
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সাতক্ষীরা খুলনা ,বাগেরহাট , পিরোজপুর ,ঝালকাঠি, পটুয়াখালী ,ভোলা এই সমস্ত এলাকার মানুষের জ্বালানি হিসেবে একমাত্র সুন্দরবনের ভেসে আসা গাছের ফল ও পাতা ।সুন্দরবনের সুন্দরী গাছের ফল দেখতে অনেকটা ডিম্বাকৃতির। এটি ঝরে পড়ার পর সমুদ্রের নোনা জলে ভেসে উপকূলীয় এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। পরে সৈকত থেকে এগুলো সংগ্রহ করেন উপকূলীয় এলাকার লোকজন, বিশেষ করে নারীরা। রোদে শুকিয়ে ভেতরের বিচিটা ফেলে জ্বালানি কাজে ব্যবহার করছে শত শত পরিবার।
সুন্দরী ফল দেখতে বাদামি রঙের হয়। এর গায়ে লম্বা খাঁজকাটা দাগ থাকে। ফলের ভেতরে বীজ থাকে, যা গাছ থেকে পড়ার আগেই অঙ্কুরিত হতে শুরু করে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গঙ্গামতি, লেম্বুরবন, তিন নদীর মোহনা উপকূলীয় এলাকার জেলে পরিবারগুলো একসময় তাদের জ্বালানি হিসেবে জঙ্গলের ওপর নির্ভরশীল থাকতো। বছরে বিভিন্ন সময় জলোচ্ছ্বাসে নষ্ট হওয়া গাছগুলো সংগ্রহ করে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতেন তারা। আবার অনেক সময় মরে যাওয়া গাছগুলোকেও তারা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে রান্নার কাজ করতেন।
গত কয়েক বছরে বিভিন্নভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে সেই বন। তাই সংকট তৈরি হয়েছে উপকূলীয় মানুষের জ্বালানিতে। এই অবস্থায় সুন্দরবন থেকে ভেসে আসা সুন্দরী ফলগুলো অনেকটা জ্বালানি সংকট দূর করতে সাহায্য করছে। ওই এলাকায় নারী-পুরুষেরা এগুলো সংগ্রহ করে নিজেদের চাহিদা মেটাচ্ছেন।
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের লেম্বুরবন এলাকার বাসিন্দা নুরুন্নাহার জাগো নিউজকে বলেন, ‘এই এলাকা যখন জঙ্গল ছিল, তখন আমরা জঙ্গল থেকে আমাদের লাকড়ি সংগ্রহ করতাম। মরা গাছ, ভেঙে পড়া ডাল, ভেঙে যাওয়ার গাছগুলোকে সংগ্রহ করে আমরা রান্নার কাজে ব্যবহার করতাম। কিন্তু এই গাছগুলো এখন আর নেই। বন ধ্বংস হয়ে গেছে, সমুদ্রে চলে গেছে। তাই আমাদের রান্না করতে হয় গ্যাস দিয়ে বা লাকড়ি কিনে, যা আমাদের মতো গরিব পরিবারের পক্ষে সম্ভব না। তাই সুন্দরী ফলগুলোকে সংগ্রহ করে রোদে শুকিয়ে জ্বালানি কাজে ব্যবহার করছি।’
কুয়াকাটা সৈকতের ট্যুর গাইড সোলায়মান বিশ্বাস বলেন, ‘৩০ কিলোমিটার সৈকতে আমাদের যাতায়াত বেশি। এই ৩০ কিলোমিটারের বিভিন্ন জায়গায় দেখি ফলগুলো এসে স্তূপ হয়ে আছে। এগুলো সংগ্রহ না করলে সমুদ্রে আবার ভেসে যাবে। এলাকার অনেক মানুষ এগুলো সংগ্রহ করে রান্নার কাজ ব্যবহার করেন।’সুন্দরবনের পশ্চিম অংশে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে নদীর পানির সঙ্গে বনের ভেতর থেকে ভেসে আসে বিভিন্ন জাতের গাছের ফল। উপকূলীয় এলাকায় এসব ফল থেকেই জন্মায় নতুন গাছ, প্রকারান্তরে আয়তন বাড়ে সুন্দরবনের। তবে এখন ফল ভেসে আসে কম। কারণ নদীতে ভেসে আসা ফল রোদে শুকিয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ কারণে গাছের বংশবৃদ্ধি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, একইসঙ্গে আয়তনেও বাড়ছে না সুন্দরবন।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনে প্রায় ৩২০ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য গরান, কেওড়া, গেওয়া, বাইন, সুন্দরী, কাকড়া, গোল, খলসি ইত্যাদি। সুন্দরবনের উদ্ভিদের মূল বৈশিষ্ঠ এগুলো লোনা মাটির ও জলজ শ্রেণির। জোয়ার ভাটার অঙ্কুরোদগমের মাধ্যমে এসব উদ্ভিদ বংশ বিস্তার করে। নদীর পানিতে পড়ার পর এসব উদ্ভিদের ফল ও বীজ থেকে জন্ম নেয় নতুন চারা।
পশ্চিম সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সুন্দরবন উপকূলীয় মুন্সিগঞ্জ, হরিনগর, গাবুরা, পদ্মপুকুরা এলাকার প্রান্তিক শ্রেণির মানুষ ভেসে আসা ফলগুলোর শ্বাস বাদ দিয়ে উপরের খোলস জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করছে।
নদীর পানিতে ভেসে আসা ফল জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছেন এলাকাবাসীসাতক্ষীরা শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জের হরিনগর এলাকার বিলি রানী, অষ্টমী রাণী, নিলিমা রাণীসহ বেশ কয়েকজন নারী এই প্রতিবেদককে জানান, ‘বৃক্ষের ফল জালানি হিসেবে ব্যবহারের কারণে বাদার (বন) অনেক ক্ষতি হয়। কিন্তু কি করবো জালানি কাঠের অভাবে বাধ্য হয়ে আমাদের এটি করতে হয়।’
তারা আরও বলেন, ‘বাইন ফল আগুনে পোড়ে না সেজন্য এটি আমরা আবার নদীতে ফেলে দেই, যাতে গাছ জন্মাতে পারে।’
সুন্দরবন গবেষক পিযুষ বাউয়ালি পিন্টু এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘বর্ষার মৌসুমে সুন্দরবন বিভিন্ন বৃক্ষের ফল নদীর পানিতে ভেসে লোকালয়ে আসলে সুন্দরবন পাড়ের বনজীবীরা না বুঝে তা সংগ্রহ করে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে। এই ফল যদি জালানি হিসেবে ব্যবহার না হতো তবে আরও একটি নতুন সুন্দরবন গড়ে উঠতো।’
নদীর পানিতে ভেসে আসা ফল জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছেন এলাকাবাসীতিনি আরও বলেন, সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবনমান পরিবর্তনের লক্ষ্যে কয়েকটি এনজিও কাজ করলেও কোনও উন্নতি হয়নি। বরং সুন্দরবনকে পুঁজি করে কোটি কোটি টাকা বিদেশীদের কাছ থেকে এনে নিজেরা লোপাট করেছে।’
সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বনসংরক্ষক মো. ফজলুল হকএই প্রতিবেদককে বলেন, ‘এ ব্যাপারে বনবিভাগ সচেনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সুন্দরবনের বিভিন্ন ফল জালানি হিসেবে ব্যবহারের হার আগের তুলনায় অনেক কমেছে। এছাড়া সুন্দরবনে বনবিভাগের পক্ষ থেকে টহল জোরদার করা হয়েছে।
পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জার কদমতলা স্টেশন কর্মকর্তা একে এম আব্দুস সুলতান এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘প্রাকৃতিকভাবে বন কমে যাওয়ায় জ্বালানি সংকট তৈরি হচ্ছে। সেখানে বিকল্প হিসেবে অনেকে সুন্দরী ফল ব্যবহার করছেন। এটা প্রকৃতির সিস্টেম।’