
ফুলতলা (খুলনা) প্রতিনিধি : খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বিতান কুমার মন্ডল বলেছেন, রবীন্দ্রনাথ একটি প্রতিষ্ঠান। তাঁর কৃষি দর্শন কেবল কৃষিকাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল গ্রামীণ জনজীবনের সার্বিক উন্নয়ন, আত্মনির্ভরশীলতা এবং আধুনিকায়নের এক সমন্বিত রূপরেখা। তিনি বিশ্বাস করতেন, কৃষকদের অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত না হলে দেশের প্রকৃত উন্নতি অসম্ভব। রবীন্দ্রনাথ ১৮৯৯ সাল থেকে শিলাইদহ ও পতিসরের জমিদারিতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কৃষি বিপ্লবের সূচনা করেন। তিনি কৃষকদের সাধারণ চাষের পরিবর্তে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ধান, আমেরিকান ভুট্টা, নৈনিতাল ও আমরাগাছি আলু, পাটনাই মটর, আখ ও কপি চাষের উৎসাহ দিয়েছিলেন।
তিনি আরও বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বুঝতে পেরেছিলেন যে, ক্ষুদ্র কৃষকরা আলাদাভাবে আধুনিক কৃষিযন্ত্র ব্যবহার করতে পারবে না। তাই তিনি সমবায়ের মাধ্যমে জমি একত্রিত করে যৌথ চাষাবাদের পরামর্শ দিয়েছিলেন। কৃষকদের সুদখোর মহাজনদের হাত থেকে রক্ষা করতে তিনি পতিসরে ১৯০৫ সালে নিজস্ব অর্থায়নে কৃষি সমবায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। কৃষিকে জীবিকা হিসেবে সম্মানজনক করতে তিনি ছেলে রথীন্দ্রনাথকে আমেরিকায় কৃষিবিদ্যা পড়তে পাঠিয়েছিলেন, যা তৎকালীন সময়ে অত্যন্ত দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ছিল। পরে ১৯২২ সালে তিনি বোলপুরের শ্রীনিকেতন-এ একটি কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করেন, যা আজও কৃষি শিক্ষার এক অন্যতম প্রতিষ্ঠান।
রবীন্দ্রনাথের দর্শনে কৃষি ছিল পল্লী পুনর্গঠনের প্রধান স্তম্ভ। তিনি গ্রামকে ‘জীবন্ত’ করতে চেয়েছিলেন যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষির সমন্বয় থাকবে। তিনি কৃষিতে গ্রামীণ নারীর অবদান স্বীকার করেছিলেন এবং পল্লী উন্নয়নে তাদের অংশগ্রহণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। রবীন্দ্রনাথের কৃষি দর্শন ছিল ‘আত্মশক্তি’ বা আত্মনির্ভরশীলতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি টেকসই ও আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা, যেখানে প্রকৃতি এবং মানুষ একে অপরের পরিপূরক।
রোববার বিকালে খুলনা ফুলতলা উপজেলার দক্ষিণডিহি রবীন্দ্র কমপ্লেক্সে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের সমাপনী দিনে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় এ কথা বলেন। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও খুলনা জেলা প্রশাসন যৌথভাবে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন স্থানীয় সরকার খুলনার উপপরিচালক মোঃ আরিফুল ইসলাম। ‘‘রবীন্দ্রনাথের কৃষি দর্শন’ শীর্ষক স্মারক বক্তৃতা করেন শিক্ষাবিদ ও গবেষক অধ্যাপক মোঃ আব্দুল মান্নান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুচি রানী সাহা। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন খুলনা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার আসাদুজ্জামান আরিফ ও রহমতুল্লাহ। পরে অনুপম মিত্রের পরিচালনায় বিভিন্ন শিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।