
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : বাংলাদেশ- ওষুধ শিল্প জাতীয় গর্বের প্রতীক। দেশি ওষুধ এখন রপ্তানি হয় বিশ্বের নানা প্রান্তে। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ বাস্তবতা- দেশের অভ্যন্তরেই ওষুধ বিক্রির ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত- অসংখ্য ওষুধের দোকান চলছে ফার্মাসিস্ট ছাড়াই, লাইসেন্স বিহীন ভাবে, এবং আইন অমান্য করে। একদিকে রাষ্ট্র বলছে, “ওষুধ জীবন বাঁচায়”; অন্যদিকে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ওষুধই মানুষের জীবনকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
বাংলাদেশে ওষুধ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ওষুধ আইন ১৯৪০, ওষুধ নীতি ২০১৬ এবং ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর এর বিধিমালা। এসব আইনে স্পষ্ট বলা আছে-“কোনো ফার্মেসি পরিচালনা করতে হলে নিবন্ধিত ফার্মাসিস্ট থাকতে হবে, যিনি পেশাগতভাবে ওষুধ বিক্রি, সংরক্ষণ ও পরামর্শ দেবেন।” কিন্তু বাস্তবতা? ওষুধ প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ২ লাখের বেশি ফার্মেসি বা ওষুধ বিক্রয়কেন্দ্র আছে। কিন্তু নিবন্ধিত ফার্মাসিস্টের সংখ্যা সর্বোচ্চ ৪০ থেকে ৫০ হাজার। অর্থাৎ, অন্তত দেড় লাখ ফার্মেসি চলছে ফার্মাসিস্ট ছাড়াই।
এদের বেশিরভাগই অবৈধভাবে ব্যবসা করছে- কেউ জাল লাইসেন্স ব্যবহার করে, কেউ নামধারী ফার্মাসিস্টের সনদ “ভাড়া” নিয়ে, আবার কেউ একে বারেই অনুমোদনহীনভাবে ওষুধ বিক্রি করছে। দেশের ১৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ২৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মাসি বিভাগ চালু রয়েছে। সেগুলো থেকে পাস করা ১ লাখ ৮৮ হাজার ৮৪৭ জন ফার্মাসিস্ট রয়েছেন দেশে। তাদের অধিকাংশই ওষুধ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। ফার্মেসিতে বসা ফার্মাসিস্ট নেই বললেই চলে। বাংলাদেশে এক অদ্ভুত প্রথা চালু হয়েছে- “লাইসেন্স ভাড়া” ব্যবসা।
একজন ফার্মাসিস্ট তার সনদ মাসিক নির্দিষ্ট টাকায় অন্য দোকানকে “ভাড়া” দেন। দোকানে তিনি থাকেন না, কিন্তু নামটি ঝুলে থাকে বোর্ডে। ওষুধ প্রশাসনের কর্মকর্তারা এ বিষয় জানেন, কিন্তু পদক্ষেপ নিতে পারছেন না জনবল সংকট, রাজনৈতিক চাপ বা তদারকির অভাবে। ফলে তৈরি হয়েছে এক “অবৈধতার বৈধ বাজার”- যেখানে আইন আছে, কিন্তু কার্যকর নেই। চিকিৎসা বিজ্ঞানে ওষুধ ব্যবস্থাপনা একটি সংবেদনশীল কাজ।
প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক, হরমোন, স্টেরয়েড বা মানসিক রোগের ওষুধ খাওয়া বিপজ্জনক। কিন্তু দেশে এর ব্যবহার অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৩০ লাখ মানুষ ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া জনিত জটিলতায় আক্রান্ত হয় বলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করেন।গ্রামাঞ্চলে দেখা যায়, জ্বর, ব্যথা, কাশিÑসব কিছুর জন্য দোকানদারই “ডাক্তার”।
এমনকি ইনজেকশনও দেওয়া হয় দোকানের টেবিলে। বিশেষজ্ঞ ডাক্তরের মতে, “ওষুধ সঠিকভাবে না দিলে সেটা বিষে পরিণত হয়। ফার্মাসিস্টের অভাবে দেশে ওষুধ এখন অনেক সময় রোগ সারায় না, বরং নতুন রোগ তৈরি করে।” ওষুধ বিক্রির পেশা আজ পরিণত হয়েছে নিছক ব্যবসায়। ওষুধ কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা বিক্রি বাড়াতে দোকানদারদের কমিশন দেন। দোকানদাররা সেই লোভে বেশি দামি ওষুধ বিক্রি করে।
এক ওষুধ প্রতিনিধি স্বীকার করেন, “আমরা বিক্রি বাড়াতে টার্গেট পাই। দোকানদারদের কমিশন দিই। তারা প্রেসক্রিপশন ছাড়াই বিক্রি করে, আমরা থামাতে পারি না।” এই কমিশন সংস্কৃতি ও নৈতিক অবক্ষয় মিলে ওষুধকে পরিণত করেছে “মুনাফার অস্ত্রে”। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের প্রশ্ন করলে এক ধরনের “চিরাচরিত” উত্তর মেলেÑ“জনবল কম, তদারকি করা কঠিন।” কিন্তু এই “কঠিন”-এর আড়ালে লুকিয়ে থাকে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও কখনো কখনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রভাব। বিভিন্ন জেলায় নামমাত্র অভিযান চালানো হয়, কয়েকটি দোকান সিলগালা হয়, তারপর আবার সব আগের মতো।
এই দায় কেবল প্রশাসনের নয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়েরও। নিয়মিত মনিটরিং না থাকলে আইনের কাগজ মূল্যহীন হয়ে পড়ে। গ্রামীণ ও শহরাঞ্চল উভয় জায়গাতেই সাধারণ মানুষ এখন প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ কিনতে অভ্যস্ত। কারণÑডাক্তার দেখানো ব্যয়বহুল, ওষুধ দোকানে সহজলভ্য,আর্থিক অনিশ্চয়তা। “ওষুধ মানেই আরাম”ফলে মানুষ নিজের শরীর নিয়ে নিজেই পরীক্ষা চালাচ্ছে। জ্বরের ট্যাবলেট থেকে শুরু করে অ্যান্টিবায়োটিক- সব কিছুই নিজের সিদ্ধান্তে খাচ্ছে।
এই সংস্কৃতি ধীরে ধীরে “ওষুধ নির্ভর জাতি” তৈরি করছে, যারা চিকিৎসা নয়, অস্থায়ী আরামের পেছনে দৌড়ায়। দেশে এখন নিবন্ধিত ফার্মাসিস্টদের সংখ্যা অনেক হলেও তাদের অনেকেই বেকার বা অন্য খাতে কাজ করছেন। কারণ- তাদের পেশাগত সম্মান রক্ষা করার মতো পরিবেশ নেই। ফার্মেসি খোলার মূলধন, লাইসেন্স জটিলতা, এবং অনিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা তাদের পিছিয়ে দেয়। ফলে সুযোগ নেয় অদক্ষ ব্যবসায়ীরা।
একজন পেশাদার ফার্মাসিস্ট বলেন, “আমরা আইন মেনে দোকান খুললে লাভ হয় না, কারণ পাশের দোকান নিয়ম না মেনেই কম দামে বিক্রি করে। এতে সৎ মানুষ টিকে থাকতে পারে না।” এটাই আজ বাংলাদেশের ওষুধ খাতের বড় সংকট- নৈতিক ব্যবসা টিকছে না, অনৈতিকতাই লাভজনক। ফার্মাসিস্টবিহীন ওষুধ বিক্রির কারণে এখন যে ক্ষতি হচ্ছে, তা শুধু আজকের নয়- ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও হুমকি।
অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে তৈরি হচ্ছে ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স- অর্থাৎ ওষুধ আর কাজ করছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডঐঙ) বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণ না করলে প্রতি বছর লাখো মানুষ মারা যাবে এমন রোগে, যেগুলোর চিকিৎসা এখন সহজ। বাংলাদেশে ইতিমধ্যেই “অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স” ভয়াবহ পর্যায়ে।
ফলে সাধারণ সংক্রমণও জটিল হয়ে পড়ছে। সমাধান কোথায়? লাইসেন্সবিহীন ফার্মেসি বন্ধ ও ফার্মাসিস্ট ছাড়া ওষুধ বিক্রিতে কারাদ- নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি ফার্মেসিকে অনলাইন রেজিস্ট্রেশনের আওতায় এনে লাইসেন্স ও ফার্মাসিস্ট তথ্য পাবলিক করতে হবে।
গণমাধ্যম, স্কুল ও ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রচারণা চালাতে হবে- প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ কেনা যাবে না। নিবন্ধিত ফার্মাসিস্টদের সরকারি নীতির আওতায় বিশেষ প্রণোদনা দিতে হবে, যেন তারা পেশায় ফিরে আসেন। বিক্রয় টার্গেট সংস্কৃতি বন্ধ করে নৈতিক মার্কেটিং নিশ্চিত করতে হবে। প্রত্যন্ত এলাকায় সরকারি ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতি নিশ্চিত করলে মানুষ দোকাননির্ভর হবে না।
ফার্মাসিস্টবিহীন ওষুধ বিক্রি শুধু আইন ভঙ্গ নয়, এটা সমাজের নৈতিক অবক্ষয়েরও প্রতিফলন। আমরা এমন এক জায়গায় পৌঁছেছি, যেখানে “লাভ” মানুষের “জীবনের চেয়ে বড়” হয়ে উঠেছে। একজন রোগী মারা গেলে সেটা আর সমাজের বিবেককে নড়ে না, বরং নতুন গ্রাহক খোঁজে বাজার। আমরা বলতে পারি, জীবন বাঁচানোর দায় সবার। বাংলাদেশে ওষুধ ব্যবসার এই বেপরোয়া চিত্র কেবল স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যর্থতা নয়- এটা রাষ্ট্রের নৈতিক পরীক্ষাও।
আইন, নীতি, শিক্ষা- সবই আছে, শুধু অনুশীলন নেই। ওষুধের দোকান যদি অদক্ষ হাতে চলে, তাহলে সেই ওষুধ আর জীবনরক্ষার নয়, মৃত্যুর হাতিয়ার হয়ে ওঠে।সমাজ, প্রশাসন, ফার্মাসিস্ট সংগঠন ও সাধারণ মানুষ- সবাইকে এখন দায়িত্ব নিতে হবে। কারণÑ“জীবন বাঁচানো শুধু ডাক্তারদের কাজ নয়, সেটা আমাদের মানবতারও দায়।”