
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সুন্দরবনের খাল ও নদীতে নজরদারির অভাবে কীটনাশক দিয়ে মাছ শিকার বন্ধ হচ্ছে না। সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, জেলে নামধারী সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্তরা বনবিভাগের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা ও সদস্যদের ছত্রচ্ছায়ায় অবৈধভাবে কীটনাশক প্রয়োগ করে মাছ শিকার করছে। এর ফলে মৎস্যসম্পদ ও জলজ প্রাণী হুমকির মুখে।
অন্যদিকে বিষ প্রয়োগে ধরা এসব মাছ যাচ্ছে শহরের বিভিন্ন আড়তে। এতে মৃত্যুঝুঁকির আশঙ্কা বাড়ছে। এভাবে মাছ ধরায় মৎস্য সম্পদ ধ্বংসের পাশাপাশি অসংখ্য সাধারণ জেলের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষ দিলে মাছের সঙ্গে সব প্রজাতির জলজ প্রাণীই মারা যায়। এটা জীববৈচিত্রের জন্য খুবই মারাত্মক। পরিবেশের ওপর যেমন বিরূপ প্রভাব পড়ে অন্যদিকে বিষে মরা ওই মাছ খেয়ে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে মানুষসহ অন্যান্য প্রাণী। কীটনাশক বা বিষ যেখানে প্রয়োগ করা হয়, সেখানে ছোট-বড় সব প্রজাতির মাছ মারা যায়। দুষ্কৃতকারীরা সেখান থেকে শুধু বড় মাছগুলো সংগ্রহ করে। ছোট মাছগুলো তারা নেয় না। কিন্তু এই ছোট মাছগুলো ছিল বড় মাছের খাবার। ফলে ওই এলাকার খাদ্যচক্রেও ব্যাপক প্রভাব পড়ে। আবার এই কীটনাশকমিশ্রিত পানি ভাটার টানে যখন গভীর সমুদ্রে যায়, তখন সেই এলাকার মাছও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সুন্দরবনের বেশ কয়েকজন জেলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই প্রতিবেদককে বলেন, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগে মাছ ধরা বেড়েছে। সুন্দরবনের কোলঘেঁষে বসবাস বিপুলসংখ্যক মানুষ জীবিকার জন্য মাছ ধরা, গোলপাতা ও মধু আহরণসহ নানাভাবে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। কিছুদিন ধরে অসাধু মাছ শিকারি স্থানীয় টহল ফাঁড়ির বন কর্মচারীদের সঙ্গে আঁতাতের মাধ্যমে সুন্দরবনের আওতায় বিভিন্ন খালে বিষ প্রয়োগে অবাধে মাছ শিকার করছে।
জেলেরা বলেছেন, সুন্দরবনে সরকারি পাশ-পারমিটের রাজস্ব ২৪ টাকা ৫০ পয়সা। সেখানে কালাবগি স্টেশনে জনপ্রতি নেয়া হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। নৌকায় তিনজন হলে ২ হাজার টাকা দিতে হয়। চারপাটা ও খেপলা জালে ২ জনে ১ হাজার ও বেন্দি জালের জন্য জনপ্রতি ৩ হাজার টাকা করে দিতে হয়। বিএলসি নবায়নে ৭৫ থেকে ১১০ টাকা রাজস্ব প্রদানের নিয়ম হলেও ২ হাজার টাকা করে নেয় বন বিভাগের কর্মকর্তারা।
উপকূলীয় এলাকা ও বন বিভাগের লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দুর্বৃত্তরা বনে প্রবেশের সময় নৌকায় বিষাক্ত কীটনাশক নিয়ে যায়। পরে জোয়ারের আগে কীটনাশক চিড়া, ভাত বা অন্য কিছুর সঙ্গে মিশিয়ে নদী ও খালের পানির মধ্যে ছিটিয়ে দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিভিন্ন প্রজাতির মাছ কীটনাশকের তীব্রতায় নিস্তেজ হয়ে পানিতে ভেসে ওঠে। তারা ওই মাছ উঠিয়ে প্রথমে স্থানীয় আড়তে নিয়ে যায়। বিভিন্ন বাজারসহ বিভিন্ন শহরে বাস-ট্রাক ও পিকআপযোগে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। অথচ মাছে কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করার কোনো পরীক্ষাগার বন বিভাগের নেই।
বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ এই প্রতিবেদককে বলেন, সুন্দরবনে অসাধু মাছ ব্যবসায়ী ও জেলে বিষ দিয়ে মাছ শিকারের সাথে সম্পৃক্ত। প্রায় সময়েই অভিযান চালিয়ে এদের গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু তারা দ্রুত আদালত থেকে জামিনে এসে আবার একই কাজ করে। গ্রেফতারের পর কেন দ্রুত জামিনের বেরিয়ে আসে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষ দিয়ে শিকার করা মাছ শনাক্ত করার মেশিন আমাদের কাছে নেই। তাই এ বিষয়ে প্রমান আদালতে উপস্থান করা যায় না।
বিষ দিয়ে মাছ শিকার ও এ প্রক্রিয়ার সাথে বন বিভাগের কতিপয় কর্মকর্তা ও সদস্য সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে আইনগত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়। তবে অভিযোগ একেবারেই কম বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বন বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেন, বিষ দিয়ে মাছ ধরায় জেলেদের অনেকই একাধিকবার গ্রেফতার হয়েছে। কিন্তু তথ্য প্রমানের অভাবে দ্রুত জামিনে বেরিয়ে এসে আবার একই কাজে জড়িয়ে পড়ে। প্রভাবশালী ব্যক্তি এদের জামিন প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে বলে ওই কর্মকর্তা মন্তব্য করেন।
সুন্দরবনের স্থানীয় জেলেদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পশ্চিম সুন্দরবন খুলনা রেঞ্জ বনবিভাগের গেওয়াখালী, পাতকোষ্টা, ভোমরখালী, চিন্তামণি, কালিরখাল, ছেঁড়া, ঝঁপঝঁপিয়া ও মুচিখালীসহ বিভিন্ন খালে বিষ ঢেলে মাছ ধরা হচ্ছে। পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই ও শরণখোলা এই দুই রেঞ্জেই এক দশক ধরে এই সর্বনাশা কর্মকাণ্ড চলে আসছে।
তবে চাঁদপাই রেঞ্জেই মৎস্যদস্যুদের অপতৎপরতা তুলনামূলক বেশি। এ রেঞ্জের জোংড়া, ঢাংমারী, বৈদ্যমারী, জয়মনী, কাটাখালী, জিউধরা, নন্দবালা, ঘাগরামারী, হারবাড়িয়া, শুয়ারমারা, হরিণটানা, নলবুনিয়া, আন্ধারমানিক, মরা পশুর, ঝাঁপসি, লাউডোব ও সংলগ্ন নলিয়ান রেঞ্জের কালাবগী, ঝনঝনিয়া, হলদিখালী, টেংরামারী, ভদ্রা, কোরামারীসহ বনের আশপাশ এলাকার বিভিন্ন খাল ও নদী এলাকায় এখন কীটনাশক বা বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরা হচ্ছে।
সুন্দরবনের অধিবাসীদের অন্যতম জীবিকা নদীতে মাছধরা।
সুন্দরবনের সামগ্রিক মাছের ওপর পূর্বাপর কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়নি। ফলে মাছের বর্তমান অবস্থা, বিলুপ্ত মাছ, বিলুপ্তপ্রায় মাছের ওপর উপাত্তনির্ভর তথ্য পাওয়া যায় না। শুধু, মানুষ যেসব মাছ খায় এবং যেসব মাছ রপ্তানি উপযোগী, সেসব মাছ চিহ্নিত করা হয়েছে। ধারণা করা হয়, সুন্দরবনে শিরদাঁড়াওয়ালা মাছ রয়েছে প্রায় ৩০০ প্রজাতির। সাইডেনস্টিকার ও হাই-এর (পরিপ্রেক্ষিত ১৯৭৮) মতে, এর মধ্যে বাণিজ্যিক মাছ ১২০ প্রজাতির; অবশ্য বার্নাকসেকের মতে, (২০০০) বাণিজ্যিক মাছ ৮৪ প্রজাতির, কাঁকড়া-চিংড়ি ১২ প্রজাতির ও ৯ প্রজাতির শামুক রয়েছে।
সুন্দরবনে মৎস্যসম্পদকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। সব মাছ মিলিয়ে হয় সাদা মাছ, বাকিরা বাগদা, গলদা, কাঁকড়া।
আশির দশকে চিংড়ির পোনা ধরা শুরু হওয়ার পর মাছের প্রাচুর্য হঠাৎ কমে যায়। একসময় স্থানীয় জনসাধারণের প্রাণিজ প্রোটিন ৮০ শতাংশ মেটাতো মাছ। এখন মাছ খাওয়ার সৌভাগ্য এলাকার খুব কম লোকের ভাগ্যে জোটে। সুন্দরবনে কালা হাঙর, ইলশা কামট, ঠুঁটি কামট, কানুয়া কামট পাওয়া যায়। আগে এদের খালিশপুর এলাকা পর্যন্ত পাওয়া যেতো, এখন (২০১০) অনেক দক্ষিণে সরে গেছে। পশ্চিম সুন্দরবনে এদের উৎপাত বেশি। এরা সংখ্যায় অনেক কমে গেছে, বিশেষ করে কালা হাঙর প্রায় দেখাই যায় না। ৯ প্রজাতির শাঁকজ বা শাপলাপাতা মাছের অধিকাংশই এখন (২০১০) সুন্দরবনের খাঁড়ি এলাকায় দেখা যায় না।
কুঁচে কা কামিলা-জাতীয় মাছের পাঁচটি প্রজাতির সাগর কুইচ্চা ও ধানি কুইচ্চার অবস্থা খুবই খারাপ। আগের দিনে বাম মাছের মতো দেখতে এই মাছগুলো স্থানীয় লোকজন খেত না। এখনো খায় না। তবে হাজার হাজার কাঁকড়া মারা জেলে কুইচ্চা মাছের টুকরো কাঁকড়া ধরার টোপ হিসেবে ব্যবহার করে। শীতকালে সাগরপারের জঙ্গলি খালে পূর্ণ জোয়ারের প্রায় স্বচ্ছ জলে আর্চার ফিশ বা তীরন্দাজ মাছ দেখা যেতো। তিতপুঁটি মাছ আকারের এই মাছগুলো জলের এক-দেড় ফুট ওপরে গাছের পাতা বা ডালে পিঁপড়ে কিংবা মধ্যম আকৃতির বিভিন্ন পতঙ্গ দেখে পিচকারীর মতো তীব্র জল ছিটিয়ে পোকাটিকে ভিজিয়ে জলে ফেলে খেয়ে নেয়। এই মাছ পূর্ণবয়সকালে ফুটখানেক লম্বা হয়। এই মাছগুলো আজকাল আর দেখি না। একসময় জাভা মাছের খুব নাম শোনা যেতো, এরা ৫৫ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। এখন (২০১০) দেখা পাওয়া ভার। পায়রাতলী বা চিত্রার মতো অত্যন্ত সুস্বাদু মাছ আজকাল জেলেদের জালে খুব কম পড়ছে।
সুন্দরবনের সবচেয়ে পরিচিত মাছ পারশে মাছ। ১৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা এ মাছটি জঙ্গলের সর্বত্র প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেতো। এখনো পাওয়া যায় খুব কম। পারশেরই জাতভাই বাটা ভাঙান। ভাঙান, গুল বাটা, খরুল ভাঙান আজকাল খুব কম ধরা পড়ে। খরশুলা বা খল্লা অত্যন্ত সুস্বাদু মাছ; বনের নদী-খালে এদের তেমন আর দেখতে পাওয়া যায় না।
সুন্দরবনের কাইক্কা বা কাইকশেল মাছ স্বাদু পানির কাইক্কার চেয়ে আকারে অনেক বড় হয়। এখানকার এই ঠুঁটি কাইকশেল এখন (২০১০) খুব কম ধরা পড়ে। বিশাল আকৃতির মেদ মাছের দুটি প্রজাতি এখন বিলুপ্তপ্রায়।
মারাত্মক মাছ কান মাগুর-এর পাশের কাঁটায় মারাত্মক বিষ রয়েছে। বড় কান মাগুর এখনো (২০১০) কিছু পাওয়া গেলেও দাগি কান মাগুর এখন বিলুপ্তপ্রায়। ট্যাংরা জাতের গুলশা ট্যাংরা, নোনা ট্যাংরা এখনো কিছু পাওয়া গেলেও বিশাল আকৃতির শিলং মাছ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে এসেছে। কাজলী মাছও সহসা চোখে পড়ে না। অপূর্ব সুন্দর ভোল মাছ। সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় মাছ কই ভোল এখন ধরা পড়ে কালেভদ্রে। আগে সুন্দরবনের খালে কুৎসিত দর্শন গনগইন্যা মাছ বড়শিতে ধরা পড়তো এখন (২০১০) তেমন একটা পাওয়াও যায় না। রেখা মাছ একসময় বেশ দেখা যেতো, ইদানীং দেখা পাওয়া যায় না।
গুটি দাতিনা এখনো (২০১০) পাওয়া গেলেও লাল দাতিনা একেবারেই বিরল হয়ে গেছে। সুন্দরবনের নদী-খাঁড়িতে মাঝ ভাটায় অত্যন্ত সুস্বাদু লাক্ষা মাছ (স্থানী নাম তাড়িয়াল মাছ: Indian Salmon) দারুণ আলোড়ন তুলে ছোট, মাঝারি পারশে, দাতিনা মাছ তাড়িয়ে বেড়ায়। এরা আকারে প্রায় চার ফুট লম্বা হয়। এদের মতোই তপসে মাছের (স্থানীয় নাম রামশোষ) আকাল দেখা দিয়েছে (২০১০)। জেলেরা অন্তত পাঁচ প্রজাতি চেউয়া মাছ ধরে বড় নদীতে। এর মধ্যে লাল চেউয়া বিপন্ন হয়ে উঠেছে। সুন্দরবন তথা পৃথিবীর সব ক্রান্তীয় ম্যানগ্রোভ বনের প্রতীক মাছ হলো মেনো মাছ (Mud Skipper), কোথাও ডাহুক মাছ নামেও পরিচিত। বনে এদের পাঁচটি প্রজাতি দেখতে পাওয়া যায়। প্রজাতিভেদে এরা ৯ থেকে ২২ সেন্টিমিটার লম্বা হয়।
বনের বলেশ্বর, কুঙ্গা নদীতে যথেষ্ট ইলিশ ধরা পড়ে। দুই প্রজাতির ইলিশের মধ্যে চন্দনা ইলিশ কম পাওয়া যায় (২০১০)। ৪ প্রজাতির ফ্যাসা মাছের মধ্যে রাম ফ্যাসা কম পাওয়া যায় (২০১০)। বৈরাগী মাছের সংখ্যাও কমেছে। সুন্দরবনের ভেতর পোড়ামহল, আন্ধারমানিক, জোংরা, শুবদি-গুবদি এলাকার মাঝারি আকারের বিলগুলোতে বর্ষায় পানি আটকে যায়, কোথাও জোয়ারের পানি ঢোকে। এই বিলগুলোর পানি মিঠা, এখানে মিঠাপানির মাছ পাওয়া যায়। বেশির ভাগ জিওল মাছ। কই, শিং, মাগুর, দুই প্রজাতির টাকি, শোল ছাড়াও ছোট ট্যাংরা, পুঁটি, খলসে, চ্যালা, দাঁড়কিনা, কুঁচো চিংড়িসহ নানা মাছ পাওয়া যায়। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে এসব বিলে লোনা পানি ঢুকছে। এই বিলগুলোর মাছ তাই শেষ হওয়ার দিন গুনছে।
সুন্দরবনে বর্তমানে (২০১০) ১৩ ধরনের পদ্ধতিতে মাছ ধরা হয়। ঠেলা জাল, রকেট জালের ছিদ্র খুব ছোট হওয়ায় চারা মাছ এবং মাছের ডিম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সুন্দরবন এলাকায় জেলে বাড়ায় মৎস্যসম্পদ দ্রুত কমে যাচ্ছে। তবে বিষ প্রয়োগে মাছ মারায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয।
সুন্দরবনের নদী-খালে বিষ দিয়ে মাছ শিকারের কারণে হুমকির মুখে রয়েছে মৎস্যসম্পদ। বিষ দিয়ে ধরা মাছ প্রকাশ্য মৎস্য আড়ত এবং হাটবাজারে বিক্রি হচ্ছে। দেউলিয়া বাজার মৎস্য আড়তে যেয়ে এমনি চিত্র দেখা গেছে।
সেখানে কথা হয় রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাড়িতে মেহমান এসেছে সে জন্য মাছ কাটায় গিয়েছিলাম মাছ কিনতে, কিন্তু মাছ কেনা হলো না।’ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অনেকেই বলছেন সুন্দরবনে নদী-খালে বিষ দিয়ে ধরা মাছ, সে জন্য মাছ না কিনে ফিরে এসেছি।
অথচ সুন্দরবনের নদী-খাল বিষমুক্ত করতে বনবিভাগ ইতিমধ্যে লিখিত নির্দেশনা বনবিভাগের সব অফিসে পাঠিয়েছেন। নির্দেশনায় সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ ধরা, অভয়ারণ্য প্রবেশ করে বন্যপ্রাণী শিকার বন্ধের জন্য পাশ ইসু্য করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কয়েকটি শর্ত আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু কোন শর্তই মানছেন না জেলেরা। তারা পুরাতন নিয়মে অভয়ারণ্য (নিষিদ্ধ খালে) বিষ দিয়ে মাছ ধরছে। যার ফলে হুমকির মুখে রয়েছে সুন্দরবনের মৎস্য সম্পদ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১ জুন থেকে তিন মাস সুন্দরবনে মাছ ধরা বন্ধ ছিল। গত ১ সেপ্টেম্বর সুন্দরবনে জেলেদের মাছ ধরার অনুমতি দিয়েছে বন বিভাগ। অনুমতি পেয়েই পূর্বের ন্যায় জেলেরা সুন্দরবনের নদী-খালে বিষ দিয়ে মাছ ধরা শুরু করেছেন। তিন মাসের ঘাটতি পোষাতে সুন্দরবনের নীলকোমল, ভোমরখালী, গেওয়াখালী ও কাগা দোবেকী বন টহল ফাঁড়ির কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে চুক্তি করে কালিরচর, সিসখালী, ছদনখালী, কাগান্দী, মরাবাবগা ও কেওড়াতলী খাল, ভোমরখালী কুকুমারী, বড় কুকুমারী, ভোমরখালী ও খলিশাবুনিয়া নিষিদ্ধ খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরছে জেলেরা।পূর্ণিমা ও অমাবস্যায় সন্ধ্যা নামার আগে গহিন বনে অবস্থান নেই। সন্ধ্যা নামলে অভয়ারণ্যের নদী-খালে নিস্তব্ধ অন্ধকারে তখন শুধু পানির কলকল শব্দ আর দূর থেকে ভেসে আসা কিছু মানুষের ফিসফাস শোনা যায়।
“তখনই মাছ শিকার করি।” -কথাগুলো বলছিলেন খুলনার দাকোপ উপজেলার সুতারখালি এলাকার বনজীবী জেলে মোজাম ফকির।
প্রজনন মৌসুমেও পূর্ব ও পশ্চিম সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খালে দেদার চলছে বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার। কিছু অসাধু জেলে বিষ ব্যবহার করে মাছ ধরায় বনের গহিনে থাকা বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, মাছের পোনা, অন্যান্য জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রতিনিয়ত ধ্বংস হচ্ছে।
ফলে প্রজনন মৌসুমে সুন্দরবনে মাছ ধরা পাশ পারমিট বন্ধ রাখা শুধু ‘কাগজে কলমে’ সীমাবদ্ধ থাকছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রতি বছর ১ জুন থেকে ৩১ অগাস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়। এ সময় সুন্দরবনে সাধারণ মানুষের চলাচলসহ বনজীবীদের প্রবেশের পাশাপাশি পর্যটক প্রবেশেও নিষেধাজ্ঞা থাকে।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, “জুন থেকে আগস্ট-এই তিন মাস সুন্দরবনের নদী-খালের মাছের প্রজনন মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। এই তিন মাস সুন্দরবনের নদী ও খালে থাকা বেশির ভাগ মাছ ডিম ছাড়ে। এছাড়া এই সময়ে বন্যপ্রাণীরও প্রজনন মৌসুম। এই তিন মাস বনে পর্যটক ও বনজীবীরা না গেলে বনের জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী নিরুপদ্রব থাকে।”
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুন্দরবনের প্রশাসনিক অবকাঠামো খুবই দুর্বল। অধিকাংশ টহল ফাঁড়ি ভাঙাচোরা। আধুনিক অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, জলযানের অভাবে ডাকাত, চোরাশিকারির পিছু নিতে বন কর্মকর্তা-প্রহরীদের আগ্রহ কম। এ কারণে বন অপরাধী চক্রের সঙ্গে তারা মিলেমিশে থাকেন।
জনবল সংকটসহ বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও সুন্দরবনকেন্দ্রিক সব ধরনের অপরাধ দমনে বন কর্মকর্তা ও প্রহরীরা সচেষ্ট রয়েছেন বলে দাবি খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিস্টার ইমরান আহমেদ।
এছাড়া সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ উপকূল এবং নদীর মোহনায় ‘নেট জাল’ দিয়ে চিংড়ির পোনা ধরছেন স্থানীয়রা। জালগুলো মশারির মতো প্রায় নিশ্ছিদ্র। এতে চিংড়ির সঙ্গে নানা জাতের মাছের রেণু, পোনা, ডিমওয়ালা মা মাছ ও মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য-সামুদ্রিক প্রাণীর লার্ভাও মারা পড়ছে।
সব মিলিয়ে হুমকির মুখে পড়েছে বনের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ।
তবে বিষ দিয়ে মাছ শিকারের প্রবণতা ঠেকাতে ‘ড্রোন দিয়ে নজরদারি’ করা হচ্ছে বলে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী জানিয়েছেন।
‘পূর্ব’ ও ‘পশ্চিম’ এই দুটি প্রশাসনিক বিভাগে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশ বিভক্ত। খুলনা ও সাতক্ষীরা অংশ নিয়ে পশ্চিম সুন্দরবন। আর বাগেরহাট ও খুলনার সামান্য অংশ নিয়ে পূর্ব সুন্দরবন।
সুন্দরবনের এই দুই বিভাগের খুলনার কয়রা, পাইকগাছা ও দাকোপ, বাগেরহাটের মোংলা, শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বেশিরভাগ বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবন সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। তাদের প্রায় অধিকাংশই বংশপরম্পরায় বনজীবী এবং সুন্দরবনসংলগ্ন নদ-নদীতে সারা বছর মাছ-কাঁকড়া ধরে এবং বনে গোলপাতা ও মধু আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
সুন্দরবন লাগোয়া এসব গ্রামগুলোর পুরুষরা সুন্দরবনে মাছ ধরা, গোলপাতা কাটা, কাঁকড়া ধরা ও মধু আহরণ করেন। আর নারী ও শিশুরা ব্যস্ত থাকেন চিংড়ির পোনা ধরা ও কাঠ সংগ্রহের কাজে। কিন্তু বর্তমানে নানা সংকট এসব বনজীবীদের জীবন-জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো বনের নদী-খালে বিষ দিয়ে মাছ ধরার প্রতিযোগিতা। এই অপতৎপরতার পেছনে কাজ করছে প্রভাবশালী কয়েকটি গোষ্ঠী। একটি গোষ্ঠী বন উপকূলের একশ্রেণির মাছ ব্যবসায়ী, যাদের বলা হয় ‘কোম্পানি মহাজন’। তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রিত জেলেদের প্ররোচনা দেন বিষ ছিটিয়ে দ্রুত বেশি মাছ শিকারে। আরেক গোষ্ঠী হলো অসাধু বনরক্ষী। কোম্পানি মহাজনদের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে তারা অভয়ারণ্যের নদী-খালে ঢুকে বিষ ছিটিয়ে মাছ ধরার সুযোগ করে দেন। এসব চক্রকে সহযোগিতা করছেন এক শ্রেণির সাংবাদিক।
বনজীবীদের ভাষ্য, সুন্দরবনে সারা বছরই কিছু অপরাধ কর্মকাণ্ড চলে। বিশাল এ বনের সবখানে সারা বছরই তারা সক্রিয় থাকেন।
খুলনার সুন্দরবন ঘেঁষা কয়রা উপজেলার তেঁতুলতলার চর এলাকার বনজীবী গফুর গাজী বলেন, জঙ্গল ব্যবসায়ী ‘মহাজনদের’ (যারা বনভূমি থেকে সম্পদ আহরণ করে ব্যবসা করে) টাকা দিয়ে তারা বনের অভয়ারণ্যের নদ-খাল ইজারা নেন। বন কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করেন মহাজনরা। তবে বন্ধের সময় তাদের টাকা ‘বেশি’ দিতে হয়।
“আর বনের প্রহরীদের সঙ্গে আমরা সমঝোতা করে নেই। প্রহরীরা না চাইলে বনের একটা খালের পানিও জেলেদের ছোঁয়ার ক্ষমতা নেই। বন বিভাগের লোকজন ডিউটি খরচের নামে বন ফাঁড়িতে আমাদের কাছ থেকে সারা বছরই সমানে টাকা আদায় করে।”
চাহিদামত টাকা না পেলে ভোর হতেই দালালদের মাধ্যমে বন বিভাগের লোকেরা ট্রলারে এসে রাতভর ধরা মাছ নিয়ে যায়। এসব বিষয়ে প্রতিবাদ করলে ধরে নিয়ে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ বনজীবী গফুর গাজীর।
তিনি বলেন, “বনের অন্য সব খালের চেয়ে অভয়ারণ্যে বেশি মাছ পাওয়া যায়। যে কারণে অভয়ারণ্যের খাল দখল নিয়ে স্থানীয় মহাজনদের মধ্যে ‘প্রতিযোগিতা’ রয়েছে। মহাজনরা দালালদের মাধ্যমে বন বিভাগকে ‘মোটা অংকের টাকা দিয়ে’ অভয়ারণ্যের খাল দখল নেন। পরে তা জেলেদের কাছে চুক্তিতে ইজারা দেওয়া হয়।
“তবে বিপত্তি বাধে যখন বড় ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ‘বেশি টাকা’ নিয়ে ছোট ব্যবসায়ীদের ওই এলাকা থেকে সরিয়ে দিতে জেলেদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়, তখন।”
সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু, দুর্যোগ, সুন্দরবন সুরক্ষা ও শিক্ষা সহায়তা বিষয়ে নিয়ে কাজ করা কয়রা সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি তারিক লিটু বলেন, “সুন্দরবনসংলগ্ন জনপদের কিছু প্রভাবশালী বন বিভাগকে ম্যানেজ করে অভয়ারণ্য এলাকাতে সারা বছরই বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার করেন। এমনি হরিণসহ বন্যপ্রাণী নিধনও থামানো যায়নি।”
সুন্দরবন সুরক্ষায় বনে প্রবেশাধিকার আরও সংরক্ষিত, বনের ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ এবং বন বিভাগের জনবল, লজিস্টিক সাপোর্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের অবশ্যই সততা থাকতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
একই সঙ্গে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার প্রভাবশালী অসাধু মাছ ব্যবসায়ী আড়তদার মহাজনদের তালিকা করে তাদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান তিনি।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, “জনবল সংকটসহ বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও সুন্দরবনকেন্দ্রিক সব ধরনের অপরাধ দমনে সচেষ্ট রয়েছেন বন কর্মকর্তা ও প্রহরীরা। প্রায়ই কীটনাশক, কীটনাশক প্রয়োগে ধরা মাছ, নিষিদ্ধ ঘন জাল ও হরিণ শিকারের ফাঁদ, মাংসসহ অনেককে আটক করা হচ্ছে। ধ্বংস করা হচ্ছে গহিন বনে বানানো শুঁটকির মাচা।”
“তবে টহল বোটের শব্দ পেলেই অপরাধীরা পালিয়ে যায়।” যোগ করেন তিনি।
সুন্দরবনের সাধারণ জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘প্রবেশ নিষেধাজ্ঞার’ সময়টাতে বনঅপরাধ বেড়ে যায় কয়েকগুণ। এ সময় দর্শনার্থী এবং সাধারণ জেলেরা না থাকার সুযোগে একাধিক অপরাধী চক্র বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
খুলনার সুন্দরবন প্রভাবিত দাকোপ উপজেলার সুতারখালি এলাকার বনজীবী জেলে মোজাম ফকির বলছিলেন, সুন্দরবনের অভয়ারণ্যের নদী-খালে বিষ দিয়ে মাছ ধরা এখন সাধারণ ব্যাপার হয়ে গেছে। গত কয়েক বছর ধরে এ প্রবণতা বেড়েছে।
“সুন্দরবনে এখন মাছ ধরতে গেলে কোম্পানি মহাজনদের তালিকাভুক্ত হতে হয়। ওই চক্রের বাইরে কোনো বনজীবী জেলে সুন্দরবনে মাছ ধরতে গেলে বন কর্মকর্তা-প্রহরী বা পুলিশ দিয়ে মাছসহ ধরিয়ে দেওয়া হয়।”
মোজাম বলেন, “বন বিভাগের স্থানীয় অফিস থেকে প্রথমে জেলেদের নামে বিএলসি নেন ‘জঙ্গল’ ব্যবসায়ী মহাজনরা। জেলেদের নামে বন বিভাগের বিএলসি নিলেও নিয়ন্ত্রণ থাকে মহাজনের হাতে। দাদন ও ভাড়ার ফাঁদে ফেলে তারা জেলেদের পাঠান প্রবেশ নিষিদ্ধ অভয়ারণ্যে বিষ দিয়ে মাছ ধরতে।”
সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনের বনজসম্পদ আহরণে অবৈধ ও অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করার এ পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলছেন, সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষায় কর্মরত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা ফাউন্ডেশন’-এর মিডিয়া সমন্বয়ক ওবায়দুল কবির সম্রাট।
সম্রাট বলেন, “আগে দেখা যেত, অভয়ারণ্য এলাকায় একটি-দুটি দল বিষ দিয়ে মাছ ধরত; তারা মৎস্যজীবী ছিলেন। কিন্তু এখন সেখানে দাদনদাতা হয়ে গেছেন সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী মাছ ব্যবসায়ী মহাজন। তারাই এখন বনবিভাগের সঙ্গে রফা করেন। পরবর্তীতে বনের অভয়ারণ্যের বিভিন্ন নদী-খাল জেলেদের কাছে অলিখিত ইজারা দেন। এসব চক্র অবৈধ নানা উপায়ে সুন্দরবনের বনজসম্পদ আহরণ ও পাচারে জড়িত।”
তিনি বলেন, “বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-প্রহরীদের যোগসাজশে পশ্চিম সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে খুলনার কয়রা ও দাকোপ এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগরকেন্দ্রিক কয়েকটি চক্র গড়ে উঠেছে। আরও কয়েকটি চক্র রয়েছে পূর্ব সুন্দরবনের বাগেরহাটের মোংলা, শরণখোলা ও মোরেলগঞ্জকেন্দ্রিক। অসাধু কিছু বন কর্মকর্তা-প্রহরী বছরের পর বছর সুন্দরবনের একই এলাকায় দায়িত্ব পালন করায় এসব চক্রের সঙ্গে মিশে রয়েছেন। এদের সহযোগিতা করছেন স্থানীয় একশ্রেণির সংবাদকর্মী।
“বিষ, নিষিদ্ধ ঘন জাল বা হরিণ শিকারের ফাঁদসহ কেউ ধরা পড়লে ওই চক্রের কারও নাম প্রকাশ করতে চায় না। কারণ ওরাই আবার তাদের মুক্ত করে আনে। এ কারণে মূল অপরাধী চক্র বরাবরই থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এসবের পেছনে টাকা, প্রভাব আর দায়মুক্তির চুক্তি কাজ করে।”
তবে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সুন্দরবনে প্রবেশ করে মাছ-কাঁকড়া ধরা বা বন্যপ্রাণী শিকারের কোন সুযোগ নেই দাবি করে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, “সুন্দরবনে সারা বছরই বন বিভাগের নিয়মিত জোরালো টহল অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ‘প্রবেশ নিষেধাজ্ঞার’ মাঝেই পশ্চিম সুন্দরবনের গহিন বনের নীলকোমল স্টেশনের আওতাধীন বালুরগাং, আমড়া তুলি, নীলকোমল অফিস খাল, বঙ্গবন্ধু চর, পুনতি দ্বীপ, কেঁড়ড়াসুটি, ভোমরখালীর আওতাধীন বয়ার শিং, ভোমরখালি অফিস খাল, পাটকোস্টার আওতাধীন মোরগখালী, চেরাগাখি, পাটকোস্টা অফিস খাল, কাশিয়াবাদের আওতাধীন নলবুনিয়া, বজবজা, খাসিটানা, ছোটো দুখমুখি, বড় দুধমুখি, পিনখালি, চালকি, কালাবগির আওতাধীন আদাচাই, অফিস খাল, মামার খাল, গেওয়াখালীসহ অন্যান্য খাল ও ভারানিতে ২০০-২৫০টি নৌকায় চিংড়ি ও বিভিন্ন প্রজাতির মাছ শিকার করেন ‘একদল জেলে’।
ওইসব এলাকার বনজীবী জেলেরা বলছেন, সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার মাছ ব্যবসায়ী মহাজনদের হয়ে সারা বছরই মাছ ধরেন তারা। ওইসব মাছ ভোরে কয়রার বেদকাশির ফুলতলা, চাঁদালি, শ্যামনগরের নওয়াবেকী, গাবুরা, প্রতাপনগর, দাকোপের নলিয়ান ও সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে মোংলায় বিভিন্ন আড়তে বিক্রি করা হয়।
জেলেদের ভাষ্য, স্থানীয় লোকজন এসব মাছ খায় না। এসব মাছ থেকে বিশেষ করে চিংড়ি থেকে ‘বিষের উৎকট গন্ধ’ আসে। ফলে এগুলো চলে যাচ্ছে ঢাকাসহ অন্য বড় শহরে। বড় রেস্তোরাঁ, নামিদামি সুপারশপের পাশাপাশি অনলাইনে সুন্দরবনের মাছ এবং শুঁটকি বলে ব্র্যান্ডিং করেও বিক্রি হয়।
সুন্দরবন ঘেঁষা কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের আনোয়ার হোসেন নামের এক জেলে বলেন, “বিষ দিয়ে ধরা চিংড়ি সরাসরি লোকালয়ে আনা হয় না। স্থানীয় শুঁটকির ফড়িয়ারা গোপনে জেলেদের কাছ থেকে কম দামে এসব চিংড়ি কিনে সুন্দরবনের সন্নিকটে কয়েকটি উপজেলায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ‘খটিঘরে’ আগুনে শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করে চড়া দামে বিক্রি করেন।
“বিষ দিয়ে ধরা চিংড়ি থেকে বিষের গন্ধ আসে-লোকালয়ে আনা যায় না। যে কারণে বনের মধ্যেই এখন চিংড়ি শুকানোর ব্যবস্থা করা হয়। প্রতি কেজি শুঁটকি ১ হাজার ৫০
কাগাদোবেকী বন টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসএম আবু সাইদ বলেন, ‘আমরা কোন সহযোগিতা করি না। বরং অভয়ারণ্য যাতে কেউ মাছ ধরতে না পারে সে জন্য বনবিভাগের লোকজন সতর্ক রয়েছে।’ কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের স্টেশন কর্মকর্তা নির্মল চন্দ্র মন্ডল বলেন, ‘কোন জেলে সুন্দরবনের নদী-খালে বিষ দিয়ে মাছ ধরতে না পারে সে জন্য বনবিভাগের পক্ষ থেকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’ সুন্দরবন পশ্চিম বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাসানুর রহমান এই প্রতিবেদককে বলেন, সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ শিকার ও অভয়ারণ্য প্রবেশ করে বন্যপ্রাণী শিকার বন্ধের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন বন আইন শক্তিশালী করার জন্য অতি দ্রুতই নতুন আইন প্রজ্ঞাপন দাবি করা হবে সে আইনে বলা হয়েছে জামিন না যোগ্য ।