
পাইকগাছা প্রতিনিধি : মুসলিম উম্মাহর অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা (কুরবানির ঈদ) যতই ঘনিয়ে আসছে, খুলনার পাইকগাছা উপজেলা সদর সহ বিভিন্ন এলাকায় কামারপট্টিতে ততই ব্যস্ততা বাড়ছে। কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জ্বলছে কয়লার আগুন। বাতাসে উড়ছে আগুনের ফুলকি, আর চারপাশ মুখরিত হয়ে উঠেছে হাতুড়ি পেটানোর চেনা ‘টুংটাং’ শব্দে। কুরবানির পশু জবাই এবং মাংস কাটার প্রধান অনুষঙ্গ দা, বঁটি, ছুরি আর চাপাতি তৈরিতে এখন দম ফেলার ফুরসত নেই উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কামার শিল্পীদের। স্মৃতির অন্তরালে ঐতিহ্যবাহী পেশার গল্প পাইকগাছা উপজেলা সদরের কামারপট্টি ঘুরে দেখা যায়, কুরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে জমে উঠেছে এই প্রাচীন কুটির শিল্প। এখানকার কারিগরদের সাথে কথা বলে উঠে আসে এই পেশার সাথে তাদের দীর্ঘ পথচলার এক আবেগঘন ইতিহাস। কামারপট্টির সবচেয়ে প্রবীণ কারিগর ফজর আলী (৭৫)। জীবনের সিংহভাগ সময়ই পার করেছেন এই কামারশালায়। কয়লার উত্তাপ আর লোহা পেটানোর শব্দই যেন তার জীবনের চেনা ছন্দ। দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে এই পেশায় কাজ করার অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, “বাপ-দাদার আমল থেকে এই হাতুড়ি আর হাপর টেনেই জীবনটা পার করে দিলাম। আগে সারা বছরই ভালো কাজ হতো। এখন শুধু এই কুরবানির ঈদের সময়টাতেই আমাদের ডাক পড়ে। বয়স হয়েছে, শরীর আর চলে না, তাও ঈদের এই সময়টায় দোকানে না এসে ঘরে বসে থাকতে পারি না।” কথা হয় আরেক অভিজ্ঞ কারিগর দুলাল কর্মকারের (৫৯) সাথে। তিনি দীর্ঘ ৪০ বছর যাবত এই পেশার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তার আদি বাড়ি কয়রা উপজেলার আমাদী গ্রামে হলেও, ছোটবেলা থেকেই তিনি পাইকগাছা সদরে এসে এই পেশায় থিতু হয়েছেন। তিনি জানান, কুরবানির এই শেষ সময়ে কাজের যে চাপ থাকে, তা সামাল দিতে তাদের নাওয়া-খাওয়ার সময়টুকুও মিলছে না। এই পট্টির আরেকটি পরিচিত নাম তপন, শংকর, প্রকাশ কর্মকার। তাদের পিতা যমুনা কর্মকার ছিলেন এই অঞ্চলের এই শিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ। বহু বছর আগে কপিলমুনি থেকে পাইকগাছা সদরে এসে তিনিই প্রথম এই লোহার সরঞ্জাম তৈরির ব্যবসা শুরু করেন। পিতার সেই ঐতিহ্য ও স্মৃতিকে বুকে আগলে তারা আজও এই পেশা টিকিয়ে রেখেছেন। একই কামারশালের কারিগর আব্দুস সামাদ জানান, প্রায় ৩০ বছর ধরে অর্থাৎ জ্ঞান বা বুঝতে শেখার পর থেকেই তিনি এই কাজের সাথে জড়িয়ে আছেন। তার কাছে এটি কেবল জীবিকা নয়, বরং এক ধরনের মায়া ও শিল্প। নতুন সরঞ্জামের চাহিদা ও শান দেওয়ার ধুম
বর্তমানে বাজারে আসা কুরবানিদাতারা পশু জবাইয়ের জন্য বড় ছুরি এবং হাড় কাটার জন্য ভারী চাপাতি বেশি কিনছেন। নতুন পণ্য কেনার পাশাপাশি অনেকেই বাড়ি থেকে পুরনো দা, বঁটি, ছুরি নিয়ে আসছেন শান (ধার) দেওয়ার জন্য। ফলে প্রতিটি দোকানেই এখন উপচেপড়া ভিড়। লোহা ও কয়লার দাম গত বছরের তুলনায় কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় তৈরিকৃত সরঞ্জামের দামও সামান্য বেড়েছে। মানভেদে বর্তমানে বাজার দর পশু জবাইয়ের বড় ছুরি- ৩শত থেকে ১৭-১৮ শত টাকা, মাংস কাটার চাপাতি ৬শত থেকে ১১৪/১৫ শত টাকা, দা ও বঁটি আড়াইশত থেকে ৮শত টাকা পর্যন্ত, পুরনো পণ্যে শান দেওয়া ৫০ থেকে ১৫০ টাকা। টিকে থাকার লড়াই এ আধুনিক যুগে বাজারে রেডিমেড বা বিদেশি আধুনিক যন্ত্রপাতির আধিক্য থাকলেও, টেকসই ও গুণগত মানের কারণে পাইকগাছার সাধারণ মানুষ এখনও এই কামারদের হাতে তৈরি ইস্পাত বা গাড়ির স্প্রিংয়ের লোহার তৈরি সরঞ্জামের ওপরই ভরসা রাখছেন। তবে কারিগরদের দাবি, বছরের অন্য সময়ে কাজ সীমিত থাকায় এবং সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক সহজ শর্তে ঋণ না পাওয়ায় অনেকেই এই পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। সব ক্লান্তি আর অভাব-অনটন ভুলে, কপালের ঘাম আর আগুনের উত্তাপকে সঙ্গী করে পাইকগাছার কামারশালার কারিগররা এখন ব্যস্ত উৎসবের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে। তাদের হাতের প্রতিটি হাতুড়ির আঘাত যেন জানান দিচ্ছে- ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত পবিত্র ঈদুল আজহা আর মাত্র কয়েকদিন বাকি।