
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সাতক্ষীরা বাংলাদেশের অতি সম্ভাবনাময় জেলা হিসেবে পরিচিত। এই জেলায় সুন্দরবন অবস্থিত। বিশ্বের দেশে দেশে সুন্দরবনের সুনাম, সুখ্যাতি আর আলোক উজ্জ্বল আভা বিশ্বকে আলোকিত করে চলেছে। সাতক্ষীরা বর্তমান সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশকে বিশেষ সম্মান ও মর্যাদাময় অবস্থানে নিয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের অন্যতম হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে সাতক্ষীরা। এই জেলায় উৎপাদিত চিংড়ী শিল্প বিশ্ব বাজারে রপ্তানী পরবর্তি শত শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করে চলেছে। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের অন্যতম এবং বিশেষ মাধ্যম হিসেবে পরিচিত চিংড়ী শিল্প কেবল দেশকে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের মহাক্ষেত্র হিসেবে চিহিৃত করছে তা নয় আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশ কে সুনাম, সুখ্যাতি আর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় অন্য যে কোন জেলা অপেক্ষা সাতক্ষীরা দেশকে অর্থনৈতিক ভাবে সমৃদ্ধ করে চলেছে। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অতীতের সব ধরনের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে আর অতীতের সব ধরনের রেকর্ড ভঙ্গ করায় দৃশ্যতঃ বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ অর্থনীতিতে যে ব্যাপক ভাবে এগিয়ে চলেছে তার প্রমান মিলেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা গুলো এই দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিনত করার বিষয়টি জোরে প্রচার প্রচারনা করছে। বর্তমান রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধের ডামাডোলের সময় গুলোতেও সাতক্ষীরার চিংড়ী রপ্তানীতে সামান্যতম ছন্দ পতন ঘটেনি। সাতক্ষীরার চিংড়ী কেবল মাত্র বিশ্ব বাজারে রপ্তানী হচ্ছে তা নয়, বিশ্বের দেশে দেশে সাতক্ষীরায় উৎপাদিত বিভিন্ন ধরনের সাদা প্রজাতির মাছ রপ্তানী হচ্ছে। সাতক্ষীরা চিংড়ী সহ সাদা প্রজাতির মৎস্যের কারনে শুধুমাত্র দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হচ্ছে তা নয়, আমাদের এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে সুবাতাস প্রবাহীত হচ্ছে। দেশের সামগ্রীক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে সাতক্ষীরার অবস্থান আর অবদান দিনে দিনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াচ্ছে। অর্থনীতির এই সুবাতাস প্রবাহীত হওয়ার ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকুক এই প্রত্যাশা জেলাবাসির।
দেশে মোট রফতানিজাত চিংড়ির একটি বড় অংশ উৎপাদন হয় উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায়। প্রতি বছর আড়াই থেকে ৩ হাজার কোটি টাকার চিংড়ি রফতানি হয়। গত বছরের তুলনায় চলতি অর্থবছর রফতানি আয় বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে এ খাত থেকে ২ হাজার ২৫ কোটি টাকা আয় হয়েছে, যা গেল অর্থবছরের তুলনায় অন্তত ১৫০ কোটি টাকা বেশি।
জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, সত্তর-আশির দশকের দিকে শুরু হয় সাতক্ষীরায় লবণ পানির চিংড়ি চাষ। বাগদা, গলদা, হরিণা, চাকা ও চেম্বিসহ বিভিন্ন প্রজাতির চিংড়ি চাষ হয় এখানে। চলতি ২০২৩-২৪ মৌসুমে সাতক্ষীরার ছয়টি উপজেলায় ৫৯ হাজার লবণ পানির ঘেরে বাগদা চিংড়ি চাষ হয়, যা থেকে ২৭ হাজার টন চিংড়ি উৎপাদন হয়েছে। উৎপাদিত এসব বাগদা চিংড়ি থেকে রফতানি আয় হয়েছে ২ হাজার ২৫ কোটি টাকা। মোট উৎপাদিত চিংড়ির ৯০ শতাংশ বিভিন্ন দেশে রফতানি হয় এবং বাকি ১০ শতাংশ দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ হয়েছে। এর আগে ২০২২-২৩ মৌসুমে জেলায় ২৫ হাজার টন বাগদা চিংড়ি উৎপাদন হয়েছিল, যা থেকে রফতানি আয় হয় ১ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। এ হিসাব অনুযায়ী চলতি মৌসুমে ১৫০ কোটি টাকা রফতানি আয় বেড়েছে।
কভিড-পরবর্তী এ জেলায় বাগদা উৎপাদন যেমন বেড়েছে, তেমন রফতানি আয়ও বাড়ছে। এ ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে জেলার চিংড়িচাষীদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণসহ সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মৎস্য কর্মকর্তারা।
আশাশুনি উপজেলার সরাপপুরের চিংড়িচাষী রাজ্যেশ্বর দাশ জানান, প্রায় চার দশক ধরে চিংড়ি চাষ করেন তিনি। ২০২৩-২৪ মৌসুমে ২ হাজার বিঘা ঘেরে বাগদা চিংড়ি চাষ করেছেন। উৎপাদন খরচ উঠিয়ে প্রায় দেড় থেকে ২ কোটি টাকা লাভ হয়েছে। তবে প্রথম পর্যায়ে কিছু মাছ মারা যায়। তা না হলে লাভের পরিমাণটা আরো বাড়ত। চিংড়ি উৎপাদনে সম্ভাবনাময় জেলা সাতক্ষীরা কিন্তু কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে সুনাম হারাচ্ছে বাংলাদেশী চিংড়ি। অতিমুনাফা করতে চক্রটি চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশ করে আন্তর্জাতিক বাজার নষ্ট করছে।
সাতক্ষীরা মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আব্দুর রব জানান, জেলার উৎপাদিত বাগদা চিংড়ির চাহিদা রয়েছে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে। তবে কভিডের সময় রফতানি বন্ধ থাকায় দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও চাহিদা বেড়েছে। এখন দেশের বাজারে বাগদা চিংড়ি ৮০০-৮৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
সুন্দরবন সংলগ্ন সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলায় চাষ হওয়া নরম খোসার (সফটশেল) কাঁকড়া আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল চাহিদা তৈরি করেছে।
বর্তমানে সফটশেল (নরম খোসার) কাঁকড়া সাতক্ষীরা জেলার মানুষের ভাগ্য বদলাতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এ অঞ্চলে কাঁকড়া উৎপাদনের জন্য প্রতি বছর গড়ে উঠছে নতুন নতুন খামার, যা জেলা তথা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সম্পতি সাতক্ষীরা জেলা সরেজমিনে পরিদর্শন করে ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সূত্রে এই সব তথ্য পাওয়া গেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য মতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই থেকে জুন মাসে কাঁকড়া রপ্তানি হয়েছে ১৩ দশমিক ৭৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে (জুলাই-জুন) এ রপ্তানি ছিল ৯ দশমিক ২৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, এতে বিগত বছরে চেয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৮ দশমিক ৭০ শতাংশ। শুধু চলতি বছরের জুন মাসে রপ্তানি হয়েছে ১ দশমিক ৫৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
সংশ্লিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমান বাণিজ্যিকভাবে চাষ যোগ্য কাঁকড়ার মধ্যে শিলা কাঁকড়া অন্যতম।
শিলা কাঁকড়া খোলস বদলের সময় প্রায় ৩ ঘণ্টা খোলস বিহীন থাকে। তখন কাঁকড়ার ওপর শুধু একটি নরম আবরণ থাকে। ঠিক সেই সময় কাকড়াঁগুলো বিক্রির জন্য উপযুক্ত হয়।
আন্তর্জাতিক বাজারে সফটশেল (নরম খোসা) কাঁকড়ার উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়, যার কারণে অনেক চাষি চিংড়ি ছেড়ে এখন কাঁকড়া চাষে ঝুঁকছেন। লাভ বেশি হওয়ায় চাষিরা এখন চিংড়ি চাষ ছেড়ে কাকড়াঁতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন বেশি।
বর্তমানে সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর ছাড়াও সদর উপজেলা ও কালিগঞ্জ উপজেলাসহ অন্যান্য স্থানেও সফটশেল কাঁকড়া চাষ হচ্ছে।
কাঁকড়া চাষে পুকুরের পানির উপরিস্তর ব্যবহৃত হয়। যাতে অব্যবহৃত থাকে পানির নিচের স্তর। পুকুরের পানির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য কাঁকড়ার পাশাপাশি সাদা মাছ যেমন- রুই, কাতলা ও তেলাপিয়াসহ নানা মাছ চাষ করে লাভবান হচ্ছেন অনেক চাষি।
সফটশেল কাঁকড়া সাধারণত খাঁচা পদ্ধতিতে চাষ হয়। যাতে পানির ওপরে খাঁচাগুলোতে কাঁকড়া চাষ করলে নিচের স্তরের পানিতে সাদা মাছের চাষ করা যায়।
সফটশেল কাঁকড়া দ্রুত প্রক্রিয়াজাত ও রান্না করা যায় বলে আন্তর্জাতিক বাজারে এর চাহিদা বেশি। বর্তমানে সফটশেল কাঁকড়া চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন এশীয় দেশে রপ্তানি হচ্ছে।
কাঁকড়া শুধু সাতক্ষীরা জেলার মানুষের আয়েরই উৎস নয়, বরং কাঁকড়া চাষের মাধ্যমে এই অঞ্চলে মানুষের বেকারত্বও দূর করছে। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও এই কাজ করে স্বাবলম্বি হচ্ছেন।
সরেজমিনে শ্যামনগর উপজেলার কয়েকটি কাঁকড়ার খামারে গিয়ে দেখা যায়, কাঁকড়ার খামারে কর্মব্যস্ত দিন কাটাচ্ছেন নারী ও পুরুষরা। কেউ ছোট ছোট করে কাটছেন কাঁকড়ার খাবার তেলাপিয়া মাছ এবং কেউ কেউ নিয়ম করে দেখছেন কাঁকড়ার খোলস পাল্টাচ্ছে কি না।
খুলনা মৎস্য পরিদর্শন ও মাননিয়ন্ত্রণ দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, সফটশেল কাঁকড়া রপ্তানিতে গত ২ অর্থবছরে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৬৪৪ দশমিক ৭৬৮ মেট্রিক টন সফটশেল কাঁকড়া রপ্তানি হয়েছিল, যার বাজার মূল্য ছিল ৮ দশমিক ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। পরবর্তী অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৪-২৫ সালে রপ্তানির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১১৬৬ দশমিক ৮৮৮ মেট্রিক টনে। যার বাজার মূল্য ছিল ১৪ দশমিক ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এতে ১ বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৬ দশমিক ১৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে ২০২১-২২ অর্থবছরে সফটশেল কাঁকড়ার রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৮০২ দশমিক ৭১৩ মেট্রিক টন, যার বাজার মূল্য ছিল ১১ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
শ্যামনগরের দুগাবাঁটি এলাকার কাঁকড়া চাষ করেন গৌতম সরকার।
তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকে। তাই আমাদের অর্থনৈতিক একটা ঝুঁকি সব সময় থাকে। চিংড়ি পোনার লবণাক্ততা সহ্য করার ক্ষমতা কম এবং পোনায় ভাইরাসের আক্রমণে এটি মারা যায়। তাই আমি এবার কাঁকড়া চাষ করেছি।’
তিনি আরও বলেন, এতে তুলনামূলক লাভ বেশি হয় ও কাঁকড়ার পাশাপাশি পুকুরে সাদা মাছ চাষ করছি, যাতে এটি থেকেও আর্থিকভাবে কিছুটা লাভবান হওয়া যায়।
একই এলাকার চাষি সৌরভ সরকার বলেন, ‘আমাদের এই অঞ্চলের সবাই সফটশেল কাঁকড়া চাষ করছেন। আমি এই মৌসুমে ৭০০ খাঁচায় তৈরিতে খরচ হয়েছে ৩ লাখ টাকা । বাজার ভালো থাকলে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা বিক্রি করতে পারবো। বর্তমানে ‘এ’ গ্রেডের সফটশেল কাঁকড়া প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ টাকা, ‘বি’ গ্রেডের ৬৫০ টাকা, আর ‘সি’ গ্রেডের ৫০০ টাকা দামে।’
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের চিংড়ির সুনাম ছিল একসময়। কিন্তু করোনা মহামারিসহ বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের চিংড়ির বাজার কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিল। তবে চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সাতক্ষীরায় গলদা চিংড়ির উৎপাদন রপ্তানি বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। চলতি মৌসুমে এ জেলায় উৎপাদিত গলদা চিংড়িতে রপ্তানি আয় এসেছে ৭৭০ কোটি টাকা।
একই সঙ্গে উৎপাদনও বেড়েছে গত মৌসুমের তুলনায় এক হাজার টন। আগামীতে রপ্তানি ও উৎপাদন আরও বাড়বে বলে আশা করছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে, বাণিজ্যিকভাবে এই জেলায় বাগদা, গলদা, হরিণা, চাকা ও চেমনি জাতের চিংড়ি চাষ হয়। তবে বাগদায় ভাইরাস বা অন্যান্য সংক্রমণ বেশি হওয়ায় এ জেলায় গলদা চিংড়ি চাষে আগ্রহ বেশি চাষিদের। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারেও রয়েছে গলদা চিংড়ির ব্যাপক চাহিদা। চলতি মৌসুমে জেলার সাতটি উপজেলায় ২০ হাজার হেক্টর ঘেরে গলদা চিংড়ি চাষ হয়, যা গত মৌসুমের তুলনায় দুই হাজার হেক্টর বেশি।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার রইচপুর গ্রামের গলদা চিংড়ি চাষি গোলাম মোস্তফা জানান, তিনি এক দশক ধরে মিঠা পানির সাদা মাছের পাশাপাশি গলদা চিংড়ি উৎপাদন করেন। চলতি মৌসুমে ৩০ বিঘা জমির ঘেরে গলদা উৎপাদন করেন। জমির লিজ, রেণু পোনা ক্রয়, খাদ্য ও শ্রমিকের মজুরির টাকা উঠিয়েও ৮ লাখ টাকা লাভ হয়েছে তার। তিনি বলেন, ‘গত মৌসুমেও একই পরিমাণ ঘেরে গলদা চিংড়ি চাষ করে ৬ লাখ টাকা লাভ হয়েছিল।’
গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘বাগদা চিংড়ির তুলনায় গলদা চিংড়ি উৎপাদনে ঝুঁকি কম। তা ছাড়া এর বৃদ্ধি দ্রুত, দামও ভালো পাওয়া যায়। যে কারণে আগামীতে আরও বড় পরিসরে গলদা চাষ করব।’ তবে চাষিরা গলদা চিংড়ি উৎপাদনে তাদের কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেছেন। তারা জানান, গলদার রেণু পোনা সংগ্রহে অনেক জটিলতা রয়েছে। নদী বা সুন্দরবন থেকে পোনা আহরণ নিষিদ্ধ। তা ছাড়া কিছু পোনা অবৈধ উপায়ে ভারত থেকে আসে। এ ছাড়া সামান্য কিছু পোনা আমাদের দেশে উৎপাদন হয়। এসব মিলিয়ে চাহিদার তুলনায় গলদা রেণু পোনা অপ্রতুল। এ সংকট সমাধানে চাষিরা সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন।
বাংলাদেশ চিংড়ি চাষি সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাতক্ষীরার বিশিষ্ট ঘের ব্যবসায়ী আবুল কালাম বাবলা বলেন, গলদা উৎপাদন বাড়াতে হলে এর রেণু পোনা উৎপাদনে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে আগামীতে পোনা সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হবে।
সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণ অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষ মৎস্য চাষের উপর নির্ভরশীল। আর এ কারণে জেলায় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষাবাদ করে সাতক্ষীরাসহ দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রেখে চলেছে সাতক্ষীরার মৎস্য চাষিরা। এখানে হয়াইট গোল্ড নামে পরিচিত বাগদা ও গলদা মাছ এ মাছের সুনাম বর্তমানে দেশের ও দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও প্রশংসা কুঁড়িয়েছে।ইউরোপ সহ বহি:র্বিশ্বে রপ্তানিকৃত ৭০ ভাগ চিংড়ি সাতক্ষীরা থেকে উৎপাদিত হয়ে দেশের বাইরে যায় বলে জানা গেছে।
এদিকে জেলার কয়েকটা নদী নাব্যতা হারিয়ে ফেলাই সংশ্লিষ্ট এলাকায় চিংড়ি ঘেরে চিংড়ি মাছ চাষ করার জন্য লবণাক্ত পানির অভাব দেখা দেওয়ায় চিংড়ি মাছের সাথে সাথে আলাদা আলাদা করে সাতক্ষীরা জেলায় মৎস্য চাষিরা বিভিন্ন জাতের সাদা মাছ, কাকড়াঁ ও কুচিয়া মাছ এর চাষ করছে পাল্লা দিয়ে। এসব মাছ এলাকার চাহিদা পূরণ করে দেশের বিভিন্ন মাছের আড়তে সরবরাহ হয়ে থাকে। দেশের ভিতরে প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে নিয়মিত। বর্তমানে সাতক্ষীরার মৎস্য চাষিরা তাদের উৎপাদিত মাছের মান ও সুনাম বজায় রাখা সহ মাছের পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য আধুনিকরণে সর্বদা তৎপরতা থেকে জেলার মৎস্য কর্মকর্তাদের সাথে সর্বদা যোগাযোগ রক্ষা করে বিভিন্ন পরামর্শ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন।এদিকে চিংড়ি মাছের চাহিদা দেশে ও দেশের বাইরে বেশি কদর থাকার কারণে বর্তমানে চিংড়ি চাষের জন্য প্রয়োজনীয় মাছের পোনা সাতক্ষীরা সুন্দরবন উপকূল এলাকার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ নওয়াবেকি হ্যাচারি থেকে উৎপাদিত হয়ে স্থানীয় বাজারে চিংড়ি মাছের রেনু পোনার সংকট নিবারণ করছে। যা সাতক্ষীরা জেলার মৎস্য চাষিদের জন্য চিংড়ি চাষের রেনু পনার সংকট দূরীকরণে ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছে।
জানা যায়, জেলায় ১ লাখ ৪০ হাজার ৭১ হেক্টর জমিতে ১ লাখ ৪৯ হাজার ২৮৬ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়। যার মধ্যে ৬৭ হাজার ৬শত ৮৩ হেক্টর জমিতে ৪০হাজার ৯শত ১১ মেট্রিক টন বাগদা ও গলদা ও অন্যান্য চিংড়ি মাছের উৎপাদন হয়। জেলার চাহিদার থেকে প্রায় দ্বিগুণ উৎপাদন মাছ বেশি হয়।
মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, সাতক্ষীরা জেলায় ৫৪ হাজার ৩শত ৫৮ মেট্রিক টন মাছের চাহিদার তুলনায় উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ২শত ৮৬ মেট্রিক টন। যা জেলার চাহিদার তুলনায় বেশি উৎপাদন হয়েছে ৯৪ হাজার ৯শত ২৭ মেট্রিক টন বেশি।
জানা যায়, জেলার ৫৪ হাজার ৯শত ৩৫টি জলাশয়ে ৫৮ হাজার ২শত ৯৪ হেক্টর জমিতে ২৬ হাজার ২শত ১৪. ৯৯ মেট্রিক টন বাগদা চিংড়ি মাছের চাষ হয় ও ১১ হাজার ৬শত ৬২টি জলাশয়ে ৯ হাজার ৩ শত ৮৯ হেক্টর জমিতে ১০ হাজার ২০৪ মেট্রিক টন গলদা চিংড়ি চাষ হয়। এবং অন্যান্য নদী ও বিভিন্ন জলাশয়ে ৪ হাজার ৪শত ৯৩ মেট্রিক টন ছোট বিভিন্ন প্রজাতির চিংড়ি মাছের চাষ হয়। ৩৬৪টি কাঁকড়া ঘের এ ৩ শত ২১ হেক্টর জমিতে ১ হাজার ৯শত ৬৫ মেট্রিক টন কাঁকড়া উৎপাদন হয়। ও সাতক্ষীরা জেলার ভিতর দিয়ে প্রবাহিত বিভিন্ন নদের ৪৩ জায়গারও ১৩শ ২৬ সেক্টর জায়গায় ১হাজার হাজার ৫শত ২১ মেট্রিক টন বিভিন্ন মাছ উৎপাদন হয়, জেলার বিভিন্ন খাল ও বিলের ৪শত ৬টি জায়গার ৩ হাজার ২শত ৫ হেক্টর জমিতে ১৪ হাজারহ ১শত ৭৩ মেট্রিক টন বিভিন্ন মাছ উৎপাদন হয়, জেলার বিভিন্ন বাওড়ের চারটি স্থানের হেক্টর জমিতে ২শত ৪ মেট্রিক টন মাস উৎপাদন হয় এবং জেলার সুন্দরবন পয়েন্টের একটি নদের ৫৫হাজার ৫শত২৪হেক্টর আয়তনে২হাজার ২শত ৫৯ মেট্রিক টন মাস উৎপাদন হয় এবং জেলার বিভিন্ন ধান ক্ষেতের ভিতরে ৩হাজার ৫ হেক্টর জমিতে ২ হাজার ৪ মেট্রিক টন মাস উৎপাদন হয় এবং বারোপিট এলাকার ২শত ৫৮ হেক্টর জমিতে ১শত ৭৫ টন মাছ উৎপাদন হয়, রং বিভিন্ন স্তানের বিলের জমিতে ঘেরসহ অন্যান্য জলাশয় মিলে ৪০ হাজার ৬শত ৫৪ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়। মাছের সাথে সাথে জেলা থেকে ১শত ৯ মেট্রিক টন কুচিয়া উৎপাদন হয় যার দেশের চাহিদা মিটিয়ে বাইরে রপ্তানি করা হয়। এবং সরকারিভাবে ১শত ৯৩টি পুকুরের ৪৮ হেক্টর জমিতে ২শত ৮৫ মেট্রিক টন বিভিন্ন জাতের মাছ উৎপাদন করা হয়, ও বিলের ভিতরে ছোট নার্সারি চারা মাছ ৩৯ মেট্রিক টন বিভিন্ন প্রজাতির মাছ উৎপাদন হয়।
এদিকে বেসরকারিভাবে ৫৫ হাজার ৯শত ৬৯টি পুকুরে ৮ হাজার ৬শত ২১ হেক্টর জমিতে ৪৪ হাজার ৯শত ৮৬ মেট্রিক টন বিভিন্ন প্রজাতির মাছ উৎপাদন করা হয়।
মৎস্য চাষি সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার বড়বিলা গ্রামের রশিদ আমিন বলেন, আমি ৩০ বিঘা জমিতে মাছ চাষ করি সেখানে মাছের রেনু ও খাদ্য খরচ সহ চার লক্ষ টাকা খরচ হয়। মাছ ছাড়ার সাত মাস পরে বিক্রি করি তখন প্রায় ১০ লক্ষ টাকা কেনাবেচা হয়।
বাইগুনি গ্রামের নতুন উদ্যোক্তা মৎস্য চাষি বাদশা জানান, আমি নতুন হিসাবে চার বিঘা জমি হাড়ি নিয়ে এবার দুই লক্ষ টাকা খরচ করে মাছ চাষ করি কিন্তু এ বছর বর্ষার পানিতে ঘের ডুবে যাওয়ায় আমার মাছ ভেসে যায় যার কারনে লাভ করতে পারি নাই তবে আসল টাকাটা ঘরে তুলতে পেরেছি।
তিনি আরো বলেন, সামনেবার নতুন করে আরো চার বিঘা জমি হাড়ি নিয়ে বড় আকার মাছের চাষ করার পরিকল্পনা আছে।
ঘের ব্যবসায়ী শাকদাহ গ্রামের সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমি দীর্ঘদিন যাবত শাকদাহ বিলে ৫০ বিঘা জমি হারি নিয়ে মাছ চাষ করে আসছি তাতে প্রতিবছর আমার ভালো ব্যবসা হয় কিন্তু এ বছর বন্যার পানিতে ঘের ভেসে যাওয়ায় লাভের পরিমাণ কম হয়েছে।
মৎস্য চাষি ঝন্টু মোড়ল ও একিই কথা বলেন, তিনি ২০০ বিঘা জমিতে বাগদা, গলদা ও সাদা মাছের চাষ করেন। তিনি বলেন, এবার প্রাকৃতিক বন্যার কারণে ঘেরের অনেক মাছ ভেসে যাওয়ায় লাভের পরিমাণ বিগত বছরের চেয়ে কম হবে।
স্কটল্যান্ড প্রবাসী বাংলাদেশের যশোর জেলার কোমরপুর গ্রামের চিত্তরঞ্জন দাস বলেন, সাতক্ষীরা এলাকার মাছ অনেক সুস্বাদু আমরা বিদেশের মাটিতে কোথাও বেড়াতে যেয়ে যদি শুনি সাতক্ষীরা থেকে কোন মাছ এখানে আসছে তখন কেনার চেষ্টা করি। তবে দেশের বাইরে থাকার কারণে সাতক্ষীরার টাটকা মাছের স্বাদ খুব মিস করি। তবে যখন গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে আসি তখন আর এই সুযোগকে মিস করি না সাতক্ষীরার বড়বাজার মাছের আড়ৎ, পাটকেলঘাটা বাজার ও বিনেরপোতা মাছের আড়ৎ থেকে টাটকা মাছ ক্রয় করে নিয়ে আসি।
মাছের দাম নিয়ে মৎস্য চাষি আজিজুল ইসলাম জানান, ১০০ গ্রাম ওজনের বাগদা চিংড়ি মাছের কেজি ১৩০০ থেকে ১৪০০ টাকা, আর ১০০ গ্রামের নিচে হলে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি, আর গলদা মাছের কেজি ১০০ গ্রাম সাইজের ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকা ১০০ গ্রামের ছোট হলে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা কেজি অপরদিকে সাদা রুই, কাতলা ও মৃগেল ২০০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, তেলাপিয়া মাছ এক কেজি ওজনের মাছ ১৫০ টাকা কিজি দারে বিক্রি হচ্ছে। টেংরা বড় মাছের দাম ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ভেটকি বড় মাছ ৯০০ থেকে ১০০০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে মাছ চাষিরা বিশাল খুশি।
মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, সাতক্ষীরা জেলায় মৎস্য আমদানি কারক আছেন ৬জন এরা অনেক সময় দেশের বাইরে থেকে সাগরের বিভিন্ন প্রজাতির মাছ এনে থাকেন।এদিকে জেলার ভিতরে পাইকারি মাছের আড়ত আছে পাঁচটি এখানে প্রায় ৫০ জন পাইকারি বিক্রেতা আছে এরা সবাই এসব আড়ত থেকে মাছ নিয়ে খুলনা, ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এবং ঢাকার বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে বাইরে রপ্তানি করে। এবং সাতক্ষীরা সদরে খুচরা মাছ বিক্রেতা আছেন ১২১ জন।
মৎস্য অফিস সূত্রে আরো জানা যায়, সাতক্ষীরাতে প্রক্রিয়াজাত করণ কারখানা আছে ৬টি, বাগদা চিংড়ি মাছের হ্যাচারি আছে ১২টি, গলদা চিংড়ি মাছের হ্যাচারী আছে ২টি, কাপ হ্যাচারি ৪টি, মনোসেক্স ও সাদা অন্যান্য মাছের হ্যাচারি আছে ২৯ টি, ডিপো আছে ২৩৭ টি ও বরপকল কল আছে ৩৪টি।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আনিসুর রহমানএই প্রতিবেদককে বলেন, সাতক্ষীরা জেলা দেশের ভিতরে মৎস্য চাষে মডেল হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে। এ জেলা থেকে তিন ভাগের দুই ভাগ চিংড়ি মাছ বিদেশে রপ্তানি হয়। আমরা মৎস্য চাষীদের আধুনিকরনে সর্বদা সহযোগিতা করে থাকি।
মাছ চাষিদের বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পর্কে বলেন, এবার বন্যার পানিতে অনেক মৎস্য চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেকের মাছ ভেসে গেছে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অনেক চাষি আর এ ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্য চাষিরা কিভাবে উন্নতি লাভ করতে করে ক্ষতিপুষিয়ে উঠতে পারে আমরা সে ব্যাপারে চাষিদের বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস কর্মকর্তা আনিসুর রহমান আরো বলেন, ‘সফটশেল কাঁকড়ার উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে আমরা বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। চাষিদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা আধুনিক ও টেকসই পদ্ধতিতে কাঁকড়া চাষ করতে পারেন।’
তিনি আরও বলেন, তবে বর্তমানে সুন্দরবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকায়, চাষিরা কাঁকড়ার পোনা সংগ্রহে কিছুটা সমস্যায় পড়ছেন। এই সংকট মোকাবিলায় সরকারিভাবে তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে।