
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : জলবায়ু পরিবর্তনে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ। খাদ্যসংকট, শিশুমৃত্যু, নারীর প্রজনন, সুপেয় পানির স্বল্পতা, কৃষিজমির উর্বরতা হ্রাসসহ নানা সংকট ক্রমশ বাড়ছে। লবণাক্ততা বাড়ায় উপকূলের প্রায় সাড়ে ৩ কোটি মানুষ তীব্র খাবার পানি সংকটে ভুগছেন। বিভিন্ন সংস্থার সূত্রমতে, এখানে একজন মানুষ প্রতিদিন গড়ে মাত্র দুই লিটার খাবার পানির মাধ্যমে ১৬ গ্রাম লবণ গ্রহণ করেন। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ দিনে পাঁচ গ্রাম। চরম আকারে হ্রাস পেয়েছে কৃষি উৎপাদন, গাছপালা নেই বললেই চলে। বিলুপ্ত হয়েছে ৬০ প্রজাতির মাছ ও অসংখ্য প্রজাতির পশুপাখি। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় প্রথম ১০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশকে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১০০ সেন্টিমিটার বাড়লে পানির নিচে তলিয়ে যাবে ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ উপকূলীয় অঞ্চল, পরিবেশ শরণার্থী হবেন ২ কোটি মানুষ। শতকরা ২৯ শতাংশ নিচু এলাকায় বন্যার ঝুঁকি বাড়বে। এ হিসেবে প্রতি বছর গড়ে ৬৫ হাজার হেক্টর আবাদি জমি কমছে। এ হারে কমতে থাকলে আগামী ২০ বছর পর দেশে কৃষিজমির পরিমাণ দাঁড়াবে ৫০ হাজার হেক্টরে।
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতির সুরতহাল রিপোর্ট পর্যালোচনা করলে এটা প্রতিভাত হয়ে ওঠে যে, জাতীয় অর্থনীতির আন্তঃসলিলা শক্তির উদ্বোধন যার হাতে, সেই সবচেয়ে বেদনায় বিবর্ণ। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরো অর্থনীতির অনেক প্রবণতার সূচক সন্ধানে কালাতিপাত করে কিন্তু উপকূলীয় জেলা অথচ তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন নেই বললেই চলে। উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি ও বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনের সুরক্ষা নিয়ে কার্যকরী পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি উঠেছে। পাশাপাশি আগামী দিনে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক সমুদ্র অর্থনীতি বা ‘নীল অর্থনীতি’ বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে উপকূলীয় অঞ্চলকে গড়ে তুলতে প্রয়োজন বিশেষ পরিকল্পনা। মোদ্দাকথায় সময়ের প্রেক্ষাপটে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে যে পরিবর্তন সূচিত হচ্ছে, তার গতিপ্রকৃতি বিচার-বিশ্লেষণ জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যথাসময়ে যথাপ্রযত্ন দেয়া সম্ভব না হলে, উষ্ণায়নের প্রভাবক ক্ষয়ক্ষতিকে যথা নিয়ন্ত্রণ ও মোকাবিলা করা সম্ভব না হলে, অদূর ভবিষ্যতে সমূহ সম্ভাবনাময় একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের অবদান থেকে জাতীয় অর্থনীতি শুধু বঞ্চিতই হবে না, বরং সময়ের অবসরে জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এটি গোটা দেশ ও অর্থনীতির জন্য দুর্ভাবনা-দুর্গতির কারণও হয়ে দাঁড়াতে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সাতক্ষীরার ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬২৬ হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে ৮১ শতাংশেরও বেশি অর্থাৎ ১ লাখ ৫৩ হাজার ১১০ হেক্টর জমি লবণাক্ততায় রূপ নিয়েছে। আর পতিত জমি রয়েছে ৪০ হাজার ৯৮১ হেক্টর। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তন ঘটায় সাতক্ষীরায় বন্যা, খরা ও জলাবদ্ধতার পাশাপাশি মাটি ও পানির লবণাক্ততা বেড়ে গেছে। এতে ক্রমেই আমন ধানের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। গত চার বছরের ব্যবধানে আমন ধান উৎপাদন কমেছে ৩৩ হাজার টন।
উপকূলের বাসিন্দারা বলছেন, উপকূলের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার উন্নয়নে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এ অঞ্চলের শিশুরা শৈশবের ডানা মেলে অপুষ্টি আর অশিক্ষায়। জলবায়ু পরিবর্তন এ জেলার পুষ্টিহীনতার অন্যতম প্রধান কারণ বলে জানা যায়।
বিগত ২০১৯ সালে জলবায়ু পরিবর্তন-সম্পর্কিত বিষয়ে সাতক্ষীরার দুটি উপকূলীয় উপজেলা নিয়ে জরিপ পরিচালনা করে স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা লিডার্স। জরিপের তথ্যানুযায়ী, শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার ৩ লক্ষাধিক মানুষ বছরের প্রায় ৭ মাস দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ইটভাটায় অবস্থান করেন। আর এ সময় ওইসব পরিবারের শিশুসন্তানরা শিক্ষা থেকে পিছিয়ে যায়। জড়িয়ে পড়ে শিশুশ্রমে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য ও পুষ্টির অভাব শিশুদের বিকাশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।