1. mesharulislammonir1122@gmail.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন
  2. info@www.sangjogprotidin.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন :
শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ০৫:২১ অপরাহ্ন

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, রক্ষা পাচ্ছে না মাতৃগর্ভের শিশুও

  • প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬৮ বার পড়া হয়েছে

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সম্প্রতি পুত্র সন্তানের মা হয়েছেন জান্নাতুন নাহার জাকিয়া। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তার সন্তানকে তিন দিন ভর্তি রাখতে হয় নবজাতকদের জন্য বিশেষায়িত একটি হাসপাতালে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার সন্তানের ওজন কম, দেখা দিয়েছে বেশ কিছু শারীরিক জটিলতাও।
জাকিয়া এই প্রতিবাদক কে বলেন, ‘আমি শাহবাগে থাকি, অফিস মহাখালী। সন্তান গর্ভে আসার পর প্রথম ৩ মাস আমি অফিস করি। সে সময় লক্ষ্য করি আমার প্রচুর শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। অফিসে আসা-যাওয়ার সময় যানবাহনের ধোঁয়া সহ্য করতে পারছিলাম না। বাসা থেকে বের হলেই আমার অস্বস্তি লাগত। তখন একদিন পত্রিকায় দেখলাম বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বাতাসের শহরের মধ্যে ঢাকাও একটি। এরপরই অফিস বন্ধ করে দিই।’
তিনি বলেন, ‘এখন চিকিৎসকরা বলছেন, তাদের ধারণা প্রথম ৩ মাসে আমি যে দূষণের শিকার হয়েছি তার কারণেই আমার গর্ভের শিশুর ক্তি হয়েছে। তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গঠনে সমস্যা হয়েছে।’
শুধু জাকিয়া নন, রাজধানীতে বসবাসকারী তার মতো অধিকাংশ মা-ই একই রকম সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। অনেকেরই সন্তান জন্মদানে সমস্যা হচ্ছে বা সন্তানের নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিচ্ছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ বায়ুর শহর এখন ঢাকা। এর প্রভাবে অনেক মায়ের গর্ভের সন্তান নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে পৃথিবীতে আসছে। একই সঙ্গে দূষণ প্রভাব ফেলছে শিশুদের সুষ্ঠু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গঠনেও। তাছাড়া বায়ু দূষণের কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই পৃথিবীতে আসছে শিশুরা (প্রি-ম্যাচিউর বার্থ), অনেক শিশুর ওজন আবার বেশ কম হচ্ছে। যা জন্ম-পরবর্তী সময়ে নানা জটিলতা তৈরি করে।
আমরা এতদিন বাংলাদেশকে ষড়ঋতুর দেশ বলতাম। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়া অদ্ভুত আচরণ করছে। এখন আর এটি ষড়ঋতুর দেশ নেই। অসময়ে বৃষ্টি হচ্ছে, বর্ষায় খরা হচ্ছে। এ ধরনের পরিবর্তন আমাদের সামাজিক অবস্থা ও খাদ্য উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব গিয়ে পড়ছে শিশুদের ওপর। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের তাপমাত্রা দিন দিন বাড়ছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রায় রোগজীবাণুর বিস্তার বেশি হয়। এটা শিশুদের সবচেয়ে বেশি এফেক্ট করে।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের চেয়ারম্যান আবু নাসের খান
যুক্তরাষ্ট্র ও সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুর মান যাচাই বিষয়ক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ‘আইকিউ এয়ার’-এর তথ্য মতে, ২২ আগস্ট দুপুর ১-২টা পর্যন্ত ঢাকায় বায়ুর মান সূচক ছিল ৯৭। ওই সময় বায়ুতে মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর সূক্ষ্ম বস্তুকণা ‘পিএম ২.৫’ প্রতি ঘন মিটারে ছিল ৩৯.৪ মাইক্রোগ্রাম। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বায়ু ‘স্পর্শকাতর গ্রুপের মানুষের (অনাগত সন্তান ও শিশু) জন্য অস্বাস্থ্যকর’
ঢাকা শিশু হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক শারাবান তাহুরা এই প্রতিবেদককে ‌বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট বায়ু দূষণের ফলে নারীদের গর্ভে থাকা শিশুরা ‘লেড পয়জনিং’-এর শিকার হচ্ছে। এর ফলে গর্ভের শিশু নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। মা যখন দূষিত বায়ুর মধ্যে থাকেন, বায়ুর মধ্যে যদি ডাস্ট বা কেমিক্যাল থাকে সেক্ষেত্রে শিশুর ওপর টেরাটোজেনিক ইফেক্ট পড়ে। মাতৃগর্ভের সন্তান বিকলাঙ্গ হতে পারে, তার হার্ট বা লাঙ্গসে অসঙ্গতি হতে পারে। অনেকসময় হার্টে ছিদ্রও হতে পারে দূষণের কারণে।’
তিনি বলেন, ‘একজন মা গর্ভবতী হওয়ার প্রথম ৩ মাসে শিশুর বিভিন্ন অঙ্গ তৈরি হয়। এই সময়টায় যদি কোনো নারী বায়ু দূষণের শিকার হয় তাহলে তার গর্ভের সন্তানের বিকলাঙ্গ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে গর্ভপাতও হতে পারে। এই সময়টা খুবই সেনসিটিভ।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অনাগত নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক প্রভাব সব বয়সী শিশুদের জন্য অভিশাপ হিসেবে এসেছে। বর্তমানে শিশুরাই এর সর্বোচ্চ মূল্য দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের উপকূলীয় ও অভ্যন্তরীণ অঞ্চলগুলোতে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের তারতম্য ব্যাপকভাবে হচ্ছে, যা খুবই উদ্বেগের। গত ৫০ বছরে দেশে দিন ও রাতে উষ্ণতার হার বেড়েছে, অসময়ে বন্যা হচ্ছে, দেখা দিচ্ছে নদী ভাঙন। এসবের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মাশুল দিচ্ছে শিশুরা।
দীর্ঘদিন এক পরিবেশে থাকার পর হঠাৎ করে পরিবর্তিত আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা শিশুদের নেই। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় ডায়রিয়া ও অন্যান্য প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি তাদের। জলবায়ুর প্রভাবে পুষ্টিহীনতায়ও ভোগে শিশুরা। দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হিসেবে শিশুদের শিক্ষাজীবন ও মানসিক স্বাস্থ্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে এই জলবায়ু পরিবর্তন।
দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা বাড়ায় নতুন নতুন রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। এক যুগ আগেও মশাবাহিত রোগ হিসেবে কেবল ম্যালেরিয়া ও ফাইলেরিয়ার কথা শোনা যেত। বর্তমানে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়ার মতো রোগ শিশুদের মারাত্মকভাবে গ্রাস করছে। সময়ে অসময়ে বৃষ্টির কারণে সর্দি-কাশির মতো রোগবালাইও বাড়ছে।
২০২১ সালে বিশ্ব ব্যাংকের প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের দায় রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯০ সালের পর থেকে প্রতি দশকে সারা বিশ্বে এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর প্রকোপ দ্বিগুণ হচ্ছে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল। ওই বছর সারাদেশে যত মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল, তার অধিকাংশই ছিল শিশু। আর ঢাকায় ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হার ছিল ৭৭ শতাংশ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট তাপমাত্রার তারতম্য আর অধিক আর্দ্রতা ডেঙ্গুর ব্যাপক বিস্তারে ভূমিকা রেখেছিল।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট বায়ু দূষণের ফলে নারীদের গর্ভে থাকা শিশুরা ‘লেড পয়জনিং’-এর শিকার হচ্ছে। এর ফলে গর্ভের শিশু নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। মা যখন দূষিত বায়ুর মধ্যে থাকেন, বায়ুর মধ্যে যদি ডাস্ট বা কেমিক্যাল থাকে সেক্ষেত্রে শিশুর ওপর টেরাটোজেনিক ইফেক্ট পড়ে। মাতৃগর্ভের সন্তান বিকলাঙ্গ হতে পারে, তার হার্ট বা লাঙ্গসে অসঙ্গতি হতে পারে। অনেকসময় হার্টে ছিদ্রও হতে পারে দূষণের কারণে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও জানায়, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল ২৪ হাজার ৩৮০ জন। মারা গেছেন ৯৫ জন। মোট আক্রান্তের অধিকাংশই ছিল শিশু।
আবহাওয়ার এই বদলের কারণে বর্ষাকালে শহরগুলোতে যেমন বাহকনির্ভর রোগের প্রকোপ বাড়ছে তেমনি শুকনো মৌসুমে বাড়ছে শ্বাসতন্ত্রের রোগ। খুলনা, সাতক্ষীরা, ভোলার মতো দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানিতে অতিরিক্ত লবণাক্ততা এবং ঘন ঘন দুর্যোগ শিশুদের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এছাড়া অতিরিক্ত গরম শিশুদের স্বাভাবিক জীবন ও বেড়ে ওঠা ব্যাহত করছে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় এসব অঞ্চলের শিশুরা বড়দের চেয়ে অনেক বেশি হেপাটাইটিস এ, কলেরা, আমাশয়, টাইফয়েডের ঝুঁকিতে আছে।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের চেয়ারম্যান আবু নাসের খান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমরা এতদিন বাংলাদেশকে ষড়ঋতুর দেশ বলতাম। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়া অদ্ভুত আচরণ করছে। এখন আর এটি ষড়ঋতুর দেশ নেই। অসময়ে বৃষ্টি হচ্ছে, বর্ষায় খরা হচ্ছে। এ ধরনের পরিবর্তন আমাদের সামাজিক অবস্থা ও খাদ্য উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব গিয়ে পড়ছে শিশুদের ওপর। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের তাপমাত্রা দিন দিন বাড়ছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রায় রোগজীবাণুর বিস্তার বেশি হয়। এটা শিশুদের সবচেয়ে বেশি এফেক্ট করে।’
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় ও বন্যাকবলিত এলাকার অনেক শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের একটি ফল হলো নদী ভাঙন। এর ফলে মুহূর্তের মধ্যে দরিদ্র হওয়া পরিবারগুলো তাদের শিশুদের নিয়ে পাড়ি জমাচ্ছে ঢাকায়। ঢাকায় এসে স্কুলে পড়া দূরের কথা ঠিকমতো তিন বেলা খাবার জুটছে না তাদের।
২০২১ সালে প্রকাশিত ইউনিসেফের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের তাপমাত্রা মাত্রাতিরিক্ত গরম হচ্ছে যা বন্যা, খরাসহ নানা দুর্যোগ ডেকে আনছে। এর প্রভাবে হাজারো পরিবার গ্রাম থেকে শহরে গিয়ে বস্তিতে থাকছে। শুধু তাই নয়, পড়াশুনা ছেড়ে তারা শ্রমিক হিসেবে নানা কাজে যুক্ত হচ্ছে। দেশে প্রায় ২ কোটি শিশুর মধ্যে স্কুল বাদ দিয়ে কাজে যোগ দেয়া শিশু শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ১৭ লাখ। তাদের মধ্যে এক-চতুর্থাংশ শিশুর বয়স ১১ এর নিচে। এসব শিশুর মধ্যে ছেলেরা ট্যানারি, শিপইয়ার্ড, সবজি বিক্রি, দর্জির দোকান, মোটর ম্যাকানিক ওয়ার্কশপে কাজ করে। অধিকাংশ মেয়ে শিশুই অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করে।
পুরান ঢাকার বংশাল এলাকায় একটি মোটরসাইকেল ওয়ার্কশপে কাজ করে মোহাম্মদ নাঈম (ছদ্মনাম) নামে ১৩ বছর বয়সী এক শিশু। তার কাজ মোটরসাইকেলের দুই চাকায় হাওয়া আর ব্যাটারিতে চার্জ দেওয়া। নাঈম ঢাকা পোস্টকে জানায়, তার বাড়ি লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে। ২০২১ সালে ভাঙনের কবলে পড়ে তাদের বাড়ি নদীতে চলে যায়। এরপর ৮ সদস্যের পরিবারসহ সে ঢাকায় এসে কামরাঙ্গীরচর এলাকায় বসবাস শুরু করে। গ্রামে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর অভাব অনটনের কারণে আর পড়তে পারেনি সে। বর্তমানে ১৫০ টাকা রোজে (দৈনিক মজুরি) কাজ করছে।
আবহাওয়ার এই বদলের কারণে বর্ষাকালে শহরগুলোতে যেমন বাহকনির্ভর রোগের প্রকোপ বাড়ছে তেমনি শুকনো মৌসুমে বাড়ছে শ্বাসতন্ত্রের রোগ। খুলনা, সাতক্ষীরা, ভোলার মতো দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানিতে অতিরিক্ত লবণাক্ততা এবং ঘন ঘন দুর্যোগ শিশুদের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এছাড়া অতিরিক্ত গরম শিশুদের স্বাভাবিক জীবন ও বেড়ে ওঠা ব্যাহত করছে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় এসব অঞ্চলের শিশুরা বড়দের চেয়ে অনেক বেশি হেপাটাইটিস এ, কলেরা, আমাশয়, টাইফয়েডের ঝুঁকিতে আছে।
২০২১ সালের বাংলাদেশের বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারির তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১ কোটি ২৪ হাজার শিশু পড়াশুনা করত। এ বছর প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থী স্কুল থেকে ঝরে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের পরোক্ষ প্রভাবই শিশু শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার কারণ। এছাড়া চাহিদা অনুযায়ী অন্যান্য মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ায় মানসিক যন্ত্রণায়ও ভুগছে শিশুরা।
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক বিষয়, যার জন্য উন্নত রাষ্ট্রগুলো দায়ী। এতে মূলত বাংলাদেশের মতো আর্থিকভাবে কম শক্তিশালী দেশগুলোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব দেশে আবার বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুরা। বর্তমানে বাংলাদেশে অধিকাংশ দুর্যোগই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হচ্ছে। এতে মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে আগে শিশুদের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও খাবার বাবদ বাবা-মা যে বাজেট রাখতেন এখন তারা সেটা কমাতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে কোনো রকম অপরাধ না করেই শিশুরা তাদের চাহিদাগুলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এতে শিশুদের মানসিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশে নানা ধরনের আকস্মিক দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে। সময়ে অসময়ে বন্যা, শিলাবৃষ্টি এসে নস্যাৎ করে দিচ্ছে অনেক ফসল। এর প্রভাবও পরোক্ষভাবে পড়ছে শিশুেদের ওপর। প্রতি পাঁচ বছরে একবার খরার কারণে বিপদে পড়ে বাংলাদেশের মানুষ, আর এক্ষেত্রে দেশের উত্তরপশ্চিমাঞ্চলের বাসিন্দারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে শিশুরা কাঙ্ক্ষিত পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
জাতিসংঘ শিশু তহবিল-ইউনিসেফের ‘দ্য স্টেট অব দ্য ওয়ার্ল্ড চিলড্রেন ২০১৯, চিলড্রেন, ফুড এবং নিউট্রেশন, গ্রোয়িং ওয়েল ইন এ চেঞ্জিং ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের ৬০ শতাংশেরও বেশি মানুষ কৃষির ওপর জীবিকা নির্বাহ করে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খরা ও বন্যায় বাংলাদেশের কৃষি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের ক্ষুধার মুখে পড়ার ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। খাদ্য উৎপাদন কম হওয়ায় দাম বেড়ে যাচ্ছে এবং দরিদ্র পরিবারগুলোর ওপর এর বিরূপ পড়ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশের হাসপাতালগুলোয় তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় অনেক বেড়েছে। এই হার ৭২ শতাংশেরও বেশি।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান এই প্রতিবেদক কে ‌বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নানা দুর্যোগ হচ্ছে, এতে খাদ্য উৎপাদন কমে যাচ্ছে। এর প্রভাবে শিশুরা কাঙ্ক্ষিত ও পর্যাপ্ত পুষ্টি পাচ্ছে না। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকাগুলোর শিশুদের পুষ্টিহীনতায় ভোগার প্রধান কারণ জলবায়ু পরিবর্তন।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ বায়ুর শহর এখন ঢাকা। এর প্রভাবে অনেক মায়ের গর্ভের সন্তান নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে পৃথিবীতে আসছে। একই সঙ্গে দূষণ প্রভাব ফেলছে শিশুদের সুষ্ঠু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গঠনেও। তাছাড়া বায়ু দূষণের কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই পৃথিবীতে আসছে শিশুরা (প্রি-ম্যাচিউর বার্থ), অনেক শিশুর ওজন আবার বেশ কম হচ্ছে। যা জন্ম-পরবর্তী সময়ে নানা জটিলতা তৈরি করে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সদস্য, শিক্ষক ও পরিবেশকর্মী‌ সাধন সরকার বলেন, বয়স ভেদে শিশুর ক্যালরি গ্রহণের মাত্রা ঠিক না থাকলে সাধারণভাবে তা অপুষ্টি হিসেবে ধরা হয়। বর্তমানে শিশুর পুষ্টির জন্য জলবায়ু পরিবর্তন বড় হুমকি। জলবায়ুর নেতিবাচক পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে চরম অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের সংখ্যা বাড়ছে। দরিদ্র পরিবারের হাজার হাজার শিশু চরম অপুষ্টিতে ভুগছে। উপকূলের বহু দরিদ্র পরিবার জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে শহরের বস্তিতে, নদীর তীরের বেড়িবাঁধে বা রেললাইনের পাশে অবস্থান নিচ্ছে।
২০২২ সালের শুরুতে প্রকাশ করা একটি গবেষণায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম বলছে, বিশ্বজুড়ে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে জলবায়ু পরিবর্তন। দাবদাহ, বন্যা, দাবানলের মতো দুর্যোগগুলো চলতি বছর আগের সব রেকর্ড ভেঙেছে।  বিশেষত প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্য দিয়ে যাওয়া শিশুদের ১৫-২০ শতাংশই উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, হতাশাসহ নানা মানসিক সমস্যায় ভোগে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল ইউনিভার্সিটির (বিএসএমএমইউ) আবাসিক সাইক্রিয়াটিস্ট তৌহিদুল আলম এই প্রতিবেদককে ‌বলেন, একজন ব্যক্তির মানসিক বিকাশের বিষয়টি তার শৈশবের কয়েকটি বছরের ওপর নির্ধারিত হয়। এই সময়ে তারা যদি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্য দিয়ে যায় তাহলে এর ছাপ পড়ে শিশুর মনোজগতে। নদী ভাঙন, বন্যা ও দাবদাহের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ শিশুদের ওপর মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। এই দুর্যোগগুলো ভ্রূণের ক্ষতি করতে পারে, যার প্রভাব শিশুর ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরও থাকে। এই প্রভাব শিশু বড় হওয়া পর্যন্ত স্থায়ীভাবে থেকে যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরম ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ বলছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রতি বছর ১৭ লাখ শিশু প্রাণ হারায়। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন মানুষের মৌলিক অধিকার স্বাস্থ্য, খাদ্য, পানি, বিশুদ্ধ বাতাস, শিক্ষা এবং সুরক্ষাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। তাই বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান চরম আবহাওয়া বিপুল পরিমাণ শিশুর জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
জলবায়ু পরিবর্তন শিশুদের সুখী, সুস্থ ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে আরো কমিয়ে দিচ্ছে। প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী বন্যায় স্কুল ও স্বাস্থ্য ক্লিনিক ধ্বংস হয়ে যায়। যখন খরা হয়, তখন শিশুরা স্কুলে কম সময় কাটায় কারণ তাদের পানি সংগ্রহের জন্য মাইলের পর মাইল হাঁটতে হয়। ক্রমবর্ধমান সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এবং বিষাক্ত বায়ু দূষণ শিশুদের বেড়ে ওঠার পরিবেশকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।
ইউনিসেফ বলছে, মায়ানমার, ফিলিপাইন, পাপুয়া নিউ গিনি এবং ডেমোক্রেটিক পিপলস রিপাবলিক অফ কোরিয়াতে বসবাসকারী শিশু এবং তরুণরা পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এ অঞ্চলের শিশুরা স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সুরক্ষার চরম হুমকিতে রয়েছে।
২০২১ সালের ২০ আগস্টে প্রকাশিত ইউনিসেফের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, মারাত্মক রোগের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ৫০টি দেশের মধ্যে ভিয়েতনাম, চীন, লাওস, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং থাইল্যান্ডও রয়েছে।
ফ্রাইডেস ফর ফিউচার-এর সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত হওয়া যুব-নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সংকট আন্দোলনের তৃতীয় বার্ষিকীর এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বে প্রায় ২২০ কোটি শিশু রয়েছে যার মধ্যে ১০০ কোটি শিশু এমন ৩৩ টি দেশে বাস করে যে দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এই শিশুরা পানি ও স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষার মতো অপর্যাপ্ত প্রয়োজনীয় পরিষেবাগুলির কারণে উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। তার মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে। জলবায়ু পরিবর্তন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই পরিসংখ্যানও পরিবর্তিত হবে।
হার্ভার্ড টিএইচ-এর জলবায়ু, স্বাস্থ্য এবং বৈশ্বিক পরিবেশের কেন্দ্রের অন্তর্বর্তীকালীন পরিচালক, চ্যান স্কুল অফ পাবলিক হেলথ (হার্ভার্ড চ্যান সি-চেঞ্জ), বোস্টন চিলড্রেনস হাসপাতালের একজন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ এবং হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের শিশুরোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক অ্যারন বার্নস্টেইন। তিনি জলবায়ু সংকটে শিশুদের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব নিয়ে গবেষণা এবং বিশ্বজুড়ে শিশুদের স্বাস্থ্য ও সুস্থতার উন্নতির জন্য এর কারণগুলিকে মোকাবেলা করার সমাধান নিয়ে গবেষণা করেছেন।
অ্যারন বার্নস্টাইন প্রায় ২৫ বছর আগে যখন একজন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ শুরু করেন, তখনও তার মনে হয়নি জলবায়ু সংকট শিশুদের জন্য এমন গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হয়ে উঠতে যাচ্ছে। পেশা জীবন যতই অতিবাহিত হতে লাগলো ততই তিনি দেখতে পেলেন তীব্র গরমে অসুস্থ হয়ে প্রতি বছর হাসপাতালে শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলবায়ু সঙ্কট কারো কারো ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যারও কারণ ঘটাচ্ছে।
বার্নস্টাইন বলেন, সেসময় বলতে গেলে কেউই জলবায়ু পরিবর্তনকে স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে মনে করেনি। বিষয়টি আগে খেয়াল না করার জন্য নিজেকেই এখন বোকা মনে হচ্ছে। সময়মতো বিষয়টিকে গুরুত্ব দিলে হয়তো এখন এতো জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না।
নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন হালনাগাদ তথ্য নিয়ে একটি গবেষণার বিস্তৃত পর্যালোচনা প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর প্রভাব, বায়ু দূষণ ও মারাত্মক আবহাওয়ার মতো বিষয়গুলো, পানির নিম্ন মান, চরম তাপ শিশু স্বাস্থ্যের জন্য ব্যাপক ও ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি তৈরি করেছে। এই জার্নালকে সব মেডিক্যাল জার্নালের ‘পবিত্র আধার’ বলে থাকেন বার্নস্টাইন।
গবেষণা প্রতিবেদনের প্রধান লেখক কলাম্বিয়া সেন্টার ফর চিলড্রেনস এনভায়রনমেন্ট হেলথের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ফ্রেডেরিকা পেরেরা বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর পৃথিবীর অধিক নির্ভরতা এবং শিশু স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাবের যোগসূত্র দেখানো ওই গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল না। শিশুদের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিপর্যয় থেকে রক্ষা করার উপায়গুলোও তুলে ধরাও এর লক্ষ্য ছিল।
তিনি বলেন, কীভাবে জলবায়ুর প্রভাব মোকাবেলা করা যায় আমরা তা জানি। আমরা জানি কীভাবে কার্বন গ্যাস নির্গমন কমিয়ে আনা যায়। আমরা এখনই ব্যবস্থা নিতে পারি এবং এটাই ছিল নিবন্ধের উদ্দেশ্য।
বন্যার পাশাপাশি বায়ু দূষণসহ বেশ কয়েকটি চরম জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঘটনার রূপরেখা দেওয়া হয়েছে গবেষণা নিবন্ধে। গবেষকদের মতে সকল প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে মারাত্মক হলো উচ্চ তাপমাত্রা।
আমেরিকান পরিবেশগত স্বাস্থ্য বিজ্ঞানী এবং কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি মেইলম্যান স্কুল অফ পাবলিক হেলথের কলম্বিয়া সেন্টার ফর চিলড্রেনস এনভায়রনমেন্টাল হেলথের প্রতিষ্ঠাতা ফ্রেডেরিকা পেরেরা বলেন, প্রাপ্ত বয়স্করা উচ্চ তাপমাত্রায় নিজেদের সামলাতে পারেন। কিন্তু বাচ্চারা তা পারে না, তাদের ভুগতে হয়।
বিশেষজ্ঞরা কয়েক দশক ধরেই বলে আসছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শিশু এবং গর্ভবতী নারীরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর তালিকায় রয়েছে। তাদের হিট স্ট্রোকের মতো তাপজনিত সমস্যার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
পেরেরা বলেন, শিশুদের যখন পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ করা দরকার তখনও তাদের প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর নির্ভর করতে হয়। তাছাড়া অভিভাবকরা এমনিতেই তাদের ঠাণ্ডা বা শীতল জায়গায় রাখেন। সে কারণেও বাচ্চারা তাপে কাবু হয়ে পড়ে। আমরা অতিরিক্তি গরমের সময় পার্কিংয়ে রাখা গাড়িতে শিশুদের মারা যাওয়ার মত দুঃখজনক ঘটনাও দেখেছি, যেখানে তার বাবা-মায়েরা বুঝতেই পারেননি সেখানে কতটা গরম।
বার্নস্টাইন গত জানুয়ারিতে একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি বলেন, গ্রীষ্মকালের প্রচণ্ড উত্তাপের কারণে শিশুদের হাসাপাতালে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এমনকি যে সময় তাপমাত্রা খুব একটা বেশি থাকে না তখনও এমনটি ঘটে। জলবায়ু সংকটের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে এখন জন্ম নেওয়া শিশুরা ৬০ বছর আগে জন্ম নেওয়া শিশুদের তুলনায় ৩৫ গুণ বেশি চরম তাপমাত্রা অনুভব করে।
গবেষণায় আরো বলা হয়, তাপ শিশু স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ায় আমরা তা জানি। গরমের কারণে শিশুদের জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা বেড়ে যায়। এমনকি গর্ভবতী নারীরা তীব্র তাপের সংস্পর্শে এলে তাদের সন্তানের ওপরও প্রভাব পড়ে। পরবর্তীতে দেখা গেছে সেই শিশুরা শিক্ষা বা পরীক্ষায় ভালো করতে পারে না।
পেরেরা বলেন, এই নিবন্ধটি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের আরও সচেতন করবে। সেইসঙ্গে জলবায়ু প্রভাব থেকে শিশুদের রক্ষা করতে জলবায়ু নীতির পক্ষে বড় ভূমিকা রাখবে এটি। কার্বন গ্যাস নিঃসরণ এবং তাপমাত্রা বাড়ার যে ঊর্ধ্বগতি, তাতে আমাদের হাতে সময় নেই। তবে পরিবর্তিত জলবায়ু পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে শিশু ও পরিবারগুলোকে সহায়তার জন্য আমরা অনেক কিছু করতে পারি।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের বেশির ভাগ গ্রামাঞ্চলে বৃষ্টি কমে আসছে। এতে কৃষক পরিবারগুলোর আয় কমছে। ফলে বৃষ্টি কমছে, এমন এলাকার মায়েরা গর্ভকালীন অবস্থায় পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছেন না। এতে করে শিশুরা মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায় দুর্বল হয়ে পড়ছে। জন্মের পরেও তারা অপুষ্টির শিকার হচ্ছে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) একটি গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। আজ বুধবার রাজধানীর পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়। পিআরআইয়ের আয়োজনে ‘স্বাস্থ্য খাতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় জলবায়ু নীতি: বাংলাদেশ থেকে তথ্য-প্রমাণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে জলবায়ুবিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদেরা বক্তব্য দেন।
বৈঠকে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এডিবির জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ মিনহাজ মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।…বৃষ্টিপাত কম হচ্ছে, এমন এলাকাগুলোর যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট তহবিলের আওতায় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, সেখানে শিশুদের পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।’
উদাহরণ হিসেবে মিনহাজ মাহমুদ বলেন, অপুষ্টির শিকার শিশুদের মধ্যে খর্বাকৃতি ও কৃশকায় শিশুদের সংখ্যা জলবায়ু প্রকল্প নেওয়া এলাকায় কমে আসছে। কিন্তু ওই উন্নতি স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রকল্পের কারণে হচ্ছে তা নয়। মূলত কৃষি খাতে উন্নতি এবং ভালো ফসল হওয়ার কারণে গ্রামীণ পরিবারগুলোর আয় বেড়েছে। ফলে ওই সব এলাকার পরিবারে শিশুদের পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।
সুপারিশ হিসেবে মিনহাজ মাহমুদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গ্রামীণ জনপদের অধিবাসীদের জীবিকার উন্নতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি খাতে উন্নতি হলে এবং আয় বাড়লে পরিবারগুলোতে গর্ভবতী নারী ও শিশুরা পুষ্টিকর খাবার পাবে। এতে তাদের স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে। ফলে জীবিকার উন্নতিকে মাথায় রেখে জলবায়ু প্রকল্প নেওয়া বেশি জরুরি।
বৈঠকে সঞ্চালকের বক্তব্যে পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ ড. জায়েদি সাত্তার বলেন, বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঋতুবৈচিত্র্য ও বৃষ্টিপাতের ধরনে নানা ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। কিন্তু ওই পরিবর্তনের প্রভাব মানুষের জীবন-জীবিকা এবং স্বাস্থ্যে কী ধরনের পরিবর্তন আনছে, তা বোঝা জরুরি। আর কোন ধরনের উদ্যোগ ও প্রকল্প নিলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করে টিকে থাকা যাবে, তা ঠিক করতে হবে।
অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. অনন্ত নীলিম বলেন, ‘বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন বৃষ্টি ও পানি ব্যবস্থাপনার ওপরে বেশি প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপরে পানির প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। ফলে পরিবর্তনগুলোকে আমলে নিয়ে তা অর্থনীতির ওপরে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, সেটা আমাদের পর্যবেক্ষণ করে দেখতে হবে।’
সমাপনী বক্তব্যে পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. খুরশিদ আলম বলেন, বাংলাদেশের কৃষি থেকে শুরু করে অবকাঠামো, পানি ব্যবস্থাপনাসহ প্রতিটি খাতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে।

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট