
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সুনীল অর্থনীতি (ব্লু ইকোনমি) পৃথিবীব্যাপী একটি প্রতিষ্ঠিত বিষয়। বর্তমান পৃথিবীর ৮৮ ট্রিলিয়ন ডলারের যে অর্থনীতি, এর মধ্যে ২৪ ট্রিলিয়ন হচ্ছে সমুদ্র অঞ্চলভিত্তিক এই সুনীল অর্থনীতির অবদান। যদিও আমাদের জাতীয় অর্থনীতির ক্ষেত্রে এর অবদান উল্লেখ করার মতো নয়। আমরা এ ক্ষেত্রে এখনো তেমন অগ্রসর হতে পারিনি।
সুনীল অর্থনীতির হাতছানিতে আমরা যখন নিজেদের সমুদ্র অঞ্চলের দিকে তাকালাম, তখন দেখা গেল, দুই নিকট প্রতিবেশী আমাদের বেশ খানিকটা কোণঠাসা করে রেখেছে। ফলে আমাদের সুনীল অর্থনীতির ক্ষেত্র যথেষ্ট সংকুচিত এবং সেখানে আমাদের কার্যক্ষেত্রের সম্প্রসারণ করা বেশ জটিল। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতের দ্বারস্থ হয়ে আমাদের সেই প্রতিবন্ধকতা দূর করা গেছে। ২০১২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে এবং ২০১৪ সালের ৭ জুলাই (এখন থেকে ঠিক ১০ বছর আগে) ভারতের সঙ্গে আমাদের সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধের মীমাংসা হয়েছিল।
ফলে তখন আমাদের সামনে খুলে গেল এক নতুন উন্মুক্ত দিগন্ত। ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র অঞ্চলে আমাদের সার্বভৌমত্বের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জিত হলো। তটরেখা থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন এবং ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত কন্টিনেন্টাল শেলফ হিসেবে আমাদের বিচরণক্ষেত্র সম্প্রসারিত হলো। কিন্তু এক দশকে আমরা তেমন আর কিছুই করতে পারিনি। যেটুকু পারা যেত, তা-ও আমরা করিনি।
অনেকের ধারণা, সুনীল অর্থনীতি মানে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও আহরণ। কিন্তু আসলে তা নয়। ২০১৯ সালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে সুনীল অর্থনীতির অন্তর্ভুক্ত হিসেবে ২৫টি ক্ষেত্র উল্লেখ করা হয়েছে। তেল-গ্যাস আহরণ অবশ্যই এর অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র।
এ ছাড়া রয়েছে মৎস্য ও খনিজ সম্পদ আহরণ, সমুদ্রভিত্তিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, পর্যটন, সমুদ্রের সংরক্ষিত এলাকা (মেরিন প্রোটেক্টেড এরিয়া) রক্ষণাবেক্ষণ, ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সংরক্ষণ, সমুদ্রের ইকোসিস্টেম সংরক্ষণ ও দূষণ রোধ, সমুদ্র এবং উপকূলীয় এলাকার ইকোসিস্টেমের টেকসই ব্যবস্থাপনা, সমুদ্র সম্পদের ওপর উপকূলীয় জনগণের নির্ভরতা প্রভৃতি। এর কোনো একটি ক্ষেত্রেও এখন পর্যন্ত আমরা দৃশ্যমান কিছু করে উঠতে পারিনি। অথচ বঙ্গোপসাগরকে বলা হয় প্রাকৃতিক সম্পদের বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ও সমৃদ্ধ ভান্ডার।
যদি তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কথা ধরি, ১০ বছরে আমাদের সমুদ্রসীমার সন্নিহিত এলাকায় মিয়ানমার ও ভারত উভয় দেশই বড় আকারের গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে। বিশেষজ্ঞ ভূতত্ত্ববিদদের অভিমত, এই গ্যাসক্ষেত্রগুলোর ভূগর্ভস্থ স্ট্রাকচার বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় সম্প্রসারিত। কাজেই ওই সব অঞ্চলে অনুসন্ধান করলে বাংলাদেশও বিপুল পরিমাণ গ্যাসের আধার পেতে পারে। এ ছাড়া বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ সমুদ্র অঞ্চলজুড়ে আরও অনেক গ্যাস ক্ষেত্র পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
কিন্তু আমরা এখন পর্যন্ত আমাদের সমুদ্র অঞ্চলে ২৬টি ব্লক চিহ্নিত করা ছাড়া তেল-গ্যাস অনুসন্ধান বলতে গেলে শুরুই করতে পারিনি। অবশ্য পেট্রোবাংলা এ ক্ষেত্রে বিদেশি কোম্পানি এবং তাদের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য নতুন উৎপাদন অংশীদারি চুক্তিপত্র (পিএসসি) প্রণয়ন করে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে। আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই দরপত্রে অংশগ্রহণের সময় রয়েছে।
এরপর তা যাচাই-বাছাই শেষে যদি এ বছরের মধ্যে কোনো এক বা একাধিক কোম্পানির সঙ্গে পিএসসি সই করা সম্ভবও হয়, তাহলেও তার ফল পাওয়া শুরু হতে অন্তত পাঁচ বছর সময় লাগবে; অর্থাৎ ২০৩০ সালের আগে এ খাতে কোনো কিছু অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে সমুদ্রের বায়ু ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ বায়ুবিদ্যুৎ এবং বিশাল সমুদ্রতট ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন অল্প সময়ের মধ্যেই করা সম্ভব।
এরপর বলা যায়, মৎস্য সম্পদের কথা। আমাদের সমুদ্র অঞ্চলে আমরা খুবই সীমিত পরিমাণে মৎস্য আহরণ করতে পারছি। কারণ, সক্ষমতার অভাব। বিশেষজ্ঞদের মতে, বঙ্গোপসাগরে মাছ আছে প্রায় ৫০০ প্রজাতির। এ ছাড়া রয়েছে শামুক, ঝিনুক, কাঁকড়া, শেলফিশ, হাঙর, অক্টোপাস প্রভৃতি। বিস্তীর্ণ সমুদ্র অঞ্চলজুড়ে এই মৎস্য সম্পদের বিচরণ। এখান থেকে বছরে ৮ মিলিয়ন বা ৮০ লাখ টন মাছ আহরণ করা সম্ভব। কিন্তু আমরা আহরণ করছি ৭ লাখ টন। কারণ গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণের জন্য প্রয়োজনীয় জাহাজ এবং অন্যান্য সরঞ্জাম আমাদের নেই। থাকলে এই মৎস্য সম্পদই জাতীয় অর্থনীতিতে অনেক বড় অবদান রাখতে পারত।
বালুকাবেলাসহ আমাদের সমুদ্র অঞ্চলে রয়েছে নানা সম্পদ এবং প্রতিনিয়ত পলির সঙ্গে এসে জমা হচ্ছে ১৩ ধরনের মূল্যবান ভারী খনিজ (হেভি মিনারেল)। এর মধ্যে রয়েছে ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম, ইলমেনাইট, গার্নেট, জিরকন, রেটাইল, ম্যাগনেটাইল প্রভৃতি। এসব খনিজ স্বর্ণের চেয়েও দামি। অথচ আমরা এগুলো আহরণ করতে পারছি না। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, এসব খনিজ আহরণের বিষয়ে বিদেশি অনেক প্রতিষ্ঠানও আগ্রহী। আমরা সেই সুযোগও কাজে লাগাচ্ছি না।
আমাদের আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য সমুদ্রপথেই পরিচালিত হয়। সমুদ্রপথ ব্যবহার করে নিজেদের ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের বড় ধরনের সম্প্রসারণ ঘটানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া চোখের সামনে উজ্জ্বল উদাহরণ। অবশ্য আমাদের বন্দরের সীমাবদ্ধতা এ ক্ষেত্রে প্রধান বাধা। এই বাধা অতিক্রম করার জন্য কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে যে গভীর সমুদ্রবন্দর গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সে কাজেও অগ্রগতি নগণ্য। বঙ্গোপসাগরে আমাদের সমুদ্র অঞ্চলে রয়েছে ছোট-বড় ৭৫টি দ্বীপ। এই দ্বীপগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে সমুদ্রকেন্দ্রিক পর্যটন। খুব দ্রুতই যে এটা করা সম্ভব তা নয়। তবে উদ্যোগ নেওয়া দরকার, যার অভাব রয়েছে।
২০১৭ সালের জানুয়ারিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানিও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে গঠন করা হয়েছিল ‘ব্লু ইকোনমি সেল’। কিন্তু এখন পর্যন্ত এটি একেবারেই একটি নামমাত্র সংস্থা। এর কোনো কাজ এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়; বরং পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। এ ছাড়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিট’ সম্প্রতি প্রকাশ করেছে ‘ব্লু ইকোনমি ডেভেলপমেন্ট ওয়ার্ক প্ল্যান’। তাতে মোট ৫৬টি অ্যাকশন পয়েন্ট সন্নিবেশিত হয়েছে। আমরা আশা করব, এই পরিকল্পনা অনুযায়ী সুনীল অর্থনীতির কর্মকাণ্ড বিকশিত হবে।
আর শেষ কথা হলো, ২০৪১ সালে যদি বাংলাদেশকে উন্নত দেশ হতে হয়, তাহলে সুনীল অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য দরকার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা অর্জন করা এবং লাগসই প্রযুক্তির ব্যবহার। তবে সরকারের একার পক্ষে বা শুধু সরকারের উদ্যোগে এটা সম্ভব হবে না। কারণ এ কাজে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ দরকার। তাই যুক্ত করতে হবে বেসরকারি খাতকে। বেসরকারি খাতের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও আইনি কাঠামো তৈরি করা দরকার হবে।
বিনিয়োগের ব্যাপারেও এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ লক্ষ করা যায় না। অবশ্য ‘মুজিব ক্লাইমেট প্রোস্পারিটি প্ল্যান ২০২২-৪১’-এ ‘ব্লু বন্ড’ ইস্যু করার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ‘গ্রিন বন্ড পলিসি’ নামে একটি নীতিমালা প্রকাশ করেছে। কিন্তু এসবের ভিত্তিতে কী পরিমাণ অর্থ সুনীল অর্থনীতির বিকাশে বরাদ্দ বা ব্যয় করা হচ্ছে, তার একটি ঠিকঠাক হিসাব প্রকাশ করা জরুরি।
ইকোনোমি বলতে সমুদ্র ভিত্তিক অর্থনীতিকে বোঝায়। ব্লু ইকোনোমি একটি অর্থনৈতিক শব্দ, যাতে একটি দেশের সামুদ্রিক পরিবেশকে এবং সামুদ্রিক পরিবেশের সুষ্ঠু ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে আলোচনা করা হয়।
মূলত ব্লু ইকোনমি হলো গ্রিন ইকোনোমির সম্প্রসারিত আরেকটি রূপ। ইকোনমিক অঞ্চল একটি দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্য নিশ্চিত করে। বিশ্ব ব্যাংকের মতে ‘ব্লু ইকনোমি একটি ধারণা, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং জীবিকার সংরক্ষণকে উন্নীত করতে চায় এবং একই সাথে সমুদ্র ও উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশগত স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে।’
১৯৯৪ সালে বেলজিয়ামের অধ্যাপক গুন্টার পাউলি সর্বপ্রথম ব্লু ইকোনমি র ধারণা দেন। জাতিসংঘ ব্লু ইকোনোমিকে মহাসাগর সমুদ্র ও উপকূলীয় অঞ্চলের সাথে সম্পর্কিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি পরিসর হিসেবে উল্লেখ করে।
ব্লু ইকোনমি বা সমুদ্র অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল বিষয় হলো- টেকসই মাছ ধরা, সমুদ্র স্বাস্থ্য, বন্যপ্রাণী এবং দূষণ বন্ধ করা। ২০১৫ সালে জাতিসংঘের সকল সদস্য রাষ্ট্র টেকসই তার উপর একটি উন্নয়ন নীতি গ্রহণ করে, যা ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (SDG, Sustainable Development Goals) কেন্দ্রিক।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (SDG) এর ১৪ নম্বর লক্ষ্যে লাইফ বিলো ওয়াটার অর্থাৎ টেকসই উন্নয়নের জন্য মহাসাগর, সমুদ্র এবং সামুদ্রিক সম্পদের সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহারের বিষয়ে এবং সমুদ্রের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার দাবী জানায়।
প্রতিনিয়ত পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। আর এ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার জন্য ২০১৫ সালে প্যারিসে একটি চুক্তি করা হয়েছিল। যাতে আমাদের সবুজমনা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেতৃত্বমূলক ভূমিকা রেখেছিলেন।
সেদিন তিনি সেখানে বলেছিলেন, ‘সুনীল অর্থনীতিকে সামনে রেখে সমুদ্রে অব্যবহৃত ও এর তলদেশে অউন্মোচিত সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে এই অঞ্চলে যার যার টেকসই উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে আরো ত্বরান্বিত করার সুযোগ রয়েছে।’
তিনি আরো বলেছেন, ‘শান্তি, নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের মধ্যে এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। খেয়াল রাখতে হবে, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে গিয়ে যেন সমুদ্রের সুস্থ পরিবেশ বিঘ্নিত না হয়। তাই আমাদের সুনীল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি সুনীল চিন্তাও করতে হবে এবং সে লক্ষ্যে সমন্বিত লাভজনক ও সর্বোপরি সমুদ্র সংরক্ষণমূলক নীতি নির্ধারণ ও সে অনুযায়ী কর্মকান্ড পরিচালনা করতে হবে।’
একই সঙ্গে তিনি এই আশার বাণী উচ্চারণ করেন যে, ‘২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ৯ বিলিয়ন মানুষের জীবন ধারণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে এই সুনীল অর্থনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।’
সমুদ্র জয়ের পর বেশ কয়েক বছর কেটে গেছে। এটা ঠিক যে, বিশাল সমুদ্রসীমা জয়ের ফলে বাংলাদেশের সামনে জাহাজ নির্মাণ শিল্প ও বন্দর সুবিধা বৃদ্ধি, মৎস্য ও জলজ সম্পদসহ সমুদ্রতলদেশে থাকা প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ এবং পর্যটন ব্যবসা সম্প্রসারণ ইত্যাদি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আমাদের যতটা জানা তার চেয়ে বেশি অজানা বিশাল সম্পদের আধার সমুদ্র।
বাংলাদেশের সমুদ্র সীমানার মধ্যে শুধু বিপুল মৎস্য ভান্ডার নয়,রয়েছে অফুরন্ত প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের ভান্ডারও। বিশেষ গঠন-প্রকৃতির কারণেই তেল-গ্যাস সহ নানা খনিজ সম্পদ সঞ্চিত রয়েছে আমাদের সাগরের তলদেশে।
বাংলাদেশের সমুদ্র নিয়ে গবেষণা করা বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেভ আওয়ার সি’র তথ্য অনুযায়ী, সমুদ্র থেকে মাছ ধরেই শুধু বিদেশে রপ্তানি করে বিলিয়ন বিলিয়ন অর্থ আয় করা সম্ভব। ‘সেভ আওয়ার সি’ এর সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ আনোয়ারুল হকের মতে, ‘সমুদ্রসম্পদকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটে যেতে পারে।’ তার মতে, শুধু সামুদ্রিক মাছ ও শৈবাল রপ্তানি করে বাংলাদেশ বছরে এক বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ আয় করতে পারে।’
ব্লু ইকোনোমি বা সমুদ্র অর্থনীতি ক্রমশ জনসাধারণের কাছে পরিচিত হচ্ছে। আমাদের দেশের সমুদ্র গভীরে রয়েছে অগণিত সম্পদের। বঙ্গোপসাগরের সমুদ্র সম্পদের ব্যবহার বাংলাদেশকে যেমন দিতে পারে আগামী দিনের জ্বালানি নিরাপত্তা, ঠিক তেমনি বদলে দিতে পারে সামগ্রিক অর্থনীতির চেহারাও। এমনকি দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে সামুদ্রিক খাদ্যপণ্য রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করাও সম্ভব।
বঙ্গোপসাগর থেকে প্রতিবছর প্রায় ৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন মাছ ধরা যেতে পারলেও আমরা মাত্র ০.৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন মাছ ধরতে পারছি (কালের কন্ঠ, ১লা জুন ২০১৭)। মূলত উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারলে মাছ আহরণ বাড়বে। এছাড়াও বঙ্গোপসাগরে ভারি খনিজের সন্ধান পাওয়া গেছে। ভারি খনিজের মধ্যে রয়েছে ইলমেনাইট, টাইটেনিয়াম অক্সাইড, জিরকন ইত্যাদি। যা অত্যন্ত মূল্যবান।
এসব মূল্যবান সম্পদ ঠিকভাবে উত্তোলন করতে পারলে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারবে বাংলাদেশ। তাছাড়াও বাংলাদেশে রয়েছে ব্যাপক পর্যটন স্থান। উপকূলীয় পর্যটন থেকে বিশ্বের জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন)’র ৫% আসে এবং বিশ্বের ৬-৭% মানুষের কর্মস্থান এই খাতে থেকে হয়। বাংলাদেশে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বালুময় সমুদ্র সৈকত (১২০কি.মি. দৈর্ঘ্য)।
যা কক্সবাজার নামে পরিচিত। এক্ষেত্রে কক্সবাজারের উপকূল অঞ্চলে পর্যাপ্ত বিনোদন ও মনোরম পরিবেশের ব্যবস্থা করে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারে। মূলত সমুদ্রকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নই হলো বাংলাদেশের ব্লু ইকোনমি।
পৃথিবীতে যে কোনো কাজই সহজে করা যায় না। সকল কাজেরই থাকে বিভিন্ন অসুবিধা ও চ্যালেঞ্জ। সে সকল অসুবিধা ও চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবেলা করেই সামনে এগিয়ে যাওয়া লাগে। ঠিক তেমনি বিশ্বের দরবারে তালে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে ব্লু ইকোনমির উন্নয়নে রয়েছে ব্যাপক চ্যালেঞ্জ।
চ্যালেঞ্জগুলো হলো
পর্যাপ্ত নীতিমালার ও সঠিক কর্ম পরিকল্পনার অভাব, দক্ষ জনশক্তির অভাব, ব্লু ইকোনমি সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক যোগাযোগের অভাব, প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব, মেরিন রিসোর্সভিত্তিক পর্যাপ্ত গবেষণা না হওয়া।
এ সকল চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে পারলেই বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে ব্লু ইকোনমিতে সার্থক দেশ হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে। বঙ্গোপসাগরে বিস্তৃত একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চলে সামুদ্রিক সম্পদ আহরণে বাংলাদেশের রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা।
বঙ্গোপসাগরের অপার সম্ভাবনা ও সম্পদ চিহ্নিতকরণ, পরিমাণ নির্ধারণ ও জাতীয় উন্নয়নে পরিবেশের যথাযথ ব্যবহারকে সামনে রেখে পর্যাপ্ত গবেষণার জন্যই বাংলাদেশ সরকার ১৬জানুয়ারি, ২০১৮ সালে ‘বাংলাদেশ ওসানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠা করেছেন। যা কক্সবাজারে অবস্থিত।
বিশ্বের জনসংখ্যার ৪০% ইকোনোমিক অঞ্চলের কাছাকাছি বাস করে। ৩ বিলিয়নেরও বেশি মানুষ তাদের জীবিকা নির্বাহের জন্য সমুদ্রকে ব্যবহার করে। অন্যদিকে সমুদ্র আমাদের নানাভাবে উপকার করলেও এই সাগর-মহাসাগরগুলো মানুষের নানা কাজের মাধ্যমেই হুমকির মধ্যে রয়েছে। আমাদের সকলের উচিত ব্লু ইকোনমির ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সমুদ্রকে রক্ষা করা এবং দেশকে বিশ্ব দরবারে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
বঙ্গোপসাগর। বাংলাদেশের সামুদ্রিক পরিচয়। এই বিশাল জলরাশি দেশের সুনীল তথা সামুদ্রিক অর্থনীতিরও মূল উৎস। বিশাল সমুদ্রের অন্যতম রহস্য সি-উইড বা শৈবাল। কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশে এই শিল্পের উল্লেখযোগ্য অবস্থান না থাকলেও এখন ধীরে ধীরে এর প্রসার ঘটছে। এরই মধ্যে শৈবাল দিয়ে তৈরি বিভিন্ন পণ্য স্থানীয় বাজারে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় এ বছর খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি শৈবাল দিয়ে অন্যান্য পণ্যও তৈরি করা হয়েছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদিত এসব পণ্য দেশের মানুষের পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আগামীতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও বিশাল অবদান রাখবে বলে আশাবাদী সংশ্লিষ্টরা।
শৈবালশিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শৈবালের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধিলাভের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এর বিশাল বাজার আছে। শৈবালের তৈরি পণ্য বিদেশে রপ্তানি এবং দেশের মানুষের কাছে জনপ্রিয় করতে ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পুষ্টিগুণ বিবেচনায় শৈবালের চাষাবাদ কৌশলও ঠিক করা হয়েছে। এর বিদেশি বাজার ধরতে রপ্তানি আরও বাড়ানো হবে। বর্তমানে বিক্রির জন্য শৈবালের পাঁচটি পণ্য রয়েছে।
উপকূলীয় জনগোষ্ঠী বিশেষত মৎস্যজীবী ও জেলে সম্প্রদায় এবং গৃহিণীরা এই প্রকল্প বাস্তবায়নে সরাসরি উপকৃত হবেন। এতে মৎস্যজীবী ও জেলে সম্প্রদায়ের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। গৃহিণীরা পারিবারিক পুষ্টি বিশেষত দৈনন্দিন খাবারে অণুপুষ্টির অভাব দূরীকরণে শৈবালজাত খাদ্য ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। তাছাড়া হোটেল-রেস্তোরাঁ ব্যবসা, রপ্তানি-বাণিজ্যে শৈবাল বিশেষ ভূমিকা পালন করবে
মানুষের কাছে এসব পণ্য পরিচিত করতে কক্সবাজারে শনিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) থেকে দুই দিনব্যাপী মেলার আয়োজন করা হয়েছে। এই মেলায় আগত পর্যটকদের সি-উইড বা শৈবালপণ্যের সঙ্গে পরিচিত করতে বিনামূল্যে কিছু পণ্য বিতরণ করবে কর্তৃপক্ষ।
শৈবাল কী:
সি-উইড বা সামুদ্রিক শৈবাল সাধারণত সাগর বা নদীর তলদেশে (ইন্টার-টাইডাল জোন) জোয়ার-ভাটার মধ্যবর্তী স্থানে জন্মায়। এটি শেকড়, পাতা, ফুল ও ফলবিহীন উদ্ভিদ, যা সালোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় কার্বন-ডাই-অক্সাইড এবং সূর্যালোককে কাজে লাগিয়ে প্রয়োজনীয় জৈব রাসায়নিক পদার্থে রূপান্তর করে অক্সিজেনকে উপজাত হিসেবে উৎপন্ন করে। শৈবাল বিভিন্ন শক্ত অবলম্বনের (বালি, কাদা, শেকড়, খোলস, পাথর, কোরাল ইত্যাদি) সঙ্গে লেগে থাকে এবং বৃদ্ধি লাভ করে।
প্রকৃতিতে মূলত তিন ধরনের (লাল, বাদামি এবং সবুজ) শৈবাল দেখা যায়। সামুদ্রিক আগাছা হিসেবে পরিচিত হলেও বর্তমান বিশ্বে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলজ সম্পদ। অধিক পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ হওয়ায় বহুকাল আগে থেকেই সরাসরি সালাদ, মসলা ও সবজি হিসেবে উন্নত দেশে শৈবালের ব্যবহার হয়ে আসছে। এছাড়া ফার্মাসিউটিক্যালস পণ্য, ওষুধ, আগার, কারাজিনানসহ বিভিন্ন দ্রব্যের উপজাত হিসেবে শৈবালের ব্যবহার ক্রমশ বাড়ছে।
শৈবালপণ্যের উৎপাদন বাড়াতে গবেষণা:
জানা গেছে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে শৈবালপণ্যের উৎপাদন বাড়াতে গবেষণার কাজ চলছে। ‘বাংলাদেশ উপকূলে সি-উইড চাষ এবং সি-উইডজাত পণ্য উৎপাদন গবেষণা’ শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে কক্সবাজার, পটুয়াখালী এলাকায় এ গবেষণা চলছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের (কক্সবাজার) বিজ্ঞানীরা ২০১৩ সাল থেকে শৈবাল নিয়ে কাজ করছেন। এরই মধ্যে তারা ১৪৩ প্রজাতির সি-উইড বা শৈবাল শনাক্ত ও সংরক্ষণ করেছেন। চিহ্নিত এসব শৈবালের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ২৩ প্রজাতি পাওয়া যায়। এসব বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতির সঠিক চাষ প্রক্রিয়া নিশ্চিতের নিরীখে বর্তমানে বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন। এরই মধ্যে ছয় প্রজাতির শৈবালের সব চাষ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া চাষকৃত এসব শৈবাল ব্যবহার করে বিভিন্ন ভ্যালু অ্যাডেড পণ্য প্রস্তুত করার লক্ষ্যে বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন।
গবেষকরা বলছেন, পুষ্টিগুণ এবং ঔষধি গুণাগুণ বিচারে শৈবাল একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদ। শৈবালজাত পণ্য ব্যবহারে মানুষের শরীরে পুষ্টির ভারসাম্য বজায় থাকে। এছাড়া এর রয়েছে ফার্মাসিউটিক্যালস, মেডিসিনাল ব্যবহারসহ আরও বিভিন্ন ধরনের ব্যবহার। সুনীল অর্থনীতির লক্ষ্য পূরণে শৈবাল গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে আছে। এর সুষ্ঠু সংরক্ষণ ও ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে তা দেশের মানুষের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পাশাপাশি আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ উপকূলে সি-উইড চাষ এবং সি-উইডজাত পণ্য উৎপাদন গবেষণা’ শীর্ষক প্রকল্পের পরিচালক মো. মহিদুল ইসলাম বলেন, ‘উপকূলীয় জনগোষ্ঠী বিশেষত মৎস্যজীবী ও জেলে সম্প্রদায় এবং গৃহিণীরা এই প্রকল্প বাস্তবায়নে সরাসরি উপকৃত হবেন। এতে মৎস্যজীবী ও জেলে সম্প্রদায়ের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। গৃহিণীরা পারিবারিক পুষ্টি বিশেষত দৈনন্দিন খাবারে অণুপুষ্টির অভাব দূরীকরণে শৈবালজাত খাদ্য ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। তাছাড়া হোটেল-রেস্তোরাঁ ব্যবসা, রপ্তানি-বাণিজ্যে শৈবাল বিশেষ ভূমিকা পালন করবে। এছাড়া বাংলাদেশ উপকূলে অর্থনৈতিক গুরুত্বসম্পন্ন শৈবালের প্রজাতির জরিপ ও শনাক্তকরণ; উপকূলে উপযুক্ত চাষ এলাকা নির্বাচন এবং বিভিন্ন শৈবাল প্রজাতির টেকসই চাষ প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সমুদ্র উপকূলে প্রাপ্য এবং উৎপাদিত শৈবালের বাণিজ্যিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এই প্রকল্পের মূল্য উদ্দেশ্য।
শৈবালজাত পণ্যের গুরুত্ব:
শৈবাল পানি ও পরিবেশ থেকে বিভিন্ন খনিজ এবং পুষ্টি সংগ্রহ করে। এতে ফল ও শাকসবজির চেয়ে বেশি ভিটামিন এ, বি-১২, সি, বিটা ক্যারোটিন, ফোলেট, রিবোফ্লাভিন এবং নায়াসিন যোগ হয় শৈবালে। সামুদ্রিক শৈবাল বিশেষত ভিটামিন বি-১২ এর শক্তিশালী উৎস, যা রক্ত এবং স্নায়ু টিস্যুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। থাইরয়েড ফাংশন স্বাভাবিক করতে, স্বাস্থ্যকর হজমক্রিয়া বজায় রাখতে, শরীরের স্থূলতাবিরোধী প্রভাব তৈরি করতে সহায়তা করে শৈবাল। এছাড়া শৈবালে বিদ্যমান ভিটামিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের অন্যান্য গুণাবলি ত্বককে পুনরুজ্জীবিত রাখতে সহায়তা করে। বর্তমানে শৈবাল মানুষের খাদ্য হিসেবে বহুলভাবে ব্যবহার হচ্ছে। এর পাশাপাশি ফার্মাসিউটিক্যালস, মেডিসিন, সার ইত্যাদি বিভিন্ন শিল্পকারখানার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয় শৈবাল। বর্তমানে শৈবাল পানি শোধনাগারে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া এটি বিভিন্ন প্রণীর খাদ্য হিসেবেও ব্যবহার হচ্ছে।
শৈবাল ব্যবহার করে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের ভ্যালু অ্যাডেড পণ্যও তৈরি করা হচ্ছে। এসব পণ্য দেশের বাজারে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন দ্বার উন্মোচন করছে।
সি-উইড থাই ফ্লেভারড স্যুপ:
নির্দিষ্ট ধরনের শৈবাল দিয়ে থাই ফ্লেভারড সুপও তৈরি করা যায়। এজন্য শৈবাল সংগ্রহ করে ভালোভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করে নেওয়া হয়। পরে মাশরুম, গোলমরিচ ও কিছু প্রচলিত মসলা পৃথকভাবে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় শুকানো হয়। এরপর এগুলো নিরাপদ পরিবেশে গুঁড়া করা হয়। পরে আনুপাতিকহারে সব উপাদান নিয়ে পরিমাণমতো বিট লবণ প্রয়োগ করে সমসত্ত্ব মিশ্রণ তৈরি করা হয়। এরপর তিন পাশে বন্ধ অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল প্যাকেটে নির্দিষ্ট পরিমাণের গুঁড়া নিয়ে অন্যপ্রান্ত বায়ুরোধক করে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওই প্রক্রিয়ায় প্যাকেটজাত স্যুপ গুঁড়ার গুণগত মান প্রায় দুই বছর পর্যন্ত অক্ষুণ্ন থাকে।
বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতির ভিত বঙ্গোপসাগরেইবাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতির ভিত বঙ্গোপসাগরেই।
শৈবাল বা সি-উইড দিয়ে প্রসাধনী বা ফেস প্যাকও বানানো যায়। সেজন্য নির্দিষ্ট ধরনের শৈবাল সংগ্রহ করে ভালোভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করে নেওয়া হয়। সম্পূর্ণ অরগানিক ফেস প্যাক তৈরির জন্য প্রাথমিকভাবে শৈবাল, জাফরান, গোলাপ, মেথি ও কাসাভা পৃথকভাবে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় শুকানো হয়। এরপর এগুলো নিরাপদ পরিবেশে গুঁড়া করা হয়। পরে আনুপাতিকহারে সব উপাদান নিয়ে পরিমাণমতো চন্দন গুঁড়া প্রয়োগ করে সমসত্ত্ব মিশ্রণ তৈরি করা হয়। এরপর তিন পাশে বন্ধ অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল প্যাকেটে নির্দিষ্ট পরিমাণের গুঁড়া নিয়ে অন্য প্রান্ত বায়ুরোধক করে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওই প্রক্রিয়ায় প্যাকেটজাত ফেস প্যাকের গুণগত মান প্রায় দুই বছর পর্যন্ত অক্ষুণ্ন থাকে।
সি-উইড উপটান:
শৈবাল বা সি-উইড দিয়ে উপটানও তৈরি করা যায়। সেজন্য নির্দিষ্ট ধরনের শৈবাল বা সি-উইড সংগ্রহ করে ভালোভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করে নেওয়া হয়। সম্পূর্ণ অরগানি উপটান তৈরির জন্য প্রাথমিকভাবে শৈবাল, কাসাভা, মুলতানি মাটি, গম, ডাল, কমলার খোসা, হলুদ, তিল, তিসি, কারি পাতা ও চাল পৃথকভাবে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় শুকানো হয়। এরপর এগুলো নিরাপদ পরিবেশে গুঁড়া করা হয়। পরে আনুপাতিকহারে সব উপাদান নিয়ে পরিমাণমতো গুঁড়ার সমসত্ত্ব মিশ্রণ তৈরি করা হয়। এরপর তিন পাশে বন্ধ অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল প্যাকেটে নির্দিষ্ট পরিমাণের গুঁড়া নিয়ে অন্যপ্রান্ত বায়ুরোধক করে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওই প্রক্রিয়ায় প্যাকেটজাত সি-উইড উপটান প্যাকের গুণগত মান প্রায় দুই বছর অক্ষুণ্ন থাকে।
বালাচাও:
শৈবাল বা সি-উইড দিয়ে বানানো যায় দীর্ঘসময় সংরক্ষণযোগ্য বালাচাও নামে এক ধরনের ‘রেডি টু ইট ফুড’ও। এজন্য নির্দিষ্ট ধরনের সি-উইড সংগ্রহ করে ভালোভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করে শুকিয়ে নেওয়া হয়। এছাড়া পেঁয়াজ, রসুন, কাঁচকি মাছ, মরিচ, চিংড়ি পরিষ্কার করে কেটে নেওয়া হয়। এরপর আনুপাতিকহারে সব উপকরণ অল্প আঁচে তেলে ভাজা হয়। এক্ষেত্রে প্রথমে পেঁয়াজ এবং রসুন তেলে ভেজে উঠিয়ে নিতে হবে। পরে সব উপকরণ ভাজা হলে পেঁয়াজ এবং রসুন ভাজা যোগ করে নিতে হবে। এরপর এগুলো কাচের পাত্রে সংরক্ষণ করা হয়। ওই প্রক্রিয়ায় প্যাকেটজাত সি-উইড বালাচাও এর প্যাকের গুণগত মান প্রায় এক বছর পর্যন্ত অক্ষুণ্ন থাকে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ উপকূলে বসবাস করে। তাদের প্রধান কাজ হলো মৎস্য আহরণ, মৎস্য বাজার ব্যবস্থাপনা, লবণ চাষ ইত্যাদি। বিশাল সমুদ্রের উপকূলে মানুষের জন্য বিকল্প আয়ের উৎস হতে পারে সি-উইড বা শৈবাল চাষ, ব্যবস্থাপনা ও পণ্য তৈরি। এতে বিনিয়োগের তেমন ঝামেলা নেই। স্বল্পপুঁজিতে শৈবাল চাষ একদিকে যেমন আয়ের উৎস হবে, ।