
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে খুলনার উপকূলজুড়ে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে নাজুক বেড়িবাঁধ নিয়ে আতঙ্কে থাকা পাইকগাছা, দাকোপ ও কয়রার পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে পুরোনো বেড়িবাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন।
পাইকগাছার শান্তা এলাকার শাফায়াত হোসেন বলেন, ফকিরাবাঁধ আর হড্ডা এলাকার বাঁধ কিছুদিন আগে ভেঙেছিল। আমরা নিজেরাই বালুর বস্তা ফেলে ঠেকানোর চেষ্টা করেছি। জোড়াতালি দিয়েই চলছে সব।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সামান্য বৃষ্টি বা জোয়ার হলেই বাঁধ টিকবে কি না, সেই দুশ্চিন্তায় প্রতিটি রাত কাটে আতঙ্কে। কয়রার বিভিন্ন জায়গায় নতুন করে ফাটল দেখা দেওয়ায় মানুষ আরও ভীতসন্ত্রস্ত।
২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বরের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় সিডরের স্মৃতি এখনো উপকূলবাসীর মনে তাজা। ২৬০ কিমি বেগের বাতাস ও ১৫-২০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস উপকূলকে ল-ভ- করে দেয়। প্রাণ হারান সাড়ে ৩ হাজার মানুষ। ভেসে যায় প্রায় ২০ লাখ ঘরবাড়ি। মারা যায় প্রায় পাঁচ লাখ গবাদিপশু।
কয়রার আংটিহারা গ্রামের মিজানুর রহমান বলেন, সেই রাতে বাঁধ-রাস্তাঘাট সব শেষ হয়ে গিয়েছিল। এরপর আর কোনোদিন বাঁধ আগের মতো হয়নি। এখনো ভাঙন থামেনি।
৭৫ বছরের সালেহা বেগম বলেন, সিডরের মতো ঝড় আর দেখিনি। এখনও এলাকায় গাছ-গাছালি ঠিকমতো জন্মায় না। একটু বাতাস উঠলেই ওয়াপদা ভেঙে পানি ঢুকে পড়ে।
সিডরের পর আইলা, মহাসেন, কোমেন, রোয়ানু, ফণী, বুলবুল, আম্পান, ইয়াস, অশনি, সিত্রাং, মোখা, প্রায় প্রতি বছরই নতুন ঘূর্ণিঝড় আঘাত করেছে উপকূলে। ২০২৪ সালের ‘রিমাল’ ‘দানা’ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত ১,৬৫১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ৬৮৪ কিলোমিটার ভেঙে গেলেও টেকসই পুনর্নির্মাণ হয়নি। খুলনা-সাতক্ষীরা-বাগেরহাট অঞ্চলের ১,৯১০ কিলোমিটার পোল্ডারের অধিকাংশই এখনো ষাটের দশকের পুরোনো বাঁধ। নানা সময়ে জিওব্যাগ ও বালুর বস্তায় অস্থায়ী রিংবাঁধ দিয়েই উপকূলকে টিকিয়ে রাখা হচ্ছে।
৬০ বছর বয়সী হাসেম আলীর ক্ষোভ, বাঁধ ভাঙলে তখন সবাই আসে। পরে আর কেউ আসে না। এখন বাঁধ চিকন হয়ে গেছে, ঢেউ উঠলেই পানি ঢুকে পড়ে। এখনই নতুন বাঁধ নির্মাণ করা দরকার।
খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম বলেন, অনেক এলাকায় সংস্কার কাজ চলছে। তবে স্থানীয়দের মতে, কাজের গতি ধীর এবং সংকটের তুলনায় তা একেবারেই অপ্রতুল।
উপকূলের মানুষের একটাই দাবি, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপ। তারা বলছেন, টেকসই বাঁধ চাই, নিরাপদে ঘুমানোর অধিকার চাই।
বহু ঝড়-জলোচ্ছ্বাস মোকাবিলা করা মানুষগুলোর আতঙ্ক এখন শুধু আবহাওয়া নয় বরং ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ, যা তাদের প্রতিদিনই জীবন-জীবিকা ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের কাছে ঘূর্ণিঝড় কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, প্রতিবছর আঘাত হানা এক আজন্ম অভিশাপ। বিশেষ করে, বছরের বর্ষা মৌসুমের আগে এবং পরে আকাশে মেঘ দেখলেই তাদের মনে দানা বাঁধে এক চেনা ভয়, এই বুঝি হারালাম সবকিছু।
এই ভয়ের একটি ভৌগোলিক এবং বৈশ্বিক কারণও রয়েছে। পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ বাংলাদেশের উপকূলীয় ভূখ- প্রাকৃতিকভাবেই নিচু এবং সমতল। অসংখ্য নদী-নালা জালের মতো ছড়িয়ে থাকায় এই অঞ্চল যেমন উর্বর, তেমনই অরক্ষিত। বঙ্গোপসাগরের ফানেল আকৃতির উপকূলরেখা সামুদ্রিক ঝড়কে দানবীয় শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ করে দেয়। এর সাথে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন নামক বৈশ্বিক অভিশাপ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধি ঘূর্ণিঝড়গুলোকে আরও শক্তিশালী ও ঘন ঘন আঘাত হানার পরিবেশ তৈরি করছে। ফলে, যা ছিল প্রকৃতির এক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া তা এখন এক বিধ্বংসী ও নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। উপকূলের সাধারণ মানুষ, যারা এই জলবায়ু পরিবর্তনে সামান্যতম ভূমিকাও রাখেনি, তারাই এর সবচেয়ে নিষ্ঠুর শিকার।
তবে প্রকৃতির এই রুদ্র রূপের বিপরীতে উপকূলকে মায়ের মতো আগলে রেখেছে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন- সুন্দরবন। সিডর, আইলা বা বুলবুলের মতো প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের সামনে সুন্দরবনই যেন হয়ে উঠেছিল এক প্রাকৃতিক বর্ম। এর অসংখ্য গাছপালা, শ্বাসমূল আর নদ-নদীর ঘন নেটওয়ার্ক ঝড়ের গতিকে অনেকাংশে কমিয়ে দেয়, জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা শোষণ করে নেয় এবং উপকূলের মূল ভূখ-কে সরাসরি আঘাত থেকে রক্ষা করে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি, দূষণ এবং বনখেকোদের আগ্রাসনে সুন্দরবন নিজেই আজ বিপন্ন। এই প্রাকৃতিক রক্ষাকবচকে রক্ষা করতে না পারলে ভবিষ্যতে ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত বাংলাদেশের জন্য আরও কত ভয়াবহ হবে, তা কল্পনাও করা যায় না। সুন্দরবনকে বাঁচানো তাই কেবল একটি পরিবেশগত বিষয় নয়, এটি উপকূলের কোটি মানুষের জীবন বাঁচানোর সমার্থক।
উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ প্রতিবছর হারায় তাদের স্ত্রী-সন্তান, মা-বাবা, নিকটাত্মীয়, ঘর-বাড়ি ইত্যাদি। সিডর, আইলা, ফণী, আম্ফানÑ এসব নামের সাথে মিশে আছে হাজারো মানুষের কান্না আর হারানোর বেদনা। তবে এই দুর্যোগগুলোই তাদের আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তিও জোগায়। এই হারানোর যন্ত্রণা কেবল বস্তুগত বা শারীরিক নয়, এর একটি গভীর মানসিক প্রভাবও রয়েছে। প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়ের পর উপকূলের শিশুদের চোখে যে আতঙ্ক জমা হয়, তা ভোলার নয়। ঝড়ের রাতে বাতাসের হুংকার আর জলোচ্ছ্বাসের গর্জন তাদের শিশু মনে যে স্থায়ী ক্ষত তৈরি করে, তা সারাজীবনেও শুকায় না। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে তৈরি হয় এক ধরনের উদ্বেগ। বারবার ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারিয়ে তারা একসময় মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এই মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি প্রায়শই ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়।
এই সংকটের সবচেয়ে নীরব শিকার হয় নারী ও শিশুরা। দুর্যোগের সময় এবং পরে তাদের দুর্ভোগ পৌঁছায় চরমে। আশ্রয়কেন্দ্রে অপরিসর ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে নারীরা তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকেন। বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের অভাবে তারা নানা রকম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন, বিশেষ করে তাদের প্রজনন স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্যোগ পরবর্তী সময়েও সংসারের হাল ধরতে নারীদেরই সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় ধরে স্কুল বন্ধ থাকায় শিশুদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়, যা তাদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়। দুর্যোগের এই লিঙ্গভিত্তিক এবং বয়স-ভিত্তিক প্রভাবগুলো আমলে না নিলে কোনো পুনর্বাসন কার্যক্রমই পুরোপুরি সফল হতে পারে না।
এখানে ঘূর্ণিঝড় বৃষ্টি ও বাতাসের সাথে সাথে নিয়ে আসে লোনা পানির বিশাল ঢেউ আর জলোচ্ছ্বাস। মানুষ কেবল তার শেষ আশ্রয় হারায় না, খাদ্য-বস্ত্র-পানির অভাব তখন সবচেয়ে প্রকট হয়। বাঁধ ভেঙে নদীর লোনা পানি উপকূলে ঢুকে পুকুর, টিউবওয়েলসহ অন্যান্য পানির উৎস নষ্ট করে দেয়। দীর্ঘমেয়াদে ডেকে আনে খাদ্য সংকট এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি। সমস্ত ফসল নষ্ট হয়ে যায় লবণাক্ততা আর তীব্র বাতাসের তোড়ে। জেলে হারায় তার মাছধরার জাল ও নৌকা। অনেকেই হারায় তাদের জীবিকার অনুসঙ্গ, যার ফলে বেড়ে যায় অপরাধপ্রবণতা। লোনা পানির এই আগ্রাসন কেবল তাৎক্ষণিক সংকট তৈরি করে না, এটি উপকূলের কৃষি অর্থনীতি এবং বাস্তুতন্ত্রকে স্থায়ীভাবে বদলে দেয়। যে জমিতে একসময় সোনার ধান ফলত, লবণাক্ততার কারণে তা আজ বন্ধ্যা। বাধ্য হয়ে অনেক কৃষক তাদের শতবর্ষের পেশা ছেড়ে চিংড়ি চাষ বা অন্য পেশায় ঝুঁকছে। চিংড়ি চাষ লাভজনক হলেও এটি মাটির উর্বরতা আরও কমিয়ে দেয় এবং লবণাক্ততা বাড়িয়ে তোলে। এর ফলে মিষ্টি পানির মাছ ও দেশীয় প্রজাতির উদ্ভিদ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এটি একটি চক্রাকার সংকট তৈরি করে। ঘূর্ণিঝড় লবণাক্ততা বাড়ায়, আর সেই লবণাক্ততা কৃষিকে ধ্বংস করে মানুষকে এমন পেশার দিকে ঠেলে দেয়, যা পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি করে। এর ফলে উপকূলের খাদ্য নিরাপত্তা ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ওপর এক নীরব আঘাত নেমে আসে।
বেশিরভাগ মানুষ সঠিক খবর ও সচেতনতার অভাবে আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় গ্রহণ করতে পারে না। যারা আশ্রয় গ্রহণ করে তারা ফিরে এসে বাড়ির খোঁজ নেয়, হারিয়ে যাওয়া গবাদিপশুটির খোঁজ নেয়। ঘূর্ণিঝড় বাড়িঘর আস্ত রাখে না, অনেকসময় মেরে ফেলে তাদের সম্বল গবাদি পশুদের। কিন্তু, এই অদম্য মানুষগুলো আবার ঘুরে দাঁড়ায়। চোখের পানিকে আড়াল করে ঘাম ঝরিয়ে পরিশ্রম করে, গড়ে তোলে আরেকটা বাড়ি, মাছে ভরা পুকুর, গোয়ালভরা গবাদি পশু-পাখি। কিন্তু, এসব আয়োজন যেন আবার ঘূর্ণিঝড়ের কাছে সঁপে দেওয়ার জন্যই এর
সত্তরের প্রলয়ঙ্করী সাইক্লোন কিংবা ১৯৯১ সালের বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ে যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল, সেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিডর, আইলা, ফণী, আম্পান বা মোখার মতো প্রচ- ক্ষমতাশালী ঝড়গুলোতেও আমরা মৃত্যুর সংখ্যাকে কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি। এই বৈপ্লবিক সাফল্যের পেছনে নিঃসন্দেহে রয়েছে আমাদের সময়োপযোগী আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা। পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি করার মাধ্যমে আমরা দুর্যোগের ক্ষয়-ক্ষতি এবং প্রাণহানি দিন দিন কমিয়ে আনছে।
উপগ্রহ থেকে তথ্য সংগ্রহ, উন্নত আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং একটি শক্তিশালী স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক (বিশেষ করে সাইক্লোন প্রিপেয়ার্ডনেস প্রোগ্রাম বা সিপিডি) একযোগে কাজ করে। ঝড়ের কয়েকদিন আগে থেকেই বিপদ সংকেত পৌঁছে যায় উপকূলের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। মাইকিং, রেডিও, টেলিভিশন এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ক্রমাগত প্রচারণার ফলে মানুষ দুর্যোগের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন হতে পারে। এই সক্ষমতা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু, সাফল্য কি আমাদেরকে এক ধরনের আত্মতুষ্টির বিভ্রান্তিতে ভোগাচ্ছে? আমরা কি ধরে নিচ্ছি যে, মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে আনার বার্তা দিতে পারাই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার চূড়ান্ত সফলতা? সময় এসেছে এই প্রশ্নগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করার। সতর্কবার্তা জীবন বাঁচায়, কিন্তু সেই জীবনকে সচল রাখার জন্য যে জীবিকা প্রয়োজন, তা কি আমরা রক্ষা করতে পারছি?
বাস্তবতা হলো, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রথম ধাপ হলো সতর্কবার্তা, শেষ ধাপ নয়। যখন একজন উপকূলীয় বাসিন্দাকে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের কথা জানিয়ে ঘর ছাড়তে বলা হয়, তখন আমরা কি ভেবে দেখেছি, তার গন্তব্য কোথায়? সংকেত পাওয়ার পর সেই মানুষটির যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত, মানসম্মত ও নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র কি আমরা আদৌ নিশ্চিত করতে পেরেছি? কাগজে-কলমে আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা হয়তো বেড়েছে, কিন্তু সেগুলোর বাস্তব অবস্থা ভয়াবহ। বেশিরভাগ আশ্রয়কেন্দ্রই সারাবছর অবহেলায় পড়ে থাকে। দুর্যোগের সময় সেগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। ন্যূনতম পরিচ্ছন্নতা, সুপেয় পানি বা পর্যাপ্ত শৌচাগারের ব্যবস্থা থাকে না। বিশেষ করে নারী, শিশু এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য এই পরিবেশ অত্যন্ত অনিরাপদ ও অবমাননাকর।
এর চেয়েও বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, গবাদি পশুর জন্য স্থানের অভাব। উপকূলীয় অঞ্চলের একটি পরিবারের কাছে তার কয়েকটি ছাগল, হাঁস-মুরগি বা একটি গরু কেবল পশু নয়, এগুলো তার জীবিকার প্রধান অবলম্বন এবং বছরের সঞ্চয়। যখন আশ্রয়কেন্দ্রে এই নিরীহ প্রাণীগুলোর জন্য কোনো ব্যবস্থা থাকে না, তখন অনেক পরিবারই তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঝড়ের মধ্যে নিজেদের বাড়িতে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে, আমাদের সতর্কবার্তা ব্যবস্থা সচল থাকলেও তা ব্যবহারের অনুপযোগী অবকাঠামোর কারণে পুরোপুরি কার্যকর হতে পারে না। মানুষকে কেবল ‘যাও’ বলাই যথেষ্ট নয়, তাদের একটি নিরাপদ ও মানবিক আশ্রয় নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
সতর্কবার্তা মানুষকে সাময়িকভাবে নিরাপদ স্থানে সরাতে পারে, কিন্তু দুর্যোগের মূল আঘাতটি আসে আমাদের ভঙ্গুর অবকাঠামোর ওপর। আর এই অবকাঠামোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো উপকূলীয় বেড়িবাঁধ। জলোচ্ছ্বাসের প্রথম ধাক্কাতেই যখন এই বাঁধগুলো হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে, তখনই প্রকৃত বিপর্যয় শুরু হয়। একটি প্রশ্ন বারবার উঠে আসে, কেন প্রতি বছর একই জায়গায় বাঁধ ভাঙে? কেন বর্ষার আগে বা দুর্যোগের ঠিক আগমুহূর্তে জরুরি মেরামত বা আপৎকালীন সংস্কার করতে হয়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং রক্ষণাবেক্ষণের সংস্কৃতিতে। আমাদের বাঁধ নির্মাণ প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রেই হয়ে পড়েছে ত্রাণবান্ধব। অর্থাৎ, এমনভাবে দুর্বল করে বাঁধ নির্মাণ বা সংস্কার করা হয়, যা ভেঙে গেলে নতুন করে ত্রাণ ও মেরামতের সুযোগ তৈরি হয়। টেকসই ও জলবায়ু-সহনশীল বাঁধ নির্মাণে যে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ এবং স্বচ্ছতা প্রয়োজন, সেখানে দুর্নীতি ও অবহেলার অভিযোগ প্রকট। যখন একটি পাঁচ বা ছয় ফুট জলোচ্ছ্বাসের ধাক্কাতেও বাঁধ ভেঙে যায়, তখন বুঝতে হবে এটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়েও বেশি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা। এই দুর্বল অবকাঠামোগত ব্যর্থতা দুর্যোগের ক্ষতিকে কেবল বহুগুণ বাড়িয়েই তোলে না, এটি সতর্কবার্তার সাফল্যকেও ম্লান করে দেয়।
বাঁধ ভাঙার তাৎক্ষণিক প্রভাব হলো ঘরবাড়ি প্লাবিত হওয়া। কিন্তু, এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব আরও ভয়াবহ এবং স্থায়ী। বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে যখন সমুদ্রের লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে, তা এক অপূরণীয় বিপর্যয়ের সূচনা করে। এই লবণাক্ত পানি বছরের পর বছর কৃষি জমিকে অনুর্বর করে রাখে। কৃষকের সোনালি ধানের স্বপ্ন নোনা পানিতে ডুবে যায়। মিঠা পানির মাছের ঘেরগুলো মুহূর্তে ধ্বংস হয়ে যায়। সুপেয় পানির একমাত্র উৎস যে পুকুর, তা লবণাক্ত হয়ে পড়ায় তীব্র পানি সংকট দেখা দেয়। এই দীর্ঘমেয়াদী বিপর্যয় থেকে মানুষ সহজে ঘুরে দাঁড়াতে পারে না।
আমাদের বর্তমান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা একটি অদ্ভুত দ্বৈত সংকট তৈরি করেছে। আমরা আগাম সতর্কবার্তা দিয়ে জীবন বাঁচাতে পারছি, কিন্তু টেকসই অবকাঠামোর অভাবে সেই মানুষগুলোর জীবিকা রক্ষা করতে পারছি না। একজন মানুষ যখন আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ঝড়ের পরদিন সকালে বাড়ি ফিরে দেখেন, তার ভিটেমাটি লোনা পানিতে ডুবে আছে, ফসলের জমি নষ্ট হয়ে গেছে, মাছের ঘের ভেসে গেছে, তখন তার বেঁচে থাকাটাই অর্থহীন হয়ে পড়ে।
দুর্যোগের পর পুনর্বাসন প্রক্রিয়াও অত্যন্ত ধীরগতির এবং প্রায়শই তা ত্রাণ-নির্ভর। এই ত্রাণ সাময়িক স্বস্তি দিলেও তা টেকসই সমাধান দেয় না। একটি ভাঙা বাঁধ সময়মতো মেরামত না হওয়ায় মানুষ এক ফসলের পর আরেক ফসল হারাতে থাকে। সুপেয় পানির অভাবে ডায়রিয়া, আমাশয়সহ নানা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়। জীবিকা হারিয়ে এই মানুষগুলো ক্রমান্বয়ে স্থায়ী দারিদ্র্যের চক্রে আটকে পড়ে। শেষ পর্যন্ত, তারা সব হারিয়ে জলবায়ু উদ্বাস্তু হিসেবে শহরের বস্তিগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। সুতরাং, আমরা জীবন বাঁচিয়ে হয়তো পরিসংখ্যানের পাতায় সফল হচ্ছি, কিন্তু জীবিকা ধ্বংস করে আমরা একটি নিঃস্ব ও পঙ্গু জনগোষ্ঠী তৈরি করছি। এটি কোনোভাবেই টেকসই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা হতে পারে না।
সময় এসেছে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর। কেবল দুর্যোগের সময় তৎপর হয়ে ওঠা যথেষ্ট নয়। দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে হবে সারাবছর ধরে। আমাদের সাফল্যকে পরিসংখ্যানের ঘরে আটকে না রেখে, তা মানুষের প্রকৃত জীবনমানে প্রতিফলিত করতে হবে। আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার যে আধুনিকায়ন আমরা করেছি, তা অবশ্যই অব্যাহত রাখতে হবে। এর পাশাপাশি আমাদের সমস্ত মনোযোগ ও বিনিয়োগ এখন টেকসই অবকাঠামোর দিকে ফেরাতে হবে। বিশেষ করে উপকূলীয় বেড়িবাঁধগুলোকে নেদারল্যান্ডসের ডেল্টা প্ল্যানের মতো দীর্ঘমেয়াদী ও বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনায় পুনর্নির্মাণ করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা মাথায় রেখে বাঁধের উচ্চতা ও কাঠামো নতুন করে ডিজাইন করতে হবে। বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। জরুরি মেরামতের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ওপর জোর দিতে হবে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে কেবল দুর্যোগের সময় নয়, সারাবছর ব্যবহারোপযোগী এবং মানবিক সুবিধাসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে হবে।
পরিকল্পিত বনায়ন করি-সবুজ বাংলাদেশ গড়ি’ প্রতিপাদ্য নিয়ে বুধবার থেকে জাতীয় বৃক্ষরোপন অভিযান ও বৃক্ষমেলা শুরু হলেও দেশের বিশাল উপকুলীয় এলাকা সহ দক্ষিণাঞ্চলকে বঙ্গোগাপসাগর থেকে ধয়ে আসা ঘূর্ণিঝড় থেকে রক্ষায় প্রাকৃতিক ঢাল’ উপক’লীয় বনভূমি এখন নিজেই ঝুকির মুখে। ১৯৭০-এর ঘূর্ণিঝড় ‘হেরিকেন’ থেকে শুরু করে ‘সিডর’, ‘আইলা’, ‘মহাসেন’ ‘আম্পান’ ও ‘ইয়াস’এর মত বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছাস প্রতিহত করতে দেশের বিশাল উপকুলীয় বনভুমি, ‘প্রাকৃতিক ঢাল’ হিসেবে কাজ করছে। কিন্তু ১৯৬৬ সাল থেকে বিশ^ব্যাংক সহ বিভিন্ন দাতা ও সাহায্য সংস্থার অর্থায়ন সহ দেশের নিজস্ব সম্পদে যে প্রায় সোয়া ২ লাখ হেক্টর উপক’লীয় বনভ’মী সৃজন করা হয়েছে, তার অন্তত ৩০ভাগ ইতোমধ্যে বিনষ্ট ও বেদখল হয়ে গেছে।
এমনকি এসব বনভ’মি প্রতিটি ঝড়ঝঞ্ঝায় উপক’লভাগের বিশাল জনগোষ্ঠী সহ সম্পদের সুরক্ষায় ‘প্রাকৃতিক ঢাল’এর ভ’মিকা পালন করলেও তার উন্নয়ন ও পূণর্বাশনে এখন কোন প্রকল্প নেই। বিগত এক যুগেরও বেশী সময় ধরে উপক’লীয় এলাকায় নতুন বন সৃজনে কোন প্রকল্প না থাকায় বিদ্যমান ও ক্ষতিগ্রস্থ বনভ’মীর স্থায়িত্ব ও টেকসই ধারা অব্যাহত থাকছে না।
এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, ১৮৭৭ সাল থেকে ২০২৪-এর মধ্যভাগ পর্যন্ত বঙ্গোপসাগর থেকে অন্তত অর্ধশতাধিক তীব্র ঘূর্ণিঝড় ছাড়াও ৪৯ বার ঘূর্ণিঝড় ও ২০ বার ‘হেরিকেন’ মাত্রার ঘূর্ণিঝড় আমাদের উপক’লীয় এলাকায় আঘাত হেনেছে। বন বিভাগের একটি দায়িত্বশীল সূত্রের মতে, ২০০৭-এর ১৫ নভেম্বর রাতে ২৪৮ কিলোমিটার বেগে ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’এর আঘাত প্রতিহত করতে গিয়ে বরিশাল অঞ্চলের উপক’লভাগ সহ মূল ভ’খন্ডের প্রায় ১ কোটি সরকারী ও বিভিন্ন বসতবাড়ীর গাছপালা বিনষ্ট হয়।
ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’এর আঘাতে উপক’লীয় বনের প্রায় সাড়ে ১১ হাজার হেক্টরের গাছ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ঘূর্ণিঝড় ‘আম্পান’এ প্রায় ১২ হাজার হেক্টরের বনবাগান ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। আর সবশেষ ২০২৩-এর মে মাসের ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’এর প্রভাবে সাড়ে ৬ হাজার হেক্টরের ম্যানগ্রাভ বাগান, পৌনে ২শ হেক্টরের স্ট্রীপ, গোলপাতা ও ঝাউ বাগান ছাড়াও নার্সরী সমুহের প্রায় দেড়লাখ চারা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল।
তবে বছর পাঁচেক আগে ১০৪ কোটি টাকার সম্পূর্ণ দেশীয় তহবিলে ‘বঙ্গোপসাগরে জেগে ওঠা চরাঞ্চলে বনায়ন’ নামে একটি প্রকল্পের আওতায় ২৫ হাজার হেক্টরে নতুন বনায়ন সহ এক হাজার কিলোমিটার উপকুলীয় বেড়িবাঁধ ও বিভিন্ন সড়কে বৃক্ষ রোপনের একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। উপকুলের ১০টি জেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মেয়াদ ১ বছর বৃদ্ধি সহ সোয়া ৩ কোটি টাকা প্রকল্পব্যায় বাড়িয়ে ৪০ হাজার বসতবাড়ী বনায়নের লক্ষ্যে গাছের চাড়া বিতরন করা হয়।
তবে ‘গ্রীন ক্লাইমেট ফান্ড’এর সহায়তায় উপকূলীয় এলাকায় আরো বনায়নের একটি ‘উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা’ গ্রহনের প্রচেষ্টার কথা শোনা গেলেও তা এখনো আলোর মুখ দেখেনি।
সরকার বঙ্গোসাগরের কোল ঘেসে দেশের ৭১০ কিলোমিটার উপকুলীয় তটরেখার ১৯টি জেলার ৪৮টি উপজেলার ৪৭ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকাকে ‘উপকুলীয় এলাকা’ হিসেবে চিহিৃত করেছে। যা দেশের মোট আয়তনের ৩০%। মোট জনসংখ্যার ২৮% মানুষ এসব ঝুকিপূর্ণ এলাকায় বাস করে। উপক’লীয় এলাকার বিশাল জনগোষ্ঠী সহ সম্পদকে রক্ষায় ১৯৬৬ সাল থেকে যে বনায়ন শুরু হয়, তারই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় উপকুলভাগে ইতোপূর্বে দুই লক্ষাধীক হেক্টর সরকারী খাশ জমিতে ‘লবনাম্বুজ বন বা ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট’ সহ বিভিন্ন ধরনের বনায়ন করা হয়েছে।
কিন্তু বঙ্গোপসাগর থেকে ধেয়ে আসা একের পর এক ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাশ প্রতিহত করতে গিয়ে উপক’লীয় বনভ’মীও অনেকটাই ক্ষতবিক্ষত। সিডরের ক্ষতি পুরনের আগেই পরবর্র্তি ৩ বছরে ঘূর্ণিঝড় ‘মহাশেন’ ও ‘আইলা’ উপক’লীয় বনবাগান সহ বিশাল জনপদকে আরো ক্ষতবিক্ষত করে।
বছর পাঁচেক আগে ভারত, ব্রাজিল ও মালয়েশিয়ার কয়েকজন গবেষক সুন্দরবন সহ বরিশাল অঞ্চলের উপক’লীয় বন বাগান পরিদর্শন করে ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন। তাদের গবেষনা ফলাফল আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘এলসেভিয়ায়ের এষ্টুয়ারিন, কোষ্টল এন্ড সেলফ সায়েন্স জর্নাল’এ প্রকাশিত হয়েছিল। ঐ গবেষনাপত্রে আম্পান সহ সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড়গুলোতে বরিশাল উপক’লীয় অঞ্চলের বনের ক্ষতি ৫৬.১৯ শতাংশ এলাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। এমনকি আম্পানের কারণে উপক’লীয় ম্যনগ্রোভ বা লবনাম্বুজ বনের সব অংশেরই অবনতি সহ ভাঙন দেখা দিয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে তাদেও গবেষনা প্রতিবেদনে।
গত কয়েক বছর ধরে দেশের উত্তরাঞ্চল সহ পাশর্^বর্তি ভারতে বৃষ্টির অভাবে উজান থেকে নদ-নদীর প্রবাহ আশংকাজনক ভাবে হ্রাসের ফলে সাগরের লবনাক্ত পানি উপক’ল থেকে বরিশাল অতিক্রম করে চাঁদপুরে ভাটিতে মেঘনার হিজলা পর্যন্ত পৌছে যাচ্ছে। উপক’লীয় এলাকা ও এর নদ-নদীগুলোতে লবনাক্ততার মাত্রা অতীতের যেকোন সময়ের তুলনায় বেড়ে যাবার কারণেও বনের ক্ষতি হচ্ছে। আবার অনেক চরাঞ্চলে ক্রমাগত পলি পড়ে ভ’মির উচ্চতা বৃদ্ধির ফলেও গাছ পর্যাপ্ত পানি পচ্ছেনা। ফলে তার টেকসই স্থায়িত্ব ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। পলি জমে উপক’লের নদী ও খাল ভরাট হবার কারণেও বনের ইকোসিষ্টেম ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।
আবার নদী ভাঙনেও উপক’লীয় এলাকায় প্রতিবছর প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর বনভুমি বিলীন হচ্ছে। উপক’লীয় বনায়নে আর্থিক সহায়তাকারী বিশ^ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ১৯৭৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৩৭ বছরে দেশের উপকূলীয় এলাকায় ১৪৪ বর্গ কিলোমিটার বনভ’মি হ্রাস পাবার কথা বলা হয়েছে।
এমনকি একের পর এক ঘূণিঝড়ের ছোবলে দক্ষিন উপক’ল সংলগ্ন উপক’লীয় বনভ’মি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। গত দুই দশকে খেপুপাড়া সংলগ্ন উপক’লীয় বনাঞ্চলের প্রায় ৬৪ ভাগ বনভ’মি সাগরের ঢেউ সহ ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বলেও জনাগেছে। এমনকি ঐ এলাকার ইকোপার্ক, নারকেল বাগান ও ঝাউ বাগান সহ লবানাম্বুজ বনের বেশীরভাগ এলাকাই বিলীন হয়েছে।
পাশাপাশি বন বিভাগ জানিয়েছে ইতোমধ্যে সৃজিত বনভ’মির কারনে দেশের বিশাল উপকুলীয় এলাকায় অনেক ভুমি উদ্ধারও সম্ভব হয়েছে। অনেক চরাঞ্চল মূল ভু-খন্ডের সাথেও যূক্ত হয়েছে ইতোমধ্যে। তবে পরিবশেবীদদের মতে, ভুখন্ড উদ্ধারের চেয়েও সৃজিত বনভুমি সবচেয়ে বেশী ইতিবাচক ভুমিক রাখছে বঙ্গোপসাগর থেকে ধেয়ে আসা ঝড়-জলোচ্ছাসের হাত থেকে উপকুলভাগকে রক্ষায়।
এ পর্যন্ত উপকুলীয় এলাকায় যে বনায়ন হয়েছে, তার প্রায় ৯৫ ভাগই ছিল কেওড়া গাছ। কিন্তু দ্রুত বর্ধনশীল হলেও দশ বছর বয়স থেকে কান্ড ছিদ্রকারী পোকার আক্রমনে কেওড়া বাগান মড়ে যাচ্ছিল। পাশাপাশি উপকুলীয় বাগানে ক্রমাগত পলি পড়ে ভ’মির উচ্চতা বৃদ্ধি সহ অবাধে গবাদিপশুর বিচরনে বনভুমির মাটি শক্ত হয়ে বাগানের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছিল। এ থেকে পরিত্রানে উপকুলীয় এলাকায় কেওড়া’র বিকল্প হিসেবে ‘ছইলা,বাইন, সাদা বাইন, মরিচা বাইন, গেওয়া, সুন্দরী, পশুর, ধুন্দল, সিংড়া, খলসী, কিরপা, গোলপাতা, হেতাল, কাকড়া, গড়ান ও গর্জন’ গাছের চারা উত্তোলন ও আবাদ কৌশল উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ বন গবেষনা ইনস্টিটিউট। তবে সাম্প্রতিককালে কেওড়া গাছের কান্ড ছিদ্রকারী ‘স্টেম বোরার’ পোকার আক্রমন প্রকৃতিকভাবেই অনেকটা স্তিমিত হয়েছে বলেও গবেষকগন জানিয়েছেন।
এসব ব্যপারে বন অধিদপ্তরের বরিশাল কোষ্টাল সার্কেলের বন সংরক্ষক জানান, বনভ’মির ক্ষয়ক্ষতি পূণর্বাশন সহ নতুন বনায়নে অপাতত কোন প্রকল্প বা কর্মসূচী না থাকলেও আমরা যতটা সম্ভব ক্ষতি মেরামতের চেষ্টা করে যাচ্ছি।
অপরদিকে বরিশাল বিশ^বিদ্যালয় ও পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের একাধিক শিক্ষক মন্ডলী ‘উপক’লীয় বন দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্যের রক্ষাকবজ’ বলে উল্লেখ করে ‘এ বন বাঁচলে উপক’ল বাঁচবে’ বলে মন্তব্য করেছেন। তাদের মতে, ‘যেকোন উপায়ে উপক’লীয় বনভ’মী রক্ষা সহ তা সম্প্রসারনের কোন বিকল্প নেই।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল যেমন সংকটাকীর্ণ তেমনি সম্ভাবনাময়। ঝড়-ঝঞ্ঝা, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, জীবিকা নির্বাহে ঝুঁকি, অভাব অনটনে বিক্ষুব্ধ-বিপর্যস্ত এক জনপদ এটি। ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি, জোয়ার-ভাটার বিস্তৃতি ও লবণাক্ততার প্রভাবÑ এ তিনটি নির্দেশকের উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের মোট উপকূলীয় জেলা ১৬টি। এর মধ্যে পূর্ব উপকূলে রয়েছে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও চাঁদপুর; মধ্য উপকূলের অন্তর্ভুক্ত ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বরগুনা, শরীয়তপুর এবং পশ্চিম উপকূলের আওতাভুক্ত খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা। উপকূলীয় জেলাগুলোতে বসবাসকারী মোট জনসংখ্যা সাড়ে ৩ কোটির বেশি। বৃহৎ এই জনগোষ্ঠী বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসসহ মহামারি সৃষ্টিকারী নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে একরকম যুদ্ধ করে টিকে আছে। প্রাকৃতিক ও মনুষ্য সৃষ্ট নানাবিধ কর্মকা-ের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের জনগণের নদী ভাঙন, জলাবদ্ধতা ও নানা ধরনের পানিবাহিত রোগের সাথে লড়াই করে যাচ্ছে।