
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : স্থায়ী ঘর নেই, উঁচু বেড়িবাঁধের উপর টং ঘরের বেড়াও নেই সরকারিভাবে কোন শীত বস্ত্র এসব এলাকায় পৌঁছায়নি নিউমনিয়া ও ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত শত শত শিশু
গত পাঁচ দিনের টানা মাঝারি শৈত্যপ্রবাহে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন উপকূলীয় অঞ্চলের ১৫ জেলার ১ কোটি মানুষ। তীব্র শীতে অচল হয়ে পড়েছে জনজীবন। বিশেষ করে যাদের ঘর নেই, উঁচু বেড়িবাঁধের উপর টং ঘর থাকলেও নেই বেড়া, সেই অরক্ষিত উপকূলবাসীরা পড়েছেন সবচেয়ে বেশি বিপদে। বিশেষ করে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা ,বাগেরহাট ,পিরোজপুর ,ঝালকাঠি ,বরিশাল, বরগুনা ,পটুয়াখালী ,ভোলা, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, ফেনী, নোয়াখালী , কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলার উপকূলীয় অঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষের উপরে জেগে বসেছে প্রবাল আকারে শীত । যার কারণে ছিন্নমূলের মানুষরা আয় রোজগার থেকে বঞ্চিত হয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে । এক সপ্তার ব্যবধানে এই ঘটনা ঘটেছে ।আবহাওয়া অধিদপ্তর বলেছে আরো পাঁচ দিন নাকি শীতের তীব্রতা বাড়বে। সে কারণে উপকূলীয় জেলাগুলোর ছিন্নমূলের মানুষের শীতবস্ত্র খাদ্য পানি সহতার জন্য সরকারকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন সুধী মহল । সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলা ও আসাসনি উপজেলা খুলনা জেলার কয়রা উপজেলা ও রামপাল উপজেলা বাগেরহাট জেলার মংলা উপজেলা এই সমস্ত এলাকার মানুষগুলো গত কয়েকদিনে শীতে যবো থবো মেরে গেছে । এই সমস্ত উপজেলা গুলো মানুষের একমাত্র আয়ের পথ নদী ও সুন্দরবন কিন্তু মারাত্মক শীতের কারণে যেতে পারছে না আয় রোজগার করতে । সে কারণে এই সমস্ত পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে শীতের সাথে অভাবের ঠেলা ।তাদের পরিবারের শিশু ও বৃদ্ধদের নেই প্রয়োজনীয় গরম কাপড়। এদিকে গত তিন দিনে কয়েক হাজার শিশু নিউমনিয়া ও ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ভুগছে। শিশু হাসপাতালসহ সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীতে ঠাসাঠাসি অবস্থা। নিম্নবিত্তদের ওষুধ কেনার টাকা নেই। আর উপকূলীয় দুর্গম এলাকা থেকে অনেকেরই পরিবারের অসুস্থ শিশুদের নিয়ে হাসপাতালে আসার সামর্থ বা সুযোগ নেই। ফলে বিচ্ছিন্ন এলাকা উপকূলীয় অঞ্চলের জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ।
সরকারিভাবে কোন শীত বস্ত্র এসব এলাকায় পৌঁছায়নি। ইতোমধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলে গত ৪-৫ দিনে তীব্র শীতে ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বৃদ্ধ ও শিশুরা। সপ্তাহ জুড়ে শুধুমাত্র খুলনা শিশু হাসপাতালে ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে দেড় হাজার শিশুকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। গত ১৫ দিন ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত দুই হাজারের বেশি শিশুকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।
চিকিৎসকরা জানয়েছেন, আবহাওয়া পরিবর্তন ও হঠাৎ করেই ঠান্ডা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভাইরাসজনিত কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আঞ্চলিক আবহাওয়া অফিস ইনচার্জ ইনকিলাবকে জানান, তাপমাত্রা ওঠা নামার সম্ভাবনা রয়েছে। ভোরে ঘন কুয়াশা পড়ছে। তিনি জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহজুড়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন।
এদিকে প্রচন্ড শীতে বিপাকে পড়েছেন নগরীর ভাসমান ও দরিদ্র লোকজন। বিভিন্নস্থানে ছিন্নমূল লোকজন চরম দুর্ভোগে রাত কাটাচ্ছেন। ঘূর্ণিঝড় আইলার প্রায় ১৬ বছর পরও গৃহহীন ও পানিবন্দি পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ শীত নিবারণের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ জোগাড় করতে পারেনি। চরম মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে আইলা দুর্গত ও কপোতাক্ষ পাড়ের জনপদে। বিভিন্ন বেড়িবাঁধ ও উঁচু রাস্তায় পলিথিন দিয়ে তাবু আকারের ঘরে অস্থায়ীভাবে বাস করা এসকল লোকজন সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
অপরদিকে, সুন্দরবনের দুবলার চরের উপকূলীয় শুঁটকি পল্লীগুলোতে কর্মচাঞ্চল্য ফিরলেও টানা শৈত্যপ্রবাহ ও কয়েকদিন সূর্যের দেখা না মেলায় শুঁটকি উৎপাদনে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে। দুবলার চর, আলোর কোলসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলে হাজারো জেলে, শ্রমিক ও ব্যবসায়ী মৌসুমের শুরুতেই কাজে নেমেছেন। তবে আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাবে কাক্সিক্ষত উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।
শুঁটকি উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত রয়েছেন ১৫ থেকে ২০ হাজার নারী-পুরুষ। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চার মাসই শুঁটকি উৎপাদনের প্রধান মৌসুম। সাধারণত তিন থেকে চার দিনের টানা রোদে মাছ ভালোভাবে শুকিয়ে ওঠে। কিন্তু চলতি মৌসুমের শুরুর দিকেই প্রচন্ড শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে সূর্যের দেখা না মেলায় শুকানোর প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।
সূত্রমতে, শীতে কাঁপছে উপকূল অঞ্চল। মহানগরীসহ উপকূলীয় উপজেলাগুলোতে তাপমাত্রা কমতে শুরু করেছে। বাড়তে শুরু করেছে শীত। মধ্য পৌষের জেঁকে বসা শীতে বিপর্যস্ত জনজীবনে নেমে এসেছে স্থবিরতা। কনকনে শীত ও বাইরে হিমেল হাওয়াই প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো যেন থরথর করে কাঁপছে। দিনজুড়ে সূর্যের দেখা না মেলাতে শীতের এই তীব্রতা আরো বেড়েছে। গত ৪-৫ দিন ধরে উপকূলীয় অঞ্চলে এমন অবস্থা বিরাজ করছে, বিশেষ করে ঘন কুয়াশা ও বাইরে বাতাস থাকার দরুন তীব্রভাবে এই শীতের অনুভূত হচ্ছে। এ অঞ্চলে জেঁকে বসা শীতে চরম বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। তীব্র শীতে তাদের নিত্যদিনের কর্মযজ্ঞে ছেদ পড়েছে। তারপরও জীবন জীবিকায় টানা পোড়েন সামলাতে শীতকে উপেক্ষা করেই নামতে হচ্ছে কাজে।
এদিকে, সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলের মানুষ বিশেষত নারীরা নদীতে নেমে জাল টেনে মাছ ও কাঁকড়া সংগ্রহ করেন। ঠান্ডায় তাদের জীবিকা নির্বাহের এ পথ প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম। দিনমজুর শ্রেণির মানুষ যাদের প্রতিদিনের কাজের ওপর নির্ভর করে চলে সংসারের চাকা, তারাও কাজে নামতে বিপাকে পড়ছেন।
সাতক্ষীরা আশাশুনির ভ্যানচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, শীতের তীব্রতার কারণে সকালে ভ্যান নিয়ে বের হতে পারিনা। যাত্রীও কম। অন্য সময় দিনে তিন থেকে চারশ টাকা পর্যন্ত আয় হতো এখন তা ২০০ টাকায় নেমে এসেছে। ফলে ছেলে মেয়ে নিয়ে সংসার চালানো কষ্টসাধ্য হয়ে গেছে।
সুন্দরবন সংলগ্ন ৪নং কয়রা গ্রামের আকলীমা খাতুন জানান, সকাল হতে কাঁকড়া ধরতে নদীর চরে হাঁটু পানিতে, কখনো বুক পানিতে নামতে হয়। কিন্তু শীতে এতো ঠান্ডা পানিতে নামতে পারি না। দুদিন জাল টানলে ঠান্ডা লেগে অসুস্থ হয়ে পড়বো। বিকল্প আয়ের কোন উপায় নেই।
কনকনের ঠান্ডা, সঙ্গে হিমেল বাতাস। তীব্র শীতে জবুথবু সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপকূলের মানুষ। একটু উষ্ণতার জন্য খড়কুটোতে আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করেছে সাধারণ মানুষ। শুক্রবার সন্ধ্যার পর থেকে উপকূলীয় এলাকার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী, ভামিয়া, মুন্সিগঞ্জ জেলে পলী, নীলডুমুরসহ কয়েক স্থানে খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণ করতে দেখা গেছে।
উপকূলীয় এলাকা থেকে আইয়ুব হোসেন জানান, শীতের সন্ধ্যায় সুন্দরবন সংলগ্ন চুনা নদীর পাড়ে মুন্সিগঞ্জ জেলে পলীতে চারদিকে গোল হয়ে বসছেন কয়েকজন। এর মাঝে দেখা যাচ্ছে আগুনের শিখা। গত কয়েকদিনে তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় এই উপকূলীয় অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় চোখে পড়ে এমন চিত্র। মুন্সিগঞ্জ জেলে পলীর গোপাল সানা বলেন, ঘরের ভেতরেও যেন ঠান্ডায় থাকা দায়, বাইরে তো হাড়কাঁপুনি শীত। তাই কয়েকজনকে নিয়ে আগুন জ্বালিয়ে শীত তাড়ানোর চেষ্টা করছি। মুন্সিগঞ্জ জেলা পাড়ার বাঘ বিধবা সোনামণি দাসী বলেন, “একটাই পাতলা ছেঁড়া কম্বল আমার সম্বল। রাতে এই পাতলা কম্বলডা পেঁচায়েই শুয়ে থাকি। শীতের আর কাপড় নেই। ঠান্ডা লাগলে কি আর করবো। সুন্ধে হলি (সন্ধ্যা হলে) খুব ঠান্ডা লাগে। এবার কেউ একটা খেতা (কাঁথা) কম্বলও দেইনি। এক কাপড়ে শীত যায় না, কেউ কাপড় দিতেও আসে না বাপ। শীতে টিকতি পারি না। কাপড় কেনার সাধ্য নেই। নদীতে কাঁকড়া ধরে খেতাম, সেটাও বন্ধ হয়ে গেল। এখন খাইতেই পাই না, আর শীতের কাপড় কিনবো কিভাবে। অনেক কষ্ট হয়”।বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের ভামিয়া গ্রামের মৃত বাহার আলী সরদারের ছেলে গফুর সরদার (৭২) ও তার স্ত্রী খাদিজা বেগম (৬০) বসবাস করেন খলপেটুয়া নদীর চরে। দুই মেয়ে এক ছেলে তাঁদের। মেয়ে দুইটাকে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে থাকেন তাঁদের পাশেই। ছেলের কথা শুনতেই কান্না জড়িত কন্ঠে গফুর সরদার বলেন, ছেলের কথা আর শুনো না বাপু। ছেলে আমার নেই। তাদের সংসার কিভাবে চলে এবং শীতের কাপড় আছে কিনা জানতেই গফুর সরদার বলেন, মানুষের কাছে চেয়ে সংসার চলে আমাদের। গ্রামে গ্রামে হাত পেতে যা পাই, তা দিয়ে তিন বেলা খাইতেই পাই না। শীতের কাপড়ের দাম বেশি, কেনার পয়সা নেই। ছেঁড়া কাপড়ে শীত যায় না। এত শীত পড়তেছে তা একটা কম্বল দেয়নি কেউ।সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে এখনো শীতার্তদের মাঝে পর্যাপ্ত গরম কাপড় বা কম্বল বিতরণ করা হয়নি জানিয়ে স্থানীয়রা বলছেন, শীত নিবারণে গরম কাপড় বিতরণে বিত্তবানদের এগিয়ে আসা দরকার। হিমেল হাওয়ায় কনকনে শীতে হাত-পা যেন অবশ হয়ে আসছে। ছেলে-মেয়েরাও ঠিকমতো পড়ালেখা করতে পারছে না। নিম্নআয়ের লোকজন শীতবস্ত্রের অভাবে কাহিল হয়ে পড়েছ।
সাতক্ষীরার আবহাওয়া অফিস থেকে জানা গেছে, রোববার বেলা সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছ ১২ দশমিক ৬ ডিগ্রী সেলসিয়ার্স। গত ১৫ ডিসেম্বর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১২ দশমিক ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস। ধীরে ধীরে তাপমাত্রা আরও কমবে। ১০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে নামার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান সাতক্ষীরা জেলা আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন।
শ্যামনগর উপজেলার প্রায় চার লাখ জনসংখ্যার মধ্যে অন্তত সাড়ে তিন লাখ নিম্নবিত্তের শীতবস্ত্র, খাদ্য ও অর্থ সহায়তা দরকার। শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোছাঃ রনী খাতুন জানান, উপজেলায় এখন পর্যন্ত ছয় লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। এ টাকায় ভ্যাট ট্যাক্স কেটে ৯৪৭ পিস কম্বল কেনা হয়েছে। এরমধ্যে তারা এ পর্যন্ত ৫০০টির মতো কম্বল বিতরণ করেছেন। বাকি ৪৪৭ পিস কম্বল ইতোমধ্যে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সমাজকর্মী কামরুল ইসলাম বলেন, সমাজের অসহায় ও শীতার্ত মানুষদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সকলেরই নৈতিক দায়িত্ব। কনকনে শীতে ঠকঠক করে কাঁপা মানুষের গায়ে শীতবস্ত্র জড়িয়ে তার মুখে হাসি ফোটানোর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে। এর মাধ্যমে প্রকাশ পায় মানুষের প্রতি আমাদের মমত্ব ও ভালোবাসার। তাই এই শীতে সরকারের পাশাপাশি এই এলাকার বিত্তবানদের সমাজের অসহায় ও শীতার্ত মানুষদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন।
এদিকে শীতের কারণে নিউমোনিয়া, এ্যাজমা, হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট ও ডায়রিয়াসহ শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়েছে শিশু থেকে বয়স্ক মানুষ। শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক সাকির হোসেন জানান, হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও আউটডোরে ঠান্ডাজনিত রোগীরা চিকিৎসা নিচ্ছেন। চিকিৎসার পাশাপাশি শীতজনিত রোগ থেকে নিরাময় থাকতে বিভিন্ন পরামর্শ প্রদান করেছেন চিকিৎসকরা। তীব্র শীতে কাঁপছে দেশ। ঘন কুয়াশায় ঢাকা পড়ছে সূর্য। শৈত্যপ্রবাহ (১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে তাপমাত্রা) না থাকলেও হিমেল হাওয়ায় বিপর্যস্ত মানুষজন। সকালের দিকে বৃষ্টির মতো কুয়াশা পড়ার দৃশ্যও দেখা যাচ্ছে। নদী-তীরবর্তী এলাকায় কোথাও কোথাও দৃষ্টিসীমা ১০ গজে নেমে এসেছে। এতে সব ধরনের যানবাহন স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারছে না।
কুয়াশায় গত কয়েক দিন থেকে দেশের বেশির ভাগ অঞ্চলে সূর্যের আলো মাটিতে পড়তে পারছে না। ঘন কুয়াশা সৃষ্টি হওয়ার কারণ হিসেবে আবহাওয়াবিদরা বলছেন, সূর্য অস্ত যাওয়ার পর বাতাস ঠাণ্ডা হয়ে গেলে বায়ুতে অবস্থিত জলীয়বাষ্প আগে থেকে বিরাজমান ধূলিকণা ও বাতাসে ভাসমান ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অন্যান্য বস্তুকণা ঘনীভূত হয়ে কুয়াশার সৃষ্টি করছে। এ ছাড়া দেশের বাইরে থেকে ঠাণ্ডা বাতাসের সাথে ঘন কুয়াশা আসাও অব্যাহত রয়েছে। সূর্য থেকে আসা তাপমাত্রার পুরোটা শোষণ করে নিচ্ছে ঘন কুয়াশা। ফলে উচ্চ তাপমাত্রা কাক্সিক্ষত পর্যায়ে বাড়তে পারছে না।
আবহাওয়া অফিসের তথ্য, গত বুধবার দেশের সর্বনিন্ম তাপমাত্রা ছিল শ্রীমঙ্গলে ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সর্বোচ্চ ছিল টেকনাফে ২৮ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শ্রীমঙ্গল ছাড়া দেশের অন্যান্য নিন্ম তাপমাত্রার অঞ্চলগুলোতে তাপমাত্রা ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি ছিল।
চট্টগ্রাম বিভাগ ছাড়া দেশের সর্বত্র উচ্চ তাপমাত্রার সাথে নিন্ম তাপমাত্রার ব্যবধান খুব কম। পর্যাপ্ত সূর্যতাপ পাওয়া যাচ্ছে না বলে সারা দেশে বেশ শীত অনুভূত হচ্ছে। উচ্চ তাপমাত্রা থেকে নিন্ম তাপমাত্রার ব্যবধান রাজধানী ঢাকাতে সবচেয়ে কম। গত বুধবার ঢাকায় এ যাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র শীত অনুভূত হয়। ওই দিন ঢাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, সর্বনিন্ম ছিল ১৪ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শুধু রাজধানী নয়, ঢাকা বিভাগের সব অঞ্চলে গত বুধবার উচ্চ ও নিন্ম তাপমাত্রার মধ্যে ব্যবধান ছিল খুব কম।
এই যখন অবস্থা, তখন সারা দেশে কয়েক দিনের তীব্র শীতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন ছিন্নমূল মানুষ। শিশু ও বৃদ্ধরাও শীতে কাবু হয়ে পড়েছেন। খেটে খাওয়া, ছিন্নমূল ও নিম্ন আয়ের মানুষের ভোগান্তির যেন শেষ নেই। শীতের তীব্রতায় অনেকে খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বাইরে বের হচ্ছেন না। ছিন্নমূল মানুষ স্কুল-কলেজ ও মসজিদের বারান্দায় অতিকষ্টে রাত যাপন করছেন। অনেকে খড় ও কাঠে আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন।
তীব্র শীতে দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ এক দিকে গরম কাপড়ের অভাবে কষ্ট পাচ্ছেন; অন্য দিকে কাজ করা অসহনীয় হয়ে পড়েছে তাদের জন্য। তাদের টিকে থাকা দায় হয়ে উঠেছে। প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় তারা নির্ঘুম রাত শেষে দিনে একটু উষ্ণতার আশায় থাকলেও মিলছে না সূর্যের দেখা। শীতের কারণে তাদের কাছে রাত যেন একটা ভয়ঙ্কর সময়। দিনে কাজে ব্যস্ত থাকায় ঠাণ্ডা তবু সহ্য হয়। কিন্তু সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে শীতের তীব্রতা বাড়ছে। মধ্যরাতের পর মনে হয় যেন বরফ গলে ঠাণ্ডা নামছে। এ জন্য ঘুম তো দূরে থাক, আগুন জ্বালিয়েও শীত বিবারণ কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই সন্ধ্যার সাথে সাথে ছিন্নমূল মানুষ রাতে আগুন জ্বালানোর উপকরণ সংগ্রহ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন। মধ্যরাত থেকে আগুন পোহানোর মাধ্যমে সকাল গড়ায় তাদের। সারা দিন কঠোর পরিশ্রমের পর সন্ধ্যায় ক্লান্তিতে যখন শরীর ভেঙে আসছে তাদের; তখনো ঘুমানোর উপায় নেই। ঠাণ্ডা আর হিমেল হাওয়ায় ঘুমের পরিবর্তে রাত জেগে উষ্ণতার সন্ধান করতে হচ্ছে অসহায় এসব মানুষকে।
এক সময় শীতে সরকারি পর্যায়ের সাথে বেসরকারি এবং ব্যক্তি উদ্যোগে অভাবীদের মধ্যে গরম কাপড় বিতরণ করা হতো। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বেসরকারি উদ্যোগে ভাটা পড়েছে। এমতাবস্থায় জীবনযুদ্ধের সাথে শীত নিবারণের সংগ্রামে ছিন্নমূল মানুষ এখন ভীষণ ক্লান্ত। অথচ তাদের জন্য শীতবস্ত্র এবং নগদ অর্থ সহায়তা করা জরুরি হয়ে পড়েছে।পৌষের শেষে শীত জেঁকে বসেছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। কয়েকটি জেলার ওপর দিয়ে বইছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ, যা তিন দিনের মধ্যে কোথাও কোথাও মাঝারি শৈত্যপ্রবাহে রূপ নিতে পারে। একই সঙ্গে শৈত্যপ্রবাহ নতুন অঞ্চলে বিস্তৃতি লাভ করতে পারে বলেও জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা। বিভিন্ন জেলায় তীব্র শীতের সঙ্গে বাতাস আর ঘন কুয়াশার কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শীতের প্রকোপে দুর্ভোগ বেড়েছে দরিদ্র, খেটে খাওয়া ও ছিন্নমূল মানুষের। ঠান্ডায় মানুষের সঙ্গে কাঁপছে প্রাণীকূলও। আমাদের স্টাফ রিপোর্টার ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর- গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, গত কয়েকদিন থেকে গাইবান্ধা অঞ্চলে তীব্র শীত অনুভূত হচ্ছে। মঙ্গলবার শীতের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। ঘন কুয়াশা না থাকলেও দুপুর ১টা পর্যন্ত সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। দুপুর পর্যন্ত রোদ না ওঠায় মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। শীতের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় কষ্ট পাচ্ছে গবাদিপশুও। ফলে গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন গৃহস্থ কৃষক ও খামারিরা। জেলার চরাঞ্চলগুলোতেও মানুষের জীবনযাত্রা জড়োসড়ো হয়ে পড়েছে। অনেকে খড়-কুটা জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে। মাঝে মাঝে এলোমেলো হিমেল হাওয়া শীত আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এদিকে, দাম চড়া হলেও মানুষ শীত নিবারণের জন্য বাধ্য হয়েই গরম কাপড় কিনছেন। নিম্ন আয়ের গ্রামের গরিব মানুষের একমাত্র ভরসা পুরনো কাপড়। সেই পুরনো গরম কাপড়ও মিলছে না ২০০-৩০০ টাকার নিচে। দাম চড়া হলেও মঙ্গলবার পুরনো কাপড়ের দোকানগুলোতে ছিল উপচেপড়া ভিড়। নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, শীত জেঁকে বসায় নবীগঞ্জের সর্বত্র নিম্ন আয়ের মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। সন্ধ্যার পর থেকে পরদিন সকাল ১০টা পর্যন্ত ঘন কুয়াশায় ঢাকা থাকছে প্রকৃতি। গত কয়েকদিনের শৈত্যপ্রবাহের পর নবীগঞ্জে তাপমাত্রা কিছুটা বাড়লেও ঠান্ডা কমছে না। হিমেল হাওয়ায় ঠান্ডাজনিত রোগে শিশু ও বয়স্কদের দুর্ভোগ বেড়েছে। শীতের তীব্রতা বাড়লেও শীতার্ত মানুষের মধ্যে সরকারি বা বেসরকারিভাবে কোনো শীতবস্ত্র বিতরণের খবর পাওয়া যায়নি। সরেজমিন নবীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে চোখে পড়ে অভাবী ও শীতকাতর মানুষের দুর্ভোগ। হিমেল হাওয়ায় গায়ে কম্বল জড়িয়ে থাকা যেখানে দুঃসাধ্য, সেখানে শীতার্ত মানুষজন গায়ে শুধু একটা গেঞ্জি কিংবা লুঙ্গি জড়িয়ে আছেন। আর নারীদের সম্বল শুধু শাড়ির আঁচল। সোমবার সন্ধ্যার পর চুলায় ভাতের হাড়ি বসিয়ে আগুনের কাছে বসে ছিলেন কান্দিপাড়ার রত্না বেগম। তিনি বলেন, ‘চুলার আগুনই আমাদের সম্বল। কয়দিন থাকি খুব ঠান্ডা পড়ছে। চুলার আগুন নিভি যাইলে রাইত (রাতে) কষ্টে কাটা লাগবে।’ এমন দুর্ভোগে পড়েছেন উপজেলার শীতার্ত মানুষজন। এদিকে, শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শীতবস্ত্রের দোকানগুলোতে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। দামও বেশি নিচ্ছে দোকানদাররা। নবীগঞ্জ শহরে শীতের কাপড়ের মার্কেটগুলোর মধ্যে শেরপুর রোডস্থ পুরনো কাপড়ের মার্কেট, জামে মসজিদের সামনের মার্কেট, ওসমানী রোডস্থ মার্কেট, নবীগঞ্জের নতুন বাজার মোড় আশপাশে ফুটপাতের মার্কেটে সবচেয়ে বেশি কাপড় বিক্রি হয়। শহরের বাইরে, সৈয়দপুর, আউশকান্দি, ইনাতগঞ্জ, কাজীরগঞ্জ বাজার, ইমামবাড়ি বাজার, পানিউন্দা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এসব বাজারে পুরনো কাপড়ের ক্রেতা বেশি। স্বল্প আয়ের মানুষ থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের পদচারণায় মুখরিত নবীগঞ্জের পুরনো কাপড়ের বাজার। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিদেশি পুরনো শীতের কাপড়ের দাম তুলনামূলক কম। এ ছাড়া এই কাপড়গুলো দেখতে সুন্দর, মানসম্পন্ন ও টেকসই হওয়ায় ক্রেতাদের এসব কাপড়ে আগ্রহ বেশি। কোট, জ্যাকেট, সোয়েটার, ট্রাউজার, ওভারকোট, ফুল হাতা গেঞ্জি, কম্বল, মেয়েদের কার্টিগান, হাতমোজা ও পা-মোজার ক্রেতার সংখ্যা বেশি। তবে গত বছরের চেয়ে এবার পুরনো কাপড়ের দাম অনেক বেশি বলে ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা অভিযোগ করেছেন। ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতিবছর শীতের সময় মহাজনদের কাছ থেকে গরম কাপড়ের গাইট নিয়ে তা খোলা বাজারে খুচরা বিক্রি করেন তারা। গত বছর সাত থেকে আট হাজার টাকায় একটি কাপড়ের গাইট বা বেল কেনা যেত। এ বছর একটি গরম কাপড়ের গাইট কিনতে ১৪-১৬ হাজার টাকা লাগছে। ওসমানী রোডের পুরনো কাপড়ের পাইকারি ব্যবসায়ী সেকুল মিয়া বলেন, ‘শীতকে ঘিরে চীন, তাইওয়ান, জাপান, কোরিয়া ও রাশিয়া থেকে পুরনো শীতবস্ত্র আসছে। পরিবহণ খরচ ও ব্যাংক ঋণের কারণে কাপড়ের বেলের দাম বেড়ে গেছে। আমরা পাইকারি বিক্রির জন্য চট্টগ্রাম ও ঢাকা থেকে কাপড়ের বেল ট্রাকে করে আনি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করি।’ ফজলুল হক জানান, ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের বাকিতে কাপড় দেন, তারা বিক্রি করে টাকা শোধ করেন। ব্যাংক লোনের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল হলেও ব্যাংকগুলো এক লাখ টাকার ওপর লোন দিতে চায় না। আবার অনেক কিছু ম্যানেজ করতে খরচ বেশি পড়ে যায়। স্টাফ রিপোর্টার, চুয়াডাঙ্গা জানান, পৌষের শেষে শীত জেঁকে বসেছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলা চুয়াডাঙ্গায়। চলছে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ। মঙ্গলবার বেলা ১১টায় এই জেলায় ৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অফিস। সকাল থেকে সূর্যের দেখা মিলছে না, সঙ্গে রয়েছে কুয়াশা। প্রতিদিন রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শীতের তীব্রতাও বাড়ছে। ভোরের দিকে শীতের তীব্রতা আরও বেশি। শীতের তীব্রতায় এই জেলার দরিদ্র খেটে-খাওয়া মানুষরা দারুণ কষ্টে পড়েছেন। সেই সঙ্গে কষ্টে পড়েছে বৃদ্ধ ও শিশুরা। চলতি জানুয়ারি মাসজুড়েই এই শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ মো. সামাদুল হক। এদিকে শীতার্তদের পাশে দাঁড়িয়েছে জেলা প্রশাসন। জেলার চারটি উপজেলায় শীতার্তদের মধ্যে প্রতিদিনই কম্বল বিতরণ করছেন জেলা-উপজেলা প্রশাসন। ফুলবাড়ী উত্তর জেলা কুড়িগ্রাম, সীমান্ত ঘেঁষা ও ধরলা নদীবেষ্টিত কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীর জনপদে পৌষের হাড় কাঁপানো ঠান্ডা বিরাজ করছে। ঠান্ডায় কাঁপছে মানুষের সঙ্গে প্রাণীকূলরাও। তীব্র ঠান্ডার সঙ্গে যোগ হয়েছে উত্তরের হিমেল হাওয়া ও ঘন কুয়াশা। গ্রাম-গঞ্জের মানুষরা বিভিন্ন স্থানে আগুনের কুন্ডলি জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা চালাচ্ছেন। শীতের প্রকোপে শিশু-বৃদ্ধের মাঝে জ্বর, সর্দির প্রার্দুভাব দেখা দিয়েছে। তীব্র ঠান্ডায় বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় কৃষক ও গরু-ছাগলের খামারিরাও। তারা গরু-ছাগলের গায়ে চটের বস্তা জড়িয়ে শীত নিবারণে চেষ্টা চালাচ্ছেন। এ ব্যাপারে কুড়িগ্রামের রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার বলেন, কুড়িগ্রামে শীতের পরিধি বৃদ্ধি পাচ্ছে। মঙ্গলবার কুড়িগ্রামে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
পৌষের শুরুতে শীতের দেখা না মিললেও হঠাৎ করেই যেঁকে বসেছে শীত। গলাচিপা উপজেলায় গত ২৫ ডিসেম্বর থেকে মৃদু সৈত প্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। শীতের তীব্রতা বাড়ার পাশাপাশি মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা দেখা দিয়েছে এতে সড়ক ও নৌপথে যোগাযোগ সাময়িক বিঘ্নের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পটুয়াখালী মিনিবাস মালিক সমিতির সদস্য হাবিবুর রহমান জানান সকালের বাস সিডিউল সকাল ছয়টায় থাকলেও ঘন কুয়াশার কারণে তা ৭:৩০ মিনিটে করা হয়েছে তবুও দুই একজন যাত্রী ছাড়া কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না।
শীতের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর,কৃষি শ্রমিক, খেটে খাওয়া ও ভাসমান মানুষ দেরিতে সূর্য ওঠা বা সূর্য না ওঠার কারণে বিপাকে পড়তে হয়। জেলে ফারুক খান বলেন, আমরা ছয় জনের একটা দল বিভিন্ন পুকুরের মাছ ধরে পেট চালাই কিন্তু শীত বেশি থাকার কারণে পুকুরে বেশিক্ষণ থাকা যায় না এভাবে শীত চলতে থাকলে আমাদের রুটি রুজির সমস্যা হবে।
হাসপাতাল গুলোতে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। সর্দি, কাশি, জ্বর, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে প্রতিদিনই ভর্তি হচ্ছেন অনেকে। গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তার মেজবাউদ্দিন বলেন, শিশুদের নিমোনিয়া আর বয়স্কদের শ্বাসকষ্ট জনিত রোগ শীতে বেশি দেখা যায়। তাই শিশু ও বয়স্কদের ব্যাপারে বাড়তি সতর্কতা নেয়া প্রয়োজন। হাসপাতালে আমরা এই ধরনের রোগীর বেলায় সর্বোচ্চ সচেষ্ট রয়েছি
দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ও সাবেক অধ্যক্ষ রফিকুল আলম সমাজের সচেতন জনগনদের এগিয়ে আসার দাবি জানিয়ে বলেন, দুর্গম চরাঞ্চল,গ্রামীন এলাকা ও নিম্ন আয়ের মানুষদের প্রশাসনের পাশাপাশি সমাজের ধনী ও বিভিন্ন সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো যেন শীতার্থদের পাশে দাঁড়ান। পৌষের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে প্রকৃতি। সারা দেশে জেঁকে বসেছে শীত। উত্তরের জনপদে আরও আগে থেকেই বইছে হিমেল হাওয়া। সিলেট অঞ্চলে শ্রীমঙ্গলে বয়ে যাচ্ছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ।
তবে শীতের এমন আয়োজনে এতদিন অনেকটাই ব্যতিক্রম ছিল ঢাকা শহর। কয়েকদিন ধরে নগরে ঠাণ্ডা অনুভূত হলেও এর প্রভাব ছিল মূলত রাতে। দিন থেকেছে রৌদ্রকরোজ্জ্বল। ফলে শীতটা সেভাবে টের পাওয়া যায়নি।
পৌষের ১৯তম দিনে এসে মঙ্গলবার ঠাণ্ডা অনুভব করতে শুরু করেছেন রাজধানীবাসীও। একদিনের প্রভাবে ঢাকায় তাপমাত্রা কমে গেছে ৬ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
সারাদেশে গত ২৪ ঘণ্টায় শৈত্যপ্রবাহ না থাকলেও শীতের তীব্রতা ছিল বেশ। আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, তাপমাত্রার তুলনায় শীত বেশি অনুভূত হওয়ার কারণ উত্তরের হিমেল বাতাস।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. তরিকুল নেওয়াজ কবীর জানান, রাজধানী ঢাকাসহ খুলনা ও রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে সর্বনিম্ন তাপমাত্রার দূরত্ব কমে গেছে। ফলে এই তিন বিভাগে শীত আরও বেশি প্রকট হচ্ছ।
দেশজুড়ে হিমেল বাতাস বইতে পারে আরও কয়েক দিন। সেই সঙ্গে আজ দিন ও রাতের তাপমাত্রা কিছুটা কমে আসতে পারে। তবে আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিন সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে শ্রীমঙ্গলে ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং রাজধানীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা হচ্ছে ১৪.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ মঙ্গলবারের তুলনায় রাজধানীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা কিছুটা কমেছে।
ওই দিন ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৪.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর এদিন রাজধানীতে ১৪.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে।
আবহাওয়াবিদ তরিকুল নেওয়াজ বলেন জানুয়ারির ১০ তারিখ পর্যন্ত উপকূলীয় অঞ্চল সহ সারা দেশে শীতের তীব্রতা থাকবে তারপরে আস্তে আস্তে দিনও রাতের তাপ বাড়বে।