1. mesharulislammonir1122@gmail.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন
  2. info@www.sangjogprotidin.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন :
শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ০৫:৫৯ পূর্বাহ্ন

উপকূলের মানুষ ‌সরকারের কাছে ‌ত্রাণ ‌নয়, চাই টেকসই মজবুত ‌বেড়িবাঁধ

  • প্রকাশিত: রবিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৬৩ বার পড়া হয়েছে

বিশেষ প্রতিনিধি : সাতক্ষীরা খুলনা বাগেরহাট পিরোজপুর ঝালকাঠি বরগুনা বরিশাল ভোলা লক্ষীপুর চাঁদ পুর নোয়াখালী ফেনী চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মানুষ সরকারের কাছে ত্রাণ চায়না চাই টেকসই মজবুত দীর্ঘ মেয়াদী, ভেরি বাঁধ‌।বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে ঘূর্ণিঝড় রিমালের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত গ্রামীণ অবকাঠামো। ১০ ফুট জ্বলোচ্ছাসে কার্পেটিং, কাঁচা-পাকা রাস্তা ভেঙে চৌচির বড় বড় খানাখন্দে পরিনত। ভেঙে যাওয়া পাকা রাস্তার একাধীক স্থানে চলাচলে স্থানীয়দের স্বেচ্ছা শ্রম ও অর্থায়নে দেয়া হচ্ছে সাঁকো। কাঠের ও আয়রণ পুল ভাসিয়ে নিয়েছে জলের স্রোতে। এ উপকূলীয় অঞ্চলের ৪ লাখ মানুষের এখন যোগযোগ ব্যবস্থায় অভবনীয় দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এতে ১৪০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট এলজিইডি দপ্তর জানিয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি ত্রাণ নয় চাই রাস্তাঘাট ও টেকসই বেড়িবাঁধ।
সরেজমিনে ও সংশ্লিষ্ট অফিস সূত্রে জানা গেছে, দু’দিনের ঘূর্ণিঝড় রিমালের আঘাতে ও জ্বলোচ্ছাসে উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নসহ ১টি পৌরসভায় প্রত্যন্ত গ্রামের সড়কের কার্পেটিং ও কাঁচা-পাকা রাস্তাঘাট ভেঙে ভাসিয়ে নিয়িছে। ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে নদীর তীরবর্তী ৬টি ইউনিয়নের যোগাযোগ ব্যবস্থা। বারইখালী ফেরিঘাট থেকে বহরবুনিয়া অভিমূখী ১০ কিলোমিটারের কার্পেটিং, এসবিবি ও কাঁচা রাস্তাটি ৮০ ভাগ ভেঙে গিয়ে বিভিন্ন স্পটের ১৫/২০টি স্থানে অনেক যায়গাজুড়ে বড় বড় খানাখন্দে পরিনত হয়েছে। রাস্তার ইট ভাসিয়ে নিয়েছে নদীতে। এতে বারইখালী, সুতালড়ী, কাশ্মির তুলাতলা, বহরবুনিয়া, ফুলহাতা ও ঘষিয়াখালীসহ ৬টি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষের চলাচলে দুভোর্গ সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে পারছেনা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। স্থানীয়দের সহযোগীতায় বড় বড় খানাগুলোতে বাঁশ ও শুপারী গাছ দিয়ে সাকো তৈরি করে চলাচল করতে হচ্ছে গ্রামবাসীদের। এ রাস্তা থেকে চলাচলে ভুক্তভোগী বারইখালী গ্রামের মশিউর খান, আরমান শেখ, শাহিন হাওলাদার, মো. বাবলা শেখ, আনছার আলি, দোলোয়ার হোসেন, আসলাম শেখ, পল্লী চিকিৎসক আজিজুল ইসলাম ও শেফালী বেগমসহ একাধীকরা বলেন, বন্যা হয়ে গেছে ৫দিন গুরুত্বপূর্ন এ রাস্তাটি ১৫/২০ যায়গা থেকে ভেঙে মানুষের চলাচলে খুবই কষ্ট হচ্ছে। বৃদ্ধ ও শিশুরা রাস্তা পাড় হতে দূভোর্গের আর সীমা নেই। আমরা ত্রাণ চাইনা, চাই রাস্তাঘাট ও টেকসই বেড়িবাঁধ। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রশাসনের প্রতি আমাদের জোর দাবি।
অনুরুপ হোগলাবুনিয়া ইউনিয়নের পাঠামারা, বদনীভাঙা ও সানকীভাংগা গ্রামের কাঁচা-পাকা ৮/১০টি রাস্তা ভেঙে পড়েছে। খাউলিয়া ইউনিয়নের খাউলিয়া, চালিতাবুনিয়া, সন্যাসী, পশুরবুনিয়া, ফাঁসিয়াতলা ও পূর্ব বরিশাল গ্রামের ৬/৭টি ইটসোলিং ও কাঁচা রাস্তা ও খাউলিয়া বাজার সংলগ্ন বড় কাঠের পুলটি ভেঙে গিয়ে দুর্ভোগে ওই এলাকার মানুষ। মোরেলগঞ্জ সদর ইউনিয়নের কাঠালতলা-গাবতলা কার্পেটিং সংযোগ সড়কটি একাংশ ভেঙে গিয়ে বড় খাদে পরিনত হয়েছে। বলইবুনিয়ার শ্রেণিখালীর ৩, শ মিটার অস্থায়ী বেড়িবাঁধ ভেঙে গিয়ে নদী গর্ভে বিলীন। পঞ্চকরণের দেবরাজে ৮শ’ মিটার ওয়াবদা বেড়িবাঁধ বিভিন্ন স্থান থেকে ভেঙে পড়েছে। উপজেলার যাদের একমাত্র আয়ের উৎস মৎস ঘের তাদের সেই ঘেরের চিহ্ন পর্যন্ত নেই, পথে বসে গেছে ঘের ব্যাবসায়ীরা।
এছাড়াও চিংড়াখালী, খাউলিয়া, বহরবুনিয়া ও হোগলাবুনিয়ার ৭/৮টি ব্রিজের (এ্যাপ্রোজ) সংযোগ সড়ক ভেঙে পড়েছে। ১২টি কাঠের পুল ও আয়রণ ব্রিজ ভেঙে গেছে। ৪/৫টি কাঠের পুল পানির স্রোতে ভাসিয়ে নিয়েছে।
উপজেলা এলজিইডি দপ্তরের তথ্যমতে জানা গেছে, ঘূর্ণিঝড় রিমালের আঘাতে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ১২০ কিলোমিটার কার্পেটিং রাস্তা, ২৭০ কিলোমিটার এসবিবি পাকা রাস্তা, ৭/৮টি ব্রিজের এ্যাপ্রোজ, ১২টি পুল ও আয়রণ ব্রিজ বিধস্ত হয়ে ১৪০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এ সম্পর্কে উপজেলা প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম বলেন, রিমালের আঘাতে এবারে গ্রামীণ অবকাঠামো রাস্তাঘাট ব্যপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নে খোঁজ নিয়ে ক্ষয়ক্ষতির একটি প্রথমিক তথ্য বিবরনী তাদের সেন্টার সফটাওয়ারে এ্যাসেসমেন্ট তৈরি করে পাঠানো হয়েছে। এছাড়াও ছোটখাটো আকারে আকারে সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাস্তাগুলো মেবাইল মেইনটেনেন্স এমারজেন্সি কর্মীদের মাধ্যমে শীগ্রই মেরামত করে জনচলাচল সুগাম করা হবে। বড় ধরনের ক্ষতিগ্রস্থ সড়কগুলোতে কাজ করতে সময় লাগবে। এ দূযোর্গে উপজেলার গ্রমীন অবকাঠামো ভেঙে গিয়ে প্রায় ১৪০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে এ কর্মকর্তা জানান। এ বিষয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার এস, এম তারেক সুলতান বলেন, রিমালে ক্ষতিগ্রস্থ ইউনিয়ন পর্যায়ের রাস্তা ঘাটগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যে মেরামত করে জনচলাচল উপযোগী করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। জেলা প্রশাসক মহদয়ের দপ্তরে প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির একটি তথ্য বিবরণী প্রেরণ করা হয়েছে। এ নিয়ে জেলা প্রশাসকের এলজিইডি দপ্তরের উর্ধ্বতণ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করারও কথা রয়েছে।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের কাছে ঘূর্ণিঝড় কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, প্রতিবছর আঘাত হানা এক আজন্ম অভিশাপ। বিশেষ করে, বছরের বর্ষা মৌসুমের আগে এবং পরে আকাশে মেঘ দেখলেই তাদের মনে দানা বাঁধে এক চেনা ভয়, এই বুঝি হারালাম সবকিছু।
এই ভয়ের একটি ভৌগোলিক এবং বৈশ্বিক কারণও রয়েছে। পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ বাংলাদেশের উপকূলীয় ভূখ- প্রাকৃতিকভাবেই নিচু এবং সমতল। অসংখ্য নদী-নালা জালের মতো ছড়িয়ে থাকায় এই অঞ্চল যেমন উর্বর, তেমনই অরক্ষিত। বঙ্গোপসাগরের ফানেল আকৃতির উপকূলরেখা সামুদ্রিক ঝড়কে দানবীয় শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ করে দেয়। এর সাথে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন নামক বৈশ্বিক অভিশাপ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধি ঘূর্ণিঝড়গুলোকে আরও শক্তিশালী ও ঘন ঘন আঘাত হানার পরিবেশ তৈরি করছে। ফলে, যা ছিল প্রকৃতির এক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া তা এখন এক বিধ্বংসী ও নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। উপকূলের সাধারণ মানুষ, যারা এই জলবায়ু পরিবর্তনে সামান্যতম ভূমিকাও রাখেনি, তারাই এর সবচেয়ে নিষ্ঠুর শিকার।
তবে প্রকৃতির এই রুদ্র রূপের বিপরীতে উপকূলকে মায়ের মতো আগলে রেখেছে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন- সুন্দরবন। সিডর, আইলা বা বুলবুলের মতো প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের সামনে সুন্দরবনই যেন হয়ে উঠেছিল এক প্রাকৃতিক বর্ম। এর অসংখ্য গাছপালা, শ্বাসমূল আর নদ-নদীর ঘন নেটওয়ার্ক ঝড়ের গতিকে অনেকাংশে কমিয়ে দেয়, জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা শোষণ করে নেয় এবং উপকূলের মূল ভূখ-কে সরাসরি আঘাত থেকে রক্ষা করে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি, দূষণ এবং বনখেকোদের আগ্রাসনে সুন্দরবন নিজেই আজ বিপন্ন। এই প্রাকৃতিক রক্ষাকবচকে রক্ষা করতে না পারলে ভবিষ্যতে ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত বাংলাদেশের জন্য আরও কত ভয়াবহ হবে, তা কল্পনাও করা যায় না। সুন্দরবনকে বাঁচানো তাই কেবল একটি পরিবেশগত বিষয় নয়, এটি উপকূলের কোটি মানুষের জীবন বাঁচানোর সমার্থক।
উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ প্রতিবছর হারায় তাদের স্ত্রী-সন্তান, মা-বাবা, নিকটাত্মীয়, ঘর-বাড়ি ইত্যাদি। সিডর, আইলা, ফণী, আম্ফানÑ এসব নামের সাথে মিশে আছে হাজারো মানুষের কান্না আর হারানোর বেদনা। তবে এই দুর্যোগগুলোই তাদের আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তিও জোগায়। এই হারানোর যন্ত্রণা কেবল বস্তুগত বা শারীরিক নয়, এর একটি গভীর মানসিক প্রভাবও রয়েছে। প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়ের পর উপকূলের শিশুদের চোখে যে আতঙ্ক জমা হয়, তা ভোলার নয়। ঝড়ের রাতে বাতাসের হুংকার আর জলোচ্ছ্বাসের গর্জন তাদের শিশু মনে যে স্থায়ী ক্ষত তৈরি করে, তা সারাজীবনেও শুকায় না। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে তৈরি হয় এক ধরনের উদ্বেগ। বারবার ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারিয়ে তারা একসময় মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এই মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি প্রায়শই ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়।
এই সংকটের সবচেয়ে নীরব শিকার হয় নারী ও শিশুরা। দুর্যোগের সময় এবং পরে তাদের দুর্ভোগ পৌঁছায় চরমে। আশ্রয়কেন্দ্রে অপরিসর ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে নারীরা তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকেন। বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের অভাবে তারা নানা রকম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন, বিশেষ করে তাদের প্রজনন স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্যোগ পরবর্তী সময়েও সংসারের হাল ধরতে নারীদেরই সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় ধরে স্কুল বন্ধ থাকায় শিশুদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়, যা তাদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়। দুর্যোগের এই লিঙ্গভিত্তিক এবং বয়স-ভিত্তিক প্রভাবগুলো আমলে না নিলে কোনো পুনর্বাসন কার্যক্রমই পুরোপুরি সফল হতে পারে না
এখানে ঘূর্ণিঝড় বৃষ্টি ও বাতাসের সাথে সাথে নিয়ে আসে লোনা পানির বিশাল ঢেউ আর জলোচ্ছ্বাস। মানুষ কেবল তার শেষ আশ্রয় হারায় না, খাদ্য-বস্ত্র-পানির অভাব তখন সবচেয়ে প্রকট হয়। বাঁধ ভেঙে নদীর লোনা পানি উপকূলে ঢুকে পুকুর, টিউবওয়েলসহ অন্যান্য পানির উৎস নষ্ট করে দেয়। দীর্ঘমেয়াদে ডেকে আনে খাদ্য সংকট এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি। সমস্ত ফসল নষ্ট হয়ে যায় লবণাক্ততা আর তীব্র বাতাসের তোড়ে। জেলে হারায় তার মাছধরার জাল ও নৌকা। অনেকেই হারায় তাদের জীবিকার অনুসঙ্গ, যার ফলে বেড়ে যায় অপরাধপ্রবণতা। লোনা পানির এই আগ্রাসন কেবল তাৎক্ষণিক সংকট তৈরি করে না, এটি উপকূলের কৃষি অর্থনীতি এবং বাস্তুতন্ত্রকে স্থায়ীভাবে বদলে দেয়। যে জমিতে একসময় সোনার ধান ফলত, লবণাক্ততার কারণে তা আজ বন্ধ্যা। বাধ্য হয়ে অনেক কৃষক তাদের শতবর্ষের পেশা ছেড়ে চিংড়ি চাষ বা অন্য পেশায় ঝুঁকছে। চিংড়ি চাষ লাভজনক হলেও এটি মাটির উর্বরতা আরও কমিয়ে দেয় এবং লবণাক্ততা বাড়িয়ে তোলে। এর ফলে মিষ্টি পানির মাছ ও দেশীয় প্রজাতির উদ্ভিদ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এটি একটি চক্রাকার সংকট তৈরি করে। ঘূর্ণিঝড় লবণাক্ততা বাড়ায়, আর সেই লবণাক্ততা কৃষিকে ধ্বংস করে মানুষকে এমন পেশার দিকে ঠেলে দেয়, যা পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি করে। এর ফলে উপকূলের খাদ্য নিরাপত্তা ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ওপর এক নীরব আঘাত নেমে আসে।
বেশিরভাগ মানুষ সঠিক খবর ও সচেতনতার অভাবে আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় গ্রহণ করতে পারে না। যারা আশ্রয় গ্রহণ করে তারা ফিরে এসে বাড়ির খোঁজ নেয়, হারিয়ে যাওয়া গবাদিপশুটির খোঁজ নেয়। ঘূর্ণিঝড় বাড়িঘর আস্ত রাখে না, অনেকসময় মেরে ফেলে তাদের সম্বল গবাদি পশুদের। কিন্তু, এই অদম্য মানুষগুলো আবার ঘুরে দাঁড়ায়। চোখের পানিকে আড়াল করে ঘাম ঝরিয়ে পরিশ্রম করে, গড়ে তোলে আরেকটা বাড়ি, মাছে ভরা পুকুর, গোয়ালভরা গবাদি পশু-পাখি। কিন্তু, এসব আয়োজন যেন আবার ঘূর্ণিঝড়ের কাছে সঁপে দেওয়ার জন্যই।
ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস, জোয়ার-ভাটা এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপক‚লীয় এলাকার স্বাভাবিক ঘটনা। আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাবের ফলে এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়েই চলছে। এসব দুর্যোগের কবল থেকে উপকূলবাসীকে রক্ষা করতে বেড়িবাঁধ এবং বনায়নের মাধ্যমে সবুজ বেস্টনি গড়ে তোলা হয়। তবে ৩০ বছর আগের বেড়িবাঁধ নানান দুর্যোগে আজ ভেঙে তছনছ হয়ে গেছে। অসাধু ব্যক্তিরা বনায়নের গাছ কেটে চিংড়ি ঘের তৈরি করেছে। সব মিলিয়ে উপকূল এখনও অরক্ষিত। আকাশে কাল মেঘ ও সাগরের নিম্নচাপ দেখলেই উপক‚লবাসীর বুক ভয়ে কেঁপে উঠে। দেশের সাগর তীরবর্তী অর্থাৎ উপক‚লীয় ২১টি জেলায় লাখ লাখ মানুষের বসবাস। কিন্তু এই বিস্তীর্ণ উপকূলের যথাযথ সুরক্ষা নেই। উপকূলের রক্ষাকবচ বেড়িবাঁধ সর্বত্রই ভাঙাচোরা ক্ষতবিক্ষত। অনেক জায়গায় বাঁধের চিহ্নও নেই। ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে তছনছ উপক‚লীয় এলাকার বেড়িবাঁধ। এতে করে প্রতি বছর এসব এলাকার বসতভিটা, ফল-ফসলি জমি, ফাউন্দি ক্ষেত, খামার, লবণের মাঠ, চিংড়িসহ মাছের ঘের, মিঠাপানির উৎস পুকুর-কুয়া-নলকূপ, হাট-বাজার, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে একাকার। হাজার হাজার একর জমি লবণাক্ত হয়ে চাষের অনুপোযোগী হয়ে পড়ছে। এসব এলাকায় উঁচু বাঁধ নির্মাণে পরিকল্পনা থাকলেও বাঁধ নির্মাণে নজর নেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের। ভাঙা বাঁধ মেরামতে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও তাতে রক্ষা হয় না উপক‚ল। অথচ টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করলে সমুদ্রবন্দর, পোতাশ্রয়, বিমানবন্দর, শিল্প-কারখানা, প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদসহ অপার সম্ভাবনা এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাগর পাড়ের বাঁধগুলো উঁচুকরণ, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে সংশ্লিষ্টদের খুব একটা গুরুত্ব ও নজর না থাকার কারণে জোয়ারে পানিতে প্রতি বছরই উপক‚লীয় এলাকা ডুবে-ভাসে। গতবছর দীর্ঘস্থায়ী জোয়ারে সাগর পাড়ের লাখ লাখ মানুষ ছিল পানিবন্দি। বর্তমানে অতিবৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে উপক‚লের অনেক এলাকা। দেশের দক্ষিণ-পূর্বে টেকনাফ-কুতুবদিয়া, বাঁশখালী-স›দ্বীপ, ল²ীপুর থেকে দক্ষিণের দ্বীপজেলা ভোলা, বরিশাল, খুলনা হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বাগেরহাট-সাতক্ষীরা পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে বিস্তীর্ণ উপকূল-চর-দ্বীপাঞ্চলে শুধুই ভাঙন। এসব এলাকার কয়েক লাখ বাসিন্দা এবং সেখানকার জনবসতি, অবকাঠামো অরক্ষিত। অনিশ্চিত জীবন-জীবিকা। তাইতো উপকূলবাসী কাফনের কাপড় পরে ভাঙা বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে দাবি জানায় ‘ত্রাণ চাই না, টেকসই বেড়ি বাঁধ চাই’।
গত সপ্তাহেও খুলনা-সাতক্ষীরা ও সংলগ্ন দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নিম্নচাপ অবস্থান করে। এর ফলে অতিবৃষ্টি ও প্রবল জোয়ারে গোটা উপক‚লভাগ, নদ-নদী, খাল-বিলসহ ফুলে-ফুঁসে উঠেছে। সতর্ক সঙ্কেত না থাকলেও গতকাল রোববার পর্যন্ত সমুদ্র ছিল উত্তাল। অস্বাভাবিক জোয়ারে চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের অনেক এলাকা প্লাবিত হয়। লোকালয় পানিতে সয়লাব। আবহাওয়া বিভাগের পূর্বাভাসে জানা গেছে, চলতি আগস্ট (শ্রাবণ-ভাদ্র) মাসে বঙ্গোপসাগরে এক থেকে দু’টি নিম্নচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এরফলে উপক‚লজুড়ে ভারি বর্ষণ ও অস্বাভাবিক জোয়ারে একই ধরনের দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দেশের উপকূলীয় এলাকার ৮ হাজার কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর ও ২০০৯ সালে আইলার পর উপকূল এলাকার বাঁধের অনেক জায়গা ভেঙে যায়, অনেক জায়গা বানের তোড়ে ভেসে যায়। কিন্তু তার বড় অংশ এখনো যথাযথভাবে মেরামত করা হয়নি। এতে করে গোটা উপক‚লীয় এলাকা এখন অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। গত বছর আম্পানে উপক‚লীয় জেলার ১৫২টি স্থানে ৫০ দশমিক ৪৭৮ কিলোমিটার বাঁধ সম্পূর্ণ ভেঙে বিলীন হয়েছে। ৫৮৩টি স্থানে ২০৯ দশমিক ৬৭৮ কিলোমিটার আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৪৮টি নদীর তীর ভাঙনে ১৩ দশমিক ২০৮ কিলোমিটার বিলীন হয়েছে এবং ৩৭টি নদীর তীর সংরক্ষণ উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের ক্ষতি হয়েছে ১২ দশমিক ৮০০ কিলোটার। এই বিধস্ত উপক‚লকে এখনো মেরামত করা হয়নি। ফলে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের কারণে ও টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে ভাসছে উপকূলের জেলাগুলো।
বিশিষ্ট জলবায়ু ও পানি বিশেষজ্ঞ ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ইমেরিটাস ড. আইনুন নিশাত ইনকিলাবকে বলেন, আইলা-সিডর-আম্ফান ও দীর্ঘ বন্যায় দেশের অনেক ক্ষতি হয়েছে। এবার সমুদ্রে সৃষ্ট লঘুচাপের ফলে জোয়ারে পানিতে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ অঞ্চল। এসব প্রাকতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পেতে হলে বর্তমানে বাঁধের উচ্চতা সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে ১৫ ফুট, ভেতরের দিকে ১৪ কিংবা ১২ ফুট। এগুলো যদি সবল থাকে তাহলে ১৪-১৫ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস ঠেকিয়ে দেবে। কিন্তু বাস্তবে এসব বাঁধও ভাঙা-বিধস্ত। এ ছাড়া বর্তমানে ১৭-১৮ ফুট উচ্চতা পর্যন্ত জোয়ারের পানি উঠছে। তাই এসব বিবেচনা করে উপক‚লের বেড়িবাঁধগুলো টেকসইভাবে নির্মাণ করতে হবে। অন্যথায় প্রতি বছর বাঁধ ভাঙবে আর এসব ভাঙা মেরামতের নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হবে। উপকূলবাসীর দুর্ভোগ তাতে দূর হবে না।
উপক‚লীয় এলাকার বর্তামন অবস্থা আমাদের সংবাদদাতারা তাদের রিপোর্টে তুলে ধরেছেন। সে আলোকে এ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম থেকে শফিউল আলম জানান, ঘূর্ণিঝড়ের মুখে প্রাণ হাতে নিয়ে উপক‚লবাসীর বসবাস। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটাছুটি। যখন ঘূর্ণিঝড় হয় না তখনও প্রবল জোয়ার ভাটায় লোনা পানি এপাশ-ওপাশ খেলছে। এতে করে বসতভিটা, ফল-ফসলি জমি, ফাউন্দি ক্ষেত, খামার, লবণের মাঠ, চিংড়িসহ মাছের ঘের, মিঠাপানির উৎস পুকুর-কুয়া-নলক‚প, হাট-বাজার, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে একাকার। অথচ বেড়িবাঁধ অবহেলিতই রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ বদ্বীপ এবং বঙ্গোপসাগরের কোলে ফানেল বা চোঙ্গা আকৃতির অবস্থানে বাংলাদেশ। ভ‚প্রাকৃতিক কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশে দুর্যোগের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। সুদূর অতীত থেকে এ যাবত বছরে একাধিক ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানে। তাছাড়া জলবায়ুর বৈরি আচরণে ফুলে-ফুঁসে উঠা সমুদ্রের অস্বাভাবিক জোয়ারে প্লাবিত হচ্ছে অনেক এলাকা। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ‘নাভি’ আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, হালিশহর এবং দেশের প্রধান ‘সওদাগরী বাণিজ্য পাড়া’ চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ সামুদ্রিক জোয়ারে ডুব-ভাসি করছে। ঢলের পানিতে থৈ থৈ সড়কে সাম্প্রতিক সময়ে নৌকাযোগে অফিসে গেছেন সরকারি কর্মকর্তারা। সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যাংক-বীমা, ব্যবসা-বাণিজ্যকেন্দ্র, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, গুদাম-আড়ত, আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকা, সরকারি কমার্স কলেজসহ অধিকাংশ স্কুল-কলেজ, মসজিদ, মাদরাসা, হাসপাতাল, সড়ক অলিগলিতে জোয়ারে পানিবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এতে করে ক্ষয়ক্ষতি কোটি কোটি টাকার। ইতোমধ্যে ব্যবসা গুটিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন অনেকেই। অথচ চট্টগ্রাম শহর রক্ষা বাঁধ আজও অধরা।
আবহাওয়া-জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির বিরূপ প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। যা উপক‚লজুড়ে ‘সাইলেন্ট দুর্যোগে’ রূপ নিয়েছে। অথচ যুগের প্রয়োজনে লাগসই প্রযুক্তিতে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেই। মীরসরাই-সীতাকুন্ড-সোনাগাজীতে নির্মাণাধীন দেশের সর্ববৃহৎ শিল্পজোন ‘বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর’ থেকে চট্টগ্রাম মহানগরী, আনোয়ারা, বাঁশখালী, চকরিয়া, পেকুয়া হয়ে কক্সবাজার উপকূলভাগ পর্যন্ত ‘সুপার ডাইক’ অর্থাৎ সুউচ্চ বেড়িবাঁধ-কাম-সড়ক নির্মাণের প্রাথমিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। তবে এখনও তার বাস্তবায়ন কাজ শুরু হয়নি। নেদারল্যান্ডস ও বিশ্বের সমুদ্রবেষ্টিত বিভিন্ন দেশ আধুনিক হাইড্রোলজি প্রযুক্তির বেড়িবাঁধ, রিং-বাঁধ ও আঁড়াআড়ি বাঁধ নির্মাণ করে সমুদ্র ও উপক‚লভাগে বিশাল আয়তনের ভূমি জাগিয়ে তুলছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ সমুদ্রের করাল গ্রাসে অসহায়ভাবে প্রতিনিয়ত হারাচ্ছে ব্যাপক হারে মূল্যবান ভূমি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশের দ্বীপাঞ্চল, চর ও উপকূলে ৩৫ শতাংশ স্থানে বেড়িবাঁধের চিহ্ন প্রায় মুছে গেছে। প্রায় ৫০ ভাগ বেড়িবাঁধ ক্ষত-বিক্ষত, কম-বেশি বিধ্বস্ত, জরাজীর্ণ, নড়বড়ে। বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও জোড়াতালির মেরামতের নামে নয়-ছয় করেই সারাবছর চলে যথেচ্ছ অনিয়ম-দুর্নীতি। এর পেছনে পাউবোর একশ্রেণির অসৎ প্রকৌশলী, কর্মকর্তা-কর্মচারী-ঠিকাদার মিলে সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে উঠেছে। ভাঙাচোরা বেড়িবাঁধ উপকূলবাসীর মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বেড়িবাঁধ সংস্কার, জোড়াতালি মেরামত কাজের মান নিয়ে উপযুক্ত তদারকি, যাচাই, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতার বালাই নেই। মানসম্মত কাজ না হওয়ায় বেড়িবাঁধ টিকছে না। বালির বাঁধের মতোই বিলীন হয়ে যাচ্ছে সাগরের পেটে। বেড়িবাঁধ ধসে যায়, আসে নতুন কাজ। নামে মাত্র কাজ করেই বিলের মোটা অঙ্কের টাকা তুলে নিয়ে সটকে পড়ে ঠিকাদাররা।
তাছাড়া বেড়িবাঁধ যথেষ্ট উঁচু করে নির্মিত হয় না। সামুদ্রিক জোয়ারের সমান উঁচু করে বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার না করায় জোয়ারের পানি বেড়িবাঁধ টপকে ফসলি জমি, লবণ মাঠ ও লোকালয় ভাসিয়ে দিচ্ছে। অনেক জায়গায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে বেড়িবাঁধ। নড়বড়ে বিধ্বস্ত অবস্থায় কোনোমতে টিকে আছে বেড়িবাঁধ। উপকূলীয় অনেক জনপদে বেড়িবাঁধ ব্যবহৃত হয় স্থানীয় যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে। কিন্তু বাঁধ ক্ষত-বিক্ষত থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কক্সবাজারসহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় জিওব্যাগ তছনছ হয়ে গেছে সমুদ্রের ঢেউয়ের আঘাতে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে আনোয়ারা, বাঁশখালী, সীতাকুন্ড, স›দ্বীপ, পতেঙ্গা, কাট্টলী, হালিশহরে উপক‚লীয় বেড়িবাঁধের বর্তমানে নাজুকদশা। নিয়মিত জোয়ারে প্লাবিত হচ্ছে বিস্তীর্ণ এলাকা।
১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল শতাব্দীর প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস, ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডর, ২০০৯ সালের ২৫ মে আইলা, ২০১৩ সালের ১৬ মে মহাসেন, ২০১৫ সালের ৩০ জুলাই কোমেন, ২০১৬ সালের ২১ মে রোয়ানু, ২০১৭ সালের ৩০ মে মোরা, ২০১৯ সালের ৩ মে ফণি, ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর বুলবুল, ২০২০ সালের ২০ মে ঘূর্ণিঝড় আম্ফান ও সর্বশেষ এ বছর ২৬ মে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস। প্রতিবছর এক বা একাধিক ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় বেড়িবাঁধের ভাঙাচোরা অববাঠামো আরও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে করে উপক‚লবাসী জীবন-জীবিকা এবং মূল্যবান অবকাঠামো হুমকির মুখে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞ সূত্র জানায়, ‘সুপার ডাইক’ অথবা অন্যান্য উন্নত হাইড্রোলজি প্রযুক্তির স্থায়ী বেড়িবাঁধ কাম সড়ক নির্মাণ এখন জরুরি। সেকেলে বেড়িবাঁধ টিকছে না। সমুদ্রবন্দর, পোতাশ্রয়, বিমানবন্দর, শিল্প-কারখানা, প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদসহ অপার সম্ভাবনার ধারক উপকূল অরক্ষিত রয়ে গেছে। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ভোলা, বরিশাল, খুলনা, বরগুনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরায় সাগরের সাথে লাগোয়া দ্বীপ ও চরাঞ্চল ক্রমেই লোনা পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। লোনার আগ্রাসন বিস্তারের সাথে সাথে সর্বনাশ হচ্ছে ফল-ফসলি জমির। কৃষি-খামার, পর্যটন, বিনিয়োগ, শিল্পায়নসহ চর-উপকূল-দ্বীপাঞ্চল সুরক্ষা, উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান প্রসারের জন্য মজবুত টেকসই বাঁধের বিকল্প নেই। এরফলে উপক‚লীয় অঞ্চলের বহুমুখী অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে উন্নত সমৃদ্ধ হবে দেশ।

পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সভাপতি প্রবীণ অর্থনীতিবিদ প্রফেসর মুহাম্মদ সিকান্দার খান বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনৈতিক এলাকা আগ্রাবাদ, চাক্তাই খাতুনগঞ্জে জোয়ারের সমস্যার স্থায়ী সমাধান জরুরি। এর জন্য দীর্ঘদিনের নাগরিক দাবি চট্টগ্রাম শহর রক্ষা বাঁধ মজবুত এবং জোয়ারের তুলনায় যথেষ্ট উঁচু করে নির্মাণ করা প্রয়োজন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ এ জে এম গোলাম রাব্বানী বলেন, উপক‚লে বাঁধের ভাঙনস্থলে বালুর বস্তা ও কংক্রিটের ব্লক ফেলে সমাধান হবে না। উপক‚ল সুরক্ষায় স্থায়ী সমাধানের উপায় খুঁজে বের করতে হবে। উন্নত ও নতুন প্রযুক্তির বেড়িবাঁধের কলাকৌশল কাজে লাগাতে হবে। এর জন্য পর্যাপ্ত তহবিল বরাদ্দ প্রয়োজন। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীল এবং সমুদ্রের জোয়ারের চেয়ে অনেক বেশি উচ্চতার সুপার ডাইক, সড়কসহ বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। তবে বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত থাকা চাই।
কক্সবাজার থেকে শামসুল হক শারেক জানান,সাগরে লঘুচাপের সপ্তাহব্যাপী ভারি বর্ষণে কক্সবাজারের নিম্নাঞ্চলে পানিবন্দি হয়েছে তিন লাখেরও বেশি মানুষ। জেলার দুই প্রধান নদী বাঁকখালী ও মাতামুহুরি নদীতে ঢলের পানির তোড়ে বেড়িবাঁধ ভেঙে ডুবে গেছে চকরিয়া, পেকুয়া, রামু, ঈদগাঁও, কক্সবাজার সদরের বিস্তীর্ণ জনপদ। পানিবন্দি এসব মানুষের সুপেয় পানিও খাবারের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এদিকে বৃষ্টির পানিতে নতুন করে ডুবে গেছে উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ বিস্তীর্ণ এলাকা। বেড়িবাঁধ ভেঙে নাফ নদীর জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে শত শত একর চিংড়ি ঘের, ঘরবাড়ি ও রাস্তা ঘাট। মহেশখালীর ধলঘাটা, মাতারবাড়ি ও কুতুবদিয়ার আলী আকবর ডেইল এলাকায় ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে চলছে সাগরের লোনা পানির জোয়ার ভাটা। কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের মতে বন্যায় প্রায় ৪৫টি ইউনিয়নের সাড়ে ৫ শত গ্রামের আড়াই থেকে তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়েছে।
জানা গেছে, কক্সবাজার উপক‚লে টেকনাফ থেকে কুতুবদিয়া ও পেকুয়া পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপক‚লীয় বেড়িবাঁধ আছে ৫৯৫ কিমি.। আর পানি নিষ্কাশনের জন্য সøুইস গেট আছে ২৫৩টি। উপক‚লে প্রচুর সবুজ বন তৈরি হলেও বনদস্যুরা তা কেটে চিংড়ি ঘের করে। কয়েক শত সাইক্লোন শেল্টার পড়ে আছে অরক্ষিত। আর টেকসই বেড়িবাঁধ যেন অধরা স্বপ্ন। বেড়িবাঁধ নির্মাণ নিয়ে চলে আসছে লুটপাটের মহোৎসব।
কক্সবাজার কুতুবদিয়া কুতুবী থেকে জানা যায়।, দেশের সম্ভাবনাময় দ্বীপ-উপজেলা কুতুবদিয়া। এই দ্বীপরক্ষাবাঁধ নির্মাণে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার অর্থ বরাদ্দ করে সরকার। কিন্তু আধুনিক ডিজাইনমতে কাজ না হওয়ায় টেকানো যাচ্ছে না কুতুবদিয়া রক্ষাবাঁধ। এতে করে প্রতি বর্ষায় অমাবস্যা-পূর্ণিমাসহ স্বাভাবিক জোয়ারেও সামুদ্রিক নোনা পানিতে সয়লাব হওয়ায় দ্বীপটির প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছে স্থানীয় বাসিন্দারা।

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট