1. mesharulislammonir1122@gmail.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন
  2. info@www.sangjogprotidin.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন :
সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৫:২৬ পূর্বাহ্ন

অর্থনৈতিক ও উন্নয়নের জেলা সাতক্ষীরা

  • প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৫৯ বার পড়া হয়েছে

বিশেষ প্রতিনিধি : অর্থনৈতিক ও উন্নয়নের জেলা বাংলাদেশর দক্ষিণাঞ্চলে সাতক্ষীরা।ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অপার লীলাভূমি সাতক্ষীরা জেলা। জেলাটি বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। ১৯৮৪ সালে জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে সাতক্ষীরা। দেশের অষ্টম বৃহত্তম জেলা সাতক্ষীরার সাতটি উপজলার জনসংখ্যা প্রায় ২২ লাখ। এই জেলার অপার অর্থনৈতিক সম্ভবনা আছে, যা উন্নয়নের মাধ্যেমে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে।
সাতক্ষীরা জেলা চিংড়ি চাষে বিখ্যাত। এই জেলা থেকে দেশের রপ্তানিকৃত চিংড়ির প্রায় ৭০ভাগ হয়ে থাকে। সাতক্ষীরার চিত্তাকর্ষক ও দর্শনীয় স্থানের মধ্যে আগের সারিতেই রয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন ‘সুন্দরবন’। বর্তমানে সাতক্ষীরা শিল্প বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম স্থলবন্দর ভোমরা স্থল বন্দরের অবস্থানও সাতক্ষীরায়।
অর্থনৈতিকভাবে এই জেলা মৎস চাষ, কাঁকড়া, মধু, আম, ডেইরি শিল্প, মৃতশিল্প, শাকসবজি ইত্যাদিরন জন্য সুপরিচিত। সাতক্ষীরার ক্রিড়াবীদরা বিশ্বে দেশের মুখ উজ্বল করে চলেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশকে বিশেষ সম্মান ও মর্যাদাময় অবস্থানে নিয়েছে, যা এখন গৌরবগাথা।ননন
এতো সম্ভবনা থাকার পরেও সাতক্ষীরা দীর্ঘদিন উন্নয়ন বঞ্চিত একটি জেলা। সাতক্ষীরার অনেক থানা শহর, ইউনিয়ন ও গ্রামীণ অঞ্চল এখনও উন্নয়নবঞ্চিত। রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসাসহ প্রয়োজনীয় সামাজিক অবকাঠামোর অনেকটাই জরাজীর্ণ ও অপ্রতুল। বিশেষ করে জেলা শহরের সঙ্গে সংযোগকারী অনেক প্রধান সড়ক ও আন্তঃউপজেলা সড়কসমূহের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ—বেশিরভাগই ভাঙাচোরা, কাঁচা বা সংস্কারহীন। এতে করে অর্থনৈতিক, শিক্ষাগত ও জরুরি সেবাদানে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে।
স্বাধীনতার ৫৪ বছর অতিক্রম করলেও আধুনিকতা ও উন্নয়নের ছোঁয় লাগেনি এই জেলায়। সেই কবে ১৯৮০ সালে ৩৩ একর জমিতে তৎকালিন বস্ত্র মন্ত্রী অ্যাডভোকেট মনসুর আলীর হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলস্, যা সাতক্ষীরার একমাত্র ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান ছিল। দেশের অন্যতম লাভজনক প্রতিষ্ঠানটি ১৯৯২ সালে বন্ধ হয়ে যায়। পরে বিভিন্ন পর্যায়ে খোলার চেষ্টা করা হলেও মিলটি এখনও বন্ধ আছে। বিগত সরকারের সময় উন্নয়নের অনেক প্রতিশ্রুতি ছিল, কিন্তু শুধু একটি মেডিকেল কলেজ ছাড়া তেমন কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেনি।
খুলনা বিভাগের একটি ব্যস্ততম সড়ক খুলনা থেকে মুন্সীগঞ্জ এবং ভোমরা থেকে খুলনা সড়ক। সাতক্ষীরা-মুন্সিগঞ্জ পর্যন্ত বর্তমান সড়কে সৃষ্টি হয়েছে ছোট-বড় গর্ত। এই সড়কের পিচ উঠে সড়কে সৃষ্টি হয়েছে খানাখন্দ। এতে সড়কে অহরহ ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। এ সড়ক ধরেই সুন্দরবন ভ্রমণে আসেন দেশি-বিদেশি পর্যটক এবং রাজধানী ঢাকার সঙ্গে পণ্য আনা-নেওয়া করেন ব্যবসায়ীরা। সাতক্ষীরা সন্তানেরা দেশের গৌরব বয়ে আনলেও এটিও উন্নত মানের স্টেডিয়াম নেই, নেই সুইমিংপুল যেখানে সঁতার শিখবে। মৎস্য চাষে অবদান রাখলেও নেই কোনো গবেষণা কেন্দ্র ও ভালো ফ্রিজিংপ্লান্ট, অনেক জেলায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও সাতক্ষীরা জেলায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
কিছু আশার কথাও আছে। বেশ কিছুদিন আগে অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের এবং যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা উপদেষ্টা সদাশয় আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সাতক্ষীরায় সরেজমিন পরিদর্শনে জেলার রাস্তা এবং উন্নয়নের করুণ অবস্থা দেখে যোগাযোগ উপদেষ্টাকে ব্যবস্থা নিতে লিখিত সুপারিশ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৭ মে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রস্তাবে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের খুলনা জোনের ‘সাতক্ষীরা-সখিপুর-কালীগঞ্জ (জেড-৭৬০২) এবং কালীগঞ্জ-শ্যামনগর-ভেটখালী (জেড-৭৬১৭) মহাসড়ক যথাযথ মানে উন্নীতকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পের প্যাকেজ ডাব্লিউপি-০৫ এর আওতায় কালীগঞ্জ-শ্যামনগর-ভেঠখালী (জেড-৭৬১৭) সড়কের উন্নয়ন। কালীগঞ্জ ফুলতলা মোড় থেকে সাতক্ষীরার শ্যামনগর চৌরাস্তা পর্যন্ত টেন্ডার কাজের ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১১৩ কোটি ৮৯ লাখ ৭৯ হাজার ৮৭৪ টাকা। এছাড়া জেলার উন্নয়নে তিন কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। পানি সম্পদ উপদেষ্টার তৎপরতায় উপকূলিও বেড়িবাঁধ সংস্কার করার উদ্যোগ নিয়েছেন, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
সাতক্ষীরার ক্রীড়াবিদরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। তবে, আধুনিক স্টেডিয়াম ও সুইমিংপুলের অভাব রয়েছে। যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সাতক্ষীরা সফরে এসে এই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছেন এবং দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।
সাতক্ষীরায় প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা কারণে উদ্বাস্তু হচ্ছে হাজারো মানুষ। উপকূলীয় জেলা হিসেবে সাতক্ষীরা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের মারাত্মক ঝুঁকির মুখে। ফলে এখানকার মানুষকে সুরক্ষিত করতে স্থায়ী বাঁধ, অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়ন অপরিহার্য।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশী। তাই সাতক্ষীরা জেলাবাসী প্রত্যাশা করে বৈষম্যহীন উন্নয়নের। দেশের অর্থনীতিতে সাতক্ষীরা জেলার যে অবদান ও প্রয়োজনিয়তার নিরিখে নির্ধারন হোক উন্নয়ন পরিকল্পনা।
সাতক্ষীরাবাসী আশা করে, ভোমরা বন্দরের উন্নয়ন, সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলস পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আধুনিক স্টেডিয়াম ও সুইমিংপুল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নদীর ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, মৎস্য গবেষণা কেন্দ্র, হ্যাচারি ও আধুনিক ফ্রিজিং প্ল্যান্টসহ অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যটন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে এগিয়ে যাবে সাতক্ষীরারসহ দেশের অর্থনীতি।
সাতক্ষীরার প্রয়োজনিয়তা অনুভব করে সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক মোস্তাক আহমেদ বলেছেন, “আমরা নতুন, আধুনিক ও বৈষম্যহীন সাতক্ষীরা গড়ার স্বপ্ন দেখছি” (সূত্র: BVNEWS24)। এটি একটি আশাপ্রদ কথা জেলাবাসীর জন্য, কিন্তু উদ্যোগ, বাস্তবায়ন ও সহযোগিতা জরুরি।
এখনই সময়—সরকারের নীতিনির্ধারকদের এই জেলার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন ঘটানো এবং টেকসই উন্নয়ন, বাস্তবসম্মত ও লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য। সাতক্ষীরা যেন আর অবহেলিত না থাকে, সেটিই হোক আমাদের সম্মিলিত চাওয়া। আজকের সঠিক বিনিয়োগ—আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সমৃদ্ধ এবং টেকসই সাতক্ষীরা।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের জেলা সাতক্ষীরা থেকে কলকাতা কাছে। কলকাতা একসময় ভারতের রাজধানী ছিল। এ জনপদের মানুষ ব্যবসা-বাণিজ্য, জীবিকা, শিক্ষা ও চিকিৎসার কেন্দ্রবিন্দু ছিল কলকাতা। আর জীবিকা নির্বাহের প্রধান অবলম্বন ধান-পাট, তাঁত, মাদুর, মাছ, বিড়ি উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্র ছিল সাতক্ষীরা। দেশভাগের পর কলকাতার সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন হয়। তখন সাতক্ষীরার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে পাশের যশোর, খুলনা, বাগেরহাট কিংবা নড়াইলের। সাতক্ষীরা থেকে ঢাকা বেশ দূরে। যাতায়াতব্যবস্থা দুরূহ। পণ্য আনা-নেওয়ার সময় ও ব্যয় বেশি। স্বল্প পুঁজির মানুষের পক্ষে ঢাকায় ব্যবসা করা কঠিন। ফলে আমাদের লোকজন ধীরে ধীরে কর্মহীন হয়ে পড়ে। বেকারত্বের ভয়াল থাবায় উন্নয়নের ছোঁয়া থেকে সাতক্ষীরা জেলা পিছিয়ে পড়ে। বর্তমান সরকার দেশের অর্থনীতির ভিত্তি সুদৃঢ় ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন জেলায় অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছে। সাতক্ষীরায়ও অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে ওঠার ব্যাপক প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাবনা রয়েছে।
দারিদ্র্যপীড়িত ও উপকূলীয় অঞ্চল সাতক্ষীরার সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের সংকট বহুমুখী। ব্রিটিশ-পূর্ব যুগে এ জেলার সর্বত্র গড়ে উঠেছিল অপরিকল্পিত গ্রামীণ সমাজ। তারা মাটির হাঁড়ি-পাতিল, টালি তৈরি করত। উৎপাদিত হতো সামান্য কৃষিপণ্য। তাতে অনেক সময়ই মানুষের চাহিদা পূরণ হতো না। বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ তছনছ করে দিত মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন। কোনো শিল্পকারখানা গড়ে ওঠেনি। কৃষি ও মাছ চাষ ছিল মানুষের প্রধান পেশা। শিক্ষার হার নিম্নগামী। নদী ভাঙনে বসত হারানো, পেশা বদল, বেকারত্ব রূপকথার মতো। এর পরিবর্তন আসে গত শতকের ষাটের দশকে সাতক্ষীরার উপকূলজুড়ে বিশেষ বাঁধ দেওয়ার পর। এ সময় কিছু ধানসহ কৃষিপণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় মানুষের কর্মসংস্থান হয়।
স্বাধীনতার পর মানুষের জীবনযাপনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। শুরু হয় বেঁচে থাকার লড়াই। ষাটের দশকে উপকূলীয় বাঁধে নদীতে পলি ভরাট হয়ে ব্যাপক এলাকা জলাবদ্ধ হয়। ফলে কৃষিজমিতে ব্যাপকভাবে তৈরি হয় মাছের ঘের। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তরা জমি হারাতে থাকে। সবচেয়ে ক্ষতি করে লবণাক্ত পানি ও জলাবদ্ধতা। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়। কৃষিপণ্য, জীবিকা বিপন্ন হওয়ায় খেতমজুর কৃষক কর্মসংস্থান হারানোর ফলে নতুন করে মানুষের অভিবাসন শুরু হয়। বর্তমানে জেলার ২২ লাখ মানুষের প্রধান পেশা কৃষি ও মাছ চাষ। এ ক্ষেত্রে দরিদ্র মানুষের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসেনি। তাদের অনেকেই কৃষিজমি মহাজনের কাছে বর্গা দিয়ে নিঃস্ব হয়েছে। এ সময় ব্যাপক হারে সাতক্ষীরার মানুষ অভিবাসিত হয়ে যশোর, নড়াইল, খুলনা, বাগেরহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় আবাস গড়ে তোলে। ইউনেস্কোর বিশ্ব-ঐতিহ্যে জায়গা করে নেওয়া সুন্দরবনের অংশবিশেষ এ জেলায়। হারিকেন, সিডর, নার্গিস, আইলা, আম্ফানসহ একাধিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে এ সুন্দরবনই রক্ষা করেছে লাখ লাখ মানুষের প্রাণ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এ সুন্দরবন হতে পারে বিশেষ পর্যটন কেন্দ্র। সাতক্ষীরায় একমাত্র ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছিল সুন্দরবন টেক্সটাইল মিল, যা বন্ধ হয়ে গেছে। সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এখানে শিল্পায়ন হয়নি। শিল্পের বিকাশ ঘটেনি। ২০১০ সালে দেশে অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের পরিকল্পনা গৃহীত হয়। তবে শুরুতে কাজ তেমন কিছুই হয়নি। গতি পায় মূলত ২০১৫ সালে। সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সাল নাগাদ দেশে ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা। এর মধ্যে ৯৩টি অর্থনৈতিক অঞ্চল অনুমোদন পেয়েছে। যদিও বাস্তবায়নাধীন রয়েছে সরকারি-বেসরকারি ২৮টি অর্থনৈতিক অঞ্চল। দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে এ উদ্যোগ প্রশংসনীয়। সাতক্ষীরায় একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার জন্য ২০১৮ সালে  উদ্যোগ নেওয়ার পরও অনিবার্য কারণে পরবর্তী কার্যক্রম গতিশীল হয়নি। করোনার আগে সারা দেশে দরিদ্রতা ছিল ২৩ শতাংশ আর সাতক্ষীরায় ছিল ৪২ শতাংশ। করোনাকালীন সংকটে সারা দেশের মতো এ জেলারও অনেক মানুষ কর্মবিমুখ হয়ে পড়ে। বেকারত্বের কারণে সাম্প্রদায়িক শক্তি লাভবান হচ্ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে অপরাধ। অন্যদিকে ঢাকায় কর্মরত অসংখ্য মানুষ কাজ হারিয়ে ফিরে এসেছে গ্রামে। অর্থাৎ বেকারত্ব ও দরিদ্রতা উভয়ই বাড়ছে। সাতক্ষীরা থেকে বহু মানুষ পরিবারসহ ঢাকায় যায় কাজের সন্ধানে। নারীরা যায় গার্মেন্টে। তাদের উদ্দেশ্য থাকে পরিবারকে সাহায্য করা। তারা জীবন-যাপনের ব্যয় সামলিয়ে পরিবারের জন্য তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না। দেশের গার্মেন্টগুলো গড়ে উঠেছে ঢাকাকেন্দ্রিক। এর উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানি হয় মূলত চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের দূরত্ব প্রায় ২৫০ কিলোমিটার। রপ্তানি খরচ বেশি হয়। সাতক্ষীরায় অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠলে বাড়তি কিছু সুযোগ তৈরি হবে। প্রথমত উৎপাদন খরচ কমবে। ১০ হাজার টাকা বেতনের শ্রমিক কাজ শেষে বসবাস করবে নিজের বাড়িতে। এতে অর্থনৈতিকভাবে সে স্বাবলম্বী হবে। সবচেয়ে বড় সুবিধা জেলা সদর থেকে মোংলা সমুদ্রবন্দরের দূরত্ব মাত্র ৮০ কিলোমিটার। ভোমরা স্থলবন্দর ১৩ কিলোমিটার। প্রশস্ত সড়ক ও যানজটমুক্ত। অর্থাৎ পণ্য পরিবহন ও রপ্তানির ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পাওয়া যাবে। জেলায় বিদুৎ সরবরাহও যথেষ্ট ভালো। শ্রমও সহজলভ্য। কেবল গ্যাসের সংকট। এ সংকট দেশব্যাপী। প্রস্তাবিত ট্রেনলাইনও কাছে। অন্যদিকে পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে সাতক্ষীরার পণ্য সহজে দেশ-বিদেশে বাজার গড়ে তুলতে পারবে। কলকাতা কাছে হওয়ায় ভারতে এমনকি পাশের অন্যান্য দেশে সাতক্ষীরার উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করা সহজ হবে। সামনে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। অথচ ৩০ শতাংশ মানুষ ভোট দিতে পারবে না। কারণ ইট উৎপাদনের মৌসুম হওয়ায় তারা দেশের বিভিন্ন জেলায় ইটভাটায় কাজে নিয়োজিত রয়েছে। দরিদ্র বাবা-মা ইটভাটায় কাজের উদ্দেশ্যে গেলে নিরাপত্তার কারণে স্কুলপড়ুয়া সন্তান সঙ্গে নিয়ে যায়। এর ফলে প্রচুর শিক্ষার্থী পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ছে। এ রকম তীব্র অর্থনৈতিক যন্ত্রণার মধ্য চলছে সাতক্ষীরার শ্রমজীবী মানুষ। সুতরাং সাতক্ষীরায় একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে ওঠা জরুরি। সাতক্ষীরায় উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে মাছ, আম, সবজি, নারকেল, চিনি, গুড় ইত্যাদি বিদেশে রপ্তানি হয়। বিশ্ববাজারে এসব পণ্যের বেশ চাহিদা আছে। অথচ উল্লিখিত পণ্যের বিকল্প উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়ানো যাচ্ছে না। অর্থনৈতিক অঞ্চল হলে এখানে আরও অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে উঠবে। সুদৃঢ় হবে দেশের অর্থনীতি। বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে সাতক্ষীরা জেলা।
সাতক্ষীরা : বাংলাদেশের অতি সম্ভাবনাময় জেলা হিসেবে পরিচিত সাতক্ষীরা। পৃষ্টপোষকতা পেলে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের অন্যতম হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে জেলাটি। এই জেলায় উৎপাদিত চিংড়ী শিল্প বিশ্ব বাজারে রপ্তানী পরবর্তি শত শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করে চলেছে। এখানকার চিংড়ী শিল্প কেবল দেশকে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের মহাক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করছে তা নয় আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশ কে সুনাম, সুখ্যাতি আর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে বলে মনে করেন বিশেজ্ঞরা। সাতক্ষীরা চিংড়ী সহ সাদা প্রজাতির মৎস্যের কারনে শুধুমাত্র দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হচ্ছে তা নয়, এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে সুবাতাস প্রবাহীত হচ্ছে। দেশের সামগ্রীক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে সাতক্ষীরার অবস্থান আর অবদান দিনে দিনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াচ্ছে। অর্থনীতির এই সুবাতাস প্রবাহীত হওয়ার ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকুক এই প্রত্যাশা জেলাবাসির।
দেশে মোট রফতানিজাত চিংড়ির একটি বড় অংশ উৎপাদন হয় উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায়। প্রতি বছর আড়াই থেকে ৩ হাজার কোটি টাকার চিংড়ি রফতানি হয়। গত বছরের তুলনায় চলতি অর্থবছর রফতানি আয় বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে এ খাত থেকে ২ হাজার ২৫ কোটি টাকা আয় হয়েছে, যা গেল অর্থবছরের তুলনায় অন্তত ১৫০ কোটি টাকা বেশি।
জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, সত্তর-আশির দশকের দিকে শুরু হয় সাতক্ষীরায় লবণ পানির চিংড়ি চাষ। বাগদা
, হরিণা, চাকা ও চেম্বিসহ বিভিন্ন প্রজাতির চিংড়ি চাষ হয় এখানে। চলতি ২০২৩-২৪ মৌসুমে সাতক্ষীরার ছয়টি উপজেলায় ৫৯ হাজার লবণ পানির ঘেরে।
চাষ হয়, যা থেকে ২৭ হাজার টন ।চিংড়ি উৎপাদন হয়েছে। উৎপাদিত এসব বাগদা চিংড়ি থেকে রফতানি আয় হয়েছে ২ হাজার ২৫ কোটি টাকা। মোট উৎপাদিত চিংড়ির ৯০ শতাংশ বিভিন্ন দেশে রফতানি হয় এবং বাকি ১০ শতাংশ দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ হয়েছে। এর আগে ২০২২-২৩ মৌসুমে জেলায় ২৫ হাজার টন বাগদা চিংড়ি উৎপাদন হয়েছিল, যা থেকে রফতানি আয় হয় ১ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। এ হিসাব অনুযায়ী চলতি মৌসুমে ১৫০ কোটি টাকা রফতানি আয় বেড়েছে।
সাতক্ষীরা মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আব্দুর রব জানান, জেলার উৎপাদিত।
চাহিদা রয়েছে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে। তবে কভিডের সময় রফতানি বন্ধ থাকায় দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও চাহিদা বেড়েছে। এখন দেশের বাজারে বাগদা চিংড়ি ৮০০-৮৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য মতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই থেকে জুন মাসে কাঁকড়া রপ্তানি হয়েছে ১৩ দশমিক ৭৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে (জুলাই-জুন) এ রপ্তানি ছিল ৯ দশমিক ২৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, এতে বিগত বছরে চেয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৮ দশমিক ৭০ শতাংশ। শুধু চলতি বছরের জুন মাসে রপ্তানি হয়েছে ১ দশমিক ৫৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ এলাকার কাঁকড়া চাষ করেন আব্দুস সাত্তার। তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকে। তাই আমাদের অর্থনৈতিক একটা ঝুঁকি সব সময় থাকে। চিংড়ি পোনার লবণাক্ততা সহ্য করার ক্ষমতা কম এবং পোনায় ভাইরাসের আক্রমণে এটি মারা যায়। তাই আমি কয়েক বছর ধরে কাঁকড়া চাষ করেছি। তিনি আরও বলেন, এতে তুলনামূলক লাভ বেশি হয় ও কাঁকড়ার পাশাপাশি পুকুরে সাদা মাছ চাষ করছি, যাতে এটি থেকেও আর্থিকভাবে কিছুটা লাভবান হওয়া যায়।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার রইচপুর গ্রামের গলদা চিংড়ি চাষি গোলাম মোস্তফা জানান, তিনি এক দশক ধরে মিঠা পানির সাদা মাছের পাশাপাশি গলদা চিংড়ি উৎপাদন করেন। চলতি মৌসুমে ৩০ বিঘা জমির ঘেরে গলদা উৎপাদন করেন। জমির লিজ, রেণু পোনা ক্রয়, খাদ্য ও শ্রমিকের মজুরির টাকা উঠিয়েও ৮ লাখ টাকা লাভ হয়েছে তার। তিনি বলেন, ‘গত মৌসুমেও একই পরিমাণ ঘেরে গলদা চিংড়ি চাষ করে ৬ লাখ টাকা লাভ হয়েছিল।
বাংলাদেশ চিংড়ি চাষি সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাতক্ষীরার বিশিষ্ট ঘের ব্যবসায়ী আবুল কালাম বাবলা বলেন, গলদা উৎপাদন বাড়াতে হলে এর রেণু পোনা উৎপাদনে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে আগামীতে পোনা সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হবে।
জানা যায়, জেলায় ১ লাখ ৪০ হাজার ৭১ হেক্টর জমিতে ১ লাখ ৪৯ হাজার ২৮৬ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়। যার মধ্যে ৬৭ হাজার ৬শত ৮৩ হেক্টর জমিতে ৪০হাজার ৯শত ১১ মেট্রিক টন বাগদা ও গলদা ও অন্যান্য চিংড়ি মাছের উৎপাদন হয়। জেলার চাহিদার থেকে প্রায় দ্বিগুণ উৎপাদন মাছ বেশি হয়।
মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, সাতক্ষীরা জেলায় ৫৪ হাজার ৩শত ৫৮ মেট্রিক টন মাছের চাহিদার তুলনায় উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ২শত ৮৬ মেট্রিক টন। যা জেলার চাহিদার তুলনায় বেশি উৎপাদন হয়েছে ৯৪ হাজার ৯শত ২৭ মেট্রিক টন বেশি।
জানা যায়, জেলার ৫৪ হাজার ৯শত ৩৫টি জলাশয়ে ৫৮ হাজার ২শত ৯৪ হেক্টর জমিতে ২৬ হাজার ২শত ১৪. ৯৯ মেট্রিক টন বাগদা চিংড়ি মাছের চাষ হয় ও ১১ হাজার ৬শত ৬২টি জলাশয়ে ৯ হাজার ৩ শত ৮৯ হেক্টর জমিতে ১০ হাজার ২০৪ মেট্রিক টন গলদা চিংড়ি চাষ হয়। এবং অন্যান্য নদী ও বিভিন্ন জলাশয়ে ৪ হাজার ৪শত ৯৩ মেট্রিক টন ছোট বিভিন্ন প্রজাতির চিংড়ি মাছের চাষ হয়। ৩৬৪টি কাঁকড়া ঘের এ ৩ শত ২১ হেক্টর জমিতে ১ হাজার ৯শত ৬৫ মেট্রিক টন কাঁকড়া উৎপাদন হয়। ও সাতক্ষীরা জেলার ভিতর দিয়ে প্রবাহিত বিভিন্ন নদের ৪৩ জায়গারও ১৩শ ২৬ সেক্টর জায়গায় ১হাজার হাজার ৫শত ২১ মেট্রিক টন বিভিন্ন মাছ উৎপাদন হয়, জেলার বিভিন্ন খাল ও বিলের ৪শত ৬টি জায়গার ৩ হাজার ২শত ৫ হেক্টর জমিতে ১৪ হাজারহ ১শত ৭৩ মেট্রিক টন বিভিন্ন মাছ উৎপাদন হয়, জেলার বিভিন্ন বাওড়ের চারটি স্থানের হেক্টর জমিতে ২শত ৪ মেট্রিক টন মাস উৎপাদন হয় এবং জেলার সুন্দরবন পয়েন্টের একটি নদের ৫৫হাজার ৫শত২৪হেক্টর আয়তনে২হাজার ২শত ৫৯ মেট্রিক টন মাস উৎপাদন হয় এবং জেলার বিভিন্ন ধান ক্ষেতের ভিতরে ৩হাজার ৫ হেক্টর জমিতে ২ হাজার ৪ মেট্রিক টন মাস উৎপাদন হয় এবং বারোপিট এলাকার ২শত ৫৮ হেক্টর জমিতে ১শত ৭৫ টন মাছ উৎপাদন হয়, রং বিভিন্ন স্তানের বিলের জমিতে ঘেরসহ অন্যান্য জলাশয় মিলে ৪০ হাজার ৬শত ৫৪ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়। মাছের সাথে সাথে জেলা থেকে ১শত ৯ মেট্রিক টন কুচিয়া উৎপাদন হয় যার দেশের চাহিদা মিটিয়ে বাইরে রপ্তানি করা হয়। এবং সরকারিভাবে ১শত ৯৩টি পুকুরের ৪৮ হেক্টর জমিতে ২শত ৮৫ মেট্রিক টন বিভিন্ন জাতের মাছ উৎপাদন করা হয়, ও বিলের ভিতরে ছোট নার্সারি চারা মাছ ৩৯ মেট্রিক টন বিভিন্ন প্রজাতির মাছ উৎপাদন হয়।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেন, সাতক্ষীরা জেলা দেশের ভিতরে মৎস্য চাষে মডেল হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে। এ জেলা থেকে তিন ভাগের দুই ভাগ চিংড়ি মাছ বিদেশে রপ্তানি হয়। আমরা মৎস্য চাষীদের আধুনিকরণে সর্বদা সহযোগিতা করে থাকি।

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট