ফি দিয়ে বন বিভাগ থেকে লাইসেন্স সংগ্রহ করা হয়। ওই লাইসেন্স প্রতিবছর নবায়ন করতে খরচ হয় ৭০০ টাকা। এই মৌসুমে দুবলার চরের স্থানীয় ও আশপাশের লোকরে মধ্যে ১৫ জন মাছ ধরার অনুমতি পেয়েছেন। এরমধ্যে- কামাল উদ্দিন আহমেদ, আফিয়া বেগম, খান শফিউল্লাহ, শেখ মইনুদ্দিন আহমেদ, আরিফ হোসেন, রেজাউল শেখ, এবি এম মুস্তিাকিন, ইদ্রিস আলী, হাকিম বিশ্বাস, জালাল উদ্দিন আহমেদ, সুলতান মাহমুদ, বেলায়েত সরদার, কামরুন নাহার, শাহানুর রহমান এবং আসাদুর রহমান সরদার।
সুন্দরবনের দুবলারচর বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রহ্লা চন্দ্র রায় বলেন, ঘর নির্মাণসহ মাছ প্রক্রিয়াজাতের জন্য ১৫ জনের নামে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। তাদের লোকজন নিয়ে তারাই সব নিয়ন্ত্রণ করে। তবে কোনো বিচ্যুতির বিষয়ে আমাদের কাছে এখনও কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে ।
সুন্দরবন জলদস্যুমুক্ত হলেও শুঁটকিপল্লী হিসেবে খ্যাত দুবলারচর এখনো মুক্ত হয়নি সিন্ডিকেটের কবল থেকে। বিভিন্ন জলদস্যু বাহিনীর প্রধানরা আত্মসমর্পণ করলেও দুবলারচর নিয়ন্ত্রণ করছেন ছয় প্রভাবশালী। তারা নিয়মিত জেলেদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করছেন। জেলেরা চাঁদা দিলেও কোনো প্রতিবাদ করতে পারছেন না। সাগর থেকে মাছ ধরে পল্লীতে নিয়ে আসার পর তাদের কাছেই বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন জেলেরা। তাদের অভিযোগ, প্রশাসনের সঙ্গে আঁতাত করেই ওই সব প্রভাবশালী চলাফেরা করছেন। দস্যুমুক্ত ঘোষণার পর শান্তি ফিরে এলেও এখনো আতঙ্ক কমেনি শুঁটকিপল্লীতে।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, র্যাবের অভিযান ও দস্যুদের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে সুন্দরবনে শান্তি ফিরলেও প্রভাবশালী নিয়ন্ত্রণকারীরা রয়েছে বহাল তবিয়তে। আর এই প্রভাব একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ করছেন কামাল উদ্দিন ওরফে কামাল মামাসহ ছয় প্রভাবশালী। দাদন, জেলেদের নিয়ন্ত্রণ, কাঁচা মাছ ও শুঁটকিপল্লী নিয়ন্ত্রণ, এমনকি সাইক্লোন শেল্টারগুলো নিয়ন্ত্রণ করছেন তারা। জেলেদের কাছে শুধু টিকিট বিক্রি করেই তারা পাঁচ মাসে আড়াই কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী নুরুল করিমএই এই প্রতিবেদককে জানান, শুঁটকি মৌসুমকে কেন্দ্র করে দুবলারচর সরগরম হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন প্রজাতির মাছ আহরণ শেষে তা রোদে শুকিয়ে শুঁটকির প্রক্রিয়া করা হয়। আর মাছের চাহিদা অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমনকি বিদেশেও বাজারজাত করা হচ্ছে। চলতি বছর শুঁটকি মাছ তৈরিতে ৩ কোটি ২২ লাখ টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, গত মৌসুমে শুঁটকি আহরিত হয়েছিল ৪৫ হাজার টন। গত ২৬ অক্টোবর থেকে শুরু হয়ে আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরপাড়ের দুবলা, মেহের আলীর, আলোরকোল, অফিস কিল্লা, মাঝের কিল্লা, শেলার চর, নারকেলবাড়িয়া, ছোট আমবাড়িয়া, বড় আমবাড়িয়া, মানিকখালী, কবরখালী, চাপড়াখালী, কোকিলমনি ও হলদাখালীর চরে জেলেরা শুঁটকি করবেন। এ কারণে তাদের বন বিভাগ থেকে পাস পারমিট দেওয়া হয়েছে। জেলেদের জন্য ৯৮৫টি ঘর ও ৬৬টি ডিপো তৈরির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এসব ঘর বা ডিপোতে ওঠা প্রতি কুইন্টাল রূপচাঁদা ও লাক্ষা মাছের শুঁটকি থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং অন্য সাধারণ মাছের শুঁটকি থেকে প্রতি কুইন্টাল ৫০০ টাকা রেভিনিউ (রাজস্ব) আদায় করা হবে। জেলেরা সাধারণত লইট্টা, ছুরি, খলিসা, ভেদা, চিংড়ি, ইছা ও রূপচাঁদা মাছ আহরণ করেন।
সরেজমিন ঘুরে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুন্দরবনের দক্ষিণে পশুর নদীর পূর্বদিকে দুবলারচর। আলোরকোল, খেজুরতলা, জামতলা, মাঝেরকেল্লা, অফিসকেল্লা, শেলারচর, নারকেলবাড়িয়া প্রতিটি আলাদা চর। এই সব কটি মিলেই হচ্ছে দুবলারচর। সবচেয়ে বড় চর হলো আলোরকোল। প্রতিবছর শতকোটি টাকার কাঁচা মাছ ও শুঁটকি বিক্রি হয়। তবে এই টাকার সিংহভাগই নিয়ন্ত্রকদের কাছে চলে যায়। বন বিভাগ থেকে জেলেরা লিজ আনার পরও ওই সব প্রভাবশালীর কাছ থেকে মাছ ধরার টিকিট হিসেবে ১০ হাজার টাকা দিতে হয় জেলেদের। নবায়ন করার নামে নেওয়া হয় ৭০০ টাকা। প্রতি বছর জেলেরা সুন্দরবনের দুবলারসহ পাঁচটি চরে মাছ আহরণের উদ্দেশ্যে আসেন। প্রত্যেক জেলেকে দাদন বা ঋণ দেওয়া হয়। প্রথমে ব্যবসায়ীদের ৩ লাখ টাকা করে দেওয়া হয়। এরপর ওই ব্যবসায়ী আরও টাকা চাইলে তা সুদ হিসেবে দেওয়া হয়। পাঁচ মাসে প্রতি লাখে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা সুদ নেওয়া হয়। দুর্যোগ বা কোনো কারণে টাকা দিতে বিলম্ব হলে চক্রবৃদ্ধি হারে এই সুদের টাকা বাড়তে থাকে। শুধু তা-ই নয়, জেলেদের কে ঋণ দেবে, ঋণের সুদ কত হবে, দাদন দেবেন কে এসবও নিয়ন্ত্রণে প্রত্যক্ষ থাকেন প্রভাবশালীরা। তারা যেভাবে কলকাঠি নাড়েন দুবলারচর ঠিক সেভাবেই চলে। তাদের ওপরে কেউ কোনো কথা বলতে পারেন না। যদি বলে ফেলেন, তবেই বিপদ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জেলে এই প্রতিবেদককে বলেন, দুবলারচর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করেন কামাল উদ্দিন ওরফ কামাল মামা, শেখ মাইনুদ্দিন আহমেদ, বেলায়েত সরদার, কামরুন নাহার, আসাদুর রহমান সরদার ও শাহানুর রহমান। তাদের নিয়ন্ত্রণে আছে অন্তত দেড় শতাধিক সদস্য। তারা খুবই প্রভাবশালী। তারা বিশাল সিন্ডিকেট তৈরি করে রেখেছেন। সিন্ডিকেটের বাইরে কেউ কাঁচা মাছ বা শুঁটকি বিক্রি করতে পারেন না। ব্যাংক বা এনজিও থেকে ঋণ নিতে হলেও তাদের সঙ্গে আঁতাত করে নিতে হয়। তারা আরও বলেন, প্রতি বছর পাঁচ মাসের জন্য (নভেম্বর থেকে মার্চ) বন বিভাগ মাছ প্রজননের জন্য জায়গা লিজ দিয়ে থাকে। এই পাঁচ মাস স্ত্রী-সন্তান ফেলে এই চরে বসবাস করেন প্রায় ত্রিশ হাজার বাসিন্দা। নারীশূন্য দুবলারচরে অসুস্থ হয়ে পড়লেও কোনো সুচিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। গ্রাম্য চিকিৎসকরা চিকিৎসা দিলেও ঠিক সময়ে পাওয়া যায় না তাদের। নেই বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা। স্বাস্থ্যবিধিরও কোনো ব্যবস্থা নেই। কোনো জেলে কথা না শুনলে সিন্ডিকেটের সদস্যরা নানাভাবে হুমকি দিয়ে চর থেকে বের করে দেন। প্রতি বছর মাছ ধরতে গিয়ে অনেকে প্রাণ হারাচ্ছেন।
দুবলারচরের আরও কয়েকজন জেলে জানান, এখানে যারা বসবাস করেন, তারা সবাই জেলে বা শুঁটকির কারবারি। দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে এসে এখানে অস্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেছেন। প্রতি বছরই তারা আসেন। নির্দিষ্ট সময় পর তারা স্থায়ী ঠিকানায় চলে যান। এসব মানুষের জন্য এই চরে চিকিৎসার সুব্যবস্থা নেই। কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই রোগী মারা যান। তাদের জন্য চারটি সাইক্লোন শেল্টার আছে। সবগুলো শেল্টারই কামাল উদ্দিনসহ অন্যদের দখলে আছে।
ছয় প্রভাবশালীর মধ্যে শীর্ষে কামাল উদ্দিন : ১৯৮৪ সালের অক্টোবরে মেজর জিয়া উদ্দিন আহমেদের ছোট ভাই কামাল উদ্দিন আহমেদ ভাগ্নে শাহানুর রহমান শামীম ও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে চলে যান সুন্দরবনের দুবলারচরে। বনদস্যু বাহিনীগুলোর হাতে প্রতিনিয়ত নির্যাতিত সুন্দরবনের জেলেদের সংগঠিত করে শুঁটকি মাছের ব্যবসা শুরু করেন। সর্বশেষ মর্তুজা বাহিনীর সদস্যরা পূর্ব সুন্দরবনের হারবাড়ীয়া ও মেহেরালীর চর এলাকার মাঝামাঝি চরপুঁটিয়ায় মেজর জিয়াকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। বন্দুকযুদ্ধে মর্তুজা বাহিনীর চার সদস্য নিহত ও মেজর জিয়া গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এরপর থেকেই দুবলারচরসহ পুরো সুন্দরবন নিয়ন্ত্রণে নেন কামাল উদ্দিন। সুন্দরবন জলদস্যুদের থেকে রক্ষা পেলেও এখনো একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ করছেন তিনি।
জানতে চাইলে কামাল উদ্দিন এই প্রতিবেদককে।বলেন, জেলেদের অভিযোগ সম্পূর্ন মিথ্যা ও বানোয়াট। জেলে, বাওয়ালি, মৌয়ালি ও শুঁটকি ব্যবসায়ীদের সার্বিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আসছি। যখন যার যা প্রয়োজন তা দিয়ে আসছি। জেলেরা নিরাপদে মাছ আহরণ করতে পারে। কোনো চাঁদা দিতে হয় না। শান্তিতে তারা নদী, খালে মাছ ধরতে পারেন। সবকিছুই তার জন্যই সম্ভব হয়েছে। তবে অন্য প্রভাবশালীদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
মোবাইল ফোনের বিড়ম্বনা: দুবলারচর থেকে আহরিত শুঁটকি চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জের পাইকারি বাজারে মজুদ ও বিক্রি করা হয় বেশি। জেলেরা মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কাঁচা মাছ ও শুঁটকির দরদাম ঠিক করতে পারেন। সুন্দরবনে টেলিটক নেটওয়ার্কের গুরুত্ব অনেক বেশি হলেও প্রায় সময় এর বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে জেলেদের। হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয় নেটওয়ার্ক। ঠিক তখনই বিপাকে পড়েন তারা। এর কারণ মাছের সঠিক দরদাম না পেয়ে কম দরেই সিন্ডিকেটের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হন তারা। জেলেরা জানান, তারা যাতে মাছের সঠিক দর জানতে না পারেন, সে জন্য অনেক সময় এই নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেওয়া হয়। দুবলারচর নিয়ন্ত্রণে থাকা সাহেবরা এর সঙ্গে জড়িত। কারণ জেলেরা বাজারদর না জানতে পারলে সাহেব-মহাজনরা কম মূল্যে মাছ কিনে নিতে পারেন। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কামাল উদ্দিন বলেন, ‘একটি টাওয়ারের জেনারেটর। তেল শেষ হয়ে গেলে নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণেই চরে টেলিটকের নেটওয়ার্ক নেই। খুলনা থেকে তেল আসার পর তা আবার চালু করা হয়।’
মৌসুমের শুরুতেই সুন্দরবনের শুঁটকির আবাসভূমি তথা দুবলার চরে ব্যস্ততা বেড়েছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সাগরজলের নিঃস্তব্ধতা ভেঙ্গে ভেসে আসে উদাস কণ্ঠের সুর। কখন বা অক্ষেপ আবার কখন আনন্দ ঝরে পড়ে সুর মুর্ছনায়। শুঁটকি শ্রমিকরা নিজেদের ক্লান্তি ভুলে যেতে সন্ধ্যা নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে নানা গানের সুর ভেসে আসে।
চারিদিকে অথৈ জলরাশি। তারই মাঝখানে দুবলার চর। এই দুবলার চরেই পাঁচমাসের ঘরবসতি পেতে বসেছে শুঁটকি শুটকি শ্রমিকেরা। বিভিন্ন জায়গা থেকে এসব শ্রমিকেরা কাজের সন্ধ্যা দুবলার চরে কাজ করতে আসেন। এই দুবলার চরে ভীড় করতে শুরু করেছেন জেলে, মহাজন ও শ্রমিকরা।
ভোরের কুয়াশা ভেদ করে শ্রমিকের কর্মব্যস্ততায় মুখরিত হয়ে ওঠে দুবলার চর। তাদের কেউ ঘর বাঁধছেন, আবার কেউ কেউ মৎস্য আহরণে নেমে পড়েছেন সাগরে। কেউ কেউ মাছ নিয়ে চরে ফিরেছেন। কেউ বা সেগুলো বাছাইয়ের পর মাচায় শুকাতেও দিচ্ছেন।
দীর্ঘ পাঁচ মাস এমনি চিত্রকল্পে সরগরম থাকবে দুবলার চর। দুবলার চরের শুঁটকি পল্লী ঘিরে সংক্ষিপ্ত জীবনের নানা গল্পগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে। স্বজন রেখে পেটের দায়ে মহাজনের ডাকে সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের ফণাকে অবলিলা সামাল দিয়ে জাল নিয়ে নোনা জলে নামে মৎস্য আহরণে। তাদের অনেকেই স্বজনদের দুঃখকে বুকে চেপে পাঁচটি মাস কাটিয়ে দেবে।
এই পাঁচ ঘিরে দুবলার চরের শুঁটকি নগরী তথা পল্লীতে বহু সুখ-দুঃখের স্বপ্নরা ঘুরে ফিরে। এখানে ঘুমড়ে কেদে ওঠা অনেক মনের খবরের হয়তো স্বাক্ষী কেবল সাগরের অর্থৈ জলরাশি! উদার আকাশে মিলিয়ে যায় অনেকের দীর্ঘ শ্বাস।
এর আগে উপকূলের জেলেরা শুঁটকি মৌসুম ঘিরে নিজ নিজ এলাকায় জাল, নৌকা মেরামত ও সব ধরনের সরঞ্জাম প্রস্তুত করেন। এরপর বিভিন্ন এলাকার জেলে ও শ্রমিকরা দুবলার উদ্দেশ্যে জড়ো হন মোংলায়। বৃহস্পতিবার দিনগত গভীর রাতে বনবিভাগের পাস নিয়ে চরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন তারা।
সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের বিভাগীয় বনকর্মকর্তা কাজে রেজাউল করিম এই প্রতিবেদককে বলেন, বঙ্গোপসাগর পাড়ে সুন্দরবনের দুবলার চরে শুরু হয়েছে শুঁটকি মৌসুম। চলবে ৩১ মার্চ পর্যন্ত। টানা পাঁচ মাস সেখানে থাকতে হবে হাজারো জেলে ও শ্রমিককে। সাগরপাড়ের এ চরে তাদের থাকতে অস্থায়ী ঘর, মাছ শুকানোর চাতাল ও মাচা তৈরি করা হচ্ছে।
স্থাপনা নির্মাণে সুন্দরবনের কোনো গাছপালা ব্যবহার করা যাবে না। তাই বনবিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী দুবলার চরে যাওয়া জেলেরা সঙ্গেই নিয়ে যাচ্ছেন প্রয়োজনীয় সামগ্রী। আলোরকোল অস্থায়ী ক্যাম্প ও দুবলা জেলে পল্লী টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দিলীপ মজুমদার ভাষায় উপকূলের বিভিন্ন এলাকার জেলেরা গভীর রাতে রওনা হয়ে ভোরে পৌঁছান দুবলার চরে। তারা চরে ঘর বাঁধতে শুরু করেছেন। জেলেদের থাকার ঘর বাঁধতে সময় লাগবে দু-তিনদিন।
এদিকে ভোরে চরে এসেই ঘর, মাঁচা ও চাতাল তৈরিসহ অন্যান্য জিনিসপত্র নামিয়ে রেখে জাল এবং নৌকা নিয়ে সাগরে মাছ ধরতে নেমেছেন জেলেরা। ভোরের প্রথম খেপের মাছও দুপুরে চলে এসেছে চরে। চরে সেই মাছ বাছাই করে শুকাতেও দিয়েছেন জেলেরা।
পাখির চোখে দেখা এই দৃশ্য দুবলার চরের। বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের শেষ সীমায় বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষা এই চরে গড়ে উঠেছে শুটকি পল্লী।
ঐতিহ্যবাহী রাস উৎসবের পাশাপাশি এই চরের খ্যাতি দেশের সবচেয়ে বড় শুটকির বাজার হিসেবেও। এখান থেকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার শুটকি যায় সারাদেশে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলেরা প্রতি বছর অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত অর্থাৎ ছয় মাস এখানে ব্যবসার অনুমতি পান। এই চরে কাজ করেন ৩৫ হাজারের বেশি মানুষ।
সুন্দরবনের পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের দুবলার চরের মূলত আলোরকোল, মাঝেরকেল্লা, নারকেল বাড়ীয়া, শেলারচর ও মেহেরআলীর চরে হয় মাছ শুকানোর কাজ।
যেসব জেলেদের তিন থেকে পাঁচটি নিজস্ব মাছ ধরার ট্রলার আছে তাদেরকে ডাকা হয় ‘মহাজন’ বলে। যাদের ট্রলারের সংখ্যা আরও বেশি তাদেরকে ডাকা হয় ‘বহরদার’। শুটকির কাজে নিযুক্ত জেলেরা এসব ‘মহাজন’ ও ‘বহরদার’দের হয়ে কাজ করেন।
সাগর থেকে মাছ ধরে এনে রাখা হচ্ছে বাছাইয়ের জন্য।
কয়েকজন ‘বহরদার’ ও ‘মহাজন’র সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে—সাধারণত লইট্টা, তেলফ্যাসা, ছুরি, বৈরাগী, চাকা চিংড়ি, রূপচাঁদা শুঁটকি করা হয়। কাঁচা মাছ শুকাতে সময় লাগে তিন থেকে পাঁচ দিন। পাইকারদের কাছে গড়ে প্রতি কেজি শুটকি বিক্রি করা হয় ৫০০-৫৫০ টাকায়। এখান থেকেই পাইকাররা শুঁটকি কিনে নিয়ে যান।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়—কয়েক হাজার শ্রমিক শুঁটকি পল্লীতে কাজ করছেন। কেউ রোদে মাছ শুকাচ্ছেন, কেউ আবার ট্রলার নিয়ে সাগরে যাচ্ছেন মাছ ধরতে।
জেলেরা মাছ নিয়ে এসেই শুরু করেন বাছাইয়ের কাজ। প্রজাতি অনুযায়ী মাছ আলাদা করা হয়। এরপর নানান প্রক্রিয়া শেষে শুকাতে দেন সেসব মাছ।
জেলে মিরাজ শেখ এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘সাধারণত তেলা, ফ্যাইসাসহ অন্যান্য ছোট মাছ চাতালে ও লম্বাটে লইট্টা, ছুরি মাছগুলোকে বাঁশের আড়ায় ঝুলিয়ে শুকাতে দেওয়া হয়।’
প্রায় ৩০ বছর ধরে এই চরে মহাজনের কাজ করা ইসমাইল হোসেন ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এখান থেকে শুঁটকি নেওয়ার জন্য ১০-১২টি পরিবহন ব্যবস্থা আছে। তারা রংপুর, সৈয়দপুর, চট্টগ্রাম ও ঢাকায় শুঁটকি পাঠিয়ে দেয়। দেশের শুঁটকির বড় অংশ যায় দুবলার চর থেকে।’
আলাদাভাবে শুকানো হচ্ছে নানান প্রজাতির মাছ।
তার মতে, সরকারিভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হলে এই চরের শুঁটকি রপ্তানি করে প্রতি বছর হাজার হাজার ডলার আয় করা যেত।