
স্টাফ রিপোর্টার : স্ত্রী কর্তৃক খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ খানের বিরুদ্ধে মানসিক, শারীরিক ও আর্থিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় স্ত্রী মোছাঃ মাহবুবা নাসরীন কেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন। এ বছরের ২২ ফেব্রুয়ারী অফিসিয়াল রেজিস্টার্ড ডাকযোগের মাধ্যমে এ অভিযোগ পত্রটি প্রেরণ করা হয়। তবে অভিযোগের প্রায় দুই মাস অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে কোনো ফলাফল পাননি ভুক্তভোগী স্ত্রী। বিষয়টি নিয়ে বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে, ভুক্তভোগী স্ত্রী কেয়া তার স্বামী আবু সাঈদ খানের বিরুদ্ধে দেনমোহর, খোরপোষ ও এবং সন্তানদের ভরণ-পোষণের অর্থ আদায়ের জন্য ঢাকার আদালতে মামলাও দায়ের করেছেন। আগামী ২৯ এপ্রিল মামলার শুনানীর দিন ধার্য্য করেছেন আদালত।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ খানের সঙ্গে ২০০৪ সালে ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক মোছাঃ মাহবুবা নাসরীন কেয়া বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিবাহের সময় স্বামী’র চাকরী না থাকা এবং দীর্ঘ ৫ বছর বেকার থাকার পর ২০০৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ড. আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ খান খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, দীর্ঘ বৈবাহিক জীবনে স্বামী আবু সাঈদের অব্যাহত মানসিক, শারীরিক ও আর্থিক নির্যাতনের শিকার হন স্ত্রী কেয়া ও তার সন্তানেরা। এমনকি বিয়ের পর থেকেই তিনি সংসার বিমুখ, দায়িত্বশূন্য ও বিকৃত আচরণের পরিচয় দিতে থাকেন। গভীর রাতে বাসায় ফেরা, মদ্যপান, পরোকীয়ায় আসক্ত এবং নারী লোলুপতার মতো নিন্দনীয় অভ্যাসের কারণে পারিবারিক পরিবেশ অসহনীয় হয়ে ওঠে। সময়ের সাথে তার আচরণ আরও হিংস্র ও অপমানজনক রূপ নেয়।
অপরদিকে, তার স্ত্রী মাহবুবা নাসরীন কেয়া ২০০৪ সাল থেকে ঢাকার গাজীপুরের টংগী পাইলট স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষক ছিলেন। ২০০৬ সালে তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি প্রজেক্টে যোগদান করেন।
এর আগে ২০০৪ সাল থেকেই স্ত্রী’র আয়ের অধিকাংশ অংশ তার স্বামীকে দিতেন। কারণ তার নিজস্ব কোনো পৈত্রিক সম্পদ বা স্থায়ী আয়ের উৎস ছিল না। এমনকি তার স্বামীর উচ্চশিক্ষা, কনফারেন্স ও বিদেশ সফরের জন্য স্ত্রী কেয়া একাধিকবার ঋণ গ্রহণ করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছেন। ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে স্বামী আবু সাইদের কনফারেন্সে অংশগ্রহণের পুরো ব্যয়ভারও বহন করেন বলে দাবি করেছেন স্ত্রী কেয়া।
এর বাইরেও বিভিন্ন সময়ে স্বামী আবু সাইদ নানা অজুহাতে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা তার কাছ থেকে নিয়েছে। এমনকি ১৪ ভরি স্বর্ণালঙ্কার, ডিপিএসের টাকা এবং পারিবারিক সহায়তায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টারের পেছনে ৫ শতক জমি ও নিরালা দিঘিরপাড় এলাকায় একটি ফ্ল্যাটের শেয়ার তার সঙ্গে যৌথভাবে ক্রয় করেন স্ত্রী। পরবর্তীতে জমি বিক্রির অর্থ দিয়ে ঢাকায় একটি ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রেও আর্থিকভাবে সহায়তা করেন তিনি। যার সমস্ত অর্থের উৎস স্ত্রী কেয়া এবং তার পরিবারের পরিশ্রমের ফল। এমনকি ২০০৯-২০১২ সালে ঝালকাঠির কাঁঠালিয়ায় চাকরিরত অবস্থায় স্ত্রীর নামে অফিসের বরাদ্দকৃত মোটরসাইকেলটিও স্বামী আবু সাইদ খুলনায় তিন বছর ধরে ব্যবহার করেন। পরে নিজস্ব মোটরসাইকেল ক্রয়ের সামর্থ্য না থাকায় স্ত্রী’র ডিপিএস ভেঙে আড়াই লাখ টাকা প্রদান করে মোটরসাইকেল ক্রয়ে সহায়তা করেন। যেটা তিনি এখনো ব্যবহার করছেন।
অভিযোগে স্ত্রী কেয়া আরও উল্লেখ করেন, তার নির্যাতন সময়ের সঙ্গে আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। তিনি তাকে নিয়মিত শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন। সামান্য কারণে অপমান করতেন এবং সন্তানদের ওপরও ভয়ভীতি, শারিরীক ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন। এ কারণে স্ত্রী-সন্তানেরা মারাত্মক মানসিক আঘাতপ্রাপ্ত হয় এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞের চিকিৎসা নিতে বাধ্য করা হয়।
তিনি স্ত্রী-সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ কিংবা প্রয়োজনীয় ব্যয়ের কোনো দায়িত্ব কখনোই নেননি। এমনকি সন্তান অসুস্থ হলেও কোনো খোঁজ খবর রাখেন না বা সহানুভূতি প্রকাশ করেন না। অথচ তিনি অবাধে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ান ও বিলাসী জীবনযাপন করেন, যা একজন স্বামী ও পিতার ন্যূনতম দায়িত্ববোধের পরিপন্থী বলেও অভিযোগ করা হয়। এক পর্যায়ে অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে স্ত্রী কেয়া খুলনায় আলাদা বাসায় বসবাস শুরু করেন এবং পরবর্তীতে সন্তানদের শিক্ষার স্বার্থে ঢাকায় চলে যান। কিন্তু তার স্বামী কখনোই ভরণপোষণের দায়িত্ব নেননি, বরং তিনি স্ত্রী’র কর্মস্থল, সহকর্মী ও আত্মীয়স্বজনদের কাছে স্ত্রীর বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন, মিথ্যা ও মানহানিকর তথ্য প্রচার করে আসছেন।
স্ত্রী কেয়া’র অভিযোগ, তার শ্বশুর বাড়ির পারিবারিক পরিবেশও দীর্ঘদিন ধরে অশান্ত ও সহিংস। তার ভাইদের মধ্যেও মারাত্মক পারিবারিক সংঘাত ও মারপিটের ঘটনা বিদ্যমান। যা প্রমাণ করে এই পরিবারের সহিংসতার প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর। ফলে তিনি নিজের এবং তার সন্তানদের নিরাপত্তা চরমভাবে হুমকির মুখে রয়েছে বলে আশংকা প্রকাশ করেন।
এদিকে, স্বামী আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ খান হয়রানী করার উদ্দ্যেশ্যে কেয়া’র বৃদ্ধ পিতা, মাতা ও একমাত্র ভাইয়ের (ব্যাংকার) বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলাও দায়ের করেছেন। স্ত্রীর অর্থে ক্রয় করা ফ্ল্যাট থেকে বেদখল করার জন্য হুমকি দেন এবং তাকে ভয়ভীতিও প্রদর্শন করেন। উক্ত বিষয়ে গত ১৪ ফেব্রুয়ারী ঢাকার পল্লবী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী করেন স্ত্রী কেয়া।
স্ত্রী মাহবুবা নাসরীন কেয়া এ প্রতিবেদককে বলেন, তার স্বামীর উল্লিখিত কর্মকান্ডে পারিবারিক সম্মান ও সামাজিক মর্যাদা বিবেচনায় এতদিন তিনি নীরব ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে তিনি ব্যক্তিগত ও পেশাগত মর্যাদা ক্ষুন্ন করছেন। ফলে উল্লেখিত বিষয়টি সুষ্ঠভাবে তদন্ত করে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিকারের দাবি জানিয়েছেন তিনি। এছাড়া খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক দপ্তরে অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে অনুলিপি প্রেরণ করেছেন তিনি।
স্ত্রী’র অভিযোগ অস্বীকার করে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ খান বলেন, উনার সাথে আমার কিছুদিন আগে ডিফোর্স হয়ে গেছে। তিনি যেটা বলছেন তার কোন সত্যতা নেই, যেটা সম্পূর্ণ অসত্য।
যেহেতু পারিবারিক বিষয়, এটা আদালতে সাব জুডিশিয়াল মেটার হিসেবে আছে।
এ বিষয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. রেজাউল করিম স্ত্রী কেয়ার অভিযোগপত্র প্রাপ্তির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, বিষয়টি তাদের পারিবারিক। এ কারণে পারিবারিকভাবেই মিমাংশা বা মিটিয়ে ফেলতে বলা হয়েছে। তা নাহলে এটা নিয়ে সবারই মান-সম্মান যাবে।
বিশেষ করে তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্কের বিচ্ছেদ হওয়ায় স্ত্রী’র পাওনা দেনমোহর, খোরপোশ এবং সন্তানদের ভরণ-পোষণ অবশ্যই দিতে হবে-উল্লেখ করে এ বিষয়টি তিনি দেখবেন বলে জানিয়েছেন।