
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দিন দিন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। এর সবচেয়ে বড় শিকার দেশের শিশু-কিশোররা। বিশেষজ্ঞদের মতে, তীব্র বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, খরা ও লবণাক্ততার মতো জলবায়ু বিপর্যয় এখন শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। বাড়াচ্ছে বাল্যবিয়ে ও শিশুশ্রমের ঝুকি।
জাতিসংঘের শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বিশ্বে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম, যেখানে প্রায় দুই কোটি শিশু নিয়মিত জলবায়ু দুর্যোগের মুখে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপকূলীয় অঞ্চলে পানিবাহিত রোগ, পুষ্টিহীনতা ও শিক্ষার ব্যাঘাত মারাত্মকভাবে বাড়ছে। অনেক শিশু পরিবার হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে, আবার কেউ পড়ছে বাল্যবিয়ে বা শিশুশ্রমের ফাঁদে। নদীভাঙনের ফলে বাড়িঘর ও বিদ্যালয় হারানো শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যেও ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
চাইলে ইউএনডিপির জেন্ডার টিম লিডার শারমিন ইসলাম বলেন, উপকূলীয় এলাকায় আমরা কাজ করতে গিয়ে দেখি সেখানে কন্যাশিশুরা বেশি বাল্যবিয়ের শিকার হয়। এতে নারীর উন্নয়ন অনেকভাবেই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাল্যবিয়ের কারণে ওই কন্যাশিশু বা কিশোরীরা জীবনের শুরুতেই স্বামী-সংসার নিয়ে ব্যস্ততা হয়ে যাচ্ছে। কম বয়সে মা হয়ে পুষ্টিহীনতাসহ শারীরিক নানা ঝুকিতে পড়ছে তারা। ঝরে পড়ছে স্কুল থেকে। কিন্তু তাদের যদি বাল্যবিয়ে না হতো, তাহলে তারা আরও দক্ষতার সঙ্গে পড়াশোনা ও কাজ করতে পারত।
শারমিন ইসলাম এই প্রতিবেদককে আরও বলেন, ‘মাসিক ব্যবস্থাপনার অভাবে এসব এলাকার নারী ও কম বয়সী মেয়েরা নিয়মিত জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি খান দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কথা না জেনেই। এতে পরবর্তীতে তাদের নানা শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়। অবার যাদের বাল্যবিয়ে হচ্ছে তারা জন্মনিয়ন্ত্রণ না করায় কম বয়সে মা হচ্ছেন। এতে তাদের ও শিশুর স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে। এ জন্য আমরা তাদের সচেতন করছি, যেন বাল্যবিয়ের পর তার কম বয়সে মা না হন।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দিন দিন নতুন রোগের বিস্তার ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়েই চলেছে, যার ফলে একটি পরিবারকে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আর্থিক সংকট। এই আর্থিক চাপ সরাসরি শিশুদের ওপর প্রভাব ফেলে, যা তাদের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে শিশুদের শৈশব ও স্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ে ঝরে পড়ছে শিক্ষা থেকে, যুক্ত হচ্ছে শিশু শ্রমে।
সেভ দ্য চিলড্রেন-এর চাইল্ড প্রোটেকশন অ্যান্ড চাইল্ড রাইটস গভার্নেন্স বিভাগের পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন এই প্রতিবেদককে বলেন, শিশুদের বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সুবিধা দিতে চাওয়া হলেও যেহেতু তাদের শ্রমে যাওয়ার মুল কারণ পারিবারিক অস্বচ্ছলতা তাই তারা নানা প্রকল্পের সুবিধা নিতে পারে না। কারণ এসব প্রকল্প থেকে তার পরিবারের অবস্থার কোনো তাৎক্ষণিক পরিবর্তন বা সুফল মেলে না। এসব ক্ষেত্রে শিশুকে শ্রম থেকে সরিয়ে আনতে আমরা তিন ভাবে কাজ করি। এর মধ্যে প্রথমত আমরা ওই পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা করি। না হলে পরিবারের অন্য সদস্যকে ওই শিশুর বিকল্প হিসেবে উপার্জনের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। আর শিশুটি যদি ১৪ বছরের বেশি বয়সি হয় তাহলে তাকে কোন ঝুকিবিহীন কাজের প্রশিক্ষণ দিয়ে উপার্জনের ব্যবস্থা করা হয়।
শিশু অধিকারকর্মীরা মনে করেন, জলবায়ু পরিকল্পনা প্রণয়নে শিশুদের কণ্ঠস্বর অন্তর্ভুক্ত করা, সচেতনতা বাড়ানো এবং শিশুদের নেতৃত্বে স্থানীয় অভিযোজন প্রকল্প চালুর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত সংকট নয়, এটি এখন শিশুদের অধিকার রক্ষার লড়াইও। সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন অভিযোজন প্রকল্প গ্রহণ করলেও শিশু-কিশোরদের জন্য আলাদা করে জলবায়ু সহনশীল শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব পড়ছে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের লাখো মানুষের জীবনে। এই সমস্যা থেকে বাদ যাচ্ছে না কোমলমতি শিশুরাও। অন্যান্য অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা হলেও কথা হয় না এসব শিশুকে নিয়ে। এ বিষয়ে বিস্তারিত…
খুলনার দাকোপের কামারখোলা ইউনিয়নের আনিস মোল্লা। ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডর আর ২০০৯ সালের আইলা তার সাজানো সংসার তছনছ করে দিয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ে সবকিছু হারিয়ে বাঁধের ওপর কেটেছে জীবনের পরবর্তী সাতটি বছর। ইচ্ছে থাকলেও দুই সন্তানকে লেখাপড়া করাতে পারেননি। একমাত্র মেয়েকে নিরুপায় হয়ে অল্প বয়সে বিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। টাকার জন্য ছেলেদের পাঠিয়েছেন কাজে। আনিস মোল্লার পরিবারের মতো এমন ঘটনা দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের অজস্র পরিবারের না-বলা গল্পই যেন।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তিক অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান। এ সমস্যা থেকে রেহাই পাচ্ছে না কোমলমতি শিশুরাও।
জলবায়ুগত দুর্যোগে ঘরবাড়ি হারানো পরিবারগুলোর শিশুরা উপার্জনের জন্য কাজে যোগ দিতে বাধ্য হচ্ছে! দায়িত্ব নিতে না পেরে অনেক পরিবার মেয়েশিশুদের বাধ্য হয়ে বিয়ে দিচ্ছে। বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে উপকূলীয় বহু পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে এক পর্যায়ে কাজের খোঁজে শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। এতে এসব পরিবারের শিশুরা পাচারসহ যৌন হয়রানির ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে। এ ছাড়া উপকূলীয় এলাকার শিশু ও নারীদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাও নাজুক। ইউনিসেফের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ঝুঁকির মধ্যে থাকা প্রায় ২ কোটি শিশুর মধ্যে নদী ভাঙন এলাকাগুলোয় বাস করছে ১ কোটি ২০ লাখ। এ ছাড়া উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকিতে রয়েছে ৪৫ লাখ শিশু আর খরার ঝুঁকিতে ৩০ লাখ।
১৫ লাখের বেশি মানুষ নিজস্ব আবাসস্থল পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের জেনেভাভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টারের অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি সম্পর্কিত ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার ৭৬ ভাগ শিশু ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ উচ্চ তাপমাত্রায় ভুগছে। সংখ্যার বিচারে ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ৪৬ কোটি শিশু। বিশ্বের যে কোনো অঞ্চলের মধ্যে এ হার সর্বোচ্চ।
গত দুই দশকে বাংলাদেশে ১৮৫টি প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হেনেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে সপ্তম। আর জলবায়ু ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি আছে এ দেশের উপকূলীয় এলাকার মানুষ ও প্রকৃতি।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সুপেয় পানির আধার এখন ধুঁকছে। লবণাক্ততার প্রভাব পড়েছে উপকূলজুড়ে। ফলে উপকূলের শিশুদের জীবনে সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। কোনো না কোনোভাবে লবণাক্ত পানি পান করতে বাধ্য হচ্ছে শিশুরা। এ কারণে তারা নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। দীর্ঘ সময়ব্যাপী লবণপানি পান করার কারণে শিশুদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা জেলায় লবণাক্ততার প্রভাব সবচেয়ে বেশি। গবেষণার তথ্যমতে, সাতক্ষীরা ও খুলনার কিছু কিছু এলাকায় পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ ১০ পিপিটি (লবণাক্ততা পরিমাপক মাত্রা) পর্যন্ত।
বাংলাদেশ মৃত্তিকা সম্পদ ইনস্টিটিউটের এক গবেষণা বলছে, দেশের উপকূলবর্তী প্রায় ৫৩ শতাংশ অঞ্চল সরাসরি লবণাক্রান্ত। সুপেয় পানির অভাবে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাটের মানুষের সার্বিক জীবনব্যবস্থায় বিরূপ প্রভাব পড়ছে। চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করা শিশুর অধিকাংশই লবণপানি পান করছে। আবার মাটির গভীর থেকে পানি তোলার ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যাচ্ছে। লবণাক্ত পানির প্রভাবে এলাকার ফসল উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সার্বিকভাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনজীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছে।
বিশ্বে বাল্যবিবাহপ্রবণ শীর্ষ দেশসমূহের মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম সারিতে। ২০২০ সালে ইউনিসেফের (জাতিসংঘ শিশু তহবিল) এক প্রতিবেদনমতে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ বাল্যবিবাহের দিক দিয়ে শীর্ষে। ২০১৮ সালে বাল্যবিবাহের হার ছিল ৫৯ শতাংশ। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গবেষণা বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশে ৫০ শতাংশ মেয়ের বাল্যবিবাহ হচ্ছে। বাংলাদেশে যত বাল্যবিবাহ একের পর এক দুর্যোগে ক্ষতবিক্ষত উপকূলের পরিবারগুলোর আর্থিক অবস্থা যেন আরও খারাপ হচ্ছে। ফলে অভিভাবকরা কিশোরী মেয়েটাকে আর ঘরে রাখতে চাচ্ছেন না! দ্রুত বিয়ে দেওয়াটাই তাদের জন্য যেন অনেক বেশি স্বস্তির! অনেক পরিবার উপকূল ছেড়ে শহরে এসে বালিকা মেয়েকে বিয়ে দিচ্ছে। উপকূলে লবণাক্ততার সঙ্গে দীর্ঘদিন বসবাস করার ফলে বাল্যবিবাহের শিকার নারীদের জরায়ু সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে উপকূলের জীবনযাত্রা খারাপ হচ্ছে দিন দিন। কাজের ক্ষেত্র কমে যাচ্ছে, বিপরীতে জীবনযাত্রার খরচ বাড়ছে। কাজ হারিয়ে অনেক পরিবার চরম দারিদ্র্যের কবলে পড়ছে। এক কথায়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলের জীবন বিপর্যস্ত। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে বহু পরিবার শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। শহরে এসেও উদ্বাস্তু শিশুরা যুক্ত হচ্ছে বিভিন্ন শ্রমের সঙ্গে।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৪০ ভাগ শিশু। বেসরকারি তথ্য বলছে, বাংলাদেশে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা পাঁচ থেকে ১৪ বছর বয়সি মোট শিশু জনসংখ্যার ১৯ ভাগ। বাংলাদেশে বর্তমানে শিশুশ্রমের সঙ্গে যুক্ত সঠিক পরিসংখ্যান নেই বললেই চলে। তবে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে শিশুশ্রমের সঙ্গে যুক্ত শিশুর সংখ্যা ৫০ লাখের বেশি। ‘বাংলাদেশ জাতীয় শ্রম আইন-২০১৬’ অনুযায়ী ১৪ বছরের কম বয়সি শিশুদের কাজ করানো হলে তা শিশুশ্রম হিসেবে গণ্য। যদি এখনই শিশুশ্রম বন্ধে কার্যকর, পরিকল্পিত ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ না নেওয়া যায় তাহলে শিশুশ্রমমুক্ত দেশ গড়া স্বপ্নই থেকে যাবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হয়ে উদ্বাস্তু শিশুরা যুক্ত হচ্ছে বিভিন্ন শ্রমের সঙ্গে
প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র পরিবার আলাদা করে শিশুর জন্য কখনও ভাবে না। নতুন বিপদ মূল্যস্ফীতি। ফলে উপকূলবর্তী অঞ্চলসমূহে দারিদ্র্যের সংখ্যা বাড়ছে। উপকূলের বহু দরিদ্র পরিবার জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হয়ে নিয়ে শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। ঠাঁই নিচ্ছে শহরের বস্তি, নদীর তীরে বেড়িবাঁধ কিংবা রেললাইনের পাশে। নিজেরাই যেখানে জীবন ও খাদ্যের সংগ্রামে ক্লান্ত, সেখানে শিশুর পুষ্টির চিন্তা তাদের জন্য রসিকতাই বটে। অপুষ্টির প্রধান কারণ দারিদ্র্য। উপকূলবর্তী জেলাসমূহে দারিদ্র্য বেশি, তাই উপকূলের শিশুরা অপুষ্টির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেও বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের সদ্যপ্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, ২০২১ সালে দেশের হাসপাতালগুলোয় তীব্রতম অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন’-এর তথ্য বলছে, সমুদ্রের পানি প্রতি বছর বাড়ছে ১৪ ইঞ্চি হারে। গত ৩০ বছরে বঙ্গোপসাগরের উচ্চতা বেড়েছে ৬ ফুটের বেশি। পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের চারটি স্যাটেলাইটের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ৩ দশমিক ৮ মিলিমিটার হারে বাড়লেও বাংলাদেশের উপকূলে তা বাড়ছে ৫ দশমিক ৩ ভাগ হারে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের উপকূলের ১৪টি শহর জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকিতে রয়েছে। স্বাভাবিকভাবে এসব অঞ্চলের লাখ লাখ শিশু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং হবে। জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আন্তঃসরকার সংস্থা ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল ফর ক্লাইমেট চেঞ্জের (আইপিসিসি) অন্য এক গবেষণায় বলা হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মিটার বাড়লে বাংলাদেশের প্রায় ১৭ ভাগ উপকূলীয় স্থলভূমি পানিতে তলিয়ে যাবে। ফলে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ জলবায়ু-উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে (প্রতি সাতজনে একজন)। সীমিত সম্পদ ও বিপুল জনসংখ্যাবহুল বাংলাদেশে জলবায়ু-উদ্বাস্তুরা সবকিছু হারিয়ে বাড়তি সমস্যা তৈরি করবে। বোধ করি শিশুরা বিপদে পড়বে সবচেয়ে বেশি। লাখ লাখ শিশু মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা শিশুদের জীবন তছনছ করে দিচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ১৭টি অভীষ্ট সফলভাবে অর্জন করতে হলে এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ ও টেকসই পৃথিবী গড়তে জলবায়ু সমস্যা মোকাবিলার পাশাপাশি অভিযোজনের বিকল্প নেই। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শিশুদের সুরক্ষা দিতে হবে সবার আগে।