
ডেস্ক রিপোর্ট : র্যাব কোষ্টগার্ডের অব্যাহত অভিযান সত্ত্বেও আত্মসমর্পণের মাধ্যমে দস্যুমুক্ত সুন্দরবনে এখন আবারও দস্যুতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনে এই মুহুর্তে কমপক্ষে ৭টি দস্যু বাহিনী বনজীবীদের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক। প্রতি গোনে ডাকাতরা জেলে বাওয়ালীদের কাছ থেকে কোটি টাকার চাদা আদায় করছে। বঙ্গোপসাগরের ফিসিং ট্রলার আটক করে জেলেদের জিম্মি তাদের নিত্যদিনের ঘটনা।এমন পরিস্থিতিতে পেশা বদলাচ্ছেন বনজীবীরা। এর ফলে বন বিভাগের রাজস্ব আদায় কমেছে অর্ধেকের নিচে। যদিও কোষ্টগার্ড ইতোমধ্যে গত এক বছরে প্রায় ৪৮ জন বনদস্যুকে আটক করেছে। উদ্ধার করা হয়েছে ডাকাত দলের হাতে জিম্মি অর্ধশত জেলেকে। এসময় কোষ্টগার্ড বিপুল পরিমান অস্ত্র ও গোলাবারূদ উদ্ধার করে।
সূত্রমতে, বনদস্যুদের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে ২০১৮ সালের নভেম্বরে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়। ৫ আগষ্টেরপর সাতক্ষীরা জেলা কারাগার থেকে পালানো দাগি আসামি এবং ৭ বছর আগে আত্মসমর্পণ করা বনদস্যুরা সুন্দরবনে গিয়ে শুরু করেছে নতুন করে দস্যুতা। ছাত্র-জনতার বিপ্লবের সময় লুট হয়ে যাওয়া আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ, মিয়ানমার এবং ভারতের সীমান্ত থেকে বিভিন্ন আধুনিক অস্ত্র ও দেশীয় তৈরী অস্ত্র সংগ্রহ করে ডাকাত বাহিনীগুলো এখন সুন্দরবনের অঘোষিত সম্রাট সেজেছে।
সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। জীববৈচিত্র্যের ভান্ডার। এ বন শুধু প্রকৃতির জন্য নয়, হাজারো জেলের জীবিকার ভরসাস্থল। কিন্তু আজ সেই সুন্দরবনই জলদস্যু ও বনদস্যুদের তৎপরতা বাড়ায় জেলেদের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে উঠেছে। গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে সুন্দরবনে জেলে অপহরণ, ডাকাতি, চাঁদা আদায়সহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনা বাড়ছে। সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি সুন্দরবন। সেই বনে আবারও আতঙ্কের কারণ হয়ে দাড়িয়েছে বনদস্যু দল। অপহরণ, ডাকাতিসহ নানা অপরাধের অভয়ারণ্য হয়ে উঠছে সুন্দরবন।
বনজীবী সমিতির নেতা আব্দুল গফুর বলেন, প্রশাসনের কার্যক্রম সন্তোষজনক নয়। যদি সত্যিকারে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ভূমিকা নিতো তাহলে সুন্দরবনে ডাকাতে সয়লাব হতো না। বর্তমানে সক্রিয় ৭টি বাহিনীর মধ্যে রয়েছে শরীফ বাহিনী, মামা-ভাগ্নে বাহিনী, আছাবুর বাহিনী, মজনু বাহিনী, জাহাঙ্গীর বাহিনী, আনারুল বাহিনী ও রাঙ্গা বাহিনীর নাম উঠে আসছে। তাদের বিরুদ্ধে অপহরণ, জিম্মি করে নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায়- এমন বেশ কয়েকটি অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী জেলেরা। জানা গেছে, আত্মসমর্পণ করা বনদস্যু আলিম বাহিনীর প্রধান আব্দুল আলিম, মিলন, জিয়া, জনাব ও নুরু বর্তমানে ভারতে বসে চাঁদা দাবি করছে। গত কয়েক বছর ধরে সুন্দরবন দস্যুমুক্ত থাকলেও বর্তমানে দু-একটি বাহিনী নতুন নামে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
৫ আগস্টের পর থেকে গত এক বছরে কোস্ট গার্ডের অভিযানে ৩৭টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৪৩টি দেশীয় অস্ত্র, বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ও ককটেল উদ্ধার হয়েছে। মুক্ত করা হয়েছে জিম্মি থাকা অর্ধশত জেলেকে। আটক করা হয়েছে ৪৮ জন ডাকাত ও তাদের সহযোগীদের। আত্মসমর্পণ করা দস্যুদের কেউ কেউ আবার জড়িয়ে পড়ছে আগের অপরাধে।
বনবিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র বলছে, সুন্দরবনের বনদস্যুরা কয়েক দফায় আত্মসমর্পণ করে আলোর পথে ফিরেছিল। ২০১৬ সালে সুন্দরবনের সাতটি বনদস্যু দল একসঙ্গে আত্মসমর্পণ করে। সে সময় ৩২ জন বনদস্যু অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার অঙ্গীকার করে। এরপর ২০১৮ সালের পহেলা নভেম্বর ৯টি বনদস্যু বাহিনীর ৫৭ জন বনদস্যু আত্মসমর্পণ করে। পরে আরেক দফায় ২০১৯ সালের পহেলা নভেম্বর আরো ২৫ জন বনদস্যু আত্মসমর্পণ করে। প্রায় শতাধিকের বেশি বনদস্যু আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে, যার কারণে সুন্দরবন দস্যুমুক্ত হওয়ার পথে অগ্রসর হয়।
সেভ দ্যা সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও বগেরহাট জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘বনদস্যুরা সাধারণত বনজীবী কিংবা জেলে বাওয়ালিদের ছদ্মবেশে সুন্দরবনের প্রবেশ করে দস্যুতায় জড়িয়ে পড়ে। এসব বনদস্যুদের ডাটাবেজ তৈরি করে তাদেরকে ডিজিটালাইজড করতে হবে, যাতে সহজেই তাদেরকে চিহ্নিত করা যায়। তাদেরকে বিকল্প কর্মসংস্থানের সাথে যুক্ত করতে হবে। সুন্দরবনের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এটি শুধু একটি নিরাপত্তার ইস্যু নয়, বরং এটি অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সংকটের দিকেও ইঙ্গিত করছে। যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়া হয়, তবে এই প্রাকৃতিক সম্পদ ও এর উপর নির্ভরশীল মানুষের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।’