1. mesharulislammonir1122@gmail.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন
  2. info@www.sangjogprotidin.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন :
শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ০৮:১৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
কালিগঞ্জের চৌমুহনী ডিগ্রি মাদ্রাসার সাফল্য উজিরপুর উপজেলা শ্রমিক দলের দোয়া ও মিলাদ মাহফিল নড়াইল–১ ও নড়াইল–২ আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ঘোষণা তালায় শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান হলেন সুপার আব্দুর রাজ্জাক মোল্লাহাটে সংসদ নির্বাচন ২০২৬ ও গণভোট উপলক্ষে ভোটের গাড়ির প্রচারণা দিঘলিয়ায় ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ থানা সম্মেলন অনুষ্ঠিত শ্যামনগরে সড়ক নির্মাণের খোঁড়া গর্তে যাত্রীবাহী বাস কালিয়ায় বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর সঙ্গে সাংবাদিকদের মতবিনিময় কেরানীগঞ্জে নিখোঁজ ছাত্রী ও তার মায়ের লাশ উদ্ধার খালেদা জিয়ার স্মরণে শোকসভা শুরু, অনুষ্ঠানস্থলে তারেক রহমান

সুন্দরবনে ‌সুন্দরী কমছে , ভালো নেই গোলপাতাও

  • প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৫ মার্চ, ২০২৫
  • ২২ বার পড়া হয়েছে

বিশেষ প্রতিনিধি : সুন্দরবন নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সুন্দরী গাছ। জনশ্রুতি রয়েছে, এ গাছের নামানুসারেই এ বনের নাম হয়েছে ‘সুন্দরবন।’ কিন্তু সেই সুন্দরী গাছই কমতে শুরু করেছে বনটিতে। সুন্দরবন বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আগামী ২৫ বছর পর এ বনে সুন্দরী গাছ খুঁজে পাওয়াই কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কারণ উজান থেকে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় লবণাক্ততা বাড়ছে সুন্দরবনের পানিতে। পানির তলদেশেও জমছে লবণাক্ত পলি।
এ বনের আরেক সৌন্দর্য গোলপাতার গাছগুলোরও একই হাল। পচতে পচতে মরতে বসেছে গোলপাতা। কারণ গাছটির অপ্রয়োজনীয় পাতা কেটে ফেলার এবং সঠিক সময়ে গাছ পরিষ্কার করার প্রক্রিয়াটি এখন আর কার্যকর নয়। নতুন অঙ্কুরোদ্‌গম ঘটার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অব্যাহত না থাকলে গোলপাতাও হারিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বন ও পরিবেশ গবেষকরা।
সুন্দরবনের এই সুন্দরী গাছ নিয়ে টানা পাঁচ বছর গবেষণা করেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালের বন ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড মিনারেল সায়েন্সেস অনুষদের অধ্যাপক ড. স্বপন কুমার সরকার। গবেষণায় তার সঙ্গে ছিলেন যুক্তরাজ্যের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জেসন ম্যাথিউপউলস ও ড. রিচার্ড রিভ। গবেষণার ফল সম্পর্কে ড. স্বপন কুমার সরকার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ, ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়া বনাঞ্চল সুন্দরবন এখন হুমকির মুখে। সাগর আর বনসংলগ্ন নদীর পানির লবণাক্ততা-সহিষ্ণু গাছগাছালি এখন অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে উদ্বেগজনক হারে কমে আসছে। একই সঙ্গে পলি জমছে বনের ভেতরে। ফলে আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে হারিয়ে যেতে পারে সুন্দরবনের অন্যতম আকর্ষণীয় এবং সবচেয়ে বেশি কার্বন ধারণক্ষম বৃক্ষ সুন্দরী।’

গবেষক ড. স্বপন কুমার সরকার জানান, এই গবেষণা থেকে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ধরে তিনি সুন্দরবনের পানি ও মাটির পরিবেশগত বৈজ্ঞানিক পরিবর্তন নিয়ে নতুন করে গবেষণা শুরু করেছেন। তার মতে, সমুদ্রের আশপাশের নদী ও খালগুলো খনন করে, মিষ্টিপানির প্রবাহ বাড়িয়ে এবং শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহের মাত্রা বাড়িয়ে কিছু সুফল পাওয়া যেতে পারে। তবে প্রকৃতির প্রভাবের ওপর তেমন কিছু করার নেই বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশ ও ভারত মিলিয়ে সুন্দরবনের আয়তন প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে বাংলাদেশ অংশে আছে ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের এই বনকে ১৯৯৭ সালে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ইউনেস্কো। গত বুধ ও বৃহস্পতিবার সুন্দরবনের মোংলা, হিরণ পয়েন্ট, হারবাড়িয়া, দুবলার চর ও করমজল এলাকা ঘুরে চোখে পড়েছে সুন্দরী আর গোলপাতা গাছের এই হাল। নদীর নালা বেয়ে চলার পথে মরতে বসা গোলপাতা গাছ কিছু চোখে পড়লেও সুন্দরী গাছ খুঁজে পেতে সময় লাগে। দুই-চারটা যা-ও চোখে পড়ে, সেটা শুকনো এলাকায়।
হিরণ পয়েন্টে এলাকায় কর্মরত ফরেস্ট গার্ড লিয়াকত হোসেন জানালেন, গত ২৪ বছর ধরে তিনি এই বন বিভাগে কাজ করছেন। প্রকৃতিকে ভালোবাসেন বলে কোনো পদোন্নতি নেই জেনেও দীর্ঘ দুই যুগ ধরে তিনি কাজ করছেন। কিন্তু গাছপালার অস্বাভাবিক মৃত্যু তাকে এখন আপনজনের মৃত্যুর মতোই কষ্ট দিচ্ছে।
সুন্দরীদের মতো সুন্দরবনের গোলপাতা গাছও ভালো নেই। সুন্দরবন ঘুরে দেখা গেল, গোলপাতার কূপগুলোয় গাছের মরা পাতায় ভরে উঠেছে। কোনো কোনো গাছে মাইজ পাতা বা মাঝখানের শিশুপাতা বাদে সব পাতাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বন বিভাগের কর্মকর্তা ও বাওয়ালিরা বললেন, ‘পাতা না কাটার কারণেই তা নষ্ট হচ্ছে। এতে গাছের ফল প্রদানের পরিমাণও কমে যাচ্ছে। এতে করে নতুন গাছের জন্ম বা অঙ্কুরোদ্‌গমও হবে না।’
হারবাড়িয়া এলাকায় কথা হয় বাওয়ালি হোসেন মিয়ার সঙ্গে। তিনি আক্ষেপের সঙ্গে বললেন, ‘আগে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল বনজীবীরা বছর ধরেই কিছু না কিছু আয় করতে পারতেন। তখন সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের খুলনা রেঞ্জের তিনটি কূপ থেকে গোলপাতা সংগ্রহ করা হতো। এখন এ এলাকায় সেটা কমে গেছে। এ ছাড়া জলদস্যুদের ভয়েও অনেকে ঠিকমতো পাতা কাটতে পারছেন না। তিন দিন আগেও জলডাকাতি হয়েছে। জলদস্যুরা বাওয়ালিদের ধাওয়া করে মোবাইল ও নগদ টাকা কেড়ে নিয়েছে। অনেক সময় দস্যুরা তাদের নৌকা বা নৌকার ইঞ্জিনও লুট করে নিয়ে যায়।’
হোসেন আলী বললেন, ‘আগে উপকূল এলাকার অনেকেই তাদের বাড়ির দেয়াল আর ছাদ তৈরির জন্য গোলপাতা ব্যবহার করতেন। এখন এর প্রচলন কমেছে। অনেক এলাকাকে অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়েছে। তাই গোলপাতার কূপের সংখ্যাও কমেছে। গোলপাতার চাহিদা কমে যাওয়ায় কমেছে বাওয়ালির সংখ্যা। এসব কারণেও অনেক গোলপাতার গাছ থেকে পাতা আর কাটা হচ্ছে না। সেসব পাতা মরছে ও পচে উঠছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ফরেস্ট গার্ড বললেন, ‘যেসব বাওয়ালি গোলপাতা কাটেন বা পরিষ্কার করেন, তাদের কোনো টাকা দেওয়া হয় না। এ কাজ করতে এসে কেউ বিপদে পড়লে তেমন আর্থিক সহায়তাও করা হয় না। তারা শুধু গোলপাতা কেটে নিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু চাহিদা কম বলে তারা এখন সেভাবে তা বিক্রি করতে পারেন না। ফলে তাদের উপস্থিতিও কমে গেছে। বন বিভাগ পরিচ্ছন্নতার পেছনে সামান্য অর্থ ব্যয় করলে এই সংকট কাটতে পারে।’
হারবাড়িয়া শাপলা টাওয়ারের পাশে নৌকা বা ট্রলার ঘাটে বাওয়ালি আলমাস মোক্তার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আর দেড় মাস পরই শুরু হবে গোলপাতা কাটা ও পরিষ্কারের কাজ। প্রতিবছর সাধারণত জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসে তাদের বনের মধ্যে গিয়ে পাতা সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হয়। আর তাই গোলপাতা সংগ্রহের মৌসুমকে সামনে রেখে বাওয়ালিরা এখন নতুন নৌকা তৈরি বা পুরোনোগুলো মেরামতের কাজে ব্যস্ত। চলছে বাওয়ালিদের ভাষায়, শারণের মাস।’
এ প্রসঙ্গে খুলনা বিভাগের সুন্দরবনের পশ্চিম অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাসানুর রহমান এই প্রতিবেদককে ‌বলেন, ‘বনে সুন্দরী গাছ আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। যা দিন দিন কমতেই আছে। পানির প্রবাহ কম। পানিতে লবণের পরিমাণ বেশি এবং পলিমাটি জমে মাটি শক্ত হয়ে যাওয়ায় অনেক গাছ মরে গেছে। গাছগুলো পর্যাপ্ত শ্বাস নিতে পারছে না। যেগুলো বেঁচে আছে, সেগুলো বলা যায় শ্বাসকষ্ট নিয়েই বেঁচে আছে। আশপাশের নদীগুলো প্রায়ই খনন করা হয়, যাতে প্রবাহ বাড়ে এবং মিষ্টিপানির পরিমাণও বৃদ্ধি পায়। এতে করে কিছুটা সুফল পাওয়া যায়।’
গোলপাতার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘এই গাছেরও একই অবস্থা। বাওয়ালি কমে গেছে এবং নেই বললেই চলে। ফলে গাছ পরিষ্কার বা পাতা সংগ্রহে সংকট দেখা দিয়েছে। ওরা এখন পাতা নিয়ে কোথাও সেভাবে বিক্রি করতে পারেন না। আগে যে অঞ্চলে দুই শতাধিক নৌকা পাতা সংগ্রহ করত, এখন করে মাত্র ২০-৩০ টা। যারা পাতা কাটে তাদের কোনো টাকা দেওয়া হয় না, বরং তাদের কাছ থেকেই রাজস্ব কর আদায় করা হয়। তাই তারাও উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন।’
সুন্দরী গাছ নিয়ে করা গবেষণা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ইকোলজিক্যাল সোসাইটি অব আমেরিকা থেকে প্রকাশিত ইকোলজিক্যাল মনোগ্রাফস জার্নালে ছাপা হওয়া ‘সলভিং দ্য ফোর্থ-কর্নার প্রবলেম : ফোরকাস্টিং ইকোসিস্টেম প্রাইমারি প্রোডাকশন ফ্রম স্পেশিয়াল মাল্টিস্পেসিস ট্রেইট-বেজড মডেলস’ শীর্ষক নিবন্ধে বলা হয়, সুন্দরবনের লবণাক্ততা ও পলি জমার পরিমাণ বর্তমানের চেয়ে আর ৫০ শতাংশ বাড়লে বনের কার্যক্ষমতা বা উর্বরতা ২৯ শতাংশ কমে যাবে। গাছের গড় উচ্চতা কমে যেতে পারে ৩৬ শতাংশর মতো। শুধু তা-ই নয়, সুন্দরী গাছের পাতার খাদ্য উৎপাদন ক্ষমতাও ব্যাপকভাবে কমবে। শুধু সুন্দরী গাছই নয়, অতিরিক্ত লবণাক্ততা আর পলি জমতে থাকায় গেওয়া, গরান, পশুর, বাইন, সিংড়া ও কেওড়াসহ সুন্দরবনের অন্য গাছগুলোরও ক্ষতি হচ্ছে। তবে অন্য গাছের তুলনায় সুন্দরীর লবণাক্ততা সহ্য করার ক্ষমতা কম বলে এই প্রজাতি সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়বে।
ড. স্বপন কুমার সরকার বলেন, গত চার দশকে সুন্দরবনের লবণাক্ততা ৬০ শতাংশ বেড়েছে। আর প্রতিবছর ৯৬ হাজার টন পলি জমছে সুন্দরবনে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে লবণাক্ততা বাড়ছে এবং পলি জমছে। ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে মিঠাপানির অসম বণ্টনও এ সমস্যার জন্য অংশত দায়ী বলে জানান তিনি। সংকট কাটাতে বৈশ্বিক উষ্ণতা কমিয়ে সমুদ্রের পানি বৃদ্ধির হার সীমিত রাখার ওপর জোর দেন এ গবেষক। একই সঙ্গে তিনি নদী শাসন করে শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে পানির সুষম বণ্টনের তাগিদ দেন।
বলা হয়, সুন্দরী গাছের আধিক্যের কারণেই পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্যটি ‘সুন্দরবন’ নামে পরিচিত পেয়েছে। কিন্তু বনের মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধির পাশাপাশি এক ধরনের ‘পরগাছা’র অস্বাভাবিক বিস্তারে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে সেই সুন্দরী গাছ।
বনজীবী ও বন কর্মকর্তারা বলছেন, আগে থেকেই সুন্দরী গাছের ‘আগা মরা’ রোগ আছে। সুন্দরবনের পানি ও মাটিতে লবণাক্ততা বাড়ায় চারা না টেকায় বনে নতুন গাছও জন্মাছে কম। তার সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে লতা-জাতীয় একশ্রেণির ‘পরগাছা’র অস্বাভাবিক উপদ্রবে সুন্দরী গাছের অস্তিত্ব চরম হুমকিতে পড়েছে।
বনবিভাগ বলছে, এই পরজীবী ধীরে ধীরে সুন্দরী গাছের শ্বাসরোধ করছে। এরা মূল গাছের রস শোষণ করে বাঁচে। ফলে ধীরে ধীরে গাছ দুর্বল হয়; পাতা হলুদ হয়ে ঝরে যায় এবং এক পর্যায়ে গাছ মরে দাঁড়িয়ে থাকে।
সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করীম চৌধুরী বলেন, পূর্ব বনবিভাগের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ সুন্দরী গাছ, বিশেষ করে বয়স্ক গাছে পরগাছা বাসা বেঁধেছে।
“আগে শাখা-প্রশাখায় সীমাবদ্ধ থাকা পরগাছা এখন গাছের মূল অংশ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এতে গাছ দুর্বল হয়ে একসময় শুকিয়ে মারা যাচ্ছে।”
তবে এ নিয়ে কোনো গবেষণা না থাকায় কীভাবে সুন্দরী গাছ বাঁচানো যাবে, তা বলতে পারছে না বনবিভাগ। বিষয়টি এখন বন কর্মকর্তাসহ সুন্দরবন সংশ্লিষ্ট সবার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষণা কর্মকর্তা মমিনুল ইসলাম নাহিদ বলেন, সুন্দরবনে ভেষজ, গুল্ম, লতা, ফার্নসহ বিভিন্ন প্রজাতির পরগাছা আছে, যা তারা শনাক্ত করেছেন। তবে ঠিক কোন কোন পরগাছা সুন্দরী গাছের ক্ষতির কারণ তা এখনো শনাক্ত হয়নি।
বঙ্গোপসাগরের প্রান্ত ছুঁয়ে প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের সুন্দরবন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলা এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলায় অবস্থিত।
বনবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বড় এ শ্বাসমূলীয় বনের বাংলাদেশ অংশের আয়তন ৬ হাজার ৫১৭ বর্গকিলোমিটার, যা পুরো বনের ৬৬ শতাংশ। ২০২৪ সালের সর্বশেষ জরিপে এ বনে বৃক্ষ, লতা, গুল্ম, ঘাস ও পরগাছাসহ ১৮৪ প্রজাতির উদ্ভিদ চিহ্নিত হয়েছে।
বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করীম চৌধুরী বলেন, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশ ‘পূর্ব’ ও ‘পশ্চিম’ এই দুটি প্রশাসনিক বিভাগে বিভক্ত। খুলনা ও সাতক্ষীরা অংশ নিয়ে পশ্চিম আর বাগেরহাট ও খুলনার সামান্য অংশ নিয়ে পূর্ব সুন্দরবন। আর সবচেয়ে বেশি সুন্দরীগাছ আছে বনের পূর্বাঞ্চলে।
সুন্দরবন ঘেরা খুলনার কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের তেঁতুলতলার চর এলাকার বাসিন্দা ইসলাম সানা বলেন, ৪০ বছর ধরে সুন্দরবন ঘিরে জীবিকা তার। তবে সম্প্রতি সুন্দরবনের বেশ কিছু পরিবর্তন তার চোখে পড়ছে।
“পাঁচ-ছয় বছর আগেও যেখানে সুন্দরীগাছের ঘন জঙ্গল ছিল, এখন সেসব জায়গা প্রায় ফাঁকা। বহু সুন্দরী গাছ শুকিয়ে গেছে।”
বাগেরহাটের শরণখোলার বাসিন্দা শাহজাহান আকন বলেন, “৩০-৩৫ বছর ধরে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করছি। আগে বনের যেসব জায়গায় ঘন জঙ্গল দেখতাম, সেসব জায়গা এখন ফাঁকা।
“মে মাসের শুরুতেই ফুল আসে সুন্দরী গাছে। তখন সুন্দরীর ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় গোটা সুন্দরবন। কিন্তু বনের অনেক সুন্দরী গাছ শুকিয়ে গেছে, মৌমাছিও সেসব জায়গায় চাক বানাচ্ছে না।”
বনজীবীরা বলছেন, মাটির ক্ষয়রোধ, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূল রক্ষা এবং প্রাণীর প্রজননে সুন্দরী গাছের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সুন্দরীর শেকড়ে আশ্রয় নেয় ছোট মাছ ও চিংড়ি, গাছে বাসা বাঁধে পাখি, আর এ গাছের আড়ালেই বাঁচে বনের হরিণ ও রয়েল বেঙ্গল টাইগার।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ওয়াসিউল ইসলাম বলেন, আগে থেকেই সুন্দরবনের সুন্দরী গাছের ‘আগা মরা’ রোগ আছে। তবে লবণাক্ততা বাড়ায় সুন্দরী গাছের ‘আগা মরা’ রোগ ও পরগাছার উপদ্রব বেড়েছে।
“যেসব সুন্দরী গাছ এর মধ্যে ‘আগা মরা’ রোগে আক্রান্ত, তাদের দুর্বল অবস্থার সুযোগ নিয়েই পরগাছা ছড়িয়ে পড়ছে। যেখানে লবণাক্ততা বেশি, কিংবা জোয়ার-ভাটার পানি চলাচল কম; এমন প্রতিকূল পরিবেশে গাছগুলো সহজেই আক্রান্ত হচ্ছে।”
অধ্যাপক ওয়াসিউল বলেন, “সাধারণত শীত মৌসুমে এসব পরগাছা ফুল ও ফল দেয়। তার আগে এদের সরিয়ে ফেলতে পারলে বংশবিস্তার রোধ করা সম্ভব। পাখিরা এদের বীজ এক গাছ থেকে আরেক গাছে ছড়িয়ে দেয়।”
এ শিক্ষক সতর্ক করে বলেন, সুন্দরীসহ ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ কমে গেলে পুরো সুন্দরবনের ইকোসিস্টেম ভেঙে পড়ার শঙ্কা তৈরি হবে।
এ বিষয়ে ব্যাপক গবেষণা ছাড়া কার্যকর সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষণা কর্মকর্তা মমিনুল ইসলাম নাহিদ বলেন, “সমন্বিত প্রভাবেই সুন্দরবনের বিভিন্ন গাছের রোগ বাড়ছে। রোগের কারণ বিশ্লেষণে গবেষণাও চলছে।
বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, বনের অধিক লবণাক্ত এলাকায় বয়স্ক সুন্দরী গাছের আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি। সেইসঙ্গে কম লবণসহিষ্ণু সুন্দরী, পশুরসহ কয়েকটি গাছের চারা গজানোর হার কমেছে। অন্যদিকে বনের লবণাক্ত স্থান ভেদে গেওয়া, বলা গাছ নামে স্থানীয়ভাবে পরিচিত বৃক্ষ বাড়ছে।
গবেষকরা বলছেন, সাধারণভাবে উপকূলীয় এলাকার নদীতে লবণাক্ততা থাকার কথা দুই থেকে পাঁচ পিপিটি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও উজানের মিঠাপানির প্রবাহ কমায় অনেক আগে থেকেই সুন্দরবনের পানি ও মাটিতে লবণাক্ততার সেই মাত্রা ছাড়িয়েছে। একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পলিমাটি।
পানি ও মাটিতে লবণাক্ততা বাড়ায় চারা না টেকায় বনে নতুন গাছও জন্মাছে কম। আবার সুন্দরীগাছের উচ্চতা বেশি এবং ডালপালা কম হওয়ায় ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে সুন্দরবনে গাছের পরিমাণ এবং বনের ঘনত্ব কমছে।
লবণাক্ততা ও বনের নদী-খালের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় গাছ পর্যাপ্ত পানি গ্রহণ করতে পারছে না। ফলে গাছ ছোট ও রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। একপর্যায়ে দুর্বল গাছে পরগাছা জন্ম নিচ্ছে এবং দ্রুত গাছের মৃত্যু ঘটছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সুন্দরবন ভয়াবহভাবে ক্ষতগ্রস্ত হচ্ছে। মিঠাপানির বাদাবন তার বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে। বাড়ছে লবণপানির আগ্রাসন।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় বনের মধ্যে জোয়ারের লবণাক্ত পানির চাপ বেড়েছে। সেই সঙ্গে উজান থেকে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে গেছে।
“এর ফলে বনের মাটি ও পানির লবণাক্ততা বেড়েছে। এর প্রভাবে বনের গাছের রোগ-বালাই বাড়ছে। শুকিয়ে গাছ মারা যাচ্ছে। এতে গাছের পরিমাণ এবং বনের ঘনত্ব কমছে।”
অধ্যাপক হারুন বলেন, সুন্দরবনের গাছের রোগ-বালাইয়ের কারণ, বর্তমান অবস্থা এবং প্রতিকারের উপায় নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
পশ্চিম সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, “সুন্দরী গাছ মূলত মিঠা ও ঈষৎ লবণপানিতে ভালোভাবে বাঁচতে পারে। কিন্তু উজান থেকে মিঠাপানির প্রবাহ কমে আসায় সুন্দরবনের সামগ্রিক লবণাক্ততার পরিমাণ বাড়ছে। বিশেষ করে বনের সাতক্ষীরা ও খুলনা অংশে।”
সুন্দরবন অ্যাকাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, একই সঙ্গে বন, জলাভূমি, সামুদ্রিক ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের সমন্বয়ে প্রাকৃতিক বন-সুন্দরবন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মিঠা পানির উৎস কমে গেছে।
“বনের বেশকিছু খাল পলিমাটি জমে ভরাট এবং বিভিন্ন এলাকায় চর জেগেছে। ফলে বনে এখন লবণ পানির আধিক্যই বেশি। অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে সুন্দরীসহ বিভিন্ন গাছ নানা রোগে মারা যাচ্ছে।”
তিনি বলেন, সুন্দরবন রক্ষায় নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা সেভাবে কার্যকর নেই।
জলবায়ু সচেতনতা এবং সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের মিডিয়া সমন্বয়ক ওবায়দুল কবির সম্রাট মনে করেন, উজানের নদীগুলো দিয়ে মিষ্টি পানির প্রবাহ বাড়াতে পারলে বন পুনরুজ্জীবিত হবে। এক্ষেত্রে পশুর ও বলেশ্বর নদের মাধ্যমে সুন্দরবনে মিষ্টি পানির প্রবাহ বাড়ানো কার্যকর পদক্ষেপ। পাশাপাশি সুন্দরবন রক্ষায় প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে এগোতে হবে।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, সুন্দরবন ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় এ বনের ভূমিকা অপরিসীম। এ বনের প্রধান বৃক্ষ সুন্দরী গাছ শুধু জীববৈচিত্র্যের জন্য নয়, স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গেও সম্পৃক্ত।
সুন্দরবনের ‘পরগাছা’র উপদ্রবের বিষয়ে তিনি বলেন, তারা সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। এর প্রতিকার এবং সুন্দরীগাছ রক্ষায় দ্রুত এই পরজীবী উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণা শুরুর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
“এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আসফাক আহমদকে সুন্দরবন ঘুরিয়ে ওই ‘পরগাছা’ দেখানো হয়েছে। উনারা এর শ্রেণি চিহ্নিত করেছেন। শিগগির এ বিষয়ে গবেষণার কাজ শুরু হবে।”

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট