1. mesharulislammonir1122@gmail.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন
  2. info@www.sangjogprotidin.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন :
শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ১২:২৪ পূর্বাহ্ন

দৈনন্দিন নদী ভাঙ্গনের প্রভাব ‌, আয়তন কমে যাচ্ছে দেশের ভূখণ্ডের

  • প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ১২০ বার পড়া হয়েছে

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি ‌: প্রতি বছরই বর্ষায় দেশের বিভন্ন অঞ্চল বিশেষ করে উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে ব্যাপক নদীভাঙন দেখা দেয়। ভাঙনে বসতভিটা, ফসলি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হারিয়ে যায়। চলতি বর্ষাতেও পত্রপত্রিকায় প্রায় প্রতিদিনই ভাঙনের ভয়াবহ রূপ তুলে ধরা হচ্ছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণকারী বাঁধ ও নদীভাঙনে গ্রামের পর গ্রাম, জনপদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মাদরাসা ইত্যাদি বিলীন হয়ে দেশ ও জনসাধারণ অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হলেও তা রোধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। বছরের পর বছর ধরে ভাঙনে মানুষ সর্বহারা হলেও এর কোনো স্থায়ী প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না।
দুই.
বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো একসময় আশীর্বাদ হলেও কালক্রমে তা যেন বিভিন্ন এলাকার মানুষের জন্য আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে পানিশূন্যতা, বর্ষায় প্রচ- ভাঙনের মুখে পড়ছে তারা। নদীগুলো স্বাভাবিকভাবে বইতে পারছে না বা বইতে দেয়া হচ্ছে না। এজন্য আমরা যতটা না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী প্রতিবেশি ভারত। ৫৪টি নদী ভারতের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে এটাই যেন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারত তার অংশে একের পর এক বাঁধ, আন্তঃনদী সংযোগ ও গ্রোয়েন নির্মাণ করে শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে, আবার বর্ষায় বাঁধের সব স্লুইস গেট খুলে দিয়ে পানিতে ভাসিয়ে দিচ্ছে। ভাঙনকে তীব্র করে তুলছে। অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে যুগের পর যুগ ধরে ভারতের সাথে চুক্তি নিয়ে কথা হচ্ছে। ভারত কেবল আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে। বাস্তবায়ন করছে না। এতে শুষ্ক ও বর্ষা মৌসুমে যথাক্রমে পানিশূন্যতা ও ভাঙনের কবলে পড়ছে দেশের মানুষ। এ সমস্যার সমাধান কবে হবে বা আদৌ হবে কিনা, তা কারও পক্ষে বলা সম্ভব নয়। জনগণ এক প্রকার ধরেই নিয়েছে, এ সমস্যার যৌক্তিক সমাধান হওয়া দিল্লী দূরস্ত। এই যখন পরিস্থিতি, তখন আমাদেরও বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। বন্যায় যাতে ডুবে যেতে না হয়, ভাঙনের শিকার না হতে হয় এবং শুষ্ক মৌসুমে শুকিয়ে মরতে না হয়, এই ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য যথোপযুক্ত পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার বিকল্প নেই। আমাদের দেশে জলোচ্ছ্বাস ও বন্যার হাত থেকে বাঁচার জন্য বাঁধ নির্মাণের উপর জোর দেয়া হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীন প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ও নদীর তীর রক্ষা বাঁধ রয়েছে। ৫৫টি প্রকল্পের মাধ্যমে নতুন নতুন বেড়িবাঁধ ও নদীর তীর রক্ষার কাজ করা হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে দেয়া মোট বাজেটের প্রায় ৭০ শতাংশই ব্যয় হয় এসব বাঁধ ও নদী তীর রক্ষার কাজে। নদ-নদীর পানি নিয়ন্ত্রণ করে বন্যা থেকে বাঁচার উপায় এবং বন্যার পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে কাজে লাগানোর কোন প্রকল্প নেয়া হয় না। এ নিয়ে মাঝে মাঝে মহাপরিকল্পনার কথা শোনা গেলেও তার বাস্তবায়ন হতে দেখা যায় না। কয়েক বছর আগে বিকল্প গঙ্গা ব্যারেজ নির্মাণের কথা শোনা গিয়েছিল। তবে ভারতের আপত্তিতে সে প্রকল্প স্থগিত হয়ে রয়েছে। রাজবাড়ির পাংশায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে বাজেট করা হয়েছিল ৩২ হাজার কোটি টাকা। এর বাস্তবায়ন হলে কি কি উপকার হতো, তা নিয়েও একটি সমীক্ষা করা হয়। ব্যারেজ থেকে উজানে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাংখা পর্যন্ত ১৬৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে থাকবে ২৯শ’ মিলিয়ন মিটার কিউব পানির বিশাল রিজার্ভার। শুষ্ক মৌসুমে এই রিজার্ভার থেকে ২ হাজার মিলিয়ন কিউসেক পানি ৮টি সংযোগ খালের মাধ্যমে ছাড়া হবে। এর ফলে গঙ্গা নির্ভর ১৬টি নদী শুষ্ক মৌসুমে নাব্যতা ফিরে পাবে। একই সাথে গঙ্গা অববাহিকা নির্ভর ৫১ লাখ হেক্টর জমির মধ্যে ১৯ লাখ হেক্টর জমি সরাসরি সেচের আওতায় আসবে। ব্যারেজের গেইট থাকবে ৯৬টি। থাকবে একটি পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্র। এখান থেকে ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। এই ব্যারেজের মূল কাজ হচ্ছে, এর মাধ্যমে সারা বছরই পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, যাতে দেশের আর্থসামাজিক ও অর্থনৈতিক খাতে বিপ্লব সাধিত হবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা থেকে শুরু করে মরুময়তা ও লবনাক্ততা থেকে সংশ্লিষ্ট এলাকা মুক্ত থাকবে। বলাবাহুল্য, এটি বাস্তবায়িত হলে একটি মহামূল্যবান প্রকল্প হিসেবে পরিগণিত হতো। প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতির মাধ্যমে যত টাকা বিদেশে পাচার হয়, তার অর্ধেকেরও কম টাকা দিয়ে এমন একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন সদিচ্ছা ও কার্যকর উদ্যোগ। এ ধরনের প্রকল্প যত দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে, দেশের জন্য ততই মঙ্গল। ভারত এ প্রকল্প বাস্তবায়নে আপত্তি তুললেও সে ইতোমধ্যে বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি পানির রিজার্ভার গড়ে তুলেছে। তার অংশের এক ব্র‏হ্মপুত্র নদীতেই ৩৩টি রিজার্ভার গড়ে তোলার মাধ্যমে ৫০ লাখ কিউসেক পানি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। অন্যান্য নদীতেও এরকম আরও অনেক রিজার্ভার গড়ে তুলছে।
তিন.
নদী ভাঙনে মানুষের যতটা না ক্ষতি হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে দেশের ভূখ-ের। আভ্যন্তরীন নদী ভাঙনের পাশাপাশি সীমান্ত নদীর ভাঙনও ব্যাপক আকার ধারন করেছে। এতে একদিকে যেমন দেশের আভ্যন্তরীণ ভৌগলিক কাঠামো পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে সীমান্ত ভাঙনে মানচিত্রও বদলে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে পদ্মার ভাঙনে রাজশাহীর পবা উপজেলার চর খানপুর ও চর খিদিরপুর মৌজা বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। চর দু’টি বিলীন হলে আন্তর্জাতিক পানি আইন অনুযায়ী, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী পদ্মায় বাংলাদেশের অংশে প্রবেশের সুযোগ পাবে। স্থানীয় বাসিন্দারা আশংকা প্রকাশ করেছে, চর দুটিতে যেভাবে ভাঙন শুরু হয়েছে, তা রোধ করা না গেলে পদ্মার অর্ধেক অংশের নিয়ন্ত্রণ বিএসএফ-এর হাতে চলে যাবে। তখন বাংলাদেশিদের চলাচলে তারা বাধা দিতে পারবে। আন্তর্জাতিক পানি আইন অনুযায়ী, বিএসএফ তা করতে পারে। আন্তর্জাতিক পানি আইন মোতাবেক দুই দেশের সীমান্ত নদীর মাঝ ¯্রােত বরাবর বা মাঝিমাঝি সীমান্ত রেখা টানা হয়। দেখা যাচ্ছে, পদ্মাসহ দেশের অন্যান্য সীমান্ত নদীগুলোর ভাঙনের ফলে নদীর ¯্রােতধারা বাংলাদেশের দিকে ক্রমশ এগুচ্ছে আর ভারতের দিকে চর জাগছে। ভারত এসব জেগে উঠা ভূখ- রক্ষা এবং তাদের অংশে ভাঙন রোধে বাঁধ দিচ্ছে। শুধু পদ্মাই নয়, সীমান্ত সংলগ্ন সুরমা, কুশিয়ারা, ইছামতি ও অন্যান্য নদীর ভাঙনেও বাংলাদেশ ভূখ- হারাচ্ছে। এভাবে বাংলাদেশের মানচিত্র ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত চার দশকে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা নদীর ভাঙনে দেড় লাখ হেক্টর জমি হারিয়ে গেছে, যা ঢাকা শহরের আয়তনের চেয়ে বেশি। এর বিপরীতে চর জেগেছে মাত্র ৫৩ হাজার হেক্টর। অর্থাৎ প্রতি বছরই নদ-নদীর ভাঙন তীব্র হচ্ছে। এই ভাঙন রোধে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। যেসব উদ্যোগের কথা শোনা যায়, তা বলতে গেলে নামকাওয়াস্তে নেয়া হয়। ভাঙন কবলিত এলাকায় যেসব বাঁধ নির্মাণ ও ভাঙন রোধের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, সেগুলোর নির্মাণ ও স্থায়িত্ব এত কম যে, নদীর পানির ¯্রােত ঠেকানোর মতো সক্ষমতা নেই। কোন কোন এলাকায় বাঁধগুলো বালির বাঁধে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর বাঁধগুলো পুনঃনির্মাণ ও সংস্কারে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। অথচ দেশজুড়ে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে নদীভাঙন ও বন্যা মোকাবেলার বাঁধ। বছর ঘুরতে না ঘুরতে এসব বাঁধে ভাঙন দেখা দেয়। তখন পানি উন্নয়ন বোর্ড সংস্কারের নামে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করলেও তাতে খুব একটা কাজ হয় না। গাফিলতি ও টাকা লুটপাটের ফলে নড়বড়ে বাঁধ বর্ষা এলেই ভাঙতে থাকে। হাজার হাজার কোটি টাকা পানিতে ভেসে যায়। মানুষের ভোগান্তি আর কমে না। পানি উন্নয়ন বোর্ডের একশ্রেণীর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের জন্য বাঁধগুলো অর্থ লুটপাটের একটি স্থায়ী প্রজেক্টে পরিণত হয়েছে। একে দেশের লাখ লাখ মানুষের জীবন-মরণ সমস্যা নিয়ে ব্যবসা ছাড়া আর কি বলা যেতে পারে! দায়সারাগোছের কাজের ফলাফল প্রতি বছরই দেখা যায়। দেশের উত্তরাঞ্চল বন্যাকবলিত হলে, পানির প্রবল ¯্রােতে বাঁধ ভেঙ্গে শত শত গ্রাম, ফসলি জমি, গবাদি পশু তলিয়ে যায়। নদী ভাঙনে বিলীন হয়ে যায়, কৃষি জমি, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও জনপদ। নদী ভাঙন শুধু ভূখ-গত কাঠামো পরিবর্তন নয়, হাজার হাজার মানুষকে উদ্বাস্তুতে পরিণত করছে। পরিবার নিয়ে কৃষক ও কাজের লোক বেকার হচ্ছে। এদের কর্মসংস্থানের দায়িত্ব নিতে সরকারকে দেখা যায় না। অর্থনীতির ভাষায়, দেশে একজন লোকও যদি বেকার থাকে, তবে তার ভরণপোষণের চাপ পরিবার থেকে রাষ্ট্রের অর্থনীতির উপর পড়ে। রাষ্ট্রের প্রশাসনিক দুর্বলতা ও অবহেলায় যদি কর্মক্ষম শত শত কৃষক ও ব্যক্তি বেকার হয়, তবে তাদের কর্মসংস্থানের চাপ অর্থনীতির উপর কি পরিমাণ পড়ে, তা বোধকরি ব্যাখ্যা করে বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার যে স্বপ্ন দেখছি, নদী ভাঙনে লাখ লাখ মানুষের যে ক্ষতি হচ্ছে, তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া যে তার উপর পড়ছে, তাতে সন্দেহ নেই। এত বড় ক্ষতির দায় কে নেবে? এই দায় কি বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের দায়িত্বে নিয়োজিত পানি উন্নয়ন বোর্ড নিচ্ছে? দুর্নীতি ও গাফিলতির কারণে দেশের মানচিত্র বদলে যাওয়া, আভ্যন্তরীন ভূখ- হারানো এবং মানুষের উদ্বাস্তু হওয়ার দায় কি তার উপর বর্তায় না? পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে জিডিপি’র ১.৮ শতাংশ হারায়। ১৯৭০ সালের তুলনায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ ৫ গুণ বেড়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে ৯ গুণ। আর জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড রিস্ক রিপোর্ট অনুযায়ী, দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের ১৭৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম সারিতে রয়েছে। এসব তথ্য-উপাত্ত থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, বাংলাদেশ কতটা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। সরকার সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে কৃষি জমিতে ঢুকে পড়া লবনাক্ত পানির হাত থেকে কৃষিজমি রক্ষা করতে উপকূলীয় অঞ্চলে বাঁধ নির্মাণ ও পুনর্বাসনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এছাড়া আবহাওয়ার পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি হ্রাস ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় ৫০ থেকে ১০০ বছরের ডেল্টা প্ল্যান প্রণয়ন করেছে। সরকারের এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে এসব পরিকল্পনা যে মন্ত্রণালয় এবং যেসব বিভাগ বাস্তবায়ন করবে, তাদের আন্তরিকতা, সততা, দক্ষতা এবং যথাসময়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়টি কঠোরভাবে যদি মনিটর করা না হয়, তবে এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হোঁচট খেতে পারে। বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার নিয়ে চলমান প্রকল্পগুলোতে এর নজির রয়েছে। বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি ও যথাসময়ে সংস্কারের উদ্যোগ না নেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল উল্লেখিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব।
চার.
নদী ভাঙনের যে ভয়াবহতা পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে কোন ধরনের শৈথিল্য ও গাফিলতি কাম্য নয়। তাকে যথাসময়ে যথাযথভাবে বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। এই নির্মাণ ও সংস্কার যাতে স্থায়ী হয়, বালির বাঁধে পরিণত না হয়, এজন্য কঠোর মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। যেসব এলাকায় বাঁধ ভেঙে গেছে এবং দুর্বলভাবে নির্মিত হয়েছে, কেন এমন হলো এ নিয়ে সেসব এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। বাঁধ নির্মাণ, সংস্কার এবং ভাঙন রোধক প্রকল্প নিয়ে বছরের পর বছর ধরে কিছু লোকের অসৎ বাণিজ্য চলতে পারে না। বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য শুধু বাঁধ নির্মাণ করলেই হবে না, বন্যার পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করে শুষ্ক মৌসুমে কাজে লাগাতে হবে। পানির রিজার্ভার গড়ে তুলতে হবে। এজন্য, নদীর নাব্য বজায় রাখার কার্যক্রম জোরদার, খাল খনন কর্মসূচি, লেক, হাওর-বাওর, বিল-ঝিল-পুকুর সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। এসব উদ্যোগ সফল করতে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষদের উদ্বুদ্ধ ও কাজে লাগাতে হবে। এতে যেমন কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে, তেমনি পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজও হবে। দুর্যোগ মোকাবিলার ক্ষেত্রে ক্রাইসিস ব্যবস্থাপনার চেয়ে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিতে হবে। এক্ষেত্রে ১ ডলার ব্যয় করলে ১০ ডলার পরিমাণ সম্পদ রক্ষা পায়। অর্থাৎ ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পর ব্যবস্থা নেয়ার চেয়ে ক্ষতি হওয়ার আগে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে বন্যা, ঝড়-ঝঞ্ঝা, নদী ভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার ক্ষেত্রে এ ধরনের ব্যবস্থাপনার উপর জোর দেয়া এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে এক বিশাল উপকূলীয় অঞ্চল বিস্তৃত, যা দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ ও জনজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উপকূলীয় অঞ্চলে দেশের ১৯টি জেলায় প্রায় ৩ কোটি মানুষের বসবাস। বাংলাদেশের মোট ভূমির প্রায় ৩২ শতাংশ উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থিত। তবে উপকূলীয় অঞ্চল দেশের কৃষি, মৎস্য ও সামুদ্রিক অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হলেও জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন ও ঘূর্ণিঝড়সহ বিবিধ দুর্যোগের কারণে উপকূলীয় জনপদ আজ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর অন্যতম। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি সূচক (২০১৯) অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বের সপ্তম সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। ঘূর্ণিঝড় সিডর (২০০৭), আইলা (২০০৯), বুলবুল (২০১৯) এবং মোখা (২০২৩) উপকূলীয় জীবনের দুর্বলতা এবং অভিযোজন ব্যর্থতার দুর্বলতা প্রকাশ করেছে।
১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ৫ লক্ষাধিক প্রাণহানি, অসংখ্য পরিবার ধ্বংস ও উপকূলীয় জীবনব্যবস্থার বিপর্যয়ের স্মারক এই দিনটি আমাদের দুঃখময় স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১২ নভেম্বর ‘উপকূল দিবস’ পালনের দাবি ও তাগিদটি তৈরি হয়েছে। সত্তরের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে লাখো মানুষের প্রাণহানির বেদনা বহন করে চলেছে এই দিবস যা কেবল শোক পালনের জন্যই নয়, বরং এটি উপকূলের গুরুত্ব অনুধাবন করে এর শক্তিকে কাজে লাগানো এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি দুর্যোগসহনশীল বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকারের দিন। আমাদের উপকূলের শক্তিকে দেশের সামগ্রিক সমৃদ্ধির কেন্দ্রে আনতে হলে প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল কেবল দুর্যোগ এবং দুর্ভাগ্যের গল্প নয়, এটি শক্তি, সম্ভাবনা এবং সমৃদ্ধির আধার। প্রায় ১৯টি জেলার বিস্তৃত উপকূলজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, মৎস্য এবং সামুদ্রিক অর্থনীতি জাতীয় প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি।
উপকূলীয় অঞ্চলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সমুদ্র অর্থনীতি বা ‘সুনীল অর্থনীতি (ব্লু-ইকোনমি)’। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক মৎস্য আহরণ, জাহাজ চলাচল, অফশোর সম্পদ ও পর্যটন শিল্প জাতীয় আয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। পাশাপাশি, চিংড়ি চাষ ও লবণ উৎপাদনের মতো কৃষিভিত্তিক খাতগুলো কোটি মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করছে। অন্যদিকে, সুন্দরবনসহ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল বাংলাদেশের ‘প্রাকৃতিক ঢাল’ হিসেবে কাজ করে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় এই বন শুধু মানুষকেই নয়, গোটা উপকূলকে সুরক্ষা দেয়। এটি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধেও একটি প্রাকৃতিক প্রতিরোধক। সংগতকারণে এই অঞ্চল যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করছে, তেমনি দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায়ও অনন্য ভূমিকা রাখছে।
একটি টেকসই উপকূল গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন একটি সমন্বিত, মানবকেন্দ্রিক ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন কৌশল— যেমন: ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, বাঁধ মজবুতকরণ, আধুনিক বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও টেকসই গৃহনির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন। টেকসই মৎস্য আহরণ পদ্ধতি, সামুদ্রিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কঠোর নীতি অবলম্বন করা জরুরি।
উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ মূলত মৎস্য, কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসাভিত্তিক জীবিকার ওপর নির্ভরশীল। ইউএনডিপি (২০২০)-এর তথ্যানুযায়ী উপকূলীয় জেলা বিশেষ করে খুলনা, ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, সাতক্ষীরার প্রায় ৩ কোটি মানুষ সরাসরি জলবায়ু ঝুঁকিতে রয়েছে। এই সকল উপকূলীয় অঞ্চলের ৭০% মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে কৃষি ও মৎস্যের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু বছরে গড়ে ৪-৫ বার তারা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকে। এখানকার বৈচিত্র্যময় অর্থনৈতিক কাঠামো স্থানীয় ও জাতীয় উভয় পর্যায়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। তবে এই সম্ভাবনাময় অঞ্চল প্রতিনিয়ত একাধিক ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে। যেমন: ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙন এখানে জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড়ের প্রবল বাতাসের প্রকোপে এখানকার জনপদ তাদের প্রাণনাশের ঝুঁকিতে থেকে হারাচ্ছে আবাসস্থল ও পরিবহন যোগাযোগব্যবস্থা। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর তথ্য (২০২০) অনুযায়ী ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ১,৩৮,০০০ জন নিহত হয়।
ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে প্রতি মৌসুমে ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে বনাঞ্চল, নষ্ট হচ্ছে বসবাসরত প্রাণীদের বাস্তুসংস্থান, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে প্রজননে। বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম, তলিয়ে যাচ্ছে আবাদি ফসল। কলেরা, ডায়রিয়া, টাইফয়েডের মতো পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে মহামারীতে রূপ নিচ্ছে। বাংলাদেশের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন (২০১৬) অনুযায়ী, দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ৩০% এলাকা নিয়মিত জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়াও আন্তঃসরকার জলবায়ু পরিবর্তন প্যানেল (আিইপিসিসি, ২০১৬) এর তথ্যমতে, সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ১৭% উপকূলীয় এলাকা নিমজ্জিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নদী ভাঙনের প্রভাবে গ্রামের পর গ্রাম বিলীন হয়ে যায় নদীগর্ভে, বাড়ে বাস্তুচ্যুত মানুষ যারা কর্মসংস্থানের জন্য ভিড় জমায় শহরে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (২০১৯)-এর তথ্য অনুসারে, প্রতিবছর গড়ে ৮,০০০-১০,০০০ হেক্টর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়। কর্মহীন মানুষের দরিদ্র্যতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে সামাজিক বিশৃঙ্খলা, পুষ্টিহীনতা ও নিরাপত্তাহীনতার যার শিকার হয় নারী ও শিশুরা। উপকূলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও খরার প্রভাবে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি ও মৎস্যখাত। ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে সুপেয় জলের সংকট। সাম্প্রতিক গবেষণা ও আন্তর্জাতিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, নদীর লবণাক্ততা বাড়ার ফলে উপকূলীয় কৃষি, মৎস্যচাষ ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা তীব্র হচ্ছে এবং আগামী দশকে ঝুঁকি আরও বাড়বে। মাটি সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে (২০১৮) উপকূলীয় এলাকার প্রায় ৮৩ লাখ হেক্টর জমির ৫৩% এখন লবণাক্ততায় আক্রান্ত এবং এর ফলে ধান, ডাল ও শাকসবজির উৎপাদন ২০-৩০% পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। এছাড়াও উপকূলে অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, বনায়ন হ্রাস ও মেগা প্রজেক্টের করনণ উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য ও বনজ সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জীবিকার স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে। বিশ্বব্যাংক (২০২৪) অনুযায়ী, আগামী ২০ বছরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে, যা বাংলাদেশের উপকূলীয় ১৮% ভূমি প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি করছে।
উপকূল শুধু ভৌগোলিক অঞ্চল নয়, এটি এমন একটি জীবনব্যবস্থা, যেখানে সুপ্ত রয়েছে সমুদ্রভিত্তিক সুনীল অর্থনীতির অপার সম্ভবনা। এই জীবনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও নীতিগত সমর্থন জরুরি। কেননা, উপকূল শুধু বাংলাদেশের সীমানা নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখার মেরুদ-ও বটে। উপকূলের শক্তি কাজে লাগিয়ে দুর্যোগ সহনশীল বাংলাদেশ গড়া কেবলই একটি লক্ষ্য নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। উপকূলের সুরক্ষা মানেই নিরাপদ বাংলাদেশ। উপকূলকে কেন্দ্র করে প্রয়োজন নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা, যেখানে উন্নয়ন হবে দুর্যোগসহনশীল, পরিবেশবান্ধব এবং মানবকেন্দ্রিক।
সাতক্ষীরা শ্যামনগর উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা অস্বাভাবিকভাবে দিন দিন বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে দেশের দক্ষিণ পশ্চিমের জেলা সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের আবহাওয়া জীববৈচিত্র্যের উপর প্রভাব পড়ছে ব্যাপকভাবে।
জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে ১৯৮৮ সালে প্রথম এ উপকূলীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটে। ঘুর্ণীঝড়ের দাপটে নোনা পানির প্রচন্ড শ্রোতে উপকূলীয় এলাকার ফসলি জমি ও মানুষের জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এরপর উপকূলীয় অঞ্চলে পর্যায় ক্রমে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটতে থাকে।
দেশের দক্ষিণ পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের উপর দিয়ে ২০০৮ সালের ১৫ নবেম্বর ‘সিডর’ এবং ২০০৯ সালের ২৫ মে ‘আইলা’ নামক দুটি প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট ঝড় বয়ে যায়। সিডর’ ও ‘আইলা’ ঝড়ের ফলে তাৎক্ষতিক ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াও এর ফলে একটা দীর্ঘ মেয়াদি পরিবেশগত ক্ষতি ও পরিবর্তন দেখা দিয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিহয় আইলায় ৭১১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে সমুদ্রের লোনাপানি প্রায় দুই লাখ একর ফসলি জমির ভেতর ঢুকে পড়ে আর বের হতে পারেনি। এর ফলে তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদি অনেক ক্ষতি হয়েছে। মিষ্টি পানির ফসল উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক বৃক্ষ ও গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ মারা গেছে। এবং লোনাপানির বদ্ধতার কারণে অনেক প্রজাতির উদ্ভিদ প্রায় বিলুপ্ত হয়েছে। অনেক বন্যপ্রাণী ও স্থানীয়ভাবে পালন করা হাস, গরু, ছাগল,প্রভৃতির খাদ্য সংকট সৃষ্টি হওয়ায় এ অঞ্চলে সকল গৃহপালিত পশুপালন ব্যাহত হয়েছে।
আর এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার নানা দিকের একটি হলো এ অঞ্চলের মানুষের খাদ্য পুষ্টি ঘাটতি।
আইলায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাতক্ষীরা জেলার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে সরকার এবং বিভিন্ন এনজিও ও সংস্থা সাহায্য কারলেও, আইলার আট বছর পরেও এ এলাকা মানুষের বসবাসের উপযোগী করে গড়েতুলতে পারিনি। পারিনি এই উপকূলীয় মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা, পুষ্টি ও খাদ্য নিশ্চিত করতে।
ছবিতে, আইলায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত সাতক্ষীরা শ্যামনগর উপজেলার পদ্মাপুকুর ইউনিয়নের শিক্ষা ও চিকিৎসাহীন গুচ্ছগ্রামের অপুষ্টো শিশুরা। এই গুচ্ছগ্রামে ৮১ পরিবারে দু’শোরও বেশি অপুষ্ট শিশু রয়েছে। শিক্ষা চিকিৎসাহীন অপুষ্ট শিশুরা ব্যাবহার হচ্ছে এনজিও ও সংস্থাগুলোর কাছে।
জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশের এই উপকূলীয় অঞ্চল। এইমর্মে, বিশ্বের বড় বড় দাতাসংস্থার কাছে অপুষ্ট মা শিশু ও অসহায় মানুষের করুণচিত্র তুলেধরে বিশাল অঙ্কের অর্থ সহযোগিতা নিয়ে নিজেরাই পকেট ভর্তি করছে এনজিও ও সংস্থাগুলো। শুধুই খাতা কলমে কর্মকান্ড সীমাবদ্ধ রেখেছেন। মুখে বলেন উপকূলের মানুষের সুপেয়পানি, পুষ্টি, চিকিৎসা, শিক্ষা, নিশ্চিত করা হয়েছে। সৃষ্টি করা হয়েছে বনায়ন ও কর্মসংস্থানের। সরজমিনে গিয়ে দেখা যায় এ সবের উল্টো, উপকূলীয় মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছে।
আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত এউপকূলীয় অঞ্চলে বনায়ন সৃষ্টিকরা হয়নি, চাষাবাদের অযোগ্য রয়ে গেছে সমতল ভূমি। নেই সুপেয় পানির ব্যবস্হ।
সকল ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর, বিশ্বপ্রকৃতি তার হুকুমেই চলে, আল্লাহর রহমত ছাড়া মানুষ চরম অসহায়। আল্লাহ সব বিষয়ে সর্বশক্তিমান। ইল্লাল্লাহা আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর। পবিত্র কোরআনে বহুবার এ কথাটি এসেছে। এ বিশ্ব প্রকৃতি সৃষ্টিজগত আল্লাহর নির্দেশে তার নিঁখুত ব্যবস্থাপনায় প্রতিনিয়ত চলছে। মানুষের ধারণা ও কল্পনার চেয়েও বড় এবং সুনিপুন সৌরজগত, মহা বিজ্ঞানময় অনুপম এই পৃথিবীর প্রতিটি কণা, অণু-পরমাণু আল্লাহর হুকুমে বিবর্তিত হয়। ইউসাব্বিহু লাহূ মা ফিস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ। আকাশ মণ্ডলী ও বিশ্ব চরাচরে যা কিছু আছে, সবই আল্লাহর গুণগান ও পবিত্রতা বর্ণনার তসবিহ পড়ে। আল্লাহ পরম ক্ষমতাশালী, মহাপ্রজ্ঞা ও কৌশলময়। (সূরা হাশর : ২৪)।
তুরস্কে সর্বকালের বড় দাবানল দেখা গেছে ২০২১ এর জুলাই ও আগস্টের দশ পনেরো দিন। তুরস্ক বিশাল একটি রাষ্ট্র। এর পার্বত্য বনাঞ্চল ও উপকূলীয় পর্যটন এলাকায় শত শত জায়গায় একই সাথে দাবানল জ্বলে ওঠে। এর ভয়াবহতা ছিল ভাবনাতীত। মাইলের পর মাইল বন ও পাহাড়ি গ্রাম পুড়িয়ে আগুনের লেলিহান শিখা সমুদ্রপার পর্যন্ত চলে যায়। পর্যটন রিসোর্ট জ্বলতে থাকে। আগুন লাফিয়ে চলে নতুন এলাকায় দাবানল হয়ে জ্বলে।
বাতাসের গরম তেজ ও আগুনের কালো ধোঁয়ায় আকাশ ঢাকা পড়ে। মানুষ নিঃশ্বাস নিতে না পেরে দৌড়াতে থাকে। নিজের পরনের কাপড়টুকু নিয়েই মানুষ পালাতে শুরু করে। কিছু মানুষ টাকা পয়সা গয়নাগাটি আর ব্যবহারের সামান্য বস্ত্রাদি নিয়ে বাড়িঘর আগুনের মুখে রেখে পালাতে থাকে। গ্রামের নারী পুরুষদের দেখা যায় নিজেদের গবাদি পশুগুলোকে হাঁকিয়ে সমুদ্র তীরে নিয়ে যেতে। আগুনের হাত থেকে আত্মরক্ষার আর কোনো উপায় তাদের ছিল না।
একাধারে দুই সপ্তাহ দাবানল জ্বলতে এবং নতুন নতুন জায়গায় ছড়াতে থাকে। পাশ্ববর্তী অঞ্চল ইজরায়েলে এ দাবানল দেখা গেছে। বিশেষ করে গ্রিসের অনেক অঞ্চল দাবানলের শিকার হয়। তবে তুরস্কের ব্যাপক এলাকাজুড়ে শত শত দাবানল একই সাথে জ্বলতে শুরু করলে দেশটিতে বিপুল আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সতর্কতা ও অব্যাহত নির্বাপন চেষ্টায় প্রাণহীন কম হলেও মানবিক বিপর্যয় ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি বিপুল আকার ধারণ করে।

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট