
আলতাফ হোসেন অনিক, উজিরপুর : বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সাতলা ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী সাতলা একতা বাজার থেকে কান্দী পর্যন্ত প্রায় ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ গুরুত্বপূর্ণ খালটি বর্তমানে দখলদারদের কবলে পড়ে অস্তিত্ব সংকটে। স্থানীয় কয়েক হাজার ব্লক চাষি ও সাধারণ মানুষের অভিযোগ মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে খালটির উপর ১৫ থেকে ২০টিরও বেশি অবৈধ বাঁধ নির্মাণ, ভরাট করে বসতবাড়ি ও দোকানপাট গড়ে তোলার মাধ্যমে খালটির স্বাভাবিক প্রবাহ কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, একসময় এই খালটি ছিল সাতলার কাচা নদীর পশ্চিম তীর থেকে শুরু হয়ে মেহেরের বাড়ির উত্তর পাশ দিয়ে কান্দী হয়ে ধারা বাশাইল ও তাড়াইল পর্যন্ত বিস্তৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌ-যোগাযোগ পথ। স্থানীয়দের চলাচল, কৃষি সেচ ও পণ্য পরিবহনের জন্য এটি ছিল একমাত্র নির্ভরযোগ্য জলপথ।
দখলের সূচনা ও বিস্তার
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, অবদা সড়কের পশ্চিম পাশে খালের উপর প্রথমে দুটি সড়কের মাঝখানে বাঁধ নির্মাণ করে একটি পুকুর তৈরির মাধ্যমে দখল প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপর ধীরে ধীরে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় খালের বিভিন্ন অংশ ভরাট করে ব্যক্তিগত মালিকানায় নেওয়া হয়।
পানি চলাচল স্বাভাবিক রাখতে একতা বাজারের উত্তর পাশে একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন নালাকে খাল হিসেবে ব্যবহার করা হলেও, সেটিও পর্যাপ্ত নয় বলে দাবি এলাকাবাসীর।
সড়ক নির্মাণে খালের সংকট আরও তীব্র
পরবর্তীতে বরিশাল-খুলনা মহাসড়কের সাতলা নদীর উপর ৫৬০ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণ এবং সংযোগ সড়ক তৈরি হওয়ার ফলে খালটির অবস্থান বিভিন্ন স্থানে সড়কের দুই পাশে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এতে খালটির ধারাবাহিকতা নষ্ট হয় এবং সুযোগ নিয়ে দখলদাররা খালের অংশ নিজেদের জমির সঙ্গে একীভূত করে ফেলে।
বর্তমানে একতা বাজার থেকে রিন্টুর বাড়ি পর্যন্ত খালটি সড়কের ডান পাশে, এরপর ঠেডা বা হুশির বাড়ি পর্যন্ত বাম পাশে এবং পুনরায় পশ্চিম সাতলা এলাকায় ডান পাশে অবস্থান করছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, খাল দখলের সাথে জড়িতদের মধ্যে রয়েছেন বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—মোঃ জাহিদ হোসেন হাং, আবুল কাসেম হাং, মোঃ শহিদ হাওলাদার, হুশি, এচাহাক বাহাদুরসহ প্রায় অর্ধশতাধিক পরিবার।
তারা খালের মধ্যে ১০-১৫ ফুট প্রস্থের বালুর বাঁধ তৈরি করে পুকুর বানিয়ে মাছ চাষ এবং সবজি চাষ করে আসছেন।
স্থানীয় ব্লক চাষিদের আশঙ্কা—খালটি পুনরুদ্ধার না করা হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সেচের পানির তীব্র সংকট দেখা দেবে, যা কৃষি উৎপাদনে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।
একজন কৃষক বলেন,
এই খালই ছিল আমাদের বোরো ধানের পানির প্রধান উৎস। এখন খাল না থাকলে আমরা কীভাবে চাষ করবো?
এলাকাবাসী জানান, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বপ্ন ছিল পরিত্যক্ত খাল পুনঃখননের মাধ্যমে কৃষিতে সেচব্যবস্থা নিশ্চিত করা। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারও দেশব্যাপী খাল পুনঃখনন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
তাই সাতলা ইউনিয়নের জনগণের জোর দাবি—
সাতলা একতা বাজার থেকে কান্দী পর্যন্ত এই ৩ কিলোমিটার খালটি জরুরি ভিত্তিতে পুনঃখনন করে দখলমুক্ত করা হোক। তাদের দাবি শুধু এই খাল নয়, সাতলা ইউনিয়নসহ আশেপাশের সব সরকারি খাল পুনরুদ্ধার ও দখলমুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। অন্যথায় কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
Like this:
Like Loading...
Related