1. mesharulislammonir1122@gmail.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন
  2. info@www.sangjogprotidin.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন :
শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ০৮:১১ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
কালিগঞ্জের চৌমুহনী ডিগ্রি মাদ্রাসার সাফল্য উজিরপুর উপজেলা শ্রমিক দলের দোয়া ও মিলাদ মাহফিল নড়াইল–১ ও নড়াইল–২ আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ঘোষণা তালায় শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান হলেন সুপার আব্দুর রাজ্জাক মোল্লাহাটে সংসদ নির্বাচন ২০২৬ ও গণভোট উপলক্ষে ভোটের গাড়ির প্রচারণা দিঘলিয়ায় ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ থানা সম্মেলন অনুষ্ঠিত শ্যামনগরে সড়ক নির্মাণের খোঁড়া গর্তে যাত্রীবাহী বাস কালিয়ায় বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর সঙ্গে সাংবাদিকদের মতবিনিময় কেরানীগঞ্জে নিখোঁজ ছাত্রী ও তার মায়ের লাশ উদ্ধার খালেদা জিয়ার স্মরণে শোকসভা শুরু, অনুষ্ঠানস্থলে তারেক রহমান

অভাবের তাড়নায় ঝরে পড়ছে উপকূলের শিশুরা

  • প্রকাশিত: সোমবার, ৫ জানুয়ারি, ২০২৬
  • ৪৮ বার পড়া হয়েছে
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও সাতক্ষীরার শ্যামনগরে বাল্যবিয়ে ও শিশুশ্রম রোধ করা যাচ্ছে না। শিশুশ্রম ও বাল্যবিয়ের কারণে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ছে উপকূলীয় শিশুরা।
শ্যামনগর উপজেলা শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে উপজেলার ৪৬টি বিদ্যালয়, ৩৬টি মাদরাসা ও ৩টি কারিগরি (ভোকেশনাল) বিদ্যালয়ে মোট ৫ হাজার ৬৫৭ জন শিক্ষার্থী অষ্টম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত ছিল। ওই বছরের পরীক্ষার্থীরাই ২০২৩ সালে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল মাত্র ৩ হাজার ২৯৩ জন। অর্থাৎ ওই ব্যাচের কমপক্ষে ২ হাজার ৩৬৪ জন শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে।
শিক্ষকরা জানান, ছেলে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার প্রধান কারণ দরিদ্রতা এবং মেয়ে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার পেছনে মূলত দায়ী বাল্যবিয়ে। বিয়ে হওয়ার পরে ছাত্রীদের পক্ষে পড়াশোনা অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সচেতনতার অভাবে মেয়ে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ বাল্যবিয়ে ও পারিবারিক আর্থিক দুরাবস্থার কারণে দ্রুতই শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ছে। যদিও গত কয়েক বছর সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগে এ চিত্রে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। সরকার উপবৃত্তি ও বিনামূল্যে বই দেওয়াসহ নানা উদ্যোগের মাধ্যমে দেশে শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে মেয়েদের অংশগ্রহণ ও টিকে থাকার হার বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে ব্যতিক্রম চিত্র লক্ষ্য করা যায় ছেলে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে। মূলত দারিদ্র্যের কারণেই ঝরে পড়া এসব ছেলে শিক্ষার্থী মাধ্যমিকের আগেই পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা। পরিবারের ভরণ-পোষণের তাগিদে জীবিকা উপার্জন করতে গিয়ে ঝরে পড়া এসব শিক্ষার্থী শিশুশ্রমের শিকার বলে দাবি তাদের। এছাড়াও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে তারা। এ থেকে গড়ে উঠছে ছোট ছোট কিশোর গ্যাং।
উপজেলায় বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে কাজ করছে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক। সংস্থাটি এ বছর উপজেলায় ৩টি বাল্যবিয়ে বন্ধ করেছে প্রশাসনের সহায়তায়।
ব্র্যাকের মানবাধিকার ও আইন সহায়তা কর্মসূচির (বিএলসি) উপজেলা কর্মকর্তা আরাফাত হোসেন বলেন, অনেক সময় অভিভাবকেরা দূরে কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে মেয়ের বিয়ে দেন। ফলে সব বিয়ে রোধ করা সম্ভব হয় না।
উপজেলার প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত উপজেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৩৪টি বাল্যবিয়ে বন্ধ করা হয়। তবে উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেন, বহু বিয়ে প্রশাসনের অগোচরে হয়ে গেছে।
উপজেলার কৈখালী ইউনিয়নের সাপখালী গ্রামের এক দরিদ্র অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তিনি এক আত্মীয়ের কথা শুনে সপ্তম শ্রেণিতে পড়া মেয়েকে বিয়ে দেন ২০২১ সালে। মাত্র চার মাসের মাথায় মেয়ের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। এখন মেয়েটি তার বাড়িতেই থাকে। তার পড়াশোনাও আর হয়নি।
সদর ইউনিয়নের (শ্যামনগর পৌরসভা) মাহমুদপুর গ্রামের জোবেদা সোহারাব মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির এক মেয়ে শিক্ষার্থীর বিয়ে হয় ২০২২ সালে। পড়াশোনাও আর হয়নি। তার বাবার দাবি ভালো সম্বন্ধ পেয়েছি তাই আর দেরি না করে বিয়ে দিয়ে দিয়েছি।
কৈখালী ইউনিয়নের সাপখালী গ্রামের মোস্তফা গাজী বলেন, তার ছেলেকে পারিবারিক অসচ্ছলতা ও দরিদ্রতার কারণে বেশি পড়াশোনা করাননি তিনি। সপ্তম শ্রেণির পর তাকে ইটভাটায় পাঠিয়ে দেন কাজে। এ বছরও ইটভাটা মালিকপক্ষের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়েছেন তাকে কাজে পাঠানোর জন্য।
শিশুশ্রমের কথা বলায় তিনি বলেন, ওসব আমরা বুঝি না। কাজ করতে হবে, কাজ না করলে পেটে ভাত জুটবে না। অভাব অনটনের সংসারে একার পক্ষে সংসার চালানো সম্ভব না। তাই ছেলেকে কাজে লাগিয়েছি।
জোবেদা সোহরাব মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুস সাত্তার বলেন, তাঁর বিদ্যালয়ের ৯৭ জন শিক্ষার্থী ২০২০ সালে অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যায়নরত ছিল। নবম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়ে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার আগেই ৯ জনের বিয়ে হয়েছে। পাঁচজন ছেলে পড়ালেখা বাদ দিয়েছে। জানতে পেরেছি দরিদ্রতার কারণে অভিভাবকরা তাদের দেশের বিভিন্ন এলাকার ইটভাটায় শ্রমিক হিসেবে ও স্থানীয় বিভিন্ন দোকানের কর্মচারী হিসেবে কাজে যোগদান করিয়েছেন। ২০২৩ সালে ৭২ জন শিক্ষার্থী মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে।
কৈখালী শামছুর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শেখ সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, তাঁর বিদ্যালয়ে ২০২০ সালে ৮৭ জন শিক্ষার্থী অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছিল। এবার ৫৪ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। বাকি ৩৩ জন ঝরে পড়েছে। এদের অধিকাংশই বাল্যবিয়ে ও শিশুশ্রমে জড়িয়ে গেছে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও নকিপুর পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কৃষ্ণানন্দ মুখার্জী বলেন, তাঁর বিদ্যালয়েও বাল্যবিয়ের কারণে কয়েকজন শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। তবে বাল্যবিয়ে পরেও বেশ কয়েকজন ছাত্রী এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে বাল্যবিয়ে আগের তুলনায় কমেছে বলে দাবি করে তিনি জানান, বাল্যবিয়ের হার আগের তুলনায় কমলেও শিশু শ্রমের হার বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে প্রতিবছর আমাদের এ উপকূলীয় এলাকা থেকে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন ইটভাটাসহ অন্যান্য পেশায় কাজে চলে যাচ্ছে পড়াশোনা বাদ দিয়ে। ৬ মাস ইটভাটায় কাজ শেষ করে তারা আর পড়াশোনায় যোগ দিচ্ছে না। এতে ঝরে পড়ছে অনেক শিক্ষার্থী। পরে এইসব ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের অনেকেই জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। গড়ে উঠছে ছোট ছোট বহু কিশোর গ্যাং।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ তেজারাত বলেন, শিশুশ্রম ও বাল্যবিয়ে রোধে প্রশাসন, শিক্ষক, এনজিওসহ সমাজের অনেক সচেতন মানুষ কাজ করে যাচ্ছেন। স্কুলগুলোতে সমাবেশ করে সচেতনতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। কুফল তুলে ধরা হচ্ছে। এরপরেও দরিদ্রতা ও পরিবারের অসচেতনতার কারণে রোধ করা যাচ্ছে না। তবে আগের তুলনায় বাল্যবিয়ের হার কমছে।
তবে শিশুশ্রমের হার না কমায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি বলেন, শীতকালে (ইটভাটার সিজনে) পরিবারের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইটভাটায় কাজ করতে যায় অনেক শিশু। পরে কাজ শেষ করে এসে তারা আর পড়াশোনায় যোগ দেয় না। এতে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ ঝরে পড়ছে।
শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আক্তার হোসেন বলেন, সপ্তম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বাল্যবিয়ের সংখ্যা বেশি। বাল্যবিয়ে রোধে প্রশাসন থেকে সচেতনতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে জরিমানা করাও হচ্ছে। তবে উদ্বেগজনক হারে শিশু শ্রমের হার বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন দরিদ্রতার কারণে পারিবারিকভাবে শিশুরা শিশুশ্রমে জড়িয়ে পড়ছে।
স্বপ্না, বয়স ১০। ৭১ নম্বর বুড়িগোয়ালিনী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। শরীরে অপুষ্টির ছাপ স্পষ্ট। এ বয়সে স্বপ্নাকে আয়ের পথ ধরতে হয়েছে! দুপুর তখন ২টা। সুন্দরবনসংলগ্ন মালঞ্চ নদে পূর্ণ জোয়ার চলছে। জোয়ারের সময় বাড়ির সামনে দিয়ে বয়ে যাওয়া মালঞ্চের তীর ঘেঁষে ত্রিভুজ আকৃতির নীল রঙের নেট টানতে টানতে এগিয়ে যায় স্বপ্না। বিদ্যালয় সময়ের বাইরে সে চিংড়ির পোনা ধরে। নেট টানতে তার ইচ্ছে করে না! তবু নেট টানা এখন ওর প্রতিদিনকার রুটিনে দাঁড়িয়ে গেছে! বাবা অসুস্থ। সংসারে অভাব। নেট টেনে প্রতিদিন কত টাকা পাও?Ñ এ প্রশ্নের উত্তরে লজ্জামাখা মুখখানি তুলে এক পলক তাকিয়েই কোনো কথা না বলে নেটের ভেতর বাগদার পোনা খুঁজতে শুরু করে। নদের এপার থেকে তাকালে ওপারে সুন্দরবন অনায়াসেই দেখা যায়। তীরে দাঁড়িয়ে থাকা স্বপ্নার নানির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটি পোনার দাম ১ টাকা। কোনো দিন ৫০টি আবার ভাগ্য ভালো থাকলে কোনো দিন ২০০টিও পোনা পায় স্বপ্না। স্বপ্নাদের লোনা পানির ভয় নেই! সংসারের অভাবের ভয় লবণাক্ত পানিতে নারীদের শারীরিক ক্ষতিকেও যেন হার মানিয়েছে!
সুন্দরবনসংলগ্ন সাতক্ষীরার শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের বুড়িগোয়ালিনী গ্রামে স্বপ্নার বাড়ি। এলাকার মানুষের প্রধান পেশা মাছ ধরা। মালঞ্চ নদে জোয়ার এলেই যেন জেগে ওঠে শিশু-কিশোর বয়সের ছেলেপুলে! জোয়ারে সুন্দরবন তলিয়ে যায়। এ সময় ছোট ছোট ডিঙি, জাল, নেট আর আটল (কাঁকড়া ধরার যন্ত্র) নিয়ে ছোটবড় সবাই বেরিয়ে পড়ে সাদা মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ির রেণু সংগ্রহে। সংসারে অভাব-অনটন এ এলাকার মানুষের নিত্যসঙ্গী। মাছ ধরা বাদে উল্লেখযোগ্য কোনো কর্মসংস্থান নেই। তাই লেখাপড়ার চেয়ে ছোটবেলায় বাপদাদার পুরাতন পেশা মাছ ধরার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয় বেশি!
মালঞ্চের পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে দেখা হয় মিয়ারাজের সঙ্গে। মাকে নিয়ে দোকানে খাবার কিনতে এসেছে আট বছরের মিয়ারাজ। তুমি স্কুলে যাও?Ñ এ প্রশ্নের উত্তরে মায়ের আঁচলের নিচে হাসিমাখা মুখ লুকায় ও। মিয়ারাজের মা রহিমা (৩২) জানান, স্কুলে ভর্তি হলেও মিয়ারাজ স্কুলে যায় না। ছেলের লেখাপড়া নিয়ে অতটা চিন্তিত নন মা। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘লেখাপড়া শিখে কী হবে? চাকরি নাই। বাদাবনে (সুন্দরবনে) কাজে দিয়ে দেব।’ একই দোকানে বসে ছিলেন দুই সন্তানের জননী খাইরুন (৩৫)। ছোট ছেলের নাম রণি। বয়স ১১। চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়িয়ে আর পড়াননি। অল্প বয়সের ছেলেকে অভাবের কারণে কাজে দিয়ে দিয়েছেন।
মালঞ্চের তীর ঘেঁষে বুড়িগোয়ালিনী গ্রামের বাঁধের রাস্তা দিয়ে নীলডুমুর যাওয়ার পথে দেখা হয় ইয়াসিনুর রহমানের (৩০) সঙ্গে। এলাকায় একটি প্রজেক্টে দীর্ঘদিন কাজ করছেন। এলাকায় শিশুদের কোনো সমস্যা আছে কি না?Ñ এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এলাকায় জলবায়ুগত সমস্যার প্রভাব রয়েছে। এ গ্রামের বাসিন্দাদের প্রধান সমস্যা নদীভাঙন। এলাকার মানুষ বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভরশীল। পুকুরের পানি বিশুদ্ধকরণের পর পাইপের মাধ্যমে গ্রামে সরবরাহ করলেও শুষ্ক মৌসুমে পানি লবণাক্ত হয়ে যায়। তখন পানির জন্য হাহাকার লেগে যায়। অনেক পরিবারের শিশুরা লবণাক্ত পানি পান করতে বাধ্য হয়। ফলে শিশুরা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়। শিশুদের পাঁচড়া, শ্বাসকষ্ট, চুলকানি, সর্দিকাশি লেগেই থাকে। অভাব ও অসচেতনতার কারণে বেশিরভাগ পরিবারের শিশুরা অপুষ্টিতে ভুগছে। এলাকায় চিকিৎসাসেবাও ভঙ্গুর।’
শ্যামনগরের আরেক ইউনিয়ন গাবুরা। এটি একটি দ্বীপ ইউনিয়ন। কপোতাক্ষ নদ ও খোলপেটুয়া নদী গাবুরার চারদিক ঘিরে রেখেছে। এলাকায় ৯৫ ভাগ রাস্তা কাঁচা। গাবুরা ইউনিয়নে বাঁধের ওপর যখন পৌঁছাই তখন দুপুর সাড়ে ১২টা। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। বাঁধের পাশে আলী হায়দারের (২৯) ছোট দোকানে তখন শিশুদের জটলা। বাঁধের এক পাশে কংক্রিটের ব্লক দিয়ে ঢালাই চলছে। তার পাশেই আবার নদীভাঙনের চিহ্ন স্পষ্ট। এলাকায় প্রধান সমস্যা কী?Ñ প্রশ্ন করতেই শুরুতে আলী হায়দার লবণাক্ততার কথা জানান। এ সমস্যার কারণে শিশুদের সর্দিকাশি, নিউমোনিয়া লেগেই থাকে। এলাকার হাওয়া খারাপ। যোগাযোগব্যবস্থা খুবই নাজুক। অপুষ্টি, রক্তশূন্যতা ও বাল্যবিবাহের মতো সমস্যা রয়েছে শিশুদের। আগে তিনি সন্তানদের জন্য রক্তের বড়ি কিনে খাওয়াতেন। একই দোকানে বসে কথা হয় কিশোর আরিফুল ইসলামের (১৪) সঙ্গে। ৫০ নম্বর গাবুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বয়সের সঙ্গে শ্রেণি না মেলায় খানিকটা অবাক হই! তোমার তো এখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার কথা?Ñ এ প্রশ্নের উত্তরে ঠোঁট দুটো চওড়া করে মিষ্টি হাসি দিয়ে আরিফুল বলে, ‘আমায় দেরিতে স্কুলে দেছে। বাপ-মায় জানে।’ আরিফুল আরও জানায়, প্রতি বছর মে মাসের দিকে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাকেও ছোটবেলায় বাঁধে থাকতে হয়েছে। আরিফুলের সঙ্গে কথা বলতে বলতে দোকানে হাজির হয় ১২ বছরের শিশু আজমীর। স্থানীয় নিজামিয়া দাখিল মাদ্রাসায় পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। আজমীর জানায়, একটু বৃষ্টি হলেই কাঁচা রাস্তা দিয়ে মাদ্রাসায় যেতে মন চায় না। বাড়িতে লোনা পানি দিয়ে থালাবাসন ধোয়া ও অন্যান্য কাজ করা হয়। আর খাওয়ার জন্য টিউবওয়েলের পানি সংগ্রহ করতে হয়। আজমীর আরও জানায়, এলাকায় নদীভাঙনের ভয় আছে। নদীভাঙন শুরু হলে তখন বাঁধের ওপর থাকা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। তাই ছোট্ট ভাইকে নিয়ে খুব
চিন্তা হয় ওর।
গাবুরা ইউনিয়নের খোলপেটুয়া গ্রামের বাসিন্দা মাজেদা বেগমের (৪৫) ছোট মেয়ে সাবিনা। বয়স ৭। স্কুলের বারান্দায় যাওয়ার সুযোগ হয়নি এখনও। কারণ ঘরে থাকা বয়স্ক অন্ধ দাদিকে দেখাশোনা করতে হয়। গাঙের চরে ওদের বাস। ঘরের তিন পাশে পানি। বহুবার নদীভাঙনের শিক্ষার হয়েছে মাজেদার পরিবার। শিশু সাবিনা আদৌ লেখাপড়া করতে পারবে কি না নিশ্চয়তা নেই পরিবারের কাছে!
গাবুরায় সবচেয়ে সমস্যা হলো বিয়ে দেওয়ার সময় বেশিরভাগ পরিবার মেয়ের উপযুক্ত বয়স বিবেচনায় নেয় না। এলাকায় কম বয়সে বিয়ে হওয়ার প্রবণতা বা প্রথা অনেক আগে থেকেই। নয়টি ওয়ার্ডের মধ্যে ছয়টিতেই বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট। গাবুরা দ্বীপটিকে বাঁচানোর জন্য চারপাশে কংক্রিটের ঢালাই গাবুরাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি। কাজও শুরু হয়েছিল। গত জুনের মধ্যে কংক্রিটের বাঁধের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও অর্ধেকের কম কাজ হয়েছে। তাই লেবুবুনিয়া বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশের ভয়ে এলাকার শিশুসহ সবাই শঙ্কিত।
গাবুরা সুন্দরবন কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক হাফিজুল ইসলাম জানান, তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণিতে কয়েক মাস আগেও ৭৭ জন শিক্ষার্থী ছিল। এখন রয়েছে ৫৫ জন। ঝরে পড়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, শুষ্ক মৌসুমে অনেক শিক্ষার্থী বাবা-মায়ের সঙ্গে এলাকার বাইরে ছয় মাসের জন্য ইটভাটায় কাজ করতে যায়। দারিদ্র্য ও অভিভাবকদের অসচেতনতা শিশুদের ঝরে পড়ার প্রধান কারণ। এলাকার শিশুদের এগিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি ‘গাবুরা শিশু অধিকার ফাউন্ডেশন’ করেছেন বলে জানান।
শ্যামনগরের আরেক প্রসিদ্ধ ইউনিয়ন মুন্সিগঞ্জ। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে যখন সুন্দরবনসংলগ্ন মুন্সিগঞ্জ সেন্টার কালীনগর গ্রামের রাস্তা দিয়ে হাঁটছি তখন দেখা হয়ে গেল স্কুল থেকে ফেরা নিশাত তাসনিম, ইসরাত তাসনিম ও মারিয়ার সঙ্গে। তাদের প্রত্যেকের বয়স ১২ বছরের কাছাকাছি। তারা সাড়ে ৩ কিলোমিটার হেঁটে মুন্সিগঞ্জ বাজারের পাশে কলবাড়ি নেকজানিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়তে আসে। বৃষ্টি হলে বিদ্যালয়ে আসা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়! ইসরাত জানায়, তাদের এক বান্ধবীর ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াকালে বিয়ে হয়ে গেছে। গ্রামে বিশুদ্ধ পানির সংকট আছে বলে তারা জানায়।
বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে শিশুসহ সব নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসাকে মৌলিক মানবিক চাহিদা বা মৌলিক উপকরণ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু জলবায়ুগত সমস্যার কারণে উপকূলের অনেক শিশু এসব মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত। ইউনিসেফের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপকূলীয় এলাকার ৪৫ লাখ শিশু ঘূর্ণিঝড়সহ তীব্র ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বুলবুল, আম্পান, সিত্রাং, মোখা, রিমালের মতো ঘূর্ণিঝড় উপকূলের মানুষকে একটু একটু করে পিছিয়ে দিচ্ছে। জলোচ্ছ্বাস, খরা, বন্যা, দাবদাহ, অতিবৃষ্টির মতো জলবায়ুগত সমস্যা এলাকার শিশুদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। দারিদ্র্যের কারণে উপকূলের অনেক শিশু বিদ্যালয়ের বারান্দা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছে না। জলবায়ুগত সমস্যা উপকূলে সুপেয় পানির অভাব, পুষ্টির অভাব, স্যানিটেশন সমস্যা বাড়িয়ে তুলেছে। এসব সমস্যা শিশুদের শারীরিক ও মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করছে। অনেক শিশু বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ছে। শিশুরা মাছ ধরাসহ বিভিন্ন শ্রমের সঙ্গে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন বাল্যবিবাহ ত্বরান্বিত করছে।
মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের কলবাড়ি নেকজানিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শিবাশীষ কুমার মণ্ডল জানান, শ্যামনগরজুড়ে শিশুদের ওপর জলবায়ুগত সমস্যার প্রভাব পড়েছে। লবণাক্ততার কারণে দ্রুত বয়ঃসন্ধিকাল চলে আসছে শিশুদের মধ্যে। বিভিন্ন সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের সুযোগে বাল্যবিবাহ হচ্ছে।’ তিনি আরও জানান, তার বিদ্যালয়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে শিক্ষার্থীদের পানির চাহিদা মেটানো হয়। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে পানির টান লাগলে পানি কিনতে হয়। এ এলাকার অনেক গরিব শিক্ষার্থী পড়ালেখার পাশাপাশি আয়বর্ধক কাজের সঙ্গে যুক্ত।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের শ্যামনগর উপজেলার ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) প্রোগ্রাম অফিসার প্রণব বিশ্বাস জানান, শ্যামনগরের বিভিন্ন এলাকায় সুপেয় পানির অভাব রয়েছে। লবণাক্ততার কারণে শিশুদের স্বাস্থ্যগত সমস্যা তৈরি হচ্ছে। কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে অল্প বয়সে বয়ঃসন্ধিকাল চলে আসছে।’ শিশুশুম ও বাল্যবিবাহ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সাতক্ষীরায় বাল্যবিবাহের হার একটু বেশি। অনেক জায়গায় গোপনে বাল্যবিবাহ হওয়ার অনেক পরে আমরা জানতে পারি। এলাকায় শিশুশ্রম নেই তা বলব না। অভাবের কারণে দালালদের খপ্পরে পড়ে বড়দের পাশাপাশি শিশুরাও ইটভাটায় যাওয়াসহ বিভিন্ন কাজে যুক্ত হচ্ছে। আমরা শিশুদের অধিকার রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছি।’
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মোট দৈর্ঘ্য ৭১০ কিলোমিটার। সর্ব দক্ষিণের টেকনাফ থেকে সাতক্ষীরা জেলার সীমান্তবর্তী রায়মঙ্গল-কালিন্দী নদী পর্যন্ত এবং খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের ১৪টি জেলা নিয়ে এ অঞ্চল গঠিত। দেশের মোট জনসংখ্যার ২৫ শতাংশ জনগোষ্ঠী বসবাস করে এসব উপকূলীয় অঞ্চলে। মত্স্য, কৃষি, পর্যটন কিংবা রপ্তানিমুখী নানা শিল্পে অগ্রসরতার মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে প্রতিনিয়ত অবদান রেখে চললেও এসব এলাকার মানুষকে যাপন করতে হয় মানবেতর জীবন। ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, জলাবদ্ধতার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়িয়ে তুলেছে এসব এলাকার ফসলহানি, মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বাস্তুচ্যুতিসহ বিভিন্ন সমস্যা। যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর শিশুদের ওপর। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের ১ কোটি ২০ লাখ শিশু ঝুঁকিতে রয়েছে। যাদের ভেতর ৪৫ লাখ উপকূল শিশু।
হাসি-আনন্দ, খেলাধুলা, শিক্ষার আলোয় শিশুরা বেড়ে উঠবে—এমনটাই হওয়ার কথা থাকলেও উপকূলীয় শিশুদের ক্ষেত্রে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। জন্মলগ্ন থেকেই ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বৈষম্য কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করার প্রস্তুতি নিতে নিতে বেড়ে উঠতে হয় তাদের। জ্ঞান হওয়া মাত্রই কাঁধে চাপে সংসারের বোঝা। শুরু হয় অনিশ্চিত এক গন্তব্যের পথচলা। বর্তমানের তাড়নায় ভবিষ্যতের চিন্তা কখনোই আর ভর করতে পারে না তাদের মাথায়। অল্প বয়সে সংসারের বোঝা কাঁধে চাপায় শৈশব থেকেই শুরু হয় বিবর্ণ কর্মজীবনের সূচনা। কখনো জেলে, কখনো কৃষক, কখনো-বা কঠোর পরিশ্রমী দিনমজুরের কাজ করে এসব শিশু। সারা দিনের হাড়ভাঙা খাটুনি তাই শিক্ষাকে অমাবস্যার চাঁদে পরিণত করেছে এসব শিশুর কাছে। শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে উপকূলের হাজার হাজার শিশু। যা তাদের আর্থ সামাজিক অবস্থানকে নিম্নদিকে ধাবিত করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যনুসারে, ৫-১৭ বছর বয়সি শিশুদের মধ্যে ৬.৮ শতাংশ শিশু শ্রমের সঙ্গে জড়িত। স্কুলে যাওয়া শিশুদের (৪.৪ শতাংশ) তুলনায় স্কুলে না যাওয়া শিশুদের (১৮.৯ শতাংশ) মধ্যে এই হার বেশি।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। যার ফলে স্বাভাবিক জোয়ারের পানিতেও প্লাবিত হয়ে যায় উপকূলীয় অঞ্চলগুলো। দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধ পরিবেশে বসবাস এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে সুপেয় পানীয় জলের অভাবে শিশুরা আক্রান্ত হয় নানা ধরনের পানিবাহিত রোগ যেমন: কলেরা, টাইফয়েড, জন্ডিস, আমাশয়, ডায়রিয়া এবং বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগে। প্রতিদিন সুপেয় নিরাপদ পানির প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে মাইলের পর মাইল হাঁটতে হয় এসব শিশুকে। এছাড়া প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা না থাকায় চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে এসব শিশু। ভরণপোষণের সামর্থ্য না থাকায় উপকূলীয় অঞ্চলের বেশির ভাগ মেয়ে শিশুই বাল্যবিবাহের শিকার হয়; যা তাদের স্বাস্থ্য এবং নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশে ১৫-১৭ বছর বয়সি ১৫.৪ শতাংশ নারী বিবাহিত। এ ছাড়াও ২০-২৪ বছর বয়সি ১৫.৫ শতাংশ নারীর ১৫ বছর বয়সের আগেই বিয়ে হয়। পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারের অভাবে এসব এলাকার অধিকাংশ শিশুই পুষ্টিহীনতায় ভোগে। মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০১৯-এর তথ্য মতে, বাংলাদেশে  শিশুদের শৈশবকালীন খর্বাকৃতির  হার  ২৮ শতাংশ এবং মাঝারি ধরনের ও মারাত্মক পর্যায়ের কম ওজনের হার ২২.৬ শতাংশ। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ছাড়াও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্যহারে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে বহু উপকূল শিশু। এসব শিশুরা উদ্বাস্তু হয়ে চলে আসে শহরে। ভিড়ে যায় ছিন্নমূল শিশুদের দলে। সামাজিক বৈষম্য, নিম্ন জীবনযাত্রা কিংবা ক্ষুধার জ্বালা নিবারণে বাধ্য হয়ে এসব শিশু প্রতিনিয়ত মাদক গ্রহণ, মাদক ব্যবসা, ভিক্ষাবৃত্তিসহ নানান অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। মেয়ে শিশুরা জোরপূর্বক শিকার হচ্ছে যৌন নির্যাতনের। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্যমতে, প্রতি মাসে গড়ে ৮৪ জন শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়; যা  এ শিশুদেরকে মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত করে তুলছে। ফলে শৈশবের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বৈষম্য, নির্যাতনের শিকার এবং অধিকার বঞ্চিত হয়ে শিশুরা হারিয়ে ফেলছে তাদের বিকশিত হয়ে ওঠার শৈশব।
বাংলাদেশে শিশু অধিকার রক্ষায় বিভিন্ন আইন এবং নীতিমালা থাকলেও উপকূলীয় শিশুদের ক্ষেত্রে নেই তার সঠিক প্রয়োগ। প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে হাজারো সম্ভাবনা আলোর মুখ দেখার আগেই নিমজ্জিত হচ্ছে অন্ধকারের অতল গহিনে। এসব অঞ্চলের শিশুদের অধিকার নিশ্চিতে রাষ্ট্রের তত্পরতা জরুরি। উপকূলের সবুজ বেষ্টনী বাড়ানো, স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন যেমন একদিকে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোকে রক্ষা করবে অপরদিকে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়নেও সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। অধিকার বঞ্চিত শিশুরা ফিরে পাবে শৈশব।
কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের নাজিরারটেক সমুদ্র উপকূলের খাসজমিতে নদীভাঙনের শিকার ও ঘূর্ণিঝড়ে ঘরবাড়ি হারানো লোকজনের বসবাস। ওই এলাকার এমন ১৬টি মহল্লায় (গ্রাম) এসব ভাসমান মানুষের বসবাস। এসব মহল্লায় পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় বেশির ভাগ শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
ওই এলাকায় কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত একটি িবদ্যালয়, দুটি মাদ্রাসা ও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অল্প কিছু শিশু পড়াশোনা করলেও অধিকাংশ শিশু শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছে। দিনমজুরি করে, সাগরে মাছ ধরে ও শুঁটকিপল্লিতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে এই এলাকার মানুষ। পরিবারকে সাহায্য করার জন্য অধিকাংশ শিশুও নানা ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় জড়িত হয়ে পড়ছে। সরেজমিনে দেখে ও এলাকার জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
এই এলাকার বাসিন্দারা ও সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের কাউন্সিলরের হিসেবে নাজিরারটেকে প্রায় ৫০ হাজার ভাসমান মানুষজনের মধ্যে ১২ হাজারই শিশু। তবে ১৬টি মহল্লায় ঠিক কত মানুষ বসবাস করছে, কোনো সরকারি-বেসরকারি সংস্থার কাছে সে–সংক্রান্ত কোনো জরিপ নেই। স্থানীয় লোকজন জানান, মহল্লাগুলোর প্রায় ১০ হাজার শিশু বিদ্যালয়ে যায় না। পড়াশোনার বদলে চিংড়ির পোনা শিকার ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে এই শিশুরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নাজিরারটেক এলাকায় বসরকারি সংস্থা কোডেকের ১৮টি শিখন িবদ্যালয় আছে। সব মিলিয়ে এসব বিদ্যালয়ে পড়ছে প্রায় সাড়ে ৫০০ শিশু। এ ছাড়া এই এলাকার কুতুবদিয়াপাড়া উপকূলীয় বহুমুখী নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৩৫২, উপকূলীয় আদর্শ শিক্ষা নিকেতনে ২৫০, দারুল কুতুব একাডেমিতে ৩০০ ও কুতুবদিয়াপাড়া মহিউসসুন্নাহ মাদ্রাসায় ৬০০ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সব মিলিয়ে প্রায় দুই হাজার শিশুর পড়ার ব্যবস্থা থাকলেও বাকি ১০ হাজার শিশু বিদ্যালয়ে যায় না।
গত ২৭ অক্টোবর সকালে নাজিরারটেকের সমিতিপাড়া সৈকতে গিয়ে দেখা গেছে, প্রায় ৪০ জন শিশু নিষিদ্ধ জাল দিয়ে উপকূলে চিংড়ি পোনা ধরছে। পাশের কুতুবদিয়াপাড়া, নাজিরারটেক, ফদনারডেইল সৈকতেও দেখা মিলেছে একই চিত্র। এ ছাড়া এখানকার প্রচুর শিশু শুঁটকি মহালেও শ্রমিকের কাজ করছে।
নাজিরারটেক এলাকার একটি মহল্লায় থাকে মদিনা বেগম (১৪)। সে জানায়, চার বছর আগে তার বাবা ফিরোজ আহমদ ট্রলারডুবিতে নিখোঁজ হন। এরপর থেকে তারও স্কুলে যাওয়া বন্ধ। এখন মায়ের সঙ্গে শুঁটকি মহালে কাজ করে সে। দৈনিক মজুরি পায় ১৫০ টাকা। মদিনার বেগমের মা সামছুন্নাহার বেগম বলেন, ‘গরিবের ছেলেমেয়েরা পড়ালেখা করলে কাজ করবে কে? অভাব না থাকলে মেয়েটার লেখাপড়া বন্ধ করতাম না।’
বেসরকারি সংস্থা কোডেকের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা সুবিমল পাল বলেন, এ উপকূলের প্রায় ৯৩ শতাংশ মানুষ নিরক্ষর। এলাকার কয়েক হাজার শিশু শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আকতার কামাল বলেন, ‘সমুদ্র উপকূলীয় এই ওয়ার্ডের আওতাধীন ১৬টি মহল্লায় প্রায় ৫০ হাজার জলবায়ু উদ্বাস্তু ও ভাসমান লোকের বসবাস। এর মধ্যে প্রায় ১২ হাজার শিশু।
আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট