1. mesharulislammonir1122@gmail.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন
  2. info@www.sangjogprotidin.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন :
সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৪:০৭ পূর্বাহ্ন

পানির ঋণে বন্দি উপকূলের নারীরা ‌‌

  • প্রকাশিত: রবিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪৩ বার পড়া হয়েছে

বিশেষ প্রতিনিধি : বয়োবৃদ্ধা মরিয়ম খাতুন। দুটি খালি কলসি নিয়ে ঘণ্টা দুয়েক সময় ধরে খাবার পানির জন্য অপেক্ষা করছেন। কতক্ষণে পানি পাবেন জানেন না তিনি। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ী ইউনিয়নের দেওল গ্রামের রাস্তার মোড়ে অর্ধশত নারী-শিশু জড়ো হয়েছে পানি সংগ্রহের জন্য। ‘বন্ধু’ নামক একটি এনজিও গভীর নলকূপের পানি পাইপে দেয়। অনেকেই কলসি হাতে অধীর অপেক্ষায়। এসেছেন কেউ এক থেকে তিন মাইল পথ হেঁটে। ঘর-সংসারের কাজে যারা আসতে পারেনি তারা অন্য কাউকে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিয়ে পানি আনতে পাঠিয়েছেন। রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে এভাবে প্রদিতিনই তাদের আসা-যাওয়া। সুপেয় পানির জন্য নিত্যদিনের লড়াই। খুলনার কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুর গ্রামের কালিকাপুর বটতলায় পানির সন্ধানে ছুটে আসা মানুষজনের কষ্ট-দুর্ভোগের দৃশ্যও একই রকম।

দেশের সমুদ্র উপকূল, চর ও দ্বীপাঞ্চলে মিঠাপানির সঙ্কট মানুষের জীবনযাত্রায় সবচেয়ে বড় সঙ্কট। দিনে-রাতে অবর্ণনীয় ভোগান্তির অপর নাম। চারদিকে পানি থাকলেও লবণাক্ততার মারাত্মক আগ্রাসন। সুপেয় ও বিশুদ্ধ মিঠাপানির উৎসগুলো সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। অনেক নলকূপে উঠছে না পানি। পুকুর, জলাশয়-দীঘি, কুয়াগুলোর পানিও লোনায় গিলে ফেলছে। অধিকাংশ জায়গায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। মিঠাপানির পানি মিলছেই না সহজে। উপকূলে অধিকাংশ এলাকায় স্থানীয় জনসাধারণ বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) থেকে বাধ্য হয় ঋণ গ্রহণ করতে। ঋণগ্রস্ত হয়ে তারা সমিতিবদ্ধভাবে নলকূপ বা গভীর নলকূপ স্থাপন করে। যা মাইক্রোক্রেডিট বা ক্ষুদ্র ঋণ। চক্রবৃদ্ধি হারে সেই ঋণের সুদ পরিশোধ করতে হয়।

এই ঋণ গ্রহীতা বেশিরভাগই উপকূলের নারীরা। অভিনব ‘পানির ঋণ’ জালে আষ্টেপৃষ্ঠে বন্দি রয়েছে হাজার হাজার নারী। যদিও কাগজে-কলমে ‘পানির ঋণ’ লেখা থাকেনা। অন্য কোনো কারণ উল্লেখ দেখিয়ে যে ক্ষুদ্র ঋণ দেয়া-নেয়া হয়, সেই টাকার বিনিময়ে প্রতিদিনই পানি কিনতে বাধ্য হচ্ছে বিশুদ্ধ ও মিঠাপানির সঙ্কটে দিশাহারা উপকূলের নারীরা।

আবার নলকূপ কিংবা গভীর নলকূপ কোনোভাবে বিকল বা অচল হয়ে পড়লে আবারও সুদে ঋণ নিয়ে মেরামত করতে হয় তাদেরকেই। তাছাড়া যারা সাংসারিক কাজে, চাষবাসের ব্যস্ততায় সুপেয় পানি সংগ্রহের জন্য এনজিও’র থেকে নেয়া ঋণের টাকায় পাড়া-পড়শীদের দূর-দূরান্তে পাঠিয়ে সংগ্রহ করছে খাবার পানি। এভাবে দেশের সমুদ্র উপকূল, চর ও দ্বীপাঞ্চলে অনেক এনজিও’র ক্ষুদ্র ঋণের নামে মহাজনি চক্রবৃদ্ধি সুদে সর্বস্বান্ত লাখো দরিদ্র জনগোষ্ঠি।

তদুপরি এনজিওর ঋণের টাকায়ও পানি আদৌ কারো দোরগোড়ায় মিলছে না। স্থানীয় লোকজন মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে, ভ্যান কিংবা সাইকেলে ছুটছেন মিঠাপানির সন্ধানে। দিনের বড়সড় একটি কর্মঘণ্টা লেগে যাচ্ছে পানি সংগ্রহের ছোটাছুটিতে। তার উপর হিমশিম অবস্থা। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি ধরে রেখে কয়েক চালিয়ে নেয়া যায়। কিন্তু বছরের অধিকাংশ সময়ে লোনা পানির গ্রাসের কারণে মিঠাপানি পাওয়া কঠিন। খরতাপে পানির প্রাকৃতিক ও নলকূপের মতো কৃত্রিম উৎসগুলো শুকিয়ে তলানিতে চয়ে যায়।
তাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, মাটিতে ও পানির উৎসগুলোতে লবণাক্ততার হার বেড়ে গিয়ে মিঠাপানির পানির পুকুর ও জলাধার নষ্ট হওয়া, গভীর নলকূপের পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়ার কারণে মিলছে না সুপেয় পানি। এছাড়া উপকূলের অনেক এলাকায় নলকূপের পানি লবণাক্ত কিংবা আর্সেনিক দূষিত। এ ক্ষেত্রে পন্ড স্যান্ড ফিল্টার (পিএসএফ) পদ্ধতিতে পুকুরের পানি লবণাক্ততা মুক্ত করে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু খরায় ও শুষ্ক মৌসুমে অধিকাংশ মিঠাপানির পুকুর-দীঘি, কুয়া, জলাশয় শুকিয়ে পানিশূন্য হয়ে যায়। পন্ড স্যান্ড ফিল্টার (পিএসএফ) করার জন্যও এনজিওর ক্ষুদ্র ঋণ নির্ভর হয়ে পড়েন বিশেষত উপকূলের নারীরা।
এ প্রসঙ্গে অভিমত জানতে চাইলে একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, সমাজচিন্তাবিদ বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি প্রফেসর ড. মইনুল ইসলাম গতকাল শনিবার দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, মাইক্রোক্রেডিটের (ক্ষুদ্র ঋণ) ব্যবসার নামে অতীতের সেই সুদি মহাজনী কারবার বিস্তৃত হয়েছে। ক্ষুদ্র ঋণে দারিদ্র্য বিমোচন হবে- আমি কখনোই এটা বিশ^াস করিনা। বাস্তবে তা হচ্ছেও না। আমার লিখিত বইয়েও আমি সেটা তুলে ধরেছি। ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে সুদ-আসলে পরিশোধ করতে না পেরে হতদরিদ্র উপকূলবাসী পালাতে বাধ্য হয়। ক্ষুদ্র ঋণদাতা এনজিও’র সুদের জালে উপকূলবাসী আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে।

এদিকে ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস, নি¤œচাপ, খরা-অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টির মতো বৈরী আবহাওয়া-জলবায়ু এবং একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে লড়াকু উপকূলবাসী টিকে আছেন। উপকূলজুড়ে নীরব ভয়াল দুর্যোগ লবণাক্ততার আগ্রাসন। দেশের দক্ষিণ-পূর্বে টেকনাফ থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে খুলনা-সাতক্ষীরা পর্যন্ত ৭১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দক্ষিণভাগে উপকূলীয় তটরেখা ঘেঁষে বঙ্গোপসাগরের কোলে বিস্তীর্ণ চর-উপকূল-দ্বীপাঞ্চল। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরাসহ ১৯টি উপকূলীয় জেলার নদ-নদী খাল-বিল-খাঁড়ি, পুকুর-নলকূপসহ পানির উৎসগুলোতে লবণাক্ততার হার ক্রমাগত বাড়ছে।
ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে অনেক জেলা-উপজেলায় বেড়িবাঁধ বিধ্বস্ত হলেও মেরামত হয়নি। ভাঙচোরা বেড়িবাঁধ দিয়ে অবাধে জোয়ারের লোনা পানি বিস্তার লাভ করছে গ্রাম-জনপদে বিশেষত মিঠাপানির উৎসগুলোতে। এর ফলে সুপেয় পানির সঙ্কট তীব্রতর হয়ে উঠেছে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট এবং লবণাক্ততা ব্যবস্থাপনা ও গবেষণা কেন্দ্রের জরিপ মতে, গত ৩৬ বছরে লবণাক্ত জমি বৃদ্ধি পেয়েছে ২৬ দশমিক ৭ ভাগ।

দুর্যোগ ও লবণাক্ততার আগ্রাসন যতই বাড়ছে ততই বিস্তার লাভ করছে ক্ষুদ্র ঋণের আড়ালে এনজিও’র সুদি মহাজনি কারবার। বাড়ছে এনজিও’র সংখ্যা ব্যাঙের ছাতার মতো। পানি কিনতে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে উপকূলবাসী এনজিও-নির্ভর হয়ে পড়েছে বেশি। মিঠাপানির তীব্র সঙ্কটের মুখে অনেকেই বিশুদ্ধ পানির অভাবে দূষিত ও লবণাক্ত পানি পান করে নানান রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে প্রতিনিয়তই। পানিবাহিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছেই। লবণাক্ততা কবলিত উপকূলে রোগব্যাধির প্রকোপ বৃদ্ধি ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির সমস্যা প্রকট হয়ে উঠেছে।

বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় ২০ শতাংশ প্রসূতি লবণাক্ততার কারণে অকাল গর্ভপাতের শিকার হচ্ছেন বলে উদ্বেগজনক তথ্য ফুটে উঠেছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ বলেন, গর্ভাবস্থায় অধিক মাত্রায় লবণাক্ত পানি পান করলে খিঁচুনি ও উচ্চ রক্তচাপ হয়। এ কারণে গর্ভাবস্থায় সন্তান মারা যাওয়ার হার বেশি। আইসিডিডিআরবি’র এক গবেষণায় বলা হয়েছে, লবণাক্ততার কারণে উপকূলের মহিলারা অকাল গর্ভপাতের শিকার হচ্ছেন। শুধু তাই নয়; এ কারণে তিন শতাংশ শিশু মারা যায়। তাছাড়া ব্যাপকহারে বাড়ছে উচ্চ রক্তচাপের রোগীর সংখ্যা। ডায়রিয়া, আমাশয়, হৃদরোগ, চর্মরোগ, শ^াসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগব্যাধি বেশিমাত্রায় লক্ষ্য করা যায় উপকূলীয় অঞ্চলে।  পানির অপর নাম জীবন। কিন্তু সেই পানি নিরাপদ না হলে ধ্বংস বয়ে আনে। পানি যখন সুপেয় না হয়, তখন তা হয়ে উঠে নানা অসুখ, নানাবিধ স্বাস্থ্য সমস্যাসহ মরণেরও কারণ। পানির সংকট বর্তমানে একটি বৈশ্বিক সংকট। ক্রমান্বয়ে এ সংকট আরো তীব্র হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে এ সংকট। বিশ্বের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী পানি সংকটের মধ্যে রয়েছে। পৃথিবীতে যতো মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ প্রাণ হারায় বিশুদ্ধ পানির অভাবে। পানিবাহিত রোগের প্রভাবে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এদের অধিকাংশই আবার শিশু। সুপেয় পানি প্রাপ্তির সুযোগ বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। পানি অধিকারকে জাতিসংঘ মানবাধিকার হিসেবেও ঘোষণা করেছে। কিন্তু বিশ্বের ৭৬ কোটিরও বেশি মানুষ এ অধিকার থেকে বঞ্চিত। তাই সুপেয় পানির অধিকার রক্ষা না হলে সংকটাপন্ন এলাকাগুলো আরো বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।
নিরাপদ পানির অধিকারবঞ্চিত বিপুল জনগোষ্ঠীই আবার চরম দরিদ্রসীমায় বাস করে। প্রান্তিক এ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ গ্রামে বাস করে। নারী ও শিশুরা এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছে। এশিয়া ও আফ্রিকার এ সংকট আরো ভয়াবহ। ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাবে সুপেয় পানির সুযোগবঞ্চিত জনসংখ্যার দিক দিয়ে আমাদের অবস্থান বিশ্বে সপ্তম। অথচ নদীমাতৃক দেশে হিসাবে আমাদের পরিচিতি। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট দীর্ঘদিনের। ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলা প্রলয়ের পর এই সংকট আরও তীব্র হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে পানির উৎস্যগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। এখনও পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরতে পারেনি। এছাড়া, জলবায়ু পরিবর্তনে কমে গেছে পূর্ববর্তী বছরগুলোর তুলনায় গড় বৃষ্টিপাত। একদিকে অস্বাভাবিক জোয়ারে বাঁধের নাজুক পরিস্থিতি, অন্যদিকে পানযোগ্য পানির অভাবে চিন্তা বাড়িয়েছে উপকূলীয় মানুষগুলোর। এছাড়া, পানির চাহিদা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার হচ্ছে। পানি সম্পদের ওপর চাপ বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর উষ্ণতা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পায়; যা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়ায় গভীর নলকূপগুলোতেও পানির দেখা মিলছে না। অনেকে আবার বৈদ্যুতিক শক্তি ব্যবহার করে পানি উত্তোলন করলেও আর্সেনিক সমস্যা সে প্রচেষ্টায় বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে পানযোগ্য একটু পানির খোঁজে উপকূলীয় মানুষজন কলসি, বোতল, ড্রাম নিয়ে নৌকা বা ভ্যান যোগে দূরদূরান্তে ছোটে। আবার খাবারের পর তারা হাত ধোয়ার পানিটুকুও আলাদা পাত্রে রক্ষিত করে ব্যবহার করতে হয়। অনেক পরিবার কাছে ভরসা পুকুরের পানি।
দেশের উপকূলের চারদিকে পানির অভাব নেই, কিন্তু লবণাক্ততা বেড়ে ও সুপেয় পানির অভাবে ওই অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ পড়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। নিত্য ব্যবহার্য কাজে লবণাক্ত পানি ব্যবহারের কারণে ছড়িয়ে পড়ছে রোগব্যাধি। পেটের পীড়া, অ্যালার্জিসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে নারী, শিশু থেকে বৃদ্ধসহ সব বয়সের মানুষ। লবণাক্ত পানিতে নানা চর্মরোগসহ দূর থেকে পানি আনায় শারীরিক বিভিন্ন ঝুঁকিও আছে, বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে। মানুষের শরীরে নির্দিষ্ট পরিমাণ লবণের প্রয়োজন, যা আসে খাদ্য ও পানি থেকে। কিন্তু উপকূলীয় এলাকার পানিতে লবণের পরিমাণ অনেক গুণ বেশি। এই পানি শরীরে প্রবেশ করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের জন্য তা হয়ে ওঠে আরও বেশি বিপজ্জনক। গর্ভাবস্থায় নারীরা বেশি লবণাক্ত পানি খেলে খিঁচুনি ও উচ্চ রক্তচাপ হয়। এ কারণে নারীদের গর্ভাবস্থায় সন্তান মারা যাওয়ার সম্ভবনা থাকে। এ ছাড়া বেশি লবণ খাওয়ার সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্ক রয়েছে, যা হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। শুধু লবণাক্ততাই নয়, বিশ্বজুড়ে পানির নতুন বিপদ হিসেবে অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার সমস্যাকে সামনে আনা হয়েছে। একই সঙ্গে রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও আর্সেনিকের কারণে পানিদূষণের বিষয়টি উঠে এসেছে। বলা হয়েছে, এসব সমস্যা বিশ্বের সুপেয় পানির উৎসগুলোকে বিষিয়ে তুলছে।
দেশের উপকূলীয় এলাকার সুপেয় পানির ক্ষেত্রে এই নাজুক পরিস্থিতি উত্তরণ না হলে সংকট আরো বাড়বে। স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত দেশের জলাভূমি কমেছে ৭০ ভাগ। অনেক নদ নদীও শুকিয়ে গেছে। সারাদেশে কমপক্ষে আট হাজার কিলোমিটার নৌপথ ইতোমধ্যেই হারিয়ে গেছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বন্ধে পাকিস্তান আমল থেকে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তার মধ্যে বেড়িবাঁধ উল্লেখযোগ্য। কিন্তু সিডর ও আইলার পর অনেক স্থানেই সেই বাঁধ ভেঙে গেছে। উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেতে মূলত দু’টি প্রাকৃতিক কারণকে দায়ী করা হয়। এক. জোয়ারের সময় লবণযুক্ত পানি জমিতে প্লাবিত হয়ে; দুই. ভূগর্ভস্থ লবণাক্ত পানি কৈশিক রন্ধ্র দিয়ে মাটির উপরে চলে আসা। শুকনো মৌসুমে লবণাক্ত পানি জোয়ারে এসে বহু জমি তলিয়ে দেয়। এ পানি সেচ কাজে ব্যবহার করা হলে মাটি বা জমি আরো লবণাক্ত হয়। অন্যদিকে বর্ষা শেষ হলে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাস হতে মাটি শুকাতে শুরু করে। এর ফলে মাটিতে অনেক ফাটল সৃষ্টি হয়। যখন মাটির উপরে রোদ পড়ে তখন মাটির উপরিস্তর হতে পানি বাষ্পীভূত হয়ে উড়ে চলে যায় এবং ভূগর্ভস্থ লবণাক্ত পানি ঐ ফাটল দিয়ে ভূমির উপরিস্তরে চলে আসে। তখন জমির উপরিস্তর লবণাক্ততায় আক্রান্ত হয়। এছাড়া মনুষ্য সৃষ্ট কারণেও লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায়। চিংড়ি চাষের জন্য স্থানীয় প্রভাবশালীরা বাঁধ কেটে ঘের এলাকায় লবণপানি উত্তেলন করেন। এতে গুটিকয়েক ঘের ব্যবসায়ী লাভবান হলেও এলাকার বেশির ভাগ বাসিন্দার জীবন-জীবিকা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এইসব প্রতিকূলতা ছাড়াও উপকূলীয় এলাকায় আরও অনেক প্রতিকূলতা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনেক বেশি ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস হয়ে থাকে। দুর্বল পোল্ডার ও স্লুইচ গেট যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে সময়ে-অসময়ে লবণাক্ত পানি ফসলি জমিতে প্রবেশ করে। উপকূলীয় এ জনগোষ্ঠী তাই জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার আশা হিসেবে তাকিয়ে থাকে তাই রাষ্ট্রীয়ভাবে দীর্ঘমেয়াদি কোনো উদ্যোগের দিকে। পানিকে মৌলিক অধিকার এবং জনগুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে চিহ্নিত করে এ খাতে প্রয়োজনীয় ন্যায্যতাভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষ করে নদী ভাঙন এলাকা, লবণাক্তপ্রবণ এবং ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকার সুবিধা বঞ্চিত জনগোষ্ঠির সুপেয় পানি নিশ্চিতকরণে ব্যাপক কর্মসূচি ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এখনই গ্রহণ করতে হবে। উপকূলীয় এলাকার জমিতে লবণাক্ততা ঢোকা বন্ধে সমাধান বের করতে হবে। এ উদ্দেশ্য সাধনে গবেষকদের পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা প্রদান করে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। এছাড়া জলবায়ুসহিষ্ণু প্রযুক্তির প্রসারে পৃষ্ঠপোষকতা করার পাশাপাশি এ খাত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করতে হবে। উপযুক্ত আকারের বাঁধ স্থাপনের মাধ্যমে লবণাক্ত পানি জমি রক্ষা করা যেতে পারে। প্রস্তাবিত আকার উচ্চ জোয়ার স্তর থেকে এক মিটার উঁচু হওয়া উচিত। এছাড়া, অতিরিক্ত পানি অপসারণ এবং উচ্চ জোয়ারের সময় লবণাক্ত পানিতে প্রবেশ রোধ করার জন্য বাঁধ ব্যবস্থায় স্লুইচ গেটের ব্যবস্থা করা দরকার। অগভীর ভূগর্ভস্থ পানির টেবিলগুলিসহ নি¤œ-পাত্রে জলাবদ্ধতা রোধ করতে এবং অতিরিক্ত পানির অভিন্ন নিকাশনের সুবিধার্থে জমি সঠিকভাবে সমতল করা উচিত। সেইসাথে সকল নদী দখলদারদের হাত থেকে মুক্ত করে বিলীন হয়ে যাওয়া নদীপথগুলোকে আবারো প্রশস্ত করার মধ্য দিয়ে পানির ধারণক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। এছাড়া, সরকারি পর্যায়ে বড় রকমের প্রকল্প হাতে নিয়ে উপকূলীয় এলাকার মানুষের সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে। গভীর পুকুর খনন করে এবং সেগুলোর চারপাশে যথাযথ উঁচু বাঁধ নির্মাণ করে লবণাক্ত পানি প্রবেশে বাধা দিয়েও মিষ্টি পানি নিশ্চিত করা যায়। এতে শুধুমাত্র বর্ষার পানি জমা হবে। এছাড়া সরকারের গৃহীত নানান পদক্ষেপ, যেমন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য বড় বড় রিজার্ভার সরবরাহ করা যেতে পারে। ব্যক্তি পর্যায়ের পাশাপাশি পাড়া ও গ্রামভিত্তিক এসব প্রকল্প হাতে নেওয়া যেতে পারে। তবে ব্যক্তি পর্যায়ের ক্ষেত্রে অবশ্যই সুষ্ঠু বণ্টনসহ প্রকৃত ভুক্তভোগীরা যাতে উপকৃত হয় সে বিষয়ে নজরদারি করতে হবে।
বিশুদ্ধ পানির ব্যাপারে আমাদের আরো সচেতন হতে হবে। পানি যাতে দূষিত না হয় সেই উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি পানিকে আর্সেনিকমুক্ত করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। ভূগর্ভস্থ পানির উত্তোলন কমিয়ে ভূপৃষ্ঠের পানি গৃহস্থালীসহ অন্যান্য কাজে যাতে সর্বাধিক ব্যবহার করা যায়, সেদিকে নজর দিতে হবে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর উদাহরণ এক্ষেত্রে অনুসরণ করা যায়। সমুদ্র ও নদনদীকেও দূষণের কবল থেকে মুক্ত করতে হবে। শিল্প ও রাসায়নিক বর্জ্য যাতে নদী এবং সাগরে না ফেলা হয়, তার ব্যবস্থা করতে হবে। গবেষকরা অনেক আগেই সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে, পানি সংকট আগামীতে আরও ঘণীভূত হবে এবং ভবিষ্যতে যদি কোনো বিশ্বযুদ্ধ বাঁধে, তবে তা হবে পানি নিয়ে। বিশ্বের সকল দেশেই বিশুদ্ধ পানি সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের দেশে পানি ও পানি ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সকলের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট