1. mesharulislammonir1122@gmail.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন
  2. info@www.sangjogprotidin.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন :
শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৫৩ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
মাজারে কুমিরের আক্রমনে মারা যাওয়া কুকুরটি জলাতঙ্ক রোগে ভুগছিল মোরেলগঞ্জে পানি নিষ্কাশন ও স্লুইজ গেটের দাবিতে মানববন্ধন মোরেলগঞ্জে কৃষক দল নেতার জমি দখলে মরিয়া শ্রমীক লীগ নেতা খালিশপুরে রিকশা-ভ্যান শ্রমিক দলের আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার: পানিসম্পদ মন্ত্রী ইরানকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে: পেজেশকিয়ান যৌতুক দাবিতে স্ত্রী নির্যাতন মামলায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক কারাগারে সভাপতি তামিমের উৎসাহে আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ দল: মিরাজ ফিলিস্তিনি বন্ধিদের ওপর ইসরায়েলের ভয়াবহ যৌন নির্যাতন বার কাউন্সিল নির্বাচন স্থগিত নিয়ে প্রশ্ন আখতারের, যা বললেন আইনমন্ত্রী

বাঁধের ফাঁদে উপকূলের মানুষের জীবন

  • প্রকাশিত: শুক্রবার, ২ জানুয়ারি, ২০২৬
  • ২১২ বার পড়া হয়েছে

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : বাংলাদেশের দক্ষিণে সমুদ্র উপকূলবর্তী ১৯টি জেলা নিয়ে উপকূলীয় অঞ্চল। দেশের তিন ভাগের এক ভাগজুড়ে বিস্তৃত এই অঞ্চলে প্রায় ৫ কোটি মানুষের বাস। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন-জীবিকা অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ষাটের দশকে নির্মিত হয় ৫ হাজার ৮১০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলীয় বেড়িবাঁধ। যা ১৯৬১ সালে শুরু হয়, শেষ হয় ১৯৭১ সালে। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মতে, উপকূলীয় এলাকার ৫ হাজার ৭৫৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের অর্ধেকের বেশিই আজ ঝুঁকিপূর্ণ। বাঁধগুলো অনেক পুরনো। উচ্চতা আছে তিন-সাড়ে তিন মিটার। এগুলোর কেবল সাধারণ জোয়ার ঠেকানোর ক্ষমতা আছে। আম্পান বা সিডর-আইলা, রোমানের মতো বড় ঘূর্ণিঝড় ঠোকানোর সামর্থ্য এই বেড়িবাঁধের নেই। উপকূলীয় ১৯টি জেলার প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ প্রতিনিয়ত ঘূর্ণিঝড়ের আতংকে দিন কাটে।
ষাটের দশকে দেশের ১৩ জেলায় ৫ হাজার ৮১০ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকার ১৩৯টি পোল্ডার বা বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিলো। স্বাধীনতার ৫০ বছরে উপকূল সুরক্ষায় নতুন কোন পোল্ডারও তৈরী করা হযনি। পাকিস্তান আমলে তৈরী বেড়িবাঁধ সংস্কার আর পুন:নির্মাণেই কেটে গেছে ৫০টি বছর! অর্ধশত বছরেরও আগে নির্মিত এসব বাঁধ এখন আর সামাল দিতে পারছে না সামুদ্রিক ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের ধাক্কা।
প্রতি বছর জুন মাসে স্থানীয় সংসদ সদস্যের মাধ্যমে যেসব স্থানে বেড়িবাঁধ দুর্বল, স্থানগুলো উল্লেখ করে একটি আনুমানিক বরাদ্দ পাউবো এমপির ডিও লেটারের মাধ্যমে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। সেই ষাটের দশকে আদি বাঁধ নির্মাণের পর এ ধরনের আর কোনো মূল বাঁধ এ অঞ্চলে নির্মাণ হয়নি, হয়েছে শুধু সংস্কার-মেরামত। উপকূল সুরক্ষা বেড়িবাঁধ ভাঙ্গলে সংস্কারে কেটে যায় বছর। আর বাঁধ বলতে যেটি করা হয়েছে, তা হলো যেখানে ভেঙেছে সেখানে রিং বাঁধ দেওয়া। তবে নিম্নমানের কাজ, নকশায় ত্রুটি, বাস্তবতার সাথে পরিকল্পনার ভিন্নতার কারনে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ টেকসই হয় না।
ষাটের দশকে উপকূলীয় এলাকায় বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে পাকিস্তান সরকার। ৫৫ বছরে ভাঙতে ভাঙতে যার অস্তিত্ব এখন আর নেই বললেই চলে। বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে লবণপানি প্রবেশ করায় সবুজ শ্যামল জনপদ বিরাণ হচ্ছে। একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত আর নদীর ভাঙ্গন বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে এতটাই ভঙ্গুর করে দিয়েছে যে, এখানে এখন আর বড় ঘূর্ণিঝড়ের প্রয়োজন হয় না। অমাবস্যার জোয়ারে পানির চাপ একটু বাড়লে মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূল রেখার প্রায় ১৫ হাজার কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকা এখনো অরক্ষিত। দেশে বর্তমানে পোল্ডারের সংখ্যা ১৩৯, যা ষাটের দশকে তৈরী করা হয়েছিলো। এর মধ্যে ৬০টি বেড়িবাঁধ এখন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। পাউবো বিভিন্ন সময় সংস্কার ও পুন:নির্মাণ করেছে। তবে নতুন করে কোন বাঁধ তৈরী করা হয়নি। ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে লবণপানি প্রবেশ করায় একসময়ের সবুজ শ্যামল জনপদ বিরাণ হচ্ছে। একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত আর নদীর ভাঙ্গন বেড়িবাঁধ এতটাই ভঙ্গুর করে দিয়েছে যে, এখন আর বড় ঘূর্ণিঝড়ের প্রয়োজন হয় না। অমাবস্যা বা পূর্নীমার জোয়ারে পানির চাপ একটু বাড়লে মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দফায় দফায় ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে জমিতে লবণপানি ঢুকে জমি উর্বরতা হারায়। ৫৫ বছরে ভাঙতে ভাঙতে যার অস্তিত্ব এখন আর নেই বললেই চলে। দু:খের বিষয়, বেড়িবাঁধ নির্মাণ হওয়ার পর থেকে স্বার্থান্বেষী মানুষদের ছোবলে বারবার ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে বাঁধটি। ৮০ দশ থেকে ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠিত কৃষকরাও বাঁধ কেটে জমিতে লবণপানি প্রবেশ করিয়ে মাছচাষ শুরু করে। ফলে একদিকে জমি নষ্ট হয়েছে, অন্যদিকে বিনাশ করা হয়েছে বাঁধ।
ভারতের ট্রপিক্যাল মেটেরোলজি ইনস্টিটিউটের জলবায়ু বিজ্ঞানী ড. রক্সি ম্যাথিও কল-এর তথ্যমতে, বিশ্বের ভয়াবহতম ১০ ঘূর্ণিঝড়ের ৮টিই সৃষ্টি হয়েছে বঙ্গোপসাগরে। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বিশ্বে যত মৃত্যু ঘটেছে, তার ৮০ শতাংশই হয়েছে এই অঞ্চলে। এ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির প্রবণতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় ১৯ জেলার প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন।
১৯৭০ থেকে ২০২৪ সাল পযন্ত প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়সহ একের পর এক ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে দেশের বাঁধের বেশিরভাগ অংশ নাজুক হয়ে পড়েছে। শুধুমাত্র সুপার সাইক্লোন সিডরে উপকূলীয় ৩০ জেলার ২ হাজার ৩৪১ কিলোমিটার বাঁধ বিধ্বস্ত হয়। এর মধ্যে সম্পূর্ণ বিলীন হয় ৩৯১ কিলোমিটার। ১ হাজার ৯৫০ কিলোমিটার বাঁধ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার ৩৮টি পোল্ডারের ১৬৫১ কিলোমিটার বেঁড়িবাধের মধ্যে ৬৮৪ কিলোমিটার বিধ্বস্ত হয়। ২০২০ সালে ঘূর্ণিঝড় আম্পানে উপকূলীয় ১০ জেলার ৪৭৮ কিলোমিটার বাঁধ সম্পূর্ণ ভেঙে বিলীন হয়ে যায়। আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৬৭৮ কিলোমিটার।
১৯৬০ সালের দিকে নির্মাণ করা বাধের মেয়াদ ছিল ২০ বছর। তবে দু:খের বিষয় হলো, বিগত ৫৫ বছরের মধ্যে এ বাঁধ কখনো সংস্কার করা হয়নি। ভাঙ্গলে মেরমত করা হয়। উপকূলীয় বাঁধগুলোর মেয়াদ শেষ হয়েছে অনেক আগেই। ৫৫ বছর আগের বাঁধ যে এখনো সার্ভিস দিচ্ছে সেটাই অনেক বেশি। এছাড়া যে সময় বাঁধগুলো নির্মাণ করা হয়েছিলো, সে সময় শুধুমাত্র জোয়ার থেকে জনবসতিকে রক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিলো। কিন্তু বর্তমানে ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়ের চাপ বাঁধগুলো আর নিতে পারছেনা।
ভেড়িবাঁধ মাটি অথবা শিলা দ্বারা নির্মিত উচুঁ পৃষ্ঠবিশিষ্ট প্রাচীর সদৃশ মাটির স্থাপনা। প্রচলিত বাংলায় এটিকে বেড়িবাঁধও বলা হয়ে থাকে। অবস্থাভেদে ভেড়িবাঁধের প্রকৃতি এবং গঠন বিভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে। বিভিন্ন ধরনের ভেড়িবাঁধের মধ্যে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ একটি, যা বন্যা নিয়ন্ত্রণ অথবা প্রতিরোধের লক্ষ্যে নির্মাণ করা হয়। নি¤œভূমি অঞ্চলে বন্যা প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে নদীতীর এবং তীরভূমি থেকে কিছুটা দূরে বন্যার পানি ধরে রাখার জন্য নির্মিত ভেড়িবাঁধকে কান্দা বা জলস্রোত প্রতিরোধী বাঁধও বলা হয়, ইংরেজি ভাষায় যাকে বলা হয় লেভি বা ডাইক। এই ধরনের বাঁধের অভ্যন্তরে পানি প্রবেশ এবং নির্গমের ব্যবস্থা থাকতে পারে আবার নাও পারে। বন্যার পানি ধারণ ও প্রতিরোধ করা অথবা সড়ক, রেলপথ, খাল ইত্যাদি নির্মাণে এরূপ স্থাপনার প্রয়োজন হয়।
উপমহাদেশে সর্বাপেক্ষা প্রাচীন ভেড়িবাঁধ নির্মাণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় সুলতানি শাসনামলে (১২১৩-১৫১৯ খ্রিষ্টাব্দ)। সুলতান গিয়াসুদ্দিন ইওয়াজ খিলজী তাঁর রাজধানী লখনৌতিকে বন্যার কবল থেকে রক্ষার জন্য কয়েকটি ভেড়িবাঁধ নির্মাণ করেন। তাঁর সময়েই প্রায় ১৫০ মাইল দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট গ্রান্ড ট্রাঙ্ক সড়ক নির্মিত হয়, যা একই সঙ্গে বন্যা প্রতিরোধে ভেড়িবাঁধ হিসেবেও কাজ করত। মুগল সম্রাটগণও বিভিন্ন বড় বড় নদ-নদীর গতিপথে ভেড়িবাঁধ নির্মাণ করেছিলেন।
বাংলাদেশে সমুদ্র উপকূলবর্তী ভেড়িবাঁধসমূহ নির্মাণ শুরু হয় সপ্তদশ শতকের শুরুতেই। জমিদারদের কর্তৃত্বাধীন এসব উদ্যোগ ছিল মূলত বেসরকারি। স্থানীয়ভাবে এ বাঁধকে অষ্টমাসি বাঁধ বলা হতো। মূলত: জোয়ারের পানি থেকে ফসল বাঁচানোর এ জন্য বাঁধ দেওয়া হতো। উপকূল সুরক্ষায় ব্যাপক পরিসরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ভেড়িবাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা মাফিক উন্নয়ন কর্মকান্ডের সূত্রপাত ঘটে ১৯৬০ এর দশকে। সে সময় থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী এবং নদী তীরবর্তী অঞ্চলে বহু কিলোমিটার ভেড়িবাঁধ নির্মিত হয়েছে। এই বাঁধগুলি কৃষি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে উপযুক্ত পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখছে।
সমুদ্র উপকূলীয় ভেড়িবাঁধ প্রকল্প বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলীয় জেলাসমূহ এই প্রকল্পভুক্ত। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ¥ীপুর, ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালি, ঝালকাঠি, বরগুনা, পিরোজপুর, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং বাগেরহাট জেলার বিস্তৃত এলাকা জুড়ে সমুদ্র উপকূলীয় ভেড়িবাঁধ প্রকল্প বা সিইপি।
বাঁধনির্মাণ এবং পানি নিষ্কাশনে আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর জটিল কার্যক্রম ভিত্তিক এই প্রকল্পে পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয় স্লুইস গেইট বা জলকপাট দ্বারা। সেই সঙ্গে পানি অপসারণের জন্য কার্যকর ব্যবস্থাও এখানে গৃহীত হয়েছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় বন্যা এবং লবণাক্ত পানির অবাঞ্চিত অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে এটি প্রথম একটি ব্যাপক ও কার্যকর পরিকল্পনা হিসেবে চিহ্নিত। প্রকল্পটি বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক পরিচালিত। ১৯৬১ থেকে ১৯৭৮ সালের মধ্যে দুই পর্বে এটি বাস্তবায়ন করা হয়। প্রথম পর্বে প্রকল্পভুক্ত ছিল ৯২টি পোল্ডার নির্মাণ, যার মাধ্যমে ১০ লক্ষ হেক্টর ভূমি প্রকল্প সুবিধার আওতায় আসে। পোল্ডার একটি ডাচ শব্দ, যার অর্থ বন্যা নিরোধের জন্য নির্মিত মাটির দীর্ঘ বাঁধ (ডাইক) দ্বারা বেষ্টিত এলাকা। দ্বিতীয় পর্বে ১৬টি পোল্ডারে আরও চার লক্ষ হেক্টর ভূমি উদ্ধার সম্ভব হয়। সিইপির আওতায় এ পর্যন্ত ৪,০০০ কিমি-এর অধিক দীর্ঘ ভেড়িবাঁধ এবং ১,০৩৯টি নিষ্কাশন জলকপাট বা স্লুইস গেইট নির্মিত হয়েছে।
ভেড়িবাঁধ জোয়ার প্লাবন থেকে ভূমিকে রক্ষা করতে কার্যকর, কিন্তু বাঁধের উচ্চতা ছাড়িয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়,জলোচ্ছ্বাসে ও জোয়ার জলোচ্ছ্বাসের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারে না। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকার পাশাপাশি এ সকল বাঁধ সড়ক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, যা উপকূলীয় অঞ্চলের সার্বিক আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে গতিশীলতার সঞ্চার করেছে।
তবে ভেড়িবাঁধসমূহ নদীর স্বাভাবিক গতিপথের পরিবর্তন ঘটায়। এই নদীশাসন, জোয়ার ভাটার স্রোতধারায় এবং বাঁধের জলকপাটসমূহের নির্গম পথে পলি জমার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। এ ধরনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সর্বাপেক্ষা মারাত্মক অবস্থার সৃষ্টি করেছে খুলনা অঞ্চলে। সেখানে উচ্চভূমি অঞ্চল থেকে নদীবাহিত পলি অধিক মাত্রায় সঞ্চিত হচ্ছে। ফলে এ এলাকার নি¤œভূমি বা বিভিন্ন পোল্ডারে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। পলি সঞ্চয়নের ফলে নদীর নাব্য কমে যাচ্ছে এবং প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ছে। এর কারণসমূহ চিহ্নিত করার জন্য এপর্যন্ত বেশ কিছু গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। সিইপি ১৯৮৮ সাল থেকে দুর্বল পানি নিষ্কাশণ ব্যবস্থা এবং জলাবদ্ধতা দূরীকরণের লক্ষ্যে সংস্কার মূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছে। সেক্ষেত্রে চিহ্নিত নদীগুলির নাব্য বৃদ্ধির জন্য খননকার্য এবং জীর্ণ ও অকার্যকর জলকপাটগুলোর মেরামত, প্রয়োজনে নতুন করে স্থাপনসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
উপকূল অঞ্চলের মানুষের জীবনজীবিকা নির্বাহ করে বেড়ীবাঁধের উপরে। দুর্যোগে এই বাঁধ তাদের ভরসার একমাত্র স্থল। বাঁধ ভালো থাকলে তারা দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাবে। বাঁধ ভেঙ্গে গেলে তাদের ঘরবাড়ী, ফসলের ক্ষেত, রাস্তাসহ সবকিছু পানিতে ভেসে যায়। মানুষগুলো নি:স্ব হয়ে পড়ে। উপকূলের জনজীবন ভাঙ্গা বাঁধের ফাঁদে বিপন্ন হচ্ছে। বেড়িবাঁধ দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবন জীবিকা রক্ষার দাবি, নূন্যতম বেঁচে থাকার দাবি। অন্য যে কোন উন্নয়নের আগে টেকসই বেড়িবাঁধ তৈরি করতে হব্।ে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসে এবং নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধে তীর রক্ষা বেড়িবাঁধের জরুরি প্রয়োজন উপকূলের জনপদে।
ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধের কারণে স্বপ্নভঙ্গের শঙ্কা দেখা দিয়েছে সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় দাকোপ উপজেলার ৩২ নম্বর পোল্ডারের কামারখোলা ও সুতারখালী ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষের।
জোয়ারের সময় ঢাকী নদীর তীব্র স্রোতের তোড়ে কামারখোলার হাটখোলা গেটসংলগ্ন প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকায় বেড়িবাঁধে ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। সিডর-আইলার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে সর্বস্বান্ত মানুষ বহু কষ্টে ঘুরে দাঁড়ানোর পর আবারও কোনো এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ ভেঙে বাড়িঘরসহ বিস্তীর্ণ ফসলের খেত লবণপানিতে তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় পড়েছে। এখনই ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ সংস্কার করা না হলে একসময়ের অনাবাদি জমিতে দুই ফসল ফলিয়ে তিন ফসল ফলানোর স্বপ্ন দেখা মানুষের স্বপ্ন তছনছ হয়ে যাবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতবিক্ষত সুন্দরবন উপকূলীয় জনপদ। তার ওপর বছরের পর বছর ছিল শহর থেকে আসা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের লবণপানির চিংড়ি চাষ। একদিকে ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আরেক দিকে লবণপানির চিংড়িচাষে উপকূলের মানুষের জীবন হয়ে উঠেছিল দুর্বিষহ। এ রকম অবস্থায় ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলার সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে দাকোপের কামারখোলা ও সুতারখালী ইউনিয়নের বাড়িঘর বিধ্বস্তসহ লবণপানিতে তলিয়ে যায় ফসলের খেত। প্রাথমিকভাবে আইলার ক্ষয়ক্ষতি কম হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব পড়ে ভয়ংকরভাবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াইয়ে টিকতে না পেরে বহু মানুষ ছাড়তে বাধ্য হন উপকূল। সর্বস্বান্ত এসব মানুষ জীবিকার অন্বেষণে তাদের দীর্ঘদিনের বসতি ছেড়ে পাড়ি জমান অজানা গন্তব্যে। কেউ কেউ হন দেশান্তরী। তবে, যারা মাটি কামড়ে টিকে থাকেন তারা লবণপানির চিংড়ি চাষের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। তাদের পাশে এসে দাঁড়ান স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। প্রতিরোধের মুখে এক পর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায় লবণপানির চিংড়ি চাষ।
খুলনায় ট্যাংকলরি শ্রমিকদের কর্মবিরতি স্থগিত
এদিকে উপকূলীয় এলাকার বেড়িবাঁধের ভাঙন প্রতিরোধ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতবিক্ষত উপকূলবাসীকে রক্ষা করতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ‘উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্প—প্রথম পর্যায়’ গ্রহণ করে ২০১৩ সালে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) আওতায় বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০১৩ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। এ প্রকল্পের আওতাভুক্ত উপকূলীয় জেলাগুলো হচ্ছে খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, বরগুনা, পিরোজপুর ও পটুয়াখালী। এই জেলাগুলোতে ৩২,৩৩,৩৫/১, ৩৫/৩, ৩৯/২সি, ৪০/২, ৪১/১, ৪৩/২সি, ৪৭/২ ও ৪৮ নম্বর পোল্ডার রয়েছে।
সূত্রমতে, উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্পের উপকৃত এলাকা হচ্ছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৫০ একর ও সেচ সুবিধাভুক্ত এলাকা হচ্ছে ১ লাখ ৩০ হাজার ১৫৭ একর। এ ছাড়া বাঁধ নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ ৪১২ কিলোমিটার, নিষ্কাশন খাল খনন ও পুনঃখনন ৩০৬ কিলোমিটার, পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো নির্মাণ ৮৯টি, ফ্লাসিং ইনলেট নির্মাণ ৮১টি, বাঁধের ঢাল প্রতিরক্ষা কাজ ২৯ কিলোমিটার, নদীতীর সংরক্ষণ কাজ ১৪ কিলোমিটার ও বনায়ন ১ হাজার ৭২৯ একর। কিন্তু এ প্রকল্পের অনেকটাই এখনো অসমাপ্ত রয়েছে।
তবে, স্থানীয়রা জানান, সুন্দরবনসংলগ্ন দাকোপ উপজেলার ৩২ নম্বর পোল্ডারের কামারখোলা ও সুতারখালী ইউনিয়নের ঢাকী, শিবসা ও ভদ্রা নদীর তীরে বাঁধ দেওয়ার কারণে এ এলাকার নদনদী থেকে কৃষিজমিতে লবণপানি ওঠা বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে কামারখোলা ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকায় তরমুজ চাষ ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া লবণপানির প্রকোপ না থাকার কারণে তরমুজের ফলন উঠে যাওয়ার পর মানুষ আমন ধান ও রবিশস্য চাষ করছেন। যা কয়েক বছর আগেও ছিল তাদের কাছে স্বপ্নের মতো।
সম্প্রতি কামারখোলা ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, মাঠের পর মাঠ কৃষক-কিষানিরা তরমুজের বীজ রোপণ করছেন। শুধু খেতমালিকই নন, চৈত্রের তীব্র রোদ ও দাবদাহের মধ্যেও কৃষক-কিষানিদের মুখে খুশির ঝিলিক। তারা স্বপ্ন দেখছে, গত মৌসুমের তুলনায় এবার তরমুজের আরো ভালো ফলন হবে।
মো. শহীদ গাজী, দীপঙ্কর রায় ও তাপস রায়—এই তিন জনে একসঙ্গে এবার ২৫ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করছেন। প্রতি বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করতে তাদের ৩০-৩২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তারা জানান, গত মৌসুমে তারা এক বিঘা জমির তরমুজ ১ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন। তবে, এবার আশা করছেন, এবার তারা আরো বেশি টাকার তরমুজ বিক্রি করতে পারবে।
দাকোপ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মেহেদী হাসান খান বলেন, এ বছর দাকোপ উপজেলায় ৭ হাজার ৬০৫ হেক্টর জমিতে তরমুজের চাষ হয়েছে। এ ছাড়া ২১৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান, তিন হেক্টর জমিতে তিল, চার হেক্টর জমিতে মুগডাল, ৮ হেক্টর জমিতে ভুট্টা ও ৫০ হেক্টর জমিতে অন্যান্য শাকসবজি চাষ হয়েছে। তিনি বলেন, এবার গড়ে প্রতিটি তরমুজ ছয় কেজি ওজন ও ৩৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলে দাকোপ থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার তরমুজ বিক্রি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কামারখোলা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান পঞ্চানন কুমার মণ্ডল বলেন, ঢাকী নদীর তীরে বাঁধের ভাঙন ঠেকাতে জিও ব্যাগ দিয়ে ডাম্পিং করা হয়েছে। তার পরও ভাঙন রোধ করা সম্ভব হয়নি। নদীর জোয়ারের তোড়ে এই ভাঙন আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে কামারখোলা, জালিয়াখালী, কালাবগী, সুতারখালীতে নবনির্মিত বেড়িবাঁধের অনেক স্হানে আংশিক ও সম্পূর্ণ বাঁধ ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এখনই জিও ব্যাগ দিয়ে ডাম্পিং করা না হলে স্বপ্নের বেড়িবাঁধ মানুষের কোনো কাজে আসবে না।
খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সাবেক ‌উপসহকারী প্রকৌশলী গোপাল কুমার দত্ত বলেন, ৩২ নম্বর পোল্ডারটি পোস্টাল এনভারমেন্ট ইমপ্র‚ভমেন্ট প্রজেক্টের (সিআইপি) অধীনে। এই প্রজেক্টি বিশ্বব্যাংকের। এখনো আমাদের কাছে এই পোল্ডারটি দেওয়া হয়নি। এই কারণে আমাদের কাছে এই পোল্ডারের বিস্তারিত কোনো তথ্য নেই।
দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বাঁধ দেওয়া হয়েছে যাতে সাগরের লোনা পানি ঢুকতে না পারে; ক্ষেত-খামার, জীবন-জীবিকার ক্ষতি করতে না পারে। আবার ওই উপকূলীয় অঞ্চলেই মৎস্য প্রকল্প নেওয়া হয়েছে যাতে সাগরের লোনা পানি ঢুকিয়ে চিংড়ি চাষ করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যায়। বলার অপেক্ষা রাখে না এই দুটি ‘গুরুত্বপূর্ণ’ সিদ্ধান্তই নেওয়া হয়েছে দেশের পশ্চাৎপদ উপকূলবাসীর কল্যাণের কথা ভেবে। কিন্তু সিদ্ধান্ত দুটি কি স্ববিরোধী মনে হচ্ছে না? একদিকে যে লোনা পানি ঠেকাতে দেওয়া হচ্ছে বাঁধ, অন্যদিকে সেই লোনা পানি টেনে এনে করা হচ্ছে চিংড়ি চাষ! তবে এ সংক্রান্ত বিধি-বিধান, আইন-কানুন ঘেঁটে বোঝা যায়, বিষয়টি স্ববিরোধী নয়, বরং সুসমন্বিত। বাঁধের জায়গায় বাঁধ থাকবে, চিংড়ির জায়গায় চিংড়ি। নিয়ম অনুযায়ী সব হবে। বিধি বা আইনে কথাগুলো বলা আছে। কিন্তু ‘কে শোনে কার কথা’র এই দেশে নিয়ম-নীতি সব আছে কাগজে-কলমে, বাস্তবে চলছে সীমাহীন অরাজকতা।
গত ২০ মে রাতে বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড় আম্পান আঘাত হানার পর ২ জুন থেকে ১০ জুন পর্যন্ত- ৯ দিন উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাসুনি এবং খুলনার কয়রা ও পাইকগাছা- ৪টি উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের ১৯টি গ্রামে সরেজমিন অনুসন্ধানে অরাজকতার চিত্র উঠে এসেছে। উপকূলীয় বেড়িবাঁধের যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে ব্যক্তিস্বার্থে। বিত্তবান ও প্রভাবশালীরা ইচ্ছেমতো বাঁধ কেটে নিজেদের কাজে লাগিয়েছে। নাজুক বাঁধ ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের ধাক্কায় অসংখ্য জায়গায় ধসে পড়েছে। ভেসে গেছে উপকূলবাসীর জান-মাল। নীতি-নির্ধারকরা ছুটে গেছেন পরিদর্শনে। ফিরে আসার পর প্রকল্প নেওয়া হয়েছে বিপুল টাকার। কিন্তু সেখানে বিস্ময়করভাবে উপেক্ষিত থেকেছে মূল সমস্যার সমাধান- শক্তপোক্ত, উঁচু ও টেকসই বেড়িবাঁধ। বাঁধ সংস্কারের নামে বরাদ্দ মিলেছে সামান্য। সেখান থেকেও বাকিটা চলে গেছে অন্য প্রকল্পে। আবার বাঁধ সংস্কার কাজেও চলেছে অবাধ দুর্নীতি-অনিয়ম-লুটপাট। এভাবে জোড়াতালির বাঁধ আর ঠিক হয়নি। তাই বঙ্গোপসাগরে এখন ঝড়-জলোচ্ছ্বাস মানেই বাঁধ ভেঙে উপকূলবাসীর জীবন-জীবিকার সর্বনাশ। ঘূর্ণিঝড় আম্পান সেটাই যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেল।
জোড়াতালির সংস্কার কাজ।
‘বাঁধটার জন্যি ভিখারি হয়া গেলাম’ খুলনার কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের হাজতখালী গ্রামটি আগে কখনোই ভাঙনের মুখে পড়েনি। গ্রামের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে ছোট্ট খাল। কপোতাক্ষের সঙ্গে ছিল স্লুইজগেট। কলকল শব্দে ওঠানামা করতো পানি। সেই ভাঙা স্লুইজগেটটাই যে গ্রামসুদ্ধ মানুষকে নিঃস্ব করে দেবে- কে জানতো! ঘূর্ণিঝড় আম্পানে প্রবল বেগে পানি ঢুকে খালের দুই পাড় ভাসিয়ে দিয়েছে। ফলে পুরো গ্রাম পানির নিচে। গ্রামবাসী আশ্রয় নিয়েছে বাঁধের ওপর। ৬৫ বছর বয়সী সুকুমার চন্দ্র বাউলিয়া জানালেন, এমপি সাহেব ইলেকশনের আগে এসেছিলেন। তারা একটা দাবিই তুলেছিল- বাঁধ বানিয়ে দিন। তিনি কথা দিয়েছিলেন। কিন্তু কথা রক্ষা করেননি। চোখ মুছতে মুছতে সুকুমার বলেন, ‘বাবা, আমাইগের তেরান (ত্রাণ) লাগবে না, বাঁধখান বান্দি দাও। বাঁধটার জন্যি ভিখারি হয়া গেলাম।’
সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের তালতলা বাজারে হোমিও চিকিৎসক আবদুল আজিজের ওষুধের দোকানে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের প্রলয় নিয়ে কথা উঠতেই তাঁরা তুললেন বাঁধের প্রসঙ্গ। কুড়িকাহুনিয়ার বাসিন্দা ৭৩ বছর বয়সী ফজর আলী গাজী বললেন, ‘কত ঝড় গেল! প্রত্যেক ঝড়ে ধুয়ে যায় বাঁধের মাটি। ঝড় না হলেও বাঁধ ক্ষয়ে যায়। ৫০-৬০ বছর আগের বাঁধে নতুন করে আর মাটি পড়েনি। বাঁধ টিকবে কী করে?’
কুড়িকাহুনিয়া লঞ্চঘাটে উঠতেই ভয়াবহ ভাঙনের দৃশ্যটি চোখে পড়ে। লঞ্চঘাট লাগোয়া বাঁধের ৪টি স্থানে অন্তত এক হাজার ফুট ধ্বসে গিয়ে পানি ঢুকে পড়েছে। ঝড়ের পর স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্যোগে রিং বাঁধ দেওয়া হলেও জোয়ারের পানির চাপে তা আবার ধ্বসে গেছে। কেন এখানে বাঁধ ধ্বসে গেল? প্রশ্ন করতেই এলাকার বাসিন্দাদের এক জবাব- পুরানো বাঁধ। সেই কোন কালে বাঁধে মাটি দিয়েছে; আর খবর নাই! স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল কাদের উল্টো প্রশ্ন তুললেন- ‘এটাকে বাঁধ বলা যায় না, বলতে পারেন জমির আইল। এত বড় ঝড়ে আইল টেকে?’
ঘূর্ণিঝড় আম্পানের পর যেসব এলাকার নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম লেবুবুনিয়া গ্রাম; সাতক্ষীরার শ্যামনগরে। দূর থেকে দেখেই মনে হলো এটি কোনো দ্বীপ। চারদিকে পানি থইথই। জানা গেল, আম্পানের আঘাতে প্রায় ৫০ ফুট বাঁধ ধ্বসে যায়। কারণ সেই একই- বাঁধ ছিল খুবই নাজুক। বাঁধের একপাশে ছিল নদীর পানি, অন্যপাশে চিংড়ি ঘের। বাঁধের সঙ্গে ছিল আরেকটি খাল। মাটি ক্ষয়ে বাঁধ অনেকটা নিচু হয়ে গিয়েছিল। কপোতাক্ষের পানি প্রায় সময়ই বাঁধ ছুঁইছুঁই থাকতো। শেষমেশ আম্পানের প্রবল ধাক্কা আর সামাল দিতে পারেনি।
বেড়িবাঁধ নাজুক থাকায় এভাবেই ভেসে যায় উন্নয়ন কাজ। আশাশুনির প্রতাপনগরের একটি  সংস্কার
বাঁধের ফাঁদে সাড়ে ৪ কোটি জীবন বাংলাদেশের দক্ষিণে সমুদ্র উপকূলবর্তী ১৯টি জেলা নিয়ে উপকূলীয় অঞ্চল। দেশের তিন ভাগের এক ভাগজুড়ে বিস্তৃত এই অঞ্চলে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি মানুষের বাস। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন-জীবিকা-অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ষাটের দশকে  নির্মিত হয় (১৯৬১ সালে শুরু হয়, শেষ হয় ১৯৭১ সালে) ৪ হাজার ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলীয় বেড়িবাঁধ। দুঃখের বিষয়, বেড়িবাঁধ নির্মাণ হওয়ার পর থেকে স্বার্থান্বেষী মানুষদের ছোবলে বারবার ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে বাঁধটি। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, উপকূলীয় এলাকার ৫ হাজার ৭৫৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের অর্ধেকের বেশিই আজ ঝুঁকিপূর্ণ। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব কবির বিন আনোয়ার স্বীকার করেছেন, বাঁধগুলো অনেক পুরনো। উচ্চতা আছে তিন-সাড়ে তিন মিটার। এগুলোর কেবল সাধারণ জোয়ার ঠেকানোর ক্ষমতা আছে। আম্পান বা সিডর-আইলার মতো বড় ঘূর্ণিঝড় ঠোকানোর সামর্থ্য এই বেড়িবাঁধের নেই। গত ২১ জুন এই সচিব বলেন, ‘এই বাঁধ উঁচু ও চওড়া করে শক্তিশালী করা প্রয়োজন।’
নোনাপানির তলায় জোড়াতালির উন্নয়ন অনুসন্ধান চালানো ওই চার উপজেলার পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, সেই ষাটের দশকে আদি বাঁধ নির্মাণের পর এ ধরনের আর কোনো মূল বাঁধ এ অঞ্চলে নির্মাণ হয়নি; হয়েছে শুধু সংস্কার-মেরামত। আর বাঁধ বলতে যেটি করা হয়েছে, তা হলো যেখানে ভেঙেছে সেখানে রিং বাঁধ দেওয়া।
প্রতি বছর জুন মাসে স্থানীয় সংসদ সদস্যের মাধ্যমে যেসব স্থানে বেড়িবাঁধ দুর্বল, স্থানগুলো উল্লেখ করে একটি আনুমানিক বরাদ্দ পাউবো এমপির ডিও লেটারের মাধ্যমে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। সেখানে যদি চাওয়া হয় ৩ কোটি টাকা, বরাদ্দ আসে দেড় কোটি। জানা যায়, শ্যামনগরে প্রতিবছর ৬০-৭০টি পয়েন্টের নাম উল্লেখ করে বরাদ্দ চাওয়া হয়। এ উপজেলায় পোল্ডার সংখ্যা দুটি- ৫ ও ১৫ নং পোল্ডার আর বেড়িবাঁধ আছে ১৭৩ কিলোমিটার। আমাদের অনুসন্ধান চালানো চারটি উপজেলার ৮৫৯ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সংস্কার কাজের জন্য প্রতিবছর পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে যে বরাদ্দ আসে; তারচেয়ে অনেকগুণ বেশি আসে অন্যান্য মন্ত্রণালয় থেকে যেগুলোতে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্তদের স্বার্থ খুবই কম। এর প্রমাণ মিলবে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রতিটি ইউনিয়নে কয়েক বছরের সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ের ফিরিস্তি ঘাঁটলে।
পিচের রাস্তা ভেঙে প্রবেশ করছে জলোচ্ছ্বাসের পানি।
শ্যামনগরের কাশিমাড়ী ইউনিয়নের ডুবন্ত গ্রাম তরফদার পাড়ার বাসিন্দা ৮৩ বছর বয়সী রইস উদ্দিনের সাফ কথা: ‘অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা-অবহেলার ফাঁদে পড়ছি আমরা। বাঁধ শক্ত করে বেঁধে দিলে আমাদের এই দুর্দশা হতো না। আমাদের এই দুর্দশা মানুষেরই সৃষ্টি। কারও না কারও অপরাধের দায় আমরা বয়ে চলেছি।

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।